তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৩
আশফিয়া হিয়া
আজ আরু ও ইয়াজের পরীক্ষার শেষ দিন। আজ শেষ পরীক্ষা হওয়াই ইয়াজ তার বন্ধুদের নিয়ে পরীক্ষার পর আশে পাশে ঘুরে বেড়াবে। আরুকে বলেছে পরীক্ষা শেষে বাড়ির গাড়িতে করে তাকে একাই চলে যেতে। পরীক্ষা শেষ হতে আরুর বান্ধবীরাও তাকে ঘিরে ধরল আজ তো পরীক্ষা শেষ কোথাও থেকে ঘুরে আসি। আরু তাতে একদমই রাজি নয়, তার যেতে একদমই ইচ্ছে করছে না, তার মনটা রুদ্ধকে দেখার জন্য ছটফট করছে। রুদ্ধ ব্যবসায়ের কাজে তিনদিন ঢাকার বাইরে গিয়েছিল। মানুষটাকে তিনদিন চোখের সামনে দেখেনি সে তাতেই মনে হচ্ছে কতগুলো বছর ধরে সে রুদ্ধর দেখা পাচ্ছে না। ভেতরটা কেমন ছটফট করছে। আজ সম্ভবত ফেরার কথা বড় মা তো তাই বলছিল। তাই সে এখানে সময় নষ্ট করতে চাইছে না, যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি যেতে চাইছে। আরু বন্ধুদের কোনো রকম ম্যানেজ করে এসেছে। স্কুলের গেট পেরিয়ে গাড়ির দিকে গেল সে। গাড়ি পর্যন্ত আসতে আসতেই সে ঘেমে গিয়েছে আজ প্রচুর গরম পড়েছে। গরমে আরু অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্ত আজ বোধ হয় তার আশ্চর্য হওয়ার দিল। গাড়ির ডোর খুলতেই তার দৃষ্টি জোড়া থমকে গেল। রুদ্ধ ব্যাক সিটে বসে জানালার সাথে হেলান দিয়ে ফোণ স্কোল করছে। আরুকে দেখে ভ্রু নাচাল। আরু তড়িঘড়ি করে গাড়িতে উঠে বসল। রুদ্ধ এবার সোজা হয়ে বসে ফোণ পকেটে রাখল। আরু অবাক হয়ে বলল,
– ” আপনি এখানে কি করছেন?”
– ” কেনো আসতে পারি না?”
– ” পারেন, মানে আপনি চট্টগ্রামে ছিলেন?”
– ” হু সেখান থেকেই এখানে এসেছি।
আরু উওেজিত হয়ে বলল,
– ” তার মানে আপনি বাড়িতেও যাননি, চট্টগ্রাম থেকে সোজা এখানে এসেছেন?”
– ” হু।”
আরু প্রচন্ড খুশিতে কি করবে ভাবতেই পারছে না। রুদ্ধ ভাই তার জন্য এতটা পথ জার্নি করেও বাড়িতে না গিয়ে সোজা এখানে এসেছে শুধুমাএ তার জন্য? আরুর মনটাও ভীষণ ছটফট করছিল রুদ্ধর দেখা পাওয়ার জন্য রুদ্ধ ভাইয়েরও নিশ্চয় তাকে দেখতে ভীষণ মন চাইছিল? হতেই পারে তা নাহলে বাড়ি না গিয়ে এখানে নিশ্চয় আসতো না। আরু খুশির চোটে রুদ্ধকে বোকা বোকা প্রশ্ন করে বসল।আরু রুদ্ধর হাত ধরে বলল,
– ” আপনি এখানে আমার জন্য এসেছেন?”
রুদ্ধ তার হাতে দিকে একপলক তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
– ” না আমার হবু বউয়ের জন্য এসেছি।”
আরু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
– ” কিহ্।”
রুদ্ধ তার মাথায় দু আঙুলের সাহায্যে টোকা দিয়ে বলল,
– ” জ্বী।”
আরু রাগে কটমট করতে করতে বলল,
– ” তাহলে এখানে এখনো বসে আছেন কেনো? আপনার হবু বউয়ের কাছে যান।”
রুদ্ধ এবার আরুর কাছাকাছি এগিয়ে এল। আরুর মুখে তার গরম নিশ্বাস পড়ছে। আরু পেছনের দিকে কিছুটা হেলে পড়ল। রুদ্ধ আরুর ঘামে লেপ্টে যাওয়া চুলগুলো কানের পেছনে গুজে দিল। আরু কপালে আলতো করে চুমু খেল। আরু চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল সাথে সাথেই। রুদ্ধ তার কানের কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
– ” আমার হবু বউয়ের কাছেই আছি।”
আরুর হৃদপিণ্ড প্রচন্ড গতিতে লাফিয়ে চলেছে। রুদ্ধর কথা তার কর্ণ অগোচর হতেই লজ্জায় তার গাল দুটো লাল হয়ে এল। একেই রোদের তাপে আরুর ফর্সা গাল জোড়া লাল হয়ে ছিল এখন রুদ্ধর করা কান্ডে ও কথায় তার লাল আরোও লাল হয়ে উঠল। রুদ্ধ আরুর থেকে সরে এলেও আরুর চোখ খোলার নাম নেই সে তার চোখ জোড়া এখনো বন্ধ করেই রেখেছে। রুদ্ধ তার অবস্থা দেখে মিটিমিটি হেসে আরুর লাল গাল জোড়ায় টোকা দিয়ে বলল,
– ” আর কত লজ্জা পাবি লিটল বার্ড। তোর লজ্জা পাওয়া শেষ হলে তাকাতে পারিস।”
আরু চোখ খুলেই উল্টো দিকে ঘুরে গেল। সে এক দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। রুদ্ধ গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। আরু শব্দ শুনে সেদিকে তাকাতেই রুদ্ধ তাকে পাশে বসতে বলল। আরুও বাধ্য মেয়ের মতো রুদ্ধর পাশে গিয়ে বসে পড়ল। আরু বসতেই রুদ্ধ আরুর দিকে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল। যেখানে অনেক গুলো চিপস, চকোলেট ও জুস আছে। আরু এটা দেখে ভীষণ খুশি হয়ে গেল। রুদ্ধ ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিল।
রুদ্ধ গাড়ি ড্রাইভ করছে। ড্রাইভারকে সে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল তাই তেমন কোনো সমস্যা হলো না। গাড়ি বাড়ির রাস্তায় যাচ্ছে না, চলছে উল্টো পথে। আরু গাড়ি ওঠার পর থেকে রুদ্ধকে একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছে,ও চিপস খাচ্ছে। কখনো বা জুসে চুমুক দিচ্ছে। রুদ্ধ মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছে ও আরুর কথায় শুধু হু – হা করে উওর দিচ্ছে।আরু রুদ্ধর মুখের সামনে চিপস ধরল রুদ্ধ বিনা বাক্যে সেটা মুখে নিল। এভাবে সে নিজেও খাচ্ছে সাথে রুদ্ধকেও খাওয়াচ্ছে। রুদ্ধ বারণ ও করছে না। কেনো জানি না আজ তার বারণ করতে ইচ্ছেও করছে না। গল্পে মজে থাকা আরু এখনো খেয়াল করেনি যে গাড়ি বাড়ির পথে নয় অন্য রাস্তায় চলছে। হঠাৎ করে আরুর বিষয়টা খেয়াল হতেই সে রুদ্ধকে বলল,
– ” এটা তো বাড়ির রাস্তা নয় আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
রুদ্ধ স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে জবাব দিল,
– ” গেলেই দেখতে পাবি।”
আরু আবারও প্রশ্ন করল, তবে রুদ্ধ কোনো জবাব দিল না। আরু চিন্তিত স্বরে বলল,
– ” বাড়ির সবাই তো চিন্তা করবে রুদ্ধ ভাই কেউ তো জানে না আমি আপনার সাথে আছি।”
– ” কেউ চিন্তা করবে না ডোন্ট ওয়ারি আমি মাকে জানিয়ে দিয়েছি, মা ম্যানেজ করে নেবে।”
আরু কৌতুহল থেকে বলল,
– ” কি বলেছেন বড় মাকে?”
রুদ্ধ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
– ” তুই মুখটা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করবি?”
আরুর মুখটা চুপসে গেল। কি এমন কথা বলেছে সে শুধু তো দুটো প্রশ্নই করেছে। আরু ওপাশে ফিরে মুখ ভেংচি দিল। ধুর এর থেকে আহি রুহা আপু এলেও ভালো হতো ওদের সাথে কত গল্প করা যেত। এরপর ভাবল না না ওরা এলে তো আর রুদ্ধর সাথে একা সময় কাটানো যেত না। কতগুলো দিন পর সে রুদ্ধর সাথে একা বেরিয়েছে। আরু এসব ভাবতে ভাবতেই জানালা দিয়ে বাইরে দেখায় মনোযোগ দিল। তবে পাঁচমিনিট যেতেই তার মুখ বন্ধ রাখা সম্ভব হলো না সে আবার এটা ওটা বলতা লাগল। রুদ্ধ হালকা শ্বাস ফেলে আরুর অনবরত নড়তে রাখা ঠোঁটটার দিকে তাকাল। এরপর হালকা হেসে ভাবল,
– ” তার একান্ত ব্যাক্তিগত তোতা পাখি। যে কথা না বললেই বরং তার ভেতরটা হাঁসফাঁস করে উঠে।
রুদ্ধ গাড়ি থামাল লোকালয় থেকে কিছুটা দূরে একটা রেস্টুরেন্টে। জায়গাটা ভীষণ সুন্দর গাড়ি থেকে নেমে আরুর মনটা আরও ফুরফুরে হয়ে উঠল। রেস্টুরেন্টটা একটা লেকের পাশে সেখান থেকে প্রচুর বাতাস আসছে। বাতাসের তালে আরুর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। রুদ্ধ আরুর হাত ধরে নিয়ে একটা চেয়েরে বসিয়ে দিল। সেও আরুর পাশাপাশি বসে পড়ল। আরুকে প্রশ্ন করল কি খাবে সে।আরু এক বাক্যে উওর করল, বিরিয়ানি খাবে সে। রুদ্ধ দুজনের জন্যই বিরিয়ানি অডার করল। সাথে কোল- ড্রিংক ও আরুর পছন্দের চকলেট অডার করল। আরু আজ ভীষণ খুশি। আরু রুদ্ধকে বলল,
– ” আপনার ফোনটা দিন তো।”
রুদ্ধ বিনাবাক্য ফোণ বের করে লক খুলে আরুর হাতে দিল। আরু সোজা সোজা ক্যামেরা অন করল। রুদ্ধর এক হাত পেচিয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রেখে কয়েকটা ছবি তুলে নিল। রুদ্ধ কিছু বলল না। আরু আরও একটা কাজ করল ছবিগুলো রুদ্ধর ফোণ থেকে তার হোয়াটসঅ্যাপ এ নিয়ে নিল। এই ছবিগুলো সে রাতে নিজের রুমে শুয়ে শুয়ে দেখবে। আজকের দিনটা তার কাছে স্বপনের মতো লাগছে। রুদ্ধর কাছ থেকে আজ সে এতটা আশা করেনি। তার আরোও একটা কথা মনে পড়ল। একবার রুদ্ধর ফোণ ধরায় রুদ্ধ তাকে খুব বকেছিল। আর আজ রুদ্ধ বিনা বাক্যে তার হাতে রুদ্ধর ফোণ দিয়ে দিল। অনুভূতির জোয়ারে আরুর চোখ জোড়া ছলছল করে উঠল। আরুর চোখে পানির আভাস পেতেই রুদ্ধর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল সে চিন্তিত স্বরে বলল,
– ” কি হয়েছে কাঁদছিস কেনো?”
– ” কাঁদছি না তো।”
রুদ্ধ আরুর চোখের পানিতে হাত ছুঁইয়ে বলল,
– ” এটা কি তাহলে?”
– ” এখানে এত বাতাস না তাই হয়তো এমনটা হয়েছে। এসব বাদ দিন তো।” সে রুদ্ধর হাত ধরিয়ে কাঁধে মাথা রেখে বসে রইল।
খাবার আসতেই আরু খাওয়া শুরু করল। তার ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছিল। সকালে পরীক্ষার টেনশনে এত খাওয়া যায় নাকি এখন পরীক্ষা শেষ সে আরামে খেতে পারবে। রুদ্ধ এখনো খাওয়াই শুরু করেনি সে আরুকে দেখতে ব্যস্ত। মেয়েটা ক্ষিদে পেয়েছিল খুব এটা সে বুঝতে পেরেই এখানে এসেছে। আরু খাওয়া থামিয়ে রুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল।
– ” আপনি খাচ্ছে না কেনো?”
– ” খুব ক্ষিদে পেয়েছিল?”
– ” হ্যাঁ প্রচুর এতদিন তো পরীক্ষার টেনশনে ঠিক করে খেতেই পারিনি তবে এখন থেকে আর নো টেনশন শুধু খাব আর ঘুমাব।
রুদ্ধ তার কথা শুনে নিশব্দে হাসল। আর কথা না বাড়িয়ে দুজনেই খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
খাবার শেষ করেই দুজন উঠে দাঁড়াল। কিছু দূর হেঁটে যেতেই আরু দাঁড়িয়ে পড়ল। রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ” কি হয়েছে?”
আরু নিজের পায়ের জুতো জোড়ার দিকে ইশারা করে বলল,
– ” জুতোর ফিতেটা খুলে গিয়েছে, গাড়িতে গিয়ে বেঁধে নিব চলুন।”
রুদ্ধ আরুকে অবাক করে দিয়ে আরুর পায়ের কাছে হাঁটু গেরে বসল। আরু অবাক হয়ে বলল,
– ” কি করছেন! আমার পায়ের কাছে বসেছেন কেনো?”
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩২
রুদ্ধ জবাব দিল না। খুব মনোযোগ সহকারে আরুর জুতোর ফিতে বেঁধে দিতে লাগল। জুতোর ফিতে বাঁধা শেষ হতেই সে উঠে দাঁড়াল। আরুর হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। অন্যদিকে আরুর দৃষ্টি রুদ্ধতেই স্থির হয়ে আছে। মানুষটার এই যত্নগুলোই তো বার বার আরুকে তার প্রেমে পিছলে পড়তে বাধ্য করে।
