Home তুমি এলে অবেলায় তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৪

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৪

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৪
আতিয়া আদিবা

প্রেগনেন্সির সময়কাল নদীর স্রোতের চেয়েও দ্বিগুন গতিতে বয়ে যায়। নেই কোনো অপেক্ষা। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দেখতে দেখতে প্রায় একটা পুরো মাস কেটে গেছে সামাইরা তার বাবার বাড়িতে চলে এসেছে। স্কাইলাইন ভিলার সেই বিলাসবহুল লাইফস্টাইল আর শেহজাদ রহমানের সেই দমবন্ধ করা পজেসিভ চাউনি থেকে দূরে এসে সামাইরা এখন তার চেনা মধ্যবিত্ত শৈশবের ছোট ঘরটায় দিন কাটাচ্ছে।
এখানে কোনো দামী বেলজিয়াম কাঁচের দেয়াল নেই। দামী দামী আসবাবপত্র নেই। আছে শুধু ফাটল ধরা
চেনা দেয়ালের ভ্যাপসা গন্ধ। তবুও এ যেন বড় শান্তির জায়গা।
কিন্তু এই এক মাসে সামাইরা কি সত্যিই শান্তিতে আছে? নিজের পেটের ওপর প্রতিদিন সে নিয়ম করে হাত রাখে। দিন দিন তার ভেতরের মাতৃত্বের মায়াটা গাঢ় হচ্ছে। আর একই সাথে এক অদ্ভুত একাকীত্ব তাকে গ্রাস করছে।
এই একটা মাসে শেহজাদ নিজের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনে কোনো খামতি রাখেনি। সামাইরাকে সে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের সুরক্ষাবলয়ের বাইরে যেতে দেয়নি। প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে স্কাইলাইন ভিলার মার্সিডিজ আমিনুল হকের বাড়ির গলির সামনে দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে শেহজাদের বিশ্বস্ত কর্মচারীরা নেমে পুষ্টিবিদের তৈরি চার্ট অনুযায়ী দামী দামী ফল, ওটস, অর্গানিক দুধ, ড্রাই ফ্রুটস আর বাজারের সেরা সব পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী দিয়ে যায়।
আমিনুল হক যদিও প্রথমে এসব নিতে আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু কর্মচারীরা অত্যন্ত বিনীতভাবে হাত জোড় করে বলেছিল,

-স্যার বলে দিয়েছেন ম্যাডাম আর ওনার সন্তানের পুষ্টির দায়িত্বে যেন কোনো কমতি না হয়। এটা স্যারের অর্ডার। প্লিজ ফিরিয়ে দেবেন না।
শুধু খাবার-দাবারই নয়, সামাইরা লক্ষ্য করেছে তাদের এই সাধারণ মধ্যবিত্ত গলির মোড়ে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা সাধারণ পোশাকে কিছু প্রহরী দাঁড়িয়ে থাকে। সারাক্ষণ নজরদারি রাখে এই বাড়ির ওপর। সামাইরা সবটা বুঝে। মনে মনে বিরক্ত হয়। শেহজাদ পুরো গলিটাকে এক অদৃশ্য দুর্গে পরিণত করে রেখেছে!
এই এক মাসে শেহজাদ অনেকবার সামাইরার সাথে দেখা করতে এসেছে। ফিরিয়ে নিতে এসেছে। সে যতবার শান্ত পায়ে সামাইরার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক ততবার সামাইরা তার সাথে চরম রূঢ় আচরণ করেছে।
-আবার কেন এসেছেন আমার সামনে? আপনার ওই মুখটা আমি দেখতে চাই না। এখনও কেন আমার পিছু ছাড়ছেন না?
সামাইরা প্রতিবার বিষাক্ত চাবুকের মতো কথাগুলো ছুড়ে মেরেছিল।
শেহজাদের চোখে এক ফোঁটা রাগ কিংবা অভিমান উঁকি দেয়নি। ওষুধের তীব্রতায় সে এখন এক জ্যান্ত রোবট। সে শুধু যান্ত্রিক গলায় বলেছে,

-নিজের যত্ন নিও। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে জানিও।
ব্যস।এতটুকুই। আর একটা শব্দও না বাড়িয়ে সে উল্টো পায়ে হেঁটে চলে গিয়েছিল। শেহজাদের এই নিস্পৃহতা, এই চরম নীরবতা সামাইরাকে এক অদ্ভুত জয়ী সত্তার স্বাদ দিয়েছে প্রতিক্ষণ। সামাইরার মনে হতে থাকে যে জয়ের অতি সন্নিকটে।
বিকেলের ম্লান রোদটা তখন সামাইরার ঘরের জানালার গ্রিল গলে মেঝের ওপর এসে পড়েছে। জানালার বাইরে পেয়ারা গাছের পাতাগুলো অলস ভঙ্গিতে দুলছে। সামাইরা বিছানায় বসে হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে এক ধ্যানে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল।
ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন আমিনুল হক। হাতে মেয়ের জন্য ফ্রেশ জুসের গ্লাস আর নিজের জন্য এক কাপ চা।

-কী রে? একা একা বসে কী ভাবছিস?
আমিনুল হক মৃদু হেসে মেয়ের পাশে এসে বসলেন।
তিনি জুসের গ্লাসটা সামাইরার দিকে এগিয়ে দিলেন।
সামাইরা গ্লাসটা হাতে নিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল,
-কিছু না বাবা। এমনিই বাইরের আকাশ দেখছিলাম
আমিনুল হক চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলেন। ওনার চোখ দুটো মেয়ের ফ্যাকাশে মুখের ওপর স্থির হলো।
বিগত এক মাস ধরে তিনি দেখছেন, ওনার চঞ্চল, জেদি মেয়েটা কেমন যেন বড্ড বেশি শান্ত হয়ে গেছে। সারাদিন চুপচাপ জানালার ধারে বসে থাকে, ঠিকমতো হাসে না, কথা বলে না। শেহজাদের উদাসীনতাও ওনার চোখ এড়ায়নি। তার মনে এই বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে।
তিনি চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখলেন। সামাইরার মাথার ওপর নিজের স্নেহময় হাতটা রেখে অত্যন্ত নরম গলায় বললেন,

-তুই আমার বড় আদরের! তোর মা মারা যাওয়ার পর থেকে তোকে আমি কতটা বুক দিয়ে আগলে রেখেছি, তা তুই খুব ভালো করেই জানিস। আজ তোকে একটা কথা বড্ড স্পষ্ট করে বলতে এসেছি মা।
সামাইরা বাবার দিকে তাকাল। আমিনুল হক মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-দেখ! এই বাড়িটা তোর, এই জীবনটাও সম্পূর্ণ তোর। তুই তোর জীবনটা কীভাবে কাটাতে চাস, কার সাথে কাটাতে চাস সেটা পুরোপুরি তোর নিজের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু তুই তো আর আগের মত নেই মা!
আজ একজন বাবা হিসেবে আমি জানতে চাই মা, শেহজাদের সাথে তোর ঠিক কী হয়েছে? কেন তুই এই অবস্থায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে এবাড়িতে এসে বসে আছিস? জামাইয়ের ওই শূন্য চোখগুলো আমি দেখেছি মা, ও ভালো নেই। তোদের মাঝে কী এমন দেয়াল উঠেছে যা ভাঙা যাচ্ছে না?
বাবার এই আকস্মিক সরাসরি প্রশ্নে সামাইরা এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে কীভাবে বাবাকে বলবে যে তাদের এই বিয়ের ভিত্তিটাই ছিল ভুল?
সে বড্ড নিস্পৃহভাবে নিজের মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। জুসের গ্লাসটা শক্ত করে ধরে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতর আবার সেই থমথমে নীরবতা নেমে এলো।
আমিনুল বুঝতে পারলেন, সামাইরা এখনো নিজেকে খোলস থেকে বের করতে প্রস্তুত নয়। তিনি জোর করার মানুষও নন। তিনি মেয়ের কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বললেন,

-আচ্ছা ঠিক আছে মা। আমি তোকে জোর করব না। তোর যখন মনে হবে বাবাকে বলা যায়, বলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে, তুই তখনই আমাকে বলিস। বাবা সবসময় তোর পাশেই আছে।
ঘরের ভেতরের এই ভারী আর বিষণ্ণ আবহাওয়াটা হালকা করার জন্য আমিনুল হক এবার একটু মৃদু হাসলেন। তিনি স্মৃতিকাতরতায় ডুবে গিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন,
-তোর কি ছোটবেলার কথা মনে আছে? তুই যখন বড্ড ছোট ছিলি, তখন কত নাটক করতি আমার সামনে!
সামাইরা বাবার দিকে তাকাল, তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল।
আমিনুল হক হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন,

-দিনের বেলা তোর মা যখন তোকে কোনো দুষ্টুমির জন্য বকা দিত বা হালকা মারত, তুই তখন এক ফোঁটাও কাঁদতি না। একদম চুপচাপ জেদ নিয়ে বসে থাকতি। কিন্তু রাতে আমি যখন অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতাম, তুই সদর দরজা খোলার সাথে সাথেই আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তি। আর তারপর শুরু হতো তোর আসল নাটক! ডুকরে ডুকরে কেঁদে আমার শার্ট ভিজিয়ে ফেলতি। মা কতটুকু বকেছে, কোথায় সামান্য ব্যাথা লেগেছে, সেই স্থানটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে কাঁদতি। তোর সেই কান্না দেখে আমি তোর মাকে কত বকা দিতাম! আর তুই তখন পেছন থেকে তোর মাকে ভেঙচি কাটতি। মনে আছে তোর?
বাবার মুখে নিজের শৈশবের এই মধুর নাটকের কথা শুনে সামাইরার চোখ দুটো নোনা জলে ভিজে উঠল। তার ঠোঁটের কোণের সেই ম্লান হাসিটা এবার আরোও চওড়া আর সুন্দর হয়ে উঠল। সে জুসের গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে বাবার বুকের মাঝে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল। বাবার শার্টের গন্ধ শুকে মায়াভরা গলায় বলল,
-মনে থাকবে না কেন? মেয়েদের জীবনে তাদের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা, সবচেয়ে নিরাপদ নোঙর তো তাদের বাবাই হয়। বাবারা হলো মেয়েদের জীবনের প্রথম ভালোবাসা, ফার্স্ট লাভ। বাবার সামনে নালিশ না করলে কি মেয়েদের পেটের ভাত হজম হয় বলো?
আমিনুল হক মেয়ের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ওনার নিজের চোখজোড়াও সামান্য ভিজে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

-সেটাই রে মা। একটা সন্তানের জীবনে মায়ের গুরুত্ব হয়তো অনেক, মা ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার। কিন্তু একটা মেয়ের জীবনে তার বাবার গুরুত্বও অপরিসীম। মা যদি ভালোবাসতে শেখায়, তবে বাবা শেখায় কীভাবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে লড়াই করতে হয়। বাবা হলো সেই বটগাছ, যার ছায়ায় সন্তানেরা নিজের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারে। আমি যতদিন বেঁচে আছি মা, তোর কোনো ভয় নেই।
সামাইরা বাবার বুকে মাথা রেখে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
দিন ফুরিয়ে রাত নামল। ঢাকার আকাশে আজ কোনো তারা নেই, চারপাশটা এক কুৎসিত ধূসর মেঘের চাদরে ঢাকা। রাত গভীর হলো, শহরের কোলাহল থিতিয়ে এলো। সামাইরা নিজের ঘরের লাইটটা অফ করে বিছানায় শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার চোখে কোনো ঘুম ছিল না। জানালার বাইরে বাতাসের বেগ বাড়ছে, ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।

রাত ঠিক আড়াইটা।
ধড়াম! ধড়াম!
হুট করেই সামাইরার ঘরের দরজায় এক তীব্র, হন্তদন্ত হয়ে ধাক্কা পড়ার শব্দ হলো। সামাইরা ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। এই মাঝরাতে এভাবে বাবা কেন দরজা ধাক্কাচ্ছে? কিছু হল নাকি!
সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে দরজাটা খুলতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন আমিনুল হক। ওনার মুখটা বেশ ভয়ার্ত দেখাচ্ছে। হাত দুটো কাঁপছে।
-বাবা? কী হয়েছে? তুমি এভাবে কাঁপছ কেন?
সামাইরা আতঙ্কে ওনার হাত দুটো চেপে ধরল।
আমিনুল হক ঢোক গিলে অত্যন্ত রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন,
-চরম সর্বনাশ হয়েছে রে মা! সুফিয়া আপাকে একটু আগে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ওনার অবস্থা নাকি আশঙ্কাজনক!

হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে! ওনার অবস্থা আশঙ্কাজনক!
শব্দগুলো সামাইরার কানের পর্দায় এসে এক তীব্র বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। তার চোখের সামনে পুরো ঘরটা যেন এক সেকেন্ডে বনবন করে চক্কর দিয়ে উঠল। সে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসের চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে এলো,
-কী… কী বলছ এসব? আমি যখন এলাম ওনাকে তো সুস্থ দেখে এসেছি। ওনার কী হয়েছে? এটা কীভাবে সম্ভব?
আমিনুল হক মেয়ের কাঁধ ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
-একটু আগে শেহজাদ আমাকে ফোন করেছিল মা। ওর গলার স্বর আমি চিনতে পারছিলাম না, ও পাগলের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। বলল, সুফিয়া আপা নাকি মাঝরাতে হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা নিয়ে ছটফট করতে করতে অচেতন হয়ে পড়েছেন। ওনাকে নিয়ে বারিধারার অ্যাপোলো হাসপাতালে ছুটে গেছে। ওনাকে আইসিইউ-তে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে মা!
লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে!
সামাইরার মনে হলো তার পায়ের নিচের মাটিটা কেউ এক এক কোপে কেটে নিচ্ছে। সুফিয়া রহমান তাকে খাঁটি মায়ের মায়া দিয়ে আগলে রেখেছিলেন। ওনার সেই নিষ্পাপ, সজল চোখ দুটো সামাইরার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

সামাইরা এবার চরম পাগলামি শুরু করে দিল। সে বাবার কলার চেপে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে উঠল,
-না বাবা! এটা হতে পারে না! মার কিচ্ছু হতে পারে না! আমি এক্ষুণি যাব! আমি এক্ষুণি মায়ের কাছে যেতে চাই! ওনাকে আমি দেখতে চাই! প্লিজ আমাকে নিয়ে চলো, বাবা! আমি এখনই যাব!
সে ঝড়ের গতিতে ঘরের ওড়নাটা টেনে নিয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল। আমিনুল হক তাকে আটকাতে চাইলেন,
-শান্ত হ মা! মাঝরাতে এই ঝড়ের মধ্যে তুই কিভাবে এতদূর যাবি! আমি ব্যবস্থা করছি দাঁড়া!
সামাইরাকে এত রাতে বাড়ির বাইরে দেখামাত্র একজন লোক সামনে এগিয়ে এলো। আমিনুল হক কিছু বলার আগেই লোকটি বলল,
-ম্যাডাম, স্যার গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। গলির মোড়ে স্টার্ট করা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। প্লিজ আসুন।
শেহজাদ! সে সব জানে। সে সামাইরার এই পাগলামি, তার এই কান্নার খবর আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিল। তাই সে নিজেই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে।
সামাইরা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। আমিনুল হকও মেয়ের এই অবস্থা দেখে ওনার সুতির চাদরটা গায়ে জড়িয়ে পেছনের সিটে গিয়ে বসলেন।
ঢাকার মধ্যরাতের আকাশে তখন কালচে মেঘের গর্জন শুরু হয়ে গেছে। হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে পথে।
গাড়িটি তীব্র গতিতে হেডলাইটের আলো ফুঁড়ে বারিধারার অ্যাপোলো হাসপাতালের দিকে ছুটে চলল।

বারিধারার অ্যাপোলো হাসপাতালের স্পেশাল ভিআইপি আইসিইউ জোনটা সাধারণ কোনো হাসপাতালের মতো নয়। এখানে নিয়ন বাতির আলো বড্ড ম্লান, মেঝেগুলো
মসৃণ। চারপাশের বাতাসটা ফিনাইল আর ওষুধের কড়া ঘ্রাণে ভারী হয়ে আছে।
এই জোনটা শহরের অত্যন্ত এলিট, প্রভাবশালী আর উচ্চবিত্ত শ্রেণির মুমূর্ষু রোগীদের জন্য সংরক্ষিত।
এখানে টাকার জোরে মৃত্যুকেও যেন কয়েকটা দিন আটকে রাখার এক রাজকীয় চেষ্টা চলে।
সিঁড়ি বেয়ে ঝড়ের গতিতে ওপরে উঠে এলো সামাইরা। তার পা দুটো কাঁপছিল। পরনের সাধারণ সুতির ওড়নাটা অবিন্যস্তভাবে কাঁধ থেকে ঝুলে পড়েছে। পেছনে দ্রুতপায়ে আসছিলেন তার বাবা আমিনুল হক। সামাইরা করিডোর দিয়ে দৌড়ে যাওয়ার সময় দুপাশের কাঁচের কেবিনগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল। প্রতিটা কেবিনের ভেতরে দামি দামি লাইফ সাপোর্ট মেশিন। মনিটরের অবিরাম ‘বিপ… বিপ…’ শব্দ ভেসে আসছে। বিছানায় পড়ে আছে এক একটি নিথর দেহ!
করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াল সামাইরা। কাঠের একটা বিশাল দরজা দিয়ে আইসিইউ স্যুটের ভেতরে যাওয়ার রাস্তা। সেখানে গিয়ে সামাইরা থমকে দাঁড়াল। দরজার ওপর লাল অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে ‘Restricted Area’।

দরজার ঠিক পাশেই রয়েছে ভিআইপি ওয়েটিং লাউঞ্জ।একটি চমৎকার বিলাসবহুল ঘর। যেখানে দামী লেদারের সোফা আর মৃদু নীল আলোর ব্যবস্থা করা আছে। আর সেই ঘরের এক কোণায়, জানালার কাঁচের ওপারে তাকিয়ে নিথর মূর্তির মতো বসে আছে শেহজাদ।
সামাইরা প্রায় নিঃশব্দে সেই লাগোয়া ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের ভেতর পিনপতন নীরবতা।
শেহজাদ সামাইরার আসার শব্দ পেয়েও নিজের মাথাটা ঘোরাল না। সে জানালার ওপারে ঢাকার মধ্যরাতের কালচে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সামাইরা মনের মাঝে দ্বিধা নিয়ে শেহজাদের একদম পাশের সোফাটায় আলগোছে এসে বসল। দুজনের মাঝখানের দূরত্ব নেই বললেই চলে।
সামাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
-মা, কেমন আছেন এখন?
শেহজাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকটা একবার তীব্রভাবে ওপরে উঠে আবার নেমে গেল। মৃত মানুষের মতো নিস্পৃহ স্বরে বলল,

-মা আর নেই বললেই চলে। ডাক্তাররা শেষ চেষ্টাটুকুও করে ফেলেছেন। একটু আগেই ওনার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল। কোনোমতে শক দিয়ে হার্টটাকে আবার চালু রাখা হয়েছে। এখন ওনার পুরো বডি মেকানিজম কেবল ওই লাইফ সাপোর্ট মেশিনের ওপর টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন এখন অলৌকিক কিছু না ঘটলে আর কোনো আশা নেই। সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে বলেছেন।
সামাইরা চুপ করে রইল। তার চোখজোড়া নোনা জলে ভরে উঠল। সে আইসিইউ-এর কাঁচের ওপারে থাকা সুফিয়া রহমানের সেই নিষ্পাপ, অচেতন মুখটার কথা ভেবে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে মুখে চেপে ধরল। শরীর কেঁপে উঠল তার।
শেহজাদ বিষাদগ্রস্ত হাসি হাসল। জানালার কাঁচের ওপর নিজের কপালটা ঠেকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
-আমি জীবনে অনেক অনেক বেশি টাকা কামাতে চেয়েছিলাম। পাওয়ার হোল্ড করতে চেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, নিজের একটা হাই পজিশন ক্রিয়েট করতে পারলে হয়তো পৃথিবীর সব সুখ আমি নিজের মুঠোর মধ্যে বন্দি করে রাখতে পারব। এন্ড আই ডিড ইট! আজ আমার একটা ইশারায় এই শহরের বড় বড় সিন্ডিকেট কাঁপে, কোটি কোটি টাকার ডিল এক সেকেন্ডে সাইন হয়। কিন্তু…
শেহজাদ নিজের মুখটা ঘোরাল। তার সেই শূন্য চোখ দুটো সরাসরি সামাইরার চোখের ওপর নিবদ্ধ হলো। সে অত্যন্ত করুণ কণ্ঠে বলল,

-মানুষের জীবন আর অনুভূতির সামনে আমার এই কোটি কোটি টাকা, এই একচ্ছত্র পাওয়ার সবকিছু ইউজলেস! আমার এই পুরো রাজত্বকে আজ দেউলিয়া হিসেবে ঘোষণা করলাম। হা হা হা হা।
শেহজাদের হাসি হঠাৎ থেমে গেলো। ঘরটায় আবার সেই হাড়হিম করা নীরবতা নেমে এলো। সামাইরা নিজের চোখের জল মুছে শেহজাদের দিকে তাকাল।
শেহজাদ সহসা সোফা থেকে সামান্য এগিয়ে এলো। সামাইরার আরও কাছাকাছি হয়ে, তার চোখের গভীরে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
-আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব, সামাইরা? একদম সত্যি করে উত্তর দিবে?
সামাইরা শেহজাদের এই আকস্মিক রহস্যময় সুর দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেল। সে নিচু স্বরে বলল,
-কী কথা?

শেহজাদ নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গালে। সে অত্যন্ত জঘন্য এক সন্দেহের চাবুক নিজের বুকে গেঁথে নিয়ে বলল,
-তুমি কি আমার এই বন্দিদশা থেকে, আমার কাছ থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ার জন্য মনে মনে আমার এই নিষ্পাপ মায়ের মৃত্যু কামনা করতে? তুমি কি আল্লাহর কাছে বলতে যে মা যেন তাড়াতাড়ি মরে যায়, যাতে আমাদের ওই চুক্তির কাগজটা একটিভ হয়ে যায়? সত্যি করে বলো তুমি কি ওনার মৃত্যু চেয়েছিলে?
শেহজাদের মুখ থেকে এই ভয়ংকর নিষ্ঠুর প্রশ্নটি উচ্চারিত হওয়া মাত্রই সামাইরার পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল! সে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসের চোখে।ডুকরে উঠে বলে উঠল,
-এসব কী বলছেন আপনি? আপনি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন? আমি… আমি কেন মায়ের মৃত্যু চাইতে যাব? উনি তো আমাকে নিজের গর্ভজাত মেয়ের মতো ভালোবেসেছেন! ওনার ভালোবাসার ভেতর আমি আমার নিজের মৃত মায়ের ছায়া খুঁজে পেয়েছিলাম! আপনি কীভাবে পারলেন আমাকে এমন একটা কথা বলতে?
সামাইরা নিজের মুখটা দুই হাতে ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

শেহজাদ অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে রইল সামাইরার পানে। এরপর নিজের সমস্ত রাজকীয় অহংকার বিসর্জন দিয়ে, সোফা থেকে নেমে সরাসরি সামাইরার সামনে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বলল,
-শোনো সামাইরা… আমি তোমাকে এখনই মুক্তি দিয়ে দেব। কসম খোদার, তোমাকে আর একটা দিনও, এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে হবে না! তুমি আজই মুক্ত, এখনই স্বাধীন!
তবুও আমি তোমার কাছে ভিক্ষা চাচ্ছি সামাইরা… আমি আমার মায়ের জীবন ভিক্ষা চাচ্ছি! তুমি তো বড্ড পবিত্র, তুমি বড্ড নিষ্পাপ। তোমার পেটে আমার সন্তানের পবিত্র অস্তিত্ব শ্বাস নিচ্ছে। তুমি আল্লাহর কাছে হাত তুলে আমার মায়ের বেঁচে থাকার জন্য একটু দোয়া করো না, প্লিজ! আল্লাহ তোমার কথা শুনবেন, সামাইরা! আমার হাত তো অপরাধের রক্তে নোংরা, আমার মোনাজাত আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছাবে না! তুমি মায়ের প্রাণটা ভিক্ষা চাও আল্লাহর কাছে! আমি আর কোনোদিন তোমার সামনে আসব না, কথা দিলাম!
শেহজাদ নিজের মাথাটা সামাইরার হাঁটুর ওপর ঠেকিয়ে অবোধ শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার বলিষ্ঠ কাঁধ দুটো অনবরত কাঁপছিল। সে অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে শেষবারের মতো বলল,

-আমি তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি, সামাইরা। তোমাকে অপমান করেছি, তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমাকে ছুঁয়েছি, আমার এই সব কৃতকর্মের জন্য তোমার কাছে মাফ চাচ্ছি, সামাইরা। আমাকে মাফ করে দিও। আমাকে আমার মায়ের মায়া থেকে এভাবে এতিম করে দিও না, প্লিজ!
শেহজাদের এই চরম রূপ, বুকফাটা আর্তনাদ ,নিঃস্ব আত্মসমর্পণ সামাইরাকে ভেতর থেকে এক্কেবারে ভঙ্গুর, এক্কেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল।
সে জীবনে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি যে এই ইস্পাতকঠিন, শক্তপোক্ত মানুষটা নিজের মায়ের জন্য, নিজের ভালোবাসার অবহেলার সামনে এতটা নড়বড়ে, এতটা কাঁচের মতো ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে!
এই দৃশ্য সামাইরার আত্মাকে এক তীব্র দংশনে ক্ষতবিক্ষত করে দিল।
সে আর পারল না বসে থাকতে। তার নিজের বুকের ভেতরের কান্নার বাঁধটাও এক নিমেষে ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে যদি আর একটা সেকেন্ডও এই ঘরে বসে থাকে, তবে সে নিজেই শেহজাদকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলবে। তার নিজের সবটুকু জেদ হেরে যাবে।

সামাইরা বহু কষ্টে, নিজের দাঁতে দাঁত চেপে বুকের ভেতরের উথলে ওঠা কান্নাটাকে গলার কাছে আটকে রাখল। সে এক ঝটকায় নিজের ওড়নার আঁচলটা শেহজাদের কাঁপতে থাকা হাত থেকে মুক্ত করে নিল। সোফা ছেড়ে সে অত্যন্ত দ্রুতপায়ে উঠে দাঁড়াল।

তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২৩

শেহজাদ মেঝেতে ওভাবেই মাথা নত করে বসে রইল, তার চোখ দিয়ে তখনো অশ্রুর ধারা বইছিল।
সামাইরা আর এক মুহূর্তও সেই লাগোয়া কেবিনে বা ঘরের ভেতরে দাঁড়াল না। সে এক ছুটে, নিজের চোখের অবাধ্য জলগুলো দুইহাতে মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরের অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল। সে আইসিইউ-এর বাইরের বারান্দায় গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।

তুমি এলে অবেলায় শেষ পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here