তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৬
noorayn
আলিশা তড়িঘড়ি করে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। নোটিফিকেশনের পর নোটিফিকেশন ভেসে উঠছে স্ক্রিনজুড়ে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, নিউজ পোর্টাল – সবখানেই একটা খবর। কাঁপা আঙুলে সে একটি লাইভ নিউজ খুলতেই মিনু প্রায় ছুটে গিয়ে লিভিং রুমের টিভিটা অন করে দিলো।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিউজ চ্যানেলের পরিচিত ব্রেকিং নিউজের সাউন্ড ভেসে আসলো সবার কানে।
স্ক্রিনের নিচে বড় অক্ষরে লেখা –
——-BREAKING NEWS——-
আরহাম মেহতাবক খানকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া বিতর্কের অবসান। সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ পেল রহস্যময় তরুণীর পরিচয়।
নিউজ প্রেজেন্টার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছে
“রকস্টার আরহাম মেহতাব খানকে ঘিরে গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে বিতর্ক চলছিলো ; অবশেষে তারই জবাব দিয়েছেন শিল্পী নিজে। আজ রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যাকে ঘিরে এতদিন নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছে – “তিনি তার প্রেমিকা নন।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য স্ক্রিনে ভেসে উঠল প্রেস কনফারেন্সে আরহামের বক্তব্য।
“সে আমার কাজিন…আলিশা খান। ছোটবেলা থেকে আমরা একই ছাদের নিচে, একই পরিবারের সদস্য হিসেবে বড় হয়েছি।”
আবারও নিউজ প্রেজেন্টারের কণ্ঠ শোনা গেলো।
“নিজের দাবির পক্ষে মেহতাব সাংবাদিকদের সামনে শৈশবের একাধিক ব্যক্তিগত ছবি প্রদর্শন করেন। যেখানে তাকে এবং আলিশা খানকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখা যায়। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে, অনেকেই আগের অভিযোগ ও সমালোচনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে পোস্টও করছেন।
–টেলিভিশনের প্রতিটি শব্দ যেন লিভিং রুমের নিস্তব্ধ পরিস্থিতিতে আরও ভারী হয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।
আলিশার হাত থেকে ফোনটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে টেলিভিশনের স্ক্রিনে। মুখে নেই কোনো বিস্ময়, নেই কোনো স্বস্তি। সে কেমন করে যেন তাকিয়ে ছিলো টিভির স্ক্রিনের দিকে। তার কেমন অনুভূতি হচ্ছে সে নিজেও যেন তা বুঝে উঠতে পারছেনা।
–ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকেই যেন হঠাৎ বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। কেউ কিছু বলছে না, কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেও না। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ঘরে হৈ-হুল্লোড়ে মেতে ছিলো – সেখানে এখন শুধু টিভির নিউজ প্রেজেন্টারের কণ্ঠই শোনা যাচ্ছে। আরশান টিভির স্ক্রিনে গোলগাল চোখ করে তাকিয়ে আছে আর আঙুল চুষছে – তার চোখে বিষ্ময়। যেন সে জানতে চাচ্ছে তার বাবা ওখানে কেন? সে নীলার কোল থেকে বারবার টিভির স্ক্রিনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে আর আধো আধো গলায় শব্দ করছে – “বা..ব্বা দাই, বাব্বা দাই”
আরশানের কন্ঠে আলিশা এক পলক ছেলের দিকে তাকালো।
সবার ধ্যান ভাঙলো নিয়াজ সাহেবের উচ্চ কন্ঠে –
“আরহামের সব কিছু আমি মেনে নিয়েছিলাম। তবে আজ সবার সামনে আমার মেয়েকে অস্বীকার করেছে সে! এটা আমি কিছুতেই মানবোনা।”
“আপনি শান্ত হোন। আমার প্রেশার বেড়ে যাবে..” (আয়শা)
“আমার মেয়ে কি তার বোন? সে কিভাবে পারলো নীলার সাথে আলিশাকে মেলাতে? এতে সে নিজের বউ সহ ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়েও ছিনিমিনি খেলেছে।”
–সবাই চুপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই।
নিয়াজ সাহেব এবার আলিশার দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন – ” আলিশা, তুমি কি এসব ব্যাপারে জানতে?”
–কোনো রেসপন্স নেই।
নিয়াজ সাহেব এবার ধমকে উঠলেন –
“কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে?”
–আলিশা দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে দ্বিমত করলো। সে কিছুই জানতোনা এসব ব্যাপারে।
“তুমি কি আরহামের এসব….” তিনি কথা শেষ করার আগেই
আলিশা শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো –
“বাবা, আমরা এই নিয়ে পরে কথা বলি?”
কথাটি বলেই আলিশা আর কোনোদিকে না তাকিয়ে ; নীলার কাছ থেকে ডোরাকে কোলে নিয়ে চলে গেলো নিজ কামরায়।
–সবাই চেয়ে থাকলো আলিশার গমনের পথে।
–নিয়াজ সাহেব এবার নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন – “আম্মা, আপনি কি এখনও বলবেন ; আপনি কোনো ভুল করেননি ওদের বিয়ে দিয়ে?”
“নিজের কামরায় যাও নিয়াজ। আমরা এই নিয়ে কথা না বললেই ভালো। স্বামী – স্ত্রীর ব্যাপারে আমাদের কথা বলা উচিত নয়।”
“আম্মা! বিষয়টা এখন কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।”
“আরহাম দাদুভাই এবং বাডির সকলকে আসতে দাও। আমরা এই নিয়ে রাতে কথা বলবো।”
–নিয়াজ সাহেব আর কোনো বাক্য ব্যায় না করে রাগান্বিত হয়ে চলে গেলেন নিজ কক্ষের দিকে।
আয়শাও পিছু ছুটলেন স্বামীর।
–লিভিং রুমে এখন কেবল মেহরোজা আক্তার, নীলা, শাইনা এবং মিনু অবস্থান করছে।
–শাইনা বেগম ধীর পায়ে এগোলেন শাশুরির দিকে।
“আম্মা আপনি ঠিক আছেন?”
“দাদুভাই এইডা কি করলো বড় বউ?”
“অবশ্যই যা করেছে ভুল করেছে আম্মা। আজ শুধু বাড়ি ফিরুক এই ছেলে।”
“তোমার পোলা কি কারো কথা আমলে নেয়?”
“পিঠের ছাল তুলে দেবো আজ ওর।”
“আমি এখনো বাইচ্চা আসি, আমি থাকতে আমার কোনো নাতি-নাতিন রে নিয়া এরকম বলার সাহস কি করে হয় তোমার?”
“মাফ করবেন আম্মা। তবে আরহামকে আপনি ছোট থেকে শাসন করতে দেননি যার আজকের পরিনয় বেপরওয়া আরহাম।”
–এই কথায় মেহরোজা আক্তার নীরব রইলেন। কারন, তিনি জানেন ; শাইনা ভুল কিছু বলেনি।
আরহামের মুখের দিকে তাকালে আজও উনার মনে পড়ে যায় প্রয়াত স্বামী মুজাহিদকে। চোখের চাহনি, হাসির রেখা, এমনকি রাগ করলে মুখটা গম্ভীর করে ফেলার ভঙ্গিটাও যেন হুবহু তার দাদাজানের মতো। সেই কারণেই হয়তো নিজের অজান্তেই আরহামের প্রতি তার মায়াটা সবসময়ই একটু বেশি।
আরহামও ছোটবেলা থেকেই দাদা-দাদির ভীষণ ন্যাওটা ছিলো। অন্য ভাইবোনেরা যেখানে খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, সেখানে আরহামের দিনের বেশিরভাগ সময়ই কাটত দাদা-দাদির আশেপাশে। বয়স বাড়লেও সেই টানটা কোনোদিন কমেনি।
–মা, আরশাদ কল দিচ্ছে। আমি আসছি।” বলেই নীলা প্রস্থান করলো লিভিং রুম থেকে।
শাইনা নিজেকে সামলে উঠে কোনোমতে মিনুকে বললেন –
“মিনু, আম্মার জন্য খাবার আর ঔষধ নিয়ে আয়।”
“আমি কিছু খাইতাম না বড় বউ।”
“আপনার ঔষধের সময় পেড়িয়ে যাচ্ছে।”
নিজের কামরায় ফিরে, আলিশা দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে নিঃশব্দে বিছানায় বসে আছে। সে ডোরাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে। ডোরা কিছুই না বুঝে বারবার মায়ের বাহুর ফাঁক গলে নিচে নামার চেষ্টা করছে। কখনো ছোট্ট পা দুটো ছুঁড়ছে, কখনো গুলুমুলু হাত দিয়ে মায়ের গাল স্পর্শ করছে। কিন্তু আলিশা তাকে ছাড়লো না। বরং আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে আগলে রাখলো।
–ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা।
আলিশার মনের গহীনে একের পর এক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।
সে জানে, আরহাম আজ যা করেছে তা হয়তো নিজের ক্যারিয়ার বাঁচানোর তাগিদেই করেছে। এই ইন্ডাস্ট্রিতে একটা ভুল গুজবও বছরের পর বছর ধরে একজন মানুষের পরিশ্রমকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। তাই সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্তে আলিশার কোনো আপত্তি নেই। তবে, সবটা কি এভাবেই বলতে হতো? একবারও কি তার কথা মনে পড়েনি?
একটা ফোন?
একটা মেসেজ?
একবার যদি তাকে জানাতো যে সে এমন কিছু করতে যাচ্ছে তবে কি আলিশা মানা করতো? হয়তো না।
সে নিজেই বলতো – “করো। যা তোমার জন্য ভালো, সেটাই করো।”
কিন্তু, সেই সুযোগটুকুও তো দেওয়া হলো না তাকে।
যেটা তার অনুমতি নিয়ে করার কথা সেটা সেই জানলো সবার শেষে?
আরহাম কিভাবে পারলো নিজের বাচ্চার মাকে নিজের বাকি কাজিন এবং আপন বোনের সাথে তুলনা করতে?
তার মতামতের কি একটুও প্রয়োজন হয়নি? স্ত্রী হিসেবে না হলেও, একজন মানুষ হিসেবেও কি সে এতটুকু আগে জানার যোগ্য ছিলোনা?
ভাবনাগুলো বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসতেই আলিশার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
ডোরা তখনও মায়ের বুকের ভেতর গুটিশুটি মেরে নড়াচড়া করছে। ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের থুতনি ছুঁয়ে আধো গলায় ডেকে উঠলো- “মা..ম্মা..”
আলিশা ডোরাকে বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে উঠলো।
সন্ধ্যা প্রায় ৭ টা….
দিনভর ব্যস্ততা আর টানটান উত্তেজনার পর আজ যেন অনেকদিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে আরহাম। প্রেস কনফারেন্স সফল হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড়ও অনেকটা থেমে এসেছে। বুকের ওপর চেপে থাকা ভারটা যেন হালকা হয়ে গেছে।
সেই স্বস্তি নিয়েই গাড়িটা গ্যারেজে রেখে আঙুলে চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে শিস দিতে দিতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো সে।
মুখে আগের মতোই নিশ্চিন্ত হাসি।
সিঁড়ি বেয়ে যেই দোতলায় উঠতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো – “মেহতাব! দাঁড়াও।”
আরহাম থেমে ভ্রু কুঁচকে পেছনে তাকালো।
লিভিং রুমে বাড়ির প্রায় সবাই বসে আছে। ইজাজ সাহেব, নিয়াজ সাহেব, শাইনা, আয়শা, মেহরোজা আক্তার, নীলা, আরশাদ সবাই ; কেবল আলিশা এবং ডোরা নেই।
–আরহাম মুহূর্তের জন্য অবাক হলেও মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেলো না। সে ধীর পায়ে সবার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো –
“আবার কী হলো? সবাইকে একসাথে দেখে তো মনে হচ্ছে পারিবারিক কোনো জরুরি সভা বসেছে। নাকি কোনো পার্টির প্ল্যান হচ্ছে?”
ইজাজ সাহেব কড়া গলায় বললেন –
“চুপ কর, বেয়াদব ছেলে।”
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“আচ্ছা, আমি আবার কি করলাম? বাড়িতে ঢুকতেই বেয়াদব বলা শুরু করে দিলে! যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। সারাদিন আমার ছেলেকে দেখিনি। ওর কাছে যাবো আমি।”
–আরহামের কথাটা শুনেই নিয়াজ সাহেব ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
“ছেলে? কার ছেলে?”
আরহাম বিন্দুমাত্র না ভেবে উত্তর দিলো –
“কার আবার? অবশ্যই আমার।”
“তোমার আবার ছেলে আছে নাকি?”
আরহাম নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে শুধালো –
“জ্বি, অবশ্যই আছে, শুশুউউউ আব্বা। আর সেই ছেলে কিন্তু আপনার মেয়ের পেট থেকেই বেড়িয়েছে।”
তার কথা শেষ হতেই নিয়াজ সাহেব ক্ষুব্ধ হয়ে ইজাজ সাহেবের দিকে তাকালেন।
“দেখেছো ভাইজান? তোমার ছেলের অধঃপতন কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে?”
ইজাজ সাহেবও কপাল কুঁচকে ফেললেন।
“মেহতাব, তোমার এই বেয়াদবিগুলো কবে কমবে?”
আরহাম একচিলতে হাসলো।
“যেদিন দাদা হবো, সেদিন।”
“আমি কি তোমার সাথে মশকরা করছি?”
“আমিও করছি না। তাই বলছি, কি হয়েছে সেটা তাড়াতাড়ি বলুন। আজ এই বিশেষ সভা কি আমাকে নিয়েই?”
শাইনা এতক্ষণ চুপচাপ ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখছিলেন। এবার ধমক দিয়ে বললেন –
“আর একটা কথা বললে কিন্তু পিঠের ছাল তুলে নেবো, বেয়াদব ছেলে।”
আরহাম মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো –
“ওহহহ, মাই সুইট কিউট মা! এখন তো তোমার নাতির মাইর খাওয়ার বয়স আর আমার খাওয়ানোর।””
“দিনদিন একেবারে রসাতলে যাচ্ছিস, বেয়াদব ছেলে!”
আরহাম দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলো।
“বাসায় ঢোকার পর থেকে সবাই শুধু বেয়াদব, বেয়াদব বলেই যাচ্ছে। কিন্তু আমি কি করেছি, সেটা কি কেউ বলবে?”
এবার আরশাদ নীরবতা ভেঙে বললো –
“কি করিসনি তুই? আমার বোনকে সবার সামনে অস্বীকার করেছিস!”
–এবার যেন একে একে দুই মেলালো আরহাম। তাকে নিয়ে এই সভার কারন ও বুঝে এলো।
“এখন বুঝেছি…প্রেস কনফারেন্স রাইট? এই নিয়েই সবার এতো সমস্যা?”
“আমার মেয়েকে নিয়ে মিথ্যা কেন বলেছো?” নিয়াজ।
“লিসেন, শুশুউউ আব্বা। আমি কোনো মিথ্যা বলিনি। যা সত্যি তাই বলেছি।”
“মিথ্যা বলোনি বলছো?”
“কোনটা মিথ্যা? আলিশা কি আমার কাজিন নয়? আমরা কি একই সাথে বড় হয়নি?”
“সে সাথে আমার মেয়ে তোমার স্ত্রী। তা কি ভুলে গেছো?”
“সবার সামনে বলার কথা ছিলো?”
এবার নিয়াজ সাহেব চুপ করে গেলেন।
“আলিশা তোমার সন্তানের মা। তুমি কিভাবে তাকে নিজের বোনের সাথে তুলনা করতে পারো?” ইজাজ।
“আমি তুলনা করিনি। জাস্ট বলেছি আলিশার সাথে ভাইরাল ছবি আমার নীলার সাথেও রয়েছে। ব্যাস এতটুক।”
নিয়াজ সাহেব আবারও বলে উঠলেন –
“আমার মেয়ের থেকে অনুমতি নিয়েছিলে?”
“সেটা আমাদের হাসবেন্ড-ওয়াইফ এর ম্যাটার।”
নিয়াজ সাহেব তেতে উঠলেন –
“এসব বেহায়াপনা আচরন কখন ছাড়বে তুমি?”
“যেদিন আপনাকে আমার দ্বিতীয় সন্তানের মুখে নানা ডাক শুনাবো সেদিন।”
“আরহাম….” ইজাজ ধমকে উঠলেন।
“আজ এইসব কিছু হচ্ছে তোমার বেপরওয়া মিউজিক ক্যারিয়ারের জন্য। এসব কখন ছাড়বে তুমি?”
–এবার যেন আরহাম সিরিয়াস হলো।
“তা আমি কোনোদিনও ছাড়বোনা আর না তো ছাড়ার জন্য আকড়ে ধরেছি।”
“এখনো সময় আছে এসব বেলেল্লাপনা ছেড়ে আমাদের বিজনেস জয়েন করো।”
“আমি তোমার বিজনেসে ইন্টারেস্টেড না, বাবা।”
“তো কি করবে?”
“যা এখন করছি তাই।”
“নিজের বউ বাচ্চাকে কতদিন লুকিয়ে রাখবি?” আরশাদ।
“সময় হলে সবটায় সামনে আসবে।”
“এখন কি সঠিক সময় নয়?” নিয়াজ।
“ঠিক আছে। আমি নাহয় পাবলিকলি এনাউন্স করে দেবো তবে আপনারা পারবেন তো সেটা করতে?”
–আরহামের কথায় যেন মুহূর্তেই পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।সে ভুল কিছু বলেনি।
–দুই বছর ধরে যত্ন করে লুকিয়ে রাখা একটি সম্পর্ক। তার ওপর অল্প বয়সে বিয়ে, আবার তাদের একটি সন্তানও আছে। এসব একসঙ্গে প্রকাশ্যে এলে তা শুধু পারিবারিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে না; মুহূর্তেই সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে আলোচিত খবর হয়ে উঠবে।
আর খান ইন্ডাস্ট্রির প্রতিদ্বন্দ্বীরা?
এতদিন ধরে যে সুযোগের অপেক্ষায় আছে, তারা নিশ্চয়ই এই বিষয়টাকেই হাতিয়ার বানিয়ে খান পরিবারের সম্মান আর প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করবে। ব্যবসার প্রতিযোগিতা কখনোই শুধু ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকে না; ব্যক্তিগত জীবনও সেখানে অস্ত্র হয়ে ওঠে।
আর আত্মীয়-স্বজন?
একসঙ্গে হাজারো প্রশ্ন ছুটে আসবে। কেন লুকানো হয়েছিল? এতদিন কেন কাউকে জানানো হয়নি?
এবং আলিশা?
এত অল্প বয়সে মেয়েটা কি সত্যিই এত বড় ঝড় সামলানোর জন্য প্রস্তুত?
মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি, অযাচিত মন্তব্য, সংবাদমাধ্যমের অবিরাম অনুসরণ ; এসবের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়।
তাই খান পরিবারের সবার মনে একই ভাবনা।
আরও কিছুটা সময় যাক। দুজন আরও পরিণত হোক।
তখন নাহয় আয়োজন করে সবটা এনাউন্স করা হবে। আরহাম-আলিশাও তখন সবটা সামলানোর উপযোগী হয়ে উঠবে।
আরহাম আবারও বললো –
“কি হলো সবাই চুপ করে গেলেন যে? আমি আমাকে নিয়ে ভাবলে দোষ। তবে আপনাদেরটা ঠিক? অন্যায় হয়ে গেলোনা?”
–নিয়াজ সাহেব রেগে কিছু বলতে গেলে পাশ থেকে আয়শা থামিয়ে দিলেন।
ইজাজ সাহেব চুপ করে থাকলেন না।
“সঠিক সময় আসলে আমরাই সবটা এনাউন্স করবো। তবে তুমি কি নিজের আচরন সংযোত করবেনা? এক বাচ্চার বাপ হয়েছো। এভাবে আর কতদিন?”
“আমার আচরনে কি সমস্যা?”
–“সারাদিন টইটই করে বাইরে ঘুরে বেড়াও। মাঝরাত পেরিয়ে বাড়ি ফেরো। বউ-বাচ্চার দিকে কোনো খেয়াল নেই। পড়াশোনার অবস্থা তো আগেই গোল্লায় গেছে। দিনরাত শুধু শুটিং, পার্টি আর ক্লাব ; এই নিয়েই পড়ে আছো।”
কয়েক মুহূর্ত থেমে তিনি আরও কঠিন স্বরে বললেন,
“এসব কি কোনো ভদ্র, দায়িত্বশীল পরিবারের ছেলের আচরণ? সংসার করছো, সন্তানের বাবা হয়েছো ; তবুও তোমার মধ্যে দায়িত্ববোধের লেশমাত্র দেখতে পাই না। আর কতদিন এভাবে চলবে, মেহতাব?”
আরহাম কোনো কথারই তোয়াক্কা করল না। পেছন ফিরে নিজের কামরার দিকে হাঁটতে হাঁটতে হেয়ালি কন্ঠে বললো “আমি এমনই। আমাকে নিয়ে কারও কোনো সমস্যা থাকলে সরাসরি বলে দেবেন। প্রয়োজন হলে আমি আমার বউ-বাচ্চা নিয়ে আলাদা হয়ে যাবো।
“মেহতাব!” বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলেন ইজাজ সাহেব।
কিন্তু আরহাম একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকালো না। সোজা নিজের কামরার দিকে চলে গেলো।
–মেহরোজা আক্তার মিনুর সাহায্য ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। বয়সের ভারে সামান্য টলমল করলেও কণ্ঠে ছিল অটল কর্তৃত্ব।
“ইজাজ, শান্ত হও। সবাই যার যার কামরায় যাও। অনেক রাত হয়েছে।”
ইজাজ সাহেব ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন—
“আম্মা! দেখলেন তো? আপনার আদরের নাতি কী বলে গেল!”
মেহরোজা আক্তার একবার ছেলের দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতেই যেন বহু বছরের অভিজ্ঞতা আর কঠোরতা মিশে আছে।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৫
“আমি যা বলছি, সেটাই হবে। ওদের স্বামী-স্ত্রীর বিষয়ে এই বাড়ির কেউ আর একটি কথাও বলবে না। এটা আমার আদেশ।”
“আম্মা, আপনি…”
“আর কোনো কথা নয়। সবাই নিজের নিজের কামরায় ফিরে যাও।”
আরহাম নিজের কামরার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই আচমকা তার মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়লো উড়ন্ত শলার ঝাড়ু!
