তোকে ছুয়েছি আঁধারে পর্ব ৪৩
ভূমিকা তালুকদার
লিয়ানা নিস্তেজ হয়ে পুরো শরীরের ভার জায়ানের উপর আরোপ করতেই বহিরাগত গুলির শব্দ ভেসে আসে।শব্দটা এতোটাই জোরালো ছিলো যে জায়ান ততক্ষণাৎ লিয়ানার কান দুটো চেপে ধরলো। যেনো শব্দ টা লিয়ানা না শুনতে পায়। লিয়ানা এতোটাই জায়ানের অন্তস্তলে ধ্যানমগ্নে বিভর যে দূরস্থ ঝাঁঝালো শব্দটা তার কান অব্দি তো পৌঁছলোই না উল্টো জায়ান এহন ভাবে তার কান চেপে ধরায় লিয়ানা বিচলিত হয়ে জায়ানের গাল স্পর্শ করে ব’লে,
-“কি হলো।এভাবে কান ধরেছেন কেনো”
জায়ান লিয়ানাকে আরেকটু নরম ছোঁয়ায় জড়িয়ে ধরলো।তার দৃষ্টি স্থির তাবুর বাহিরে। ওপাশের কিছু স্পষ্ট দেখা না গেলেও জায়ানের চোখ এড়ালো না যে সমুদ্রের বালির উপরে কেউ আছে।ভাবনার মাঝে থাকাকালীন আরেকটা শব্দ হয়।জায়ান তড়িঘড়ি করে লিয়ানার গোলাপি ঠোঁটজোড়ায় আঙুল ছুঁয়ে হুশশশ!করে তাকে চুপ থাকতে ইশারা করে।লিয়ানা কিছুই বুঝলো না জায়ান কি বুঝাতে চাইছে তাকে।তাও স্বামীর কথা মান্য করে আর টুঁশব্দ অব্দি করলো না।জায়ান একবার নিজের হাতের রিচ্ওয়াচ্ এর দিকে দৃষ্টি ফেলে সময় দেখে নিলো।হ্যাঁ রাত বারোটা শেষ হয়ে আরেকটা দিন শুরু হয়ে গিয়েছে।জায়ান লিয়ানাকে শুইয়ে দিলো নরম কোশনে।জায়ান পাশ থেকে শার্ট গায়ে জড়াতেই লিয়ানা জায়ানের শার্টের কলার চেপে ধরে প্রশ্ন করে বসে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“কোথায় যাচ্ছেন”
জায়ান ছোট্ট করে লিয়ানার কপালের মাঝে শুষ্ক ঠোঁট স্পর্শ করে ব’লে,
-“কোথাও না সুইটহার্ট। ঘুমিয়ে পড়।”
-“মিথ্যা বলবেন না।আমি আপনার চোখ দেখলে বুঝতে পারি সব।আমার মধ্যে যে একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে তা কি আপনি জানেন না? আমি মানুষের চোখ দেখলে বুঝতে পারি তার মনে কি চলে।আপনি বাহিরেই যাবেন।আমিও যাবো।নিয়ে চলুন।সুন্দর মুহূর্ত নষ্ট কেন করলেন।”
জায়ান একটু ঝুঁকলো লিয়ানার দিকে দুজনের মাঝে দূরত্ব গ্লান করে জায়ান নরম পুরুষালী কন্ঠে ব’লে,
-“আচ্ছা।মন পড়া শিখলি কবে থেকে। কবে এতো বড় হলি লিন।আমায় বুঝার ক্ষমতা হয়েছে বুঝি তোর?”
-“কেনো হবে না উকিল সাহেব। প্রত্যেকটা স্ত্রী যে তার স্বামীর মন পড়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। আপনি জানেন না,আমি যে আপনার পাঁজরে হাড় দিয়ে সৃষ্টি। ”
জায়ান ভ্রু নাচিয়ে চোখ ছোট করে ব’লে,
-“ওরেহ।কে বললো এ-সব তোকে?”
-“আপনার সুন্দরী বুড়ি।বলেছিলো একদিন আমাকে যার পাঁজরে হাড় দিয়ে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা আমি নাকি তার কপালেই আছি।তোহ।
-“জ্বি ম্যাডাম অনেক হ’য়েছে মন পড়া পড়ি।অবশ্য মনের মনি কুঠায় যার বাস সে যদি আমার মন নাই পড়তে পাড়ে তাহলে তো ভুবনমোহিনী তে আর কারোর সাধ্যি নেই এই পাথর মন ভেদ করার।”
জায়ানটা বড্ড কঠিন কথা বলে।লিয়ানা এতো গভীরভাবে বুঝতে পারে নাকি।সে তো খরস্রোতা নদীর জোয়ার বুঝতে পারে তবে মহাসাগরের ঘূর্ণিবাক কি করে বুঝবে।ছোট্ট বেলা থেকে লিয়ানার মা তাকে সবসময় বুঝিয়ে এসেছে। এতো মিশুক হস না লিয়ানা।তুই মানুষকে যতটা বিশ্বাস করবি কাছে টানবি মানুষ ততটা বিশ্বাসের যোগ্য না।তবে কে শুনে কার কথা লিয়ানা তো যার সাথে ভাব জমাতো তার সাথে মন প্রান উজার করে বিশ্বাসের আসনে বসিয়ে দিতো।তবে কখনো যদি কারোর কথায় আঘাত পেতো চুপ থাকতে পারতো না তাকেও দু’চার কথা শুনিয়ে দিতো।তিক্ত কথা।
পড়ে আবার নিজেরি মন খারাপ হতো।ইশশশ।আমি কি বেশি বাজে ব্যবহার করে ফেলেছি নাকি।যদিও লিয়ানা তার বান্ধুবিদের সাথে বেশি রাগ করতো।সবসময় মেরিন আর রিমা এসেই রাগ ভাঙ্গাতো।খান বাড়ির সকলের সাথে রাগ করতো, মাইশা, আরিশা,রিহান,,রাগ হলেই দরজা বন্ধ করে বসে থাকতো।সকলে হাতে পায়ে ধরে রাগ ভাঙ্গাতে হতো।তবে কেনো এখন রুল’স ব্রেক করছে লিয়ানা সবার জন্যে এক নিয়ম জায়ানের জন্যে কেনো তা ভিন্ন।সে যেনো চাইলেও মন ভারী করে বসে থাকতে পারে না সামনে থাকা মানুষটার থেকে।মার খেয়েও মন ছুঁটে যায় তার পিছু।যদি ভালো থাকার আরেক নাম জায়ান হয় তাহলে সে মানুষটার কড়া কথা মেনে নিয়েও ভালো থাকতে পারবে লিয়ানা।ভালোবাসতে পারবে। বিশ্বাস করতে পারবে।বড় আম্মু বলা একটা কথা মনে করে লিয়ানা মৃদু হাসলো,
-“সুখ কখনো মানুষের পিছু নেয় না রে মা।মানুষি সুখের পিছু নেয়।অথচ দেখ মানুষ দুঃখের ছায়া না মারাতে চাইলেও দুঃখ পিছু ছাড়ে না।”
লিয়ানার গাঁছাড়া স্বভাব দেখে প্রায়সহ বলতেন, “নারীদের কোমলতা কঠোরতা দুটোই থাকতে হয় তুই কেন বুঝিস না।কবে বুঝি।নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে নেই আর তুই!”
জায়ানের ওষ্ঠোর ভাপসা ছোঁয়ায় ধ্যান বিঘ্নিত হলো উনবিংশতী লিয়ানার।দেখলো জায়ান ভ্রু উঁচিয়ে তাকেই দেখছো।কি সুন্দর চাহনি। লোকটা রেগে থাকলে যেনো আরও সুদর্শন লাগে তার কাছে।আর এতো কোমল চাহনি তো ছুরির ন্যায় বুকের মনিকোঠায় বিঁধে যায়।গাল দুটো কেমন লাল রঙা হয়ে গিয়েছে তার।একটু দুষ্টু হেসে ব’লে,
-“আপনি এতো হ্যান্ডসাম কেনো? ”
জায়ান তাবুর চেইনটা খুলছিলো তবে লিয়ানার এমন কথায় হাত স্থির রেখে ঘাড় ঘুড়িয়ে একটুও অবাক না হয়ে বললো,
-“মিসেস লিয়ানা খানের হাসবেন্ড তো তাই।”
-“কি বললেন।শুনতে পাইনি আবার একবার বলবেন।”
জায়ান বুঝতে পারলো লিয়ানা ইচ্ছে করে শোনার ভান ধরেছে,ঠোঁট কামড়ে তাবুর চেইনটা খুলে বাক্যে ছুঁড়ে চলে যায় সে,
-“এক মৃত বাগানের মধ্যিখানে ফুঁটে থাকা সাদা গোলাপের প্রেম তো তাই বোধয়।”
জায়ান বাহিরে বেরিয়েই সি -বিচের দিকে হাঁটা দিলো,খালি পায়েই বালির উপর হেঁটে চলছে।শার্টের হাতা গুটিয়ে হাঁক ছেড়ে উঠে,
-“তুই না-হয় রাত পেঁচা মানলাম,তাই বলে মেয়েগুলোর ঘুমের বারোটা তো বাজাচ্ছিস,আর আমার রোমান্সেরও।এতোদিন জানতাম মেয়েরা হিংসুক হয়।এখন দেখি তোরা এর তিন-ডবল।ইট’স ভেরি ব্যাড ম্যানারস্ মার্কো”
মার্কো সমুদ্রের পাড়ে পা ভিজিয়ে বন্দুক তাক করে রেখেছে পানির মাঝবরাবর।রাতের আঁধারেই মার্কো ওয়ার্কআউট করতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।এমনিতেও মার্কোর ঘুম খুবই কম।হাতে গুনায় দুই তিন ঘন্টা ঘুমোবে আর সারা রাত জেগে কাজ করবে।তাই তো নাদিয়ারা মার্কো নিক নে’ইমও রেখেছিলো রাত পেঁচা।নাদিয়াতো ভেবেই পায় না মার্কো ঘুমায় কখন।একটা মানুষের ঘুম এতো পাতলা হয় কি করে।
জায়ানকে আসতে দেখে মার্কো বন্দুকটা নামিয়ে বু’ক পকেটে রেখে দিলো।ঘাড় অব্দি বড় বড় চুলগুলো কেমন বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে মার্কোর।চোখে পাপড়ি না ফেলে জায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।মার্কো তেমন কারোর কথা শুনেনা।তবে বিপরীতে আবার জায়ানের সকল সিদ্ধান্তে অটোল থাকে।তা না করে কি করবে।ভাই হয় যে। হ্যাঁ ভাই, ভার্সিটিতে জায়ানের হাতে যেদিন তুমুল মার খেয়োছিলো।সেদিন প্রথমবারের মতো নাদিয়ারা মার্কোর মুখে হাসি রেখা দেখেছিলো।সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভার্সিটির গ্যাং লিডার মার্কো মা’র খেয়েও বিপরীতে জায়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে একটা কথাই ব’লেছিলো,
“ভাই হবি আমার ভাই।”
জায়ান মার্কোর গাঁ ঘেষে এসে দাঁড়াতেই মার্কো পকেট থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে জায়ানের দিকে দেয়।জায়ান মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়ায় সে খাবে না।একটু পিছিয়ে শুকনো বালির উপরে বসে পড়ে।মার্কো গিয়েও সেখানে বসে।জায়ান সমুদ্রের জলে চোখ ফেলে গম্ভীর স্বরে ব’লে,
-“ঠোঁটের কোণে এখনো মধু লেগে আছে। নিকোটিনের ধোঁয়ায় তা হারাতে চাই না।”
মার্কো কপাল তিন ভাঁজ করে হাতদুটো বালিতে রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস টানলো। মার্কো যদি ঠিকভাবে হাসতে জানতো তাহলে সে এখন খিলখিলে হাসতো।তবে পুরুষদের যে এভাবে হাসা মানা।এমন হাসি শুধু নারী ঠোঁটই মানায়।মার্কো ওষ্ঠাধর চেপে ধরে পরক্ষণেই নিঃশ্বাস ছেড়ে ব’লে,
“-মধু!উহুম।তোর তো আবার পার্সোনাল মধুর চাক আছে।এর জন্যেই তো বলি ইদানীং জায়ানের চোখে মুখে মধুময় দৃষ্টি, নাজুক হাসি কই থেকে আসে।”
-“শালা শু*য়োর,এতো যদি বুঝিস।তাহলে মুড খারাপ করালি কেনো।”
-“ওয়েট ওয়েট।আমি আবার কি করলাম ভাই।”
-“কি করিস নি।সেটা বল।তোর জন্যে আমার রোমান্সের সান্ডে মান্ডে ক্লোজ হয়ে গিয়েছে। ”
-“ওরি বাস্।এখন যতো দোষ মার্কো ঘোষ।”
-“কানে গালে দু চার ঘা পড়লে না দোষ ভুল বিবেচনা করার শিখে যাবি,মাদার*বোর্ড ”
মার্কো ঠোঁট বাকিয়ে হাত দিয়ে চুলের শিশির বিন্দু গুলো ঝেরে আগ্রহস্বরে ব’লে উঠে,
“-ইতালি যাওয়ার কথা লিয়ানা জানে?বলেছিস।”
-“না”
-“এখনো বলিস নি কেনো।”
-“মন খারাপ করবে যে।কষ্ট পাবে।মেয়েটাকে রেখে আমি কিভাবে যাই বল তো।”
-“আর কোনো অপশান নেই জায়ান।লিয়ানাকে নিতে পারবি না তুই ভালো করে জানিস।আর ইতালি যেতেই হবে আমাদের।এলেনার সাথে কথা বলেছি আমি।নূরির বদলে এলেনা যাবে।নূরি থাকবে লিয়ানার কাছে।”
-“অনেকটাদিন তো মার্কো।মেয়েটা থাকতে পারবে না আমাকে ছাড়া।”
মার্কো জায়ানের কাঁধে হাত রাখলো।ভরসা দিলো।তবে জায়ানের পাথর হওয়া নিষ্ঠুর মনটা কখন যে নিষ্ঠুরতার ভুলে চিন করে উঠলো। এমন শব্দধ্বনি কেন কানে আসছে।এমনটা হওয়ার কথা ছিলো না কোনো কালে।তরঙ্গধ্বনিটা বাড়তে লাগলো।এ কেমন অনূভুতি যার মানে জায়ান আজ অব্দি বুঝতে পারলো না।তবে তাই হলো।
রাতের শেষ প্রহর।মেরিন শুয়ে আছে মিসেস হাবের আপর পাশে।এতো রাত হলো তাও ঘুমোতে পারছে না।শুধু কৈ মাছের মতো বিছানায় নড়েচড়ে ওঠছে।এতোবার ঘুমানো চেষ্টা করেও পারছে না।এদিকে মিসেস হান হাতির শুর ফেলে ইয়া বড় বড় করে কেমন নাক ডেকে ডেকে ঘুমোচ্ছেন।এনার নাক ডাকার শব্দ এতোটাই যে দেয়াল ফেটো শব্দ বের হওয়ার ন্যায়।তবে বিশাল এম্পায়ার মজবুত দেয়াল সাউন্ড প্রুফ বলে মনে হয় বেঁচে গিয়েছে। হাবিজাবি চিন্তা মাথায় ঘুড়পাক খাওয়ার ফলে মধ্যি রাতেও ঘুম হলো না তার।রাত জাগলে যে পেটে ক্ষিধে পায়।পেটের ভিতরটা কেমন মুচড়ে মুচড়ে উঠছে।
আর পারলো না মেরিন শুয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।জানালার থাই দিয়ে বাহিরে চোখ পড়তেই দেখলো।কতগুলো কালোপোশাক পড়া লোক পুরো এম্পায়ার পাহাড়া দিচ্ছে।দিনের বেলা শুধু দু’জন লোক থাকে।অথচ রাত হলে কেনো এতো গুলো হাতির মতো গার্ডস কড়া নজরে রাখে, তা ভেবে পায় না মেরিন।যেনো এটা কোনো সাধারণ বাড়িই না, মনে হয় কোনো গুপ্তধন লোকানো। ভেতর থেকে ভয়টা এখনো পুরোপুরি কাটেনি তার।রাত হলে নিজের সাথে হওয়া ঘটনাটা নাইটম্যায়ার হয়ে হানা দিতে থাকে প্রতিনিয়ত।মেরিন দূর্বল প্রকৃতির মেয়ে না তাও সেদিনের পর থেকে কেমন ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে ওঠে।তার জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তোবা পাচারকারীদের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারতো না।
হাত দিয়ে হাঁটু সমান চুল গুলো পেঁচিয়ে বড় খোপা করে নিলো।কিচেনের কাছে গিয়ে ফ্রিজ খুলে খাবার বের করবে তবে হঠাৎ সিঁড়ি দিকে চোখ পড়তেই কিসের যেনো ছায়া দেখতে পায়।লম্বা।ভয়ার্ত নয়নে সামনে এগিয়ে নিচু স্বরে ব’লে উঠে,
-“ক..কে?”
উপরে করিডর দিয়ে যেনো কোনো ছায়ামূর্তি ছায়া নজর কারলো।শ্বাস ভারী হয়ে উঠলো মেরিনের।বুকের মধ্যে সাহস সঞ্চার করলো।বাহিরে কড়া পাহাড়া।বাহির থেকে কেউ ঢুকতে পারবে না।এম্পায়ার শুধু তিনজন আছে তারা ।মেরিন,মিসেস হান,আর সাদা চামড়ার লোকটা মানে এলেক্স। এলেক্স অত্যধিক ফর্সা গড়নের হওয়ার কারণে তার কাছে কেমন ফ্যাকাসে লাগে।পুরুষ মানুষ হবে শ্যামবর্ণা।এমন সাদা চামড়ায় কেমন চোখ জ্বলসে যায়।
দুইতলা দিকে পাঁ বাড়ালো মেরিন,এলেক্স অসুস্থ। মিসেস হান ঘুমোচ্ছে। তবে এতো রাতে কাকে দেখলো সে।যদি বিপদজনক কেউ হয়।ক্ষতি করে তাদের।তাহলে চেঁচিয়ে উঠবে।গার্ডদের ডাকবে।সেই ভেবেই দু-তলার করিডর পেরিয়ে এগোতে লাগলো।তবে হুট করে কেউ যেনো বা পাশ দিয়ে তাকে ধাক্কা মেরে ভারী পায়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে।ম্যানশনের করিডরে লাগালো হালকা জ্বলে উঠা সোনালি লাইটের আলোয় পিছন থেকে দেখে চিনে ফেললো মেরিন এটা যে এলেক্স। তবে এভাবে ভাবলেশহীন হাঁটার কারণ বুঝতে পারলো না।কিছু টা ভয় অনুভূতি সৃষ্টি হলেও দাঁড়িয়ে রইলো ঠাঁই হয়ে।দেখলো এলেক্স করিডরের শেষ সীমানায় গিয়ে আবার তার দিকেই আসছে।মূহুর্তে মেরিনের ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায়।ঠোঁট গলে এক ছোট্ট বাক্যে বের হয়ে আসে,
-“হায়।হায়।লোকটার কি ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস আছে নাকি।”
এলেক্স মেরিনকে পাশ কাটিয়ে যাবে ততক্ষণাৎ মেরিন এলেক্সকে স্ব সশব্দে ডেকে উঠে সামনে এগিয়ে আসতেই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে বসে।হুট করে মেরিন এলেক্সের বুকের উপর হুমড়ে পড়তেই এলেক্সর ঠোঁট ছুঁয়ে যায় মেরিনের কপাল।যেনো মূহুর্তেই এলেক্স পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর জিনিসকে ছুঁয়ে ফেলেছে। নিঃশ্বাস আটকে এলো মেরিনের এলেক্সে জোরে থাক্কা মেরে ফেলে দিলো ঠান্ডা ফ্লোরে।এলেক্স ধপ্ করে পড়তেই চোখ মেলে তাকিয়ে সামনে মেরিনকে দেখে, হুঙ্কার দিয়ে উঠে,
“-ফা’ক।আমি পড়লাম কি করে।”
মেরিন শুকনো ঢুক গিলে বলে উঠে,
-“আপনি ঘুমের মধ্যে হাঁটছিলেন।”
-“তুমি এখানে এসেছো কেন।”
-“চিল্লাচ্ছেন কেনো।আমি ভেবেছিলাম ডাকাত হবে।”
মেরিনের কথায় এলেক্স ঠোঁট কামড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে,হাতে খুব জোরে ব্যথা পেয়ে বসে আছে।
-“তেমাকে শুধু শুধু বোকা বলি না আমি।যাও এখান থেকে। ”
মেরিনের মনের ভিতর রাগ জমে উঠেলো।একে তো মেরিনকে এখানে মিথ্যা বলে রেখে দিয়েছে। আবার কি তেজ দেখাচ্ছে।সেদিনও মেরিম তাকে দেশে পাঠানোর কথা বললো।আর এলেক্স জবাব দিলো আপাতত তোমাকে মে’ইড বলে পরিচয় দিয়ে দিয়েছি, হুট করে কিছু করা পসিবল না।সময় লাগবে।সে তো চুপচাপ শুনলো।আর আজ একে তো ঘুমের মধ্যে হাঁটে আবার তার কপালে চুমু বসিয়ে দিলো।মেরিনের খুব রাগ হলো।এটা যে তার ফার্স্ট কি’স ছিলো।দম আটকে এলেক্সের দিকে চোখ তোলতেই এলেক্স ভ্রু উঁচিয়ে ব’লে,
-“কি দেখছো।যাও।আর এতো রাতে রুম থেকে বের হবে না একদম।”
মেরিন আর কিছু বললো না। হাঁটা ধরলো বিপরীত পাশে।খুব করে কান্না পাচ্ছে তার।সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে নিজের গায়ের ওড়না দিয়ে চার আঙুলসমান কপালটা ঘষতে লাগলো।ঘষে ঘষে লাল বানিয়ে ফেললো।একটা বিধর্মী লোক হয়ে তাকে কি করে ছুঁয়ে দিলো।না এটা একদমি ঠিক হলো না।আচ্ছা এখন কি তার পাপ হবে!
ভোরের প্রথম আলো যখন দিগন্তের কিনারে উঁকি দেয়, সমুদ্র যেনো এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেগে ওঠে।
আকাশের ধূসর নীল রঙ গলে ধীরে ধীরে কমলালেবুর মতো মোলায়েম সোনালি হয়ে ওঠে।
দূরে গাঙচিলেরা ডানার ঝাপটায় আঁকে সূর্যের পথে ছোট ছোট ধবধবে সাদা দাগ,যেনো আকাশের গায়ে কবির লেখা কোনো গোপন প্রেমপত্র।
-“চল বাইক রাইডে।যে জিতবে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের বিল তার।”
মার্কো চোখের রোদচশমা খোলে এক ভ্রু উঁচিয়ে চোখ স্থির রেখে তাকালো নাদিয়ার পানে,
“-কি বললি আবার বল।”
নাদিয়া হাত গোল করে মুখের সামনে নিয়ে কেঁশে বললো,
“-কানে কম শুনিস কবে থেকে। বলেছি, যে জিতবে বিল তার।”
মার্কো ঠোঁট কামড়ালো।বাইক রাইড করে আজো পর্যন্ত নাদিয়ার জিতার কোনো নাম গন্ধ নেই।জানে মার্কোই জিতবে আর ইচ্ছে করে ডিনারের বিল ও তার ক্রেডিট কার্ড থেকেই দেয়াবে।তা আর নতুন কি।মার্কো বললো,
-“ফাইন।এবার আমারও একটা শর্ত আছে।”
নাদিয়া নড়েচড়ে উঠে জবাব দিলো,
-‘”উহু।কি?”
-“যে হারবে সে একটা চু’মু খাবে”
মার্কোর হঠাৎ এমন কথায় নাদিয়া হতবাক হয়ে চোখ বড়বড় অবিশ্বাসের ন্যায় তাকালো।বিষম খেলো।নাদিয়ার এমন হাল দেখে মার্কো একটি ঝুঁকে নির্ধিদায় ব’লে,
-“আমার বাইককে।”
-“What rubbish! কাকে?
-“এখন কি তুইও কানে কম শুনছিস নাকি।”
নাদিয়া দাঁত কটমট করে নিজের হাইহিল দিয়ে মার্কোর পাঁ এর উপর রেখে চাপ প্রয়োগ করলো।নাদিয়া জানে মার্কো উহ।শব্দ ও উচ্চারণ টুকুও করবে না।হলোও তাই।তামাটে মুখাবয়বে পড়লো না কোনো ব্যথার ছাপ।নাদিয়া নাক ফুঁসিয়ে ব’লে উঠে,
“কুকুর।শিয়াল।বন পাঠা।তোর কোনোদিন বিয়েই হবে না।”…. -কথা শেষ না করেই নাদিয়া গটগট করে সামনে অগ্রসর হতেই চোখ পড়লো জায়ান লিয়ানা তাদের দিকেই আসছে।মার্কো গাড়িতে হেলান দিয়ে নির্বিঘ্নে হিস করে ব’লে,
-” তাইতো বলি এই মেয়ের বিয়ে কেন হচ্ছে না।নিজের অভিশাপ নিজের উপর ডেঞ্জারাসভাবে পড়েছে সো স্যাড।”
সকালের ব্রেকফাস্ট শেষ করে সকলেই প্যারিসের উদ্দেশ্য রওনা হয়।দু’ঘন্টার জার্নিতে লিয়ানা সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিলো খেয়াল নেই তার।গাড়ি প্যারিসে প্রবেশ করতেই ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে হঠাৎ ব্রেক কষে ধরে জায়ান।আচমকা গাড়ি থেমে যেতেই লিয়ানা চোখ কচলে নাকে মন মাতানো সেই ব্লি ডিউ শ্যানেল পারফিউম এর ঘ্রাণে শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠতেই দেখে লিয়ানা র মাথা জায়ানের ফর্সা লো’মহীন বুকে।লোকটা সবসময় শার্টের দুটো গুতোম খুলে রাখে।তবে সে তো গাড়ির সিটে ছিলো এভাবে জায়ানের কোলে কিভাবে এলো।উফ।লোকটাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।লিয়ানা গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে গা হেলালো।গাড়ি চলছে না।আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো সিগনালয়ে বসে আছে তারা।যদিও গাড়ির গ্লাস লাগানো।বাহির থেকে ভিতর কিছুই দৃশ্যমান না তাও লিয়ানা লজ্জা পেলো।দাঁত দিয়ে অধর চেপে ধরে ব’লে,
-“আপনি কি বলুন তো।আমায় কোলে কেন উঠিয়েছেন কেনো।?
-“পজিশনটা একদম পারফেক্ট বেবি।ফি’ল চলে আসে।তুইও ফিল নেয়।”
-“গাড়ির মধ্যে কি-সব বলছেন।
লিয়ানার নজর পড়লো জায়ানের কন্ঠনালীর দিকে। কেমন যেনো কাঁপছে। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।জায়ান লিয়ানার টপের কলার দু আঙুলে ধরে নিজের মুখের কাছে টেনে আনলো।তাদের মধ্যেখানের সমস্ত দূরত্ব চুকিয়ে নিকোশ কালো মণিজোরা ঘোর লাগিয়ে মাতাল কন্ঠে বললো,
-“গাড়ি! What’s problem… ইউ নো সুইটহার্ট, বিদেশে মানুষ গাড়িতেও এক্কাদোক্কা খেলে।পাহাড়,সমুদ্রের ,ঘোড়ায়,কিচেন,সিঁড়ি, দোলনা,রাস্তা ম্যানহোল,in everywhere! যেখানে সুযোগ পায় সেখানেই লোডশেডিং জ্বালিয়ে দেয়।তুই চাইলে আমরাও…. ”
লিয়ানা কান দুটো লাল হয়ে গরম হয়ে উঠলো।জায়ান বাক্যে শেষ করার আগেই লিয়ানা জায়ানের মুখ চেপে ধরে নিলো।আরেক হাত কপালে রেখে শ্বাস টেনে বললো,
“-আপনার বডিতে যে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎের গতিতে কারেন্ট চলাচল করে তা আমি বুঝতে পেরেছি।মুখে তালা মারুন।”
“-গোবরেও পদ্ম ফুল ফোটে তার জলজন্তু প্রমান তোর মাথা,এতদিনে একটা রাইট কথা বললি।”
জায়ান লিয়ানার ললাটে হাতের গরম স্পর্শ দিতেই লিয়ানা পুরো শরীর শিরশির করতে লাগলো।জায়ান ঝুঁকে লিয়ানার কানে হিসহিসিয়ে ব’লে,
-“বেব।আমার বডিতে যতটুকু কারেন্ট আছে, তা দিয়ে পুরো প্যারিসের আলো জ্বলানো সম্ভব। বেড পারফরম্যান্সও করে বুঝলি নাকি।”
লিয়ানা জায়ানের এমন লাজহীন কথার পাল্টা জবাবে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
-“লাইট অন করার জন্য নিশ্চয়ই আমার আঙুলের একটা ইশারাই যথেষ্ট। এবার বলুন কার পাওয়ার বেশি। ”
ইতিমধ্যে গাড়ির সিগনাল অন হতেই সব গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সামনে যেতে লাগলো জায়ান লিয়ানার চুল ধরে নিজের বুকের সাথে লিয়ানাকে মিশিয়ে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।লিয়ানা নাজুক হেসে গাড়ির গ্লাস গলে বাহিরে দৃষ্টি ফেলতেই দেখতে পায় একটা বাইক তাদের গাড়ির সোজাসুজি।বাইকটা একটা ছেলে চালাচ্ছে।পিছনে একটা মেয়ে ছেলেটার কোমড় জরিয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। দৃশ্যটা লিয়ানার মন কাড়লো।লিয়ানার কখনো বাইকে চড়ার মন চায়নি।এমন তো অনেক দেখেছে,তবে এখন কেন ছন্নছাড়া হৃদয়খানা এদের মতো ভালোবাসার মানুষের সাথে খোলা আকাশের নিচে বাইক রাইড করে শীতল বাতাস উপভোগ করতে মন চাইছে।লিয়ানা মৃদু হেসে জায়ানের দিকে দৃষ্টি ফেলতেই জায়ান গাড়ি চালাতে চালাতে লিয়ানার দিকে না তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে,
-“বাইকে চড়বি?মন চায়।”
আশ্চর্য জায়ানকে তো লিয়ানাকে কিছু বললোই না।তাও বুঝে গেলো।মন কি লিয়ানা পড়তে পারে নাকি জায়ান পারে।লিয়ানা জায়ানের জ্যাল দেয়া চুলে আঙুল ঢুকিয়ে আঙুলের ডগায় তা পেঁচাতে পেঁচাতে বললো,
-“আমি কোনোদিন বাইকে চড়িনি”
“-আই নো।নতুন কিছু বল।উঠতে চাস?
লিয়ানা কপালে চার ভাঁজ তুলে ভরকে জবাব দিলো,
-” আপনি কি করে জানেন।আজব তো।”
-“আমি কি জানিনা সেটা জিজ্ঞেস কর।লিস্ট দিতে পারবো।”
জায়ান হটাৎ ব্রেক কষে ফেরারি টা দাঁড় করিয়ে দেয়।তবে লিয়ানা কিছু বুঝতে পারার আগেই জায়ান গাড়ির ডোর ওপেন করে নেমে পড়ে, লিয়ানা নেমেই দেখতে পায় একটা আধুনিক, কাঁচে মোড়া বিশাল ভবন।একটা শো-রুম শোরুমের সামনে লম্বা ফুটপাতজুড়ে
গভীর নীল আর সাদা রঙের BMW Motorrad
লোগো বেশ চোখে পড়ে।
দেয়ালে বড় করে লেখা,Bärenstark Motor Paris,সামনের পুরো অংশটা ফ্লোর-টু-সিলিং গ্লাস দিয়ে বানানো,ফলে ভেতরের উজ্জ্বল আলো আর বাইকের সারিগুলো।বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতাদের নজরে পড়ে যায়।লিয়ানা মাথায় হাত রেকে জায়ানের দিকে তাকায়।জায়ান ততক্ষণাৎ লিয়ানার হাত ধরে টেনে ভিতরে নিয়ে যেতেই শোরুমের ম্যানেজার জায়ানকে চিনতে পেরে হেন্ডশেক করে নেয়।এদিকে লিয়ানা হা করে দেখতে থাকে।রূপালি, কালো, নীল, মেটালিক ধূসর রঙেরBMW GS, RT,S1000RR, M-series
বাইকগুলো শো-পিসের মতো দাঁড়িয়ে আছে।ম্যানেজার জায়ানকে সব ব্যান্ডের বাইকগুলো ঘুরে ঘুরে দেখাতে থাকে।ম্যানেজার বললেন এখানে প্রায় পঞ্চাশটার মতো বাইক আছে।লিয়ানাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব’লে,
-“তোকে কি এখানে মোমের পুতুল হ’য়ে দাঁড়িয়ে থাকতে এনেছি নাকি।”
-“কি করবো আমি।”
-“কিছুই না।বেশ্ তুই যেই বাইকে হাত রাখবি, তোর স্বামী সেই বাইকে তোকে উঠিয়ে পুরো প্যারিস রাইড দিবে।যদি মন চায় সব গুলো কিনে নিতে পারি।চাইলে পুরো শো-রুম।
লিয়ানা ঠোঁট বাঁকালো, জায়ানের হাতে নিজের পার্লের পার্সটা ধরিয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো।হাত দিয়ে চুল নাড়িয়ে পিছন ফিরে ভ্রু নাচিয়ে হাসালো।
-“Hah! Money power!”
লিয়ানা kTM এ হাত রাখতেই জায়ান ম্যানেজার থেকে বাইকের চাবি নিয়ে লিয়ানার সামনে এসে গালে ছোট্ট চুমু খেয়ে পাওয়ার অরা মিশিয়ে ব’লে,
“-Yes,Darling! You are obsoletely Right!”
রাতটা যেনো আজ আর শেষ হচ্ছিলো না।প্যারিসের আকাশে একটা পাতলা কাঁচের চাদর জড়িয়ে ছিলো, শহরের আলোগুলো নরম হয়ে আসে। জায়ান হেলমেট পড়ে বাইক রাইড করছে, KTM এর ইঞ্জিনের গুঞ্জ। লিয়ানার মাথায় আরেকটা হেলমেট, জায়ানকে ধরে বসে আছে পিছনে।চোখে হালকা অবিশ্বাস,আজকের দিনটা কীভাবে এমন হঠাৎ করে এল, সে নিজেকেই বুঝতে পারলো না।এতো ভালো লাগছে।শীতও লাগছে তাও ভালো লাগছে।সারাদিন জায়ানের সাথে ঘুরলো।প্যারিস শহর সুন্দর জানতো তবে এতোটাও যে মন মাতানো তা কাছ থেকে না দেখলে লিয়ানা কখনোই জানতো না।যদিও জায়ান লিয়ানাকে Streetfood খাওয়াবে না বলে মানা করেছিলো, তাও লিয়ানা জেদ ধরে কতো কিছু খেয়ে নিয়েছে।ওয়াফেল,হট ডগ,ক্রেপ,পেনকেক।জায়ান কিছু খেলো না।শুধু রাতে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার করে শ্যাডো এম্পায়ারের উদ্দেশ্য বাইক চালিয়ে যাচ্ছে একমনে।হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা আইসক্রিম শপ দেখতে পেয়ে লিয়ানা চিল্লিয়ে জায়ানের কানের পর্দা ফাটাতে জায়ান বাইক থামিয়ে ব’লে,
-“কি? এভাবে বাইক থামাতে বলছিস কেন? ”
-“আইসক্রিম খাবো।”
জায়ান এবার বেশ্ রেগে গেলো।মূহুর্তেই রাগান্বিত স্বরে বলে উঠে,
“-ঠান্ডা লেগে যাবে খেতে হবে না।”
-“আপনি এনে দিবেন নাকি না।”
“-না বলেছি তো।”
-“আপনি আমার কথা কোনোদিনও শোনেন না কেনো,চোখে লাগে না বুঝি।”
জায়ান অবাক দৃষ্টিতে লিয়ানার দিকে দৃষ্টি ফেললো। কপালের শিরা গুলো মুহূর্তেই ফুলে উঠলো।চোখজোড়া এতোটাই লালবর্ণ ধারণ করেছে যে এখনি মনিকোঠা ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।জায়ান বাইক ছেড়েছে স্কুল লাইফে।তারপর আর বাইকের নাম অব্দি নেয় নি।লিয়ানার জন্যে দীর্ঘ বারো বছর পর আজ আবার বাইকে পাঁ রাখলো আর সে বলে তার কথা নাকি শোনে না।জায়ান নিজের হাতের হেলমেট টা রাস্তায় ছুড়ে মারলো।হেলমেটের গ্লাস ভাঙ্গতেই লিয়ানা আঁতকে উঠলো।ঠোঁট উল্টোলো।ঠোঁট জোড়া তীর তীর করে কাঁপতে লাগলো।লিয়ানা বাইকের গায়ে হেলান দিয়ে মুখ ঘুড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।তাকাবে না জায়ানের দিকে একদমি না।চোখে জল জমতে দিবে না কিছুতেই না।মন শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো।জায়ান নিজেই নিজের চুল খামচে ধরে রাগ নিয়ন্ত্রণে এনে লিয়ানাকে বাইকের সাথে ঠেঁসে ধরলো।পেশিবহুল শরীরটা দিয়ে ঘিরে ধরলো লিয়ানাকে।চোখে যেনো লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে,পরক্ষণেই চোখ বন্ধ করে আবার খোলে শান্ত চোখে তাকালো,
“-কিছুদিনের জন্যে ইতালি যাবো আমি।”
লিয়ানা তড়িৎ গতিতে কপাল ভাজ করে ব’লে উঠে,
-“কই?
-“ইতালি”
-“কেনো।হঠাৎ ইতালি কেনো যাবো আমরা।কি কাজ”
জায়ান লিয়ানার হাতের পিঠের উপর নিজের হাত ভর করে ব’লে উঠে,
“আমরা না আমি।মাসখানিক হতে পারে বা তারও কম।তোকে নিতে পারবো না আমি।এখানেই থাকবি।আই হেভ ন’ট এনি অপশান রাইট নাও”
চোখের কোণে যেই জলটা জমিয়ে রেখেছিলো পড়তে দেয় নি তা এবার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো।জায়ানকে ছাড়া এক মূহুর্ত লিয়ানার শ্বাস আটকে আসে।অস্থির লাগে। সে কিভাবে পার করবে এতো গুলো দিন।মনের ব্যথা চাপা দিয়ে শান্ত স্বরে ব’লে,
-“ওহহ।আপনার যদি কষ্ট না হয়।আমারও হবে না।”
জায়ান চোয়াল শক্ত করলো।লিয়ানার গাল বেয়ে পড়া জলে চুমু খেয়ে নিলো।লিয়ানা বুক ফেটে কান্না পেলো খুব। দহন জ্বালা সহ্য করতে না পেড়ে কি থেকে কি ভেবে প্যানিক করে জায়ানের পকেট থেকে বন্দুকটা বের করে জায়ানের বুক বরাবর ঠিক যেখানে হৃদস্পন্দন অনবরত উঠানামা করে সেখানে ধরলো।জায়ান একবিন্দুতও নড়লো না।ঘাড়টা কাত করে লিয়ানার অশ্রুসিক্ত নয়নে অপলক দৃষ্টি ফেলে ব’লে,
-“চালা”
লিয়ানা সরিয়ে নিলো হাত।ভিতরের জমে উঠা চাপা ব্যথাগুলো হালকা করতে জায়ানের অপলক দৃষ্টিতে সেও এক ন্যায় তাকিয়ে গোঙিয়ে ব’লে উঠে,
“-আমার অনেক রাগ হচ্ছে।মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে আপনাকে।তবে তা আমি পারবো না।তবে আমাকে পাথর বানাবেন না উকিল সাহেব।নাহলে একদিন আপনাকে ভালোবাসা ভুলে যাবো।”
এতোক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকলেও জায়ান একটু নড়ে উঠলো।লিয়ানার কথাটা কানে প্রতিধ্বনি হলো বারবার।ভালোবাসা বলতে দুনিয়াতে কিছু হয় না।এটাই জানতো জায়ান।তবে লিয়ানার কথায় আচমকা বিদ্যুৎ চমকানোর মতো ভিতরটা ভার হয়ে এলো কেন।তবে মুখের রেখা কিঞ্চিৎও পরিবর্তন না করে ব’লে,
-“আচ্ছা।কবে?সেই দিনটা ঠিক কবে লিন”
লিয়ানা কোনো প্রতিউত্তর করলো না।কি বলবে সে।মুখ ফোসকে কিনা কি বলে দিয়েছে। তা কি ইহকালেও সম্ভব নাকি।নিজেকে আয়ত্তে রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করতে থাকে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।জায়ানকে জড়িয়ে ধরে মন খুলে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। পুরুষমানুষ কি করে চোখের জল না ফেলে থাকতে পারে তার যে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি নিঃস্বাস টা আটকে আসবে।কিন্তু আশ্রু কি আর বাঁধা মানে।সেই গাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা নোনাজল বেয়ে পড়ছে।তাও লিয়ানা স্বাভাবিক কন্ঠে ব’লে,
“-সেই দিন বন্ধ করে দিবো আপনাকে ভালোবাসা সত্যি ”
“যেদিন পৃথিবী তার ঘূর্ণিবাক ভূলে যাবে।”
“নক্ষত্ররা আর আলো দিবে না।”
“সূর্য রাতে উঠবে”
“নকল ফুলেরা মরে যাবে ”
“ব্যাটারি ১০২% হবে”
“ফেব্রুয়ারী মাসে ৩০তারিখ আসবে”
“ছায়ামূর্তিরা কথা বলতে পারবে”
“যেদিন সময় থেমে যাবে”
আর যেদিন,
তোকে ছুয়েছি আঁধারে পর্ব ৪২
“আমার দেহ টা মাটিতে মিশে যাবে।আমি মরে যাবো।yes!I will die, Than i will stop loving you”
ব’লেই লিয়ানা কুঁকড়ে উঠে কেঁদে ফেলে অঝরে।তবে শেষ বাক্যেটা হজম করতে না পেরে জায়ান একটা চড় বসিয়ে দেয় লিয়ানার গালে।
