চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩০
আরোবা চৌধুরী আরু
স্টাডি রুমে নিস্তব্ধ নীরবতা।
মাহবুব রাশিদ আর মঈন রাশিদ পাশাপাশি বসে আছেন। সামনে চেয়ারে বসে আছে সায়মান। হাতে খোলা বই, চোখ বইয়ের দিকে দৃষ্টিবদ্ধ । পাশে দাঁড়িয়ে আছে রায়হান। মাথা নিচু করে নিজের ভেতরেই ডুবে গেছে সে।
অনেকক্ষণ নীরবতা চলার পর মাহবুব রাশিদ বিরক্ত হয়ে উঠলেন।
—— “এভাবে ডেকে এনে চুপচাপ বসিয়ে রাখার মানে কী? আমার বাইরে যেতে হবে। ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে।”
সায়মান ধীরে বই থেকে চোখ তুলে বাবার দিকে তাকালো। ঠাণ্ডা কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল,
——— “আজকের মিটিং ক্যানসেল করে দেন। বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা।”
এই কথায় বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল মাহবুব রাশিদ আর মঈন রাশিদের।
——— “কি আজে-বাজে কথা বলছো! মাথা ঠিক আছে তোমার ?” ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন মাহবুব রাশিদ।
——— “ সায়মান! বাড়ির বড় মেয়ে মানে রুহি। রুহির বিয়ে আবার কোথা থেকে এলো আজকে?” মঈন রাশিদও বিস্ময়ে বললেন।
কিন্তু সায়মান আর কিছু বলল না। দৃষ্টি ঘুরিয়ে নীরবে তাকালো রায়হানের দিকে।
রায়হান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বুক ওঠানামা করছে, বারবার ঢোক গিলছে। সায়মান এবার কড়া স্বরে বলল—
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
——— “চুপ করে আছিস কেন? তোকে কথা বলতে বলেছি, কথা বল!”
রায়হান কাঁপা গলায় মাথা উঁচু করল। গলায় ঢোক গিলে বলল—
——— “বড় মামু… ছোট মামু… আমি রুহিকে ভালোবাসি। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। রুহিও আমাকে ভালোবাসে। প্লিজ, না বলবে না। আর কিছু চাইব না কখনো। শুধু রুহিকে আমার হাতে তুলে দেও।”
বলতে বলতে রায়হানের চোখ টলটল করে উঠল। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে অশ্রু ঝরে পড়বে।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। মাহবুব রাশিদ স্থির মুখে বসে রইলেন। তাঁর মুখ থেকে কোনো ভাব প্রকাশ পেল না। মঈন রাশিদ বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে বললেন———
——— “এসব কবে থেকে চলছে? আজ হঠাৎ করে এসব বলছিস কেন? রুহির বিয়ে যদি না ভাঙত তাহলে কী করতিস? আগে কেন বলিস নি?”
রায়হান নিচু মাথায় উত্তর দিল,
——— “বড় মামুর একজনকে কথা দিয়ে ফেলেছিল,, মামুর কথার খেলাপ হবে বলে কিছু বলতে পারিনি।”
মঈন রাশিদ নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। বুকের ভেতরে অস্বস্তির কষ্ট অনুভব করল। হঠাৎ মনে হলো———তিনি তো কখনো মেয়েকে জিজ্ঞেসই করেননি, সে কাউকে ভালোবাসে কি না, সে এই বিয়েতে রাজি কি না। বাবা হিসেবে তিনি তাহলে ব্যর্থ।
এবার মাহবুব রাশিদ গলা খাঁকারি দিল——
——— “আজ পর্যন্ত তোমাদের ইচ্ছার বাইরে তোমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দিয়েছি? আশেপাশে তাকালেই তো প্রমাণ পাবে।” বলে একবার সায়মানের দিকে তাকালেন।
—— “আমাকে একবার বলতে পারতে। এতটাও খারাপ ভেবো না আমাকে। আমার কথার খেলাপ হবে বলে কখনো তোমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেব । আমার ওপর তোমরা ভরসাই করে দেখতে পারতে।”
রায়হান কাতর চোখে বড় মামার দিকে তাকিয়ে বলল——
—— “বড় মামু, প্লিজ এভাবে বলো না। ছোট থেকে তুমি আমাদের আগলে রেখেছো। আমাদের সব ইচ্ছে পূরণ করেছো।”
মাহবুব রাশিদ কোনো উত্তর দিলেন না। এবার তিনি একজন গৃহকর্মীকে ডাক দিলেন।
—— “উপরে গিয়ে রুহিকে নিয়ে আসো। আর বাড়ির বাকি সদস্যদেরও ডেকে আনো।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই উপস্থিত হলো। ঘরে চাপা গুঞ্জন, কিন্তু কেউ কিছু জানে না। সাবিহা খালেদ বিস্ময়ে তাকালেন ছেলের দিকে। রায়হান তো তাকে বলেছিল ঢাকায় এখন আসবে না কয়েকদিন পর আসবে কাজ আছে! রুহির এনগেজমেন্টেও আসেনি এত বলার পর । হঠাৎ সকালে কীভাবে এখানে?
রুহি ঘরে ঢুকলো। প্রথমেই চোখ পড়ে গেল রায়হানের দিকে। কতদিন পর এ মানুষটিকে সামনে দেখল! বুকটা ভরে গেল আবেগে, আবার অভিমানেও।
মাহবুব রাশিদ সবাইকে বসতে বললেন। তারপর রুহিকে ইশারা করলেন পাশে বসতে। রুহি ভদ্র মেয়ের মতো গিয়ে বসল বড় আব্বুর পাশে। তিনি রুহির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন——
—— “তুমি রায়হানকে ভালোবাসো? নির্দ্বিধায় বলতে পারো। ভুল হয়েছিল আমাদের , তোমাকে কিছু না জিজ্ঞেস করেই বিয়ে ঠিক করেছিলাম। এখন সুযোগ এসেছে। তুমি যা চাও তাই হবে। কেউ তোমাকে ফোর্স করবে না।”
রুহির চোখ ভিজে গেল। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল——
——— “বড় আব্বু, আমি রায়হান ভাই ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারব না। আমি রায়হান ভাইকে ভালোবাসি।”
রায়হান মাথা তুলে রুহির দিকে তাকাল। চোখে অপরাধবোধ। যে মেয়েকে ভালোবাসেছে , তার কথা সবার সামনে মাথা উঁচু করে বলতে পারেনি। নিজেকে আজ মনে হচ্ছে কাপুরুষ,, তার জন্য রুহিকে এত কষ্ট পেয়েছে ।
ঘর ভরে গেল বিস্ময় আর আবেগে। সাবিহা খালেদ প্রথমে অবাক হলেও পরে মুখে হাসি ফুটল। ইমা বেগমও চোখ মুছলেন। মনে মনে কৃতজ্ঞ হলেন আল্লাহর কাছে—ভালোই হয়েছে বিয়েটা ভেঙে গেছে আগেই। না হলে সারাজীবন মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারতেন না। মা হয়ে মেয়ের মনের কথা বুঝতে পারেনি।
মাহবুব রাশিদ দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন——
—— “সবাই প্রস্তুতি নাও। আজই কাবিন হবে। পরবর্তীতে বড় অনুষ্ঠান করা যাবে। ” সাবিহা তোর কোনো সমস্যা থাকলে বলতে পারিস এখনি। শেষের কথা সাবিহা খালেদ এর দিকে তাকিয়ে বললেন।
কি যে বল ভাইয়া তুমি আমাদের জন্য সব সময় সঠিক সিদ্ধান্তই নেবে। আর ওরা দুইজন একে অপরকে যখন পছন্দ করে এর ভিতর আমাদের তো কোন কথা বলারই নেই।
মাহবুব রশিদ সাবিহা খালেদের কথা শুনে মনে হয়, সন্তুষ্ট হলেন। তিনি আবার রুহির মাথায় স্নেহের হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর ধীর পদক্ষেপে উঠে গেলেন ঘর থেকে।
মঈন রাশিদ ধীরে ধীরে মেয়ের দিকে এগিয়ে এলেন। তার চোখে তখন হাজারো অনুশোচনা, বুকের ভেতরে জমে থাকা অপরাধবোধ। কাছে গিয়ে মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত রাখতেই——
রুহি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হঠাৎ হুহু করে শব্দ করে কেঁদে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বুক ভরে উঠলো জমে থাকা অভিমান, কষ্ট আর ভালোবাসায়।
মেয়েকে বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মঈন রাশিদের গলাও ভারী হয়ে গেল। কাঁপা কণ্ঠে বললেন ———
———“বাবাকে ক্ষমা করে দিও, প্রিন্সেস… বাবা তোমার মনের কথা বুঝতে পারেনি। তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছিলাম। বাবা হিসেবে আমি ব্যর্থ হয়েছি।”
রুহি আরও জোরে বাবাকে আঁকড়ে ধরল। যেন দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট বাবার বুকের ভেতর উজাড় করে দিতে চাইছে।
ইমা বেগমও এগিয়ে এলেন। মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে পাশে বসলেন। তাঁর চোখে তখন অশ্রু, কণ্ঠে অপরাধবোধ।
— “আমাকেও ক্ষমা করে দিস মা… আমি মা হয়েও তোর মনের কথা বুঝতে পারিনি। তোকে একবারও জিজ্ঞেস করিনি তুই আসলে কী চাও।
রুহি ভেজা চোখে মায়ের হাত চেপে ধরল।
রিশা আর রাহিল ও দৌড়ে গিয়ে রুহি, মঈন রাশিদ আর ইমা বেগমকে জড়িয়ে ধরল। তাদের ছোট্ট ভালোবাসায় চারপাশের আবহটা আরও নরম আর আবেগময় হয়ে উঠল।
সায়ফান ধীরপায়ে রায়হানের পাশে এসে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রাখল—
—— “এ ভাই এ ভাই, জেনেশুনে এইরকম খবরায় চন্ডীকে নিজের কাঁধে চাপাচ্ছিস কেন? তলে তলে সবাই প্রেম করে ঝটকা মেরে দিচ্ছে, আর আমি সারা জীবন মেয়েদের ইগনোর করে গেলাম বলে আমার তো কিছুই হলো না…”
শেষের লাইনটা সায়ফান এমন হতাশ ভঙ্গিতে বলল।
রায়হান এবার চোখ ছোট ছোট করে সায়ফানের দিকে তাকাল।
—— “এভাবে চোখ ছোট ছোট করে তাকাচ্ছ কেন? আমি একটু কান্না করে আসি…” বলে সায়ফান মজা করতে করতে রুহিদের দিকে এগিয়ে গেল। মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের সবাইকে জড়িয়ে ধরল। তারপর শয়তানি করে হাউমাউ করে কান্না শুরু করল।
ওর এই ভণ্ড কান্না দেখে , সকলে হেসে ফেলল। কান্নার ভেতরেও রুহির ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।
নাফিসা, আফিয়া বেগম আর বিলকিস আরা বেগম পাশে দাঁড়িয়ে সায়ফানের খুনসুটি মজা দেখছিল।
হাসির ভেতরেই হঠাৎ নাফিসার চোখ সরে গেল এক পাশে বসে থাকা সায়মানের দিকে। সায়মান নিঃশব্দে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
দৃষ্টি যেন একেবারে ভেদ করে যাচ্ছে নাফিসার বুকের ভেতর।
মুহূর্তেই নাফিসা অস্থির হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি আফিয়া বেগমের আড়ালে চলে গেল। কিন্তু কৌতূহল সামলাতে না পেরে আবার মাথা বের করে উঁকি দিল। সায়মান এখনো একই ভঙ্গিতে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,কিন্তু এখন কপাল কুঁচকে।
তা দেখে নাফিসা নিজে ও ভুরু জোড়া কুঁচকালো ।
এই সময় বিলকিস আরা বেগম গম্ভীর গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন—
—— “অনেক হয়েছে। যেহেতু আজকেই কাবিন হবে, আমার মনে হয় সবাইকে কাজে লেগে পড়া উচিত। এভাবে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা ঠিক না।”
সবাই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল,ব্যস্ত হয়ে উঠল বিয়ের প্রস্তুতিতে।
রুহি বউ সাজে রায়হানের পাশে বসে আছে। রায়হানের ডানদিকে বসে আছেন সাবিহা খালেদ, আর রুহির বাঁ পাশে বসে আছেন মঈন রাশিদ। রুহি বাবার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে—
সামনেই বসে আছেন কাজী সাহেব। বিয়ের কাগজপত্র নিয়ে তিনি ব্যস্ত, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কাবিন পড়ানো শুরু করবেন।
পরিবারের বাকি সদস্যরা সবাই উপস্থিত। তা ছাড়া কেউ নেই তেমন। রুশনা আর আরিব রা নেই—— গতকালই তারা ফিরে গেছে। যদিও আজকের জন্য তাদের ডাকা হয়েছিল , কিন্তু ওরা কাজের কারণে আর আসতে পারেনি।
একপাশে দাঁড়িয়ে আছে রিশা, নাফিসা আর জারিন। তিনজন মিলে ফিসফিসিয়ে প্ল্যান করছে———কীভাবে রায়হানের জুতা চুরি করা যায়!
ওরা মূলত দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে—মেয়ে পক্ষ আর ছেলে পক্ষ। মেয়েরা নিজেদের দলে, আর ছেলেরা ছেলেপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাইমা অবশ্য কোনো দলে যোগ দেয়নি। তার এসব করার সময় নেই। সে বারবার চারিদিকে তাকাচ্ছে, সায়মানকে খুঁজছে। কিন্তু সায়মান এখনো এসে পৌঁছায়নি।
এদিকে সাইফান, রিদওয়ান আর রাহিল হেসে হেসে এগিয়ে গেল নাফিসাদের দিকে। চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে সাইফান বলল—
——— “কি প্ল্যানিং চলছে শুনি দেখি? আমরাও একবার মাথা ঘামাই।”
এই কথা শুনে জারিন চোখ উল্টে উত্তর দিল—
——— “আমাদের প্ল্যান তোমাদের জানাতে যাব কেন ? যাও এখান থেকে আগে নিজের দলের দিকে খেয়াল রাখো।”
সাইফান ঠোঁট বাঁকিয়ে জারিনের দিকে তাকিয়ে বলল—
——— “তোমাদের প্ল্যান এমনিই ব্যর্থ হবে। জুতার উপর পাহারা দিয়ে রাখব। তখন দেখব কিভাবে চুরি করো।”
জারিন সঙ্গে সঙ্গে হাত কোমরে রেখে বলল—
——— “এই যে অত আত্মবিশ্বাস দেখিয়ো না!
আমরা না তোরা বেশি আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছিস রিদওয়ান বলে উঠলো।
এবার রিশা সামনে এগিয়ে এসে রিদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল——
তোরা আমাদের প্লানিং এখানে শুনতে এসেছিস আবার বেশি বড় বড় লেকচার দিচ্ছিস।
রিদওয়ান হেসে ——
——— আমাদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই তোরা কি পচা মার্কা প্ল্যানিং করছিস তা শুনতে আসবো। তোরা এমন করে কথা বলছিস যে, তোদের আওয়াজ পাশের বাড়ি থেকেও শোনা যাচ্ছে ।
রিশা চোখ কুঁচকে রাগী ভঙ্গি করে বলল—
—— “তুই একেবারে বেয়াদব! এখনই কিন্তু তোর কান মুচড়ে দেব।”
এই শুটকি চুপ থাক বেশি কথা শিখে গেছিস… আগে জুতা চুরি করে দেখা আগে ।” সায়ফান বুক ফুলিয়ে বলল।
—— “আরে আমি বলছি, তোমাদের বোকা বানাতে পাঁচ মিনিটও লাগবে না।” জারিন চোখ উল্টে উত্তর দিল।
ঐ তো, তেহুও চলে এসেছে। আফিয়া বেগম তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন—
—— “এবার তাহলে বিয়ে পড়ানো শুরু করে দেন, কাজী সাহেব।”
—— “রায়হান এতক্ষণ , সায়মান জন্য বসে ছিল। সায়মান আসবে তারপরই বিয়ে পড়ানো শুরু হবে।”
এতক্ষণ ওদের ঝগড়া–খুনসুটি শুনে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে রেখেছিল ও । আফিয়া বেগমের কথা শুনে নাফিসার দৃষ্টি সায়মানের দিকে গেল। সায়মান আজকে সাদা পাঞ্জাবি পরে এসেছে, সেই সরল রূপে যেন আরও গম্ভীর আর দৃঢ় লাগছে তাকে।
নাফিসা কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তারপর রিশাদের সঙ্গে গিয়ে বসে পড়ল।
অবশেষে সায়মান এগিয়ে এসে কোনো দিকে না তাকিয়ে এক পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে গেল।
—— “কাজী সাহেব, শুরু করুন।”—— আর দেরি করলেন না দৃঢ় কণ্ঠে বললেন মাহবুব রাশিদ।
কাজী সাহেব হাতে কাগজ নিয়ে এগিয়ে এলেন। নিস্তব্ধ পরিবেশে শুরু হলো কাবিন পড়ানো। উপস্থিত সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো রুহি আর রায়হানের দিকে।
রুহি লজ্জা, কাঁপুনি আর অশ্রুতে ভরা কণ্ঠে কবুল বলার আগে একটু সময় নিল। । অন্যদিকে রায়হান দ্বিধা না করে দৃঢ় কণ্ঠেই তাড়াতাড়ি কবুল বলে দিল। মুহূর্তেই সবার বুক থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।
কাবিন শেষ হতেই রুহি উঠে দাঁড়াল। সবার সামনে হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে সায়মানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ছোট বোনের অশ্রুসিক্ত আলিঙ্গনে সায়মানও আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারল না। মমতার হাত বুলিয়ে দিল বোনের মাথায়।
এরপর একে একে বাকি ছোটখাটো সব কার্যক্রম শেষ হলো। জুতা চুরি নিয়ে বেশ হইচই বাঁধল মেয়েপক্ষ আর ছেলেপক্ষের মাঝে। রিশা, নাফিসা, জারিন মিলে একেবারে প্ল্যান সাজিয়ে রেখেছিল। কিন্তু রায়হান তাদের বেশি বাড়তে দিল না—ঝামেলা শুরুর আগেই টাকা দিয়ে দিল।
এই নিয়ে সায়ফান, রাহিল আর রিদওয়ান ভীষণ রাগ দেখাল।
—— “এইভাবে লেনদেন করলে মজা কোথায় থাকে, বল তো!” সায়ফান ভুরু কুঁচকে গজরাল।
সবশেষে,সারাদিন পর সবার আনন্দ–হইচইয়ের মধ্যেই নবদম্পতিকে বাসর ঘরে পৌঁছে দেওয়া হলো।
রুহি ঘরে ঢুকতেই, মাথায় রাখা বিয়ের ওড়নাটা এক টান দিয়ে খুলে ফেলল। চোখে-মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। সোজাসুজি এগিয়ে গেল আলমারির দিকে নিজের জামা বের করতে ।
রায়হান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রুহির প্রতিটি কার্যক্রম লক্ষ্য করছে। এবার একটা ঢুক গিলে সে এগিয়ে গেল রুহির দিকে, পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল এবং কাঁধে মাথা রেখে ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলল।
রুহির হাত সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। রায়হানের গরম নিঃশ্বাস যেন তার গলার সঙ্গে মিশে গেল। শরীরটা হঠাৎ শিউরে উঠল। রায়হান ওর কাঁধে ধীরে একটা চুম্বন এঁকে দিল রুহি সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে করে নিল ।
কিন্তু মুহূর্তের জন্যও ওর মনে পড়ল —— অবহেলা রাগ আর অভিমানের কথা। ঝাটকা দিয়ে রুহি নিজেকে রায়হানের কাছ থেকে সরিয়ে নিল।
—— “স্পর্শ করবে না তুমি… আমাকে।”
রুহির চোখ তখন টলমল করছে, কাঁপা কণ্ঠে ভরা আবেগ।
রাইহান অসহায় দৃষ্টিতে রুহির দিকে তাকাল।
——— “বড় ভাইয়া যদি তোমাকে না আসতে বলত আর আমি যদি ভাইয়াকে সব না জানাতাম… তাহলে আজ কি হতো? আমি… আমি কথা বলতে গিয়ে বেধে যাচ্ছে , রুহির … কত কিছুর ভিতর দিয়ে গেছি জানো, তুমি তো দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছিলে আমাকে ফেলে রেখে।”
রাইহানের চোখ লাল হয়ে উঠল, চোখ টলমল করছে। মাথা নিচু করে, কণ্ঠ কম্পমান হয়ে বলল,
——— “সরি… সরি।”
কেবল স্রেফ “সরি” দিয়ে সব ঠিক হয় কি । কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে বলল—
——— “তুমি আগে আমাকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, তারপর মাঝপথে এসে কী করলা? ছেড়ে দিলে? তুমি স্বার্থপর, রায়হান ভাই।”
বলতে বলতেই মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে উঠল রুহি।
রাইহান আর দাঁড়াতে পারল না। ধীরে এগিয়ে গিয়ে রুহিকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল।
——— “সরি… আর কোনদিন এরকম ভুল হবে না। আমি নিজেও জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে গেছি এই কয়েকদিনে। তোকে আর কষ্ট দেব না কখনো। এবারের মতো ক্ষমা করে দে, প্লিজ।”
রুহি তার হাত নিজের থেকে সরাতে চাইল,মুচরা মুচকি শুরু করল। কিন্তু রাইহান আরও শক্ত করে ধরল ওকে ।
শেষমেশ রুহি কিছুতেই আর না পেরে চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর হঠাৎ অনুভব করল, তার কাঁধে ঠান্ডা কিছু স্পর্শ করছে।
——— “রায়হান ভাই… তুমি কাঁদছ?”
কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল ও।
রায়হান চুপচাপ থাকল না। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, গলায় মুখ মুড়ে নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল।
ঘরের মধ্যে নীরবতা দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজ করল। তারপর রুহি কণ্ঠ কেঁপে মুখ খুলল—
——— “প্লিজ… আর কোনদিন আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি মরে যাবো… এবার যদি কিছু হয়, সত্যিই আমি মরে যাব।”
রায়হানের কানে রুহির শব্দ ভেসে এলেই, সে ধীরে ধীরে রুহিকে ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে রুহির দুই গালে আলতো স্পর্শ করল। কপালে চুমু দিল, তারপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে বলল—
——— “আর কোনদিন তোকে এমন কথা বলতে না দেখি যেন । আর কথা দিচ্ছি… আর কোনদিন তোকে ছেড়ে যাব না।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাইহানের কণ্ঠে এবার মৃদু কাতরতার ঢেউ উঠল—
——— “আজ রাতটা আমাকে দিবি…?”
রুহি রায়হানের দিকে তাকাল। চোখে চোখ মিলিয়ে বুঝে গেল সে কি বোঝাতে চাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে রুহি নিজেই ধীরে ধীরে তার কোমল অধর মিলিয়ে দিল রায়হানের শক্ত অধরের সাথে।
রায়হান কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেও প্রিয়সির নিজ থেকে আসা আমন্ত্রণ আর ফেলে দিতে পারলো না। প্রথম স্পর্শে হৃদয় একে অপরের জন্য আরও দৃঢ়ভাবে ধুকপুক করতে লাগল। ঘরটা ভরে উঠল রোমান্টিক উত্তাপ আর আবেগে। ধীরে ধীরে তারা একে অপরের কাছে এসে বসে, সমস্ত দুঃখ, দূরত্ব আর ভুল বোঝাবুঝি যেন মুছে গেছে। নিঃশ্বাসের সাথে নিঃশব্দে বলা কথা, মৃদু হাসি আর কোমল ছোঁয়া—সব মিলিয়ে রাতটা হয়ে উঠল তাদের প্রথম সত্যিকারের মিলনের মুহূর্ত।
ঘরটা নীরব হলেও, সেই নীরবতা ছিল তাদের আবেগের একান্ত সাক্ষী। একে অপরের ছোঁয়ায়, চোখের ভাষায়, হাহাকার আর প্রশান্তির মিশেলে তারা এক অনন্ত রাতকে বয়ে নিয়ে গেল।
নাফিসা এতক্ষণ সবাইকে সাথে হাসাহাসি, খুনসুটি করছিল। এবার হাঁটতে হাঁটতে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলো। হঠাৎ পিছন থেকে যেন বজ্রপাতের মতো কারো শক্ত হাত তার কব্জি চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র এক টানে শরীরটা ঘুরে গেল।
চমকে উঠে নাফিসা চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতর তীব্র ধকধকানি। ঠিক সেই মুহূর্তে পরিচিত এক ঘ্রাণ নাকে এসে লাগল—যা কেবল একজন মানুষের সঙ্গেই মিশে আছে। আস্তে আস্তে চোখ খুলতেই দেখে—সে দাঁড়িয়ে আছে সায়মানের ঘরে… সায়মান ওকে জরিয়ে রেখেছে এক হাত দিয়ে।
সায়মান নীরবে ওর মুখের ওপর এলোমেলো চুলগুলো আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিল। সেই কোমল স্পর্শে নাফিসার চোখ আবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বুজে এল। সায়মান ঝুঁকে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে একেবারে কানের ওপর একটা নরম চুমু এঁকে দিল। শরীরটা কেঁপে উঠল নাফিসার। তা দেখে সায়মানের ঠোঁটে মৃদু এ হাসির রেখা দেখা দিল।
ধীরে ধীরে ওর নাকের সাথে নিজের নাক ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল—
—— “আমার পিচ্চি পুতুল… কালকে আমি তোমাকে কলেজে দিয়ে আসব। আসার সময়ও আমিই নিতে যাব। সকালে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।”
নাফিসা চোখ পিটপিট করে খুলল, তারপর হঠাৎ করে ঝটকা দিয়ে নিজেকে সায়মানের কাছ থেকে ছাড়াতে চেষ্টা করল। কিন্তু সায়মান আরও শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরল বুকের সঙ্গে।
নাফিসার কণ্ঠ এবার কাঁপছে, রাগ আর অভিমান মিশে—
—— “কি ব্যাপার! এভাবে সবসময় স্পর্শ করেন কেন? কখনো বলেন না, স্বীকারও করেন না—ভালোবাসেন কি না। তাহলে করেন কেন এসব? প্লিজ… আমার থেকে দূরে থাকবেন।”
ওর এই অস্থির আর আবেগে ভরা কথা শুনে সায়মানের বুকের ভেতর যেন দমে থাকা আগুন হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠল। সে আরও শক্ত করে নাফিসাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল—
—— “বেশি কথা শিখে গেছো তুমি। আর শোনো… আমার থেকে দূরে যাওয়ার কল্পনা মাথাতেও আনবে না কখনো। বুঝেছো?”
নাফিসা ওর চোখে চোখ রেখে দৃঢ়ভাবে বলল—
—— “আপনাকে আমি বুঝে উঠতে পারি না। আপনি একেক সময় একেক রকম ব্যবহার করেন। আপনার ভেতরে এত রহস্য কেন? সবকিছু এত গোপন রাখেন কেন?”
সায়মান ঠাণ্ডা গলায়, গভীর চোখে তাকিয়ে বলল—
—— “পিচ্চিদের এত বুঝতে হয় না।”
বলতে বলতে নিজের নাক দিয়ে নরমভাবে ছুঁয়ে দিল নাফিসার গাল।
এই কথাতেই যেন নাফিসার মাথার ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। কী আশ্চর্য এই মানুষটা! সবসময় তাকে স্পর্শ করে, কাছে টেনে নেয়, অথচ বলে বসে—সে পিচ্চি। একফোঁটা খোলামেলা স্বীকারোক্তি নেই, শুধু রহস্যে ভরা আচরণ।
অভিমান আর ক্ষোভে ফেটে পড়ল নাফিসা। দুই হাত দিয়ে সায়মানের বুক ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলো—
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৯
—— “সরেন! আমার কাছ থেকে দূরে থাকেন।”
নাফিসার দুই হাত একসাথে এক হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল সায়মান। চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই গাঢ় হয়ে উঠল। তারপর হঠাৎ করে নাফিসার কাঁপতে থাকা অধরে নিজের অধর মিশিয়ে দিল।
হঠাৎ পৃথিবী যেন থমকে গেল। নাফিসার শিরায় শিরায় আগুন ছড়িয়ে গেল। সায়মানের অটল দখলদারিত্বে ওর সমস্ত………
