Home দগ্ধ প্রেমানল দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৫+৬

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৫+৬

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৫+৬
আনায়া আফরিন

এমন করুণ স্বর তো সে আগে শুনেনি বোনের।হ্যাঁ ২৫ বছরের বয়স তুলনায় সে এখনো ২২ বছরের রমণীদের মতোই!তবে তার বোনকে সে এমন আওয়াজে কখনোই উপলব্ধি করেনি।দ্রুত সে উঠে বসলো।চোখ তার পুরোই লাল।বোঝাই যাচ্ছে সারারাত ঘুমায়নি।এটাই সত্য।সে আসলেই ঘুমায়নি।সকাল ৮ টার দিকেই তার চোখ লেগে আসছে!দিনটা রবিবার হওয়ায় আজ তার অফিসও বন্ধ।ফোনের অপরপাশ নিরব।আদিল চিন্তিত গলায় বলে উঠলো-
“এ্যানা কি হয়েছে তোর?ঠিক আছিস তো তুই বোন?”
“ভাইয়া নিয়ে যাও আমায়।সব অসহ্য লাগছে আমার!”
ব্যাস এতোটুকু বলার পর আর কোন শব্দ পাওয়া গেলো না!আদিল ফোন কানে নিয়ে বসে থাকলেও কোন উত্তর পেলো না।তাই সে দ্রুত বিছানা ছেড়ে কোনরকম হাত পা ধুয়ে রওনা দিলো মেহেরদের বাসায়।

অন্যদিকে রুদ্ভিকা ঘুমাচ্ছে।সে দেরিতেই উঠে।আলতাফ বাহিরে গিয়েছেন হাটাহাটি করতে।মিতালি বেগম নামাজ পড়ে আর ঘুমান না।নামাজ শেষ করে সে কোরআন পাঠ করে তারপর রান্নাঘরে এসে পড়েন।মেহের নামাজ পড়ে ঘুমায় তবে সে ৮ টায় উঠে পড়ে।কখনো উপন্যাস পড়ে তো কখনো মা-কে সাহায্য করে।আজ মা-কেই সাহায্য করছে।মিতালি বেগম জানেন আনায়া বেশ দেরিতে উঠে তাই সে আর ডাকতে যায়নি।মেহের একবার গিয়েছিলো তবে আনায়া তখন কাথা মুড়িয়ে শুয়ে ছিলো তাই সে এসে পড়েছে।১০ টার দিকে তাদের বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠে।মেহের যায় দরজা খুলতে।তখনি সামনে দেখতে পায় তার তার ব্যর্থ প্রেমিক সামনে।দু’জনের মুখোমুখি হয়ে দু’জন কী বলবে বুঝতে পারছে না।রান্না ঘর থেকে মিতালি বেগম বললেন-
“কে এসেছে মেহের?”
মেহের-“এসে দেখে যাও”
এটা বলে সে আবারও রান্নাঘরে চলে গেলো!মিতালি বেগম দরজার সামনে আসতেই দেখলেন আদিল দাড়িয়ে।সে বলে উঠলেন-

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“বাবা আজ হঠাৎ এতো সকালে এখানে।আয় আয় ভিতরে আয়।”
আদিল ভিতরে ঢুকলো!পরক্ষণেই সে আদিলের মুখটার দিকে তাকিয়ে বললো-
“এই কিরে তুইও রাতে ঘুমাসনি?চেহারার অবস্থা এমন বেহাল কেনো?দেখ মেহেরের ও তোর মতোই অবস্থা।চোখ মুখের অবস্থা তোদের এমন কেন?”
“আমার কালকে রাতে মাথা ব্যাথার জন্য ঘুম হয়নি আরকি ফুপ্পি!”
এটা বলে সে একবার মেহেরের দিকে তাকালো!
“আচ্ছা ফুপ্পি আনায়া কোথায়?”
“উপরে শুয়ে আছে।ডেকে দিবো নাকি।তার তো আবার বেলা করে ঘুমানোর অভ্যাস তাই ডাকিনি।”
“থাক আমিই যাচ্ছি!”
“আচ্ছা ও উঠলে ওকে সাথে নিয়ে আয়।তারপর নাস্তা করবি।”
আদিল মাথা নেড়ে চলে যায়।
মেহেরের রুমে যেখানে আনায়া ঘুমাচ্ছিলো!আনায়ার পুরো শরীর আর মাথা এখনও কাথা দিয়ে ঢাকা!আদিল নরম সুরে ডেকে উঠলো-

“এ্যানা”
আনায়া যেনো এই ডাকটার অপেক্ষাই ছিলো।নিস্তেজ হাতটা দিয়ে কাথাটা আলগোছে মুখ থেকে নামালো!চোখ পুরো লাল হয়ে আছে।কান্নার ফলে পানির দাগগুলো এখনো গালে স্পষ্ট লেগে আছে।আদিল এমন অবস্থা দেখে দ্রুত বোনের কপালে হাত দিলো!আনায়ার শরীর যেনো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
আদিল এবার দ্রুত ফুপি বলে চিল্লাতে লাগল।মিতালি বেগম দৌড়ে আসলেন।পিছন পিছন মেহেরও আসলো।আদিল বললো দ্রুত ডাক্তার ডাকতে।মিতালি বেগমও আনায়ার জ্বর দেখে বড্ড ঘাবড়ে গেলেন।তিনি দ্রুত তার স্বামীকে কল দিয়ে ডাক্তার নিয়ে আসতে বললেন।সে গেলো পানি পট্টি আনতে।আদিল চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো-

“এতো জ্বর বাধালি কিভাবে এ্যানা?কালও তো ঠিকই ছিলি”
মেহের আনায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জবাব দিলো-
“সারারাত পানিতে ভিজলে এমনি হবে।”
আদিল আনায়াকে জিজ্ঞাসা করলো-
“ভিজেসিস কেন?”
আনায়া মেহেরের দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো-
“নজর রাখছিলে বুঝি আমার উপর”
মেহের এবার আরো শান্ত গলায় জবাব দিলো-

“রাত ৩:১৩ তে যদি পাশের রুমের কোন মানুষ ওয়াশরুমে ঝর্ণা ছেড়ে ঘণ্টাখানেক গোসল করতে থাকে তবে কি সেটা টের পাওয়ার কথা নয়?তোর ভাইয়ের মতো কি তুই আমাকেও নির্বোধ ভাবিস নাকি?”
শেষ কথাটা আদিলকে খোচা মেরেই মেহের বললো এবং তা আদিলও বুঝলো!তবে সে কিছু বললো না!এসময় ডাক্তার চলে আসলেন।আনায়াকে দেখে তার জ্বর মেপে বললেন ১০২°।সে কিছু ঔষুধ লিখে দিলো এবং বললো এতে না কমলে হাসপাতাল নিয়ে যেতে।আলতাফ চৌধুরী এবার বেশ চিন্তিত হলেন।মেয়েটার মুখটা দেখে তার বড্ড মায়া হচ্ছে।সে ডাক্তারের লিখে দেওয়া ঔষধ আনতে চলে গেলেন।আদিল যেতে চেয়েছিলো তবে মিতালি বলেছে তাকে আর মেহেরকে আনায়ার পাশেই থাকতে।সে খাবার আনতে গিয়েছে কারণ খাইয়ে তাকে দ্রুত ঔষধ খাওয়াতে হবে।আনায়া জ্বরে ঘোঙাছিলো।আদিল বোনের মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর মেহের জ্বলপট্টি দিচ্ছিলো।মেহের বলেছিলো মামা-মামি কে কল দিতে কিন্তু আদিল বলেছে সে একাই সামলে নিবে।দু’জন চুপচাপ বসে বসে নিজেদের কাজে করছে।তাদের মধ্যে কোন টু শব্দটুকু পর্যন্ত নেই!
আনায়া তখন ঘোঙাতে ঘোঙাতে বলে উঠলো-

“ভাইয়া ডা-ডাক্তার সাহেব অন্য কারো হবে ভা-ভাইয়া ডাক্তার সাহেব অ-অন্য কা-কারো।এটা দেখার আগে আমার এই দেহ থেকে প্রাণ বে-বের হলো না কে-কেন ভ-ভাইয়া?”
আদিল যেনো বোনের পীড়া বুঝলো।এই ভাই নিজ হাতে বোনের কতো শত আবদার পুরণ করেছে।বোন মুখ ফুটে বলার আগেই সে সেটা বুঝে নিয়েছে।অথচ তার বোনের এমন অসীম ভালোবাসা সে বুঝবে না নাকি!
আদিল চুপ করে রইলো, কি বলবে সে।তার কাছে এই ব্যাথা কমানোর সান্ত্বনা বাণী থাকলে সে তো আগেই নিজেকে সামলে নিতো কিন্তু নেই তো!

বোনকে বাহুতে আগলে নিলো আলতো করে উঠিয়ে।আনায়াও চুপ করে সেভাবেই রইলো!কিছুক্ষণ পর মিতালি বেগম নাস্তা নিয়ে আসলেন।মেহের খাইয়ে আনায়াকে ঔষধ খাইয়ে দিলো।প্রায় ৪০ মিনিট পর আনায়ার শরীর ধীরে ধীরে ঘামতে থাকলো অর্থাৎ তার জ্বর ছেড়েছে।আদিল এতোক্ষণ তাকে বাহুতেই রেখেছিলো এবার আলতো করে শুইয়ে দিলো।তাকালো সামনে বসে থাকা রমণীর দিকে-
“তার আর তার বোনের যে কি পরিমাণ পীড়া হচ্ছে তা কি মেহের বুঝতে পারছে”
আদিল অত্যন্ত আস্তে বলার সত্বেও মেহের তা শুনলো কারণ সে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার হৃদয় আদিলের কাছেই!সে শান্ত গলায় বলে উঠলো-
“তবে কি এর দায়ভার আমার?”
আদিল-“বদলে গিয়েছো?”

মেহের-“এতো বড় আঘাত দেওয়ার পরও বদলাবো না নাকি?”
আদিল-“আমাকে ভুলে অবশেষে সামলাতে পারলে তাহলে নিজেকে?”
মেহের-“সামলাতে আর পারলাম কই নিজেকে!আজও অজস্র রাতে আমার চোখ আপনার জন্য পানি ঝড়ায়।খেতে বসলে কান্নারা দলা পাকিয়ে আসে।রাতের আকাশে চাঁদ দেখলে মনে পড়ে এই জিনিসের সাথে কীসের তুলনা করেছি।এই শহরের প্রতি গলি আমাকে স্বরণ করায় আমার পাশের মানুষটা কোথায়!কি বলবো তাদের?চায়ের দোকানের আবুল চাচা,শিকদার বাড়ির দারোয়ান চাচা,পান দোকানের ফাতেমার মা,সেই গলির মোড়ের ছোট্ট ফুল বিক্রি করা মেয়েটা সবাই জিজ্ঞাসা করে আপনি কোথায়?!আমি ভুলে যেতে চাইলেও তারা আর ভুলতে দেয় না আমাকে!তাদের এই স্মৃতিচারণ আমাকে ভাঙতেই থাকে।তাদের প্রশ্নের উত্তর আমি কখনোই দিতে পারি না।”
আদিল নিশ্চুপ রইলো।ঘুমের ভান ধরা আনায়াও চুপ করে কাথা নিয়ে শুয়ে রইলো।মনে মনে মেয়েটা ভাবলো মেহের কি জানে অলি-গলির প্রতিটা জিনিস কেবল মেহেরকেই নয় আদিলকেও স্মৃতিচারণ করায়।মেহেরের আর এটা জানা হয়নি।নিশ্চুপ ঘরে তিন ভাঙচুর আত্নাদের এমন অবস্থা দেখে দরজার আড়ালে দাড়িয়ে থাকা রুদ্ভিকার বড্ড মায়া হলো।সে এবার ভিতরে ঢুকে মেহেরকে বললো-

“চন্দ্রফুল আম্মু ডাকছে তোমাকে!”
মেহের যেনো এখান থেকে পালানোর সুযোগই খুজছিলো তাই রুদ্ভিকা এটা বলতেই সে দ্রুত উঠে চলে গেলো।যাওয়ার পানে চোখের দু’ফোটা পানিও গড়িয়ে পড়লো যা সকলেরই অগোচরে রইলো!রুদ্ভিকা বোনকে এখান থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই মিথ্যেটা বললো!সে গিয়ে আনায়ার পাশে বসলো।নরম সুরে বলে উঠলো-
“আপায়,চোখ মেলো।অভিনয়ে তুমি বড্ড কাচা।”
আনায়া চোখ মেললো।আদিল বললো

“ঘুমাসনি তুই?”
“জানি না”
“বাসায় যাবি?”
“হ্যাঁ,আজীবন তো এখন তোমাদের ঘাড়েই চরে থাকবো।রাখবে আমায়?”
“তোর বাবা-ভাই যতোদিন এই পৃথিবীতে বেচে আছে ততোদিন তুই ঘাড়ে নয় মাথায় চড়ে থাকিস।তারা চলে যাওয়ার পর তাদের রাজত্ব তোর।”
রুদ্ভিকা মুচকি হেসে বললো-
“তাহলে তার স্বামীর কাজ কী হবে?”
আনায়ার আগেই আদিল উত্তর দিলো-
“বোন যদি আমাদের ঘাড়েই থাকতে চায় তবে আমাদের কাছেই রেখে দেই।”
রুদ্ভিকা-“ইশ আজ একটা ভাই নেই বলে!”

আদিল-“আমি কি তাহলে?”
রুদ্ভিকা-“তবে রেখে দাও না আদিল ভাই!”
আদিল-“তুই থাকতে চাইলে তোকেও রেখে দেবো রুদু।”
রুদ্ভিকা-“আমাকে না,তোমার বিনাশীনি কে।”
আদিল থমকালো,আনায়া ভাইয়ের দিকে তাকালো।আদিল কিছুক্ষণ চুপ রইলো অতঃপর বলে উঠলো-
“তাকে রাখার সাধ্যি যে আমার নেই।থাকলে তো সেই কবেই রাখতাম।অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও তাকে আমি অপুর্নতা দিতে চাই না!”
আনায়া-“অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মানে?”
আদিল-“আগলিয়ে রাখতে হলে বেচে থাকা দরকার।বাচার সময় কম হলে কিভাবে তা পারবো?”
আনায়া আর রুদ্ভিকা এবার একসাথে বলে উঠলো-
“বাচার সময় কম মানে?”

~~আফরিন রেডি হচ্ছে সে আজ ভার্সিটিতে যাবে।আজ তাকে অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই সুন্দর লাগছে।সে বরাবরই একটু সাজগোজ করতে পছন্দ করে।আজও তাই করছে।ঘড়ির কাটা ১০ টার দিকে।আফরিন যাবে ১১ টায়!তাকে সর্বদা এরিদই দিয়ে আসে।আর যখন এরিক বাসায় থাকে তখন এরিক দিয়ে আসে তবে আজ সে ভোরে একটু বের হয়েছে জরুরি কাজে।এটা এরিদ জানে না তাই সে আরামে ঘুমাচ্ছে।আফরিন রেডি হয়ে যায় এরিদকে ডাকতে।আফরিনের জন্য এরিদ আর এরিক কখনোই দরজা লক করে ঘুমায় না।সবসময় চাপিয়ে রাখে কারণ আফরিন ভয় পায় কখনো।ভাইরা তাকে নিয়ে যথেষ্ট সতর্কবান!আফরিন গিয়ে দেখে এরিদ ঘুমাচ্ছে।অন্ধকার ঘরকে আলোকিত করার জন্য সে জানালার পর্দা সরালো।হঠাৎ চোখে আলো আসাত এরিদ আলতো করে চোখ খুললো।সামনে আফরিনকে দাড়ানো দেখে জিজ্ঞাসা করলো-
তুই ভার্সিটি যাচ্ছিস?
আফরিন- হ্যাঁ!উঠো তুমি জলদি।
এরিদ ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলে উঠলো-

“ভাইয়া কোথায়?আজ তার ডিউটি?”
আফরিন-“ভাইয়া ভাবির জন্য কি যেনো কিনতে গিয়েছে সেই সকালে উঠে!”
এরিদ-“তাহলে বাসায় থাক।আজ তীর যাওয়া লাগবে না”
আফরিন-“দেখছো না রেডি আমি,এখিন উঠো”
এরিদ ঘুমে চলে গিয়েছে।আফরিন এবার একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো-
“শুনলাম আমার হবু ভাবির ছোট বোন নাকি আমার ভার্সিটিতে পড়ে প্রথম বর্ষে।ভেবেছিলাম আজ গেলে তার সাথে একটু সখ্যতা গড়ে তুলতাম!”

এরিদ যেনো লাফ দিয়ে উঠলো।আফরিন অবাক হলো না সে এমনটাই আশা করেছিলো।
এরিদ-“রেডি হচ্ছি আমি।ড্রাইভার আঙ্কেল কে কল দিয়ে বল গাড়িটা দিয়ে যেতে।”
আফরিন-“রিক ভাইয়ার টা সে নিয়ে গিয়েছে তোমার টা নেও সেটা তো বাহিরেই আছে”
এরিদ-“আচ্ছা আসছি আমি”
আফরিন চলে যাচ্ছিলো।যাওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো-
“প্রেমে পা*গ*ল হয়ে যাচ্ছো ভাইয়া।কলেজে যে কার জন্য যাচ্ছো বুঝতে পেরেছি আমি।এখন আর বোন লাগে না তাই না।রিক ভাইয়া আসুক বলে দিবো সব!”
এটা বলে দৌড়।এরিদ চিল্লিয়ে বলছে-
“দিন দিন বা*দড় হয়ে যাচ্ছিস।ভাইয়ার কাছে তোর নামে নালিশ করবো।বড় ভাই যে সম্মানই দেয় না আমাকে!”

এরিদ গাড়ি চালাচ্ছে আজ একটু জলদিই।আফরিন অন্যদিন বকবক করলে আজ একটু চুপচাপ।এরিদ ব্যাপারটা লক্ষ করলো তবে কিছু বললো না কেবল মুচকি হাসলো।ভার্সিটির গেইটের সামনে এসে আফরিন নেমে গেলো।বিরক্ত হলো বড্ড কারণ পুরো জুতোই কাদায় নষ্ট হয়ে গিয়েছে।বর্ষাকাল চলছে।টানা চারদিন বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা পুরোই কাদা দিয়ে ভরা।তবে আজ যেনো এমন রোদ উঠেছে মানুষ ছাতা নিয়ে বের হচ্ছে।প্রকৃতির রুপ বদলানো মানুষের রুপ বদলানোর থেমে দ্রুতই হয় কখনো কখনো!গেইট পেরোতেই যাবে এসময় নজর এলো কাঙ্ক্ষিত এক মানুষের।আজ থেকে নয় গত ২ বছর ধরে এই মানুষটা একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে।সে জানে এই অপেক্ষা তার জন্যই করা হয়।রিক বা রিদ সাথে থাকার কারণে কখনো সাহস হয়নি এগোনোর।

এরিদ পুরুষ মানুষের চোখের ভাষা বুঝে।২ বছর ধরে তারও চোখে পড়ছে বিষয়টা তাই সে বোনকে একবারে ভিতর পর্যন্তই দিয়ে আসে।বি*রক্ত লাগে তার ব্যাপারটা। ভাইদের বৈশিষ্ট্যই এটা।আফরিনের ক্লাস যে ফোরে সে ফ্লোরে গিয়ে মেয়েটা দাড়ালো।দেখছে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে।অনার্সের ৪র্থ বর্ষে এবার ছেলেটা।দেখতে সুদর্শন পুরুষদের মতো।গায়ের রঙ শ্যামবর্ণের।উচ্চতায় ৫’১১।দেখতে বেশ সুদর্শন লাগে।আফরিনের ক্লাসের কিছু মেয়ে এনার উপর ক্রাশও খেয়ে বসে আছে।আফরিন দাঁড়িয়ে আছে একাই কারণ আজ তার বান্ধবী আসেনি।অন্যদিকে এরিদ অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে।অবশেষে কাঙ্ক্ষিত মুখখানার দেখা পেলো।কিছু কিছু মেয়ে আড়চোখে দেখছে তাকে।এমন পুরুষকে দেখে কি কারো নজর ফেরানো সম্ভব?অথচ এরিদের যেই সেই শ্যামকণ্যার উপর চোখ আটকালো তা আর সরলো না!রোদের তাপে রুদ্ভিকার মুখখানা পুরো লাল হয়ে আছে।চেহারায় যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে।পাশে তার বান্ধবী ফিহা!তারও চোখমুখ লাল হয়ে আছে।রুদ্ভিকা এখনো কাউকে দেখেনি!তবে এরিদ ঠিকই দেখেছে।তার চোখই পড়ছে না!আফরিনও দেখছে রুদ্ভিকাকে।সঙ্গ পেতেই সে দ্রুত ছুটলো রুদ্ভিকার কাছে।সামনে হঠাৎ আফরিনের আগমনে একটু হকচকিয়ে গেলো সে।আফরিন চেহারায় প্রফুল্লতা বজায় রেখেই বলে উঠলো-

“চিনেছো আমায়?”
রুদ্ভিকা চেহারা মুছতে মুছতে বললো-
“হ্যাঁ চিনবো না কেন আপু?”
আফরিন-“তুমি আর আমি একই জায়গায় ভাবতেই ভালো লাগছে আমার!আমার ভ্যাবলা বান্ধবীটা প্রতিদিন আসে না কারণ সে দিব্যি ১২ টা পর্যন্ত ঘুম দেয়।যাই হোক আমাদের বর্ষ আলাদা হলেও একই জায়গায় আমরা।আসতে-যেতে নিলে তো দেখা হবেই!”
রুদ্ভিকা একটু অপ্রস্তুত হলো কারণ আফরিন বড্ড মিশুক আর সে বড্ড ইন্ট্রোভার্ট টাইপের।অতঃপর রুদ্ভিকা উত্তর দিলো –
“হ্যাঁ আপু অবশ্যই।তুমি কি একাই আসো?”
“না না ভাইয়া আসে।যেই ভাইয়া সময় পায় সেই ভাইয়াই আসে।”
“আচ্ছা তাহলে চল আমরা ভিতরে যাই।কিছুক্ষণের মধ্যেই তো ক্লাস শুরু চল।”
“হ্যাঁ চল ক্লাস শেষ হলে তো দেখা হবেই!”

রুদ্ভিকার শরীরে বরাবরই রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম আর সে দুর্বলও বটে শারীরিক দিক দিয়ে।তাই সে এতো রোদে যখনই সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে নিলো তখনই তার মাথা ঘুরানো শুরু হলো।আফরিন তো বকবকই করছে তাই তার খেয়াল নেই কিন্তু গেইটের সামনে দাড়িয়ে থাকা পুরুষটা ব্যাপারটা ঠিকই লক্ষ্য করলো।তার এবার একটু চিন্তা হলো।রুদ্ভিকার যাওয়ার পানে সে তাকিয়েই রইলো অথচ রুদ্ভিকা জানতেই পারলো না দূর হতে একজন পুরুষ চোখে কতো তীব্রতর ভালোবাসা নিয়ে তাকে দেখছে।তবে আফরিন তার পুরুষের ভালোবাসা ঠিকই বুঝলো।দুই রমণী যাচ্ছে তাদের গন্তব্যে আর অদুরে দুই পুরুষ কি ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে তাদের দেখছে।আকাশের সোনালি রোদ্দুর সেই দুটো পুরুষের চোখের ভালোবাসার মাত্রা দেখেছে সেদিন!

সময়টা দুপুর ৩:২০।আফরিন আর রুদ্ভিকা বেড়িয়েছে।দু’জনের ছুটির সময় দেখা হলো।কথায় কথায় জানতে পারলো দু’পরিবারই আজ শপিংয়ে যাবে।কারণ বিয়ের আর বেশিদিন বাকি নেই!আফরিন বারবার করে রুদ্ভিকাকে বললো যে বিয়ের শপিং করতে তো অবশ্যই তাদের সাথে মেহেরকে নেওয়া হবে তো সেখানে তার প্রবল ইচ্ছা রুদ্ভিকা,আনায়া আর আদিলও যেনো থাকে!রুদ্ভিকা নিজের আসার নিশ্চয়তা দিতে পারলেও বাকি দু’জনের টা দিতে পারলো।সে তো বলতেই পারবে না তাদের কারণ কারই বা সাহস আছে নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারো হতে দেখার!তাই রুদ্ভিকা নিজের টা নিশ্চিত করলো বাসায় ফেরার পথে পা বাড়ালো।মাথা নিচু করেই হাটে সে সবসময়।গেইটের সামনে আসতেই ধাক্কা খেলো এক প্রশস্ত বুকের সাথে।সামনের মানুষটা তার থেজে বেশ লম্বা।সে মাথা নিচু করেই তাকে অত্যন্ত নরম ভাবে সরি বললো!পাশ থেকে ফিহা বলে উঠলো-

“দোস্ত একবার মাথা তুলে দেখ।”
রুদ্ভিকা যেনো এবার মাথা তুলে তাকালো!আফরিন মুচকি হাসতে থাকলো!রুদ্ভিকা সেদিন এরিদের দিকে তাকায়নি তাই আজ চিনতে পারছে না!আফরিন রুদ্ভিকার অবস্থা বুঝে বলে উঠলো-
“আমার ভাই এটা।এরিক ভাইয়ার ছোট ভাই আর আমার দামড়া ভাই!”
এরিদ এটা শুনে চোখ রাঙালো আফরিনকে।আফরিনও মুখ ভেঙচি দিলো!রুদ্ভিকা মাথা নিচু করে বলে উঠলো-
“দুঃখিত আমি খেয়াল করিনি!”
এমন মিহি কণ্ঠ শুনের এরিদের হৃদয় যেনো ধাক্কা খেলো। প্রিয় নারীর কণ্ঠ প্রথমবার শুনে তার সচল মস্তিষ্ক কিছুক্ষণের জন্য যেনো অচল হয়ে পড়লো!পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠলো-

“আরেহ ব্যাপার না!আপনি ঠিক আছেন তো?”
রুদ্ভিকা:”হ্যাঁ আমি ঠিক আছি!”
এরিদ-“চলুন আপনাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসি।আফরিনও আছে।যদি আপনার দ্বিমত না থাকে তাহলে আসতে পারেন!”
রুদ্ভিকা-“আমি একাই চলে যেতে পারবো আর ফিহাও আছে।ধন্যবাদ”
রুদ্ভিকা যেনো ছুটে পালাতে চাচ্ছে এখান থেকে।তাই সে কথা শেষ করেই দ্রুত চলে যেতে নিলো তখনই ফিহা বলে উঠলো-
“এই পানি খাবি না তুই?তোর না পিপাসায় মরার মতো অবস্থা এখন চল দোকানে যাই!”
রুদ্ভিকা-“না থাক এখন-…..

এরিদ সকালে রুদ্ভিকার ক্লান্তি খেয়াল করেছিলো তাই এখন সে সেটা বুঝলো।তাই সে দ্রুত পানি নিতে গেল্প।যদিও রুদ্ভিকা তাকে বা করেছে তাও প্রেয়সীর ক্লান্তি দুরীকরণে প্রেমিক কি আর কোন বাধা মানে!আফরিনকে জিজ্ঞাসা করেছে কি খাবে আফরিন ৬ টা ভিন্ন আইসক্রিমের লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছি।এরিদ এতে অভ্যস্ত।তাই সে তাদের ভার্সিটির ভিতরে দাড় করিয়ে চলে গিয়েছে!তারা দাড়িয়ে রইলো।রুদ্ভিকার বড্ড লজ্জা লাগছে।তার ইচ্ছে করছে ফিহাকে একটা কিল দিতে।বেচারি ফিহা কিছুই বুঝতে পারছে না!এরিদ চোখের আড়াল হতেই আফরিন বললো-
“রুদু তুমি দাড়াও এখনে আমি আসছি একটু।অপেক্ষা করো!”
রুদ্ভিকা মাথা নাড়ালো!আফরিন গেলো মাঠের এক কোনায় দাড়িয়ে থাকা একজন কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির কাছে।৩ জন ছেলে একসঙ্গে দাঁড়ানো!তাকে দেখতেই দু’জন মুচকি হেসে সরে গেলো সেখান থেকে।দাঁড়িয়ে রইলো একটি পুরুষ।হাতে তার একগুচ্ছ সাদা গোলাপ!আফরিন তৎক্ষণাত জিজ্ঞাসা করলো-

“ফুল কার জন্য?”
ছেলেটা মুচকি হেসে আফরিনের চোখে চোখ রেখে জবাব দিলো-“আমার ফুলের জন্য!”
আফরিন এবার ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো-
“আপনার ফুল বদলে গিয়েছে নাকি?আগে তো আরেক ফুলকে ভালোবাসতেন যতটুকু শুনতাম আরকি!”
ছেলেটা এবার মুচকি হেসে বললো-
“আমার ফুল সহ এই পৃথিবীতে থাকা আমার সকল কাছের মানুষ জানে আমার ফুল কোনদিনও বদলানোর নয়।”
আফরিন এবার মুচকি হাসলো।তার হৃদয়ে যেনো ভালোবাসার উষ্ণতা ছড়িয়ে যাচ্ছে দিন দিন।সে বললো-
“এই অবেলায় ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা কি ঠিক?”
ছেলেটা বললো-

“আমার ফুলের জন্য সব ঠিক”
আফরিন-“এভাবে পা*গ*লামি করলে লোকে খারাপ বলবে!ছেড়ে দিন আমার পিছু আরশ ভাই!”
আরশ এবার একটু প্রেমময় ভঙ্গিতে বললো-
“লোকে পাগল বলুক,
মাতাল বলুক,
আমিইইইইইই-
তোমার পিছু ছাড়বো না!”
আফরিন এবার বললো-
“আপনার ফুললে ফুল দিয়ে জলদি বাসায় যান!রোদে তো পুড়ে যাচ্ছেন!”
আরশ এবার ফুলগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দিলো!আফরিন নিলো না!বললো-
“২৪ তম গোলাপের এই তোড়া টাও রেখে দিন আপনার ব্যাগে।চললাম আমি।জলদি বাসায় ফিরুন আর পিছু ছাড়ুন!”

আরশ-“পিছু ছাড়বো না।পিছু ছাড়লে আমার প্রেয়সী কি করে আমাকে দেখবে?আমি না আসলে কার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থাকবে?আমি ফুল নিয়ে না দাঁড়িয়ে থাকলে তার তো মন খারাপ হবে।আমার ফুলকে প্রতিবার কে প্রত্যাখ্যান করবে?প্রেয়সীর জন্য হলেও আমি তার পিছু ছাড়বো না”
আফরিন-“বাসায় ফিরুন জলদি!”
আরশ-“ইচ্ছে করছে রেখে দেই এখন তোমাকে।আমাকে নিজের করে নাও না কেন।তুমি হীনা অন্যের হওয়ার সাধ্যি কি আমার আছে?”
আফরিন দেখলো রুদ্ভিকা তাকে ইশারা করছে তার ভাই আসছে।সে আরশকে দ্রুত বাসায় ফিরতে বলে চলে গেলো। আরশ তাকিয়ে রইলো সেই যাওয়ার পানে।এইভাবেই চলছে মাসের পর মাস!তাকে নিজের করবে না মেয়েটা আবার ছাড়বে ও না কখনো অন্য কারো জন্য।আরশ অবশ্য অন্য কারো হতেও চায় না কখনো!

এরিদ এসে আইসক্রিম দিলো আফরিনকে। আফরিন সেখান থেকে দুটো রুদ্ভিকা আর ফিহাকে দিলো!এরিদ নিঃশব্দে রুদ্ভিকার দিকে তাকিয়ে রইলো!রুদ্ভিকা আফরিনের দিকে তাকিয়ে আছে তাই সে খেয়াল করছে না।তারা হাটা ধরলো।রুদ্ভিকা তাদের গাড়িতে যাবে না তাই সে ফিহার সাথে হাটা ধরলো।যাওয়ার পানে আফরিনকে বলে গেলো-

“সুন্দর লাগছিলো তোমাদের!কাহিনি কি বলতে পারলে কালকে বলিও শুনবো নে!”
এটা বলে সে চলে গেলো।কথাটা রুদ্ভিকা আস্তে বললেও এরিদের নজর কেবল রুদ্ভিকাতেই আটকে থাকায় সে পিছনে থেকেও শুনে ফেললো কথাটা!চোখমুখ কালো করে বললো-
“কার সাথে সুন্দর লাগছিলো আফরিনকে?”
এরিদের প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলো তারা তিনজনই।রুদ্ভিকা বললো-
“ফিহা আর আফরিন আপুকে বন্ধু হিসেবে বেশ মানাচ্ছিলো!”
মিথ্যে বলতে অপটু হওয়ার তার কথার ধরণ দেখে এরিদের বোধগম্য হলো না।সে রুদ্ভিকাকে বিদায় দিয়ে আফরিনের সাথে গাড়িতে বসলো।গাড়িতে সে আজ কিছুটা দুরেই দাড় করিয়েছিলো!আফরিন বসতেই এরিদ বলে উঠলো-

“রুদ্ভিকা সত্যি বলেছে?”
আফরিনের পুরো মুখ ঘেমে একাকার।সে প্রসঙ্গ ঘোড়াতে বলে উঠলো-
“কেমন ভালোবাসো তাকে যে তার কথা বিশ্বাসই করতে পারো না!সে সত্যিই বলছিলো!”
এরিদের বিশ্বাস হলো না যদিও কিন্তু তার ভালোবাসার কথা বলায় সে কিছু বললো না!সারা রাস্তা সে চুপচাপই থাকলো।আফরিনের সারা রাস্তা বুক ধরফর করেছে।বাসায় আসার সাথে সাথে আফরিন দৌড়ে তার রুমে চলে গেলো।এরিদ কিছু বললো না।গম্ভীর মুখে নিজের রুমে চলে গেলো।

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৩+৪

সন্ধ্যার দিকে,
আফরিন বসে আছে তার রুমে,ফোন ঘাটছিলো সে। দেখলো তাদের তিন ভাই বোনের যেই একটা গ্রুপ আছে সেখানে তার দু ভাই তাকে ডাইনিং এরিয়াতে আসতে বলছে দ্রুত।আফরিনের বুকটা ধুক করে উঠলো!

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৭+৮