তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৪
জেরিন আক্তার
প্রাণেশা নিজেদের বাড়ির পেছনের দিকে আসতেই নজরে পড়লো কয়েকটা ছেলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে, সবার পরনে হলুদ রঙের পাঞ্জাবী। আর সামনে একটা ছেলে সেও হলুদ রঙের পাঞ্জাবী পড়া। সে উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণেশা হেসে বলল,
“আপনি এখানে কেনো? ভিতরে চলুন?”
ছেলেটা পেছন ফিরলো। প্রাণেশা কাছে গিয়ে বলল,
“সিয়াম ভাইয়া আপনি এখানে?”
এমন সময় স্নিগ্ধ পেছনে থেকে প্রাণেশার চোখ দুটো ধরলো। আর সামনে যে ছেলেটা সেটা সিয়াম। ও চলে গেলো বাকি ছেলেদের কাছে। আর প্রাণেশা স্নিগ্ধর স্মেল শুকেই বলে দিলো,
“উফ মজা করবেন না তো। আমি জানি আপনিই।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার চোখ ছেড়ে দিয়ে সামনে এসে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো প্রাণেশার দিকে। স্নিগ্ধর পরনে হলুদ রঙের পাঞ্জাবী, বাকি ছেলেদের থেকে আলাদা। ভালোই লাগছে।
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“মাশাআল্লাহ। প্রাণ কি সুন্দর লাগছে তোমাকে।”
প্রাণেশা হেসে স্নিগ্ধর হাত ধরে বলল,
“ওইদিকে চলুন। সবাই আপনাকে দেখলে খুশি হবে।”
স্নিগ্ধ তখনও প্রাণেশাকে দেখে যাচ্ছে। নজরকাড়া সুন্দর লাগছে।
এদিকে ছেলেগুলো একে একে চলে গেলো সামনের গেটের দিকে। স্নিগ্ধ বলল,
“তোমার সাথে একটু দেখা করতে এসেছিলাম চলে যাবো এখন।”
“এখনই চলে যাবেন?”
“হুমম কালকে তো নিতেই আসবো।”
“একটু সবার সাথে দেখা করে যান।”
“না থাক এখন শরীরটা ভালো লাগছে না গো। বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নিবো।”
“ঠিক আছে যান।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার কপালে চুমু দিয়ে চলে গেলো। প্রাণেশা ফিরে এলো। সামনেই পড়লো সৌরভ। জিজ্ঞাসা করলো,
“কোথায় গিয়েছিলি ওইদিকে?”
“ওই একটু ওইদিকে হাঁটতে গিয়েছিলাম।”
“যা স্টেজে যা। ওরা সবাই খেয়ে এসেছে।”
“যাচ্ছি।”
প্রাণেশা চলে যেতেই সৌরভ বাড়ির পেছনের দিকটায় চলে এলো। স্নিগ্ধ পেছনের গেটেই দাঁড়িয়ে দারোয়ানের সাথে কথা বলছিলো। সৌরভ ওকে দেখে বুঝতে পারলো প্রাণেশা কেনো এদিকে এসেছিলো।
সৌরভ এগিয়ে এসে স্নিগ্ধকে বলল,
“তুমি এখানে?”
স্নিগ্ধ সৌরভের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“আপনার বোনকে সারপ্রাইস দিতে এসেছি।”
সৌরভ বলল,
“ভিতরে চলো এখানে কেনো?”
স্নিগ্ধ সৌরভের হাত ধরে বলল,
“আমার সাথে আসুন তো ভাই। একটু হেল্প করতে হবে, নাচবো ওখানে।”
মিনিট বিশেক পরে সৌরভ এসে ডাকলো ইভাকে। কিছু একটা বলে চলে যায়। এরপরে সাউন্ডবক্সে গান বেজে উঠল। সেই সাথে স্নিগ্ধ ও তার বন্ধু, কাজিনদের এন্ট্রি। স্নিগ্ধ এগিয়ে আসতে আসতে নাচছে, গানের তালে তালে,
Hoooo Hoooo..
Tere ghar aaya
Main aaya tujhko lene,
Dil ke badle mein
Dil ka nazrana dene….
Tere ghar aaya
Main aaya tujhko lene,
Dil ke badle mein
Dil ka nazrana dene….
Meri har dhadkan keya bole hai-
Sun Sun Sun Sun Sun..
Saajanji ghar aaye
Saajanji ghar aaye
Dulhan kyun sharmaye…
Saajanji ghar aaye
স্নিগ্ধ সিয়ামের থেকে গোলাপ ফুলের বুকেটা নিয়ে প্রাণেশার সামনে এসে হাটু গেরে বসলো। বুকেটা এগিয়ে দিলো।
প্রাণেশা কত যে খুশি হয়েছে বলে বোঝাতে পারবে না। স্নিগ্ধ একটু আগে বলল তার শরীর ভালো লাগছে না আর এদিকে এসে নাচছে। লোকটা ভালোই মিথ্যে কথা বলতে পারে।
স্নিগ্ধ নাচা শেষে আরশাদ খানের সামনে এসে হেসে হেসে বলল,
“শশুরআব্বা জামাই বেশে কেমন লাগছে আমাকে?”
আরশাদ খান হেসে বললেন,
“অনেক সুন্দর লাগছে তোমাকে।”
পরদিন..
বিয়ে পড়ানো শেষ হতেই আরশাদ খান বাড়ির ভিতরে এসে, নিজের রুমে চলে এলেন। তার রুমের একপাশে দেয়ালে বড় করে সারিকা খানের ছবির ফ্রেম আছে। তিনি ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। একটু পরেই প্রাণেশাকে নিয়ে চলে যাবে। আর সৌরভ! সে কাঁদতে চেয়েও পারছে না। মুখে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে ঘুরছে। প্রাণেশার দুটো চোখ খুঁজছে তার বাবা আর ভাইকে। শেষে প্রাণেশা ইভাকে ডেকে বলল,
“বাবা আর ভাইয়া কোথায়? ডেকে আনতো।”
আরশাদ খান রুম থেকে বেরিয়ে ড্রইং রুমে এসে বসলেন। ইভা বাড়ির ভিতরে ঢুকে আরশাদ খানকে কাঁদতে দেখে পাশে বসে বলল,
“মামা কেঁদো না। কাঁদলে অসুস্থ হয়ে যাবে। ওদিকে প্রাণেশা তোমাকে দেখতে না পেয়ে খুঁজছে। চলো। না গেলে আবার ও কাঁদবে।”
আরশাদ খান চোখ মুছে বললেন,
“চলো!”
ইভা বলল,
“তুমি যাও, আমি সৌরভ ভাইকে ডেকে আনছি।”
“ঠিক আছে।”
আরশাদ খান চলে গেলেন। ইভা সৌরভকে খুঁজতে লাগলো। রোকেয়া বেগম বললেন সৌরভ বাড়ির পেছনের দিকটায় বসে আছে। ইভা সেখানেই এলো। সৌরভ একটা টেবিলে বসে আছে একা। ইভা পাশের চেয়ারে বসে বলল,
“তুমি এখানে! আমি সেই কখন থেকে খুঁজছি। তোমাকে ডাকছে প্রাণেশা।”
সৌরভ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“হুম চল!”
ইভা যাওয়ার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলে সৌরভ ওর হাত দুটো ধরে নেয়। সুবহা এদিকেই আসছিলো। দুজনকে একসাথে দেখে ওর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সৌরভ ইভার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,
“দেখে হাঁটবি তো!”
“আচ্ছা, চলো।”
সৌরভ সামনে তাকাতেই দেখে সুবহা ওর দিকেই কেমন অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পরক্ষনেই সুবহা চলে গেলো। আর সৌরভ এই বিষয় নিয়ে ভাবার কোনো আগ্রহই দেখালো না। চলে এলো প্রাণেশার কাছে।
বিদায়ের সময় গেটের সামনে দাড়িয়ে আছে সবাই। প্রাণেশা সেই যে সৌরভকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে ছাড়ার নাম নেই। প্রাণেশার কান্না দেখে সবার চোখেই পানি। সৌরভ কাঁদছে না, কাঁদলে প্রাণেশা আরও ভেঙে পড়বে। সৌরভ প্রাণেশার মাথায় হাত রেখে বলল,
“এই বিড়ালের বাচ্চা, তু্ই কি যাবি? দেখ সবাই তোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কান্না করিস না।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী প্রাণেশাকে বললেন,
“কান্না করো না, তোমার যখন ইচ্ছা তুমি তখনই আসতে পারবে দরকার হলে কালকেই এসে পড়ো। তবুও আজ চলো মা।”
অনেক কষ্টে তাকে ছাড়ানো গেলো ভাইয়ের থেকে। এরপরে স্নিগ্ধ ওকে নিয়ে গাড়িতে উঠল। পরপর ৪ টা গাড়িই চলে গেলো। সৌরভ শ্বাস ছেড়ে পাশেই চেয়ার নিয়ে বসে রইলো।
মিনিট ১৫ পরেই হামিম কল দিলো সৌরভকে। এই দুইদিনে ও কোনো কল দেয়নি আজ দিলো। সৌরভকে বলল,
“বোনকে বিদায় দিলি ভালোই। আয় আজকে আড্ডা দেই।”
সৌরভ কপাল কুঁচকে নিয়ে বলল,
“কেনো?”
“আরে ভাই তোর বোনের বিয়ে হলো, সেই উপলক্ষে ট্রিট দিবি না, আয়। বিশ্বাস কর, তোর বোনকে নিয়ে কিচ্ছু বলবো না। আমি তোদের বাড়ির সামনের ওই মোড়ে আয়!”
“ঠিক আছে আসছি।”
সৌরভ গেলো। তবে ও শিওর আর যাই হোক আজকে হামিম এমনি এমনি ডাকেনি। সৌরভ কাঁচা বুদ্ধি নিয়ে চলে না। ও সকাল থেকেই কোমরে রিভলবার গুজে ঘুরছে। এখনও আছে। এবং সেটা নিয়েই একা হাঁটা দিলো।
সৌরভ যা ভেবেছিলো তাই। এসে দেখে হামিম কয়েকজন ছেলে সাথে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মোড়ে সারারাতেও কোনো মানুষ যায়না, একদম নিরিবিলি। সৌরভ যাওয়ার সাথে সাথে হামিম ওর সাথে থাকা ছেলেদেরকে বলে সৌরভকে মারতে।
বাসর ঘরে লাল টুকটুকে বউ সেজে বসে আছে প্রাণেশা। অপেক্ষা করছে স্নিগ্ধর জন্য। স্নিগ্ধকে তো ছাড়ছেই না। দরজার সামনে ওর কাজিনরা দাঁড়িয়ে আছে। টাকা না দিলে বাসর ঘরে ঢুকতে দিবে না। স্নিগ্ধ ওদের টাকা দিয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। বিছানার মাঝখানে প্রাণেশাকে দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে এলো।
বিছানায় বসলো স্নিগ্ধ। প্রাণেশার ঘোমটাটা সরিয়ে দিতেই ও মুচকি হাসলো। স্নিগ্ধ ওর হাসি দেখে নেশালো কণ্ঠে বলল,
“উফ হেসো না, বুকে এসে লাগে।”
দুজনে কথাবার্তা শেষে এরপরে একসাথে নামাজও পড়ে নিলো।
…..
অতঃপর প্রাণেশা ড্রেস চেঞ্জ করতে ওয়াশরুমে ঢুকলো। স্নিগ্ধ ফোনটা চার্জ দিয়ে বসে রইলো। প্রাণেশা ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়ালো। স্নিগ্ধ ওকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে, ওর ঘাড়ে থুতনি রাখলো। প্রাণেশা মুচকি হেসে বলল,
“সরুন তো যান ফ্রেশ হয়ে আসুন।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে ধরে নিজের দিকে ঘুরালো। প্রাণেশার দুগালে হাত রেখে ঠোঁট এগিয়ে নিলো। প্রাণেশা শুকনো ঢোক গিলে চোখ বন্ধ করে নিলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে নিলো। প্রাণেশা স্নিগ্ধর পাঞ্জাবী খামচে ধরলো। স্নিগ্ধ মিনিট পাঁচেক পরে ছাড়লো প্রাণেশাকে। প্রাণেশা ওর বুকে মাথা রেখে বড় বড় শ্বাস ছাড়লো।
এরপরেই স্নিগ্ধ ড্রেসিং টেবিলে থেকে নেইল কাটারটা নিয়ে প্রাণেশাকে টেনে বিছানায় নিয়ে বসালো। ও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কি হবে এটা দিয়ে?”
স্নিগ্ধ ওর হাত টান দিয়ে বলল,
“আজ বাসর রাত, আমি কোনো রিস্ক নিতে চাইনা।”
প্রাণেশা বুঝলো না, বলল,
“কিসের রিস্ক?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“তোমার যে নখ, আমাকে খামচে দিবে।”
প্রাণেশা লজ্জায় স্নিগ্ধর পিঠে চাপর মারলো।
“অসভ্য কোথাকার।”
স্নিগ্ধ ঠোঁট কামড়ে হেসে প্রাণেশার নখগুলো কেটে দিলো।
এর মাঝে রুমে কেউ নক করলো। দুজনই উঠে দাড়ালো। স্নিগ্ধ রুমের দরজা খুলে দেখলো ওর বাবা। সাঈদ রেজা চৌধুরী স্নিগ্ধকে ধরে বাহিরে নিয়ে গেলেন। আস্তে করে বললেন,
“স্নিগ্ধ, আরশাদ ভাই কল দিয়েছিলো। সৌরভকে হসপিটালে ভর্তি করেছে।”
স্নিগ্ধ কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“কেনো? একটু আগে না ভালো দেখে এলাম।”
সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,
“ওকে হামিমরা মেরেছে। আর হামিম নিজেও… থাক ওসব ছাড়ো, এখন প্রাণেশার কাছে কোনো ফোন দিও না, কে আবার কল দিয়ে বলবে আবার কান্না করবে। এমনেই অনেক কান্না করেছে। আর আমি যাচ্ছি হসপিটালে।”
স্নিগ্ধ বলল,
“তুমি দাড়াও আমি আসছি।”
“তুমি যাবে?”
“হুমম আসছি।”
স্নিগ্ধ রুমে এসে পাঞ্জাবী-পাজামা খুলে শার্ট-প্যান্ট পড়ে নিলো। আর প্রাণেশার ফোনটা নিয়ে বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৩
“প্রাণ তুমি একটু থাকো আসছি আমি। আর তোমার ফোন নিয়ে যাচ্ছি।”
“কোথায় যাচ্ছেন? সেটা তো বলুন।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে শ্বাস ছেড়ে কপালে চুমু দিয়ে হালকা হেসে বলল,
“চিন্তা করো না, আমি এসে বলছি।”
প্রাণেশা মাথা নাড়ালো।
