তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৪২
নীতি জাহি
জামায় কাঁদা লেগে আছে। সকাল থেকে ঝমঝমিয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর পেরিয়ে এখন অপরাহ্ন। বাগানে নেমে দেখে শেপার্ড ভিজে ছুপছুপা। ওকে মা ছেলে দুজন মিলে গোসল করিয়ে কোলে নিয়ে বসে আছে। মোনার শরীরে পানি কাঁদায় মিশে আছে ঠিক তেমনি ইশানের ও একই অবস্থা।
‘ মা উপরে যাও তো ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার। আমি শেপার্ড এর কাছে আছি। কতক্ষন ধরে ভিজেছো?’
‘ আর কিছুক্ষন বাবা,একসাথে যাব। চলো শেপার্ডকে নিয়ে যাই অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। এখানে থাকলে আবার কাঁদায় গড়াগড়ি করবে।শেপার্ড বাবা উঠ,গা ঝাড়া দেয়। চল। ‘
মোনার ভাষাও শেপার্ড বুঝে এখন। যতক্ষন ইশান বাসায় থাকে তারা দুজন শেপার্ড আর ইতুকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সময় পেরিয়ে যায়। আজ তিনমাস শেষ হতে চলল ইমরান এখনো নিখোঁজ। সহসা ইশানের ডাকে সম্বিত আসে মোনার,
‘ মা ভেতরে চল, তোমার ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।’
মোনা আর কথা বাড়ায় নি। ইশান এবং শেপার্ডকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়। বাড়িতে ঢুকতেই ইতুকে কোলে নিয়ে একটু আদর করে রুমে যায় ফ্রেশ হতে। ইচ্ছে করছে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিতে কিন্তু গায়ে নোংরা দেখে বাধ্য হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে গলায়, হাতে চেইন, চুড়ি পড়ছিলো। তখনই মনে পড়লো সেদিনের কথা। চোখ দুটো ভিজে এসেছে। বুকের কাঁপুনি আবার বাড়ছে। এই কয়মাস সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে আনা নেওয়া করছে ইশান,মিনহাজ,সোহান। নয়ন ঠিকানা দিয়েছিলো উনার। মাথা যন্ত্রণা বাড়ছে। সেদিন চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় অচেতন হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে আবিষ্কার করে বাড়ির ড্রইং রুমে। সামনে অনেক মানুষ বসা। মিনহাজ বুকে জড়িয়ে বসে আছে মেয়েকে। কালো হুডি পরা লোকটা ও সামনে আছে। চিনতে পেরে মোনা চেঁচিয়ে উঠেছে,
‘ বাবা এই লোকটা আমাকে আটকে রেখেছিলো। উনি এখানে কেনো? আমার ইমরান সাহেবকে এনে দাও। কোথায় আমার ইমরান। নয়ন আংকেল কথা বলো।’
মোনার চিৎকারে ড্রইং রুম কেঁপে উঠছে। মিনহাজ বুঝাচ্ছে মাথায় হাত বুলিয়ে,
‘ আম্মা,উনি তোমাকে কি/ড/ন্যা/প করেনি। উনি তোমার আরেক আংকেল।তোমাকে সেভ করেছে ইমরানের কাছ থেকে তোমার ইনফরমেশন পেয়ে।’
মোনা কিছুটা নিরব হয়ে কায়েস এর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। উনার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘আংকেল আমার ইমরান সাহেবকে কেনো সেভ করলেন না সেদিন। আমার সাথে তো উনি ও ছিলো।’ মোনা মিনহাজের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
‘বাবা জানো আমার ইমরানের পেছনে অনেক গুলা গুলি লেগেছে।আমি দেখেছি। উনি শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত আমাকে আগলে রেখেছে। ও বাবা আমাকে ইমরান সাহেবকে এনে দাও। আমি গুড গার্ল হয়ে যাব। আমার ইমরান চাই। আমি ইমরানের বুকে যাব। ‘
পুরো ড্রইং রুমের সব জিনিস ভাঙতে শুরু করেছে। ওর পাগলামি থামাতে পারছেনা কেউ। ফয়সাল আর কায়েস এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফয়সাল কায়েসকে বলে,
‘ ইমরান এত ভালোবাসা পেয়েছে আমি ভাবতে পারছিনা। মিনহাজ ভাইয়ের মেয়ে ইমরানের স্ত্রী শুনে কিছুটা রাগ হয়েছিলো । কিন্তু এই মেয়েকে দেখার পর মনে হচ্ছে ওরা একজন অন্যজনের অংশ।’
‘ আমার সাধ্য থাকলে ইমরানকে ওর কাছে ফিরিয়ে দিতাম ফয়সাল। আমার চোখে এখনো ভাসছে ইমরানের শেষ অনুরোধ ছিলো কে. আর আমার প্রাণ আমার ছেলে এবং মোনালিসা। দেখে রাখিস ওদের।’
মোনাকে সামলানো যাচ্ছে না। প্যানিক এটাক হয় মোনার। ডাক্তার ডেকে ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছে বাড়ির সবাই। সেই থেকে সপ্তাহে দুদিন ওকে কাউন্সিলিং করে একজন পরিচিত সাইকিয়াট্রিস্ট। মোনা নিজেকে সামলায় ইশানের জন্য। ইমরানের শেষ কথাটা রাখতে হবে। ইমরান ফিরে আসলে কি জবাব দিবে!! মাথা যন্ত্রনা নিয়ে ইশান সহ বেরিয়ে পড়ে সাইকিয়াট্রিস্ট এর উদ্দেশ্যে।
ইশান আর মোনা ফিরে এসে দেখে বাড়িতে অনেক মানুষজন। তার মধ্যে ইমরানের ফ্রেন্ড ফয়সাল,কায়েস ও আছে। কয়েকজন মহিলা আছেন। মিনহাজকে দেখে মোনা এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। ইশান ও এগিয়ে আসে। মোনা এবং ইশানকে হাত দিয়ে ধরে সবার সামনে নিয়ে আসে মিনহাজ। একজন মেয়ে এগিয়ে এসে মোনাকে জড়িয়ে ধরে। মুখের অবয়ব দেখে বয়স মনে হচ্ছে ২৫ বা ২৬।
‘ কেমন আছেন ভাবী?’
‘ জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো।’
‘ আমি কায়েসের স্ত্রী নবনী।’
‘ আমি একটু হসপিটালে গিয়েছিলাম, আপনারা কখন এসেছেন?’
‘ কোনো সমস্যা নেই। এসেছি বেশ কিছুক্ষন। আপনার শরীর কেমন।’
‘ এখন আগের চেয়ে আলহামদুলিল্লাহ ভালো।’
এভাবে বেশ কিছুক্ষন কথা হলো। রাতের ডিনারটা সেরে সবাই চলে গেলো। মোনা বারান্দায় ঝড়ো হাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছে। চক্ষুদ্বয় অন্তরীক্ষ পানে। প্রকৃতি ঝড় থেমে যায় কিন্তু মনের ঝড় সেতো থামার নয়। গায়ে বৃষ্টির পানি লাগতেই নিজেকে সরিয়ে এনে কাচের দরজাটা লাগিয়ে ভেতরে এসে বিছানায় বসে মোনা। ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে ওয়ালপেপার দেওয়া ছবিটির দিকে। কক্সবাজারে তোলা ছবিটি। মোনা আর ইমরান স্পিডবোটে ছিলো। মহেশখালি যাওয়ার সময় তাদের আলোচনা,খুনশুটির মাঝে মিনহাজ তুলেছিলো সেই ছবি। নিজের মনের কতশত কথা আন ইউজড আইডিটিকে মোনা জানায়। প্রতিদিনের মতো আজকের ইমরানের অব্যবহৃত ফেইসবুক আইডিতে অনেক গুলো মেসেজ সেন্ড করেছে। যেখানে লিখা ছিলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি খবর। কিন্তু এই মেসেজ কখনোই সীন হয়না। মনের শান্তি পেতে মোনা কাজটি প্রতিদিন করে। নিত্যদিনের ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা এখানে লিখে পাঠায়। মনে হয় যেন সে ইমরানের সাথে শেয়ার করছে দুঃখ,খুশির মুহুর্ত গুলো। ইমরান দেখুক বা না দেখুক সেতো জানাচ্ছে। কখনো বা ইশানের পড়াশোনা নিয়ে,ইতুর দুষ্টুমি নিয়ে,শেপার্ড এর কান্ডকারখানা। নিজের ক্যাম্পাসের জুনিয়র গুলোর ফ্লার্ট করা সবই জানায়। নিজে নিজেই হাসে আবার কিছুক্ষন পর কেঁদে উঠে। একটা সময় ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবেই কেটে গিয়েছে গত তিনমাস।
সকাল থেকে শরীর টা ম্যাজ ম্যাজ করছে। মিনহাজ মেয়েকে অনবরত ফোন দিয়েছে ওই বাড়ি যাওয়ার জন্য। ওই বাড়িতে মিনহাজের আপন মামাতো বোনের মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছে। মেয়েরা আর্থিক দিক থেকে একটু অস্বচ্ছল কিন্তু পাত্র পক্ষ আলহামদুলিল্লাহ ভালো তাই বিয়েটা মোনাদের বাড়ি থেকেই হচ্ছে। বাড়িতে শুধু ইশান আর মোনা। আইরিন শ্বশুরবাড়ি। ইতুকে নিয়ে তুশি ও গিয়েছে ওর নানাবাড়ি। ইশান ভার্সিটি থেকে এসে মাকে নিয়ে বের হয়েছে। মোনা যাবেনা বলাতে মিনহাজ নাতিকে ফোন দিয়েছে মাকে নিয়ে যেতে। দুজনই বেরিয়ে পড়েছে। গাড়িতে মা ছেলে টুকটাক কথা বলছে।
‘ মা তোমার কি মন খারাপ?’
‘ কেনো বাবা? মন খারাপ মনে হচ্ছে নাকি?’
‘ একটু। শোনো না বিয়ে বাড়ি এভাবে মন খারাপ করোনা। সবাই বলবে ছেলে মাকে ভালো রাখতে পারেনি।’
‘ এত যত্ন পাই কিভাবে তোর হ্যাঁ, মানুষ তো নিজের মায়ের জন্য ও করেনা আর তুই এত কেয়ার কিভাবে করিস সৎ মায়ের জন্য শুনি?’
‘ শোনো, তুমি আমার নিজের মায়ের উর্ধে।আমার বায়োলজিকেল মা যে সে কি করেছে তোমার সবই জানা। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।আমার অবস্থা হয়েছে কেমন বলি ডাস্টবিনে নিজের অপকর্মের জন্য কিছু বাচ্চা নিজের মা ফেলে দেয় না ওই রকম। তুমি আদর যত্নে আগলে রাখছো…..
কথা শেষ না করতেই মোনা জোরে এক ধমক দিলো,
‘ ইশাননন….’
‘ স্যরি শুনতে খুব খারাপ লাগছে আমি জানি, কিন্তু আমার ও শুনতে খারাপ লেগেছে তুমি নিজেকে আমার সৎ মা বলেছো তাই। আমার যদি সুযোগ থাকতো আমি মহান আল্লাহকে বলতাম তোমাকে আমার মা বানিয়ে দিতে অথবা পরের জন্ম বলতে কিছু থাকলে বলতাম তোমার গর্ভে জন্ম নেয়ার আবদার টুকু করতে দ্বিতীয় বার ভাবার মত সময় নষ্ট করতাম না। একটাবার,শুধু একটাবার হলেও যেন সুযোগ করে দেয়। তোমাকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি নিজেকে সৎ মা বলবে না। বলবে ইশানের মা জননী। বুঝতে পেরেছো???’
মোনা ছেলের দিকে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইমরানের কার্বন কপি এই ছেলে। ইশান আশে পাশে থাকলে মনেই হয়না যে ইমরান নেই। দিন দিন যত্নশীল এবং আরো সুদর্শন হচ্ছে এই ছেলে। অথচ দিনশেষে আশ্রয় হিসেবে থাকে মোনার আঁচলের নিচে। নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। কাকনের মত বোকা এই দুনিয়াতে নেই। ন’ মাস কষ্ট করে ছেলের মর্ম বুঝলো না। তবে কাকনকে ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগ থাকলে একবার অবশ্যই দিবে ইশানকে ছেলে হিসেবে পেয়েছে বলে। ইশানের ডাকে সম্বিত ফিরে এলো,
‘ মা একটা কথা বলি,কয়েকদিন ধরে বলব ভাবছি।’
‘ কি কথা আব্বা?’
‘ জানো ক্যাম্পাসে একটা মেয়ে আমার পিছে পিছে ঘুরছে। নাম সিমি। আমার একদম ভালো লাগে না। সেদিন ক্লাসের সি.আর অহনা আমার সাথে এসাইনমেন্ট নিয়ে ডিসকাস করছিলো, কিন্তু ওই মেয়েটা ভেবেছে অহনার সাথে আমার কোনো রিলেশন আছে। বেশ কিছুদিন হলো অহনা ক্যাম্পাসে আসেনা। আজ শুনলাম ওই পাজি সিমি মেয়েটা অহনাকে মেরে নাকি মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। ওই সিমি নাকি কোন মন্ত্রীর নাতনী। আমাকে লাভ লেটার লিখে প্রায়।’
মোনার চক্ষু ছানা বড়া। হাসবে না নিজেকে সামলাবে বুঝতে পারছেনা। অনেক কষ্টে হাসি আটকে ছেলেকে বললো,
‘ আব্বা মেয়েটা কি সুন্দর?’
‘ হয়তো কিন্তু আমার পছন্দ না। মা প্লিজ হেল্প মি। আর হাসবেনা।আমার অহনার জন্য কষ্ট লাগছে। জানো অহনা অনেক ইনোসেন্ট। নিজে টিউশন করে পড়াশোনার খরচ চালায়।কিন্তু ওই বেয়াদপ, মেয়েটাকে হসপিটালে পাঠিয়ে দিলো।’
‘ তোমাকে মেয়েটা বেশি ভালোবেসে ফেলেছে নাকি?’
‘লাভ নেই তো মা। আমার তোমার মত একজনকে চাই,যেভাবে পাপা তোমার ভালোবাসায় অস্থির,নিবিষ্ট ছিলো,আমি ও কারো জন্য এমন হতে চাই। তোমার মত শালীন কাউকে চাই। যে নিজেকে শুধু আমার সামনে মেলে ধরবে। তুমি যেমন পাপার কাছে খোলা বই ছিলে। আমি তেমন কাউকে চাই।দুনিয়ার মানুষকে দেখানো ওয়েস্টার্ন ড্রেস পেট,কোমড় এসব দেখলে রাগ লাগে।’
মোনা যা বুঝার বুঝে গিয়েছে। খোঁজ নিতে হবে মেয়ে সম্পর্কে। মেয়ে ভালোনা। ইশান কখনো কোনো মেয়ে সম্পর্কে বাজে কথা বলে না। আজ বলেছে মানে মেয়ে ও বাজে।
‘ নেক্সট ডেটে মাকে নিয়ে যেও ক্যাম্পাসে। কিন্তু বাবা কেউ কি পছন্দের আছে তোমার।’
‘ থাকলে আগে তোমাকেই জানাবো।’
কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে মোনাদের বাড়ি। ফুলে, বাতিতে সাজানো বাড়ি।দেখতেই ভালো লাগছে। মনসুর এগিয়ে এসে ওদের উপরে নিয়ে গেলো। ইশান দীপ্তকে পেয়ে খেলছে আর কার্টুন দেখছে ড্রইং এ। বাড়িতে অনেক গেস্ট। ইশান দুপুরে কিছু না খেয়ে চলে এসেছে। মোনা এক প্লেট খিচুড়ি নিয়ে ইশান আর দীপ্ত দুজনকে খাইয়ে দিলো। কেউ একজন বলে উঠলো,
‘আদিখ্যেতা।’
ইশানের কানে কথাটি গেলেও না শোনার ভান করেছে। মোনা ঠিকই খেয়াল করেছে কে বলেছে।
ওদের খেলতে বলে কনে দেখতে রুমে গেলো। কাঁচা ফুলে মেয়েটাকে খুব সুন্দর লাগছে।
‘ তৌহিদা মাশাল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে দেখতে। ‘
‘ আপু আপনার চাইতে কম। আপনি তো মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর।’
ছেলে পক্ষের বেশি কেউ আসবেনা বলে জানিয়েছে। তাও দশ জন এসেছে। ছাদে প্যান্ডেল করা আছে পুরুষদের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মহিলারা কনে দেখতে রুমে এসেছে। মাঝখান থেকে ছেলের খালা মোনাকে দেখে সালমাকে বলে উঠলো,
‘ এটা কে আপা? অনেক সুন্দরী। গায়ের রঙ টা যদিও চাপা, আগের দেখলে তো ভাইগ্না বউ এটারে বানাতাম।’
‘ খবরদার এই ভুল করার কথা স্বপ্নে ও ভাববেন না। এটা আমার মা। মায়ের ছেলে থাকতে আবার মায়ের বিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করছেন কি করে?’
ইশানের কথায় সবাই পেছন দিকে ফিরলো। মোনা মহিলার কথা শুনে ভ্রু কুচকে ফেললেও ইশানের কথায় তুষ্ট হয়েছে। ইশানের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ কি হয়েছে বাবা কিছু লাগবে, রুমে এসেছো যে।’
‘ স্যরি মা, নক করেছিলাম আওয়াজে কেউ শুনে নি,বাধ্য হয়ে আসলাম। মঞ্জু স্যার ফোন দিয়েছে তোমার সাথে কথা বলবে?’
‘ তোমার ভার্সিটির মঞ্জু স্যার? কি ব্যাপারে আব্বু?’
‘ ওই যে সিমি কেস। ও মঞ্জু স্যার এর ভাইঝি।’
‘ আচ্ছা আচ্ছা তুমি যাও মা দেখছি।’
মোনা ফোন হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে কথা বলে দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসে। এসেই দেখতে পায় ইশান আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। পাত্র পক্ষের কে যেন কথা শুনাচ্ছে ইশানকে,
‘ সৎ মায়ের প্রতি এরম দরদ কেন? কি চক্কর চলতেছে? বলি হারি যাই এই দামড়া পোলা মোনায় সামলায় কেমনে? বিয়া ও করছে বুইড়ারে।’
ইশানের মুখটা দেখে মোনার কলিজা ছ্যাত করে উঠেছে। ছেলেটা চোখ ছলছল করছে। মোনা এমনভাবে চেঁচিয়ে উঠেছে। পাশের রুম থেকে মামুন সাহেব,মনসুর, মিনহাজ সবাই ছুটে এসেছে,
‘ আর একবার যদি শুনি আমার স্বামী, ছেলেকে নিয়ে কোনো কথা বলতে জিভ ছিড়ে ফেলবো টেনে। আমি কিছু পারি আর না পারি মা হিসেবে সন্তান রক্ষার জন্য সামনে যে আছে তাকে এক কো*পে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবো। আমার ছেলের চোখে পানি দেখেছি দুবার। তাও আমার জন্য আর ওর বাবার জন্য। এর বাইরে কেউ যদি ওর চোখের পানির কারন হয় তাকে আস্ত রাখবোনা বলে দিলাম। আমার স্বামী বুইড়া হোক আর জোয়ান হোক আমার। বেয়াল্লিশ বছর চলছে উনার। আমি একবার মাথা নাড়ালে আপনার এই ভাষা আর শব্দ ব্যবহার এর জন্য একটা আঁছাড় দিয়ে ভেতরের নাড়িভুড়ি বের করে ফেলতেও দেরী করবে না।’
মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আর বাবা তুমি কি আমার অপমান দাঁড়িয়ে দেখবে?’
ইশানের হাত ধরে মোনা এত রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছে। কেউ আটকাতে পারেনি। ইশান অনেক বুঝিয়েছে। ইশানকে ধমকে ধামকে বের করে নিয়ে এসেছে। ইশান আজ মায়ের বিদ্রোহী রূপ দেখেছে। ইচ্ছে করছে মাকে কোলে তুলে নিই। সে একবার এই কাজটা করবেই তবে আজ না। পাপা ফিরে আসুক আর মায়ের মুড ও এখন ভালো না।
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৪১
এই দিকে বিয়ে বাড়ি থমথমে। তবে ভাগ্য ভালো এই কথাটা মিনহাজের দূরসম্পর্কের এক খালা বলেছে। যদি ছেলে পক্ষের কেউ বলতো বিয়ে টাই ভেঙ্গে যেত মোনার হুমকিতে। মিনহাজ আর মামুন সাহেব হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। মিনহাজ এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে। মোনা ইমরানের কথা এখন একটু ভুলে থেকে অন্যদিকে মনোযোগ দিতে শুরু করেছে। এটাই ওর জন্য মঙ্গল।
