তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৫
জান্নাতি আক্তার জারা
অফ পিরিয়ড চলছে, আরাত ঝালমুড়ি চিবাতে চিবাতে পুরো ক্লাস চোখ বোলাচ্ছে, মিম বইয়ে মুখ গুঁজে নিজের ভাবনায় মগ্ন ব্যাগের সাইটে ঝালমুড়ি গুলো খুব অবহেলায় পড়ে আছে,সন্ধ্যা মিরার পাশে বসে ঝালমুড়ি চিবাতে চিবাতে মিরার পেত থেকে কথা বের করার জন্য সেই থেকে এটা ওটা বলছে, শেষমেশ মিরা বিরক্ত কন্ঠে বলল,
___” এমন করছো কেনো, কী জানতে চাও সোজাসুজি বলতে পারো।
বলেই মিরা ফোনে পুনরায় চোখ রাখলো, যেন ফোনে তাঁর কতটা ইম্পরট্যান্ট কাজ চলছে, সন্ধ্যা মিরা কে কিছুক্ষণ নীরব চোখে পরক করে কেনো ভনিতা ছাড়ায় বলে উঠলো,
___” রাফি ভাইয়ার সঙ্গে তোমার কী চলে?
মিরা রাফির কথা শুনে ফোন থেকে চোখ সরিয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকালো, সন্ধ্যার চোখ তীক্ষ, মিরা পুনরায় পুরো ক্লাস চোখ বোলালো, ক্লাস পুরো ফাঁকা বললেই চলে, সামনের বেঞ্চে শুধু তিন-চার নিজেদের আড্ডায় মগ্ন, আরাত কে দেখলো নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে উত্তর জানার জন্য, মিরা সবাই কে দেখে চোখ নামিয়ে বলল,
___” কী আর চলবে, কিছু না।
সন্ধ্যা মিরার দিকে নিজের হাতের ঝালমুড়ি এগিয়ে দিতে দিতে পুনরায় বলল,
___” ও তা-ই বুঝি, তাহলে যে প্রতিদিন ছুটির শেষে তোমার ভাই কলেজে থাকতেও রাফি ভাইয়ার জন্য ওয়েট করো, ওটা কী?
মিরা এবার চোখ লুকালো, বুঝতে পারলো মিরা যে রাফির জন্য অপেক্ষা করে, কয়েকদিন থেকে রাফির সঙ্গে বাড়ি ফিরে, সবকিছু এরা লক্ষ করেছে, মিরা কিছুটা সময় নিলো, পুনরায় দূরে বসা নিজের দিকে তাকিয়ে থাকা আরাত কে একনজর দেখে নিলো, সন্ধ্যা মিরা কে তাড়া দিয়ে পুনরায় বলল,
___” কী হলো বলো?
মিরা নিজের কলেজ ব্যাগের কীচেইন চার্ম বুলাতে বুলাতে নিচু গলায় বলতে লাগলো,
___” রাফি ভাইয়া কে আমার ভালো লাগে।
এটা তো সন্ধ্যা আরাত রা বুঝতে পারছে আগেই,
সন্ধ্যা বিরিঞ্চ সঙ্গে কনুই থেকালো,গালে হাত রেখে ভ্রু উঁচুয়ে জানতে চাইলো ,
___” শুধু ভালো লাগা ?
মিরা কাচুমাচু করে তাকালো সন্ধ্যার দিকে, সন্ধ্যা যে ছাড়ার মেয়ে নয়, ও মিরার থেকে কথা বের করছে এবং বের করেই ছারবে, মিরা একটা নিশ্বাস ফেলে বলতে লাগলো,
___” জানি না ভালোলাগা থেকে আগাতে পেয়েছি কী না, রাফি ভাইয়া আরশ ভাইয়া আমাদের বাড়িতে প্রায় ভাইয়ার সঙ্গে যেতো, সেখান থেকেই ভাইয়া কে আমার ভালো লাগে, বলতে পারো কিশোরী মেয়ের প্রথম ভালো লাগা, রাফি ভাইয়া যখন আমাদের বাড়িতে যেতো আমি মুড়ি মাখা এটা ওটা নিয়ে তাঁর সামনে হাজির হইতাম তাঁকে দেখার সূচনায়, কখনো বা আম্মুর কাছে বাহানা ধরে বলতাম ভাইয়াদের জন্য কফি বানিয়ে দিতে, আম্মু বানিয়ে দিতো আমি কফি নিয়ে রাফি ভাইয়ার সামনে যাইতাম, কতোই না পাগলামি করেছি।
কথাগুলো বলতে বলতে মিরা আনমনে হেঁসে উঠলো, সন্ধ্যার মুখে মুচকি হাঁসি, মিরার দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে পুনরায় জানতে চাইলো,
___” তারপর ?
মিরা সন্ধ্যার কথায় নিজের হুঁশে ফিরলো, সন্ধ্যা কে মুচকি হাসতে দেখে কিছুটা লজ্জা পেলো,কিন্তু প্রকাশ করল না, কীচেইন চার্ম হাত বুলাতে বুলাতে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” তারপর, তারপর আর কী আমার পাগলামো সবাই বুঝতে পারতো, ভাইয়া রাফি ভাইয়া আরশ ভাইয়া, সবাই বুঝতে পারতো, যখন আমার পাগলামো বাড়তে লাগলো, রাফি ভাইয়া আমাদের বাসায় আসা বন্ধ করে দিলো, মাহির ভাইয়া একদিন বিকালে আমাকে ছাঁদে ডাকে রাফি ভাইয়ার কথা বলার জন্য, আমি তখন জানতে পারি রাফি ভাইয়া আইরা আপু কে ভালোবাসে।
সন্ধ্যা লক্ষ করলো মিরা শেষের কথা বলার সময় মলিন হাসলো,মিরা মলিন মুখে কথাটা বলে সন্ধ্যার দিকে তাকালো, সন্ধ্যা কে নিষ্পলক চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, মিরা মুখে হাসি ফুটে পুনরায় বলে উঠলো,
___” কী ভাবছো কষ্ট পেয়েছি?
সন্ধ্যা মাথা ঝাকালো,” হুম, মিরা হাসি মুখে বলতে লাগলো,
___” হ্যাঁ কষ্ট একটু পেয়েছি, কিশোরী বয়সের প্রথম ভালো লাগার পুরুষ অন্য মেয়েকে ভালোবাসে, শুনে তো কষ্ট লাগবেই,বাট ওটা কে কষ্ট বলে না খারাপ লাগা বলে,আমিও খেয়াল করলাম রাফি ভাইয়ার চোখে আইরা আপুর জন্য ভালোবাসা, তারপর আর কী বাদ দিয়ে দিলাম রাফি ভাইয়া কে নিয়ে ভাবনা, বললাম না শুধুই ভালো লাগা ছিলো।
মিরা সন্ধ্যার দিকে তাকালো,সন্ধ্যার চাহনি দেখে বুঝতে পারলো সন্ধ্যা কী জানতে চাইছে,মিরার মুখে এবার চওড়া হাসি ফুটে উঠলো, সন্ধ্যা মিরার হাসি দেখে ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
___” কী হলো হাসতে ছো কেনো ?
মিরা হাসি মুখেই বলে উঠলো,
___” তোমাকে দেখে আমার কী মনে হচ্ছে জানো ?
সন্ধ্যা অবাক হয়ে মাথা ঝাকালো,
___” না।
___” মনে হচ্ছে, তুমি গোয়েন্দা আর আমি আসামী।
বলেই মিরা হেঁসে উঠলো, আজ কতদিন পড়ে মনের অনুভূতি গুলো সন্ধ্যার সঙ্গে শেয়ার করে মনটা হালকা করতে পারছে, এই কয়েকদিন তো সন্ধ্যা কলেজে আসেনি, আর মিরা তো রশ্মিরাতের সঙ্গে কথাও বলে না, মিরা সবসময় চুপচাপ একা থাকতো, সন্ধ্যা মিরা কে হাসতে দেখে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ আমি গোয়েন্দা, তুমি একটু জলদি বলো প্লিজ, আমার ছটফট লাগছে জানার জন্য।
মিরা সন্ধ্যার আস্তিরতা দেখে হাসি মুখে বলল,
___ ” ওয়েট ওয়েট বলছি, আমাকে টাইম তো দেবে?
সন্ধ্যা ঝালমুড়ির কাগজ ঝুড়ির মধ্যে ছুরে ফিলে বেঞ্চে মাথা এলিয়ে দিতে দিতে বলল,
___” হুম বলো।
মিরা আগের ন্যায় বলতে লাগলো,
___”আমান ভাইয়ার মেহেন্দি অনুষ্ঠানে , মাহির ভাইয়ার সঙ্গে তালুকদার বাড়িতে গিয়েছিলাম, ওই যে বললাম না রাফি ভাইয়া কে নিয়ে মনে আর কেনো ফিলিংস নেই, তোমার সঙ্গে যখন তালুকদার বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলাম, তুমি তো হাবীব ভাইয়ার সঙ্গে উধাও হয়ে গিয়েছিলে ।
মিরা দাঁত কেলিয়ে কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যা এক হাত দিয়ে মিরার ঘারে থাপ্পড় লাগলো, আর মিরা হাসতে হাসতে কিছুটা সাইটে হেলে পরলো, আরাত দূর থেকে দুজনের কথাকথন শুনছিলো, মিরা সন্ধ্যা কে পঁচাতে দেখে আরাত নিকাবের আড়ালে মুচকি হাসলো, মিরা সোজা হয়ে বসে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” হাবীব ভাইয়ার কথা অনুযায়ী যখন আমি সিড়ি বেয়ে উঠতে নিবো, সঙ্গে সঙ্গে সিড়িতে হা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম,এক কথায় এক দেখায় ক্রাশ খাইলাম, চিকনচাকন লম্বা পাঞ্জাবি পরিহিত একটা ছেলেকে দেখে, সে উপর থেকে সিড়ি বেয়ে দ্রুত নামছে, দ্রুত নামার কারণে মাথার চুলগুলো যেন উনার সঙ্গে উঠানামা করছে।
মিরার বর্ণনা শুনে সন্ধ্যা ফিক করে হেঁসে দিলো, সন্ধ্যা কে হাসতে দেখে মিরা বলে উঠলো,
___” আমাকে লজ্জা দিবে না, লজ্জা দিলে আমি আর বলবো না।
সন্ধ্যা মুখ চেপে হাসি আটকে বলল,
___”আরে বলো বলো আমি আর হাসবো না।
মিরা আঁড়চোখে সন্ধ্যা কে দেখে নিয়ে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” ছেলেটা আমার দিকে ফিরেও তাকালো না পর্যন্ত,তারপর আর কী বেহায়া মন পুরো বিয়ে জুড়ে নিজের অজান্তে তাঁকে খুঁজতে লাগলো…
মিরা কে কথা শেষ করতে না দিয়ে সন্ধ্যা শব্দ করে হাসতে হাসতে বলল,
___”আর তারপর বাঁশ, সিঙ্গেল লাইফে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেম না করেই ছ্যাকা।
সন্ধ্যা কে হাসতে দেখে মিরা মুখ গোমড়া করে নিলো, সন্ধ্যা হাসতে হাসতে একপর্যায়ে মিরার শরীরে এলিয়ে পরলো,মিরা রাগ করে ব্যাগ হাতে নিয়ে বসা থেকে উঠতে নিলো, আর সন্ধ্যা হাসি বন্ধ করে মিরার হাত টেনে ধরে বলল,
___” সরি সরি আর মজা করবো না, বসো বসো প্লিজ।
সন্ধ্যা মিরার হাত ছারলো না, মিরা বাধ্য হয়ে পুনরায় জায়গায় বসে পরলো, তখনই দেখা গেলো রশ্মি কে ক্লাসে ধুঁকতে, রশ্মি এতক্ষণ ওয়াশরুমের কথা বলে বাহিরে গিয়েছিল, আরাত একনজর রশ্মি কে দেখে সন্ধ্যার কথায় সন্ধ্যা আর মিরার দিকে তাকালো, সন্ধ্যা সিরিয়াস মুখে মিরা কে বলছে,
___” রাফি ভাইয়া কে কবে থেকে ভালো বাসতে শুরু করছো ?
মিরা কিছুটা সময় নিয়ে বলতে শুরু করলো,
___” ভালোবাসি কী না জানি না, যখন শুনতে পারলাম আইরা আপু তাঁর কাজিন কে ভালোবাসে আর তাঁদের বিয়ে হয়ে গেছে, তখন থেকে রাফি ভাইয়া কে খেয়াল করলাম,আইরা আপুর বিয়ে হওয়ার পর থেকে রাফি ভাইয়া চেঞ্জ হয়ে গেছে, একদিন ভাইয়ার জন্য গেটে ওয়েট করছিলাম, ওইদিন রাফি ভাইয়া আমাকে বাইকে লিফট দেয়, তারপর থেকে আমার মনে নতুন করে অনুভূতি গুলো জেগে উঠতে লাগলো, জানি না সামনে কী হবে জাস্ট এটুকু জানি আমি রাফি ভাইয়া কে ভালো লাগা থেকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।
মিরা মাথা নিচু করে কলেজ ব্যাগের দিকে চেয়ে বলল কথাগুলো, সন্ধ্যা মিরার হাতে হাত রাখলো, চোখের ইশারায় আস্সাচ দিয়ে বলল,
___” তুমি মেবি খেয়াল করো নি, রাফি ভাইয়া তোমাকে নিজে থেকে বাইকের লিফট দেয়, ভাইয়া হয়তো নতুন করে জীবন গুছাতে চাইছে, তোমার উচিত ভাইয়া কে হেল্প করা।
মিরা কিছু বলল না, শুধু সন্ধ্যা কে মলিন হাসি উপহার দিলো, আরাত সন্ধ্যা মিরার কথাগুলো শুনার মধ্যে দেখলো রশ্মি পুনরায় রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, আরাত রশ্মি কে পিছু ডাকলো,
___” আবার কই যাস?
রশ্মি স্বাভাবিক গলায় উওর করলো,
___” মাঠে।
আরাত তীক্ষ্ণ চোখে বলল,
___” কেনো?
রশ্মি কিছুটা বিরক্ত হলো,
___” আমার মর্জি।
আরাত বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো, সন্ধ্যা মিরার দৃষ্টি রশ্মিরাতের উপর, আরাত অবাক কন্ঠে রশ্মি কে বলল,
___” তুই এভাবে কথা বলছিস কেনো, আমি তোকে জাস্ট সিম্পল একটা কোশ্চেন করেছি ?
রশ্মি বিরক্তিকর কন্ঠে বলে উঠলো,
___”তোর সব কোশ্চেন আনসার করতে হবে আমাকে?
আরাত রশ্মির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
___” আজব তো তোর কিছু হয়েছে কী , কেউ কিছু বলছে, আমাকে বল, কে কী বলছে চল তো তাঁর কাছে।
আরাত রশ্মির কাছে এসে রশ্মির হাত ধরে ক্লাস রুমের বাহিরে যেতে নিলে, রশ্মি আরাতের হাত ঝাঁকটা মেরে দূরে সরে দিয়ে রাগী গলায় বলল,
___” আমি বুঝি না আমাকে কী তোর এতটা দুর্বল মনে হয়, কেউ কিছু বললে তোর হেল্প নিতে হবে?
আরাত রশ্মির দিকে অবশ্য হয়ে তাকিয়ে আছে, হটাৎ রশ্মির এমন রুট ব্যবহার মেনে নিতে পারছে না, রশ্মি কথা বলার মধ্যে দেখলো ক্লাস রুমের সামনে দিয়ে মাহির আরশ নিজেদের ক্লাসের দিকে যাচ্ছে, তাঁদের কয়েক পা পিছনে রাফি একা একা যাচ্ছে, রশ্মি আর দাঁড়ালো না, মাহিরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে, এতক্ষণ মাহির দের ক্লাসে মাহির কে খুঁজেছে কিন্তু ক্লাসে ছিলো না মাহির ছিলো সার্জারি ওয়ার্ড ক্লাসে, রশ্মি আরাত কে ফেলে নিজের ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে করিডোরে দৌড়ে মাহির কে ডাকতে লাগলো,
___” মাহির…..
রশ্মির উচ্চ স্বরে ডাক আরাতের কানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরাত চোখ বন্ধ করে নিলো, রশ্মি কে সে লক্ষ করেছে, রশ্মি বদলে গেছে, আরাত এখন দেখবে রশ্মি কী করে, এতক্ষণে মিরা সন্ধ্যা দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে রশ্মি কে দেখছে, রশ্মির ডাকে মাহির জায়গায় কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে পুনরায় সামনে হাঁটতে নিলো, সঙ্গে সঙ্গে আরশ মাহির কে এক হাত ধরে আটকে দিলো, মাহির রাগী চোখে আরশের দিকে তাকালে আরশের মধ্যে কেনো হেলদোল দেখা গেলো না, আরো বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
___” রশ্মি তোকে ডাকে।
মাহির দাঁতে দাঁত চেপে আরশ কে বলল,
___” আমি বয়ড়া না, ছাড় আমাকে।
মাহির রাগী মুখে আরশের হাত থেকে নিজের হাত বের করার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে, এতক্ষণে রশ্মি মাহিরের সামনে এসে দাঁড়িছে, আরশ রশ্মি কে দেখে মাহিরের হাত ছেড়ে দিলো, মাহির আরশের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে অ্যাপ্রন ঠিক করছে গম্ভীর মুখে, রশ্মি মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আপনার সঙ্গে আমার কথা ছিলো।
মাহির রশ্মির কথায় উওর করলো না, চুপচাপ গম্ভীর মুখে রশ্মি কে পাশ কেটে যেতে নিলো, রশ্মি এবার হুট করে মাহিরের হাত ধরল,এতে সবার নজর রশ্মি মাহিরের হাতের দিকে, আরাত ক্লাস থেকে বের হয়ে এলো করিডরে রশ্মি কে মাহিরের হাত ধরে রাখতে দেখে আরাত গম্ভীর মুখে সেদিকে চেয়ে রইলো, রশ্মি মাহিরের হাত ধরে মাহিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো,
___” আপনার সমস্যা কী, আমাকে ইগনোর করছেন কেনো,না ফোন না মেসেজ, না আমার আগেপিছে থাকেন, কেনো ইগনোর করছেন?
রশ্মির এমন কথায় মাহির ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
___” কেনো আপনার পিছনে ঘুরবো?
রশ্মি মাহিরের কথার প্রতিউত্তরে বলে উঠলো,
___” কারণ আপনি আমাকে ভালোবাসেন তাই।
মাহির রশ্মির হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে বলল,
___” আমি আমার ক্যারিয়ার আর আমাকে ভালোবাসি।
রশ্মি কিছুক্ষণ মাহির কে নীরব চোখে দেখলো,মাহির নিজেকে ভালোবাসে বলতে বুঝালো, নিজের আত্মসম্মান কে সে ভালোবাসে,রশ্মি এবার মাহিরের দু-হাত ধরে আকুতি কন্ঠে বলে উঠলো,
___” আমি জানি না আমার কী হয়েছে, নিজের উপর কন্ট্রোল নেই, শুধু মনে হয় আপনি যেন সবসময় আমার আশেপাশে থাকেন,আমার কলিজা আপনার জন্য পুড়ে, আমার মন আপনার মেসেজ পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে, আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনি শুনতে পাচ্ছেন আমি আপনাকে ভালোবাসি মাহির, ভালোবাসি।
সবাই যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো, রশ্মির থেকে এমন কথা কেউ আশা করেনি, মাহির অবশ্য মুখে রশ্মির দিকে তাকালো, আরাত রশ্মির কথা শুনে রাগে দাঁত কিরমির করতে করতে রশ্মি মাহিরের সামনে এলো, এক ঝটকায় রশ্মি হাতের কব্জি টান দিয়ে নিজের দিকে ফিরালো, মাহির রশ্মির থেকে চোখ ফিরিয়ে আরাত কে দেখতে লাগলো, আরাত রশ্মি কে রাগী গলায় বলতে লাগলো,
___” তুই কী পাগল হয়ে গেছিস, তুই সবকিছু ভুলে যাচ্ছিস ওই বেইমান আমার সঙ্গে কী করেছে?
রশ্মি আরাতের হাত থেকে নিজের কব্জি ছাড়িয়ে নিতে নিতে আরাত কে বলল,
___” ও আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে, মন চায় ওকে জরিয়ে ধরে থাকি। ওর বুকে মাথা রাখতে মন চায়, যখন ও আমার আশেপাশে থাকে আমি নিজেকে সবচেয়ে সুখী মনে করি। আমার এমন লাগে ও আমার জন্য পুরো দুনিয়ায় সঙ্গে লড়াই করতে পারবে।
রশ্মির কথায় আরাতের চোখ বেড়ে পানি গড়িয়ে পরলো, নিমেষেই নিকাবটা ভিজে গালের সঙ্গে লেপ্টে গেল, অসহায় কন্ঠে রশ্মির গালে হাত দিয়ে বলে উঠলো,
___” কিন্তু তুই তো আমার ফ্রেন্ড তাইনা, তাহলে ওই বেইমান কে…
আরাতের কথা শেষ না হতেই রশ্মি নিজের গালে আরাতের হাতে স্পর্শ করে বলল,
___”ফ্রেন্ডশিপ দিয়ে জীবন চলে না, বাঁচার জন্য জীবন সঙ্গী প্রয়োজন।
রশ্মির গাল থেকে আরাতের হাত পড়ে গেলো, নিস্তব্ধ চোখমুখ, শুধু পানি গড়িয়ে পরলো, তাঁদের বন্ধুত্ব তো আর চারটা বন্ধুত্বের মতো ছিলো না, একে অপরের কষ্টতে কেউ ভালো থাকতো না, যে ছেলের জন্য আরাত এত কষ্ট পেয়েছিল, আজকে তাকেই ভালোবাসে তাঁর বেস্টফ্রেন্ড, আচ্ছা রশ্মির কী একবারও মনে পরলো না আরাত কষ্ট পাবে, তাঁর থেকে বড় কথা মাহির তো চিট করেছে আরাতের সঙ্গে,পুরো পরিবেশ টা নিস্তব্ধ হয়ে আছে, আরশ রাফি মিরা একবার রশ্মিরাত তো আরেকবার মাহির কে দেখছে, মাহিরের মুখে কথা নেই সে শুধু রশ্মি কে অপলক দেখছে, সন্ধ্যা ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
___” রশ্মি আপু তুমি ভেবে দেখছো, এই দুনিয়া এই সমাজ কী বলবে, যখন জানতে পারবে তুমি তোমার বেস্ট ফ্রেন্ডের এক্স বয়ফ্রেন্ড কে ভালোবাসো?
সন্ধ্যার মুখে এক্স বয়ফ্রেন্ড শুনতেই আরাতের শরীর ঘিনঘিন করে উঠলো, রশ্মি সন্ধ্যার কথায় মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
___”আমার দুনিয়া সমাজ বলতে যেটা আছে সেটা হলো শুধু মাএ মাহির।
কথাটা বলে পুনরায় মাহিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো,
___”আমি চাই আপনি সবসময় সারা জীবন আমার সঙ্গে থাকবেন, আমাকে ভালোবাসবেন,কখনো আমাকে ভুলেও ছেড়ে চলে যাবেন না।
আরাত আর নিজেকে চেক দিতে পারলো না, রশ্মি কে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো, আরাতের কান্ডে সবাই হকচকিয়ে উঠলো, রশ্মি পড়ে যেতে নিলেই মাহির রশ্মি কে দু-হাতে ধরে,রশ্মি গালে হাত দিয়ে চোখে পানি নিয়ে আরাত কে দেখছে, আরাত থাপ্পড় মেরে হিসহিসিয়ে বলতে লাগলো,
___” আমার ভুল কী জানিস, তোকে তোর মতো ছেড়ে দেওয়া, ভেবেছিলাম একা থাকছিস নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিস কিন্তু না আমি ভুল ছিলাম, তুই এই বেইমান কে ভালোবাসতে শুরু করলি, আমি যদি তোর খামখেয়ালি দেখে প্রথমেই এই থাপ্পড় টা দিতাম, তাহলে এই দিন দেখতে হতো না, শোন তোর সবকিছু মেনে নিয়েছি, প্রথমে পার্থ কে মেনে নিয়েছি, তোর দূরে যাওয়া মেনে নিয়েছি, তোর খামখেয়ালী মেনে নিয়েছি, কিন্তু আর না, চল আমার সঙ্গে।
আরাত কথাটা বলে রশ্মির হাত টেনে মাঠের দিকে নিয়ে যেতে নিলো, সঙ্গে সঙ্গে হাতে বাঁধা অনুভব করল, পিছনে ফিরে দেখলো রশ্মির আরেক হাত মাহির ধরে আছে, আরাতের কান্না ভেজা চোখ রাগে লাল হয়ে উঠলো, মাহির রশ্মির আরেক হাত ধরে আরাত কে নরম সুরে বলল,
___” আমরা বসে কথা বলি প্লিজ আরাত !
আরাত রক্ত চক্ষু চোখে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে মাহির এর গালে থাপ্পড় বসালো,
___”ঠাসসসস।
পরিবেশ টা যেন আরো বিদঘুটে নিস্তব্ধ হয়ে উঠলো, কারো মুখে কথা নেই, এতক্ষণে মিম তাসিন আর রুপা চলে এসেছে, মাহির গালে হাত দিয়ে মেঝের দিকে এখনো চেয়ে আছে, নিজের সঙ্গে কী হলো বুঝে উঠতে পারছে না, আরাত মাহির কে থাপ্পড় দিয়ে আঙ্গুল তুলে বলতে লাগলো,
___” আমি রশ্মির সঙ্গে কথা বলছি না, আমাদের মধ্যে কথা বলার রাইট কে দিয়েছে তোকে?
আরাত মাহির কে থাপ্পড় দেওয়াতে রশ্মি তেতে উঠে বলতে লাগলো,
___” আরাত তুই আমাকে থাপ্পড় দিয়েছিস আমি মেনে নিয়েছি কিন্তু তুই মাহির কে…
___” আরে ইয়ার বেইমান থাপ্পড় খাওয়ার যোগ্য ছিলো,তুই আমার ফ্রেন্ড,আর তোকে থাপ্পড় দেওয়ার পুরো অধিকার আমার আছে বুজেছিস ?
রশ্মি কে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে আরাত রশ্মির দিকে চেয়ে রাগী গলায় বলল ,আরাত কে দেখে সন্ধ্যা ফিসফিস করে কাচুমাচু কন্ঠে বলে উঠলো,
___”আরে পাগল তো ক্ষেপেছে একে শান্ত করবে কে?
সন্ধ্যার পাশে মিম এসে দাঁড়িয়ে ছিলো, সন্ধ্যার ফিসফিসানি শুনতে পেয়ে ফোন হাতে নিয়ে টাইপিং করতে করতে বলল,
___” আছে একজন সে নিজের মাথা শান্ত রেখে তাঁর বউ কে সামলাতে পারে।
সন্ধ্যা নিজের পাশে মিম কে একবার দেখলো, মিম ফোনে টাইপিং করছে, রশ্মি আরাতের কথায় রাগী কন্ঠে আরাত কে বলে উঠলো,
___” আরাত তুই মাহির কে বেইমান বলা বন্ধ কর, মাহির কে ব্লেম করতে করতে তোর মাথায় ক্যাচ হয়ে গেছে বেইমান শব্দ টা!
আরাত রশ্মির কথায় তাচ্ছিল্য হাঁসলো, নেকাবের আড়ালে শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজে নিলো, চোখ-মুখে লেগে আছে রশ্মির প্রতি বিরক্তি,রশ্মির কথাটা যেন হাস্যকর লাগলো আরাতের কাছে, তাচ্ছিল্য মুখে বলে উঠলো,
___” লাইক সিরিয়াসলি রশ্মি, তুই আমাকে এই কথা বলছিস, আরে আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করছিলাম, সত্যি মনে হয়েছিল ওর সব মিথ্যা ভালোবাসা,আর তুই আমাকে বলছিস আমি ব্লেম করছি, হ্যাঁ আমি ব্লেম করছি, তুই বলতো আমি কী মিথ্যা ব্লেম করেছি, বল?
রশ্মি আরাতের কথায় আরাতের মতো করে বলে উঠলো,
___” তুই নিজের কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেখতে পারিস না, আমাকে মাহির ধোকা দিয়েছে, আমাকে মাহির কষ্ট দিয়েছে, মাহির আমার বিশ্বাস ভাঙছে, তোর বিশ্বাস ভাঙছে তো কী হয়েছে তুই কি ওর জন্য এখন কষ্ট পাচ্ছিস, ওর অপেক্ষায় জীবন গুছিয়ে নিতে পারিস নি, আমার এটা আমার ওটা আমার এ সে হয়েছে, কেনো আরাত কেনো, তুই নিজের ভালো থাকা ছাড়া অন্য কারো কষ্ট চোখে পড়ে না কেনো?
আরাত রশ্মির কথায় নীরব কন্ঠে বলে উঠলো,
___” তুই বদলে গেছিস রশ্মি, তুই আর আগের রশ্মি নেই ?
আরাতের কথায় রশ্মি দুহাত দিয়ে আরাত কে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ আমি বদলে গেছি, নিজের দিকে চেয়ে দেখতো তুই কী আগের আরাত আছিস, যে আরাত আমাকে নিয়ে মেতে থাকতো সবসময়, যে আরাত আমার মন খারাপ দেখলে আমার মন ভালো করার জন্য উঠেপড়ে লাগতো, কই তুই তো আমাকে মনে রাখিস নি, তুই আমাকে মনে রেখেছিস বল, না রাখিস নি তুই তো সুখে আছিস, বিয়ের পর একবারও আমার খবর রেখেছিস তুই ব্যস্ত তোর সংসার নিয়ে, জানিস মাহির আমাকে প্রতিনিয়ত ফোন করতো, আমি বিরক্ত প্রকাশ করলেও বারবার ফোন করতো, আমার খবর নিতো,যার জন্য দেশ ছেড়ে গিয়েছিলাম সে বেইমানি করলো অথচ দেখ যাকে অবহেলা করলাম সে আমাকে পাওয়ার জন্য কী না কী করেছে ও ছ্যাচড়া হয়ে মেসেজ দিতো আমিও বেহায়া হয়ে মেসেজ সিন করতাম, তুই তো সুখে আছিস তুই তো মাহিরের জন্য কষ্ট পাচ্ছিস না, তোর সুখে থাকার রাইট আছে আমাদের নাই ?
আরাতের মুখে কথা নেই, চোখে পানি নিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে রশ্মির অভিযোগ শুনছে, আরাতের জানা নেই, আর কীভাবে রশ্মি কে প্রাধান্য দিলে রশ্মি এই অভিযোগ গুলো করতে পারতো না, হ্যাঁ মানছে বিয়ের পর রশ্মির সঙ্গে আগের মতো আর হুটহাট আড্ডা দেওয়া হয় না, আগে এক বিছানায় একিউপর কে জরিয়ে ধরে গল্প দুষ্টুমি করে সময় কাটতো, কিন্তু সময় পরিস্থিতি সবসময় এক থাকে না, বিয়ে হয়ে গেছে, আগের মতো তো হতে পারবে না, তাই বলে কী দুজনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হবে, একটু ভিন্নতা থাক না দুজনের মধ্যে, দুজনেই মানিয়ে নেক না এতটুকু দূরত্ব, এই দূরত্বর জন্য কী যে মানুষ টা আরাত কে কষ্ট দিয়েছে তাঁকে ভালোবাসতে হবে, একবারও মনে এলো না নিজেদের বন্ধুত্বের কথা, আরশ রশ্মিরাতের কথোপকথনে বিরক্ত হয়ে মিম কে একপলক দেখে জায়গা ত্যাগ করলো, রাফি মিরা তাসিন রুপা মিম সন্ধ্যা সবাই চুপচাপ রশ্মিরাতের কথা শুনছে,
মাহির এতদিন রশ্মির থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চেয়েছিল, অনেক তো ভালোবাসার জন্য ছোট হয়েছে, পুরো ভার্সিটির সামনে একে একে দুই মেয়ের থেকে থাপ্পড় খাওয়া তো কম অপমান না, তাও থাপ্পড়ের কারণ ছিলো, ভালোবাসার পিছনে বেহায়ার মতো পড়ে থাকার জন্য, ভালোবাসা কে নিজের করার জন্য, আর ভুল করে ভুলের জন্য মাফ চাওয়ার জন্য, মানুষ মাএ তো ভুল, কই রশ্মিরাত তো মাহির কে ক্ষমা করলো না উল্টো সবার সামনে অপমান করলো, মাহির তো আরাত কে কষ্ট দিতে চায়নি, সে আরাতের প্রতি অন্যায় করেছে, রশ্মির কাছে শিকার করেছে এবং রশ্মির হেল্প চেয়েছে, দুজন মিলে আরাত কে বুঝাতে চেয়েছে,
কিন্তু রশ্মি তো মাহির কে সেই সুযোগ টুকু দেয় নি, উল্টে আরাতের সামনে সবকিছু তুলে ধরে মাহির কে বেইমান বানাইছে, হয়তো রশ্মির জায়গা থেকে রশ্মি ঠিক ছিলো, কিন্তু মাহির সে তো রশ্মি কে বিশ্বাস করেছিল, এতকিছুর পরও মাহির কী রশ্মির ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ইচ্ছার কমতি রেখেছিল, না রাখেনি মাহির রশ্মি কে ফোন করেছে বারংবার, মেসেজ করেছে, কলেজে রশ্মির সামনে দাঁড়াছে, অথচ রশ্মি সবার সামনে মাহির কে অপমান করেছিল, মাহির অপমান হয়ে নিজের আত্মসম্মান বাঁচতে রশ্মি কে আর বিরক্ত করে না, রশ্মির আশেপাশে থাকে না, তাই বলে কী ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে, না একদম না, মাহির রশ্মি কে প্রথম থেকেই ভালোবাসে, আরাত তো শুধু কিছুদিনে ভালোলাগা, রশ্মি কে ভুলতে আরাতের সঙ্গ নেওয়ার, এটাই মাহিরের জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল, কাউকে খুঁজে তাঁকে যদি না পাওয়া যায়, তাঁর জন্য কী অন্য কাউকে বেঁচে নিতে হবে, আর অন্য কাউকে নিলেই কী তাকে মন থেকে ভালোবাসতে পারবে, না পারবে না, মাহির রশ্মি কে খুঁজে না পেয়ে নিজের অজান্তে ভুলটা করে ফেললো, নিজের ভুল বুঝতে পেয়ে যখন আরাতের সামনে নিজের ভুলের জন্য সরি বলতে দাঁড়ালো, আরাত মাহির কে সবার সামনে অপমান করলো থাপ্পড় মারলো, মাহির বুঝে গেলো সে ক্যারিয়ারের পিছনে না ছুটে অনুভূতির পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছে, তাইতো মাহির আর রশ্মি কে বিরক্ত করে না, না নিজের ভালোবাসা দাবি নিয়ে রশ্মির সামনে দাঁড়ায়, অথচ মনে আগের মতোই রশ্মির প্রতি দুর্বলতা ভালোবাসা অনুভব করে,
আর এদিকে মাহিরের দূরত্ব রশ্মি কে ভালো থাকতে দিচ্ছে না, মাহির তাঁর অভ্যাস হতে শুরু করেছে, পার্থর কমতি মাহিরের পাগলামোর মধ্যে পূরণ করতে লাগলো, এক দিকে আরাতের সঙ্গে আগের মতো নেই কেনো আড্ডা দেওয়া, আরাত নিজের বিবাহিত জীবন গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত, এদিকে রশ্মি নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড আর দূর দেশের মরীচিকা ভালোবাসার কমতি মাহিরের পাগলামোর মধ্যে নিত্যদিনের অভ্যাস করে নিতে চাইলো, মাহির কে নিজের অজান্তে বারবার অপমান করে দূরে সরে দিতে দিতে রশ্মি নিজেই মাহিরের ভালোবাসা ফেঁসে গেলো, মাহির যখন রশ্মির থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করলো রশ্মি তখন মাহির কে মিস করতে লাগলো, হুটহাট মাহিরের ফোন মেসেজ আসাকে মিস করতে লাগলো, কলেজে মাহির কে দেখতে না পেয়ে মাহিরের প্রতি মন পুড়তে লাগলো, দুচোখ শুধু মাহির কে খুঁজতে লাগলো,মাহির কে যখন পুনরায় কলেজে দেখলো রশ্মি একদম নতুন মাহির কে যেন দেখছে, যে মাহিরের মধ্যে নেই রশ্মি কে নিয়ে কেনো ইন্টারেস্ট, নেই রশ্মির আগেপিছে ঘুরে ভালোবাসা প্রকাশ করার ইচ্ছা ,এসব ঘিরে রশ্মির মনে আরাতের প্রতি রাগ জন্ম নিতে লাগলো, মনে হতে লাগলো মাহির আজকাল রশ্মি কে ইগনোর করছে সবকিছু আরাতের জন্য, মাহির কেনো রশ্মি কে ইগনোর করবে, মাহির আগের মতো রশ্মি কে ভালোবাসি বলতে বলতে বিরক্ত করতে থাকবে, রশ্মি আরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” সব আমার ভুল, এছাড়া আর কেনো অপশন ছিলো না আমি অনেক চেষ্টা করেছি আমি ওকে ভালোবাসবো না কিন্তু আমি চেয়েও এমন করতে পারিনি, আমি নিজেই বিরক্ত হয়ে গেছি যে ওর প্রতি এতটা ভালোবাসা কেনো আমার।
আরাত এখনো নিস্তব্ধ হয়ে আছে রশ্মি আরাত কে কথা গুলো বলে মাহিরের দিকে তাকালো, মাহির চুপচাপ রশ্মি কে দেখছে, রশ্মি আরাত কে ছেড়ে দিয়ে মাহিরের সামনে এলো, মাহিরের চোখে চোখ রেখে নীরব কন্ঠে বলতে লাগলো,
___” আপনাকে ভুলে থাকার সাধ্য আমার নেই, ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও বারবার ব্যর্থ হই, আপনাকে ভুলেই থাকি বা কী করে,এই মনে আপনার প্রতি এক অদ্ভুত মায়া জন্ম নিয়েছে,যে মায়া আপনাকে ভুলে থাকতে দেয় না, আজ আমি নির্দ্বিধায় বলছি, ভালোবাসি মাহির, আমিও আপনাকে অনেক বেশিই ভালোবাসি, বউ হতে চাই আপনার, আপনার নামে সোনালি চুড়ি পড়ার অধিকার পেতে চাই, তিন কবুলে আপনি আমাকে আপনার ঘরে তুলে নিবেন, যে সম্পর্কে থাকবে না কেনো বাঁধা ?
আরাত চোখে পানি নিয়ে চোখ বন্ধ করে শুনলো রশ্মির কান্নাভেজা কন্ঠে মাহির বলা প্রেমকথন গুলো, রাফি মিম সন্ধ্যা নিস্তব্ধ হয়ে দেখলেও মিরার ঠোঁটে হাসি ঝুলছে, নিজের ভাইয়ের অধরা প্রেমের পূর্ণতা দেখে, রশ্মির কথায় মাহিরের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে, মাহির চোখে পানি মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে রশ্মির ফর্সা গোলগাল মুখটায় হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,
___” যদি আপনাকে পাওয়ার আশাটাই ছেড়ে দিতাম, তাহলে আমার এই ভালোবাসার অস্তিত্ব কোথায় থাকতো? আমি তো আপনাকে ভালোবেসেছি এই বিশ্বাস নিয়ে যে একদিন আপনি বুঝবেন, হয়তো একদিন সময় আমার পক্ষে কথা বলবে আশা ছেড়ে দেওয়া মানে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া নয়, নিজের অনুভূতিগুলো অস্বীকার করা, আমি জাস্ট নিজের অনুভূতি থেকে পালাতে চেয়েছিলাম,আপনার ভালোবাসা থেকে না।
রশ্মি সবার সামনেই মাহির কে জরিয়ে ধরলো, মাহির নিজের বুকের মধ্যে রশ্মি কে আগলিয়ে নিলো, আরাত চোখে পানি নিয়ে দেখলো দু’জন কে, কী বলবে, রশ্মি কে কয়েক সেকেন্ড দেখে আরাত চোখে পানি নিয়ে মাঠের দিকে যেতে লাগলো, আরাত কে যেতে দেখে সন্ধ্যা ক্লাসের দিকে এগুলো কলেজ ব্যাগ আনতে, মিম আরাতের পিছনে পিছনে যেতে লাগলো, আরাত কে যেতে দেখে তাসিন কটাক্ষ করে বলে উঠলো,
___” আর কী কী যে দেখতে হবে এই তালুকদার বাড়ির মেয়েদের জন্য, বান্ধবীর এক্স বয়ফ্রেন্ড কে ভালোবাসে এটা আবার বান্ধবীর সামনে বড় মুখ করে বলছে তাঁর এক্স বয়ফ্রেন্ড কে ছিহহ, নির্লজ্জ মেয়ে…
___” ঠাসসসসসস…..
পুনরায় থাপ্পড়ের শব্দ সবাই হকচকিয়ে গেল, রশ্মি মাহির দুজন দু’জন কে ছেড়ে দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো আরাত তাসিন কে থাপ্পড় দিয়ে তাসিনের শার্টের কলার চেপে ধরে রাগী স্বরে বলছে,
___” রশ্মির নামে আর একটা বাজে কথা তোর মুখ থেকে বের হলে তোকে আমি খুন করে ফেলবো,তুই সিনিয়র দেখে তোকে ছেড়ে দিয়েছিলাম কিন্তু আর না ফারদার যদি রশ্মি আর তালুকদার বাড়ি নিয়ে কিছু বলিস….
আরাতের পুরো কথা শেষ হওয়ার আগে তাসিন আরাতের দিকে রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করে আরাতের হাত নিজের কলার থেকে সারিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
___” তো কী করবি, আমি একবার না বারবার বলবো, তোর ফ্রেন্ড ক্যারেক্টারলেস,তোর বোন কলঙ্কিত…..
___” ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস ঠাসসস…
আরাত কে আটকায় কে আরাত রাগের মাথায় তাসিনের গালে দুহাত দিয়ে অনগর চড় বসাতে লাগলো, তাসিন শুধু গাল নিয়ে এদিক ওদিক হেলিয়ে পরছে, মাহির রাফি কিছুই বলছে না, এটা তাসিনের পাওনা ছিলো, রশ্মি তব্দা খেয়ে দেখছে শুধু মিম আর রুপা আরাত কে ছাড়াতে লাগছে, আরাত শুধু থাপ্পড়ে থেমে থাকে নি, তাসিনের ঝুঁটি ধরে টানতে লাগছে, তাঁদের ক্লাস অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে, বাহিরে কেউ নেই বললেই চলে, সন্ধ্যা ক্লাস থেকে স্যার কে বলে ব্যাগ নিয়ে এসে এসব দেখতেই হাত থেকে কলেজ ব্যাগ মেঝেতে পড়ে গেলো, সন্ধ্যা বুঝতে পারলো না ক্লাসে যেতে যেতে আবার কী হলো যে আরাত এতটা ক্ষেপে গেছে, মিম আরাত কে ছাড়াতে না পেয়ে পুনরায় ফোনে টাইপিং করলো, তাসিন তো নিজের মাথায় আরাতের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে কান্না করছে, মিম টাইপিং করার সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ সিন হলো, মেসেজ সিন হওয়ার পাঁচ সেকেন্ডর মধ্যে তাকবীর এলোমেলো ভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে সিড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তালায় উঠছে, হাতে তাঁর একটা ফাইল, মিম যখন প্রথমবার তাকবীর কে মেসেজ করে, তাকবীর মিমের কাগজ গুলো উঠানোর জন্য বাহিরে ছিলো, মিমের মেসেজ দেখে তাকবীর দ্রুত গাড়ি কলেজের দিকে ফিরায়, কলেজের সামনে এসে গাড়ি থামতেই মিমের পুনরায় মেসেজ আছে, তাকবীর গাড়ি থেকে নামতে নামতে মেসেজ সিন করে দৌড়ে কলেজের ভিতরে ঢুকে যায়, দ্বিতীয় তালায় উঠতেই আরাত কে একটা মেয়ের চুল টানতে দেখে তাকবীর থমকে গেলো, এটা কী দেখছে তাঁর বউ একটা মেয়ের চুল টানছে লাইক সিরিয়াসলি আজান তালুকদার তাকবীরের বউ কলেজে একটা মেয়ের চুল টানছে এটা নিউজ হওয়া দরকার, মিম তাকবীর কে দেখে তাকবীরের কাছে এসে বলতে লাগলো,
___” ভাইয়া আরাত আপু এটা কী করছে, কেউ আটকাতে পারছে না…
মিম নিজের মতো বলতে লাগলো,মিমের কথা তাকবীরের কর্ণপাত পৌঁছিল না,ধীর পায়ে আরাতের কাছে এসে দাঁড়ালো,কপালে ভাজ পড়ে আছে, গম্ভীর গলায় আরাত কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো
___” রাত মেয়েটা কে ছেড়ে দেও।
আরাত শুনলো না তাকবীরের কথা, মাহির রশ্মি রাফি তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর তাসিনের চুল আরাত কে ছাড়তে না দেখে তাকবীর মিমের হাতে ফাইল দিয়ে বলল,
___” সবকিছু রেডি ।
মিম ফাইল গুলো নিয়ে ফাইনালে দিকে তাকিয়ে মলিন হাসি উপহার দিলো, তাকবীর হুট করে সবার সামনে আরাতের কোমরে হাত দিয়ে আরাত কে উঁচু করে তাসিনের সামনে থেকে সরিয়ে আনলো, সবাই হা হয়ে তাকবীর আর আরাত কে দেখছে, আরাত নিজেকে হাওয়ায় অনুভব হতেই মাথা পিছনে ফিরে তাকবীর কে দেখে যেন শক্তি বেড়ে গেলো, উঁচু গলায় আরো বলতে লাগলো,
___” আমাকে ছেড়ে দেন, ওকে আমি আজকে মেরেই ফেলবো, ও বেশি বাড় বেড়ে গেছে, ওর সাহস কী করে হয় রশ্মি কে ক্যারেক্টারলেস বলার ছাড়েন বলছি আমাকে।
___” রাততত কাম ডাউন…
তাকবীর গম্ভীর গলায় আরাত কে শান্ত হতে বলে আরাতের কথায় সামনে রশ্মির দিকে তাকালো, রশ্মি নিজের দিকে তাকবীর কে তাকাতে দেখে চোখ নামিয়ে মাহিরের হাতের মধ্যে থেকে নিজের হাত বের করতে চাইলো, মাহির রশ্মির হাত আরো শক্ত করে ধরে, তাকবীর একপলক রশ্মি আর মাহিরের হাতের দিকে তাকিয়ে আরাত কে দাঁড় করালো, আরাত তাকবীরের কাছে থেকে ছাড়া পেতেই পুনরায় তাসিনেন দিকে তেরে যেতে নিলো, আর তাকবীর বা হাতে আরাতের হাত ধরে আটকে দিলো, তাসিন আরাত কে পুনরায় নিজের দিকে তেরে আসতে দেখে রুপার পিছনে দাঁড়ালো, আর রুপা তাসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছে যেন আরাত তাসিন কে ছুটে না পারে, তাকবীর আরেক হাতে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে, ওয়ালেটের ভিতর থেকে একহাজার টাকার নোট বের করে সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
___” মেয়েটা কে ডাক্তার দেখাও ।
সন্ধ্যা তাকবীরের কথায় নাকচ করে নাক ছিটকে হাত নেড়ে বলতে লাগলো ,
___” কেনো প্রয়োজন নেই ভাইয়া, এতটুকু তে তেমন কিছুই হবে না আমি আরাতের জায়গায় থাকলে তো…
তাকবীর সন্ধ্যার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো, সন্ধ্যা তাকবীরের তাকানো দেখে আর কিছু বললো না কাচুমাচু করতে করতে মুখে হাসি টেনে তাকবীরের হাত থেকে টাকা টা নিয়ে ছোট করে বলল,
___” ঠিক আছে।
তাকবীর আর কিছু বললো না, আরাত কে সবার সামনে পাঁজা-কোলা করে ঘারে তুলে নিয়ে সিড়ি বেয়ে বড়বড় পায়ে চলে গেলো, আরাতের মুখে কেনো কথা নেই,তাকবীর কলেজ থেকে বের হয়ে এসে আরাত কে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে নিজে ডাইভিং সিটে এসে বসলো, আরাতের দিকে তাকাতেই দেখলো কিছুক্ষণ আগেকার আরাতের মধ্যে কেমন ছেলেমানুষী ছিলো আর এই আরাতের মধ্যে নেই কেনো ছেলেমানুষী নেই কেনো চঞ্চলতা, কেমন গুমোট হয়ে আছে, তাকবীর আরাতের দিকে হেলে আরাতের চোখের পানিতে লেপ্টে যাওয়া নেকাব টা খুব যত্ন সহকারে খুলে দিলো, আরাত একটা নিশ্বাস ফেলে হাত দিয়ে চোখের কোণে পানিটুকু মুছে সামনে তাকালো, পাশে যে তাকবীর আছে সেদিকে তাঁর কেনো ধ্যান নেই, তাকবীর আরাত কে এক হাতে জরিয়ে ধরে নিজের কাছাকাছি বসিয়ে সামনে চোখ রেখে গাড়ি চলাতে লাগলো, আরাত কিছু না বলে তাকবীরের ঘারে মাথা এড়িয়ে দিলো আর নীরবে চোখের পানি ফেলতে লাগলো, তাকবীর নিজের শার্ট ভেদ করে ঘারে গরম পানির ছোঁয়া পেয়ে আঁড়চোখে একনজর আরাত কে দেখে আরাতের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে গাড়ি চালানোই মনোযোগ দিলো, আরাত কে কিছু বলবো না, না জানতে চাইলো কলেজে কী হয়েছে,
সন্ধ্যা টাকা টা উল্টেপাল্টে দেখছে, যাক এটা দিয়ে আগামীকাল সবাই মিলে ফোসকা খাওয়া যাবে, সন্ধ্যা টাকা টা দেখতে দেখতে তাসিনের দিকে তাকালো, বেচারার গাল দুটো লাল হয়ে গেছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, চোখদুটো থেকে যেন রক্ত ঝড়বে, জীবনের প্রথম বার এতটা অপমানিত হলো, তাসিন গালে হাত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে মেঝের দিকে তাকিয়ে বিরবির করলো,
___” এর শোধ তো আমি তুলবেই, আমাকে সবার সামনে অপমানিত করছো তাই-না, তুমি রেডি হয়ে যাও আরাত।
বিরবির করতে করতে তাসিন মিম কে একনজর দেখলো, পুনরায় রশ্মির দিকে তাকালো, মিম রশ্মির কাছে এসে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আপু চলো।
রশ্মি এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিলো, বাড়ি ফিরে কী অপেক্ষা করছে জানা নেই, তাসিন মিমের কথায় মুখ অন্ধকার করে মাহির কে বলল,
___” রশ্মি কে এভাবে যেতে দেস না মাহির, নয়তো আরাত রশ্মির বাবা-মা কে তোর নামে উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে তোদের আলেদা করবে।
তাসিনের কথায় সন্ধ্যা অবাক হয়ে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, রাফি মাহির তাসিন কে কপাল কুঁচকে দেখছে, রশ্মি তাসিনের কথায় মুখ গোমড়া করে বলল,
___” আরাত এমন না,আরাতের নামে উল্টোপাল্টা কথা বলবেন না বলে দিলাম ।
রুপা তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” ও তা-ই বুঝি, দেখলাম তো আজকে তোমার ফ্রেন্ডের রুপ,ওটা কী পাগল, এভাবে কেউ থাপ্পড় দেয় ?
কথাটা বলে রুপা তাসিনের গালে হাত রাখলো, রাফি রুপার কথা গম্ভীর গলায় বলল,
___” মুহূর্তটা দারুণ ছিলো।
রাফির কথায় রুপা তাসিন দু’জনেই রেগে গেলো, রাফি তাঁদের রাগ অগ্রহ করে নিজের ক্লাসে হাঁটা ধরলো, রুপা রাফি কে যেতে দেখে রাগী গলায় বলল,
___” রাফি আমরা তোর ফ্রেন্ড ভুলে যাচ্ছিস তুই ?
রাফি যেতে যেতে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,
___” আমার ব্যাড লাক।
রাফি চলে গেলো, মিম পুনরায় রশ্মি কে বলে উঠলো,
___” আপু বাড়ি ফিরবে?
মাহির চুপচাপ রশ্মি কে দেখছে, রশ্মি নিজের ভাবনায় মগ্ন, তাসিন মিম কে বলে উঠলো,
___” এই মেয়ে এই তুমি বুঝতে পারছো না আমার কথা…..
___” আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি না, আমার আর রশ্মি আপুর মধ্যে একদম নাক গলাবে না বলে দিলাম, নয়তো কিছুক্ষণ আগে আরাত আপুর কেলানি মনে করিয়ে দিবো।
তাসিন রেগে গেলো, মিমের দিকে তেরে যেতে নিলো সন্ধ্যা মিমের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
___” একদম ভুলেও এই ভুল করতে আসবেন না সিনিয়র আপু, ভুলে যাবেন না আমরা আরাতের বোন।
মিমের পাশে সন্ধ্যা কে দাঁড়াতে দেখে তাসিন জায়গায় দাঁড়িয়ে পরলো, রাগী গলায় শুধু বলল,
___” রশ্মি এখন বাড়ি ফিরবে না, ওরা দুজন বিয়ে করে বাড়ি ফিরবে।
সন্ধ্যা অবাক হয়ে চিল্লিয়ে উঠলো,
___” হোয়াট….?
মিম তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” আর ইউ ম্যাড, তোমার কাছে কী বিয়ে স্টার জলসা নাটক মনে হয় হ্যাঁ?
রশ্মি মাহির দুজনেই চুপ হয়ে আছে, তাসিন মিমের কথা অগ্রহ করে মাহির কে বলল,
___” মাহির ভেবে দেখ, যদি রশ্মির ফ্যামিলি জানতে পারে তুই আরাতের সঙ্গে চিট করেছিস, তখন রশ্মির সঙ্গে তোর বিয়ে দিবে, একবার ভাব কথাটা?
মিরা এতক্ষণ চুপচাপ এক সাইটে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলো, তাসিনের কথা মিরার কাছে খারাপ লাগছে না, কথার মধ্যে যুক্তি আছে, মিরা এতক্ষণে কথা বলে উঠলো, মাহির কে বলল,
___” ভাইয়া তাসিন আপুর কথায় যুক্তি আছে, তুমি রশ্মি আপু কে বিয়ে করে নেও,বাবা কে আমি ম্যানেজ করে নিবো, আর একবার তোমাদের বিয়ে হয়ে গেলে, রশ্মি আপুর মা-বাবা মেনে নেবেই,।
মাহির রশ্মির দিকে তাকালো, রশ্মি নিজের ভাবনায় মগ্ন, সন্ধ্যা মিরার উপর ক্ষিপ্ত হলো, মিম রশ্মির সামনে এসে দাঁড়ালো,
___” আপু ছোট মুখে একটা কথা বলি, যেটাই করো একবার ফ্যামিলি কে জানিয়ে করো, তোমরা ওই বেয়াদব মেয়েটার কথায় ভুল করো না প্লিজ,
রশ্মি কিছু বলল না, মিম রশ্মি কে কিছু বলতে না দেখে সন্ধ্যার হাত ধরে কলেজ থেকে বেরিয়ে মাঠে এলো, আজকে আর মন বসবে না ক্লাসে, আর কবেই বা ঠিকঠাক মতো ক্লাসে মন বসাতে পেয়েছে মিম, সন্ধ্যা আর মিম দুজন দু’জনের বাড়ি যাবে, মাঠ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরশ মিম কে পিছনে থেকে দেখে উঠলো,
___” এই মেয়ে দাঁড়াও ?
আরশের ডাকে সন্ধ্যা মিম পিছনে ফিরে তাকালো, মিম আরশের মুখে এই মেয়ে ডাক শুনে অবাক হলো, গ্রামের মেয়ে বলে ডাকতে ডাকতে আজকে হটাৎ এই মেয়ে, সন্ধ্যা আরশ কে দেখে বলল,
___” আমি গেলাম আল্লাহ হাফেজ।
সন্ধ্যা চলে গেলো, মিম সন্ধ্যা কে একটু অপেক্ষা করতে বলার সুযোগ টুকুও পেলো না, মুখ গম্ভীর করে আরশ কে বলে উঠলো,
___” যা বলার দ্রুত বলেন?
মিমের তাড়া দেখে আরশ মিমের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” হাতে কীসের ফাইল?
আরশের কথায় মিম নিজের হাতের ফাইলটা দেখতে লাগলো, কিছুটা মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠলো, তাচ্ছিল্য হেঁসে আরশের দিকে ফাইল টা বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
___” আমাদের ডিভোর্স পেপার,নিন সাইন করে দিয়ে আমাকে মুক্ত করে দেন।
মিমের কথায় আরশের বুকটা ধক করে উঠলো, শুকনো ঢোক গিলল, সঙ্গে বদমেজাজী রাগটা জেগে উঠলো, ফাইল না নিয়ে মিমের কব্জি টেনে নিজের মুখোমুখি করে বলল,
___” মুক্তি তোর জন্য বিলাসিতা, আর আমাকে এ-সব আজাইরা ভয় দেখাবি না, কারণ আমাদের বিয়ের তিনমাস এখনো হয়নি, আর ডিভোর্স।
কথাটা বলে আরশ তাচ্ছিল্য হেঁসে মিম কে দূরে থেলে দিলো, মিম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আরশের মুখের দিকে চেয়ে বলে উঠলো,
___” আপনি আমাদের ডিভোর্স নিয়ে ভয় পান?
মিমের কথায় আরশের মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেলো, মিমের থেকে চোখ লুকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
___” ভয় পাবো কেনো, তোকে কী আমি ভালোবাসি নাকি, যে তোকে হারিয়ে ফেলার ভয় পাবো।
মিম ফাইল টা বুকের সঙ্গে জরিয়ে ধরে গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁট উল্টে বলল,
___” কী জানি, বাসতেও পারেন।
আরশ মিমের পাশে হাঁটতে হাঁটতে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” তোকে আমি ভালো বাসবো, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছিস?
মিম নিজের বুকে ফাইল টা দেখতে দেখতে মলিন কন্ঠে বলল,
___” স্বপ্ন..হুম স্বপ্ন দেখছি।
মিম কে বারবার ফাইনালে দিকে তাকাতে দেখে আরশ ভ্রু কুঁচকে পুনরায় জিজ্ঞেস করে উঠলো,
___” সত্যি করে বলো তো, এই ফাইনালে মধ্যে কী?
আরশ কে হুটহাট ব্যাবহার পরিবর্তন করতে দেখে মিম মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো, কখনো তুই কখনো তুমি,হুটহাট রেগে যায় যা খুবই বাজে অভ্যাস, মিম আরশ কে রাগাতে বলে উঠলো,
___” বললাম তো আমাদের ডিভোর্স পেপার।
আরশ পুনরায় রেগে গেলো, মিম কে মাঠে ফেলে বড়বড় পা ফেলে গেটের দিকে যেতে যেতে বিরক্ত মুখে বলল
___” আমার ভুল হয়েছে তোর সঙ্গে কথা বলতে আসা, মাফ কর বউ ।
আরশ বড়বড় পা ফেলে গেটের দিকে চলে গেলো, মিম আরশের মুখে বউ ডাকটা শুনে জায়গায় থমকে দাঁড়ালো, যদিও আরশ নিজের অজান্তে বলে ফেলছে কিন্তু বউ বলে ডাক টা মিমের বুকে এসেছে কোথাও যেন লেগেছে, ছোট একটা কথা বউ, হ্যাঁ মিম তো আরশের বউ, হোক না মনের বিরুদ্ধে বিয়ে তবুও তো মিম আরশের বউ, মিমের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিজের বুকে ফাইলের দিকে চেয়ে বিরবির করল,
___”যে বাঁধনে ফেলছেস, তাঁর থেকে পালিয়ে বাঁচার একমাত্র সমাধান।
মিম ধীর পায়ে কলেজ থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়ালো রিকশা খুঁজতে, কিন্তু দু সেকেন্ডের মধ্যে একটা রিকশা মিমের সামনে এসে দাঁড়ালো, রিকশা তে আরশ বসা ছিলো, কলেজ গেটের সামনে এসে আরশ রিকশা থেকে নেমে পড়লো, মিম ভ্রু কুঁচকে দেখছে আরশ কে, আরশ নামার সঙ্গে সঙ্গে রিকশা ওয়ালা তাড়া দিয়ে মিম কে বললেন,
___” উঠে পরেন আপনারে নামিয়ে দিয়ে আসি।
আরশ রিকশা থেকে নেমে সাইটে দাঁড়িয়ে আছে, মিম আরশ কে কিছু বলতে না দেখে চুপচাপ রিকশাতে উঠে পরলো,মিম রিকশাতে উঠতেই আরশ নিজের ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে একশো টাকার নোট রিকশা ওয়ালা কে দিলো, মিম বাঁধা দিয়ে বলে উঠলো,
___” আপনি টাকা দিচ্ছেন কেনো, মামা উনার থেকে টাকা নিবেন না,ফেরত দিয়ে দেন আমার টাকা আমি দিবো।
বলেই মিম নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে নিলো, আরশ রিকশা ওয়ালা কে বললো,
___” মামা আপনি যান, এই বেডি বেশি কথা বলে বিরক্ত হয়েন না।
আরশের কথায় মিম টাকা বের না করে রাগী চোখে আরশের দিকে তাকালো, আরশ রিকশা ওয়ালা কে চোখের ইশারায় যেতে বলে ওয়ালেট পকেটে ঢোকাচ্ছে, রিকশা ওয়ালা তিরিশ টাকা রেখে বাদবাকি টাকা আরশ কে দিতে ধরলে আরশ লাগবে না বলে কলেজের ভিতরে চলে গেলো, মিম আর কিছু বলল না, মনে মনে ঠিক করে নিলো বাড়ির সামনে এসে ভরা দিয়ে দিবে, রিকশা চলছে আপন গতিতে, মিম চুপচাপ আশেপাশে পরিবেশ দেখছে, মাথায় কাপড় দেওয়া তবুও হালকা বাতাসে সামনে বারংবার চুল এসে মুখে পড়ছে, মিম বিরক্ত হয়ে বারবার মুখ থেকে চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিচ্ছে, আরশ বাইকের আয়না দেখছে মিমের বিরক্তমাখা মুখটা, কয়েক সেকেন্ড পরপর মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাচ্ছে, রিকশার দিকে, মিম রিকশা থেকে লক্ষ করলো রিকশার সামনে একটা বাইক ধীর গতিতে চলছে, বাইকে বসা ছেলেটা বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে, মিম ভালো করে লক্ষ করতেই বুঝতে পারলো, বাইকে বসা ছেলেটা আর কেউ না আরশ, মিম আরশ কে পাওা দিলো না রিকশায় বসে ব্যাগ থেকে বই বের করে বইয়ে চোখ নিবন্ধ করলো, বইয়ের দিকে চোখ রাখলে কী হবে পুরো মনোযোগ আরশের বাইকের দিকে, আরশ এবার রিকশার পাশাপাশি বাইক ধীর গতিতে চলাতে লাগলো, এভাবেই তালুকদার বাড়ির সামনে এসে রিকশা দাঁড়ালো, মিম রিকশা থেকে নেমে আশেপাশে আরশ কে খুঁজলো, আরশ রাস্তায় ওপাশে বাইকের সঙ্গে হেলিয়ে ফোন স্ক্রল করছে, মিম সেদিকে তাকিয়ে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশা ওয়ালা কে দিলো, রিকশা ওয়ালা মিম কে বাঁধা দিয়ে বলল,
___” আপনার ভারা তো দিয়ে দিছে,আমি এই টাকা নিতে পারবো না ।
মিম রিকশা ওয়ালা কে টাকা না নিতে দেখে সিটের উপর টাকা টা রেখে বলল,
___” এটা আমার ভরা, আপনি নিবেন কী নিবেন না আপনি ভালো জানেন।
কথাটা বলে মিম আরশ কে আঁড়চোখে এক পালক দেখে তালুকদার বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, আরশ মিম কে যেতে দেখে বাইকে সোজা হয়ে বসলো, রিকশা ওয়ালা মিমের টাকা দেখিয়ে দিলে আরশ বাইক নিয়ে রিকশা ওয়ালার কাছে এসে নিজের ওয়ালেট থেকে আরো একশো টাকা বের করে রিকশা ওয়ালা কে দিয়ে মিমের খুচরো তিরিশ টাকা টা নিজের ওয়ালেটে রেখে হাসি মুখে বাইক টান দিতে দিতে বলল,
___” মেয়েটার মাথায় সিট আছে।
আরশের কথায় রিকশা ওয়ালা নিজের রিকশা চালাতে চালাতে হাসি মুখে বিরবির করলো,
___” দুটোই পাগলা-পাগলি।
তাকবীর অনেক আগেই আরাত কে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে, রুমে এসে আরাত কে ফ্রেশ হতে বলে তাকবীর বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো, আরশ কে তালুকদার বাড়ির রাস্তায় ওপারে বাইকের সঙ্গে হেলিয়ে ফোন স্ক্রল করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে ছিলো, পরমুহুর্তে মিম কে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে দেখে কপালের ভাজ সোজা হয়ে গেলো, আরো কিছুক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থেকে রুমে প্রবেশ করলো, রুমে এসে দেখতে পেলো আরাত কে যেভাবে বিছানায় ঝিম ধরে বসে থাকতে দেখে বেলকনিতে গিয়েছিল, এখনও একিভাবে বসে আছে, না ফ্রেশ হয়েছে না বোরকা চেঞ্জ করেছে, তাকবীর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আরাতের সামনে এসে দাঁড়ালো,
___” আমার জন্য ওয়েল করছিলে?
আরাত তাকবীরের ভারী কন্ঠে নিজের ভাবনা থেকে বের হয়ে এলো, তাকবীরের কথা না বুঝেই মুখ থেকে ছোট করে হুম শব্দ বের করলো, তাকবীর ওকে বলে আরাত কে পুনরায় পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলো, আরাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো থতমত মুখে তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর আরাত কে কোলে তুলে ওয়াশরুমে নিয়ে এলো, কিছুক্ষণ আরাত কে কোলে রেখেই বাথটব পানিতে ভরাচ্ছে, আরাত অবাক হয়ে বলছে
___” আমাকে ছাড়েন কী করছেন, বাথটব কেনো ভরাচ্ছেন…
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৪
আরাত নিজের মতো করে বকবক করতে লাগলো, তাকবীর আরাত কে ভরা বাথটবের মধ্যে ধপাস করে ফেলে দিলো, সঙ্গে সঙ্গে বোরকা শরীরের সঙ্গে লেগে গেলো, তাকবীর আরাতের সামনে এসে গম্ভীর গলায় বলল,
___” তুমি তো কোলে করে আসার জন্য ওয়েট করছিলে, ফাস্ট ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এসো।
কথাটা বলে তাকবীর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো আরাত তাকবীর কে বকা দিতে দিতে ফ্রেশ হতে লাগলো,
