তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৭
noorayn
একটা বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামলো খান ম্যানশেন এর সামনে। গাড়ি থেকে প্রথমে বেরিয়ে এলো খান বাড়ির বড় ছেলে আরশাদ খান। তারপর তার হাত ধরে বেরিয়ে এলো খান বাড়ির বড় মেয়ে এবং বড় পুত্রবধূ নীলিমা খান।
বাড়ির মেইন ফটকে সবাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো তাদের। আরহাম এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে যেতে চাইলেও আরশাদ মানা করে দেয়, সে বলেছে গাড়ি পাঠিয়ে দিলেই হবে – কারো কষ্ট করে আসার প্রয়োজন নেই। শাইনা বেগম তবুও আরহাম কে বলেছিলো যাওয়ার জন্য কিন্তু তার মতো অলস কি আর সহজে যায়? সে না গিয়ে ঘরে বসে আরামসে ভিডিও গেম খেলতে ব্যাস্ত ছিলো – তাকে কেউ ঠেলেও পাঠাতে পারেনি।
বাড়ির সামনে সবাই উপস্থিত থাকলেও ছিলোনা আরহাম। তার ভাষ্যমতে বাইরে গিয়ে রোদে দাড়ানোর কি দরকার? এতে স্কিন এর ক্ষতি হবে আর চকলেট বয় আরহাম বরাবরই নিজের স্কিন আর ফ্যাশন নিয়ে সচেতন থাকে। তার কথা নীলারা ভিতরে আসলেই তো দেখা হবে তাহলে কেন সে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে? তাকে কেউ আসার জন্য জোড় ও করেনি কারন সবার জানা এই ছেলে নিজের মর্জির মালিক।
তবুও আলিশা একবার বলেছিলো এবং বিনিময়ে ধমক খেয়েছে। আরহাম নিজেও বাইরে যায়নি আর না ছেলেকে নিতে দিয়েছে – আলিশার কোল থেকে ডোরাকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে বলেছে – “এতটুক বাচ্চা আমার, ওকে রোদে নেয়ার সাহস ও করবিনা।”
আলিশা আর কিছু না বলে চলে গিয়েছিলো।
প্রায় ২ বছর পর পরিবারের সকলকে দেখে নীলা আর নিজেকে আটকাতে পারেনি। দৌড়ে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো মায়ের বুকে। শাইনা বেগম ও পরম মমতার সাথে আগলে নিলেন নিজের মেয়েকে।
“এই বোকা মেয়ে, এতোদিন পর ফিরেই কান্না-কাটি শুরু? আর আপা তুমিও কান্না থামাও।” (পাশ থেকে বলে উঠলেন আয়শা)
নীলা নিজের ছোট মার আওয়াজ পেতেই শাইনা কে ছেড়ে আয়শাকে জড়িয়ে ধরলো।
“অনেক মিস করেছি তোমাকে ছোট মা।”
আয়শা এতক্ষন তাদের কান্না করতে বারন করলেও নীলাকে কাছে পেয়ে তার চোখজোড়াও ছলছল করছে।
ইজাজ সাহেবের সাথে আরশাদের দেখা হতেই সে নিজের বড় বাবাকে সালাম করে বললো,
“দিনদিন হ্যান্ডসাম হয়ে যাচ্ছো শশুর আব্বা। আমার শাশুরি মা কি জাদু করেছে তোমায়?”
“তুই আর ভালো হইলিনা মেয়ের জামাই।”
“তোমার মেয়ে ভালো হতে দিলো কই?”
ইজাজ সাহেব হেসে ফেললেন তার এমন কথায়।
তাদের কথোপকথনের মাঝেই আলিশা এসে ভাইয়ের বুকে আছড়ে পড়লো। সে থেকেই ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে কেঁদে চলছে। আরশাদ নিজের ছোট পরিকে এতোদিন পর কাছে পেয়ে তার সকল অভিযোগ শুনছে।
“এতোদিন কেন আসোনি ভাই? জানো কত্ত মিস করেছি তোমায়। তোমার মতো কেউ আমায় বোঝেনা।”
আরশাদ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
“এইতো ভাই এসে গেছি, আর কোথাও যাবোনা আমার পরিকে ছেড়ে।”
“সত্যি?”
“একদম সত্যি। এখন কান্না থামা নাহলে তোর সব গিফ্ট অন্য কাউকে দিয়ে দেবো।”
“এই না না, দেখো আর কাঁদছিনা।” (চোখমুখ মুছে বললো আলিশা)
নীলা এসে পিছন থেকে বললো,
“হুম, সব ভালোবাসা শুধু ভাইকে না? আমাকে তো কেউ খেয়ালই করছেনা।”
আলিশা পিছু ফিরে জড়িয়ে ধরলো নিজের নীলাপু কে।
“তোমার সাথে কাট্টি। কথা নেই কোনো।”
“তাহলে আমায় জড়িয়ে ধরলি কেন?”
“আমার নীলাপু কে আমি ধরবো তাতে তুমি কিছু বলার কে?”
নীলা তার মাথায় গাট্টা মেরে বললো,
“এখনো দুষ্টমি গেলোনা, তাই না?”
“না।”
নীলা এবার আলিশা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো – “তোর সব কথা শুনবো, এবার মাফ করে দে পুতুল।”
‘দিলাম।”
আরশাদ নিজের মা এবং বড় মাকে সালাম করে একসাথে দুজনকেই আগলে নিলো নিজের বাহুতে।
“আমার মায়েরা কেমন আছে?”
শাইনা আরশাদ কে সরিয়ে পিঠে চাপড় মেরে শুধালো,
“হুম বদমাশ ছেলে, এতোদিন পর মায়েদের কথা মনে পড়লো?”
আরশাদ কানে ধরে নাটকীয় ভঙ্গিমায় বললো – “উফ স্যরি শাশুরি আম্মা। আপনার মেয়েকে সামলাতে সামলাতে দেরি হয়ে গেলো।”
“সব দোষ এখন আমার মেয়ের তাই না?”
“একদম”
শাইনা কথা বললেও আয়শা একেবারে চুপ। তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝড়ছে নিরবে। এতোদিন পর নিজের বুকের ধন কে কাছে পেয়ে নিজেকে আর সামলাতে পারেন নি।
“মা, ও মা…কথা বলবেনা আমার সাথে?”
আরশাদ নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বললো – “মা, তোমার শাদ তোমায় বড্ড মিস করেছে।”
“একবারো কি আসা যেতোনা?” (আয়শা)
“পরিস্থিতি নাগালে ছিলোনা মা। তবে কথা দিচ্ছি তোমায় ছেড়ে আর দূরে যাবোনা।”
আয়শা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে হুহু করে কেঁদে উঠলেন। ছেলের মুখ দেখে বললেন – “শুকিয়ে কেমন হয়েছিস বাবা? কতদিন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না।”
পাশ থেকে মা-ছেলের আহ্লাদ দেখে আলিশা মুখ ভেঙিয়ে বললো – “আমি জানতাম তুমি ভাইকেই বেশি আদর করো। আমাকে তো সুযোগ পেলেই মাইর দাও, হুহহহ।”
“মাইর খাওয়ার মতো কাজ-কারবার করিস কেন?” (আরশাদ)
“ভাই তুমিও?”
“এ্যাঁ ভাই তুমিও – আলিশা কে নকল করে বললো আরশাদ।
একটু আগে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছিলি আর এখন মা আমায় আদর করছে দেখে তোর জ্বলছে। হিংসুটে মেয়ে।”
আলিশা নীলার বাহু ধরে বললো,
“হুহহ সরো তুমি। আমার নীলাপুই ভালো।”
ইজাজ সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকায় তিনি নীলা – আরশাদের সাথে দেখা করেই চলে গেছেন অফিসে।
সবার সাথে আরশাদ-নীলিমার দেখা হলেও হয়নি তিনজনের সাথে – আরহাম, মেহরোজা আক্তার ও নিয়াজ খান।
নিয়াজ খান নিজের মাকে নিয়ে ডাক্তার কাছে গিয়েছেন। মেহরোজা আক্তার এর হাঁটুর ব্যাথা বেশ বেড়েছে তাই আর দেরি না করে আজই নিয়ে গেছেন জোড় করে। যদিও মেহরোজা আক্তার নিজের নাতি-নাতিনের সাথে দেখা না করে যাবেই না। পরে নীলাদের আসতে দেরি হবে বলে মানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উনাকে।
আরহাম লিভিং রুমের সোফায় বসে ডোরাকে নিয়ে খেলছে।
কিসব হাবিজাবি বলতেই আছে ছেলেকে আর সেও মন দিয়ে বাবার কথা শুনছে আবার একটু পর পর হাত উঠিয়ে বাবার গাল স্পর্শ করছে।
ছেলের সাথে কথা বলার সময় কেউ একজন পিছন থেকে তার চুল মুঠো করে টেনে ধরলো।
“কে রে এটা? কার এতো সাহস রকস্টার আরহামের চুল ধরার?”
নীলা পিছন থেকে আরো জোড়ে চুল টেনে ধরে বললো –
“ওরেহ আমার গুলিস্তানের রকস্টার, বাইরে এলিনা কেন?”
“তুই এসে মাত্র শুরু করে দিলি নীলা? ছাড় আমার চুল নাহলে আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।”
“এই ছেলে আমি বড় বোন তোর, আপু বলে ডাক।”
“এ্যাঁ আসছে আমার আপু, ছাড় চুল।”
নীলা চুল ছেড়ে দিতেই আরহাম ডোরাকে সোফায় শুইয়ে দিয়ে পাশে কুশন রেখে উল্টো ঘুরে দাড়ালো।
“এই নীলক্ষেত, আমি যা যা বলেছিলাম সব এনেছিস তো?”
“মাম্মায়ায়ায়া দেখো আমায় কি বলে….”
মেয়ের চিৎকার শুনে শাইনা বেগল দৌড়ে আসলেন…
“কি হয়েছে মা? এভাবে চিল্লালি কেন?”
“দেখো তোমার আদরের ছেলে আমাকে নীলক্ষেত ডেকেছে।”
“ও আমার চুল টেনেছে।”
-দেখা হওয়া মাত্রই ঝগড়া শুরু তোদের? উফ কি যে করি বাবা…”আমি গেলাম রান্নাঘরে – বহু কাজ পড়ে আছে।”
শাইনা যেতেই নীলা-আরহাম অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
দুজন একসাথে বলে উঠলো – “মাকে জ্বালাতে ভালোই লাগে”
আরশাদ তখনি লিভিং রুমে প্রবেশ করেছে বিধায় তাদের কথা শুনতে পেলো – “আমার শাশুরি আম্মাকে আর শান্তি দিলিনা তোরা”
আরশাদ ও আরহাম একে অপর কে দেখা মাত্রই কাছে এসে কাধে কাধ মিলিয়ে ধাক্কা খেয়ে হাত মিলালো। এটা তাদের ছোটবেলার অভ্যাস – দেখা হলেই এমন করে।
“হেই ব্রো, কতদিন পর। আই মিসড আওয়ার ফুটবল ম্যাচ কম্পিটিশেন ফর দো লং।”
“এসে গেছি আমি তাই এখন….
” আবার হবে…(আরশাদ – আরহাম দুজনেই একসাথে বলে উঠলো)
তাদের সাক্ষাৎকারের মাঝেই মিহি স্বরে “ওয়া ওয়া” শব্দ কানে এলো সবার। আরহামের খেয়াল এলো ডোরার দিকে – যাকে সে সোফায় শুইয়ে এসেছে। সে দ্রুত ডোরার কাছে এসে তাকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো।
নীলিমা এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সেদিকে। কি সুন্দর দৃশ্য।
সে এগিয়ে গিয়ে বললো – “আরশান? আমাদের আরশান?”
আরহাম মাথা উপর নিচ করলো।
“আমি কি নিতে পারি ওকে?”
আরহাম উত্তর না দিয়ে ডোরাকে এগিয়ে দিলো নীলিমার দিকে। নীলা ছোট্ট ডোরাকে কোলে নিয়ে কপালে চুমু আঁকলো। কি আদুরে বাচ্চা, ফর্সা গোলগাল মুখ – চোখ পিটপিট করে চেয়ে আছে নীলার দিকে।
আরশাদ এগিয়ে এসে দেখলো ডোরাকে। দেখেই আবেগে মন টা কেমন করে উঠলো – এটা তার ছোট পরির সন্তান মানে তার সন্তান। নীলার থেকে ডোরাকে কোলে নিয়ে আদর করলো। তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছেনা তাদের ছোট আরহাম-আলিশা মা-বাবা হয়ে গেছে।
“অনেক আদুরে তাই না? দেখো কেমন করে চেয়ে আছে।” (নীলা)
“অনেক আদুরে। আমাদের সবার জানবাচ্চা বলে কথা।” (আরশাদ)
“এই আরহাম, তোর তো লটারি লেগেছে – এতো কিউট বাচ্চা কেমনে হলো তোর?”
“বাপ কিউট বলে ছেলেও কিউট হয়েছে।”
“আমার বোনের জন্য কিউট হয়েছে। বুজেছিস?”
“আরশান একেবারে আরহামের উপর গিয়েছে যেন তার ছোটবেলার প্রতিচ্ছবি।” (নীলা)
“এই প্রথম তুই কোনো সঠিক কথা বললি।” (আরহাম)
“না আসলে ভুল বলেছি, আমার ভাইপো তার ফুপ্পির মতো কিউট হয়েছে। তাই না আরশাদ?”
“না ও নিজের মামার মতো কিউট হয়েছে।”
“আর আমি পটলের মতো হয়েছি।” (আরহাম)
তার কথায় নীলা-আরশাদ হেসে ফেললো।
আলিশার শরীর ভালো নেই বিধায় সে ভাই-ভাবির সাথে দেখা করেই নিজের কামরায় চলে গিয়েছে অনেক আগে।
শাইনা-আয়শা ও সন্ধ্যার নাস্তার আয়োজন করতে কিচেনে ব্যাস্ত।
সার্ভেন্টরা নীলাদের লাগেজ তাদের কামরায় নিয়ে গেছে কিছুক্ষন আগে। নীলা-আরশাদ নিজেদের কামরার দিকেই যাচ্ছিলো কিন্তু আরহামের সাথে দেখা করার জন্য এদিকটা আসা – তারা জানতোনা একসাথে আরশানের সাথেও দেখা হয়ে যাবে।
ছোট আরশান কে নিয়ে যেন তাদের খুশির শেষ নেই। মামা নাকি ফুপ্পির মতো হয়েছে, কাকে বেশি ভালোবাসবে এইসব আলোচনাতে ব্যাস্ত এখন তারা।
ডোরার ক্ষিদে পেয়েছে বিধায় আরহাম তাকে নিয়ে নিজেদের রুমের দিকে চলে গেলো। আরশাদ-নীলিমাও নিজেদের রুমের দিকে পা বাড়ালো – কতদিন পর নিজেদের সেই চিরচেনা বাড়িতে তারা। ভাবতেই খুশি খুশি লাগছে দুজনের।
আলিশা বেডে শুয়ে রেস্ট করছে। তার শরীর বড্ড ব্যাথা করছে – সব এই গন্ডারের দোষ। কাল রাতে কান ধরে উঠবস করানোর শাস্তি তাকে রাতে শুদে-আসলে ফিরিয়ে দিয়েছে, কোনো বারণ শুনেনি। এখন আলিশার নড়তেও জান যায় যায় অবস্থা। এতক্ষন সবার সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও এখন নিজের কামরায় এসে আর পারছেনা।
আরহাম ডোরাকে এনে আলিশার বুকে শুইয়ে দিলো।
“ওর ক্ষিদে পেয়েছে।”
“তুই খাওয়া।”
“আর ইউ ম্যাড?”
“আজকে ওকে তুই খাওয়াবি। আমি পারবোনা। আমার সারা শরীর ব্যাথা করছে।”
“প্রথমে আদর করে বলেছিলাম তখনি রাজি হলে এখন এই অবস্থা হতোনা।”
“তাই বলে এতবার?”
“প্রথমবার তো নয়। অভ্যাস্ত তুই।”
“দূরে সর বেয়াদব ছেলে। সাথে তোর আন্ডাকেও সরা।”
“আমার আন্ডার ক্ষিদে পেয়েছে।”
“তুই খাওয়া।”
“ছোট মাকে ডাকবো?”
“প্রয়োজন নেই। খাওয়াচ্ছি।”
আলিশা ডোরাকে ফিড করাতে শুরু করলে আরহাম ড্রেসিং রুমের দিকে গেলো।
একটুপর হাতে হট ওয়াটার ব্যাগ নিয়ে ফিরে আসলো।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৬
আলিশা যখন ডোরাকে ফিড করাতে ব্যাস্ত তখনি কোমড়ে হালকা গরম কিছু অনুভব করলো। পিছু ফিরে দেখলো আরহাম তার কোমড়ে হট ব্যাগ ধরে আছে।
আলিশা অবাক হলোনা – এটা প্রতিবারের কাহিনী। নিজেই ব্যাথা দিবে আবার নিজেই সাড়াবে।
