তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২০
নওরিন মুনতাহা হিয়া
সকাল প্রায় সাড়ে নয়টা। আদ্রিয়ান বিছানায় শুয়ে বিভোর ঘুমে মগ্ন। জানালা দিয়ে রোদের মৃদু আলো রুমে প্রবেশ করছে। হঠাৎ করে বিকট শব্দে আদ্রিয়ানের ফোন বেজে উঠল, প্রায় দুই থেকে তিনবার রিং হয়। ঘুমের মধ্যে ফোনের আওয়াজ শুনায়, আদ্রিয়ান বেশ বিরক্ত হয়ে চোখ মুখ কুঁচকে তাকায়। কাঁধের বা – পাশে টেবিলের উপর রাখা ফোন, হাতে নেয় নাম্বার না দেখে রিসিভ করে। তার কানে ধরে এরপর ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে উঠে —–
“- হ্যালো কে বলছেন?
আদ্রিয়ানের ফোনে কল দেওয়া মানুষটা, অন্য আর কেউ। তার বোন সৃষ্টি। আদ্রিয়ান আমেরিকায় চলে আসার পর, সৃষ্টি সহ বাড়ির সকলের সাথে তার এখন কথা হয়। তালুকদার বাড়ির সকলের খোঁজ খবর এখন আদ্রিয়ান রাখে, শার্লিন বেগমের সাথে দিনের নিদিষ্ট কিছু সময় কথা বলে সে। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য, হয়ত পরিবারের মানুষজনকে খুব বেশি সময় দিতে পারে না। তবে সৃষ্টি মাঝে মধ্যে তাকে ফোন করে, কথা বলে। সৃষ্টি বলে —-
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“- ভাইয়া সকাল নয়টা বাজে, আর তুমি এখন ঘুম থেকে উঠো নি? আজ কি হাসপাতালে যাবে না তুমি? লেইট হয়ে যাবে তো?
ফোনের অপর পাশ থেকে, বোনের মিষ্টি কণ্ঠস্বর শুনে আদ্রিয়ানের মুখে থাকা বিরক্তির ছাপ দূর হয়ে যায়। তবে আদ্রিয়ান সাধারণ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে। কিন্তু কারান আর আবিহার বিয়ে, রাতে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়া সহ বিভিন্ন কারণে তার ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়। আদ্রিয়ান ফোন হাতে নিয়ে, বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আদ্রিয়ান বলে —–
“- সৃষ্টি বোন আমার তুই কেমন আছিস?
আদ্রিয়ানের কণ্ঠে বোন শব্দটা শুনে, সৃষ্টির মুখে হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু সে একটু মন খারাপ করে বলে —–
“- আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি। কিন্তু ভাইয়া তোমাকে অনেক মিস করছি। তুমি কবে আসবে বাংলাদেশে?
সৃষ্টির মন খারাপ করা কণ্ঠ শুনে, আদ্রিয়ান হেসে উঠে বলে উঠে —-
“- মন খারাপ করিস না বোন। আমি ও বাসার সকলে অনেক মিস করছি। খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে ফিরে আসব আমি —-.
“- সত্যি আসবে ভাইয়া?
“- হুম আসব। আচ্ছা আম্মু কোথায়?
“- আম্মু সকালের রান্না শেষ করে, এখন হয়ত চাচির সাথে বসে টিভি দেখছে? তুমি কি আম্মুর সাথে কথা বলবে? ডাক দিব আম্মুকে?
“- না থাক আম্মুর সাথে পরে কথা বলে নিব। আচ্ছা আব্বু কোথায়? বাসায় না দোকানে?
“- আব্বু সকালের নাস্তা খেয়ে, দোকানে চলে গেছে।
জামান সাহেব দোকানে চলে গেছে, কথাটা শুনে আদ্রিয়ান মন খারাপ হয়ে যায়। সে আশা করেছিল, আজ তার বাবার সাথে কথা বলবে। তবে আদ্রিয়ান স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে উঠে —–
“- ওহ্। তুই কি আজ ভার্সিটিতে যাবি না সৃষ্টি?
– “- না ভাইয়া ভার্সিটিতে যাব না। আজ বিকালে মালিহা আপুর এনগেজমেন্ট। বাড়ির সকলে মিলে আমরা অনুষ্ঠানে যাব —–.
আদ্রিয়ান সৃষ্টির সব কথা শুনেনি, তার কানে শুধু মালিহা নাম ভেসে উঠে। মালিহা তো সেই মেয়ে, যার সাথে আদ্রিয়ানের নয় বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। ডিভোর্স পেপারে মালিহা, নাম করে সাইন করা হয়েছিল? কিন্তু মালিহার বিয়ে মানে? আদ্রিয়ান সৃষ্টিকে প্রশ্ন করে —-
“- মালিহার বিয়ে মানে? বাড়ির সকলে কি মালিহার এনগেজমেন্ট যাচ্ছে?
মেঘের আসল নাম যে মালিহা, সৃষ্টির হয়ত এই কথাটা মনে ছিল না। আদ্রিয়ান আর মেঘের ডিভোর্সের ঘটনা হয়েছিল, প্রায় এক থেকে দেড় বছর আগে। এতো পুরাতন কথা সৃষ্টির মনে নেই, তাছাড়া মেঘকে সকলে মেঘ বলে ডাকে। মালিহা যে মেঘের অন্য নাম, তা সৃষ্টি খেয়াল ছিল না। সৃষ্টি মনে করে, আদ্রিয়ান হয়ত তার আত্মীয় মেয়ে মালিহার কথা জিজ্ঞেস করছে। সৃষ্টি বলে —-
“- হুম মালিহা আপুর এনগেজমেন্ট আজ বিকালে। বাড়ির প্রতৈকে এই অনুষ্ঠানে যাবে —–.
আদ্রিয়ান পুনরায় প্রশ্ন করে উঠে —
“- মালিহার বিয়ে কবে হবে? এনগেজমেন্ট পর?
“- না আজ বিকালে এনগেজমেন্ট। আর এক মাস পর বিয়ে। কিন্তু ভাইয়া তুমি হঠাৎ মালিহা আপুর কথা কেনো জিজ্ঞেস করছ?
সৃষ্টির করা প্রশ্ন আদ্রিয়ান এড়িয়ে যায়। এরপর পরিবার সহ অন্যান্য বিষয়ে খুটিনাটি কথা বলে, ব্যস্ততার অযুহাত দিয়ে ফোন রেখে দেয়। সৃষ্টির সাথে কথা বলা শেষ করে, আদ্রিয়ান বেলকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। সৃষ্টির বলা একটা কথা, তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মালিহার কি সত্যি বিয়ে হয়ে যাচ্ছে?
অবশ্য আদ্রিয়ান জামান সাহেবের রাগ, জেদের পরিমাণ খুব ভালো করে যানে। আদ্রিয়ান মালিহাকে ছেড়ে আমেরিকায় চলে এসেছে, প্রায় নয় বছর তার খোঁজ _ খবর নেই নাই। হয়ত আদ্রিয়ানের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্য, মালিহার আবার নতুন করে বিয়ে দিচ্ছেন ওনি। কিন্তু মালিহার বিয়ের কথা শুনে, আদ্রিয়ানের কষ্ট হচ্ছে না। মনের গহীনে কোন অনুভূতি তৈরি হয় না, যাকে জীবনে একবার ও দেখিনি তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় কি সত্যি মানুষের মনে জন্মে?
তবে মালিহার বিয়ের কথা শুনে, আদ্রিয়ান দুঃখ না বরং খুশি হয়েছে। মা – বাবা মারা এক অনাথ মেয়ের সঙ্গে, আদ্রিয়ান অনেক অন্যায় করছে। কিন্তু সত্যি কি সব দোষ শুধু মাএ তার? জোর করে বিয়ে করা যায়, বাধ্য হয়ে কবুল বলা যায়, কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া কি সংসার করা যায়? যে পুরুষ যানে যে, সে তার ওয়াইফকে যোগ্য ভালোবাসা আর সম্মান দিতে পারবে না। তবুও কি তার সাথে সংসার করা, উচিত কাজ হবে?
অতীতে যদি আদ্রিয়ান বিয়ের রাতে, বাংলাদেশ ছেড়ে আমেরিকায় না আসত। তবে হয়ত তার আর মালিহার এখন সুখের সংসার হতো, দুই – তিনটা সন্তান ও থাকত। দীর্ঘ নয় বছর সংসার করার পর হয়ত, মালিহার প্রতি আদ্রিয়ানের মায়া জন্মাত। অনাথ মেয়ের দুঃখ দেখে, তার হয়ত মন গলে যেতো। কিন্তু দয়া তো ভিখারির উপর আসে, বউয়ের প্রতি না। বউয়কে সম্মান, মর্যাদা, বিশ্বাস, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে হয়। কিন্তু আদ্রিয়ান কি মালিহাকে ভালোবাসতে পারত? আজ যার বিয়ের কথা শুনে, আদ্রিয়ানের বিন্দু _ মাএ কষ্ট অনুভব হচ্ছে না। যাকে হারিয়ে ফেলার ভয়, আদ্রিয়ান অনুভব করছে না। তার প্রতি কি সত্যি তার কখন ভালোবাসা অনুভব হতো?
আদ্রিয়ানের কাছে তার প্রশ্নর উত্তর নেই? তবে সে চাই মালিহা সুখে থাকুক, যে ভালোবাসা, সম্মান, আদ্রিয়ান তাকে দিতে পারেনি। তা হয়ত অন্য একজন দিবে, তাকে বউ হিসাবে গ্রহণ করে নিবে। প্রতিটা মেয়ের জীবনে স্বামী সংসার নিয়ে একটা সপ্ন থাকে, হয়ত আদ্রিয়ান মালিহার সপ্ন সত্যি করার মতো সক্ষম ছিল না। তার দ্বারা মালিহাকে ভালোবাসা কখন সম্ভব হতো না। অবশেষে মালিহা সুখে থাকুক এইটাই তার কাম্য। আদ্রিয়ান হয়ত মালিহার জীবনে ঘৃণিত এক পুরুষ হয়ে থেকে যাবে, যে বিয়ের পর বউ রেখে আমেরিকায় চলে এসেছে। কিছু মানুষের কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে তার চোখে ঘৃণার পাএ হওয়ার চেয়ে। তার থেকে দূরে গিয়ে নিষ্ঠুর হয়ে তার ঘৃণা সয্য করা উত্তম।
কিন্তু মালিহা আর আদ্রিয়ানের ডিভোর্স হয়নি এখন। আদ্রিয়ান মৌখিক তালাক ও দেয়নি মালিহাকে। শরিয়ত অনুসারে বা আইনি বৈধতায়, মালিহা এখন আদ্রিয়ানের স্ত্রী। দেড় বছর আগে আদ্রিয়ান ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে পারেনি, তার আগেই শার্লিন বেগমের হাতের ছোঁয়া লেগে ভুলবশত পানির গ্লাস কাগজে পড়ে যায়। যার ফলে কাগজ সম্পূর্ণ ভিজে যায়। যতখন না আদ্রিয়ান ডিভোর্স পেপারে সাইন করবে, ততক্ষণ মালিহা তার বৈধ স্ত্রী।
আদ্রিয়ানের কাছে হয়ত এই বিয়ে মিথ্যা, কিন্তু সে মালিহার জন্য কবুল বলেছে। তা মিথ্যা না। একজনের সাথে তালাক হওয়া না অবধি, অন্য কারোর সাথে বিয়ে হওয়া উচিত নয়। সমাজ, আইন, ধর্ম সব দিক দিয়ে, বিষয়টা দৃষ্টিকটুক মনে হয়। তাছাড়া মালিহার বিয়ের পর হয়ত, আইনি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন তাকে হতে হবে। মালিহার নতুন জীবন, নষ্ট করতে আদ্রিয়ান চাই না।
আদ্রিয়ানের উচিত মালিহাকে তালাক দেওয়া। হুম অবশ্যই দিবে সে। একমাস পর মালিহার বিয়ে, এর আগেই মালিহাকে ডিভোর্স দিবে আদ্রিয়ান। তিরিশ দিনের মধ্যে সে বাংলাদেশে যাবে, মালিহাকে ডিভোর্স দিবে এরপর আবার আমেরিকায় চলে আসবে। তবে মালিহাকে ডিভোর্স দিতে হলে, তার জামান সাহেবের সাথে কথা বলতে হবে। আজ বিকালে বাবার সাথে, কথা বলবে সে। আদ্রিয়ান সিদ্ধান্ত নেয়, মালিহাকে সে অবশ্যই তালাক দিবে। তার সাথে থাকা সমস্ত বন্ধন থেকে, মুক্তি দিবে অনাথ মেয়েটাকে।
আজ বাড়ি সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যাবে। কারণ ফারহানা বেগম আর মিরাজ সাহেব চলে যাবেন লন্ডনে। মিরাজ সাহেবের ব্যবসার খুব জরুরি প্রয়োজনে, তাকে লন্ডনে যেতে হবে। যার জন্য কারান আর আবিহার বিয়ে, খুব দ্রুত সম্পন্ন করেছেন ওনি। প্রায় দুই – থেকে তিনমাস তাকে, লন্ডনে অবস্থান করতে হবে। মিরাজ সাহেব একা এতোদিন বাহিরে থাকতে পারবেন না, যার জন্য তার সাথে যাবে ফারহানা বেগম।
অন্যদিকে কারান আর আবিহা ও, আজ চলে যাবে হানিমুনে। যদিও তাদের পরিকল্পনা ছিল, ফারহানা বেগম আর মিরাজ সাহেব লন্ডন থেকে ফিরে আসলে। পরে তারা হানিমুনে, বা কোথাও ঘুরতে যাবে। কিন্তু বউভাতের অনুষ্ঠানে, আবিহার মামা – মামি তাদের হানিমুনের টিকিট গিফট করছে। আর টিকিট অনুসারে, তাদের ফ্লাইট আজ রাত দশটায়। তাছাড়া কিছুদিন পর থেকে কারান ব্যবসায় জয়েন করবে, তখন চাইলে ও ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হবে না। আবিহার ভার্সিটি শুরু হয়ে যাবে।
যার জন্য তারা সিদ্ধান্ত নেয়, এখনই হানিমুন থেকে ঘুরে আসার। তবে একটা সমস্যা হয়েছে, তা হলো মেঘ। যদি বাড়ির সকলে দেশের বাহিরে চলে যায়, তবে বাসায় শুধু মেঘ আর আদ্রিয়ান থাকবে। বাসায় মেঘকে একা রেখে যাওয়া কি উচিত হবে? মেঘ অতিথি, তাছাড়া একা এক মেয়ে। বাসায় আদ্রিয়ান ও থাকবে। যদিও আদ্রিয়ানের চরিত্র নিয়ে, ফারহানা বেগম বা আবিহার সন্দেহ নেই। তবুও মেঘকে একা রেখে কি করে যাবে তারা?
মেঘ বাসায় কি একা থাকতে পারবে? সকালে খাবার টেবিলে ফারহানা বেগম মেঘকে, তাদের যাওয়ার কথা বলে। মেঘ বলে, সে একা থাকতে পারবে তার কোন অসুবিধা হবে না।
মেঘ আগে একাকিত্বের ভয় পেলে ও, এখন আর পায় না। যার সারা জীবন নিঃসঙ্গ হয়ে কাটিয়ে দিয়েছে, তার আবার একা থাকার ভয়? হাস্যকর বিষয়। বাংলাদেশে থাকতে ময়মনসিংহে যখন ডক্টরি, পড়াশোনা করেছে তখন একা বাসায় সে থেকেছে। তাই এখন একা বাসায়,আলাদা রুমে থাকতে মেঘের ভয় হয় না। আর কাল থেকে মেঘের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে, সারাদিন ক্লাস করে এসে সে ভীষণ টার্য়াড হয়ে যাবে। তখন আর একাকিত্বর ভয় তার করবে না।
তাছাড়া বাসায় আদ্রিয়ান সহ কাজের মহিলা রয়েছে। যারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টায় থাকবে। রাতে যদি মেঘ ভয় পায়, তবে যেনো কোন মেইডকে তার সাথে থাকতে বলে। আর আবিহা আর কারান দশ পনেরো দিন পরে চলে আসবে, হানিমুন থেকে। শুধুমাএ এই কয়েকদিন মেঘের একা থাকতে হবে, এইটা খুব বড়ো বিষয় না মেঘের জন্য।
মেঘ সারাদিন আর রুম থেকে বের হয়। গেস্ট রুমে বসে, বই – খাতা বের করে পড়াশোনা করে। মেঘের পড়ার টেবিলে ডক্টরি রিলেটেড, খুব গুরুত্বপূর্ণ আর শিক্ষণীয় বই রয়েছে। যা আদ্রিয়ানের পুরান বই। মেঘ বুক সেলফের প্রতিটা বই নিয়ে, মনোযোগ সহকারে পড়ে।
[ বিকাল ৪:০০ বাংলাদেশ ]
তালুকদার বাড়ির সকলে দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে। বিশ্রাম করার উদ্দেশ্য, রুমে চলে যায়। জামান সাহেব মাএ দোকান থেকে এসেছে, এরপর রুমে গিয়ে জামাকাপড় পাল্টে ওয়াশরুম থেকে গোসল করে আসেন। শার্লিন বেগম তখন রুমে আসেন, জামান সাহেবকে বলেন —–
“- জামান আপনি কি এখন দুপুরের খাবার খাবেন? খাবার কি গরম করব?
জামান সাহেব বিছানায় শরীর ছেড়ে দিয়ে, শার্লিন বেগমের কথার জবাবে বলেন —-
“- হুম খাবার গরম করে টেবিলে রাখো, আমি আসছি। বাড়ির সকলে দুপুরের খাবার খেয়েছে?
“- হ্যাঁ বাড়ির সকলের খাবার খাওয়া শেষ —.
শার্লিন বেগম রুম থেকে বের হয়ে, খাবার গরম করার জন্য রান্না ঘরে চলে যায়। জামান সাহেব যখন বিছানায়, আরাম করে শুয়ে ছিলেন। তখন তার ফোন বেজে উঠে, জামান সাহেব বিছানায় থাকা ফোন হাতে নিয়ে দেখে। ফোনের স্কিনে আদ্রিয়ানের নাম, ছেলে ফোন দেখে ও জামান সাহেব খুব একটা খুশি হলেন না। জামান সাহেব ফোন রিসিভ করে, অপর পাশ থেকে আদ্রিয়ান বলে উঠে ___
“- আব্বু কেমন আছেন আপনি?
আদ্রিয়ানের কথার জবাবে জামান সাহেব সাধারণ ভাবে বলে ___
“- হুম ভালো। তুমি কেমন আছো?
“- জি আমিও ভালো —.
“- হঠাৎ আমায় ফোন করলে?কোন প্রয়োজন?
জামান সাহেবের কথা শুনে, আদ্রিয়ানের মন কিছুটা খারাপ হয়ে যায়। সে কি শুধু প্রয়োজনে, তার বাবাকে ফোন করতে পারে। বাবার সাথে কথা বলা, তার শরীর স্বাস্থ্যর বিষয়ে জানার আগ্রহ বা অধিকার কি তার থাকতে পারে না? আদ্রিয়ান বলে ____
“- আব্বু প্রয়োজন ছাড়া কি তোমাকে ফোন করতে পারি না আমি?
আদ্রিয়ানের কথার বিপরীতে জামান সাহেব বলেন __
“- আদ্রিয়ান তুমি কি প্রয়োজন স্বার্থ ছাড়া, কোন মানুষকে আপন মনে করো। যে তার সাথে ফোন করে কথা বললে?
জামান সাহেবের কথায়, আদ্রিয়ান হাসে। যেহেতু জামান সাহেব ভূমিকা করে কথা বলছেন না, তাই আদ্রিয়ান ও আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা না বলে শান্ত ভাষায় স্পষ্ট স্বরে বলে উঠে ___
“- আব্বু আগামী এক মাসের মধ্যে আমি বাংলাদেশে ফিরব। এরপর এসে মালিহাকে ডিভোর্স দিব। তুমি উঁকিলকে বলে সব কাগজপত্র রেডি করে রেখো, আর মালিহার সাথে কথা বলে, কাগজে ওর সাক্ষর করিয়ে রেখো। খুব শীঘ্রই মালিহাকে ডিভোর্স দিতে চাই —-.
আদ্রিয়ানের এক ধমে বলে যাওয়া কথাটা, বুঝতে বা শুনতে জামান সাহেবের কিছুক্ষণ সময় লাগে।অনাথ মেঘকে বাবার স্নেহ, যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করেছেন ওনি। অবাস্তব হলেও জামান সাহেবের মন বলেছিল হয়ত, আদ্রিয়ান একদিন মেঘকে ভালোবাসবে? দেড় বছর আগে যখন তাদের ডিভোর্স হয়নি, জামান সাহেব কিছুটা রাগ করলে ও। মনে মনে খুশি হয়েছিলেন, যে আদ্রিয়ান এখন মেঘকে ডিভোর্স দেয়নি। খুব শখ ছিল ওনার মেঘকে, তালুকদার বাড়ির বড় পূএবধূর মর্যাদায় দেখার।
কিন্তু জামান সাহেবের সব সপ্ন, আশা, আজ আদ্রিয়ানের এক কথায় শেষ হয়ে গেলো। তবে যা দেড় বছর আগে হওয়ার কথা ছিল, তা আজ হচ্ছে। পার্থক্য শুধু সময়ের। জামান সাহেব আদ্রিয়ানকে প্রশ্ন করে __
“- হঠাৎ করে মালিহাকে ডিভোর্স দেওয়ার কারণ কি?
আদ্রিয়ান চাই মালিহা সুখে থাকুক, স্বামী, সংসার নিয়ে খুশি থাকুক। কিন্তু যতখন তাদের ডিভোর্স হবে না, ততক্ষণ মালিহার বিয়ে বৈধ হবে না। তবে আদ্রিয়ান জামান সাহেবকে সে কথা বলল না, আদ্রিয়ান মিথ্যা অযুহাত দিয়ে বলে —-
“- আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। একমাস পর তাকে বিয়ে করতে চাই আমি, তাই মালিহাকে ডিভোর্স দিব —–.
আদ্রিয়ানের কথা শুনে জামান সাহেবের কি বলা উচিত, তা হয়ত ওনি যানেন না। ওনি ছেলেকে আমেরিকায় পড়িয়ে, উচ্চশিক্ষিত তৈরি করতে পারলে ও। মানুষ হওয়ার শিক্ষা ওনি দিতে পারেন নি, জামান সাহেব বলেন —-
“- আদ্রিয়ান খুব বড়ো হয়ে গেছে তুমি। নিজের ভালোবাসার কথা, বাবার মুখের উপর বলার সাহস হয়ে গেছে। পরিবারের অমত ছাড়া, মেয়ে পছন্দ করে তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত ও নিয়ে ফেলেছ। সত্যি আমার ছেলে অনেক বড়ে্ হয়ে গেছে, এখন আর তার জীবনে তার বাবার কোন মূল্য নাই। তবে আদ্রিয়ান এতো বড়ো না হলেও পারতে, আমার ছোট আদু হয়ে থেকে গেলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেতো?
জামান সাহেবের কণ্ঠে যে আত্মানাথ, আর কষ্ট ছিল তা হয়ত আদ্রিয়ান উপলব্ধি করতে পারল। আদ্রিয়ান শান্ত হয়ে যায়, তার গলায় দিয়ে কোন কথা বের হয় না। ফোনের দুই _ পাশে নিরবতা বিরাজ করছে, জামান সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠেন —–
“- আদ্রিয়ান তোমার আর কষ্ট করে, টাকা, খরচ করে, প্রেমিকাকে রেখে বাংলাদেশে আসতে হবে না। একমাস পর আমরা সকলে আমেরিকায় আসব। কারান বিয়ে করেছে শুনলাম, ওর বউকে দেখা দরকার। তাছাড়া তোমার মামার সাথে, অতীত জমিসংক্রান্ত যা ঝামেলা বা ঝগড়া হয়েছিল তা মিটিয়ে নেওয়া উচিত। অতীত করা ভুল সবাই সংশোধন করে নিচ্ছে, আমি আর বাকি থাকব কেনো। একমাসের মধ্যে উঁকিলকে বলে ডিভোর্সের কাগজ রেডি করে রাখব, মালিহা ও সাইন করে দিবে চিন্তা করো না। আমেরিকায় ডিভোর্সের কাগজ সাথে করে নিয়ে আসব, তখন তুমি সাইন করে দিও —-.
জামান সাহেবের কথা শুনে আদ্রিয়ান বলে —-
“- ওকে —.
জামান সাহেব আবার আদ্রিয়নকে প্রশ্ন করে উঠে __
“- মালিহাকে ডিভোর্স দেওয়ার পর, তুমি তোমার প্রেমিকাকে বিয়ে করবে। তোমার বিয়ের অনুষ্ঠানে আমাদের দাওয়াত দিবে না আদ্রিয়ান?
জামান সাহেবের কথায় যে অভিমান, আর রাগ, ছিল যা আদ্রিয়ান বুঝে। সে বলে —
“- হুম দিব —.
জামান সাহেব শব্দ করে হেঁসে উঠে বলেন —
“- শুনে খুশি হলাম। যাক আমার সন্তানের বিয়ে খাওয়ার সৌভাগ্য আমার হবে —–.
আদ্রিয়ান আর কথা বলতে পারল না, সে ফোন কেটে দেয়। জামান সাহেব বিছানা ফোন রেখে, বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ে। ওনি চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নেয়। শার্লিন বেগম এতোখন দরজার আড়ালে, সব শুনছিলেন। মূলত ওনি জামান সাহেবকে খাবার খাওয়া জন্য ডাকতে এসেছিলেন, এতোখন তার স্বামী আর সন্তানের কথা দরজার আড়ালে লুকিয়ে শুনে৷
শার্লিন বেগম আজ তার আদ্রিয়ানের পক্ষে কথা বলে না, ওনি রুমে ঢুকে বিছানার পাশে। জামান সাহেবের মাথার কাছে বসলেন, এরপর ওনার হাত বাড়িয়ে দিয়ে জামান সাহেবের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এতো বছরের বিবাহিত জীবনে, এই মানুষটাকে এমন শান্ত হয়ে থাকতে দেখনি। শার্লিন বেগমের উপস্থিতি জামান সাহেব, অনেক আগেই টের পায়। জামান সাহেব চোখ বন্ধ রেখে বলে ____
“- আজ জীবনের প্রথমবার, নিজেকে এতো অসহায় লাগছে আমার। যানো শার্লিন খুব অপরাধ বোধ কাজ করছে আমার মধ্যে, আমার ভুলের জন্য এক এতিম মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে গেলো। আমার বন্ধুর কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে কি বলব আমি। যে ওর মেয়েকে আমার ছেলে তালাক দিয়েছে? ওর নিষ্পাপ এতিম মেয়েটা এখন ডিভোর্সি? আমার একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য, মেঘের জীবন আমি ধ্বংস করে দিয়েছি। সব দোষ আমার, মেঘ কি আমায় কখন ক্ষমা করবে?
অন্যদিকে আদ্রিয়ান ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে মারে। টেবিলের ড্রয়ার থেকে, সিগারেট বের করে জ্বালায়। ডক্টর হয়ে সিগারেট খাওয়া উচিত নয়, যদিও আদ্রিয়ান সিগারেট নিয়মিত খায় না৷ মাঝে মধ্যে যখন খুব দম বন্ধ লাগে বা, কষ্ট হয় তখন একটা বা অর্ধেকটা ধরায়। আদ্রিয়ান সিগারেট আর নরম মসৃণ ঠোঁটে চেপে ধরে, এরপর এক টান দেয়। তার শরীর ছেড়ে দিয়ে, মেঝেতে বসে পড়ে।
আদ্রিয়ান মনে মনে বলে — ” বাবা সত্যি কি সব দোষ শুধুমাএ আমার? তুমি বলেলে যে আমি যদি বড় না হয়ে, তোমার সেই ছোট আদু হয়ে থাকতাম তবে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেতো? না বাবা খুব একটা ক্ষতি হতো না? কিন্তু তুমিও যদি আমার সেই আগের, আব্বু থাকতে তবে কি তোমার ও ক্ষতি হয়ে যেতো? আদ্রিয়ান ভীষণ স্বার্থপর আর সুবিধাজনক মানুষ তোমার কাছে তাই না। কিন্তু কি স্বার্থপরতা করেছি তোমার সাথে তা একটু বলবে? শুধু মালিহাকে বিয়ে করে, বাংলাদেশে রেখে আসা ছাড়া? আমি শুধুমাএ আমার কেরিয়ারের জন্য, তোমার কথার অবাধ্য হয়ে কবুল বলার পর আমেরিকায় চলে এসেছি। তোমার সম্মান, আর বিশ্বাস রাখে পারি নি, তাই আমি খুব খারাপ সন্তান তাই না? আমার কাছে মা বাবা ভাই বোন সবার চেয়ে, আমার কেরিয়ার আর আমার সপ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাই না? সত্যি কি তাই?
“— আব্বু তোমার মনে আছে, যখন আমার বয়স আট বছর ছিল। তখন তোমার হার্ট অ্যাটাক হয়, হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তোমায়। ডক্টর বলে, তোমার হার্টের অপারেশন করতে হবে। যার জন্য দেশের সবচেয়ে বড়ো হার্ট সার্জন আসে, যখন তোমায় অপরারেশন থ্রিয়াটারে নিয়ে যাওয়া হয়। মা, সৃষ্টি চাচা, চাচি সকলে অনেক কান্না করছিল, আর আমি চুপচাপ অপরাশেন থ্রিয়াটারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভিতরে তোমার অপারেশন হচ্ছিল, বাহিরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে তোমায় দেখছিলাম আমি। যানো আব্বু ওইদিন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, তোমাকে হারানোর ভয়। যদি অপারেশন, ঠিক না হয় তবে আমার বাবা হারিয়ে যাবে। এই কথাটা বারবার মাথায় ঘুরছিল।
“- অপারেশন থ্রিয়াটারে যখন ডক্টর, অপরাশেন করছিল। তখন তোমার বুকের রক্ত, ডক্টরের হাতে লেগে ছিল। যা দেখে ডক্টরের উপর ভীষণ রাগ হয়, আমার বাবার বুক কাটার সাহস কি করে হয় ওদের। এইটা ভেবে ডক্টরকে ঘৃণা করেছি। কিন্তু যখন অপারেশন শেষ করে, তোমায় বেডে দেওয়া হয়েছিল। তুমি সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন, তখন আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম। ডক্টর এসে যখন তোমার চেকআপ করে, তুমি তখন ডক্টরের অনেক প্রশংসা করেছিলে। আমি তখন মনে করেছিলাম, ভবিষ্যতে যদি আমি বড়ো ডক্টর হয়ে তোমার চিকিৎসা করি। তবে হয়ত তুমি ও আমার প্রশংসা করবে। তাই এই হার্ট সার্জন হয়েছি —
“- ছোটবেলা যখন সব বাচ্চারা, খেলাধুলা করত, আনন্দ করত। তখন আমি বই নিয়ে ঘরে বসে থাকতাম, পড়াশোনা করতাম। জীবনে শুধু একটাই সপ্ন ছিল, বড়ো হয়ে ডক্টর হব আমার বাবার মুখে প্রশংসা শুনব। আর আমার পড়াশোনা সার্থক হয়। আমার বয়স যখন আঠারো, তখন আমার এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়। আমি অনেক ভালো রেজাল্ট করি, আমেরিকার এক মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ হয়। কিন্তু আমার খুশির মাঝে হঠাৎ আগমন হয়, তোমার বন্ধুর মেয়ে মালিহার ___.
তুমি একদিন রাতে হঠাৎ করে এসে বললে যে, আমায় বিয়ে করতে হবে তোমার বন্ধুর মেয়েকে। আমি তখন বিয়ে করতে চাইনি, তাছাড়া চৌদ্দ বছরের বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করা উচিত ছিল না। কিন্তু তুমি যখন মালিহার বাবা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা, আর তার চাচা চাচির অত্যাচারের কথা বললে। তখন ওই অনাথ মেয়ের জন্য, আমার কষ্ট হয়েছিল। আর ভবিষ্যতে যেহেতু বিয়ে কখন কখন করতে হবে, তাই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। ইচ্ছা ছিল বিয়ে করে মালিহাকে রেখে, আমেরিকায় চলে যাব। এরপর পড়াশোনা শেষ করে, বাংলাদেশে যেকোন হাসপাতালে ডক্টর হিসাবে কাজ করব। আর মালিহার সাথে সংসার করব __.
“- মালিহাকে সকালে তার চাচার বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসো তুমি। বিয়ের দিন ও আমি বই নিয়ে বসেছিলাম, যার জন্য মালিহার সাথে আমার দেখা হয়নি। যেদিন আমাদের বিয়ে হয়, ওইদিন বিকালে আমার আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল। বিষয়টা তুমি জানতে বাবা। বিয়ের আসরে কবুল বলার পর, যখন খাওয়া দাওয়া শেষ করে। মালিহা আর আমার একসাথে ছবি তুলার জন্য, আমায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তুমি আর মা দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলে, আমি তোমাদের কাছে এগিয়ে যায়।
“- তুমি আম্মুকে বলছিলে যে, আমি আর কখন আমেরিকায় পড়াশোনা করতে যেতে পারব না৷ আমাকে বাংলাদেশে থেকে, ডক্টরি পড়াশোনা করতে হবে৷ আর মালিহার সাথে সংসার করতে হবে। তখন আমার খুব রাগ হয়েছিল তোমার উপর, আমার সপ্ন আর কষ্টের কোনো দাম ছিল না তোমার কাছে আব্বু। আর মালিহার উপর তখন রাগ হয়, ওর জন্য আমার আমেরিকা যাওয়া হবে না। তাই বিয়ের দিন রাগ করে, আমেরিকায় চলে আসি। তোমার উপর অভিমান, আর রাগ করেছিলাম আব্বু। তোমাকে অসম্মান নয় —-.
আমেরিকায় চলে আসার পর, পরিবারের সকলের উপর ভীষণ অভিমান হয়েছিল আমার। সকলের নাম্বার ব্লক করে দিয়েছিলাম, শুধুমাএ তোমার নাম্বার ছাড়া আব্বু। প্রতিদিন তোমার কলের অপেক্ষা করতাম আমি, তুমি যদি সাতটা বছরের মধ্যে সাত সেকেন্ডর জন্য একবার ও মিসকল দিতে। তবে হয়ত বুঝতে, তোমার আদু তোমায় ব্লক করেনি। প্রতিটা ঈদের রাতে, সকালে ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকতাম। তুমি ফোন দিবে বলে, কিন্তু তুমি দিলে না আব্বু।
মালিহার সাথে আমি সংসার করতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু তুমি করতে দাও নি । বাসর ঘরে না কি বউকে উপহার দিতে হয়, যার জন্য আমার সকল জামানো টাকা দিয়ে এক জোড়া ইয়ারিং কিনেছিলাম, আমার বউকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তা আর দিতে পারে নি, তবে যদি ভবিষ্যতে কখন দেখা হয় তবে হয়ত মালিহাকে দিব ওই ইয়ারিং জোড়া। তখন সে হয়ত অন্য কারোর বউ থাকবে, আমার নয় —।
যদি বিয়ের পর কবুল না বলে চলে আসতাম, তবে কি মালিহার সাথে সত্যি আমার সুখের সংসার হতো। না আব্বু হতো না। আমি মালিহাকে হয়ত এতিম বলে দয়া করতাম, কিন্তু ভালোবাসতাম না। আমি আমেরিকায় পড়াশোনা করতে পারেনি বলে, সবসময় আমার মধ্যে এক রাগ, জেদ, কাজ করত। ওর মুখ দেখলে, আমার সপ্ন কথা মনে হতো। এর থেকে হয়ত মালিহার প্রতি, আমার রাগ, ঘৃণা আরো বেড়ে যেতো। মালিহা হয়ত বা একদিন আমার উপর থেকে অতিষ্ঠ হয়ে, ডিভোর্স চাইত। আজ যে ডিভোর্স নয় বছর পরে হচ্ছে, তা আরো আগেই হতো।
মালিহার থাকার কোন জায়গা ছিল না। তাই ওই বাড়িতে আশ্রয় নেয় ও। আমি যদি কয়েকবছর পর, বাংলাদেশে ফিরে যেতাম। তবে হয়ত মালিহার সাথে আমার দেখা হতো, বাধ্য হয়ে আবার ওর সাথে সংসার করতে হতো। বউ হয় ও আমার, শরীরের প্রয়োজনে হয়ত আমি ওর কাছে যেতোম। ওকে ছুঁয়ে দিতাম, কিন্তু যখন আমার কেরিয়ারের কথা মনে হতো। তখন হয়ত রাগ উঠতো, খারাপ ব্যবহার করতাম৷ দিনে বউকে মেরে, রাতে হয়ত শরীরের কাছে ছুটে যেতে হতো। এমন কাপুরুষ হতে চাই আমি।
অনাথ মেয়েটাকে আর কষ্ট দিতে চাই নি। তাকে ছুঁয়ে অপবিত্র করার ইচ্ছা ছিল না আমার। তাই হয়ত বাংলাদেশে ফিরে যায়নি। সাত বছর পর হয়ত মালিহার বয়স বাইশ বছর হয়েছিল, তখন বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করি। কিন্তু মালিহাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য। কারণ আমি চাই নি সারাজীবন মালিহা মিথ্যা এক বিয়ের সম্পর্কে বেঁচে থাকুক। যার জন্য ওর মুক্তি দিতে চেয়েছিল। বিমানবন্দরে নেমে প্রথম তোমাকে খুঁজার চেষ্টার করেছি, কিন্তু তুমি আসো নি আব্বু।
বাসায় ফিরে যখন আম্মু সৃষ্টি সকলে দেখেছি। তখন তোমায় চারপাশে খুঁজেছিলাম। কিন্তু তুমি ছিলে না। বাড়ি ফিরে যাওয়ার শর্ত ছিল, যেনো মালিহা ওই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কারণ আমি চাইনি মালিহার সাথে, আমার আর দেখা হোক। ওর মনে শুধু আমার জন্য ঘৃণা থাকুক। এরপর যখন ডিভোর্স পেপারে সাইন করছিলাম, আমার হাত পা কাঁপছিল। একবারের জন্য ইচ্ছা করছিল, আমার বাচ্চা বউকে দেখতে। ওর সাথে তখন সংসার করার ইচ্ছা করছিল। এরপর আম্মু যখন পেপারে পানি ফেলে দেয়, তখন আমি মনে মনে খুশি হয় কারণ মালিহার সাথে আমার ডিভোর্স হয়নি। আমার বউ এখন আমার আছে।
কিন্তু মালিহার জন্য কষ্ট হয়। ও আমার জন্য কতোদিন বা অপেক্ষা করবে? এরপর আমার খুব জরুরি কাজে, সাতদিনের মধ্যে আমেরিকায় চলে আসতে হয়। তবে আসার আগে, মালিহার কাবিনের টাকা থেকে প্রায় তিনগুণ বেশি টাকা আম্মুর কাছে রেখে এসেছি। যাতে ওনি মালিহার ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দেন, বউ হিসাবে ওর কোন চাওয়া পাওয়া পূরণ করেনি। তাই এই সামান্য টাকা রেখে এসেছি। আম্মু ফোন করে বলেছে যে, ওনি মালিহাকে গিফট দেওয়ার কথা বলে ওই টাকা তার ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দিয়েছে ___.
আজ যখন সৃষ্টি মালিহার বিয়ের কথা বলল, তখন আমি অনেক খুশি হয়েছিল। কারণ মালিহা সত্যি আমার থেকে খুব ভালো কাউকে ডিজার্ব করে, ওর সুখ চাই আমি।
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ১৯
আর মেঘের কথা যদি বলি, তবে মেঘ আমার জীবনে এক অনাকাঙ্ক্ষিত মেহমান। তবে খুব কয়েকদিনে আপন হয়ে উঠেছে, মেঘকে যখন দেখি হৃদয়ে তখন এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করি। মেঘের বোকা বোকা চোখ, মায়া জড়ানো কথা সবকিছু আমার ভীষণ আকৃষ্ট করে। জীবনে প্রথম কোনো মেয়ের মায়ায, আমি পড়েছি। তবে যতদিন না মালিহার বিয়ে হয়, ততদিন মেঘের থেকে আমি দূরে থাকব। আমি পরকীয়া করতে চাই না। আব্বু তুমি ভালো থেকো, আমি না হয় সবার চোখে খারাপ থাকলাম।
