তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৩
রিমঝিম বৃষ্টি
যার সাথে আজ গত বারো বছরের বেশি বন্ধুত্ব সে বিপদে সাহায্য তো দূর সামান্য কথার আঘাতে তাকে খোঁচা মারলো। হয়তো একেই বলে বিপদের দিন। এই দিনগুলো যেমন কষ্ট দেয়, তেমনই নিখুঁতভাবে শিখিয়ে দিয়ে যায় যে, কাউকে এক যুগ ধরে চিনলেই সে আপন হয়ে যায় না। মানুষের আসল রুপ দেখতে অন্তত একটা বিপদের ধাক্কায় যথেষ্ট। জাহিদ তাকে আজ সেই আঘাত টায় দিলো। জাহিদ জিসানকে চুপ থাকতে দেখে কিছুটা দমিয়ে রইলো বুঝলো কি থেকে কী তুলেছে সে কিন্তু কথা বললো না। জিসান কয়েক সেকেন্ড দম ধরে থেকে বললো,
” তোকে আসলে কিছু বলায় উচিত হয় নি। উল্টো বন্ধুত্বের মর্ম নষ্ট করলি আজ..!”
” জিসান শোন আমার মাথা ঠিক ছিলো না তোর কথা শুনে তাই কী থেকে কী বলে ফেলেছি সরি..!”
জিসান তীক্ষ্ণ হেসে উঠলো আর বললো,
” তুই আসলে সোনা আর রুপার তফাৎ বুঝিস না, হয়তো একদিন পস্তাবি। উমম পস্তাবি না, পস্তাতে তোকে হবে জাহিদ তা আমি দেখিয়ে দিবো তোকে। তবে ভাবিস না সম্পর্ক শেষ এখানে আমাদের, কখনো বন্ধুত্বের সাহায্য লাগলে সর্বদা এই জিসান শিকদার হাজির হবে, এই জিসান এতটাও পাষাণ নয় জাহিদ..!”,
বলেই জিসান গটগট পায়ে ভেতরে চলে গেলো তা দেখে জাহিদ দম ছেড়ে সেখানেই স্থির হয়ে রইলো।
” মিলাদ আম্মু কোতায়..?”
ইয়াশের গলা পেতেই ইরাদ মাথা ঝুঁকে উরুর দিকে তাকাতেই দেখলো ইয়াশ চোখ ডলছে। ইরাদ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
” এইতো আম্মু পাশেই আছে তোমার খালামনির সাথে কথা বলছে..?”
ইয়াশ উঠে দাঁড়িয়ে ইরাদের গলায় জড়িয়ে ইরাদের গালের সাথে নিজের গাল লাগিয়ে ঘুমো ঘুমো চোখে তাকিয়ে বললো,
” মিলাদ খিদে পেয়েচে আমাল..!”
ইরাদ ছেলের জড়িয়ে ধরা দেখে যেনো বেশ তৃপ্তি পেলো। সেও ছেলেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বললো,
” কি খাবে তুমি..?”
ইয়াশ ইরাদের আরেক গাল হাত দিয়ে টেনে বললো,
” আমি চিপ খাবো..!”
ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে ছেলের হাতখানা নিয়ে চুমু খেয়ে বললো,
” চলো তোমায় চিপস কিনে দেয়..!”,
বলেই কোলে করে বাইরে বেরিয়ে গেলো।
” তুবা কাঁদিস না আল্লাহ হয়তো তাকে তোর কপালে রাখে নি তাই হয় নি! ”
ফারিশার কাঁধে মাথা রেখে হিঁচকি তুলতে তুলতে বললো,
” দেখ আমি শক্ত হলেও বাবা রাস্তায় চলবে কীভাবে বল..!”
ফারিশা কথা বললো না আসলেই ব্যাপার ভাবার মতো। নিজের পরিবার, লোকজন চুপ থাকলেও পথচারী, এলাকাবাসী তারা তো বুঝবে না তারা শুধু মানুষ কে খুঁচিয়েই শান্তি পায়। জামাল উদ্দিন চিন্তায় শেষ যেনো পাশেই নিঃশব্দে বসে তিশা চোখের জল ফেলছে আর স্বামীর মাথায় তেল, পানি দিচ্ছে। পাশ থেকে তুবার মামা হঠাৎ বলে উঠলো,
” তিশা ছেলে তো একটা পেয়েছি কিন্তু কোনো কর্মই করে না একটা ছোট-খাটো দোকান আছে তবে ঠিকমতো বসে না হঠাৎ বসে..। ”
” তাই দেখো তো রাজি হলে তাকেই নিয়ে আসো এখন আগে মেয়ের মান বাঁচাই তো..!”
মায়ের কথা শুনে তুবা যেনো পাথর ন্যায়ে তাকালো তার বাবা-মায়ের দিকে। ফারিশা তা বুঝতে পেরে তিশাকে শান্ত গলায় বললো,
” আন্টি হুট করে কারোর সাথে এভাবে বিয়ে না দিলেই নয়..!”
” ফারিশা দিতে হবে এখন ওকে না চাইতেও। নয়তো কাল থেকে ওর জীবনে কী নামতে পারে তুমি বুঝতেই পারছো নিশ্চয়..! ”
তুবা এগিয়ে এসে মায়ের পায়ের কাছে বসে বললো,
” আম্মু আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাবো নিজে কিছু একটা করে চলতে পারবো তবুও আমায় যার তার হাতে দিও না আম্মু..!”
জামাল উদ্দিন মেয়ের কথা শুনে নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে বললো,
” মা রে বিয়ে টা করে নে, ছেলে ভালো তো..! ”
তুবা আর জবাব দিলো না। বাবার কথায় মাথা ঝুঁকে চোখের জল ফেললো শুধু।
ডাক্তার আসতেই ফারিশা তুবাকে নিয়ে পাশের রুমে গেলো। জিসান এগিয়ে এসে জামালের পাশেই বসলো। ডাক্তার চেক-আপ করে জানালো,
” তার প্রায়ই ছোটখাটো আট্যাক হয়েছিলো, কিন্তু সাবধান আর কোনো ধাক্কা দিবেন না নয়তো বড় বিপদ হতে পারে..! ”
ডাক্তার কিছু মেডিসিন লিখে দিতেই তুবার মামা ডাক্তার কে নিয়ে এগোতে গেলো। বাইরে এখনো লোকজনে ভরপুর তারা বসে বসে কেউ খাবার গিলছে আয়েশ করে তো কেউ আবার খাবার নিয়ে নিজের বাড়িতে চালান করছে, অথচ বাড়িতে যে শোক লেগেছে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। জিসান অনেকক্ষণ যাবত গম্ভীর হয়ে বসে থেকে থেকে ভারী শ্বাস ফেলে জামালের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আঙ্কেল এখন শরীর কেমন লাগছে..?”
” আর শরীর বাপ, মেয়েটাকে বিয়ে দিতে পারলে মরতাম না হয়.! আর পারছি না মেয়ের কান্না সহ্য করতে..!”
জামালের কথা শুনে তিশাও পাশ থেকে বলে উঠলো,
” বাবা ওর মামা একটা ছেলে পাইছে আমার বাপের বাড়ির ওইদিকে ওকেই বললাম নিয়ে আসতে..! ”
জিসান মুখ তুলে তিশার দিকে তাকিয়ে বললো,
” কী করে ছেলে..?”
তিশা হালকা শব্দ করে হাসলো। লজ্জা করে আর কী সবাই এরপর জেনে যাবে সবাই এমনিতেও যে, তার মেয়েকে কী না একটা বেকার দোকানদারের সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তিশা ছোট করে বললো,
” ছোট-খাটো দোকান চালায় শুনলাম..! ”
” আন্টি মানা করে দেন ওদের আসতে..! ”
জামাল ঘাড় বাকিয়ে জিসানের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
” পাগল হইসো এখন ছেলে কয় থেকে পাবো বলো সেই দুপুর থেকে বহুত হয়রানি হচ্ছে ওর মামা তারপর এতো খুঁজে খুঁজে একজনই পাইছে..! ”
জিসান অনুভূতিহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললো,
” আঙ্কেল আপনার মেয়ের জন্য তারা যোগ্য নয়
যদি ওর সাথে একটা সামান্য ক্যাফের মালিক বা হসপিটালের জব করে এমন ছেলে ঠিক করি আপনি কি রাজি হবেন..! ”
জিসানের কথায় তিশা আর জামাল দু’জনেই তড়াক চোখে তাকালো। তিশা আকুতি গলায় বললো,
” তা দিলে তো ভালোই হয় বাপ বরং আমাদের মতো কপালে ওসব সামান্য নয় বাপ অনেক বড়ো তাই মনে হয় না আসবে..! ”
” তোমার চেনা কেউ আসে বাপ একটু বলে না হয় দেখো..!”
জামালের কথায় শুনে জিসান চেয়ারটা এগিয়ে এনে কাছে বসে জামালের হাত টা নিজের মুঠোয় নিয়ে কয়েক সেকেন্ড দম ধরে রইলো। তারপর জোরে একবার নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
” আঙ্কেল যদি কিছু মনে না করেন আমি কী তুবাকে বিয়ে করতে পারি..?”
জিসানের কথা শুনে তিশা আর জামাল স্থির হলো ক্ষণিকের জন্য কেবল। তিশা জানে জিসানের পরিবার কেমন বড় পরিবার। তিশা অবাকের সুরে বললো,
” এ কি বলো বাপ এ তো আমাদের সৌভাগ্য কিন্তু তুমি মন থেকে বলছো তো নাকি আমাদের পরিস্থিতি দেখে বলছো আর তোমার পরিবার কী মানবে এসব..!”
জিসান শীতল কন্ঠে বললো,
” আন্টি আমার পরিবার কী বলবে না বলবে তা আমি দেখে নিবো, আমি জানি আমার মা কখনো আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়নি এবারও হবে না তা আমি ম্যানেজ করে নিতে পারবো। আপনারা শুধু বলুন রাজি কী না..?”
” রাজি মানে আলহামদুলিল্লাহ বাপ। তোমার মতো ছেলে হয় নাকি তুমি অনেক ভালো বাপ কিন্তু আমাদের যে বড্ড লজ্জায় ফেললে এমন প্রস্তাব দিয়ে। তোমার পরিবার কেমন আমরা সবই জানি, তুবা বলেছে কিন্তু সেখানে আমাদের এক চুলও নেই..! ”
জিসান জামালের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
” আমারও কিছু নেই আঙ্কেল সয়সম্পত্তি থাকলেই মানুষ বড়লোক হয় না, মানুষের ব্যবহার মানুষকে বড় বানায় তাই দ্বিতীয় বার এসব তফাৎ তুলবেন না আমার সামনে এখন বলুন রাজী কী না বিকেল হতে যাচ্ছে কিন্তু..? ”
তিশা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললো,
” রাজি বাপ তোমার মতো জামাই পাওয়া ভাগ্য আমাদের। আমাদের কোনো আপত্তি নেই..! ”
জিসান বসা থেকে উঠে বললো,
” আমি একটু তুবার সাথে কথা বলে আসি আঙ্কেল..?”
” আচ্ছা যাও দেখো কী বলে ও..?”
জিসান আর দাঁড়ালো না ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে যেতেই তুবার পাশে বসে থাকা ফারিশাকে এক নজর তাকিয়ে দেখলো তার যেনো চোখ জ্বলে উঠলো, বুকের মধ্যে যেনো এক শক্ত পাথর জেঁকে বসেছে যা আর নামবার নয় বোধহয়। জিসান ধীরে পায়ে এগিয়ে এসে ফারিশাকে বললো,
” ফারিশা..!”
জিসানের ডাকে ফারিশা সামনে তাকালো তুবাও ফোলা ফোলা চোখে তাকালো সামনে। জিসান তুবার দিকে তাকিয়ে বললো,
” ফারিশা একটু বাইরে যা তুবার সাথে কথা আছে আমার..!”
ফারিশা বসা থেকে উঠে কোনো কথা ছাড়াই বাইরে চলে গেলো। এই ঘরেই সে ইরাদ আর ইয়াশকে রেখে গেছিলো কিন্তু তারা নেই এখন তাই সেও একটু বাইরে ছুটলো তাদেরকে খুঁজতে। জিসান এসে সোজা তুবার পাশে বসলো। তুবাকে চুপটি করে বসে থাকতে দেখে জিসান খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে কিছুটা ঠাট্টার স্বরে বললো,
” তোর দোকানদার জামাই আসতিছে প্রস্তুত হো বিয়ের জন্য..! ”
তুবা কথা বললো না মাথা নিচু করে রইলো। তুবার চোখের জল ফেলতে দেখে জিসান এগিয়ে এসে মাথা ঝুঁকে বললো,
” চোখে এত পানি কীভাবে আসে তোর, তোর চোখের ভেতর কী টিউবওয়েল আছে থাকলে দে তো খায় একটু পানি তৃষ্ণা পেয়েছে খুব..!”
তুবা এবার মুখ তুলে তাকিয়ে নাক টেনে বললো,
” তুই মজা করছিস। এমনিতেও এলাকার লোক করছে এখন তুই কর। চলে যা তো এখান থেকে জিসান, বাড়ি ফিরে যা তোরা আমার মুখ আর দেখিস তা আমি অপয়া..! ”
” কেমন অপয়া একটু আমিও দেখতে চায়..! ”
তুবা চোখ বন্ধ করে কপাল চেপে ধরে জিদ করলো,
” জিসান প্লিজ যা এখান থেকে। এমনিতেও একটু পরে যার তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে। এই লজ্জা নিয়ে আমি তোদের সামনে থাকতে পারবো না মরে যাবো তাই প্লিজ তোরা সবাই এখুনি চলে যা আমার বাড়ি থেকে..!”
জিসান তুবার কথায় উরুর ওপর কনুই রেখে মুখে হাত দিয়ে বিরক্ত গলায় বললো,
” যাবো তে অবশ্যই কিন্তু বউ না গেলে আমি যায় কেমনে..?”
তুবা পাশ ফিরে জিসানের দিকে তাকালো আর বললো,
” মাথার তার ছিঁড়ে ফেলছিস..?”
” বিয়ে করবি আমায়। চল দু’জনের দুঃখ মিশিয়ে একটা সংসার করি নাম রাখি স্যান্ডু কাপল। ”
তুবা কয়েক সেকেন্ড জিসানের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আস্তে করে বললো,
” জিসান তোর কী মনে হয় আমি মজা পাচ্ছি এসবে..! তুই যা এখান থেকে আর প্লিজ এসব ফাজলামো করা বাদ দে..!”
” চল না দু’জনে বিয়ে করে ফেলি। তোর পরিবারের জন্য হলেও বিয়ে কর, বন্ধু হয়ে থাকিস না হয়..!”
জিসানের গম্ভীর কণ্ঠ শুনে এবার তুবা নড়ে উঠলো পাশ ফিরে তার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,
” তুই ফারিশাকে পছন্দ করিস জিসান তা ফারিশা না জানলেও আমরা সবাই জানি..!”
” তা তো জানিই কিন্তু অসম্ভবের পিছে গত পাঁচ টা বছর ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত আমি তুবা। ”
তুবা ফিকে হেসে উঠলো নিজের মাথার ওড়না খানা আরেকটু টেনে বললো,
” ভালোবাসতে পারবি কখনো আমায়..?”
জিসান স্থির হয়ে তাকালো তুবার মুখপানে। এর উত্তর কী দিবে তারও জানা নেই তা দেখে তুবা বেড থেকে নেমে চলে যেতে লাগলে জিসান পিছন থেকে তুবার হাত টেনে ধরলো কিন্তু তুবা তাকালো না।
” ভালো হয়তো বাসতে পারবো না এটা আমার থেকে আশা করিস না কিন্তু একটা বন্ধু হিসেবে না হয় থাকলাম আমরা প্লিজ অমত করিস না। একটাবার আন্টি আঙ্কেল এর কথা ভেবে না হয় রাজি হয়ে যা.!”
তুবা কথা বললো না ভারী শ্বাস ছেড়ে পিছনে সরে এসে পাশেই বসে পড়লো। একটা সম্পর্কে ভালোবাসা না থাকলে কী আর সংসার হয়। যেখানে ভালেবাসায় নেই, অনুভূতিই নেই সেখানেই দু’জনে বাস করবে কীভাবে? কিন্তু তার পরিবারের জন্য হলেও তাকে এটা এখন করতে হবে সামনে হয়তো তাকে অনেক ধকল, অনেক লড়তে হবে কিন্তু তাকে এখন এই সিদ্ধান্ত নিতেই হবে আচ্ছা জাহিদ কী তাকে এভাবে বলতে পারতো না যে, চল বিয়ে করি। তুবা মাথা নিচু করে বললো,
” ও কোথায় জিসান..?”
” তার কথা তুলিস না। আমার মনে হয় ও ভালেবাসার কাতারেই পড়ে না। এসব বাদ দে দ্রুত বল বাড়ি ফিরতে হবে কিন্তু..! ”
তুবা ঘাড় ঘুরিয়ে জিসানের স্থির হওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
” রাজি..!”
জিসান বসা থেকে উঠে তুবার হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
” তাহলে চল একটা না হয় অনুভূতিহীন সংসার শুরু করি, দুই ছ্যাঁকা খাওয়া মিলে একটা স্যান্ডু কাপল বানায়..!”
এমন পরিস্থিতিতেও জিসান কে ঠাট্টা করতে দেখে কেনো জানি তার জিসানকে এখন আসলেই একটা অনুভূতিহীন মানুষ বলে মনে হলো। পাশের রুমে গিয়ে দেখলো সবাই বসে আছে সাথে জাহিদ, ফারিশা, ইরাদও সবেমাত্র ইয়াশকে নিয়ে এসেছে। সবাইকে এক নজর দেখে জিসান জামালকে বললো,
” আঙ্কেল বাইরে কাজী সাহেব বসে আছে আমরা দু’জনে প্রস্তুত বিয়ের জন্য..! ”
জিসানের মুখে কথা টা শুনামাত্রই সবার মাঝে হঠাৎ জোরে করে ইরাদ বলে উঠলো,
” আলহামদুলিল্লাহ! ”
তার সাথে সাথে সবাই বলে উঠলো জিসান শূণ্যহীন চোখে ফারিশার হাসিমুখ খানা দেখলো শুধু। সবাই বাইরে চলে গেলো । তিশা তার স্বামীকে ধরে নিয়ে বসালো বাইরের প্যান্ডেলে। বাইরে থাকা আত্নীয়-স্বজন তো দমে গেলো মুর্হুতেই যখন শুনলো একটা ভালো জব করা ছেলে পেয়েছে, কারোর মুখ দিয়ে আর একটা কথাও বের হলো না যেনো। জিসান তুবার সাথে বসতেই কাজী ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আপনার পরিবার থেকে কে এসেছে..! ”
” জী আমরা এসেছি.! ”
পিছন থেকে ইরাদ হাত তুলে হাসিমুখে বললো। জিসান তাকালো না সেদিকে। ফারিশা ইরাদের এমন উৎসাহ দেখে বাঁকা চোখে তাকিয়ে শুধু দেখলো। ইয়াশ তো যেনো নতুন কিছু দেখছে, এমন সাজানো বাড়ি-ঘর, তারপর তুবাকে সাজুগুজু অবস্থায় দেখে তার মনে যেনো রঙ লেগেছে সে তো একটু পর পর হাত তালি দিচ্ছে আর বলছে,
” মিলাদ খালামনি কী কলবে এখন..! ”
জাহিদ গম্ভীর দৃষ্টিতে শুধু জিসানের কান্ড দেখছে। কাজী পাশ থেকে বলল,
” বাবা দেনমোহর কত বাঁধবো..?”
” লিখুন জিসান শিকদারের পুরো ক্যাফর মালিক আজ থেকে তার স্ত্রী তুবা ইসলামের সাথে পাঁচ লাখ টাকা লিখুন..!”
” নগদ দিতে হবে যে বাবা..! ”
কাজীর কথায় জিসান পকেট থেকে দশ হাজার টাকা বের সামনে টেবিলের ওপর রেখে বললো,
” তাহলে দশ হাজার লিখুন, আমি টাকা তেমন নিয়ে আসিনি। আপনি বিয়ে পড়ানো শুরু করুন।”
কাজী সাহেব এবার সবকিছু রেডি করে বিয়ে পড়াতে শুরু করলো তুবার সামনে হয়ে বললো,
” জামাল উদ্দিন এর বড় কন্যা তুবা ইসলাম, আপনি দশ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্যে নজরুল শিকদারের ছোট পুত্র জিসান শিকদার কে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে কী রাজী? রাজী থাকলে বলুন কবুল..?”
তুবা মাথা নিচু করে কাঁদছে তার কি আদৌ এমন সম্পর্কে যাওয়া উচিত। সে তো জাহিদকে ভালোবেসেছিলো। তার সামনে সে অন্য একজনের হয়ে যাচ্ছে জাহিদের কী একটু মন পুড়ছে না, কষ্ট হচ্ছে না তার। বিয়ের জন্য আজ তাকে খেলনা হতে হলো। না চাইতেও তাকে আজ এমন জায়গায় দাঁড় হতে হলো।
” আপনি এই বিয়েতে রাজী থাকলে বলুন কবুল..?”
কাজীর ফের ডাকে তুবা কাঁপা কাঁপা গলায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জিহাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,
” কবুল! ”
কাজীর কথায় তুবার তিন কবুল বলাতে সবাই এক সাথে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। এরপর কাজী জিসানকে বললো,
” নজরুল শিকদারের এর ছোট পুত্র জিসান শিকদার আপনি কী দশ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্যে জামাল উদ্দিন এর বড় কন্যা তুবা ইসলাম কে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে কী রাজী? রাজী থাকলে বলুন কবুল..?”
জিসান পাশ ঘুরে এক নজর ফারিশাকে দেখলো, ফারিশা জিসানকে তাকাতে দেখে মৃদু হেসে পাশ থেকে আস্তে করে বললো,
” কী রে বল..!”
জিসান সামনে ফিরে পাশে তুবার দিকে তাকালো। তার কাছে এই মুর্হুতে একটা মেয়ের সম্মান রক্ষা ছাড়া আর কিছুই মাথায় এলো না । আদৌ সে তাকে ভালোবাসতে পারবে কী না জানে না কিন্তু এই মুর্হুতে বিয়ে টা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায়ই দেখছে না । শান্ত গলায় তিন কবুল বলে উঠলো,
” কবুল! কবুল! কবুল..!”
” আলহামদুলিল্লাহ..! ”
পাশ থেকে জামাল উদ্দিন যেনো কেঁদে উঠলো এবার তার মেয়ের এত বড় বিপদ কেটে যাওয়ায়। তুবার মামা এসে সবাইকে মিষ্টি দিতে দিতে ইয়াশের সামনে ধরলে ইয়াশ বলে উঠলো,
” আমি দুইতা নেয়..!”
পাশ থেকে ইরাদ ছেলের কথা শুনে হেসে উঠলো আর বললো,
” তুমি দুইটা খেতে পারবা আমার টা নাও..?”
তুবার মামা হেসে উঠলো ইয়াশের হাতে দুটো দিতে দিতে বললো,
” নাও তুমি দুইটাও খাও। এটা কে তোমার বাবা..? ”
ইয়াশ মিষ্টি মুখে নিয়ে বললো,
” উফ এতা মিলাদ। আমাল বাবা কোতায়, নেই..? ”
ইয়াশের কথায় ইরাদ মুখ টা ছোট করে ফেললো তা দেখে তুবার মামা চলে গেলে পাশ থেকে ফারিশা তা দেখে ইয়াশকে নিজের কোলে নিয়ে বললো,
” চলো তো আমরা খালামনির কাছে যায়..! “,
বলেই নিয়ে চলে গেলো। ইরাদ আর দাঁড়ালো না বাইরের দিকে চলে গেলো।
চারপাশে মেহমান এখন নিঃশ্বদে কানাঘুষা করছে যে এত ভালো ছেলে কপালে জুটলো কীভাবে তার সেই ভেবে। জিসান দূরের দাঁড়িয়ে বাড়িতে ফোন দিয়ে তার মাকে সব জানালো।
তুবা বসে বসে কাঁদছে সামনে তাকিয়ে নি:শ্বদে, পরিস্থিতি তাকে আজ এমন জায়গায় দাঁড় করেছে যেখানে তার কাছে মনে হচ্ছে মরণ হলেই বুঝি ভালো হতো। জিসান দূর হতে তা দেখে ফোন কেটে দিয়ে এগিয়ে এসে একটা চেয়ার নিয়ে পাশে বসে তুবার দিকে ঝুঁকে এক নজর দেখলো তার টলমলে চোখখানা তারপর মলিন হেসে বললো,
” পৃথিবীতে সবচেরে বাজে মুর্হুত কী জানিস তুবা..?”
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২২
তুবা পাথরের ন্যায়ে কেবল বসে রইলো উত্তর দিলো না দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহিদের দিলে দৃষ্টি স্থির করে রেখেছে শুধু তা দেখে জিসান সামনে তাকিয়ে ফিকে হেসে উঠলো আর বললো,
” ভালোবাসার মানুষকে সাক্ষী রেখে অন্য একজনের নামে কবুল বলা..!”
