তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২২
নীতি জাহিদ
বুয়েটের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে ও প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ইমরান,নয়ন এবং মিনহাজ ছোট থেকে একই পাড়ায় থাকতো। নিজেদের মাঝে সম্পর্ক টাও তেমন ছিলো। স্কুল,কলেজের গন্ডি পেরিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয় উদ্দেশ্য। প্রকৌশলী মনোভাব ইমরানকে বুয়েটের দিকে বরাবরই টানতো। ঝোঁকের বশে বুয়েটে পরীক্ষা দিয়েছিলো। মিনহাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। মিনহাজের পরামর্শে নয়নও ভর্তি হলো। ক্লাস শেষে সিনিয়র জুনিয়র পাড়ার সকল ভাই-বন্ধুরা আড্ডায় মেতে উঠতো। র্যাগিং এর শিকার হত। একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিনহাজের অনুপ্রেরণায় ইমরান- নয়ন বেছে নেয় স্টুডেন্ট পলিটিক্স। মিনহাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্স করতো বেশ ক বছর ধরে। ইমরান প্রায়ই ওকে সাহায্য করতো। বুয়েট ক্যাম্পাস এবং ঢাবি ক্যাম্পাস প্রায়শই সিম্পল ব্যাপার নিয়ে মারামারি করতো।
ইমরানদের দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে মেয়ে ঘটিত ঘটনায় ঢাবির সাথে বুয়েটের ঝামেলা হয়। প্রকাশ এবং ঢাবির এক মেয়েকে নিয়ে ঝামেলা হয়। প্রকাশ মিনহাজের বয়সের ছিলো। ইমরানের সিনিয়র। সেই ঘটনা খুব সুন্দর ভাবে সমাধান দেয় ইমরান। ইমরান চেয়েছিলো প্রকাশের শাস্তি হোক,কিন্তু মিনহাজের জন্য পারে নি। ঘটনা মিটমাট করে ইমরান। শেষ সুযোগ দেয় প্রকাশকে। সেইবার প্রথম দুই ক্যাম্পাস একসাথে হাত মেলায়। তখন থেকেই ইমরানের রাজনীতিতে অগ্রগতি লক্ষ্যমান। আড়ালে শত্রু ও কম জন্মায় নি। মিনহাজের বিয়ের জন্য মা জোরাজোরি করছিলো। মাইশাকে ছোটবেলা থেকেই মিনহাজের পছন্দ। মা বলাতে আর না করেনি। ধুমধাম করে বিয়ে হয় মাইশা এবং মিনহাজের। বিয়েতে সবাই উপস্থিত ছিলো।
ইমরানের প্রতি মায়ার ছিলো অসম্ভব টান। ইমরান দেখতে সুদর্শন, কোথাও একটা গল্পের আসর বসলে ইমরান সবার আগে গুরুত্ব পেত তার আচরন,সাবলীল এবং গুছানো মনোভাবের জন্য। মানুষ টাই যে এমন ছিলো। গান,কবিতা,গল্প,পড়াশোনা সবকিছুতেই পারদর্শী ছিলো। মিনহাজের অনুরোধে ইমরান মায়াকে বাসায় টিউশন পড়াতো। তখন থেকে ইমরানকে খুশি করার জন্য মায়া রেঁধে খাওয়াতো।প্রথম প্রথম ইমরান না বুঝলেও পরে যখন বুঝতে পারলো তখন বাহানা দিয়ে টিউশনি বন্ধ করে দেয়। তখন ল্যান্ডফোনের যুগ। মায়া প্রতিনিয়ত ইমরানের বাসায় ফোন দিত, সময় পেলেই এটা ওটা নিয়ে চলে যেত। চিঠি লিখত ইমরানকে। মায়ার এসব কিছু থেকে বাঁচতে ইমরান বন্ধুদের সাথে আলাদা বাসায় উঠে গেলো। এছাড়া ক্যাম্পাস থেকে বাসা দূরে ছিলো।
এর মধ্যে মিনহাজ বাচ্চার বাবা হলো। মাইশা অসুস্থ হয়ে পড়ে। অল্প বয়সে মা হওয়াতে অনেক সমস্যা দেখা দেয়।
ইমরানের এক বন্ধুর বোনের বিয়েতে গেলে দেখা হয় পরমাসুন্দরী কাঁকনের সাথে। এই প্রথম ইমরানের মনে হলো ও প্রেমে পড়ে গিয়েছে। ছিপছিপে গড়নের কাঁকনকে সবার মাঝখানে মনে হচ্ছে মায়াবতী নজরকাড়িনী। দেখতে যেমন সুন্দরী ছিলো ঠিক তেমনি তার চলন বলন ও মানান সই। প্রথম দেখাতে কাঁকনের সাথে কথা বলতে চাইলেও ইমরানকে ইনডিরেকটলি প্রত্যাখ্যান করে কাঁকন। কারণ ছিলো ইমরান দেখতে ফর্সা নয়।যদিও কাঁকন পরে বলেছিলো সে ইচ্ছে করে বলেছে কিন্তু সত্যি হলো সেটাই কাকনের মনের কথা ছিলো। পরের দেখাতে কাকনই ইমরানের প্রতি আগ্রহ দেখায়।ইমরান সম্পর্কে ভালো করে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ইমরানের বাবা একজন এমপি। মা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। ইমরানের নিজের যোগ্যতা তো কম নয়। বুয়েটের ছাত্র,রেজাল্ট ভালো। রাজনীতি করে। এক নামে চেনে সবাই। সবই ঠিকঠাক। কাঁকন তখন সিটি কলেজে ইন্টার প্রথম বর্ষে। লেক ছিল কাঁকন আর ইমরানের দেখা করার এক মাত্র মাধ্যম। কাঁকন ছিলো রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে কিন্তু ওর শখ মডেলিং করা। ইমরান সবসময় সাপোর্ট করে এসেছে।
ইমরানের বাবার পরিচিত অনেক প্রডিউসার ছিলো।তাদের সাথে কাঁকনের পরিচয় করিয়ে দেয় ইমরান। কয়েকটা শ্যুটিং করার পর বাসায় ধরা পড়ে যায় । ভয়ে কাঁকন বলে দেয় ইমরান এর কথা। ইমরানকে ডেকে কাঁকনের বাবা অনেক অপমান করে। তখন ইমরান তৃতীয় বর্ষে। ইমরান বাসায় জানালে ইমরানের বাবা অনেক রেগে যায়। ছেলের এই বয়সে তিনি কিছুতেই বিয়ে দিবেন না। বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া তো অনেক দূরের কথা। সেবার ইমরান বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। র*ক্ত গরম, এর মধ্যে রাজনীতিতে নতুন।কখন কি করে বসে ঠিক নেই। প্রায় এক মাস যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিলো বাবা মায়ের সাথে। সেবার বাধ্য হয়ে শাহাদাত সাহেব ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায় কাঁকনের পরিবারে। কাকন তখন ঘরবন্ধি। শুক্রবার করে একদিন প্রস্তাব নিয়ে যায়। একজন এমপি তার মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে এই জিনিস কি করে ফেরায় কাকনের বাবা। তাই দিনক্ষন ঠিক করে বিয়ের জন্য কিন্তু ইমরান নারাজ সে সেদিনই বিয়ে করবে। ও কোনোভাবেই কাঁকনকে হারাতে চায় না।
সেদিনই কাজী ডেকে বিয়ে পরানো হয়।
এতটুকু বলে দম ফেললো সালমা। মোনার মাথা সালমার কোলে থাকাতে জামার কিছুটা অংশ ভেজা অনুভব করলো সালমা। মোনা কাঁদছে।
‘ চাচী এরপর?’
‘এরপর যা হয়েছে তা ইমরান ভাইয়ের জীবনে দুঃখ ডেকে আনে।’
বছর ঘুরতেই কাঁকন প্রেগন্যান্ট হয়। ওর মডেলিং ক্যারিয়ার তখন আকাশচুম্বী। ও অ্যাবোর্শন করতে চাচ্ছিলো। ইমরান কিছুতেই তা দিতে রাজি না। তখন কাঁকনের প্রথম সিনেমার কাজ শুরু হবে। পরে প্রডিউসার কে বলে কাঁকনের জন্য এক বছর পরের সিনেমার ব্যবস্থা করে ইমরান। কাঁকন অনেক বার জন্ম নিরোধক বড়ি খেতে চেয়েছে। ইমরান চোখে চোখে রেখেছে। সেবার ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম ছিলো। কাকনকে দেখে রাখতে গিয়ে নিজে এক্সাম খারাপ দিয়েছে। অনেক গুলো কোর্স ইনকমপ্লিট ছিলো। তাও যেন আফসোস ছিলোনা ইমরানের। সন্তানের মুখের দিকে তাকালে সব কষ্ট চলে যাবে সেই আশায় বুক বাঁধে। নির্বাচনে শাহাদাত সাহেব হেরে যায়।
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২১
কিছুটা মনোমালিন্য নিয়ে ঘরে বসে থাকেন। তার বিরুদ্ধে দূর্নীতির মিথ্যা মামলা সাজানো হয়। ইমরানের ক্যারিয়ারে একটা ভাটা পড়ে। কাঁকনের ডেলিভারি পেইন উঠে সকালে ইমরান তখন এক্সাম হলে। মেসেজ আসাতে ওয়াশরুমে গিয়ে ফোন চেক করে। অর্ধেক পরীক্ষা দিয়ে ছুটে আসে ইমরান। ততক্ষনে ইশতিয়াক কাকনকে ভর্তি করিয়েছে হাসপাতালে। ইমরান দরজার সামনে দাড়াতেই নার্স তার হাতে তুলে দেয় তার একমাত্র সম্পদ ইশানকে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে যে কান্না কেঁদেছিলো পুরো হাসপাতাল দেখেছে। শাহাদাত সাহেব নাতি পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। মিষ্টি বিলি করেছিলো পুরো হাসপাতালে। কেইস ও চলছিলো তখন। সেই মুহুর্তে পুলিশ এসে এরেস্ট করে শাহাদাত সাহেবকে।
