তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৫
রিমঝিম বৃষ্টি
সকাল ৭ টা বাজতেই বাইরে থেকে সবেমাত্র সূর্যের দেখা মিললো। আলো যেনো এসে সোজা ইয়াশের মুখে পড়লো। বেচারা কোলবালিশ কে আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়েছিলো গেলো ঘুমটা ভেঙে। নিভু নিভু চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসতেই পাশ ফিরে দেখলো তার মা ইরাদকে একদম আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে। ইয়াশ তা দেখে কিছুটা ঠোঁট উল্টে ইরাদের হাতের ওপর থুতনি ঠেকিয়ে দেখলো মায়ের মুখ খানা। ইয়াশ মায়ের দিকে তাকিয়ে হুট করেই ইরাদের হাত কামড়ে ধরে রাখলো। ইয়াশের দুধের দাঁত হওয়ায় ইরাদ তেমন ব্যাথা পেলো না শুধু সামান্য নড়ে উঠলো। ইয়াশ মাথা তুলে আশেপাশে তাকালো কি করবে সে খুঁজে পেলো না। বেড থেকে নেমে রুমের মধ্যে হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে দরজার দিকে চোখ পড়তেই দেখলো দরজার লক নিচে লাগালো ইয়াশের চোখ দু’টো চিকচিক করে উঠলো খুশিতে। একবার পিছন ঘুরে মাকে দেখে দরজার ছিটকানি টা আস্তে করে খুলে বেরিয়ে গেলো ছোট ছোট পায়ে। বাইরে বেরিয়ে পাশ ফিরতেই জিসানের ঘর দেখে এগিয়ে গেলো। জিসানের রুম আটকানো দেখে দরজায় হালকা হাত দিয়ে মেরে আস্তে করে বললো,
” জিতান উঠো নি এখনো। আমি দেখো উঠে গেচি..!”
ছোট্ট হাতের ধাক্কানো আর কতই বা জোরে হতে পারে কিন্তু ভেতর থেকে চট করে দরজা খুলে দিলো কেউ।
দরজা খুলে মাথা বের করতেই তুবা দেখলো সামনে কেউ নেই নিচে তাকাতেই ইয়াশকে চোখে পড়লো। ইয়াশ তুবাকে দেখে ভীষণ খুশি। হেসে বললো,
” খালামনি তুমি উঠেচো আম্মু ঘুমায় তুমি খেলবে..!”
তুবার ভোরের দিকে ঘুম ভাঙায় নামাজ পড়ে আর ঘুমোয় নি তার বাবা-মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছিলো তাই ফ্লোরের এক কোণায় জায়নামাজের ওপরেই বসে ছিলো কারোর দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ কানে ভাসতেই উঠেছিলো। তুবা ইয়াশকে ভেতরে নিয়ে দরজা আটকে দিলো। তারপর ইয়াশকে কোলে করে বেডের ওপর বসতেই ইয়াশ সামনে তাকিয়ে দেখলো জিসান সোফায় ঘুমিয়ে আছে তা দেখে তুবাকে জিজ্ঞেস করলো,
” জিতান এত ঘুমায় কেন..?”
বলেই হেসে উঠলো তা শুনে তুবাও মলিন হাসলো।
ইরাদের সবেমাত্র ঘুম ভাঙতেই নিজের কাছে ফারিশাকে দেখে মিষ্টি হেসে উঠলো আরেকটু আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বললো,
” আজকে আমার বেস্ট দিন হবে তোমার জন্য গুড মনিং এ্যাংরি বার্ড..!”
ফারিশা নড়েচড়ে উঠতেই ইরাদ চোখ দুটো বড় বড় করে ফেললো। কী করবে সে ভেবে কুল পেলো না ফারিশার চোখ খুলতে দেখেই সে চটপট চোখ বন্ধ করে ফেললো ঘুমের অভিনয় করলো। ফারিশা ঘুম ভাঙতেই ভাবলো পাশে ইয়াশই আছে তাই ভেবে ইরাদকে আরেকটু জড়িয়ে ধরে চোখ খুলতেই ফারিশার নিঃশ্বাস যেনো কয়েক সেকেন্ডের জন্য আটকালো। তারপর একে একে দুই মিলাতেই হাত সরিয়ে ইরাদের মুখের দিকে গরম চোখে তাকিয়ে বললো,
” নাটক না করে চোখ খুলুন..?”
ইরাদের থেকে কোনো আওয়াজ এলো না। ফারিশা ফের বলে উঠলো,
” ভালোই ভালোই উঠুন নয়তো মাইর খাবেন..! ”
ইরাদ নাটক করলো বেশ নিখুঁত ভাবে। হালকা নড়ে উঠে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
” উফ আরেকটু ঘুমাতে দাও তো আমায়..?”
ফারিশা মুখ বাকিয়ে চট করে ইরাদের কানের কাছে চিপ টেনে ধরতেই ইরাদ উঁরি উঁরি বলে জেগে উঠলো। মুখ কুঁচকে ফেলে বললো,
” ওমন করো কেনো একটু ঘুমায়ছিলামই তো…! ”
” রাতে কী বলেছিলাম..?”
” মনে পড়ছে না তো..?”
ইরাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
” বলেছিলাম কাছে আসবেন না তাহলে এখানে কী করছেন..?”
ইরাদ বাচ্চাদের মতো মুখ করে সটান হয়ে শুইয়ে পড়ে বললো,
” আসলে হয়েছে কী রাতে তখন ব্রেন ইন্তেকাল করেছিলো এখন ফিরে এসেছে তাই মনে পড়ছে না কিছুই..!”
বলেই উঠতে গেলে ফারিশা ইরাদের হাত টেনে ফের শুইয়ে দিয়ে বললো,
” ইয়াশ কোথায়..? ”
ইরাদ পাশ ফিরতেই দেখলো ইয়াশ নেই। ইরাদ আশেপাশ নজর বুলাতেই চোখে পড়লো দরজা খোলা তার বিচ্ছু ছেলে যে সুযোগ বুঝে বেরিয়ে গেছে তা ঠিক ধরে ফেললো। জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বললো,
” না মানে তোমার ছেলে বাইরে গেছে বোধহয় দরজা খোলা দেখছি..?”
ফারিশা ইরাদের কথায় পাশ ফিরে দেখলো দরজা খোলা। না জানি দু’জন কীভাবে শুইয়ে ছিলো কে জানে তা ফারিশা বালিশ দিয়ে ইরাদকে মেরে বললো,
” আপনার আসলেই লজ্জা নেই পারমিশন ছাড়া আমার কাছে এসেছিলেন কেন..? ”
ইরাদ মাইর খেতে খেতে বেড থেকে নেমে বললো,
” আরে এর জন্য পারমিশন নিবো কেনো, আমি কী অন্য মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছি। বিয়ে করেছিলাম কী বউ বানিয়েছি এমনি এমনি নাকি..?”
ফারিশা স্থির হয়ে কয়েক সেকেন্ড ইরাদের দিকে তাকিয়ে বালিশের সাথে মুখ ঢেকে চিন্তিত গলায় বললো,
” কেউ দেখেছে কী না কে জানে, আমি বাইরে যাবে কীভাবে..? ”
ইরাদ ফারিশার কথা শুনে নিজের চুলে হাত দিয়ে স্টাইল করে বলে উঠলো,
” কোই.. নেহি দেখা! সির্ফ ইয়াশ কি পাপ্পা নে দেখা..! ”
ফারিশা মুখ তুলে পাশে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাতেই ইরাদ শুকনো ঢোক গিলে বোকা বোকা হাসি দিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে ছুটলো।
দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ফারিশা নিচে যেতেই দেখতে পেলো ইয়াশ তুবার কোলে বসে আছে নিচে বসার রুমে। ফারিশা নামতেই ইয়াশ দাঁত বের করে হেসে বললো,
” আম্মু দেখো খালামনি সাজচে..! ”
ফারিশা এগিয়ে এসে ইয়াশকে কোলে নিয়ে পাশে বসলো আর তুবাকে বললো,
” ও কী তোকে জ্বালিয়েছে কখন যে উঠে বেরিয়ে গেছে এত পাজী..?”
তুবা নিচু গলায় বললো,
” না জ্বালাবে কেন ও তো গুড বয়..! চলে যাবি এখন.? ”
ফারিশা হেসে বললো,
” তো! তোর শশুর বাড়িতে থেকে আর কী করবো। আমার খারাপ লাগছে রে ভীষণ, একা একা থাকতে হবে এতদিন তোর সাথে ছিলাম..!”
” আমারও। আচ্ছা একটু তোর ফোনটা দিবি আম্মুর সাথে কথা বলবো..!”
তুবার কথায় ফারিশা ফোন দিলো তাকে তারপর তুবা তার বাসায় ফোন দিলো।
” কী রে ঘরে বউ থাকতে ছাদে কী করিস..?”
জিসান ইরাদের কন্ঠ পেয়ে সেখানেই ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ইরাদ এগিয়ে গিয়ে পাশে কিছুটা দূরুত্ব রেখে দাঁড় হতেই জিসান এর থমথমে গলার আওয়াজ পেলো।
” আপনি এই কাজটা টা না করলেও পারতেন? ”
ইরাদ সামনে ঘুরে রেলিঙের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে নির্দোষভাবে বললো,
” কোন কাজ ঠিক বুঝলাম না..!”,
বলেই পাশ থেকে গাছের ছোট্ট টপ টা হাতে তুলে দেখতে লাগলো। তা দেখে জিসান শক্ত গলায় বললো,
” তুবার বর পালানোতে আপনার হাত ছিলো তাই না । আমার ওপর রাগ না হয় বুঝলাম কিন্তু তুবার সাথে কেনো করলেন এটা..!”
ইরাদ পাশ ফিরে সূক্ষ্ম হেসে উঠলো ঠোঁট বাকিয়ে, এই মুর্হুতে ইরাদের চোখখানা দেখলে যেনো মনে হচ্ছে কিলার আই’স জিসানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বললো,
” টিট ফর টেট, সিম্পল..! তুই যা দিয়েছিস আমি তা ব্যাক দিয়েছি..!”
জিসানের রাগে কপালের রগগুলো যেনো ফুলে উঠলো। হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো আর বললো,
” সামান্য ফারিশার পিছ ছাড়ানোর জন্য আপনি এতো বড় নোংরা খেলা খেললেন..?”
” চেয়েছিলাম তো তোকে অন্য ভাবে আগুনে পোড়ায় কিন্তু সম্ভব হলো না প্ল্যান পরিবর্তন করতে হলো শেষবেলায়। কাবিশাকে ফারিশার খোঁজ তুই দিয়েছি তাই না। ”
হুট করে ইরাদের এমন কথায় জিসানের সব রাগ উবড়ে গেলো যেনো। তার দৃষ্টিতে কিছুটা রাগের বদলে এখন ভীতিকর ভাব ফুটে এলো।
” এসব ক..কী বলছেন আমি কেনো দিবো..? ”
ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে বললো,
” তুতলাচ্ছিস যে! ক্লাসমেট কাবিশা খান কে বলেছিলি ফারিশার কাছে আসতে যেনো ইরাদকে ছেড়ে দিতে বলতে পারে সে, কিন্তু হয়তো ভাবিস নি তারপর এমন ঘটনা ঘটবে এজন্য হসপিটালে যাওয়ার পর একটাবারের জন্যও ফারিশাকে বলিস নি চাকরি পেয়েছিস সেই খুশি নিয়ে যেই খুশি নিয়ে তুই দুপুরে সেদিন ফারিশার ফ্ল্যাটে গেছিলি চাকরির কথা জানাতে..?”
জিসান সামনে ঘুরে বললো,
” কে কাবিশা চিনি না আমি ওকে আর আপনি ভাবলেন কী করে ফারিশার কাছে পাঠাবো আমি এভাবে একজনকে..?”
” সব খবর আমি বাড়িতে বসেই পায় বুঝলি তো ভাবিস না আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকি। সেদিন ইচ্ছে করছিলো তো তোকে জানে মারি কিন্তু এই অপরাধ নিজের হাতে তুলে না নেওয়াই ঠিক মনে হলো তাই বেঁচে আছিস এখন অব্দি। দ্বিতীয় বার যদি এমন পরিকল্পনা করিস তো ভাবিস না আর ছাড় পাবি..!”
জিসান সোজা ঘুরে ইরাদের সম্মুখীন হলো তার তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
” এর সাথে তুবার লেনাদেনা কী..?”
” তুই জানতি তুবার সাথে যার বিয়ে হচ্ছে সে একজন ড্রাগ পাচারকারী কিন্তু তুই কিচ্ছু বলিস কেন? উমম.. আমি বলছি কারণ, তার বাবার জন্যই তুই চাকরি পেয়েছেন? এই বিয়ে আটকালে তোর চাকরি নিয়ে টানাটানি হতো তাই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ভুলে গেলি এক নিমিষেই । আর তুই জাহিদকে বন্ধুত্বের মর্ম বুঝাচ্ছিলি না আসলে ওটা তোর আগে ঠিক বোঝা উচিত..! ”
জিসান এর মুখ যেনো এবার বন্ধ হলো চিরতরে। আর একটি কথা বলারও সাহস হলো না। স্থির হয়ে ইরাদের পানে তাকিয়ে রইলো শুধু। তা দেখে ইরাদ গা দুলিয়ে হাসলো আর বললো,
” শোন ভাবিস না মেয়েটার কেউ নেই এখানে । যে আমার বউয়ের সাথে পাঁচ টা বছর কাটিয়েছে, পাশে থেকেছে তার জন্য যতটুকু করার করবো আমি ভাই হিসেবে তাই ভুলেও ওকে দুঃখ দিবি না নয়তো তোর সব কীর্তি কলাপের প্রুফ দৃশ্যমান করতে জাস্ট এক মিনিট লাগবে আমার সো সাবধান..!”
ইরাদ জিসানের দিকে তাকিয়েই হাতের থেকে টপটা সাইডে ধরে ঠাস করে ছুঁড়ে ফেলতেই টপ ভেঙে খন্ড-বিখন্ড হয়ে গেলো তার পর ইরাদ বাঁকা হাসি দিয়ে জিসানের কাছে কিছুটা ঝুঁকে এসে এক চোখ মেরে বললো,
” চেকমেট..!”,
বলেই হাসতে হাসতে পকেটে দু’হাত গুজে নেমে গেলো ছাদ থেকে। জিসান বুঝলো না এত খবর, এত তথ্য তাকে দিলো কে এসব ভেবেই রাগে রেলিঙের ওপর পাঞ্চ মেরে দিলো।
” বিকেলে যেতে ফারিশা থেকে যাও আরেকটু..?”
ফারিশা হেসে উঠলো আর বললো,
” না আন্টি আবার আসবো এক সময় আপনি একটু তুবার খেয়াল রাখবেন মেয়েটা দুঃখ পেয়েছে ভীষণ..! ”
জাহানারা হেসে উঠলো দূরে বসে থাকা তুবার দিকে এক নজর তাকালো সে জিসানের দুই বোনের সাথে কথা বলছে সুন্দর করে। জাহানারা সামনে ঘুরে ইয়াশের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
” তাই বলে এমন ভর দুপুরে চলে যাবে.?”
” সমস্যা নেই আন্টি বাড়ি ফিরতে হবেই তো? ”
জাহানারা পাশ ফিরে ইরাদকে দেখে শান্ত গলায় বললো,
” বাবা আবার এসো ঘুরতে আমাদের বাড়িতে। কখনো তো আসোনি যদিও আসলে ভালো করে আপ্যায়ণ করতে পারলাম না..!”
ইরাদ বিনয়ী সুরে বললো,
” না না কি বলছেন আন্টি যা করেছেন এতেই আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের বাসায় আসবেন একসময় সবাইকে নিয়ে তাহলে ভালো লাগবে..!”
” জি যাবো এক সময়.!”
দু’জনের কথপোকথন শেষ হতেই ফারিশা ইরাদের সাথে চলে গেলো। নজরুল শিকদার ঘুম থেকে উঠে নিচে নামতেই তুবাকে দেখে এগিয়ে এসে বসলো। নজরুলকে দেখে তুবা মাথা নিচু করে বললো,
” আসসালামু আলাইকুম.! ”
” আরে এ তো দেখছি জিসানের বান্ধবী বাহ্ ছেলে এই কাজ তো করলো আরও আগে করতো তাহলে আমি একটু শান্তি পেতাম। তা মা অসুবিধা হচ্ছে না তো এ বাড়িতে..?”
তুবা হালকা হেসে বললো,
” না আঙ্কেল..!”
নজরুল পাশ থেকে জারার দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বললো,
” দেখ তো এখনো আঙ্কেল বলছে আমায়..?”
তারপর তুবার দিকে তাকিয়ে বললো,
” আমায় কী বাবা বলা যায় না মেয়ে নাকি বুড়োকে পছন্দ হয় নি.?”
তুবার এবার কিছুটা টলমলে চোখে তাকিয়ে বললো ,
” সরি বাবা..!”
” যাক তাহলে মেয়ের মুখ থেকে বাবা ডাক শুনলাম! ”
পাশ থেকে নাইমা জারার হাত ধরে বললো,
” দেখো আপু বাবা নতুন মেয়ে পেয়ে আমাদের ভুলে গেলো..?”
জাহানারা চায়ের কাপ এনে স্বামীর হাতে দিয়ে পাশেই বসলো। নজরুল চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে তা শুনে বললো,
” তোরা তো এখন পরের ঘরের হয়ে গেছিস কিন্তু আমার সারা বাড়ি জুড়ে এখন আমার একমাত্র বউমায় রাজত্ব করবে। সেই তো আমাদের দেখে রাখবে তোরা তো আর দূর থেকে দেখতে আসতে পারবি না সবসময় তাই ওকে মেয়ে বানাবো না তো কী করবো হুম.!”
তুবা শুধু চোখ তুলে এক নজর লোকটাকে অবলোপন করলো। সে জিসানের বাড়িতে আসতো ঠিকই কিন্তু কখনো নজরুল কে এতটা ফ্রি ভাবে কথা বলতে দেখেনি আজ যেনো তাকে কিছুটা হলেও খুব কাছ থেকে চিনলো আর বুঝলো লোকটি বেশ নরম স্বভাবের। নজরুল পাশ ফিরে স্ত্রী কে বললো,
” তা ও বাড়ি থেকে আজ আসবে তো নাকি কোনো আয়োজন করার তলব দেখছি না যে.?”
জাহানারা তুবার দিকে তাকিয়ে বললো,
” ও বাড়িতে ফোন দিয়েছিলাম বললো, ওর বাবা একটু অসুস্থ তাই সুস্থ হলে সাতদিন পর আসবে..!”
” আচ্ছা সমস্যা নেই বেয়াইসাহেব আগে সুস্থ হোক আপাতত তুমি আমাদের নিজেদের কয়েকজনকে ডেকে বউমার সাথে আলাপ করিও তা ওই গুণোধর টা কয় দেখছি না যে..?”
” দেখো গিয়ে ছাদে আসে বোধহয়..! ”
নজরুল উঠতে উঠতে বললো,
” যায় কথা বলে আসি আগে..? নিশ্চয় মুখ লুকিয়ে আছে আমার আসার কথা শুনে..!”
বলেই সিঁড়ির দিকে চলে গেলো।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরে সবাই ফ্রেশ হয়ে নিলো।
বাইরে সন্ধ্যা নামবে বলে কী। ইরাদ ফ্রেশ হয়ে রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসতেই ফারিশা এসে হাজির হলো। ফারিশা কে দেখে ইরাদ চোখ দুটো গোলগোল করে তাকিয়ে বললো,
” কিছু চায়.?”
” জি দুইশো টাকা দিন আমায়..!”,
বলেই হাত পাততো তা দেখে ইরাদ চোখ বড় বড় করে বললো,
” কিন্তু কেনো আমার এখনো চৌদ্দ দিন বাকি আমি দিবো না টাকা..!”
ফারিশা কোমরে হাত রেখে বললো,
” শুনুন ফ্রি তে বাসে নিয়ে গেলাম আবার নিয়ে আসলাম। আপনার পকেট থেকে খরচ করালে প্রায় পাঁচশো খানেক টাকা শেষ হতো আর সেখানে আমি মাত্র দুইশো চেয়েছি দেন জলদি রাতের রান্নার জন্য বসতে হবে আবার দেন দেন..?”
ইরাদ পাশ থেকে মানিব্যাগ থেকে দুইশো টাকা বের করে দিতেই চলে গেলো ইরাদ বাকি টাকা গুনতেই দেখলো আর মাত্র চৌদ্দশো টাকা আছে। তা দেখতেই ইরাদ ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। পাশ থেকে ফোন নিয়ে বাড়িতে ফোন দিলো তার দীদা রাজি হয়েছে কি না সেটা শোনার জন্য।
মাগরিবের আজান পড়তেই ফারিশা নামাজ পড়ে রান্না ঘরের ফ্লোরে বসে সবজি কাটছিলো। ইরাদ পাশের রুম থেকে নামাজ পড়ে ইয়াশ কে দেখার জন্য ফারিশার রুমে ঢুকে দেখে ইয়াশ নেই। পাশ ফিরে দেখে ওয়াশরুমে আওয়াজ হচ্ছে। ইরাদ এগিয়ে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজা সরাতেই জিহ্ব কাটলো ছেলের অকাম দেখে। ইয়াশ মাকে কাজ করতে দেখে ওয়াশরুমে এসে বালতি থেকে পানি নিয়ে মুখ ধুচ্ছে আবার কুলি করছে তো আবার হাত ভেজাচ্ছে। তার মাথার চুল সাথে গেঞ্জির হাতা অব্দিও ভিজে একাকার না জানি কতক্ষণ ধরে এই কাজ করেছে । ইরাদ দ্রুত এগিয়ে এক টানে ছেলেকে কোলে তুলে বললো,
” হায় আল্লাহ পানি নাড়ছো কেনো তুমি দেখোতো জামা ভিজিয়ে ফেলছো তুমি..?”
” আমি তো ওজু কলছি মিলাদ..!”
ছেলের কথা শুনে ইরাদ নিজের কপাল চাপড়ে বললো,
” বাবা ঠান্ডা লেগে যাবে তো..?”
দ্রুত বাইরে এসে বেডের ওপর দাঁড় করিয়ে মাথা মুছে জামা বের করতে লাগতেই ফারিশা রুমে এসে ছেলের এই হাল দেখে চোখ বড় বড় করে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,
” সাহস তো কম নয় তোমার এই সন্ধ্যে বেলায় তুমি ভিজেছো..! ”
মায়ের ধমক খেয়ে ভয়ে ছিঁটিয়ে গেলো ইয়াশ। ফারিশা এগিয়ে আসতে গেলে মাঝে গিয়ে দাঁড় হলো ইরাদ আর বললো,
” একদম বকবে না আমার ছেলেকে তুমি যাও কাজ করো আমি দেখছি ওকে..?”
ফারিশা রাগে বের হতে হতে বললো,
” ওর যদি জ্বর এসেছে না খবর আছে ওর। সামান্য পানি নাড়লেই ওর জ্বর আসে ওর তারপরেও কেনো পানির কাছে গেলো পাজী ছেলে..!”
বকা দিতে দিতে চলে যেতেই ইরাদ ছেলের দিকে ঘুরে দেখে ঠোঁট উল্টে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেকে গেঞ্জি পড়িয়ে দিতে দিতে বললো,
” আর মাম ছুঁবে না ঠিক আছে..! “,
ইয়াশ শুধু মাথা নাড়লো। ইরাদ জামা পড়িয়ে নিজের কোলে নিয়ে তার রুমে চলে গেলো।
ছেলেকে কোলে নিয়ে হাটতে হাটতে হঠাৎ অনুভব করলো গরমের ভাব।
” কী হয়েছে আমর বাবার তোমার শরীর গরম কেন.?”
ইয়াশ ইরাদের কাঁধে মাথা রেখে নিচু গলায় বললো,
” মিলাদ তুমি কী আমাল বাবা হও..?”
ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে উঠলো। ছেলেকে নিয়ে বেললনিতে গিয়ে দাঁড়ালো পিঠের হাত বুলিয়ে বললো,
” হ্যাঁ তো মিলাদ তোমার বাবা হয়, একটু কী বাবা বলে ডাকবে আমায়..?”
ইয়াশ মাথা তুলে ইরাদের মুখের কাছে এগিয়ে প্রশ্ন করলো,
” তুমি কোতায় ছিলে এতদিন বাবা। আমি কেন দেখতে পায় নি তোমায়..?”
ইরাদ ছেলের কথায় কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
” বাবা তো কাজে গেছিলো তাই আসতে পারে নি তুমি কী রাগ করেছো সরি বাবা.!”
” জানো মিলাদ দিয়ার বাবা সেদিন না দিয়াকে ঘুলতে নিয়ে গেচিলো আর একতা সুনদর জামা কিনে দিচে আল একতা গালি দিচে। তুমি কী আমায় দেবে কিনে..!”
ইরাদ ছেলের কথা শুনে কেনো যেনো তার বুক চিরে গেলো। এতগুলো বছর সে কী যে হারিয়েছিলো তার জন্য তার হাহাকার ছাড়া আর কিছুই করার নেই। ছেলের কথা শুনে যেনো চোখের কোনায় পানি এসে জমাট বাঁধলো ঝাপসা চোখে হালকা নিচু গলায় বললো,
” বাবা তোমায় সব জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাবে আর সবকিছু কিনে দিবে এবার, তুমি কষ্ট পেও না বাবা..!”
” তোমায় আমি মিলাদ বলে ডাকি..?”
ইরাদ ছেলের কপালে চুমু খেয়ে শান্ত গলায় বললো,
” আমি তোমায় জোর করবো না বাবা। তোমার ভালো লাগবে সেদিনই না হয় আমায় বাবা বলে ডাকবে আমি সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু বাবা তোমায় আর দূরে থাকতে দিবে না সোনা..!”
ইয়াশ তার বাবার গালে চুমু এঁকে বললো,
” তুমি খুব ভালো মিলাদ..!”
ইরাদ হেসে উঠলো ছেলের কথায়। ইয়াশ ফের কাঁধে মাথা রেখে বললো,
” মিলাদ আমায় ঘুলতে নিয়ে যাবে আমি গালি দেখবো..?”
” এত রাতে বাবা বাইরে যায় না আমি তোমায় সকালে নিয়ে যায়..! ”
ইয়াশ ঠোঁট উল্টে বললো,
” না এখুনি যাবো আমার ভালো লাগচে না..!”
ইরাদ ছেলেকে এমন নিতেজ হতে দেখে বুঝলো না এমন করছে কেন ছেলে এর ওপর আবার গায়ে হালকা জ্বরও দেখছে। কিছুদিন আগেই তো তার জ্বর এলো তাহলে আবার আসলো কেনো? ইরাদ বিষয়টা নিয়ে বেশ ভাবনায় পড়লো। ছেলের পিঠে আলতো করে হাত বুলাতে লাগলো আর বললো,
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৪
” বাবা তোমার কী শরীর ভালো..! ”
ওপাশ থেকে আর আওয়াজ এলো না শুধু ভারী নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ পেলো বুঝলো ছেলে তার ঘুমে তলিয়ে গেছে। ইরাদ আকাশের পানে চেয়ে উদাস গলায় বললো,
” আল্লাহ তুমি আমার সুখ নিয়ে সব আমার ছেলেকে দাও। আমি আমার ছেলেকে সেই ভালোবাসা দিতে পারে নি যা তার প্রাপ্য ছিলো। ”
ইরাদ চোখ বুজে ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বললো,
” বাবা তোমায় সব খুশি দিবে আমার কলিজা আর কষ্ট পাবে না। ”
