Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৮

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৮

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৮
জান্নাতি আক্তার জারা

___” মিম আপু তোমাকে নিচে ডাকছে সবাই।
আহিন দরজার কাছে এসে কথাটা বলে পুনরায় নিচে নেমে গেলো,আহিনের কথায় মিম শুয়া থেকে বিছানায় বসে পরলো, নিচে যে তাঁর ডাক পরবে এটা আগে থেকে জানা ছিলো, আইরা মিম কে বলল,
___” আন্টি আঙ্কেল যদি তোকে তাঁদের বাড়ির বউ হিসেবে নিতে আসে, কী করবি চলে যাইবি?
মিম মলিন মুখে তিনজন কে পরখ করলো, আরাত আইরা তিশা তিনজনের চাহনি তে লেগে আছে একি প্রশ্ন, মিম তাঁদের থেকে চোখ ফিরিয়ে বিছানা থেকে নামলো, ওড়না ঠিক করে ধীর পায়ে রুম থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলল,

___” তা আর সম্ভব না।
মিম রুম থেকে বের হওয়ার পর তিনজন তিনজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নিজেরাও রুম থেকে বের হয়ে এলো, ড্রয়িং রুমে বড়রা সবাই উপস্থিত, মিম আর আরশ কে নিয়ে কথা বলছে, কয়েক জোড়া পায়ের আওয়াজে সবাই সিড়ির দিকে তাকালো, মিম আরাত আইরা তিশা কে নিচে নামতে দেখে বড়রা নিজেদের কথোপকথন বন্ধ করলেন,মিম নিচে নেমে আরশের বাবা-মা কে সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো, মিমের পাশে তিশা দাঁড়িয়ে আছে, আইরা আরাত একপাশে দাঁড়ালো, আরশের মা বসা থেকে উঠে এসে মিমের সামনে দাঁড়ালেন, কোথায় থেকে শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না, বড় ছেলের জন্য আন্টি পড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই মেয়ে আজ তাঁর ছোট ছেলের বউ, তালুকদার বাড়িতে উপস্থিত সবাই মুখে লেগে আছে, গম্ভীর্য মলিন মুখ, সামনে কী হবে জানান আগ্রহ, আর হতাশার সুর, আরশের মা নীরবতা ভেঙ্গে মলিন মুখে বলে উঠলো,

___” বুঝতে পারছি না কোথায় থেকে শুরু করবো, শুধু এতটুকু বলবো সবকিছু ভুলে যাও, নতুন করে শুরু করো সবকিছু, আমি বা তোমার শশুর সবসময় তোমার সঙ্গ দিবো, আমরা তোমাকে আমাদের ছোট ছেলের বউ হিসাবে ঘরে তুলে নিতে এসেছি।
মিম মুখ তুলে তাকালো ভদ্র মহিলার দিকে, আদিবা তালুকদার ভাতিজির কাছে এসে বলল,
___” মনে করো হানিফের সঙ্গে তোমার এনগেজমেন্ট হয়নি, সবকিছু ভুলে যাও, তোমার শশুর শাশুড়ী তোমাকে নিতে এসেছে, আমরা চাই তুমি তাঁদের সঙ্গে তোমার শশুর বাড়িতে যাও, তোমার কী মতামত?
মিম আদিবা তালুকদারের কথায় পুরো ড্রয়িং রুমে চোখ বুলালো, বড়ছোট সবাই উপস্থিত, মিম সবাই কে এক নজর দেখে নিয়ে নিজের মায়ের দিকে তাকালো, রুপোলী বেগম ঝিম ধরে মেঝের দিকে চেয়ে আছে, মিম নিজের মায়ের দিকে চেয়ে আদিবা তালুকদারের কথার উত্তর করলো,

___” মনে করলেই কী সব আগের মতো হয়ে যাবে ফুপি ?
আদিবা তালুকদার মিমের কথার প্রতিউত্তরে বলে উঠলো,
___” হয়তো হবে না, কিন্তু নতুন করে শুরু করতে পারবে, সামনে তোমার সংসার অপেক্ষা করছে।
মিম আদিবা তালুকদারের কথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে সবার সামনে বলে উঠলো,
___” যে সংসারে স্বামী নামে মানুষ টা, বিয়ের প্রথম দিন স্ত্রী কে রাস্তায় ফেলে নিজের দায়িত্ব থেকে বাঁচতে ডিভোর্স দিতে চায়, যে সংসারে স্বামী নামে মানুষ টা স্ত্রী কে চরিত্রহীন লোভী অযোগ্য বলে বারবার অপমান করে সেই সংসারের কথা বলছো ফুপি?
সবাই অবিশ্বাস্য চোখে মিম কে দেখতে লাগলো,দুজন বড়দের না জানিয়ে বিয়ে করেছে, তাঁদের তো পরিবার থেকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়নি তাহলে সবাই কে না জানিয়ে বিয়ে করার পর ডিভোর্স দিতে চায় কেনো, যদি ডিভোর্স দেওয়ার ছিলো, তাহলে এভাবে বিয়ে করার মানে টা কী, মিমের কথায় রুপোলী বেগম বসা থেকে উঠে এসে মিমের সামনে দাঁড়ালো,

___” বিয়ে করেছো, আবার ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলো এসবের মানে কী ?
রুপোলী বেগমের কথায় মিম জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজে নিয়ে পুনরায় নিজের রুমের দিকে যেতে নিয়ে বলল,
___” মানে একটাই আমার ঘুম প্রয়োজন, ঘুমাবো আমি গুড নাইট।
মিমের গা ছাড়া ভাব দেখে সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে, আরশের বাবা-মার সামনে মিম কে বেয়াদবি করতে দেখে রুপোলী বেগম রেগে গিয়ে মিমের হাত টেনে ধরলেন,
___” তোমার কী মনে হয়, আমরা এখানে আড্ডা দিতে বসেছি তুমি বিরক্ত হয়ে রুমে চলে যাচ্ছো, আমরা তোমাকে নিয়ে কথা বলছি, তোমার শশুর শাশুড়ী তোমাকে নিতে এসেছে, আর তুমি বড়দের সামনে বেয়াদবি করে রুমে চলে যাচ্ছ?
মিম রুপালী বেগমের কথায় আঁড়চোখে শশুর শাশুড়ী কে দেখলো একপলক, আরশের মা-বাবা সবাই মিম কে দেখছে চুপচাপ, মিম আরশের মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালো,

___” আন্টি একটা কথা বলবো?
___” হুম বলো মা।
মিমের চোখের কোণে পানি এসে জমা হয়ে গেছে, একপলক সবাই কে দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
___” আন্টি আমার উপর রাগ লাগছে না আপনার?
ভদ্র মহিলা কেনো ভনিতা ছাড়া মিমের কথার উত্তর করলো,
___” না কারণ সব দোষ আমার ছেলের ছিলো।
মিম মলিন মুখে মেকি হাসলো,
___” আমি যদি ভালো থাকতে চাই?
আরশের মা কিছুপলক মিমের দিকে নীরব চোখ বুলালো, মিমের পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন তিনি, মিমের কথায় মানেও বুঝতে পারছেন তিনি, কয়েক সেকেন্ড মিম কে পর্যবেক্ষণ করে মিমের দু-হাত নিজের হাতের মধ্যে আবদ্ধ করে নিয়ে বলে উঠলো,

___” তোমার ভালো থাকার রাইট আছে,তোমার যেমন ভালো লাগে, আমি তোমাকে জোর করছি না, বাট সবশেষে বলল,আমার ছেলেটা কে একটা চান্স দেও মা!
মিম আগের ন্যায় মুখে মলিন হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলল,
___” আপনার ছেলে আমাকে চায় না আন্টি, সে শুধু আমাকে সবার সামনে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিলো, বিয়ে তো বাধ্য হয়ে করেছে, সে আমাকে অন্যর সঙ্গে সংসার করতে দিবে না, না আমাকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলবে, আপনি আমাকে নিতে এসেছেন, অথচ আপনার জায়গায় আপনার ছেলে থাকার কথা, আন্টি আমি এখন বিয়ে করতে চাইছিলাম না, জীবন টা উপভোগ করতে চাইছিলাম, কিন্তু আম্মুর ইচ্ছা আমি বিয়ে করে সংসার করবো, আম্মুর উপর রাগ করে এই তালুকদার বাড়িতে আসলাম, কিন্তু আমার কপাল দেখেন, জীবন টা উপভোগ না অষ্ঠিত হয়ে উঠেছে, আমি এই জীবন থেকে মুক্তি চাই আন্টি, প্লিজ আমাকে মুক্ত করেন।
তালুকদার বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেছে মিমের কথায়, কেউ কথা খুঁজে পাচ্ছে না, মিমের কথায় পরিস্কার হয়ে গেছে সবার কাছে, মিম আরশ দুজন ভালোবেসে বিয়ে করেনি, আরশের মা একনজর নিজের হাজবেন্ডের দিকে তাকালেন, ভদ্রলোকের চোখ মেঝের দিকে, আরশের মা এবার মুখে মেকি হাসি ফুটে মিমের গালে হাত রেখে বলল,

___” তুমি যা চাও তাই হবে, আজ থেকে তুমি আমার বড় ছেলে থেকে মুক্ত, আমার ছোট ছেলে থেকে মুক্ত হতে সময় লাগবে, আমি সবসময় চাইবো তুমি সুখী থাকো, পারলে আমাদের মাফ করে দিও।
মিম আরশের মায়ের হাত ধরে বলতে লাগলো,
___” না আন্টি এভাবে বলবেন না, আপনি আমার মায়ের মতো….
মিম কে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে ভদ্র মহিলা আক্ষেপ নিয়ে বলে উঠলেন,
___” মা তো আর হতে পারলাম না।
মিম কিছু বলল না, ভদ্র মহিলা উনার হাজবেন্ড আর হানিফ কে উঠতে বলে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো, ভদ্রলোক আদনান তালুকদার থেকে বিদায় নিয়ে উঠে চলে গেলো, হানিফ সোফা থেকে উঠে মিমের সামনে এসে দাঁড়ালো, মিম নিজের সামনে হানিফ কে দেখে মাথা নিচু করে বলল,

___” আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, এতটা হেল্প করার জন্য।
হানিফ মিমের কথায় একটা ভারি নিশ্বাস ফেললো, মনের অনুভূতি মনে রেখে মলিন হেঁসে বলল,
___” কিন্তু আমরা তো ব্যর্থ হলাম।
মিম মাথা তুলে চাইলো হানিফের দিকে, হানিফের চোখে চোখ রাখতেই নিজের প্রতি সফট কর্ণার অনুভব করে পুনরায় চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল,
___” আমার ভাগ্য লেখা ছিলো ব্যর্থতা।
হানিফ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে দু পকেটে হাত গুঁজে মিমের চোখে চোখ রেখে নীরব কন্ঠে বলল,
___” ভাগ্য কখনো ভুল হয় না, ভুল তো হয় আমাদের বাছাই করা রাস্তা বোকার মতো ভাগ্যের দোষ দিয়ে কি হবে,যেখানে তোমার সামনের মানুষ টা তোমাকে চাওনি, সেখানে ভাগ্য কি করবে!
হানিফ দেরি করলো না কথাগুলো বলে তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, রুপোলী বেগম মিমের কাছে এসে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

___” আগামীকাল আমরা গ্রামে যাবো, তুমি আমাদের সঙ্গে বাড়ি ফিরবে, গ্রামে কেউ জানতে পারবে না তোমার বিয়ে হয়েছে আর কেউ বাজে কথা শুনাবে না, গ্রামে ফিরে গেলে আরশ তোমার সঙ্গে সংসার করতে চাইলে অবশ্যই তোমাকে নিতে গ্রামে যাবে, আর যদি না যায় তাহলে তুমি যা চাইবে তাই হবে,যদি ডিভোর্স দিতে চাও আমরা ব্যবস্থা করবো….
মিম অবিশ্বাস্য হয়ে রুপোলী বেগমের কথা শুনলো, মেয়ে বলে মিমের কেনো ভেলু নেই, এতকিছু জানার পড়েও রুপোলী বেগম মিম কে আরশের জীবনে ফিরতে বলছে, মিম চোখে পানি নিয়ে বিরক্ত মুখে বলল,
___” সংসার সংসার সংসার, সংসার ছাড়া তোমার মেয়ের ভালো থাকা তোমার নজরে পড়ে না, আমি করবো না এমন পুরুষের সঙ্গে সংসার, আর গ্রামের মানুষ আমাকে কী ভাববে কী ভাবছে আই ডোন্ট কেয়ার, আমি নিজের মতো করে বাঁচবো।
রুপোলী বেগম মেয়ের এমন কথা শুনে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সামনে আর কিছু বলল না, আহাদ তালুকদার আদনান তালুকদার রাবেয়া তালুকদার আরাত আইরা তিশা, সবাই চুপচাপ রুপোলী বেগম তো মিম কে দেখছে, আদিবা তালুকদার এবার মিম কে বুঝানোর ন্যায় বলে উঠলো,

___” মেয়েদের এত জেদ থাকতে নেই , মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়।
আদিবা তালুকদারের কথায় মিম তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” মানিয়ে নেওয়া, কিন্তু ফুপি আমি তো মানিয়ে নিতে চাই না,আমি চাই এমন ছেলে যে আমাকে ভালোবাসবে, আমার খেয়াল রাখবে, আগলিয়ে রাখবে, আমার যত্ন করবে, আমাকে সবার কথা থেকে বাঁচবে,কারো কাছে ছোট হতে দিবে না, বাট আমি এতদিনে খুব ভালো করে বুঝে গেছি আরশের জীবনে আমি কী,এখন তো আরো সম্ভব না।
রুপোলী বেগম মিম কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললেন,
___” সম্ভব না কেনো, তুমি জানো সত্যি কখনো লুকোনো যায় না, আজ না কাল তুমি গ্রামে যাবে, তখন গ্রামের মানুষ তোমাকে কেমন নজরে দেখবে জানো, সবাই বলবে তুমি ডিভোর্সি,ডিভোর্সি ত্যাগ লাগিয়ে দিবে তোমাকে, তোমাকে যখন ডিভোর্সি বলবে, তখন আমি মা হয়ে কিভাবে সহ্য করবো বলো ?
রুপোলী বেগমের মুখে ডিভোর্সি শব্দটা মিমের মনে দ্যাগ কেটে গেলো, সত্যি তো এই সমাজে ডিভোর্সি জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা কী এতটা সহজ, মিম চোখ বন্ধ করে রুপোলী বেগমের কথায় বলল,

___” সমাজ থেকে বাঁচার জন্য এত আয়োজন, না আমি থাকবো, না এই সমাজ আমাকে মনে রাখবে, আমি সহজে হার মেনে নিবো না, আমি বাঁচবো আর আমাকে এই সমাজের চোখে কলঙ্কিত ডিভোর্সি বানানো পুরুষ তাকে আমার অনুপস্থিতিতে তিলে তিলে শেষ করবো।
মিম চোখ বন্ধ করে কথা গুলো বলে সিড়ি বেয়ে দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেলো, আরাত বাদে বাকি সবাই মিমের কথায় অবাক হলো, মিম থাকবে না মানে, সবার মনে মিম কে ঘিরে ভয় ঝেকে ধরলো, মিম কী নিজের ক্ষতি করবে, কথাগুলো ভেবে মিমের রুমের দিকে সবাই দ্রুত পায়ে যেতে লাগলো, আরাত সবাই কে এভাবে মিমের রুমের দিকে ছুটে যেতে দেখে উচ্চ স্বরে বলে উঠলো,

___” মিম কে একা ছেড়ে দিন,মিম নিজের ক্ষতি করার মেয়ে না।
আরাতের কথায় সবাই পুনরায় অবাক হয়ে পিছনে ফিরে তাকালো, আহাদ তালুকদার আরাত কে বলে উঠলো,
___” মানে ?
রুপালী বেগম আরাতের কথা কর্ণপাত না করে পুনরায় যেতে নিলো, আরাত সবাই কে একনজর দেখে নিয়ে মাথা নিচু করে নিজের বাবার কথার উত্তর করলো,
___” মিম না থাকার মানে বুঝিয়েছে, বিদেশে পাড়ি জমাবে, আগামীকাল সকাল আটটায় মিমের ফ্লাইট, মিম আরশ ভাইয়ার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরপর উনাকে বলে ডিভোর্স পেপার রেডি করতে, কিন্তু বিয়ের তিনমাস না হওয়া অব্দি ডিভোর্স হবে না, মিম দুদিন পড়ে ফাইনাল ডিসিশন নেয়, এই দেশ ছাড়বে, উনাকে সবকিছু রেডি করতে বলে, মিমের কথা মতো উনি মিমের পাসপোর্ট আর যত প্রয়োজনীয় কাগজ লাগে সবকিছু রেডি করতে লাগে, আজকে বিকালে জানিয়ে দেয় আগামীকাল সকাল আটটায় মিমের ফ্লাইট।

আরাতের কথায় সবাই তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, রুপোলী বেগম যেতে নিয়ে অবিশ্বাস্য মুখে আরাত কে দেখছে, কারো বিশ্বাস হচ্ছে না মিম এতকিছু করে ফেলছে,তাসিন যদি আজকে মিম আরশের বিয়ে টা সবাই কে না জানাতো, আগামীকাল হটাৎই আজকের মতো সবাই কে অবাক করে দিয়ে মিম এই দেশ ছাড়তো, সবাই হয়তো আরো বেশি অবাক হতো হটাৎ মিমে বিদেশ যাওয়া দেখে, কেউ হয়তো জানতেও পারতো না মিম কী কারণে বিদেশ চলে গেলো, তিশা অবিশ্বাস্য মুখে আরাত কে বলল,
___” তুমি মিথ্যা বলছো আপু ?
আরাত তিশার দিকে চেয়ে মলিন হাসলো, সঙ্গে সঙ্গে রুপোলী বেগম সিড়ির উপর বসে পরলেন, মিমের বাবা কথাটা শুনে সোফাতে বসে ছটফট করতে লাগলো, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার মিমের বাবার পাশে বসলো, সবাই যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে, আজকে একটার পর একটা অবাক হতে আছে সবাই, তাঁদের সাজানো গুছানো সংসারের পিট পিছনে তাঁদের ছেলেমেয়ে কত-কী করে ফেলছে, আর তাঁরা আজকে জানতে পারলো, আর যখন জানতে পারছে তীরে এসে তরি ডুবে গেছে এতক্ষণে, আইরা আরাত কে মলিন মুখে প্রশ্ন করলো,

___” কোন দেশে ?
___” আমেরিকা।
রুপোলী বেগম আর বসে থাকলেন না, মিমের রুমের সামনে এসে মিম কে অনবরত ডাকতে লাগলো, তাঁর পিছনে পিছনে আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার ডাকতে লাগলো, কিন্তু মিম আর দরজা খুলে দিলো না, প্রায় তিরিশ মিনিট মতো মিম কে ডেকে ব্যর্থ হয়ে মিমের দরজার সামরে থেকে নিচে নেমে এলো, বিকাল থেকে রাহিমা সুলতানা বা আলভীর দেখা নেই তালুকদার বাড়িতে, তালুকদার বাড়িতে এতকিছু ঘটে যাচ্ছে কিন্তু রাহিমা সুলতানার দেখা মিলছে না, তিনি নিজের মেয়ের ঘোর থেকে বের হতে পারছেন না, রশ্মি এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না, আদিবা তালুকদার রেগে গিয়ে বললেন,

___” তোমরা অনেক বড় হয়ে গেছো, তোমরা এতকিছু ঘটিয়ে ফেলছো আমাদের একটা বার বলার প্রয়োজন মনে করছো না, মিম কোথাও যাবে না, সবকিছু ঠিক আগের মতো হয়ে যাবে, তাকবীর কে বলো মিমের ফ্লাইট ক্যানসেল করতে।
আরো নানারকম কথা বলে হইচই করতে লাগলো, আদিবা তালুকদার কে চিল্লাপাল্লা করতে দেখে আহাদ তালুকদার এসে আদিবা তালুকদার কে রুমে নিয়ে গেলেন, আদনান তালুকদার রাবেয়া তালুকদার কে বললেন, রুপোলী বেগম আর মিমের বাবা কে গেস্ট রুমে পৌঁছে দিতে, বলে তিনি নিজের রুমে চলে গেলো, একে একে পুরো ড্রয়িং রুম ফাঁকা হতে লাগলো, কী বলবে কারো মুখে কথা নেই, আরাত তিশা আইরা মিমের রুমের সামনে এসে মিম কে ডাকতে লাগলো, তিশা ডেকে উঠলো,

___” মিম বড়রা কেউ নেই দরজা খুলে দে ?
তিশা একে একে দুতিন ডাক দেওয়ার পর দরজা খুলে গেলো, মিম দরজা খুলতেই তিশা কান্না করে মিমের উপর ঝাপিয়ে পরলো,
___”তুই আমাদের ছেড়ে এভাবে চলে যাস না মিম।
মিম তিশার কথায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, আরাত যে সবকিছু বলে দিযেছে তিশার কথাতেই বুঝতে পারলো, মিম মলিন মুখে বলে উঠলো,

___” একটু শান্তি চেয়েছিলাম কিন্তু জীবন আমাকে শান্ত করে দিয়েছে, অদ্ভুত ভাবে চলছে জীবন, না আমি নিজেকে নিয়ে খুশি, না পরিবার আমাকে নিয়ে খুশি, জানিস তো মনে শান্তি না থাকলে পুরো দুনিয়া বিরক্ত লাগে।
তিশা মিমের কথায় কান্না বন্ধ করে মিম কে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, আরাত কিছু বলল না কারণ এই কয়েক দিনে মিম কে বুঝাতে বুঝাতে ক্লান্ত সে, আইরা বলে উঠলো,
___” তোর চোখ বলে দিচ্ছে তুই আরশ কে ভালোবাসিস, মিম পাগলামি করিস না ক্ষমা করে দিয়ে সংসার কর ?
মিম আইরার কথায় তাচ্ছিল্য হেঁসে বিছানায় দিকে যেতে যেতে বলল,
___” ভালোবাসি বলেই তো ক্ষমা করবো না,ক্ষমা করা মানে তো ভুলে যাওয়া আর আমি ওকে আজীবন মনে রাখতে চাই।
আরাত এবার বলে উঠলো,

___” শিকার করছিস তুই আরশ কে ভালোবাসিস?
মিম উত্তর করলো না মুচকি হেঁসে চোখ বন্ধ করে নিলো, আরাত আইরা কয়েক সেকেন্ড মিমের দিকে চেয়ে থাকলো মিমের উত্তর শুনার জন্য, কিন্তু মিমের নীরবতা ছাড়া কেনো জবাব এলো না,মিমের নীরবতা তেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলো তিনজন, বেশ কিছুক্ষণ মিম কে দেখে আইরা আরাত তিশা কে দরজা লাগাতে ইশারা করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, দুজন রুম থেকে বের হওয়ার পরপর তিশা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে মিমের পাশে এসে শুয়ে পরলো, মিম চোখ বন্ধ রেখেই তিশা কে বলল,
___” আমার ফুল বাগানের খেয়াল রাখবি, সবসময় যত্ন করবি, আমি যদি কখনো ফিরে এসে দেখি আমার ফুলবাগান তোর অযত্নে মরে গেছে, তাহলে তোকে আমি বুড়ীর স্বামী বুড়োর সাথে বিয়ে দিয়ে দিবো।
তিশা মিম কে জরিয়ে ধরে বলল,

___” আমার যদি বিয়ে হয়ে যায়,তখন কে যত্ন নিবে?
মিম চোখ বন্ধ করে বলল,
___” তুই কখনো বিয়ে করবি না।
মিমের কথায় তিশা অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___” তোর ফুলবাগানের জন্য আমি কখনো বিয়ে করবো না?
___” না।
তিশা মিম কে পুনরায় বলে উঠলো,
___” আচ্ছা ঠিক আছে তুই না ফিরা অবধি আমি বিয়ে করবো না, তোর বাগানের মেয়ে মালি হয়ে থেকে যাবো, কবে ফিরবি তুই ?
তিশার কথায় মিম নিঃশ্বাস ফেলে নীরব কন্ঠে বলে উঠলো,

___” ফিরবো না আর কখনো।
তিশা মিমের কথায় মিম কে ছেড়ে দিয়ে ঝট করে বিছানায় বসে বলে উঠলো,
___” কীহহহহ তাঁর মানে আমাকে সিঙ্গেল মরতে হবে?
তিশার হটাৎ কান্ডে মিম চোখ খুলে তাকালো, কয়েক সেকেন্ড ডিম লাইটে তিশার উজ্জ্বল ফর্সা মুখপানে চেয়ে থেকে পুনরায় চোখ বন্ধ করে নিয়ে বলে উঠলো,
___” আমার জন্য তোকে সিঙ্গেল থাকতে হবে না, কখনো ফিরবো না পড়াশোনা শেষ করে আমেরিকায় সেটেল হয়ে যাবো।
তিশা এবার সিরিয়াস হয়ে বলে উঠলো,
___” আমাদের কথা না ভাবলি কাকা কাকির কথা ভাববি না ?
মিম চোখ বন্ধ রেখেই বলল,

___” আমি পড়াশোনা শেষ করে জব ধরে আম্মু আব্বু কে আমার কাছে নিয়ে যাবো।
___” আর আরশ ভাই ?
আরশের কথা শুনে মিম চোখ মেলে তাকালো, চোখের কোণ থেকে দুফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো, সিলিং এর দিকে চেয়ে থেকে কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
___” কেনো পিছুটান রাখতে চাই না, তবুও মস্তিষ্ক জুড়ে দখল করে নিয়েছে।
___” ভালোবাসিস?
___” মায়ায় বেঁধে নিয়েছে।
___” কাটাতে পারবি মায়া ?
মিম কথা বলতে পারলো না, তিশা নিজের বালিশে মাথা রেখে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___” তুই তো আরশ ভাই কে ভালোবাসিস, ভাইয়া যদি নিজের ভুল বুঝতে পেয়ে তোর কাছে ক্ষমা চায়, ক্ষমা করে দিতে পারবি ?
মিমের নিলিপ্ত উত্তর,

___” ভালোবাসলেই সব ভুলের ক্ষমা হয় না কিছু কিছু ভুলের শাস্তি পেতে হয়।
তিশা এবার নিজেও চোখ দুটো বন্ধ করে মলিন হেঁসে বলে উঠলো,
___” তোর প্রবলেম টা কী জানিস, তুই আরশ ভাই কে ভালোও বাসিস আবার ঘিন্নাও করিস।
তিশার কথায় মিম ঘুরে শুয়ে পরলো, ঘুম আর চোখে ধরা দিবে না, এভাবেই হয়তো কাটিয়ে দিবে এই রাতটা, শুধু ভোর হওয়ার অপেক্ষা, ছেড়ে যাবে এই শহর এই দেশ, নিজেকে ভালো রাখতে এই শহরের মানুষগুলোর প্রতি মায়া টা কাটিয়ে উঠতে হবে, মিম নিজের সঙ্গে জেদ করছে, সে এই শহর এই মানুষ গুলো থেকে দূরে রাখার জেদ, এই প্রকৃতিকে নিঃশ্বাস আটকে আসে, বাতাসে যে বিষাদের ছোঁয়া লেগে আছে,
হানিফ বাড়ি ফিরে আরশের রুমে এলো, আরশ নিজের ব্যালকনিতে বসে সিগারেট টানছে, সিগারেটের ধোয়াতে হানিফের কাশি উঠে গলো, আরশ হানিফ কে নিজের ব্যালকনিতে দেখে প্রথমে কপাল কুঁচকালো, হানিফ কে কাশি দিতে দেখেও সিগারেট ফেললো না, আপন মনে টানতে লাগলো, সিগারেট টানতে টানতে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,

___” কী চাই ?
হানিফ কাশতে কাশতে আরশের হাত থেকে সিগারেট টান দিয়ে নিয়ে বেলকনি থেকে নিচে ফেলে দিলো, এতে আরশ বিরক্ত মুখে হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ আরশ কে বিরক্ত মুখে তাকাতে দেখে রাগী গলায় বলল,
___” তোর প্রবলেম কী?
আরশ কুঁচকানো কপাল নিয়ে বলে উঠলো, হানিফের কথায় উওর না করে উল্টে কন্ঠে তিক্ততা মিশিয়ে বলল,
___” কই তোমার হবু বউ, তোমার আম্মু তাঁর জেদের কাছে হার মেনে ফিরে এলো ?
আরশের মুখে হবু বউ শুনে হানিফ আরো রেগে গেলো,
___” মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ আরশ, মিম আমার কে হয় তুই খুব ভালো করেই জানিস ?
আরশের কটাক্ষ দৃষ্টি,
___” কে হয় ?
আরশের কথায় হানিফ আরশের থেকে চোখ ফিরিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
___” তোর বউ, আমার ছোট বোন।
হানিফের কথায় আরশ তাচ্ছিল্য হাসলো, হানিফ আরশের হাসির দিকে তাকিয়ে আছে, আরশ পুনরায় তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,

___” সালা নারী এমন একটা চিস, যার সঙ্গে দুদিন কথা বললে অমনি পুরুষ জাত তাঁর প্রতি দুর্বল হয়ে যায় ।
হানিফ কিছু বলল না, আরশ পুনরায় পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট লাগাতে ধরলো, হানিফ এবার সিগারেটের প্যাকেট কেরে নিয়ে নিচে ফেলে দিলো, আরশ বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চ সূচক শব্দ বের করে তাকালো হানিফের দিকে, হানিফ নিজেও বিরক্ত মুখে আরশের দুঘারে হাত রেখে বলতে লাগলো,
___” নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস কেনো ?
আরশ নিজের ঘার থেকে হানিফের হাত সরিয়ে, অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে বলল,
___” আমাকে কী পাগলা কুত্তা কামড় দিয়েছে,যে মেয়ে মানুষের জন্য নিজেকে কষ্ট দিবো।
___” মিম তোর বউ, আর তুই তোর বউকে ভালোবাসিস, নিজের হার স্বীকার করে নে!
আরশ তিক্ততা কন্ঠে বলে উঠলো,

___” আমি জাস্ট প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ওকে বিয়ে করেছি,আমার মনে ওর প্রতি কেনো ফিলিংস নেই।
আরশের কথায় হানিফ তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,
___” তুই মিম কে ভালোবাসিস,অনেক বেশি ভালোবাসিস বাট বুঝতে পারছিস না, তুই মিমের পাশে আমাকে সহ্য করতে পারিস না, তুই আমাকে জেলাস ফিল করিস, নিজের অজান্তে মিম কে ভালোবেসে ফেলছিস, নিজের ভালোবাসা শিকার কর আরশ আর চুপ করে থাকিস না, নয়তো অনেক দেরি করে ফেলবি?
হানিফের কথায় আরশ ক্রোধে চোয়াল শক্ত করে বেলকনিতে ফুলের টপ গুলো রাগের মাথায় ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিতে দিতে তিরতির মেজাজে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ হ্যাঁ ভালোবাসি ওকে, সহ্য করতে পারি না তোমার সঙ্গে ওকে, মিম শুধু আমার ভালোবাসা, মিমের পাশে আমি তোমাকে সহ্য করতে পারি না, আর পারবো না, ও আমার, ও শুধুই আমার।
আরশের কথায় হানিফের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, আরশ কে শান্ত করে বলে উঠলো,
___” থ্যাং গুড অবশেষে স্বীকার করলি, আর দেরি করিস না, দ্রুত মিম কে আটকানোর ব্যবস্থা কর।
আরশ হানিফের কথা বুঝতে না পেয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলো, হানিফ পুনরায় বলে উঠলো,

___” মিমের সকাল আটটায় ফ্লাইট, ওর ফ্লাইট হওয়ার আগে নিজের মনের কথা বলে দে, তোর বউ কে আটকা, আর দেরি করিস না আরশ ফাস্ট ।
আরশ অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠলো,
___” হোয়াট ফ্লাইট মানে ?
___” হ্যাঁ ফ্লাইট, মিম আমেরিকা চলে যাচ্ছে, তোর থেকে অনেক দূরে।
হানিফের কথায় মনে পড়ে গেলো কলেজে মিমের হাতে ফাইল টার কথা, মিম বারবার ফাইল টা দেখছিলো, তারমানে ওই ফাইলে , আরশ আর ভাবতে পারলো না,
___” ওহ্ শিট
আরশ হানিফের বুকে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে হানিফ কে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দৌড়ে রুমে এলো, বেডসাইড থেকে বাইকের চাবি নিয়ে বাড়ির পোশাকে বাড়ি থেকে দৌড়ে বের হতে হতে বিরবির করলো

___” ও আমার ওয়াইফ, আমার পারমিশন ছাড়া এক পা নড়তে পারবে না, সেই রাইট ওর নেই।
আরশ বাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, হানিফ আরশ কে যেতে দেখে নিজেও বাবা-মা কে বলে বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে তালুকদার বাড়ির রাস্তায় যেতে লাগলো, আরশ ২৫ মিনিটের রাস্তা তেরো মিনিটে এলো তালুকদার বাড়ির সামনে, চারপাশ অন্ধকার নিরিবিরি রাত প্রায় তিনটার কাছাকাছি, তালুকদার বাড়ির চারপাশে আর গার্ডেনে লাইট জ্বলছে, মেইন গেট ভিতর থেকে বন্ধ, আরশ তালুকদার বাড়ির সামনে বাইক দাঁড় করাই, বাইক থেকে নেমে মিম কে ফোন দিতে লাগলো, তিশা কয়েক মিনিট আগে ঘুমের দেশে পারি জমিয়েছে, মিম শুয়ে থাকতে ভালো লাগলো না, বিছানা থেকে নেমে রুমের ডিম লাইটে নিজের প্রয়োজনীয় কসমেটিস লাগেজ করতে লাগলো, অনেক আগেই লাগেজ করে রেখেছে, মিম আগেই জানতো যেকোনো সময় টিকেট পেয়ে যাবে, বাড়িতে যে সবাই যে যাঁর যাঁর রুমে জেগে আছে এটা বুঝায় যাচ্ছে, কারো চোখে ঘুম নেই, মিম আয়নার সামনে রুমের আবছা আলোতে নিজেকে দেখছে, সবার প্রতি অভিমান জমে গেছে, মায়ের মতো ফুপির প্রতি, বাবার প্রতি, সবচেয়ে অভিমান জমে গেছে নিজের মায়ের প্রতি , বাকি সবাই যা ইচ্ছা ভাবুক সমস্যা নেই মিমের, কিন্তু নিজের মা রুপোলী বেগম, তিনি মেয়ের ভালোথাকা দেখছেন না, মেয়ের সংসার দেখছেন, রুপোলী বেগম যদি এত তাড়াতাড়ি মিমের বিয়ে দিতে না উঠেপড়ে লাগতো, আজকে হয়তো মিমের জীবন টা অন্য রকম থাকতো, আর আজকে সবচেয়ে বেশি নিজের মায়ের সঙ্গ প্রয়োজন সেই মা গ্রাম সমাজ নিয়ে কথা বলছে, মেয়েকে মেনে নিতে বলছে সবকিছু, মিম আয়না তে নিজের চেহারার দিকে চেয়ে কথাগুলো ভেবে চোখের পানি বিসর্জন দিতে লাগলো, হটাৎই নিস্তব্ধ ঘরটা ফোন বাজার শব্দে ঝংকার তুলে উঠলো, তিশা কাঁচা ঘুমের ডিস্টার্ব হওয়ায় ঘুমের মধ্যে নাকমুখ কুচকে বলল,

___” এতো রাতে কোন ব্যাক্কল ফোন দিয়েছে দুরু ভালো লাগে না।
তিশা নড়াচড়া করে পুনরায় ঘুমিয়ে পরলো, মিম চোখে পানি নিয়ে বিছানার দিকে একপলক চেয়ে ডান হাতে চোখের পানি মুছে বিছানায় কাছে এলো, এত রাতে কে ফোন করেছে দেখতে, ফোনের স্কিনে শহরের পন্ডিত মশাই নামটা দেখে খানিকটা অবাক হলো, হাত ঠোঁট কাঁপছে, ফোন রিসিভ করবে নাকি করবে না, এক মনে বলছে ফোন রিসিভ করতে অন্য মন বলছে না, আর তো কয়েক ঘন্টা তাহলে চিরতরে আলেদা হয়ে যাবি, কয়েক ঘন্টার জন্য দুর্বলতা দেখাস না, আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কী, শুধু শুধু পিছুটান আর দু-টানা, মিমের ভাবনার মধ্যে ফোনটা কেটে গেলো, দু সেকেন্ডের মাথায় পুনরায় ফোন এলো, মিম এবারও ফোনের দিকে চেয়ে আছে, তিশা ফোনের আওয়াজে বিরক্ত মুখে মাথা তুলে মিম কে বলল,

___” বোন প্লিজ ফোন টা তুলে আমাকে উদ্ধার কর, মাএ ঘুমাইছি।
কথাটা বলে চোখ বন্ধ করে পুনরায় বালিশে মাথা এলিয়ে দিলো, মিম তিশার কথায় তিশা কে একপলক দেখে ফোন নিয়ে বেলকনিতে এলো, দ্বিতীয় বার ফোন কেটে গিয়ে তৃতীয়বার বাজতেই মিম চোখমুখ শক্ত করে ফোন রিসিভ করে বলল,
___” কী সমস্যা এত রাতে ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করছেন কেনো ?
মিমের কথায় আরশ কয়েক সেকেন্ড নীরবতা পালন করলো, মিম পুনরায় হ্যালো বলে উঠলো, আরশ এবার ফোনের ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___” গেইট খুলে দেও।
আরশের কথায় মিম অবাক হয়ে বলল,

___” গেইট খুলবো মানে ?
আরশ মিমের কথায় মুখ থেকে চ সূচক শব্দ করে বলল,
___” কানে কী কম শুনো, গেইট খুলে দিতে বলছি।
মিম আগের ন্যায় বিরক্তিকর কন্ঠে বলে উঠলো,
___” ঘুমের মধ্যে আবোল তাবোল বকা বন্ধ করে ঘুমান আল্লাহ হাফেজ।
___” একদম ফোন কাটবি না, আমি তালুকদার বাড়ির গেটের কথা বলছি, ফাস্ট গেইট খুলে দে নয়তো সবার ঘুম হারাম করবো।
আরশের কথায় মিম বেলকনি থেকে গেটের দিকে তাকালো, আরশ গেটের বাহিরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কানে ফোন গুজে আরেক হাত কোমরে রেখে কথা বলছে, এতরাতে আরশ কে একদম আশা করেনি, মিম চোখমুখ গম্ভীর করে বলে উঠলো,

___” এ-তো রাতে নাটক করা বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যান আপনার জন্য বেটার হবে।
আরশ মিমের বেলকনির দিকে তাকালো, মিম কে ব্যালকনিতে দাঁড়ে থাকতে দেখে, আরশ অসহায় মুখে বলে উঠলো,
___” প্লিজ মিম একবার গেইট টা খুলে দেও, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
___” এতো রাতে কেনো এসেছেন?
আরশ বেলকনির দিকে চেয়ে নিলিপ্ত উত্তর দিলো,
___” তোমাকে নিজের করে নিতে প্লিজ বউ গেইট টা খুলে দেও।
আরশের আবদারে মিমের বুক কেঁপে উঠলো, মিম নিজের মধ্যে আরশের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করলো, মেয়েদের এই এক সমস্যা, স্বামী যতই খারাপ হোক না কেনো, স্বামীর দুটো মিষ্টি কথাতেই গলে যায়, মিম তো আরশের সঙ্গে সংসার পর্যন্ত করেনি, তারপরও স্বামীর প্রতি দুর্বলতা হয়ে গেছে, এটাই হয়তো পবিত্র বন্ধনের শক্তি, মিম কিছু না বলে হুট করে ফোন কেটে দিলো, ফোন বন্ধ করে রুমে ঢুকে বেলকনির দরজা শব্দ করে আটকে দিলো, চোখমুখ শুকিয়ে গেছে, গলা শুকিয়ে কাট হয়ে গেছে, দুহাত দিয়ে গাল গলা বুলাতে লাগলো, বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছ, দরজা শব্দ করে দেওয়াতে তিশা ঘুম থেকে দ্রুত বিছানায় বসে পরলো, মিম কে ছটফট করতে দেখে দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে নেমে মিমের সামনে এসে বলল,

___” কী হয়েছে মিম, তুই এমন ছটফট করছিস কেনো , তোর শরীর খারাপ লাগছে ?
মিম ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা হাতে তিশার হাত জরিয়ে ধরে শুকনো গলায় অসহায় কন্ঠে বলতে লাগলো,
___” আমি দুর্বল হতে চাই না, আমি ওকে আমার জন্য ছটফট করতে দেখতে চাই, আমি দুর্বল হতে চাই না তিশা, প্লিজ আমাকে সামলা, আমার মন আমার কথা শুনছে না, ওর কথা আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছে প্লিজ তিশা আমাকে সামলা!
তিশা মিম কে জরিয়ে ধরে বলে উঠলো,

___” শান্ত হ মিম, কী হয়েছে আমাকে বল, পানি পানি খা নে।
তিশা বেড সাইট থেকে পানির জগ থেকে পানি গ্লাসে ঢেলে মিম কে দিলো, মিম কাঁপা কাঁপা হাতে পানি খেতে লাগলো, অর্ধেক পানি পড়ে বুক ভিজে গেলো , তিশা বুঝতে পারছে না মিমের হটাৎ ছটফটের কারণ, তখনই বাড়ির বাহিরে থেকে বাইকের হর্নের আওয়াজ শুনা গেলো, মিম ফোন কেটে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরশ পুনরায় মিম কে ফোন লাগায়, মিমের ফোন বন্ধ পেয়ে রাগের মাথায় পা দিয়ে বাইকে শট মারে, নিজের পায়ে ব্যাথা পেলো, সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে রাগের মাথায় বাইকের হর্ন বাজাতে লাগলো অনগর, তালুকদার বাড়িতে সবাই জেগে আছে, হটাৎ বাড়ির বাহিরে অনগর বাইকের হর্নের আওয়াজ রুম থেকে সবাই বের হয়ে এলো, ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াতেই সবাই সবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে, রাত প্রায় সাড়ে তিনটা নাগাদ, আইরা আনাস আরাত থেকে শুরু করে আহিন পর্যন্ত নিচে নেমে এসেছে, শুধু তাকবীর তিশা আর মিম বাদে, তিশা নিচে নামতে ধরলে মিম তিশা কে নিজের কাছে থেকে আসতে দেয় না, তাকবীর আরাত কে বের হতে দিলেও নিজে বের হয়নি, বাড়িতে যা ইচ্ছা হয়ে যাক তাঁর এসবে কেনো ইন্টারেস্ট নেই, আহাদ তালুকদার আনাস কে সদর দরজা খুলতে বলল,আনাস সদর দরজা খুলে দিতেই একে একে সবাই বাড়ির বাহিরে বের হয়ে এলো, গার্ডেনে এসে দাঁড়াতেই আরশ কে গেইটের সামনে অনগর বাইকের হর্ন বাজাতে দেখে আহাদ তালুকদার ধমকে উঠলেন,

___” এত রাতে এসব কি ধরনের অভদ্রতা ?
আরশ বাইকের হর্ন বাজানো বন্ধ করে বলল,
___” আপনাদের মেয়ের সঙ্গে আমি কথা বলবো, ওকে বের হয়ে আসতে বলেন।
সবার মুখে এক প্রকার বিরক্ত ছেয়ে গেলো, আদনান তালুকদার পুনরায় মেন গেট খুলতে বলল,আনাস মেন গেট খুলে পকেটে হাত গুঁজে সাইটে দাড়িয়ে রইলো, আরশ রাস্তা থেকে গার্ডেন প্রবেশ করলো, এতক্ষণে রাহিমা সুলতানা আর আলভী বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে, আহাদ তালুকদার বিরক্ত গলায় বললেন,
___” এত রাতে মিম কে তোমার কী প্রয়োজন ?
আরশ স্বাভাবিক ভাবে উওর করলো,

___”রাতে বেলা বউকে কেনো প্রয়োজন পড়ে জানেন না?
আরশের বেয়াদবিতে রুপোলী বেগম রেগে গেলেন, আনাস আরশের কথায় নিজের হাসি আটকে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো, আহাদ তালুকদার ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, আদনান তালুকদার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
___” এসো বাড়ির ভিতরে বসে কথা বলো।
আদনান তালুকদার কথাটা বলে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, একে একে সবাই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে, রাতের অন্ধকার বাড়িটা লাইটে ঝকমক করে উঠছে, রুপোলী বেগম আরশ কে তীক্ষ দৃষ্টিতে দেখছে,আরশ রুপালী বেগমের চাহনি অগ্রহ করে একনজর মিমের বেলকিনের দিকে চেয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, রাহিমা সুলতানা বুঝলেন না আরশের আসার কারণ তিনিও তালুকদার বাড়িতে আসলেন, আরশ বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই মিমের বাবা বলে উঠলো,

___” কী কথা বলবে বলো ?
আরশ মিমের বাবা কে বলে উঠলো,
___” আপনার মেয়ে কে ডাকে দেন, আমি আমার বউয়ের সঙ্গে কথা বলবো।
রুপোলী বেগম আরশের কথায় তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো,
___” তোমার বউ আছে ?
আরশ রুপোলী বেগমের দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলো, রুপোলী বেগম আরশের তাকানো তে পুনরায় জানতে চাইলো, আরশ সোফাতে বসতে বসতে বলল,
___” হ্যাঁ আপনার মেয়ে আমার বউ, আপনার মেয়ে কে বলেন জলদি নিচে নামতে।
রাবেয়া তালুকদার রুপোলী বেগম কে আর কিছু বলতে না দিয়ে আরশ কে বলল,
___” তুমি যাও মিমের রুমে, আহিন আরশ কে মিমের রুম দেখিয়ে দেও।
আহিন মায়ের কথায় সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো, আরশ একনজর সবাই কে পর্যবেক্ষণ করে সোফা থেকে উঠে আহিনের পিছনে পিছনে চলে গেলো, আরশ যেতেই আদিবা তালুকদার বলে উঠলো,

___” ভাবী মিম কে ডাকে নিচে কথা বললে ভালো হতো না ?
রাবেয়া তালুকদার আরাত আইরা কে দেখে বললো,
___” যাও তোমার তোমাদের রুমে যাও।
রাবেয়া তালুকদারের কথায় আরাত আইরা নিজেদের রুমে চলে গেলো, রাবেয়া তালুকদার এবার বললেন,
___” দুজন আলেদা কথা বলা প্রয়োজন, আমাদের হাতে কিছুই নেই অপেক্ষা করা ছাড়া।
আহিন মিমের দরজার সামনে এসে মিম কে ডাকতে লাগলো,
___” মিম আপু, দরজা খুলো আরশ ভাইয়া এসেছে!
আরশ আহিন কে যেতে ইশারা করলো, আহিন মিমের রুমের সামনে থেকে চলে গেলো, আরশ গলা খাঁকারি দিয়ে দরজা নক করতে করতে ডাকতে লাগলো,

___” মিম দরজাটা খুলো।
রুমের ভিতর থেকে কেনো সাড়াশব্দ এলো না, আরশের ডাকে তিশা মিম কে বলল,
___” একবার কথা বলে দেখ কী বলে?
মিম চিন্তা মুখে তিশার দিকে তাকালো, তিশা এবার মিমের হাত ধরে বলে উঠলো,
___” দেখ আমি বলবো না, তুই আরশ ভাইয়ার সঙ্গে এক হয়ে যা, এটা একান্তই তোর ডিসিশন, আমি জাস্ট বলবো একবার কথা বলে দেখ, তুই সামনাসামনি না হলে সবাই ভাববে তুই আরশ ভাইয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে গেছিস, নিজের দুর্বলতা আড়াল কর আর নিজেকে এমন ভাবে তৈরি কর, যেন সামনের মানুষ টা তোকে দুর্বল মনে করে আঘাত করতে না পারে।
মিম তিশার কথায় মাথা নাড়ালো, তিশা দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,

___” আমি বাহিরেই থাকবো, নার্ভাস হোস না, দরজা খুলে দিলাম।
তিশা দরজা খুলে দিলো, আরশ তিশা কে দরজা খুলতে দেখে সাইটে দাঁড়ালো, তিশা রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আরশ ধীর পায়ে রুমে ঢুকে মিম কে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুনরায় দরজা লাগিয়ে দেয়, দরজা লাগাতে দেখে মিম বলে উঠলো,

___” দরজা লাগাচ্ছেন কেনো,খুলাই রাখেন দরজা!
আরশ মিমের কথা অগ্রহ করে, মিমের সামনে এসে দাঁড়ালো, মিম নিজেকে শক্ত করে রেখেছে, আরশ মিমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে মিম কে দেখতে লাগলো, মিম আরশের চাহনি দেখে দ্রুত পায়ে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে দরজা খুলতে যাবে আরশ মিমের হাত ধরে এক ঝটকায় নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে দুহাত কোমরে রাখলো, মিম আরশের বুক থেকে ছাড়া পাওয়া সঙ্গে মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো, আরশ এবার কেনো ভনিতা ছাড়াই শীতল কন্ঠে বলে উঠলো,

___” আই এম সরি।
মিম নিজেকে শক্ত রেখে বলল, বলে উঠলো,
___” দেখেন আমাকে ছেড়ে দেন, ভালো হচ্ছে না বলে দিলাম, আমার থেকে দূরে থাকেন।
আরশ মিমের কথা কর্ণপাত না করে পুনরায় বলে উঠলো,
___” আমাকে একটা সুযোগ দেও প্লিজ, আমি দুনিয়ায় বেস্ট হাসবেন্ড হয়ে দেখিয়ে দিবো,প্লিজ থেকে যাও।
আরশের আবেগগত কন্ঠে মিম চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___” আপনি আমার কে হ্যাঁ?
মিমের কথায় আরশ উল্টে প্রশ্ন করলো

___”আমি তোমার কেউ হই না?
মিম আরশ কে নিজের থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলল,
___” না আপনি আমার কেউ হয় না, কেউ না।
___” মিম…..
মিম দরজার দিকে হাতের ইশারা করে বলে উঠলো
___” প্লিজ চলে যায় এখান থেকে।
আরশ মিমের ন্যায় বলে উঠলো,
___” তুমিও চলো তাহলে যাবো।
মিম অবিশ্বাস্য চোখে আরশ কে দেখছে, বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো
___” কেনো ঝামেলা করছেন, অনেক তো হলো আর কিভাবে আমাকে কষ্ট দিবেন, এখন আমাকে মুক্তি দেন প্লিজ।
আরশ পুনরায় মিমের কাছে এসে বলল,
___” আগেও বলছি এখনো বলছি, আমার থেকে তোমার মুক্তি কখনো মিলবে না।
মিম আরশের চোখে চোখ রেখে বলল,
___” ভালোবাসেন?
আরশ কিছু পলক চুপ করে থাকলো, আরশ কে কিছু বলতে না দেখে মিম তাচ্ছিল্য হাসলো,আরশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলে উঠলো
___” ভালোবাসা মুখে না প্রকাশে বুঝে নিতে হয়।
মিম আগের ন্যায় বলে উঠলো,

___” কিন্তু আপনার প্রকাশে তো শুধু আমি নোংরামি ছাড়া কিছুই বুঝতে পারি না, একটা মেয়েকে কিভাবে সবার সামনে মিথ্যা কলঙ্কিত করতে হয়, এটা আপনি খুব ভালো করে জানেন, আমি বুঝলাম না আপনি এখানে এসেছেন কেনো, না মানে আপনি তো আমার মতো মেয়েকে কখনো ভালোবাসবেন না, ভালোবেসে তো আসেন নি নিশ্চয়ই, ভালোবেসে ফেলেছেন নাকি?
মিমের মুখে এরূপ কথা শুনে আরশ নিস্তব্ধ মুখে মিম কে দেখতে লাগলো, মিম হাতে হাত ভাজ করে পুনরায় বলে উঠলো,

___” আমি তো লোভী চরিত্রহীন আমি তো সুন্দরীও না, আমার মতো মেয়ে কে আর যা-ই করা যাক ভালোবাসা তো আর যায় না।
আরশ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজে নিয়ে অসহায় কন্ঠে বলে উঠলো,
___” মিম আই এম সরি….
আরশ কে কিছু বলতে না দিয়ে মিম পুনরায় বলে উঠলো,
___” আমার সম্পর্ক ঝুলিয়ে রাখা পছন্দ না, না কিছু জোর করে নিজের করে নেওয়া পছন্দ, সবসময় চেষ্টা করি কারো জীবনের বিরক্ত কারণ না হয়ে যাওয়ার।
আরশ পুনরায় মিম কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
___” তুমি আমার বিরক্ত হওয়ার কারণ না, তুমি আমার প্রশান্তি।
মিম আর নিজেকে সামলাতে পারলো না, আগের ন্যায় কান্না করতে করতে আরশ কে নিজের থেকে সারিয়ে বলল,
___” কেনো বারবার আপনার বুকে আমাকে টেনে নেন, আমি আর দুর্বল হতে চাইনা আপনার উপর, আপনি কেনো বুঝতে পারছেন না আমি আর এসব নিতে পারছি না, আমি কেনো পিছুটান রাখতে চাই না আপনি কেনো এসেছেন, আমাকে আমার মতো ছেড়ে দেয় প্লিজ আমি আজাদী হতে চাই, আপনি আমার জীবন টা কেনো ধ্বংস করে দিলেন, কী লাভ হলো আপনার, আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি, কেনো মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছেন আমাকে, আমাকে বাঁচতে দেন, আপনি যবে থেকে আমার লাইফে এসেছেন, আমার প্রত্যেকটা দিন কান্না করে কাটিয়ে দিতে হয়েছে, আমার কী শান্তি নেই, আপনার আশা তো পূরণ হয়েছে, এখন অন্তত মুক্তি দেন, প্লিজ বের হয়ে যায়।
আরশ নিস্তব্ধ হয়ে শুনলো মিমের অভিযোগ, নিজের প্রতি ঘিন্না কাজ করছে, মিমের কথাগুলো বুকে এসে লাগছে, ঢোক গিলে ছোট করে বলল,

___” আমি এতটা নিচু তোমার কাছে?
মিম কথা বলল না, শুধু মুখ ফুরিয়ে নিলো, আরশ মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
___” যাওয়ার আগে তোমার কাছে শুধু একটা কথা জানতে চাই, তুমি কী কখনো এক সেকেন্ডের জন্যও ভালো বেসেছিলে আমাকে?
আরশের কথায় মিম অন্য দিকে মুখ ঘুরে হিসহিসিয়ে বলল,
___” আপনার মতো ছেলে কে কখনো ভালোবাসা যায় না, আপনার আম্মু আমাকে মুক্ত করে দিয়েছে,আমি আপনাকে মন থেকে মুক্ত করে দিয়েছি, আপনি শুধু কাগজে আছেন যা আমি খুব শীঘ্রই মুক্ত করবো, আশা রাখবো আমাদের আর দেখা হবে না আল্লাহ হাফেজ।

মিম আরশের দিকে ফিরে তাকালো না, ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো, আরশ কিছুপলক ওয়াশরুমের দরজার দিকে চেয়ে থাকলো, নিজের প্রতি রাগ লাগছে, মিমের প্রতি অন্যায়গুলো একে একে মনে পড়ছে, মিম মুখ ফিরিয়ে নিলো, এটা মানতে পারছে না আরশ, এত অন্যায় করার পড়ে জোর খাতিরে কিছু বলতে পারছে না, নিজের অধিকার দেখাতে বিবেক বাঁধা দিচ্ছে, আরশ ফাঁকা চোখে এলোমেলো পা ফেলে বন্ধ দরজা খুলে নিজের ভাবনা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, এতক্ষণে ফরজের আজান পড়ে গেছে চারপাশ,মিম ওয়াশরুমে ঢুকে কান্না করতে করতে এখন শুধু হেঁচকি তুলছে, তিশা আরশ কে চুপচাপ বের হয়ে যেতে দেখে দ্রুত পায়ে রুমে ঢুকলো, মিম কে ওয়াশরুমের বাহিরে থেকে ডেকে উঠলো,

___” মিম ঠিক আসিস ?
মিম তিশার ডাকে চোখমুখে পানি ছিটা দিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো, তিশা মিমের মুখের দিকে চেয়ে বলল,
___” এখনো সময় আছে ভেবে দেখ।
মিম তিশার কথা অগ্রহ করে বলল,
___” চল দুজন মিলে নামাজ আদায় করবো।
তিশা কিছুক্ষণ মিম কে দেখে আর কিছু বললো না ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো ওজু করতে, আরশ তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরপর হানিফ তালুকদার বাড়িতে উপস্থিত হলো, ড্রয়িং রুমে সবাই বসে মিমের নিচে নামার অপেক্ষা করছে, চারদিকে আলো ফুটে বের হয়েছে, মিমের সকাল আটটায় ফ্লাইট, সাড়ে সাতটার আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে, ড্রয়িং রুমে সবাই কে দেখা গেলেও রুপোলী বেগম কে দেখা গেলো না, হানিফ তালুকদার বাড়িতে প্রবেশ করতেই সবাই হানিফ কে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে, হানিফ আবার কেনো এসেছে, হানিফ নিজের দিকে সবাই কে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাথা নিচু করে নিলো, আদিবা তালুকদার হানিফ কে বলে উঠলো,

___” মিমের সঙ্গে কথা বলবে ?
হানিফ মিমের কথা শুনে নাকচ করে বলে উঠলো,
___” না আন্টি আরশ এসেছিলো এখানে?
আদিবা তালুকদার মলিন মুখে বলল,
___” এসেছিলো প্রায় আধঘন্টা আগে বেরিয়ে গেছে।
আদিবা তালুকদারের কথায় হানিফ পুনরায় মিমের কথা জিজ্ঞেস করলো,
___” মিম কই আন্টি ?
___” উপরে।
হানিফ বুঝলো আরশ একা একা ফিরে গেছে, দুজনেন হয়তো কথা হয়েছে, হানিফ পুনরায় বলল,
___” মিমের ফ্লাইট ক্যানসেল করেছে?
তখনই আনাস রেডি হয়ে নিচে নামলো, হানিফের কথা শুনে আনাস বলল,
___” না, আটটায় ফ্লাইট।

হানিফ আর কিছু বলল না, মুখটা মলিন হয়ে এলো, ভেবেছিলো আরশ সবকিছু মানিয়ে নিছে কিন্তু হানিফের ধারনা ভুল, আনাস আদিবা তালুকদার কে বললো মিম কে বের হতে, আদিবা তালুকদার গম্ভীর মুখে উপরে গেলো মিম কে ডেকে আনতে, রাবেয়া তালুকদার হানিফ কে বসতে বললো, হানিফ বসলো না সাইটে দাড়িয়ে থাকলো, কয়েক সেকেন্ড পরে মিম তিশা আরাত আইরা কে দেখা গেলো নিচে নামতে, মিমের লাগেজ আগেই গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েছে, মিম নিচে নেমে একনজর হানিফ কে দেখে সবার সঙ্গে একে একে বিদায় নিলো, যদিও কেউ হাসি মুখে বিদায় দিলো না, মিম রুপালী বেগম কে খুঁজলো কিন্তু আশেপাশে না পেয়ে নিজের বাবা-র দিকে তাকালো, মিমের বাবা মিমের সামনে এসে বলল,

___” দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে, দরজা খুলবে না তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে যাও তুমি।
মিম নিজের বাবার মুখময়ে হতাশা খুঁজে পেলো, পুনরায় গেস্ট রুমের কাছে এসে রুপোলী বেগম কে ডাক দিলো,
___” আম্মু আমি চলে যাচ্ছি, শেষ দেখা দিবে না?
রুপোলী বেগমের কথা শুনা গেলো না, শুধু কান্নার আওয়াজ এলো,মিম নিজেও কান্না করে বলল,
___” আম্মু একবার শুধু তোমাকে দেখবো প্লিজ দরজাটা খুলে দেও।
না রুপোলী বেগম দরজা খুলে দিলো না, না বের হয়ে মিম কে বিদায় দিলো, আনাস তাড়া দিতে লাগলো, আদিবা তালুকদার আরাত তিশা আইরা সবার চোখে পানি, মিম নিজেও কান্না করছে, রাবেয়া তালুকদার বললেন,
___” দরজা খুলবে না, যাও তুমি লেট হয়ে যাচ্ছে।
আনাস আগেই বাড়ির বাহিরে চলে গেছে, তাকবীর বাড়িতে আসে জন্য আরাত মিমের সঙ্গে গেলো না, মিম কে এয়ারপোর্টে রাখতে সঙ্গে যাবে তিশা আরাত আনাস, আর তাঁদের সঙ্গে হানিফ যাবে, তাকবীর নিচে নেমে এলো, মিম গেস্ট রুমের দরজা থেকে সরে এসে তাকবীরের সামনে দাঁড়ালো, তাকবীর গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, মিম কান্নারত কন্ঠে বলল,

___” ধন্যবাদ ভাইয়া এতকিছুর জন্য।
তাকবীর গম্ভীর মুখে ছোট করে বলল,
___” ইটস ওকে, হেল্প লাগলে বলবে।
মিম মাথা নামিয়ে জ্বি বলে, পুনরায় সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো, তালুকদার বাড়িতে মনে হচ্ছে কেউ মা-রা গেছে কান্নার ঢেউ বয়ে যাচ্ছে, একদিনের ব্যবধানে পুরো বাড়ি এলোমেলো হয়ে গেছে, গাড়ির কাছে এসে বিপত্তি বেজে যায় হানিফ যাবে, হানিফের গাড়ি ফাঁকা যাবে, আদনান তালুকদার বললেন, আইরা আনাস এক গাড়িতে যাবে আর মিম হানিফ তিশা এক গাড়িতে যাবে, ফিরার সময় তিশা আনাস দের গাড়িতে ফিরবে, কথা মতো মিম তিশা হানিফের গাড়িতে গেলো, মিম সামনের ছিটে বসেছে, তিশা পিছনের ছিটে, মিম মনে হাজারো কষ্ট নিয়ে বাহিরের প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত, হানিফ খানিকক্ষণ পরপর আঁড়চোখে মিম কে দেখছে, বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর মিম বাহিরে চোখ রেখে হানিফ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

___” টাইম নষ্ট করার প্রয়োজন ছিলো না আপনার, আমরা আনাস ভাইয়ার গাড়িতে যেতে পারতাম।
হানিফ গাড়ি চলাতে চালাতে বলল,
___” আপনি আমাদের বাড়ির বউ, আমার দায়িত্ব আপনাকে ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছে দেওয়া।
বউ নামটা শুনে মিম মলিন হেঁসে হানিফের দিকে তাকালো,
___” শুধু তো নামের ছিলাম ?
হানিফ সামনে চোখ রেখেই বলল,
___” আপনার আর আমার ছোট ভাইয়ের ডিভোর্স এখনো হয়নি, সেই হিসাবে আপনি আমাদের দায়িত্ব, যেদিন ডিভোর্স হবে সেদিন থেকে আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন।
মিম পুনরায় মলিন হেঁসে বলল,
___” ধন্যবাদ অনেক হেল্প করেছেন।
মিমের কথায় হানিফ বিরবির করে বলল,
___” তাঁর প্রতিদান পেয়ে গেছি।
মিম বুঝতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল,
___” কিছু বললেন ?
হানিফ সামনে চোখ রেখেই বলল,
___” না।

তিশা পিছনে থেকে দুজনের কথোপকথন শুনছে চুপচাপ, গাড়ি এসে থামলো এয়ারপোর্টের সামনে, তিশা আগেই গাড়ি থেকে নেমে পরলো, হানিফ মলিন মুখে বলল,
___” দূরে যাওয়া টা কী খুব প্রয়োজন ছিলো?
মিম গাড়ি থেকে নামতে নিতেই হানিফের কথায় পিছনে ফিরে তাকালো, হানিফের চোখ সামনের দিকে, মিম মলিন হেঁসে বলল,
___” আপনার ভাই তো জোর করলো না একটি বারও।
মিম গাড়ি থেকে নেমে পরলো, হানিফ মিমের যাওয়া দিকে তাকিয়ে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে নিজেও গাড়ি থেকে নেমে পরলো, তিশা গাড়ি থেকে নামতেই দেখলো আইরা গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় বসে বমি করছে, আর আনাস আইরার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, তিশা আইরার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,

___” আপু তোমার খারাপ লাগছে ?
আনাস একনজর তিশা কে দেখে আইরা কে পানি খাওয়াতে লাগলো, আইরা পানি খেয়ে তিশার দিকে চেয়ে বলল,
___” সবসময় বাইকে চলাফেরা করে অভ্যাস হয়ে গেছে, গাড়িতে কেমন একটা গন্ধ লাগছে হটাৎ।
আনাস আইরা কে বলল,
___” গাড়ি তে রেস্ট নে, তোকে ভিতরে যেতে হবে না,কিছুক্ষণ রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবি।

আইরা আনাস এর কথায় নাকচ করে আইরা এয়ারপোর্টের ভিতরে প্রবেশ করে, ভিতরে মিম কে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার পর মিম চুপচাপ সবাই কে দেখছে, মনের মধ্যে হাজারো কষ্ট, রুপোলী বেগম দেখা করলো না, মায়ের উপর অভিমান, মিম কেমন অন্যমনস্ক হয়ে সামনে হাঁটছে, কথা বের হচ্ছে না বুক ফেটে কান্না গুলো দলাচাপা হয়ে বের হয়ে আসতে চাইছে, মিম এয়ারপোর্টের মধ্যে ঢুকে চোখ ভরা পানি নিয়ে পিছন ফিরে তাকালো, তিশার দিকে তাকাতেই দেখছে তিশা নিজের কান্না আটকে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে, মিম আর ফিরে তাকালো না, মিম ভিতরে প্রবেশ করা মাএ হানিফের ফোনে ফোন এলো, হানিফ পকেট থেকে ফোন বের করে ফোনের স্কিনে আরশের নাম্বার দেখে দ্রুত ফোন রিসিভ করে, ফোনের ওপাশ থেকে অচেনা মানুষের কন্ঠে হানিফের ফোন কান থেকে মাটিতে পড়ে যায়, হটাৎ হানিফের এমন রিঅ্যাকশনে আনাস আইরা তিশা চোখে পানি নিয়ে হানিফের দিকে তাকায়, আনাস হানিফের কাছে এসে ফোনটা মাটি থেকে তুলে বলল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৭

___” ব্রো ওহাটস দ্যা প্রবলেম ?
হানিফ এয়ারপোর্টের ভিতরে দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,
___” আরশ এক্সিডেন্ট করছে, আমাকে যেতে হবে।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৯

2 COMMENTS

Comments are closed.