তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৮
রিমঝিম বৃষ্টি
চৌধুরী প্যালেস———-
রাত হতেই সব খাবার টেবিলে বসেছে কিন্তু ইভা নেই। সে বিকেলের দিকে তার স্বামীর সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে বেরিয়ে গেছে। এদিকে ইমদাদুল শান্ত হওয়ার পরপরই তার শশুর বাড়িতে খবর নিলে জানতে পারে ইভা সে বাড়িতে যায় নি তাহলে গেলো টা কোথায়? সুমানা তারেকের চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে বললো,
” বলছিলাম ভাবীর সাথে রাগারাগি টা না করলেও পারতেন, এমনিতেই ছেলে চলে যাওয়ায় তার মন ভালো ছিলো না। ”
তারেকও স্ত্রীর কথার সাথে তাল মিলিয়ে বললো,
” আসলেই ভাই। ভাবীরে নিয়ে আসেন..?”
আয়েশা পাশ থেকে থমথমে গলায় বললো,
” গিছে থাকতে দাও। ঘুরে আসুক ক’দিন। তার পোলা ইরাদ কয়দিন থাকবোনে আমিও দেখি। যার যেহানে থাইকা, যেভাবে থাইকা অভ্যস্ত সে কি আর ওই জায়গায় থাকতে পারবে দু’দিন যেতে দাও ঠিক ফিরে আসবে..!”
ইভান আয়েশার কথা শুনে পাশ থেকে খাওয়া ফেলেই উঠে গেলো তা দেখে ইমদাদুল গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” ইভান ভাত নষ্ট করছো কেন? খেয়ে যাও..! ”
” তোমাদের কথাবার্তা শুনেই আমার পেট ভরে গেছে বাবা..! আমার মা চলে গেছে অথচ, তোমাদের মাঝে বিন্দু মাত্র চিন্তা নেই আর দীদা তো মাশাআল্লাহ সে তার মাথার ঘেলু বিক্রি করে দিয়েছে বোধহয়..! “,
বলেই চলে গেলো। আয়েশা রেগে উঠলো যেনো। কিন্তু ইভান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে হাত ধুইয়ে ছাদে চলে গেলো। ছাদে যেতেই তার চোখ আটকালো ছাদের ঠিক শেষ প্রান্তের দিকে। শুরুতে কিছুটা ভয় পেলেও পরক্ষণেই চিন্তে পেরে দম ফেলে সামনে এগিয়ে গেলো। সাবাহ্ রাতে খেতে যায় নি। তার পড়তেও ভালো লাগছিলো না তাই ছাদে এসে বসে আছে। পাশে কাউকে বসতে দেখেই সাবাহ্ ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই দেখলো ইভানকে। তা দেখে উঠে যেতে লাগলেই ইভান সাবাহ্’র হাত ধরে বসিয়ে দিতেই ইভান সাবাহ্’র চুলের ঝটকা খেলো। সাবাহ্ বসতেই ইভান নিজের গাল মুছতে মুছতে বললো,
” কী রে তুই এত রাতে শাওয়ার নিয়েছিস কেনো..?”
” আপনার কী..! ”
ইভান সাবাহ্’র মাথায় ঠোকা মেরে বললো,
” আবার ত্যাড়ামো করছিস তুই..? ”
সাবাহ্ ইভানের দিকে লালিত চোখে তাকিয়ে বললো,
” একটা প্রশ্ন করি ইভান ভাই..? ”
ইভান ভ্রু কুঁচকে তাকালো আর বললো,
” তুই আবার কবে থেকে পারমিশন চাইতে শুরু করলি বল..!”
” আপনি আপুর ননদকে চিনেন কী আগে থেকেই..?”
ইভান সাবাহ্’র কথা শুনে সোজা ঘুরে ছাদের ওপর দু’হাত ভর করে আকাশের দিকে তাকালো আর বললো,
” হু! ও আমার ভার্সিটিতেই পড়ে এক বছরের জুনিয়র.?”
সাবাহ্ কয়েক সেকেন্ড দম ধরে বসে রইলো। দু’জনের মাঝে আর কোনো কথা হলো না। ইভান সাবাহ্’র দিকে তাকিয়ে বললো,
” টেস্ট পরীক্ষা কবে থেকে শুরু হচ্ছে তোর..?”
” আপনার সাথে কী সাদিয়া আপুর কোনো সম্পর্ক আছে..?”
এমন প্রশ্নে এবার ইভান বিরক্ত হলো। দু’হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
” কী বলতে চাচ্ছিস তুই? ছোট ছোটদের মতোই থাকবি। এসব পাকা কথা কই থেকে শিখেছিস তুই.? কী জিজ্ঞেস করলাম আর কি বললি তুই..?”
ইভানের কথায় সাবাহ্ ফিকে হাসি দিয়ে উঠলো আর বললো,
” একটা বই পড়তে পড়তে হুট যখন নতুন বই আসে তখন সেই মালিক পুরোনো বই টা রেখে দেয় নতুন বইয়ের লোভ সামলাতে না পেরে কিন্তু পুরোনো বইয়ের বাকি পৃষ্ঠা পড়লে কী খুব একটা ক্ষতি ছিলো মালিকের, ইভান ভাই..? ”
ইভান তার কথার অর্থ বুঝলো না সাবাহ্’র কপালে নিজের হাতের তালু উল্টে-পাল্টে দিয়ে চেক করে বললো,
” না তোর জ্বর নেই তাহলে পাগল হলি কীভাবে। বেশি পড়াশোনা করছিস বোধহয়..? ”
” এই তোমরা এইখানে কী করছো..?”
কারোর কন্ঠ পেতেই ইভান আর সাবাহ্ পিছন ঘুরতেই দেখতে পেলো সাদিয়া কে। সাদিয়ার হাত দুটো কফির কাপ। ইভানের সামনে কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
” এই নিন ভাবী পাঠিয়েছে আপনি নাকি ভাত খাননি ভালো করে তাই দিলো..?”
ইভান কাপটা হাতে নিয়ে বললো,
” থ্যাংকস্..!”
সাদিয়া পাশ থেকে সাবাহ্ কে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,
” সরি আপু তুমি এখানে আছো জানতাম না নয়তো আরেক কাপ নিয়ে আসতাম। আমার টা নাও না হয় তুমি..?”,
বলেই তার টা বাড়িয়ে ধরলে সাবাহ্ মুখ ঘুরিয়ে বললো,
” লাগবে না আমার..!”
ইভান সাবাহ্ কে ত্যাড়ামো করতে দেখে নিজেই হেসে উঠলো আর বললো,
” আরে ও খাবে না আপনিই খান। তা ছাদে আসলেন যে হঠাৎ, শুধু কি দিতেই এসেছেন..?”
সাদিয়া মুচকি হেসে বললো,
” না আমাকে আপনি ওয়ার্কশীট টা বুঝিয়ে দিতে পারবেন। এই চেপ্টার টা আমার সমস্যা হচ্ছে..? ”
ইভান উঠতে উঠতে বললো,
” অবশ্যই চলুন বুঝিয়ে দিচ্ছি..! ”
সাদিয়ার সাথে ইভান ছাদের ডান সাইডে গিয়ে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে লাইট অন করলো। তাদের ছাদের এক সাইডে বসার জন্য খোলা রুম আছে ওপরে ছাউনি দেওয়া শুধু , ভেতরে শুধু দুটো মাঝারি সাইজের ডিভান আর ছোট্ট টেবিল রাখা আর সাইড করে দোলনা রাখা। দু’জনে সেখানে গিয়ে বসতেই সাদিয়া ফোন বের করে পিক দেখিয়ে বললো,
” এই ম্যাথটা বুঝিয়ে দেন..?”
ইভান ফোন টা হাতে নিয়ে কিছু টা দূরুত্ব বজায় রেখে তাকে বোঝাতে লাগলো। দূর হতে সাবাহ্ বসা থেকে উঠে এক নজর দু’জনকে দেখো। তার ঠোঁট জোড়া যেনো ছোট হয়ে এলো। বিড়বিড়িয়ে বললো,
” আমার হিংসে হয় কেন ইভান ভাই। আপনার পাশে কোনো মেয়েকে দেখলেই হিংসে হয়। আচ্ছা আমি কী আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি..? ”
এতটুকু বলেই সাবাহ্’ নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরলো। তবে কী তার ভাবনায় ঠিক কিন্তু এই ফিলিংসের আদৌ কী কোনো স্বীকৃতি পাবে সে, যদি বাড়ির মধ্যে এমন সম্পর্ক আনে সে তাহলে তার মা কী তাকে ঠিক রাখবে। সাবাহ্ শুকনো ঢোক গিললো, সেদিকে আর তাকালো না দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে চলে গেলো।
ইরাদ রুমের মধ্যে একটা আলমারি খালি দেখে নিজের সব কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখছে পাশেই বেডের ওপর বসে আছে ইয়াশ। সে তো বেজায় খুশি ইরাদ তার জন্য পাঁচ সেট নতুন নতুন শার্ট, গেঞ্জি, জুতে কিনে এনেছে এতে ফারিশা রাগ করলেও ইরাদ বলেছে শুধু আজকের দিনটায় তাই ফারিশা আর কিছু বলেনি। ফোন ঠিক সে ফিরেছিলো বিকেলের দিকে তারপর এসে চুপটি করে ঘর মুছেছে। মুছতে না জানলেও বউয়ের হুকুম অনুযায়ী চেষ্টা করেছিলো তবে জায়গায় জায়গায় যেনো এখনো পানি জমে আছে তার মাঝে ইয়াশ কয়বার যে আছাড় খেয়েছে তার ঠিক নেই। রুমের মধ্যে তেমন ফার্নিচার নেই জন্য ব্যাথা পায় নি সে আর তা ফারিশা দেখে তাদের আড়ালে মুখ চেপে হেসেছে শুধু। দুপুরে খাবার হিসেবে শুধু গরম গরম ভাত আর মসুরের ডাল পেয়েছিলো তবে এতে ইরাদ একটুও অভিযোগ তুলে নি বরং আয়েশ করেই খেয়েছে।
” মিলাদ আমায় ওটা দিবে আমি ওটা পলবো..? ”
ইরাদ পিছন ঘুরে ভ্রু কুঁচকে তাকালো ছেলের দিকে আর বললো,
” কোনটা..? ”
বিছানায় থাকা একটা সাদা শার্ট দেখিয়ে বললো তা দেখে ইরাদ এগিয়ে এসে বললো,
” এটা তো অনেক বড়ো তুমি কীভাবে পড়বে, ডুবে যাবে তো..?”
ইয়াশ ঠোঁট উল্টে বললো,
” পানি কোতায় পাবো একানে? ডুববো না দাও আমায় ওটা মিলাদ..!”
ইরাদ ইয়াশকে বেডের ওপর দাঁড় করিয়ে তার পরনের গেঞ্জি টা খুলে নিজের শার্ট টা পরিয়ে দিতেই ইয়াশ যেনো ডুবেই গেলো। শার্টের হাতা দুটো তার হাত ছেয়েও আরও বেশ খানিকটা ঝুলে পড়েছে আর নিচের দিকে শার্টটা একদম তার হাটু ছেড়ে নেমে পড়েছে, গলা বড় হওয়ায় কাঁধ থেকে নেমে পড়বে বলে কী। ইয়াশ নিজের এমন অবস্থা দেখে নিজেই হেসে উঠলো খিলখিলিয়ে সাথে ইরাদও। পাশের রুমে ফারিশা বেলকনিতে বসে আছে যেনো সে ভাবনায় বিভোর। ইরাদকে তো আসতে বলেছে সে কিন্তু আদৌ কি সে ও বাড়িতে যাবে। যারা তাকে নিচু করেছে তাদের পরিবারে আবার কোন মুখ নিয়ে সে যাবে কিন্তু ছেলের জন্য হলেও এবার তার যাওয়া উচিত। ফারিশার ভাবনার মাঝেই পাশের রুম থেকে হাসাহাসির আওয়াজ ভেসে এলে কানে। ফারিশা ফোনে তাকিয়ে দেখলো নয় টা বাজতে যাচ্ছে। চুলগুলো খোপা করে রান্নাঘর থেকে খাবারগুলো নিয়ে নিজের রুমের বেডের ওপর রাখলো সব। তারপর পাশের রুমে গিয়ে দেখলো দু’জনের কান্ড তা দেখে তার ভীষণ হাসি পেলো তবুও কোনোমতে হাসিয়ে সামলিয়ে স্থির গলায় বললো,
” খেতে আসুন দ্রুত অনেক বাজে। ইয়াশ এসো তাড়াতাড়ি..! “,
বলেই চলে গেলো। ইরাদ ইয়াশের হামা পাল্টে দিয়ে কোলে করে পাশের রুমে গিয়ে বেডের ওপর বসলো। ইরাদ এক নজর খাবারগুলো দেখলো সব দুপুরেরই খাবার ঠান্ডা ভাত, ডাল সাথে লেবু আছে অথচ, তার
বাড়িতে দুপুরের খাবার শেষ করে রাতে আবার গরম গরম খাবার পায় সাথে হরেক রকমের তরকারিও। ফারিশা ইরাদের স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকা দেখলো। প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললো,
” কী হলো মিস্টার ইরাদ চৌধুরী খাবার দেখে মনে হলো হ্যাং হয়ে গেলেন। আগেও বলেছি আমাদের মতো থাকতে পারবেন না..? ”
” কে বলেছে পারবো না, এই তো খাচ্ছি.! “,
বলেই খাবার মুখে তুলে নিলো ইরাদ। ফারিশা আর কিছু বললো না। ছেলেকে খাওয়াতে লাগলো। ইরাদ খেতে খেতে বললো,
” শুধু শুধু কষ্ট করো কেন, গ্যাস তো আছেই বাসায়..?”
ফারিশা ছেলেকে খাওয়াতে খাওয়াতে বললো,
” এটা সিলিন্ডার গ্যাস, লাইনের নয়। টাকা দিয়ে কিনতে হয় ফুরিয়ে গেলে। তাই তিনবেলা রান্না করে খাওয়া তো দূর খরচ করতেই হয় গুণে গুণে। সিলিন্ডারের দাম জানেন আপনি প্রায় ষোলো-সতেরোশত টাকা খরচ করে গ্যাস ভরতে হয়। ”
ইরাদ ভ্রু কুঁচকে বললো,
” টাকা আমি দিবো নে তুমি চিন্তা করো না..! ”
ফারিশা এর প্রতিত্তোরে কোনো কথা বললো না। ইরাদ ফারিশাকে চুপ থাকতে দেখে সেও আর কথা বললো না। তাদের খাওয়া শেষ হতেই ফারিশা সব পরিষ্কার করে রান্না ঘরে রাখতেই ফোন এলো তুবার তা দেখে ফারিশা ইরাদকে ডাকলো। ইরাদ তখন পাশের রুমে যাওয়ার জন্য সবেমাত্র পা বাড়িয়েছিলো ফারিশার ডাকে পিছন ঘুরে বললো,
” হুম..!”
” আমি জানি এখন আপনি ফ্রি তাই থালাবাসনগুলো একটু কষ্ট করে পরিষ্কার করে তারপর রুমে না’হয় যাবেন আমি একটু তুবার সাথে কথা বলছি বেলকনিতেই আছি..! “,
বলেই ফারিশা ভেতরে চলে গেলো আর ইরাদ বাঁকা চোখে তাকিয়ে নিচু গলায় বললো,
” হু এখন তোমার সময় তো তাই খাটিয়ে নিচ্ছো এরপর আমার সময় আসুক আমিও খাটিয়ে নিবো.!”,
বলেই রান্না ঘরের চলে গেলো। ইরাদকে রান্না ঘরে যেতে দেখে ইয়াশও পিছু পিছু চলে গেলো।
ফারিশা বেলকনিতে গিয়ে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তুবা বলে উঠলো,
” কী রে তোর পোলা আমারে ভুলে গেলো নাকি আজ একবারও ভিডিও কল দিলো না যে..!”
” তার আর দেওয়ার কথা মনে আছে নাকি । সে নতুন লোক পেয়েছে, ইরাদের সাথে সে ব্যস্ত..!”,
ওপাশ থেকে তুবা বুঝতে না পেরে উত্তেজিত গলায় বললো,
” এক সেকেন্ড! এক সেকেন্ড! ইরাদ ভাইয়া এলো কোথা থেকে..? ”
ফারিশা স্বাভাবিক গলায় বললো,
” তুবা কিছু মনে করিস না তোর পারমিশন না নিয়েই আমি তোর ঘরে ইরাদকে কিছু দিন থাকতে দিয়েছি। তুই চিন্তা করিস না তোর সব জিনিস আমার ঘরে যত্ন করে রেখেছি! ”
তুবা অবাক হয়ে বললো,
” সিরিয়াসলি, আলহামদুলিল্লাহ। তো কী অবস্থা মিল-টিল হবে নাকি এবার সোনা..!”
” ছাড় তো এসব ক্ষত ঠিক হওয়া এত সোজা না তুবা। বাদ দে, তোর কী খবর তাই বল আগে..?”
তুবা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
” কী আর খবর হবে রে বিয়ে তো ঠিক হয়ে গেছে এসে দেখি। এই শুক্রবারেই বিয়ে তো জিসানকে আসতে বলেছি ও তো দু’দিন আগেই আসবে বলেছে তুই কালই চলে আয় সোনা আমার বাড়ি। জানি আমার বাড়িতে তেমন জায়গা নেই কিন্তু একটু কষ্ট করে আয়..!”
ফারিশা মুখ টা ছোট করে বললো,
” তুবা তুই তো জানিস আমি কোথাও যায় না। তারওপর বাড়িতে ইরাদ এসেছে। যাওয়া সম্ভব নয় রে। যদি পারি তো বিয়ের দিন একবার ঘুরে আসবোনে..!”
” আমি জানতাম তুই এটাই বলবি? তুই এমন কেন, একটু বাড়ি থেকে বের হো, ঘুরে বেড়া, জগতটাকে দেখ। এমনে ঘরে থাকিস তুই কেমনে দম আটকায় না তোর..?”
ফারিশা মৃদু হেসে উঠলো এই প্রসঙ্গ ছেড়ে সে আরেক প্রশ্ন তুলে ধরলো,
” জাহিদ কে বলেছিস..?”
ওপাশ থেকে আর উত্তর এলো না চুপ হয়ে রইলো তুবা।
” তুবা মন খারাপ করিস না। ভাগ্যে যেখানে আছে তোর কপালে, তুই চেষ্টা করলেও আরেক জনকে পাবি না। তাই এসব আবেগ মন থেকে মুছে ফেলে নতুন জীবনে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে যা..!”
তুবা কিছুটা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
” আমাদের মতো মেয়েরা আসলে ভালোবাসার পাওয়ার যোগ্য না নয়তো জাহিদ আমার মন বুঝেও এড়িয়ে চলতো বল, একটা ন্যাকামো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়াতো বল। ওরা আসলে আমাদের মতো আন-স্মার্ট মেয়েদের পছন্দ করে না, বন্ধু হিসেবে যে রেখেছে এই অনেক। কিন্তু আমার খুব ভয় করছে ফারিশা..!”
” কেনো কি হয়েছে.?”
ফারিশার কথা শুনে তুবা বললো,
” বড়লোক ফ্যামিলি বোইন। তারপর ও বাড়ির লোকেদের কথার ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে খুব ভাব তাদের । ওই বাড়িতে গিয়ে কী আমি চলতে পারবো বল। ওদের মন জয় করতে পারবো তুইই.. বল..?”
ফারিশা এবার না হেসে পারলো না। রেলিঙের কাছে ঝুঁকে এসে স্থির দৃষ্টিতে আকাশের পানে তাকিয়ে বললো,
” পরের বাড়ি হাজার করেও তাদের মনে জায়গা পাবি না তুবা এটা আমি নয় এটা সেই পুরোনো দিন থেকেই হয়ে আসছে , তারা কখনো তোকে আপন ভাববে না। দিন শেষে একটা না একটা ভুল ধরবেই তারা। আর যদি ভাগ্য ভালো হয় তো ভালোই আর না হলে ওই কথা শুনতে শুনতেই দিন যাবে তোর, তাই এসব না ভাবাই ভালো। তার চেয়ে মাথা ঠান্ডা করে ও বাড়িতে চলে বেড়াবি হাসিখুশিতে, কারোর কথা গায়ে লাগাবি না..!”
” মিলাদ তুমি কি কলছো..?”
” এই তো বাবা কাজ করছি..! ”
রান্নাঘরের দরজার সাথে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ। ফারিশা তুবার সাথে ফোনে কথা বলছে সেই সুযোগে থালাবাসন পরিষ্কার করার দায়িত্ব পড়লো ইরাদের ঘাড়ে। ইরাদ তো পড়লো বড্ড মুশকিলে, সে কি এসব করেছে আগে। বেসিনের পাশেই একটা বক্সে ভিমবার আর সুন্দর জাল-কাপড় রেখে দিয়েছে ফারিশা। ইরাদ এক নজর সেদিকে তাকিয়ে বেসিনের ভেতরে তাকালো দেখলো তিনটা প্লেট, চারটা বাটি, গ্লাস। ওমা সাথে আবার আচারের কিছু বোয়েমও দিয়েছে দেখছি তা দেখে ইরাদ বোয়েম টা তুলে ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে বললো,
” সব বুঝলাম কিন্তু এর ভেতরে কীভাবে পরিষ্কার করবো..?”
” হাত দিয়ে..?”
পাশ থেকে ইয়াশ বলে উঠলো মাথা উঁচু করে। ইরাদ পাশে তাকিয়ে ছেলেকে দেখতেই তার মাথায় একটা আইডিয়া এলো। সূক্ষ্ম হেসে ইয়াশকে চট করে কোলে তুলে নিলো তারপর বসালো বেসিনের তাকের ওপর আর তার পা দুটো ডোবালো পানি ভর্তি বেসিনের মধ্যে। বেসিনের মধ্যে ফেনা পানিতে ভর্তি যেনো। ইয়াশ তো পা রাখতে পেরে বড্ড খুশি । প্রফুল্ল স্বরে হেসে উঠলো আর বললো,
” মিলাদ ঠান্ডা মাম ইয়ে……..!”
ইরাদ এবার প্লেট গুলো পরিষ্কার করতে করতে বললো,
” আরও মজা হবে তুমি দেখবে কিন্তু মাকে বলা যাবে না। এবার মাকে বললে কিন্তু আমি রাগ করবো..?”,
বলেই ঠোঁট উল্টালে ইয়াশ দুই হাটুর ওপর দু’হাতের কব্জিতে ভর করে দুই গালে হাত রেখে বললো,
” আচচা বলবো না আমি.! ”
ইরাদ যেনো বিজয়ী হাসি দিলো এক নজর দরজার দিকে তাকিয়ে ইয়াশের বা হাত নিয়ে ঢোকালো বোয়েমের মধ্যে। সুন্দর করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বোয়েমের ভেতর পরিষ্কার করছে আর ইয়াশ পানি পেয়ে ভেতরে আঙ্গুল দিয়ে পানি নাড়ছে আর বলছে,
” এটা আবাল কেমন পানি হি.হি…!”
ইরাদ ছেলের হাসি দেখে নিজেও হেসে উঠলো এগিয়ে গিয়ে কপালে তার আলতো করে চুমু এঁকে দিয়ে বললো,
” আপনি এত সুইট কেনো বাবা..?”
ইয়াশ সুইট নাম শুনতেই চট করে বললো,
” শুইত মানে মিসটি ( মিষ্টি) আম্মু বলেচে..! ”
” ইয়েস.. গুড বয়। সব মনে আছে তো তোমার। তো আর কি কি পারেন আপনি..! ”
ইয়াশের গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ইরাদ তার কাজ সারলো আর বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,
” ইরাদ চৌধুরী তোর কী বুদ্ধি রে..! ”
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৭ (২)
বলেই ব্যঙ্গ হেসে উঠলো আর এদিকে ফারিশা দরজার কোণা থেকে টুক করে দু’জনের ছবি তুললো তারপর ভেতরে চলে গেলো চুপিচুপি । ফারিশা রুমে গিয়ে ফোনে ছবিটা দেখে মিটিমিটিয়ে হেসে উঠলো। বাবা-ছেলের খুনসুটি দেখে আর বাঁধা দিলে না। চুপচাপ বিছানা পরিষ্কার করতে লাগলো ঘুমানোর জন্য।
