তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৫
জান্নাতি আক্তার জারা
__” তোদের দুজন কে নিয়ে আমি আর পারছি না, একজন সবসময় তাঁর এটিটিড নিয়ে থাকবে, আরেক জন হচ্ছেন আপনি, যেটা করতে বারন করবো ওটাই করে অসুখ বাঁধিয়ে বিছানায় পড়ে থাকবে, ওয়াও ক্যা নসিব হ্যায় মেরা।
___” তোর ডক্টর কে দেখছি না?
পার্থর দূর্বল হয়ে আসা কন্ঠে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথায়, পার্থর কপালে জলপট্রি দেওয়া মিমের হাত থেমে গেলো, মিম এতক্ষণ পার্থর বিছানার পাশে বসে পার্থ কে জলপট্রি দিয়ে দিতে দিতে বিরক্ত কন্ঠে বকবক করছিলো, পার্থর চোখদুটো বন্ধ, মুখ জ্বরের তাপমাত্রায় শুঁকে ছোট একটা লাগছে, ঠোঁট শুকে আছে, জ্বরের তাপমাত্রা এতটা প্রখর যে পার্থর শরীরের নিচে বিছানা পর্যন্ত গরম লাগছে মিমের কাছে, এক্সিডেন্ট শরীর তো পুরোপুরি ঠিক হয়নি তারউপর, পার্থ মিমের বারণ করা শর্তেও অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃষ্টি তে ভেজা আর সবার সঙ্গে বল খেলছে, ছোট থেকে ইট পাথরে বেড়ে উঠা পার্থ চৌধুরী, হটাৎ বাংলাদেশের খোলামেলা আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে উঠতে পারেনি,মিম এতটুকু তেই পার্থ কে কতশত বকা দিয়ে যাচ্ছে সেই থেকে আর যদি জানতে পারে, পার্থ বিকাল বেলা প্রায় এক ঘন্টা সময় নিয়ে ওয়াশরুমে ঝর্নার নিচে দাঁড়িয়ে ছিলো,তাহলে পার্থর অবস্থা কী করবে মিম, কথাটা ভাবতেই শুকনো ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো পার্থর, মিম কে উত্তর করতে না দেখে চোখ বন্ধ রেখেই জিভ দ্বারা শুঁকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে পুনরায় বলল,
___”একটা কথা বলবি লেডি গুগল ?
মিম পার্থর কপাল থেকে ভেজা নরম কাপড় সরিয়ে, পানির বাটিতে ভেজাতে ভেজাতে উত্তর করলো,
___” হুম বল, কী কথা ?
নিস্তেজ শরীরে শুঁকনো ঢোক গিলে বলল,
___” যদি কখনো আমাদের দুজনের মধ্যে থেকে, যেকোনো একজন কে বেছে নিতে হয়, তুই কাকে বেছে নিবি, আরশ কে নাকি আমাকে?
মিমের চলন্ত হাত থেমে গেলো, মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো, মুখে কিছুটা অস্বস্তি ফুটে উঠলো, এভাবে তো কখনো ভেবে দেখেনি মিম, তাঁর থেকে বড় কথা এমন প্রশ্ন আসছে কেনো, পার্থর কৌতূহলী চোখ মিমের দিকে উওরের আশায়, মিম নিজে নিজে মনের কৌতূহল মিটিয়ে মুখে হাসি টেনে বলল,
___” আমার জীবনে তোর আর আরশের জায়গা সম্পূর্ণ ভিন্ন, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, আর আরশ সে আমার…
___” কে হয় তোর ?
মিম থেমে গেলো, সত্যি তো কে হয় , শুধু মাএ ভালোবাসা, এর বাহিরে আর তো কোনো সম্পর্ক নেই তাঁদের, ভালোবাসা তো কোনো সম্পর্কে ভিত্তি হতে পারে না, ভালো তো সবাই বাসে, কেউ গোপনে কেউ প্রকাশে তো কেউ একপক্ষীক, এই সম্পর্ক নাম কী, আসলে তাঁদের আর সম্পর্ক আধোও আছে, কোনো উওর নেই মিমের কাছে, মিম হুট করে বাটি হাতে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো, রুমের বাহিরে পা বাড়িয়ে দরজার কাছে এসে পিছু না ফিরে মলিন মুখে বলল,
___” তুই আরশের মতো একদমই না।
মিম রুম থেকে বের হয়ে গেলো, পার্থর কৌতুহলি চোখ আগেই দমে গেছে,জ্বরে থরথর করে কাঁপছে বুক, সত্যি কী জ্বরের জন্য কাপছিলো,তাঁর পাশাপাশি তো বুকটা যন্ত্রণায় পুড়ে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল, চোখ দুটো জ্বলে উঠলো নিমেষেই, সিলিং এর দিকে চেয়ে ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি ঝুলিয়ে বিরবির করলো,
___” হুমমম, এটা তো আমি জানতাম, ইশ আমি যেমনি হই তুই যদি আমাকে সেভাবেই পছন্দ করতি।
রাত প্রায় দশটার কাছাকাছি, পার্থর জ্বর টা পুনরায় ঘুরে এসেছে, আটটা পর্যন্ত সবাই পার্থর রুমেই ছিলো, জ্বর টা এতটা তিব্র, পার্থ কে হাসপাতাল নিতে হতো, আরশ সেই বিকালে নিজের বাসায় চলে গেছে, ইচ্ছা ছিলো আজকে আর গ্রামে ফিরবে না, কিন্তু সাড়ে আটটার নাগাদ রুপালী বেগম আরশ কে ফোন করে জরুরি তলবে গ্রামে ফিরতে বলেন, পার্থর শরীরের কন্ডিশন ভালো না, ফিরার সময় মেডিসিন নিয়ে ফিরতে, আরশ বাধ্য হয়ে রাতেই গ্রামে ফিরে, যদিও আরশের সঙ্গে আরো একজন ফিরেছে, আরশের কাজিন নূরফিহা, সে তাঁর ভাবি, অর্থাৎ তিশা দের বাড়িতে, আরশ প্রথমে তাঁকে তিশাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়েছে, এক হাতে মেডিসিনের প্যাকেট অন্য হাতে বাইকের চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো,এত রাত হয়েছে তবুও সদর দরজা খুলে রেখেছে, আরশ আসবে বলে, আরশ নিজেই সদর দরজা ভিতর থেকে নক করে দিয়ে দ্বিতীয় তালায় তাকালো, রাত গভীর হওয়ায় ড্রয়িং রুমে কাউকে চোখে পরলো না, শুধু রুপোলী বেগম রান্নাঘরে খাবার গরম করছেন, আরশ রান্নাঘরের সামনে এসে হাতের প্যাকেট টা রুপোলী বেগমের সামনে রেখে বলল,
___” আন্টি তোমার ছেলের মেডিসিন।
আরশের মুখে তোমার ছেলে শুনে রুপোলী বেগম ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
___” আমার ছেলে?
___” হ্যাঁ ছেলে, যাঁর জন্য এত রাতে গ্রামে ফিরতে বলছো আমাকে, তা-ই বললাম, নতুন ছেলে পেড়ে গেছো কি-না।
রুপোলী বেগম আরশের অভিমান দেখে হেঁসে উঠলেন, হাসি মুখে ভেজা হাত আঁচলে মুছতে মুছতে আরশের সামনে এসে দাঁড়ালো, অদুরে হাত মাথায় রেখে বলল,
___” দেখো ছেলের পাগলামি, এই সাত বছরে তোমার আন্টি কে এই চিনো, ওই পার্থ ছেলেটা অনেক বেশিই অসুস্থ হয়ে গেছে, আমার ছেলে ডাক্তার কি-না, এজন্য তাঁকে জরুরি তলব পাঠিয়েছি, মানুষের সেবা তাঁর কাজ, পাগলা ছেলে তোমার জায়গা অন্য কেউ নিতে পারবে না।
রুপালী বেগম এই প্রথম হয়তো আরশের মুখে মুচকি হাসি দেখলেন, আরশ মুচকি হেঁসে বলল,
___” প্রমিস।
রুপোলী বেগম নিজেও হাসলেন,
___” হ্যাঁ রে বাবা প্রমিস, এবার উপরে যা, দেখ ছেলেটা এখন কেমন আছে, সন্ধ্যা থেকে আমরা সবাই ভয় পেয়ে ছিলাম ছেলেটার জন্য, তাই তো তোকে ফোন করা, তুই উপরে যা আমি খাবার নিয়ে আসছি।
দূর থেকে কেউ তাঁদের দুজনের কথাকথন লক্ষ করলে, ভেবেই নিবে মা-ছেলে, আরশ রান্না ঘর থেকে বের হয়ে পার্থর রুমের দিকে পা বাড়ালো, রুপালী বেগম পিছনে থেকে আরশ কে লক্ষ করলেন, আরশ এখন কিছুটা হলেও নিজের গম্ভীর্য থেকে ফিরে এসেছে, সবার সঙ্গে কথা বলা আর মিশে থাকা, এসবই রুপোলী বেগম লক্ষ করছেন আরশের মধ্যে, যা মিম আমেরিকা চলে যাওয়ার পর রুপোলী বেগম আরশের ভিতরে কখনো দেখেনি, আরশ পার্থর রুমে প্রবেশ করতেই মিম কে দেখে জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, মিম কে এত রাতে এখানে আশা করেনি, মিম সন্ধ্যার মতো পার্থর কপালে জলপট্রি দিয়ে দিচ্ছে,
___” তুমি এখানে?
মিম আরশের কন্ঠে শুনে পিছু ফিরে বলল,
___”হ্যাঁ আমি।
আরশ রুমের ভিতরে ঢুকে বলল,
___”এত রাতে এই রুমে কী চাই?
___”ডাফার অসুস্থ তো।
মিম বলতে নিয়ে থেমে গেলো, পরমহুর্তে মুখে দুষ্টু হাসি বজায় রেখে বলল,
___” উঁহু আপনাকে বলতে যাবো কেনো ?
___”কারণ আমি ডক্টর।
আরশের সোজাসাপটা উত্তরে মিম মুখ বাঁকা করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলল,
___” ও হ্যালো ডক্টর বাবু এটা আপনার হাসপাতাল না, এটা আমার বাড়ি, সো আমি কোথায় থাকবো না থাকবো এটা আপনার না জানলেও চলবে।
___”শুনে মেয়ে, তোমার বাড়ি, সে তুমি যেখানে ইচ্ছা সেখানে থাকতে পারো নো প্রবলেম, বাট আমার পেসেন্টের রুমে একা এক মেয়ে কী করছে, আমাকে জানতে হবে, এক মিনিট এক মিনিট বাই এনি চান্স আমার নাম খারাপ করার জন্য,আমার পেসেন্টের খাবারে কিছু মিশাতে আসোনি তো?
মিমের মুখ হা হয়ে গেলো, রুপোলী বেগম তো এখনো পার্থর খাবার দিয়ে যায় নি, আর সে কি-না আরশের নাম খারাপ করার জন্য পার্থর খাবারে কিছু মিশাবে, এত বড় মিথ্যা অপবাদ, মিম রাগী কন্ঠে বলল,
___” ওভাররিয়্যাক্ট করা বন্ধ করেন, ডাফার আপনার পেসেন্ট হওয়ার আগে আমার ফ্রেন্ড, ওর খাবারে আমি কেনোই বা কিছু মিশাতে যাবো?
___” সে তুমি মেশাতেই পারো, আফটার অল আমি তোমার শত্রু, তেমার ভাগের ভালোবাসা আমি নিয়ে ফেলছি, সো আমার নাম খারাপ করতেই পারো।
আরশ পার্থর কপালে হাত ঠেকে কথা গুলো বলছে, মিম আরশের পিছনে রাগী মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এখনি আরশ কে কাঁচা খিলে ফেলবে, আরশ মিমের চাহনি অগ্রহ করে বলল,
___” ডোন্ট ডিস্টার্ব মি, দরজা ওদিকে ৷
মিম দাঁত খিঁচে রাগী স্বরে বলল,
___” আমি আপনা কে ঘিন্না করি ঘিন্না।
আরশ পার্থ কে দেখতে দেখতে বলল,
___” শেষ হয়েছে তোমার বকবক?
___” না।
মিমের না কথায় আরশ পিছু ফিরে তাকালো, মিমের দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
___” ও গট……. “হুম কন্টিনিউ।
মিম হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে বলল,
___” ফ্রিতে একটা সাজেশন দেই শুনেন।
আরশ হুম হা কিছুই বলল না, মিম আরশ কে কিছুক্ষণ পরক করে নিজের মনে বলতে লাগলো,
___”আপনি এখনো পুরোপুরি ডাক্তার হয়ে উঠতে পারেন নি।
আরশ ভ্রু কুঁচকে তাকালো, ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলো ,
___”মানে?
মিম হালকা হেসে একনজর ঘুমন্ত পার্থ কে দেখে নিয়ে আরশের দিকে এক পা এগিয়ে এলো, কন্ঠ টা কিছুটা খাদে নামিয়ে বলল,
___”ডাক্তার-রা তো মানুষের অসুখ ধরতে পারেন তাই না?
আরশ এখনো চুপ,মিম কী করতে আর বলতে চাইছে সেটাই দেখছে আরশ, মিম চোখ সরু করে সরাসরি আরশের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো ,
___” আপনি তো ডক্টর, তাহলে নিজের অসুখ ধরতে পারছেন না কেনো?
আরশ ভ্রু কুঁচকে বুঝার চেষ্টা করছে মিমের কথা,মিম আরশ কে ভাবতে দেখে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে পুনরায় বলল,
___” হার্টে যে সমস্যা, সেটা কি এখনো রিপোর্টে আসেনি?
আরশ মিমের কথায় হাসফাস করতে লাগলো, বুকটা সত্যি ধুকপুক করছে, আটকে রাখা অবৈধ চাওয়া গুলো তিরতির করে বেড়ে উঠতে লাগলো, মিম যেন আরো সুযোগ পেলো, আরশের খুব নিকটে এসে আরশের বুকের বা পাশে হাত রাখতেই মিমও কিছুটা ঘাবড়ে গেলো, আরশ কে বুঝতে না দিয়ে পুনরায় বলল,
___” এই হার্টবিটটা একজনের জন্য বাড়ে, অথচ আপনি অন্য কারো জন্য প্রেসক্রিপশন লিখেন, কিন্তু আপনি ডক্টর হয়ে নিজের অসুখটার নাম জানেন না।
আরশ বারবার শুঁকনো ঠোঁট জিভ দ্বারা ভিজিয়ে নিতে লাগলো, মিম বাঁকা হেঁসে আরশের চোখে চোখ রেখে বলল,
___”আপনার অসুখের নাম কী জানেন?
আরশ ঢোক গিলল, মিমের এত কাছে আসা আরশ নিতে পারলো না, অস্বস্তিতে পড়ে গেলো, মেয়েটা কেনো বুঝতে পারছে না তাঁর এত কাছে আসা সামনের পুরুষ টা কে কতটা বেসামাল করে তুলছে, এই মেয়ে কি জানে না তাঁদের সম্পর্কে কথা, এই মেয়ে কি বুঝতে পারে না, তাঁর জন্য সামনের পুরুষের মনে কী চলে, মিম পা দুটো উঁচু করে আরশের কানের কাছে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে উঠলো,
___” ভালোবাসা।
___” ঠাসসসস।
আরশ আর নিতে পারলো না, নিজের অবৈধ চাওয়া থেকে বাঁচতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে উম্মাদে পরিনত হয়ে সামনের মেয়েটাকে আঘাত করে বসলো, মিম গালে হাত দিয়ে ছলছল দৃষ্টিতে তাকালো আরশের পানে,আরশের চোখ মুখ শক্ত,হাত মুষ্টিবদ্ধ, চোখদুটো বন্ধ, হয়তো নিজের রাগ বৃথা কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে সে, মিম কম্পিত গলায় ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো অস্ফুট স্বরে অভিযোগ ছুড়ে দিলো,
___” জানেন আমি আপনার থেকে কেনো দূরে গেয়েছিলাম, কারণ আপনি কখনো আমাকে বুঝার চেষ্টা করেন নি, আপনি আমার ঝগড়া রাগ আর জেদ দেখছেন শুধু, আপনি কখনো আমার জেদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভিমান দেখেন নি, আপনি কখনো ঝগড়ার আড়ালে আমার কষ্ট গুলো দেখতে পায় নি, কখনো রাগের আড়ালে আমার ভালোবাসা খুঁজে দেখেন নি, আমি অনেক চেষ্টা করেছি আপনার সামনে পুরো আমি টাকে খুলে দেওয়ার, কিন্তু আপনি কখনো আমাকে পড়তে চাননি, আপনি আমার জন্য পাগলামি করছিলেন না, সেদিন বলছিলেন না আপনি আমাকে ভালোবাসেন, আজকে আমি আপনাকে বলছি, আমরা কখনো এক হবো না, কখনো না, আপনি আমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না, আই জাস্ট হেইট ইউ, আই জাস্ট.. হেইট ইউউউ, আমি আপনার মুখ দেখতে চাই না,কখনো না।
মিম কান্না করতে করতে এক হাতে আরশ কে ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আরশ অসহায় মুখে ছলছল চোখে মিমের যাওয়ার পানে চেয়ে আছে, রাগের মাথায় কী করে বসেছে মাথায় আসতেই আরশ বাইকের চাবি নিয়ে পার্থর রুম থেকে ভারী কদমে হনহন করে বেরিয়ে গেলো, আরশ রুম থেকে বের হয়ে যেতেই পার্থর বন্ধচোখ খুলে গেলো, এতক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চোখ বন্ধ করে ছিলো, অনেক আগেই তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায়, মিমের সব কথায় পার্থর কানে পড়েছে, দুর্বল হাত কপালে ঠেকিয়ে হতাশা কন্ঠে অস্ফুট স্বরে বলল,
___” আমরা মৃত্যু মানুষের অভাব বুঝি, কিন্তু জীবিত মানুষের আর্তনাদ বুঝিনা,আমরা এতটা স্বার্থপর কেনো মাবুদ?
নাটক বন্ধ কর লেডি গুগল,
হোয়াট
এ-সব আরশ কে জেলাস ফিল করানোর জন্য করছিস না?
ডাফার
তুই এ-সবে খুব জিনিয়াস তাই-না, কারো মন ভেঙ্গে তুই কী পাবি
এসব কী বলছিস পার্থ,
আমার কথা তোর খারাপ লাগবে আই ডোন্ট নো বাট এটাই সত্যি, তোরা মেয়েরা এমন কাজ করিস কেনো, যদি কাউকে পছন্দ নাই-বা করিস মানুষ কে মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করে দেখাস বা কেনো
রুপোলী বেগম খাবার প্লেট সাজিয়ে পার্থর রুমের দিকে যেতে নিতেই মিম কে চোখে পানি নিয়ে ফিরতে দেখে জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, মিম রুপোলী বেগম দেখেও কিছু বলল না, পাশ কেটে নিজের রুমে চলে গেলো, মিম যাওয়ার পরপর আরশ কে আসতে দেখা গেলো পার্থর রুম থেকে, রুপোলী বেগম কুতূহলী কন্ঠে কিছু বলতে নিবে তাঁর আগেই আরশও সেম ভাবে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, রুপোলী বেগম কে চিন্তিত দেখা গেলো, আরশ এতো রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, কোথাও যাবে কে জানে, মেযেটাও তো কান্না করতে করতে কিছুই না বলে রুমে চলে গেলো, রুপোলী বেগম আর দেরি করলেন না, খাবার প্লেট নিয়ে পার্থর রুমে প্রবেশ করলো,
সকাল আটটা, আহিন গলার দুপাশে গামছা ঝুলিয়ে ব্রাশ করতে করতে রুম থেকে বের হয়ে এলো, উঠানে টিউবওয়েলে মুখ ধুবে বলে, টিউবওয়েলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করতে করতে দু-হাত মেলে শরীর চাঁড়া দিয়ে উঠলো,
___” এটা আবার কেডা এন্ট্রি নিলো রে বাবা।
আহিনের উচ্চ স্বরে বলা কথায় নূরফিহা কপাল কুঁচকে পিছু ফিরে তাকালো,এতক্ষণ নূরফিহা মিমের ফুলবাগানে বড় জবা ফুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে, একটা জবা ফুল কানের পিঠে গুঁজে একটার পর একটা পিক উঠাচ্ছিল, চৌদ্দ বছরের কিশোরী সে, পড়নে তার হালকা সাদ রঙের সুতি ফ্রক, যার ঘেরটা হাঁটার সাথে সাথে নরম করে দুলে উঠছিল,চুলগুলো খোলা, কাঁধ ছুঁয়ে নিচে নেমে এসেছে, মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে এলোমেলো হয়ে গালে লেগে যাচ্ছে, পায়ে সাদামাটা স্যান্ডেল, তবুও তার ভঙ্গিমায় একটা শিশুসুলভ নির্ভার আনন্দ লেগে আছে,মুখভরা হাসি নিয়ে কখনো ফুলের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো ফোনটা একটু উঁচু করে ধরে নতুন অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলছিলো, হটাৎ কারো কন্ঠে শুনে পিছু ফিরে তাকালো, আহিন কে ব্রাশ হাতে নিয়ে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে নূরফিহা ভাবতে লাগলো, কোথায় দেখেছিলো ছেলেটা কে, মনে পড়ছে না, শুধু মনে হচ্ছে কোথায় তো একে দেখেছি,
___” নূরফিহা চলে আয় আম্মু খেতে ডাকছে।
নূরফিহার ভাবনার মধ্যে তিশার ডাক পরলো,
___” আসতেছি ভাবি।
নূরফিহা আহিন কে একনজর দেখে তিশার ডাকে চলে গেলো, আহিন দুহাত মাথার নিচে দিয়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
___” এহহ এই ছেমড়ি, এর এত দেমাক, ছোট থাকতে একে তো বোকাবোকা লাগতো, বড় হয়ে একদম কড়া হয়ে গেছে দেখছি, গুড খারাপ না।
কাঠফাটা তপ্ত দুপুরে রোদের তেজে যেন চারপাশটা নেতিয়ে পড়েছে, প্রতিটা বাড়ির উঠানে ছড়িয়ে আছে কড়া, ঝলসানো রোদ, বাড়ির পাশের আমগাছ আর কাঁঠালগাছের ছায়ায় কয়েকজন মানুষ গোল হয়ে বসে গল্পে মশগুল, কোথাও বাচ্চারা খালি পায়ে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে, আবার গ্রামের বউ-ঝিরা এক কোণে বসে কাঁচা আমে লবণ-মরিচ মেখে টক-মিষ্টি স্বাদে মেতে উঠেছে, কেউ বা জমির পুড়ে যাওয়া রোদ থেকে বাঁচতে গাছের ছায়ায় এসে হাঁফ ছেড়ে বিশ্রাম নিতে বসেছে, পুরো গ্রামজুড়ে এক অদ্ভুত শান্তি কোথাও নেই কোনো গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ, শুধু দূরে কোথাও পাখির ডাক আর মাঝেমধ্যে বাতাসে পাতার মৃদু নড়াচড়া, খানিকক্ষণ পরপর ভেসে আরছে গরু ছাগলের ডাক, যেন নিরব নির্জন দুপুরের মধ্যে সেগুলোই একমাত্র শব্দ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে, আরাত রুমে এসে দেখলো তাকবীর পুরো রুমজুড়ে ব্যস্ত হাতে কিছু একটা খুঁজে চলছে, আরাত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
___”কী চাই আপনার, আমাকে বলেন?
তাকবীর খোঁজাখুঁজি থামাল, পিছনে ফিরে আরাত কে দেখে হালকা হেসে, পুনরায় খুঁজতে খুঁজতে ঠান্ডা গলায় বলল,
___”চাই তো তোমাকেই, কিন্তু আপাতত একটা
ফাইল খুঁজতেছি।
তাকবীরের কথায় আরাত থমকে গেল, গাল দুটো লাল হয়ে উঠল বোধহয়, মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠল,
___”ইশ, কী নির্লজ্জ কথা লোকটার।
মুখে সেটা প্রকাশ করল না, উল্টো নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় জানতে চাইলো,
___”ফাইলটা কোথায় রেখেছিলেন?
তাকবীর আরাতের চোখের কোণে লুকানো অস্বস্তিটা ঠিকই বুঝে ফেললো, বউকে সামান্য কথায় লজ্জায় ফেলতে ভালোই লাগে তাঁর, তাকবীর মুচকি হেঁসে বলল,
___” বেডসাইডের উপর রেখেছিলাম।
___” সরুন।
তাকবীর এক সাইটে দাঁড়ালো, আরাত আলমারি থেকে ফাইল বের করে তাকবীর কে দিতে দিতে বলল,
___” আমি তুলে রেখেছিলাম, ফাইল দিয়ে কী করবেন?
তাকবীর আরাতের হাত থেকে ফাইল টা নিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
___” আদিল এসে নিয়ে যাবে অফিসে মিটিং আছে ।
___” কিন্তু আপনাদের অফিস তো কিছুদিনের জন্য বন্ধ রেখেছিলেন ?
তাকবীর আরাতের দুই কাঁদে হাত রেখে বলল,
___” জ্বি না ম্যাম, বন্ধ ছিলো আজকে থেকে ওপেন করা হয়েছে, এন্ড আমরা সবাই আগামীকাল বাড়ি ফিরে যাবো।
___” এত জলদি, বাবা বড়আব্বু কত আনন্দ করছে দেখছেন, ব্যস্ত শহরের কোলাহল পেরিয়ে গ্রামের আবহাওয়া কতটা শান্তির, আর কিছুদিন থাকি না সবাই মিলে ?
তাকবীর আরাতের কথায় একটু সময় নিয়ে বলল,
___” ওকে ফাইন।
সময় টা বিকাল, রুপোলী বেগম চিন্তিত মুখে বারবার আরশ কে ফোন লাগাচ্ছে, পাশেই বসে আসে রাবেয়া তালুকদার, রাবেয়া তালুকদার বললেন,
___” ছেলেটা হয়তো তাঁর বাড়িতে, নয়তো হাসপাতালে রুপালী, হাসপাতালে কেনো ইমার্জেন্সি থাকতে পারে, একটু পড়ে দিও ফোন?
রুপালী বেগম রাবেয়া তালুকদার এর দিকে তাকালো, উনি উনার মনে মধ্যে কী হচ্ছে বুঝাতে পারছেন না, একেই মিম আর সকাল থেকে দরজা খুলে নি, তারউপর আরশ ফোন উঠাচ্ছে না, রুপোলী বেগম একটু ইতস্ত করে বললেন,
___” ভাবী আমি মা হয়ে আর এসব নিতে পারছি না, আমার মেয়েটা প্রচন্ড জেদি, ভেবেছিলাম আমি অভিমান করে আছি, ও আমার অভিমান ভাঙবে, তখন ওর কাছে আবদার করবো, বাংলাদেশে থেকে যেতে, কিন্তু তাঁর আগেই।
একটু সময় নিয়ে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” যানি না ঘরের ভিতর ওদের দুজনের মধ্যে কী হয়েছে, যাঁর জন্য মিম চলে যেতে চাইছে, আমি তো শুধু আমার মেয়েটা কে হাসিখুশি দেখতে চাই ভাবী, আমার ভুল হয়েছে আরশ কে এই বাড়িতে থাকতে দেওয়া, আমার বুঝা উচিত ছিল, ওদের সম্পর্কের কথা, আমি যদি আরশ কে কিছুদিনের জন্য গ্রামে আসতে বারণ করতাম, তাহলে হয়তো আমার মেয়েটা আরো কিছুদিন আমার আশেপাশে থাকতো।
রাবেয়া তালুকদার রুপোলী বেগম কে শান্তনা দিতে লাগলেন,
___” থাক রুপোলী চিন্তা করো না, মিম যেকোনো কারণে রেগে আছে হয়তো, রাগ মিটে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে, আর আমরা সবাই আছি না, সবাই মিলে তোমার মেয়ে কে আটকাবো, দেখবো এবার আমাদের ফেলে যায় কিভাবে হু।
রুপোলী বেগম রাবেয়া তালুকদার এর কথায় মলিন হাসলেন,উনি উনার মেয়ে কে খুব ভালো করেই চেনে, মিম কারো কথা শুনার মেয়ে না, মন যা চাইবে তাই করবে, যে মেয়ে বাবা-মা কে ফেলে সাত বছর দূরে থাকতে পারে, তাঁকে অন্তত সম্পর্কের জালে আটকে রাখা যাবে না, এদিকে আরশ টাও ফোন উঠাচ্ছে না, তাঁদের কথাকথনের মধ্যে আদিবা তালুকদার এবং আনহা শেখ দুজন এসে তাঁদের পাশে বসলো, আনহা শেখ বলে উঠলেন,
___” এভাবে হবে না ভাবী, আমরা বরং রাতে সবাই মিলে বসি, আরশ মিমের ডিভোর্স টাও ঝুলানো, ডিভোর্স পেপারে মিমের সাইন থাকলেও আরশের নেই, এসব নিয়ে বসা হবে, মিমের সঙ্গে তো পার্থ ছেলে টা এসেছে, আমরা যতই ওঁদের দুজন কে ফ্রেন্ড মানি, ওদের মনে কী চলছে, সবকিছু আমাদের জানতে হবে।
আনহা শেখের কথায় আদিবা তালুকদার সহমত পোষণ করলেন, এভাবেই আরশ মিম কে নিয়ে কথা চলতেই থাকলো, কিছুক্ষণ পর রুপোলী বেগমের ফোন বেজে উঠলো, ফোনটা আরশের, রুপোলী বেগম ফোন রিসিভ করে কিছুটা রাগী গলায় বললেন,
___” কই তুই ?
রুপোলী বেগমের কথায় আনহা শেখ রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার, তিনজনই একিউপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন,তাঁদের কাছে মনে হচ্ছে রুপোলী বেগম নিজের ছেলের সঙ্গে কথা বলছে, গ্রামের মায়েরা যেমন ছেলেমেয়ে কে তুই করে সম্বোধন করে, ফোনের ওপাশ থেকে আরশ কী বলল শুনা গেলো না, তবে আরশের কথার বিপরীত রুপালী বেগম বললেন,
___” আমার মেয়ে কে কী বলেছিস, যাঁর জন্য মেয়েটা দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, সকাল থেকে খাবার পর্যন্ত মুখে তুলে নি।
ফোনের ওপাশ থেকে আরশের কথা ভেসে এলো,
___” আন্টি তোমার মেয়েকে রেডি হতে বলো, তোমার আদরের মেয়ে কে বাঁদর থেকে সোজা করে বউ বানিয়ে ফিরবো।
কল কেটে গেলো, আদিবা রাবেয়া আনহা, তিনজন রুপোলী বেগমের দিকে প্রশ্নভরা চাহনি তে তাকালো, রুপালী বেগম ফোন হাতে নিয়ে তাঁদের কে বলল,
___” কী সব বলল,বুঝলাম না, মিম কে রেডি হতে বলল, বলে বিয়ে করে ফিরবো না-কি।
আদিবা তালুকদার ছোট ভাইয়ের বউয়ের উপর খানিকটা বিরক্ত হলো, ছেলেটা কী বললো সেটাও ঠিকভাবে বলতে পারছে না, আনহা শেখ বললেন,
___” যা হবে দেখা যাবে, বড় ভাবী, আপনি বরং বড় ভাইকে বলেন আজকে রাতে সবাই কে নিয়ে বসতে।
কেটে গেছে পুরো বিকাল, না মিম রুম থেকে বের হয়েছে, না পার্থর কেনো খবর নিয়েছে, না কিছু নিজে মুখে তুলেছে, কান্না করে চোখমুখের বেহাল অবস্থা করে ফেলছে, ডিসিশন ফাইনাল, আগামীকাল মিম চলে যাবে, লাগেজ গুছানো শেষ, শুধু কোনোমত রাতটা কেটে ভোর হওয়ার পালা, ফিরবে না আর বাংলাদেশে, আম্মু আব্বু কেউ লাগবে না, তাড়া তো আদরে আহ্লাদে একখান ছেলে পেয়ে গেছে, মিমের অভিমান যখন আকাশ ছোঁয়ায়, তখন অসুস্থ পার্থ দুর্বল শরীরে খাবার নিয়ে মিমের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো, পার্থ শুনেছে মিম কিছুই মুখে তুলে নি, মিমের দুঃখের সঙ্গী তো সেই ছিলো, প্রচণ্ড মাথাব্যথায় চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল, তবুও নিজেকে থামাতে পারলো না পার্থ, কেমন একটা অস্থিরতা তাকে টেনে নিয়ে এলো মিমের দরজার সামনে, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ, যেন প্রতিটা ধ্বনি বলছে, ” তোর লেডি গুগল ভালো নেই, হাতটা ধীরে দরজায় তুললো পার্থ, কিন্তু নক করার আগে এক মুহূর্ত থেমে গেল, কিভাবে মিমের সামনে দাঁড়াবে, আজকে কেমন সংকোচ আর দু-টানা লাগছে, কয়েক সেকেন্ড যাওয়ার পর সংকোচ কাটিয়ে দরজায় নক করল,
___” লেডি গুগল, ওপেন দা ডোর?
পার্থ একে একে দুই থেকে তিনবার নক করার মাথায় মিম হুট করে দরজা খুলে দিয়ে রাগী গলায় বলল,
___” আমি ঠিক আছি, অসুস্থ শরীরে আমার খেয়াল রাখতে হবে না, শুয়ে পর নয়তো লাগেজ রেডি কর আমরা আগামীকাল ফিরবো।
বলেই মিম দরজা আটকে দিতে লাগলো আর পার্থ অন্য হাতে দরজাটা শক্ত করে ধরে রাখলো, মিমের চোখমুখে খানিকটা বিরক্ত ফুটে উঠলো,পার্থ দরজা আটকে শান্ত গলায় বলল,
___” তুই ঠিক আছিস তাই-না ?
মিম সাথে সাথে পাল্টা উত্তর দিল,
___” আমি ঠিক আছি বললাম না, আর কতবার বলবো আমি ঠিক আছি যা এখান থেকে ?
পার্থ মিমের গালের দিকে চেয়ে বলল,
___” ঠিক আছে আমি চলে যাবো, বাট তুই খাবার খাওয়ার পর, জেদ না করে খেয়ে নে।
___” বললাম তো ডাফার আমাকে একা ছাড়।
পার্থ কী মিমের কথা শুনার ছেলে, সে রুমে ঢুকে গেলো, বেডসাইডের উপর খাবারের প্লেট রেখে বিছানায় বসে পরলো, যার অর্থ তুই যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার না খাবি আমি তোর রুম থেকে নড়ছি না,মিম বিরক্ত মুখে কিছুক্ষণ পার্থ কে দেখলো, কয়েক সেকেন্ড যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে ভদ্র মেয়ের মতো খাবারের প্লেট নিয়ে বিছানার উপর বসলো, মিম খাবার খাচ্ছে পার্থ চুপচাপ মিমের রুমজুড়ে চোখ বোলাচ্ছে, ড্রেসিং টেবিলের সামনে মিমের গুছানো লাগেজ দেখে পার্থ বলল,
___” সত্যি তো আমরা ফিরছি?
মিম খেতে খেতে পার্থর দিকে চেয়ে বলল,
___” হ্যাঁ, তোর প্রবলেম থাকলে থেকে যা, আমি আগামীকাল ফিরবো।
পার্থ কপাল কুঁচকে জানতে চাইলো,
___” ফিরা তো মুখের কথা না, আগের টিকিট ক্যানসেল করতে হবে।
___” সেসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, আমি ম্যানেজ করে নিবো।
পার্থ হাতাশায় নিঃশ্বাস ফেললো, মিম খেতে খেতে বলল,
___” জ্বর কমছে ?
___” আগের থেকে বেটার।
___” খেয়েছিস?
পার্থ অভিমানী গলায় বলল,
___” এতক্ষণে মনে পরলো?
মিম আমতা আমতা করে বলল,
___” আচ্ছা ঠিক আছে রাগ করিস না, আমি আম্মু কে খাবার আনতে বলছি ওয়েট।
মিম রুপালী বেগম কে ডাকতে যাবে, তাঁর আগেই পার্থ মিম কে আটকালো,
___” আন্টি কে ডাকতে হবে না, আমি খেয়েছি, আন্টি তোর জন্য খাবার পাঠিয়ে দিলো, আমি জাস্ট বললাম তুই অন্তত ফর্মালিটি পূরণ করতি?
___” পারতাম না রে, তোর কথা মনে পড়ছে এটাই অনেক।
পার্থর মুখ থমথমে হয়ে উঠলো, মিম কথাটা মজা করে বললেও, কথাটা যেন পার্থের বুকে লাগলো, একটা শুঁকনো ঢোক গিলে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল,
___ ” তুই কি সত্যিই একদিন আমাকে পুরোপুরি ভুলে যাবি লেডি গুগল ?
মিম খাওয়া বন্ধ করে চোখ ছোট করে পার্থর দিকে তাকালো, পার্থর চোখের ভাষা আজ ভিন্ন লাগছে মিমের কাছে, এর আগে এমন লাগেনি, হয়তো পার্থ প্রকাশ করেনি বলে, পার্থ পুনরায় অসহায় মুখে জানতে চাইলো,
___” তোর আর আমার গল্প গুলো কী একদিন রুপকথার মতোই হাড়িয়ে যাবে, থেকে যাবে শুধু স্মৃতি গুলো?
মিম এবার তাচ্ছিল্য হেঁসে মলিন মুখে বলতে লাগলো,
___” তুই এভাবে কথা বলছিস কেনো, তোকে আজ ভিন্ন লাগছে, তোর মনে কী চলছে বলতো, বাই এনি চান্স আমাকে ভুলে যাবি না তো হুমম?
মিমের প্রশ্নে পার্থ নিজের হুঁশে ফিরলো, মিমের কথা অগ্রহ করে মুখে হাসি টেনে বলল,
___” কী কী কী, আমি তোকে ভুলে যাবো, ও হ্যালো ম্যাম ভুলে যাওয়ার জন্য, প্রথমে তোকে মনে তো পড়তে হবে।
পার্থর কথায় মিম বা হাতে বালিশ তুলে নিয়ে আরশের দিকে ছুড়ে মেরে বলল,
___” কী বললি তুই, আমাকে তোর মনে পড়ে না?
পার্থ হাসতে হাসতে হালকা করে বালিশটা সরিয়ে দিল, ঠোঁটের কোণে একটা চাপা হাসি ফুটে উঠলেও চোখে সেই আগের গাম্ভীর্যটাই রয়ে গেছে,
___” নাহ, একদম না।
পার্থর কন্ঠটা মিম খেয়াল করলো না হয়তো, যদি খেয়াল করতো তাহলে বুঝতে কতটা যন্ত্রণা মিশে ছিলো কথাটার মধ্যে, মিম নিজের মতে খেতে খেতে বলল,
___” ঠিক আছে, খাবার শেষ করতে দে, তারপর তোকে দেখছি।
পার্থ আর কিছু বলল না, চুপচাপ বসে থাকলো, হটাৎই কেউ একজন পার্থর কলার চেপে ধরাতে পার্থ হকচকিয়ে গিলো, মিম হতবাক দৃষ্টিতে আরশের রাগী মুখ দেখছে, আরশ কে এখানে দুজনের কেউ আশা করেনি, তারউপর আরশ পার্থর কলার চেপে ধরেছে, আরশ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে উম্মাদে পরিনত হয়েছে,
ক্রোধে আতঙ্কে পার্থর কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলতে লাগলো,
___” হাউ ডেয়ার ইউ আমাদের দুজনের মধ্যে আসার সাহস তোকে কে দিয়েছে, মিম শুধুই আমার, ও শুধুমাত্র আমাকেই ভালোবাসে, আমাদের মাঝে তুই কোথায় থেকে এন্ট্রি নিয়েছিস, আমি মিম কে ভালো বাসবো, আমিই ওকে কষ্ট দিবো আমি ওকে বুঝবো, আমিই ওকে বুকে টেনে নিবো, তুই কে, কেন তুই ওর আশেপাশে থাকবি কেনো, আজ তোকে আমি অনেক দূরে সরিয়ে দিবো,অনেক দূরে।
আরশ পার্থ কে একটার পর একটা আঘাত করতে লাগলো, অসুস্থ পার্থ দুর্বল শরীরে নিতে পারছে না, মিম আর ঠিক থাকতে পারলো না, রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করলো আরশের দিকে, কম্পিত চোখমুখে রাগ স্পষ্ট, ক্রোধে চোয়াল শক্ত করে পার্থর থেকে আরশ কে ছাড়াতে ছাড়াতে বললো,
___” ছেড়ে দেন, ছেড়ে দেন বলছি ডাফার কে, দূরে সরে যায়।
আরশ কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে,
___” একদম কাছে আসবেন না, কেনো আমাদের দুজনের মধ্যে আসতেছেন আপনি, কে আপনি, কে হন আপনি আমার, কেনো বারবার আমাদের মধ্যে বাঁধা সৃষ্টি করছেন, দূরে থাকেন আমাদের দুজনের থেকে, আপনি আসলেই পাষাণ, আপনি, আপনি একটা নির্দয়, আপনার মন বলতে কিছুই নেই, ডাফার এর থেকে দূরে থাকবেন, নয়তো আমি ভুলে যাবো আপনি কে, আপনাকে জেলে ঢুকিয়ে দিবো, অসভ্য ছেলে আপনি….
___” মিম…
আরশ মিমের দিকে অসহায় কন্ঠে ডাকে উঠলো, মিম আরশের দিকে তেড়ে এসে কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
___” আমার কথা শেষ হয়নি এখনো, আমি কার পাশে থাকবো, কাকে বিয়ে করবো,কে আমাকে ভালোবাসবে, এসব আমার পার্সোনাল ম্যাটার , এসবের সঙ্গে আপনার কেনো সম্পর্ক নেই, আপনি যান আমার জীবন থেকে, এতবছর পড়ে কেনো আবার আমার জীবনে ফিরে এসেছেননননন কেনোনননন,আমাকে আপনার কোনো খেলনা মনে হয় , যে যখন মন চাইবে আপন করে নিবেন, আর যখন মন চাইবে না তখন দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন?
___” তোমাকে আমার এমন মনে হয়?
আরশের কথায় মিম বিদ্রুপের সুরে হেসে উঠলো, আরশের কথাটা হাস্যকর ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না, সাত বছর আগে যে কারণে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, আজ মিম সবকিছু মেনে নিতে চেয়েছিলো, আরশের মনে ধীরে ধীরে নিজের জায়গাটা ফিরে পেতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রথম দিনই মিম ব্যর্থ, শুধু ব্যর্থ না সেই পুরনো রাগ অভিমান গুলো নতুন করে তরতাজা হয়ে উঠছে, মিম পার্থ হাত ধরে নিজের রুম থেকে বের হতে হতে আরশের উদ্দেশ্য বলল,
___” আপনি একসময় আমার জীবনে ছিলেন এর চেয়েও কষ্টের আর কী-ই বা হতে পারে।
মিম রুম থেকে বের হয়ে গেলো, পার্থের থুতনি থেকে তাজা রক্ত ঝরছে, পার্থ থুতনিতে হাত দিয়ে একনজর আরশ কে দেখে মিমের সঙ্গে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আরশ ছলছল চোখে মিমের যাওয়া দেখলো, এবার নিজের উপর রাগ টা তিরতির কে বেড়ে গেলো, এই হুটহাট বেহুদাই রাগের কারণে আজকে তাদের সম্পর্ক এতদূর, এতবছর মিম কাছে ছিলো না, এই হুটহাট রাগগুলো ছিলো না, মিম যবে থেকে বাংলাদেশে এসেছে, তখন থেকেই আরশ লক্ষ করে, নিজের সেই আগের বাজে স্বাভাব পুনরায় শুরু হয়ে গেছে, আরশ মিমের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,
___” জানো, সবচেয়ে কষ্টের কী, যখন তুমি মন থেকে পুরোটা দিয়ে কাউকে চাও, আর সে কোনোদিনও সেটা বুঝতে পারে না, অথচ সে-ই ছিল তোমার পুরো দুনিয়া।
আরাত চিন্তিত মুখে পুরো ড্রয়িং রুমে পায়চারী করছে, আর বারবার উপরের দিকে তাকাচ্ছে, উপড়ে কী হচ্ছে জানার জন্য, আইরা রুম থেকে বের হচ্ছে না, আইরা রুম থেকে বের হইলেই দুজন মিলে দ্বিতীয় তলায় যাবে, একা একা পাকনামি করে মনের মধ্যে ধকধক করছে, তাইতো আইরা রুম থেকে বের হওয়ার অপেক্ষা করছে, দু’জন একসঙ্গে উপরে যাবে, তাকবীর বাহিরে থেকে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই আরাত কে চিন্তিত অবস্থায় পায়চারী করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___” আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে, তুমি কিছু একটা ঝামেলা তো করেছো, প্লিজ বলবে কী করেছো তুমি?
তাকবীরের কথায় আরাত চমকে উঠে, পিছু ফিরে তাকবীর কে দেখে বুকে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
___” ও আপনি, আমি তো ভয় পেয়ে গেয়েছিলাম।
তাকবীরের সন্দেহ আরো বাড়লো,
___” ভয় পাওয়ার রিজন?
আরাত মুখে হাসি টেনে, তাকবীরের কাছে এসে বলতে লাগলো,
___” কই, কিছু না তো, আপনি ভুল ভাবছেন, বাহিরে থেকে ফিরছেন, নিশ্চয়ই গরম লাগছে, এক মিনিট বসুন আমি আপনার জন্য ঠান্ডা পানি নিয়ে আরছি।
আরাত রান্না ঘরের দিকে যেতে নিলে তাকবীর আরাতের এক হাত ধরে বলে,
___” এই এক মিনিট দাঁড়াও, তুমি মিথ্যা বলছো কেনো, কী লুকাচ্ছো?
আরাত এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
___” আগে বলেন, বকা দিবেন না?
তাকবীর এবার আরাতের দিকে রাগী চোখে তাকালো, আরাত হাসার চেষ্টা করে তাকবীরের হাত থেকে নিজের হাত বের করে বলতে লাগলো,
___” আমি তেমন কিছুই করি নি, জাস্ট আরশের কানে তুলে দিয়েছি, মিম আর পার্থ দুজন রিলেশনশিপে আছে।
___” কীহহহহ, আর ইউ ম্যাড?
আরাত তাকবীরের ধমকে কানে হাত দিয়ে বলল,
___” আপনাকে আমি প্রথমেই বলছি বকবেন না।
___” রাত, তুমি কেনো মিথ্যা বলছো?
আরাত আরো তাকবীর কে বুঝনোর ন্যায় বলে উঠলো,
___” ওঁদের দু’জন কে এক করার জন্য কিছু একটা তো করতে হতো তাই-না?
___” আরে তাই বলে তুমি?
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৪
___” আমি বুঝতে পারেনি, আমার এক মিথ্যায় আরশ এতটা রেগে যাবে, উপর থেকে ওঁদের চেচামেচি ভেসে আরছে, ভাগ্যিস এই সময় বাড়িতে কেউ নেই, সবাই উঠানে, আইরা আপু এরান কে ঘুম নেওয়াতে গিয়েছে, এজন্য আমি একা একা উপরে যাচ্ছি না, চলুন না দেখে আছি, ওরা কী করছে।
তাকবীর হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে আগে আগে সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো, কয়েক সিড়ি উঠতেই দেখলো মিম পার্থ কে ধরে ধরে নিচে নামাচ্ছে, পার্থর থুতনিতে র*ক্ত লেগে আছে, মূলত আরশ ফুরফুরে মনে বাড়িতে ফিরছিলো, মিমের সামনাসামনি হবে বলে, মিমের সঙ্গে সব মানঅভিমান মিটিয়ে নিবে বলে, কিন্তু বাড়িতে প্রবেশ করতেই, আরাত আরশের সামনে পড়ে, এবং মিম আর পার্থর নামে মিথ্যা বলে, যেন আরশ জেলাস ফিল করে, কিন্তু আরশ জেলাস ফিল করার বদলে উল্টো রেগে বড়বড় পা ফেলে মিমের রুমের দিকে চলে যায়,

Akhon abar koto Deri kore diben??🙂