Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১৩

মেজর কারদার পর্ব ১৩

মেজর কারদার পর্ব ১৩
ফিনারা ঝুমুর

রাত গড়িয়ে সকাল, আর সকাল গড়িয়ে আবারও কৃষ্ণপক্ষের রাত নেমে আসতে চলল। ঘরের এক কোণে টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় পড়ার টেবিলে ঝুঁকে বসে একাগ্র মনে পড়ছে মেঘ। আর পাশের ড্রইং রুমে ওর মা আলেয়া বানু সোফায় আরাম করে বসে টিভির পর্দায় স্টার জলসার সিরিয়াল দেখতে মগ্ন হয়েছেন।
​ঠিক তখনই সিরিয়ালের শব্দের মাঝেই ওনার কোলের কাছে রাখা মোবাইলটা হঠাৎ তীব্র কম্পনে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর জ্বলজ্বল করছে। ভদ্রমহিলা টিভির সাউন্ড কিছুটা মিউট করে তড়িঘড়ি করে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কোনো কথার বদলে শুনতে পেলেন কেবল কারোর বুকফাটা ফোঁপানির শব্দ! এমন করুন কান্না শুনে আলেয়া বানু ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি টিভির রিমোটটা পাশে রেখে উদ্বেগের সাথে প্রশ্ন করলেন,

​“কে মা তুমি? ওভাবে কান্না করছো কেন? কী হয়েছে বলো তো?”
​ওপাশ থেকে ফোঁপাতে ফোঁপাতে এক ফ্যাসফ্যাসে ও বুঁজে আসা গলায় উত্তর এল,
​“আন্টি… আমি রাইসা। মেঘের বান্ধব–”
​“আহারে! তোমায় এত পরিচয় দিতে হবে না মা, আমি তোমায় চিনি। তার আগে বলো তুমি ওভাবে কান্না করছো কেন? কোনো বিপদ হয়েছে?”
​রাইসার সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার আগেই বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা নিয়ে উক্ত কথাগুলো বলে ফেললেন আলেয়া বানু। ওপাশে রাইসা একইভাবে নাক টানতে টানতে কান্নামিশ্রিত গলায় বলল,
​“আমার দাদুভাই একটু আগে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন আন্টি! পুরো পরিবার এক্কেবারে ভেঙে পড়েছে। আমরা সবাই এক্ষুনি আমাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় রওনা হচ্ছি দাফন করার জন্য। আন্টি মেঘকে কি এই কদিনের জন্য আমার সাথে দেওয়া যাবে? ও একটু আমার সাথে চলুক না প্লিজ!”
​রাইসার দাদু মারা গেছেন শুনে আলেয়া বানুর মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেল।কিন্তু রাইসার শেষোক্ত অদ্ভুত আবদারটা শুনে ওনার কপালে সামান্য চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি কিছুটা ইতস্তত করে ইনিবিনিয়ে আমতা আমতা করে বললেন,

​“তোমাদের এমন একটা বড় পারিবারিক বিপর্যয়ে মেঘের সাথে যাওয়াটা কেমন দেখাবে বলো তো মা? তোমাদের সবার মানসিক অবস্থা এমনিতেই ভালো নেই, পুরো বাড়ি শোকের বাড়ি; তার ওপর সেখানে মেঘের মতো একটা বাইরের মেয়ে যাওয়াটা কেমন একটা কটূক্তি দেখাবে। লোকে কী বলবে?”
​“এসব কী বলছেন আন্টি! আসলে… মেঘ সাথে গেলে আমি একটু মানসিক ভরসা পেতাম। ফাতিমা বা তানিয়ার থেকেও মেঘ আমার অনেক বেশি কাছের, ও আমার কলিজার বন্ধু। দাদুভাই হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়াতে আমি এক্কেবারে ভেঙে পড়েছি আন্টি, একা কিছুতেই সামলাতে পারছি না। প্লিজ আপনি মেঘকে না করবেন না, ও আমার সাথে গেলে আমি একটু শান্ত থাকতে পারব!”
আলেয়া বানু প্রথমে বারণ করলেও, রাইসা ওপাশে ওনার কোনো বারণই কানে তুলল না। সে অনবরত অনুনয়-বিনয় আর কান্নাকাটি করতে থাকে। শেষ পর্যায়ে এসে আলেয়া বানু খানিকটা নরম হলেন এবং মনে মনে কিছু একটা ভেবে গম্ভীর গলায় বললেন,

​“আচ্ছা মা, তুমি কেঁদো না। আমি মেঘকে একবার জিজ্ঞাসা করছি ও যেতে চায় কি না।”
​আলেয়া বানু কানে মোবাইলটা ধরেই ধীর পায়ে মেঘের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে যেয়ে দেখলেন টেবিল ল্যাম্পের আলোয় মেঘ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খাতায় কী যেন লিখছে। উনি মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতির জানান দিলেন। মেঘ খাতার ওপর থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে ওনার দিকে গোল গোল চোখ করে বেশ নিষ্পাপ ভঙ্গিতে তাকাল।
​“কিছু বলবে আম্মু?”
​আলেয়া বানু ফোনের ওপাশে থাকা রাইসাকে লাইনে রেখেই মেয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
“তোমার ফ্রেন্ড রাইসার দাদা কিছুক্ষণ আগে মারা গেছেন। ওরা সকলে কিছু সময়ের মধ্যেই দাফন-কাফনের জন্য ওদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার উদ্দেশ্যে বের হবে। রাইসা খুব কান্নাকাটি করছে, ও চাচ্ছে তুমি ওর সাথে সঙ্গ দিয়ে ওর গ্রামের বাড়ি যাও। ও একটু মেন্টাল সাপোর্ট পাবে। তা তুমি কি যাবে?”
​আলেয়া বানুর এমন জিজ্ঞাসুক প্রশ্নে মেঘ মনে মনে এক মস্ত বড় শয়তানি হাসি হাসল। যাক, মিশন কক্সবাজারের প্রথম ধাপ এক্কেবারে কেল্লাফতে! তবে উপরে নিজেকে একদম স্বাভাবিক আর সাধু সাজিয়ে মুখটা ছোট করে মিনমিনিয়ে বলল,

​“আম্মু, তুমি রাজি হলে আমি যাবো। রাইসা আমার খুব ভালো ফ্রেন্ড, ওর এই বিপদে না গেলে কেমন দেখায় বলো।”
​আলেয়া বানু টেবিল ল্যাম্পের আবছা আঁধারে ঢাকা মেয়ের সেই মায়াবী শ্যামা রঙের আননের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বান্ধবীর বিপদে মেয়ে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে দেখে ওনার আর অমত রইল না। তিনি বললেন,
​“ঠিক আছে, তাহলে আর সময় নষ্ট না করে চটপট তোমার ব্যাগপ্যাক করে রেডি হয়ে নাও। ওরা গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের বাড়ির সামনে থেকে তোমায় পিক করে নেবে।”
​কথাটা বলেই যেভাবে এসেছিলেন তিনি, ঠিক সেভাবেই ড্রইং রুমের দিকে চলে গেলেন। আর যাওয়ার মাঝপথেই তিনি রাইসার ফোনকলটাও ওপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।

প্ল্যান সাকসেসফুলি কাজ করেছে! মেঘের অবাধ্য মনে এখন বেজায় ফুর্তি। খুশির চোটে তার পা যেন মাটিতেই পড়ছে না। চনমনে মনে বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে আলমারি খুলে নিজের পছন্দের একটা ডাস্টি রোজ রঙের সিল্কের এথনিক কো-অর্ড সেট পরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে।
​পোশাকটির সাথে মানসই হিসেবে পুরো বুকে ও হাতায় সাদা সুতোর চমৎকার এমব্রয়ডারির কারুকাজ করা রয়েছে। মেঘ তার দীঘল কালো রেশমের ন্যায় কুন্তলরাশি পিঠের ওপর আলগা করে ছেড়ে রাখল। কানে পরল মাঝারি সাইজের দুটো পার্ল টপ, আর কপালের ঠিক মাঝখানটায় লেপ্টে দিল একটা ছোট্ট স্টোনের বিন্দিয়া। সবশেষে ঠোঁটে আলতো করে ছোঁয়াল পিচ ন্যুড কালারের লিপস্টিক। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মেঘ নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল; তার মায়াবী শ্যামবর্ণ ত্বকের সাথে এই ডাস্টি রোজ রঙ আর হালকা সাজ যেন এক্কেবারে খোলতাই হয়ে ফুটে উঠেছে!
​পূর্ব প্রস্তুতি অনুযায়ী ট্রাভেল ব্যাগটা আগেই প্যাক করা ছিল। ব্যাগটা এক হাতে ঝুলিয়ে রুম থেকে বের হয়ে ড্রইং রুমে বসা আলেয়া বানুর উদ্দেশ্যে বেশ চনমনে গলায় বলল,

​“মা, আমি তাহলে আসি! শীঘ্রই রাসুর মন ভালো করে দিয়ে ফিরে আসব, তুমি চিন্তা কোরো না একদম।”
​মেয়ের গলার আওয়াজ পেয়ে আলেয়া বানু টিভি থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই ওনার দুই ভ্রু কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। তিনি চরম অবাক ও ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন,
​“ঐ ছুঁড়ি! তুই কি কোনো বিয়ের দাওয়াতে যাচ্ছিস নাকি মরা বাড়ি যাচ্ছিস? বান্ধবীর দাদু মারা গেছে, পুরো পরিবার শোক সাগরে ভাসছে, আর তুই এভাবে নতুন জামাকাপড় পরে, কপালে টিপ আর ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে সেজেগুজে যাচ্ছিস কোন আক্কেলে?”
​মায়ের এমন কড়া ধমক শুনে মেঘ ঝটপট নিজের সাজগোজের দিকে তাকিয়ে মায়ের আড়ালে জিভে এক মস্ত কামড় দিল। ইশ রে! খুশির চোটে সে তো এক্কেবারে ভুলেই গিয়েছিল যে মরা বাড়ি যাওয়ার মস্ত বড় এক নাটক সাজানো হয়েছে!
​পরিস্থিতি সামাল দিতে সে দ্রুত বানিয়ে বলল,

“আরে আম্মু! আসলে তাড়াহুড়োয় কী পরব না পরব মাথায়ই ছিল না, যা পেয়েছি পরে নিয়েছি। আর লিপস্টিক তো না, ঠোঁট ফেটে যাচ্ছিল তাই একটু ভ্যাসলিন দিয়েছি। আচ্ছা এসব বাদ দাও, গাড়ি চলে এসেছে মনে হয়, তুমি শুধু তোমার এই লক্ষ্মী মেয়ের জন্য দোয়া করবে। আমি আসি!”
​মা আর নতুন কোনো জেরা করার ফুসরত পাওয়ার আগেই মেঘ চোরের মতো একপ্রকার দৌড়ে ঘর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। আলেয়া বানু মেয়ের এই অদ্ভুত বাচ্চামি আর পাগলামি ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর কিছু না বলে দরজা আটকে ঘরে ফিরে এলেন।

শ্যামলী, বাগেরহাট বাস টার্মিনালে এসে যখন চার বান্ধবী মিলিত হলো, তখন চারজনেরই বুক দুরুদুরু কাঁপছে। জীবনে প্রথমবার পরিবারের চোখে ধুলো দিয়ে, মস্ত বড় এক মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে এতখানি সাহস দেখিয়ে একা একা বাড়ি থেকে বের হয়েছে ওরা। টার্মিনালের কোলাহল পেরিয়ে যখন ওরা কাঙ্ক্ষিত ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’-এর এসি বাসে উঠল, তখন যেন চার জোড়া ফুসফুস একসাথে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। বাসের ভেতরে এসি-র ঠান্ডা বাতাসে নিজের বরাদ্দকৃত উইন্ডো সিটে আরাম করে গা এলিয়ে দিল মেঘ। খুলনা-বাগেরহাট থেকে ঢাকা হয়ে সোজা সুদূর কক্সবাজার সামনে আরও প্রায় বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টার এক লম্বা ও ক্লান্তিকর জার্নি বাকি ওদের।
​ওদিকে কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসের সরকারি বাংলোর এসি রুমে বসে তখন একনাগাড়ে কফির মগে চুমুক দিচ্ছিল মেজর শীর্ষ কারদার। ঠিক তখনই তার পার্সোনাল ফোনে স্ক্রিন কেঁপে এক জরুরি কল ভেসে এল।
​ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে মেজরের নিজস্ব এক বিশ্বস্ত গুপ্ত কর্মচারীর তটস্থ ও ফিসফিসানি কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

​“স্যার! স্যার! আপনি খুলনায় সাত্তার মাস্টারের যে মেয়ের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে বলেছিলেন, সেই মেয়ে এইমাত্র শ্যামলী, বাগেরহাট বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার গাড়িতে উঠেছে স্যার!”
​নিজের খাস ইনফর্মারের মুঠোফোন থেকে উক্ত চাঞ্চল্যকর খবরটা শুনে শীর্ষ প্রথমে চরম অবাক হতে গিয়েও পরক্ষণেই শান্ত হয়ে গেল, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসির রেখা। এই মেঘ যা দস্যি আর অবাধ্য, তার পক্ষে এমন দুঃসাহসিক ও পাগলামি ভরা কাজ করাটা খুব একটা অকল্পনীয় বা অসম্ভব কিছু নয়। ও যে কোনো একটা ফন্দি আঁটছে, তা শীর্ষ গত রাতেই মেঘের গলার উদাসীন সুর শুনে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল।​শীর্ষ গম্ভীর ও রাশভারী গলায় প্রশ্ন করল,

“সাথে আর কে কে আছে? ও কি একা?”
​“না স্যার, ও একা নয়। সঠিক নাম-পরিচয় এখনও জানি না, তবে সাথে আরও তিনজন সমবয়সী মেয়ে রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে ওর কলেজের বান্ধবী।”
​কথাটা বলেই ইনফর্মার মুসা চট করে চ্যাট বক্সে বাসের ভেতর থেকে গোপনে তোলা একটা ছবি পাঠিয়ে দিল। শীর্ষ ল্যাপটপ একপাশে সরিয়ে চ্যাট বক্সের সেই ছবিটার ওপর ক্লিক করল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ডাস্টি রোজ রঙের সিল্কের পোশাকে মেঘালয়া আর রাইসা এক সিটে পাশাপাশি বসে আছে, আর ঠিক পেছনের সিটে ফাতিমা আর তানিয়া জানালার কাঁচে মাথা এলিয়ে চোখ বুঁজে রয়েছে। ছবিতে মেঘের সেই কপালে ছোট্ট পাথরের টিপ আর মায়াবী শ্যামলা মুখের অবয়বটা দেখামাত্রই শীর্ষর আর অন্য কিছু দেখার বা বোঝার প্রয়োজন হলো না। তার শিকার নিজের ইচ্ছায়, নিজে থেকেই মেজরের ডেরার দিকে ছুটে আসছে!
​শীর্ষ ফোনের স্পিকারে নিজের কণ্ঠস্বর আরও এক ডিগ্রি চড়া ও কঠিন করে নির্দেশ দিল,

“গাড়ি ঢাকা পার হওয়া থেকে শুরু করে কক্সবাজার পৌঁছানো পর্যন্ত ওদের ছায়ার মতো ফলো করো। প্রপার সিকিউরিটি দেবে চারজনকেই। ওদের সুরক্ষায় বা নিরাপত্তায় যেন বিন্দুমাত্র কোনোরূপ ঘাটতি না হয়। যদি কোনো কারণে একটা আঁচও ওদের গায়ে লাগে, তবে তোমার এই চাকরি আমি এক সেকেন্ডে নট করে দেবো! গট ইট?”
​মেজরের এমন বজ্রকঠিন হুঙ্কার শুনে ওপাশে থাকা মুসা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আমতা আমতা করে বলল,

“বু-বুঝেছি স্যার! এক্কেবারে পরিষ্কার বুঝেছি। কোনো ভুল হবে না।”
​শীর্ষ লাইন কাটার আগে শান্ত কিন্তু এক চরম অধিকারবোধ মাখানো গলায় আবারো মুখ খুলল,
“আর শোনো মুসা, আইজ দ্যান আফটার… ওকে আর কখনো নিজের মুখে ‘মেয়ে’ বা ‘সে’ বলে সম্বোধন করবে না। রেস্পেক্ট দিয়ে সবসময় ‘ম্যাম’ বলে ডাকবে। বিকজ, শি ইজ মাই উডবি ওয়াইফ !”
​শীর্ষর মুখে এমন গম্ভীর ও চূড়ান্ত ঘোষণা শুনে ওপাশে থাকা মুসার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল, মুখের চোয়াল সোজা ঝুলে পড়ল! তাদের বাংলাদেশ আর্মির বাঘা মেজর, শীর্ষ কারদারের হবু স্ত্রী কিনা এতটুকু একটা পিচ্চি, হাঁটু বয়সী কলেজপড়ুয়া মেয়ে! আশ্চর্য! এক্কেবারে অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক কাণ্ড!​মুসা নিজের বিস্ময় চেপে কোনোমতে বলল,
“জি স্যার, ইয়েস স্যার! ম্যামের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।”
​ফোনটা কেটে দিয়ে শীর্ষ চেয়ার ছেড়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। রাতের কক্সবাজারের সমুদ্রের গর্জন যেন দূর থেকে তার কানে ভেসে আসছে। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী চওড়া হাসি হেসে বিড়বিড় করে উঠল,

​“আমার ডেরায় তোমাকে স্বাগতম, মাই ব্ল্যাক বিউটি! মায়াবন বিহারিণী নিজেই যখন তৃষ্ণার্ত প্রেমিকের মরুভূমিতে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে আসছে, তখন এই মেজর কারদার তোমাকে কীভাবে বরণ করে নেয়, তা দেখার জন্য এবার প্রস্তুত হও!”
চোখ বন্ধ করেও শান্তি পাচ্ছে না। ল্যাপটপ খুলে কাজ করতে গেলেও তার অস্থির চোখ দুটো তখনও ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেঘের সেই মায়াবী, ডাস্টি রোজ রঙের পোশাক পরা ছবিটার দিকেই নিবদ্ধ। ছবিটার দিকে তাকিয়ে শীর্ষর মগজে বারবার হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল গত রাতে ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা মেঘের সেই ভারী আর ভাঙা কণ্ঠের কথাগুলো,
​“কান্না যার গলার মণিকণ্ঠ, তার না কেঁদে আর উপায় কী বলুন? এই দুনিয়ায় কান্নাই এখন আমার একমাত্র বন্ধু, আর কান্নাই আমার পরম শত্রু!”

​সতেরো বছরের একটা চঞ্চল, ঠোঁটকাটা মেয়ের মুখে এমন বৈরাগ্য আর জীবনবিদ্বেষী কথা শীর্ষকে চরমভাবে আশ্চর্য করে। একবুক তীব্র বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে গত রাতেই মেঘের বাকি কথা শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল মেজরের মন। সে মেঘের সেই উদাসীনতার ঘোর কাটাতে এবং তার ভেতরের আসল ক্ষতটা পরিমাপ করতে নিজেই একটু দার্শনিক ভঙ্গিতে বলে উঠেছিল,
​“মানুষের জীবন মূলত দুটো স্তরে বিভক্ত, বাবুর মাম্মাহ। এক—বিয়ের পূর্ব সময় অবধি দুঃখ, আর দুই—বিয়ের পরবর্তী সময়ের দুঃখ। জীবনের এক স্তরে মানুষ সাময়িক সুখলাভ করে বটে, কিন্তু অন্য স্তরে অপেক্ষা করে থাকে কেবলই কষ্ট আর হতাশা। মানব চক্রের চাকাটা চিরকাল এভাবেই ঘূর্ণায়মান।”
​শীর্ষ ভেবেছিল তার এই তাত্ত্বিক কথায় মেঘ হয়তো রেগে গিয়ে আগের মতো চ্যাঁত করে উঠবে। কিন্তু ওপাশে মেঘ তখন শীর্ষর কণ্ঠ না চিনে, মধ্যরাতের সেই নিস্তব্ধতায় এক অচেনা পুরুষের গলার গাম্ভীর্যের মোহে এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝেই যেন নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটা উগড়ে দিয়ে বলে উঠেছিল,
​“তাই বুঝি? তবে কোন সুখের খোঁজে আমার মেজো বোন ঝিলি ধর্ষিতা হয়ে নিজের পবিত্র জীবনটা চিরতরে বিসর্জন দিল, বলতে পারেন? এই সমাজের নিকৃষ্ট পুরুষদের পাশবিক লালসাই তো একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবনের সবকিছু এক নিমেষে কেড়ে নিয়েছে! যাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে আমার কলিজার বোনটা একদিন রাতের আঁধারে ঘর ছেড়েছিল, সেই বেইমান, নরপশু পুরুষটাই তো টাকার লোভে আমার বোনটাকে অন্য একদল হায়েনার হাতে তুলে দিয়েছিল! যারা তিলে তিলে ছিঁড়ে খেয়েছে আমার কোমল, নিষ্পাপ বোনটাকে!”

স্পিকারে মেঘের মুখ থেকে বের হওয়া এই ভয়ঙ্কর সত্যটা শোনামাত্রই রামু সেনানিবাসের এসি ঘরের ভেতরেই মেজর শীর্ষ কারদারের পুরো দেহের লোম এক ঝটকায় খাড়া হয়ে গিয়েছিল! তার আর্মির ধারালো মগজ যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কী বলছে এসব মেঘালয়া? গণধর্ষণ! তারপর লোকলজ্জায় আত্মহত্যা! সাত্তার মাস্টারের পরিবারে এমন এক বীভৎস অতীত লুকিয়ে আছে, যা আজ অবধি কোনো পুলিশ ফাইল বা ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টে উঠে আসেনি!​নিজের ভেতরের পেশাদারিত্ব আর ক্রোধকে এক সুতোয় এনে শীর্ষ গত রাতেই চরম রাগান্বিত ও বজ্রকঠিন উচ্চস্বরে ধমকের সুরে প্রশ্ন করেছিল,

​“কে? কোন কুলাঙ্গার এমন জঘন্য কাণ্ড করেছে তার সাথে? নাম বলো তার, ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার!”
​শীর্ষর মেজরি সুলভ সেই রাগান্বিত ও তীব্র চিৎকারে এক ঝটকায় মেঘের অবচেতন মনের সমস্ত ঘোর কেটে গিয়েছিল। সে চমকে উঠে বুঝতে পেরেছিল আবেগের বশে এক অচেনা ‘রঙ নাম্বারের’ পুরুষের কাছে সে তাদের পরিবারের সবচেয়ে গোপন ও রক্তাক্ত ক্ষতটা ফাঁস করে ফেলেছে! ভাবতেই ভয়ে আর আতঙ্কে মেঘের পুরো শিরদাঁড়া বেয়ে এক বরফশীতল ঠান্ডা স্রোত নেমে গিয়েছিল।
​সে নিজেকে সামলাতে নিজের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ আর পুরুষজাতির প্রতি জমে থাকা আজন্ম ঘৃণা এক সুতোয় এনে ওপাশ থেকে আবারও বিষাক্ত ছলের মতো ফিসফিসিয়ে উত্তর দিয়েছিল,

মেজর কারদার পর্ব ১২

​“কোনো এক লালসায় মত্ত, পশুর চেয়েও অধম পুরুষ করেছে! এই দুনিয়ার পুরুষ জাতটা মানেই এক একটা বেইমান, ঠকবাজ আর চরম প্রতারক! আর আপনি… মাঝরাতে ফোন দিয়ে পরনারীর খোঁজ নেওয়া আপনিও হয়তো তাদেরই গোত্রের একজন!”

মেজর কারদার পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here