দাহশয্যা পর্ব ১১
Raiha Zubair Ripti
সোলেমান বাড়ির পথে যাওয়ার জন্য গাড়ি ঘুরাতেই একটা সাদা প্রাইভেট কার তাদের গাড়ির পাশে এসে থামলো। সোলেমান তাকিয়ে দেখলো গাড়ি থেকে তার মা বোন বের হচ্ছে। আফিয়া সুলতান দেখলেন পাশেই মেহরিনের বান্ধবী দাঁড়িয়ে আছে শাড়ির প্যাকেট নিয়ে। মেয়ে রুমাইসার হাতে কিছু ব্যাগ দিয়ে বলল-
-” ঊর্মির সাথে যা তুই। আমি আসছি।
রুমাইসা ঊর্মির কাছে গিয়ে বলল-
-” চলো ঊর্মি।
ঊর্মি হাঁটা ধরলো।
মাকে দেখে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আসলো সোলেমানের। আফিয়া সুলতান এগিয়ে আসলো সোলেমান দের দিকে।
-” তুমিই যেহেতু আসবে তাহলে আমাকে পাঠালে কেনো?
আফিয়া সুলতানের মেজাজ বিগড়ে আছে৷ ধমক দিয়ে বলল-
-” বের হ গাড়ি থেকে।
-” দেখো মা আমি কিন্তু যেতে পারবো না ও বাড়িতে। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি কোনো কাজ করা পছন্দ করি না।
-” আশ্চর্য শ্বশুর বাড়ি এসেছিস অথচ তুই বাড়ির ভেতরে ঢুকবি না এটা কি ভালো দেখায়? ভাগ্যিস বাকি জিনিস গুলো তোর সাথে পাঠাই নি৷ তা না হলে দেখতে পেতাম কি করে আমার ছেলে এরকম একটা কাজ করলো! এসব আমি মোটেও আশা করি নি। মেহরিনের পরিবার তোর অপেক্ষায় বসে ছিলো। আমি ফোন করে বলেছিলাম তুই যাচ্ছিস।
-” আমি গিয়ে কি করবো বলো তো?
-” নিজের শ্বশুর বাড়ি দেখবি না?
-” আমি কি ঘর জামাই হয়ে থাকবো যে বাড়ি ঘর আমার দেখা লাগবে?
-” এত কথা তো আমি শুনতে চাই না সোলেমান। নামতে বলেছি নাম। ইব্রাহিম গাড়ির ভেতর থেকে বাকি প্যাকেট গুলো হাতে নাও। মিষ্টির হাড়িটাও রেখে এসেছে বেয়াদব টা।
-” প্লিজ মা জোর করো না। বিয়েতে রাজি হয়েছি এটাই কি যথেষ্ট নয়? তোমরা যাও আমি এখানেই আছি।
-” না এটাই যথেষ্ট নয়। নিজের ইচ্ছার পাশাপাশি কখনও অন্যের ইচ্ছা কেও প্রাধান্য দিতে শেখ সোলেমান। উনারা অপেক্ষা করছেন তাদের মেয়ের জামাইয়ের।
সোলেমান বিরক্তির চরম পর্যায়ে গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। ইব্রাহিম কে গাড়ি থেকে প্যাকেট গুলো বের করতে বলল আফিয়া সুলতান। ইব্রাহিম বের করলো বিয়ের বাকি জিনিস গুলো। সোলেমান ইব্রাহিম হাঁটা ধরলো আফিয়া সুলতানের পেছন পেছন।
রঙচটা দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে মস্ত বড়ো উঠান। উঠানের এক পাশে কলপাড় আর উঠানের কিনারা দিয়ে বিভিন্ন ফলের গাছ। সোলেমান একবার আশেপাশে তাকিয়ে ভেতরে ঢুকলো। সানজিদা বেগম তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। বুঝতে পারলেন না মেয়ের জামাই আসলে কোনটা। করন সোলেমানের ছবি তার ননদ যখন দেখিয়েছিল তখন সানজিদা বেগম সেখানে ছিলেন না। একমাত্র মোতালেব ভুঁইয়া দেখেছিল। আফিয়া সুলতান বিষয় টা বুঝে সোলেমান কে দেখিয়ে বলল-
-” সোলেমান উনি মেহরিনের মা।
সোলেমান সালাম দিলো। সানজিদা বেগম নাম শুনে বুঝলেন এটাই মেয়ের জামাই। আজ প্রথম দেখছে মেয়ের জামাই কে। দেখে তো মনে হচ্ছে না মেহরিনের থেকে অনেক বড় হবে। মাশা-আল্লাহ চাঁদের মতন দেখতে একটা জামাই পেয়েছেন।
ধানমন্ডি ২ তে আজ গুরুতর মিটিং বসেছে আজ। সোলেমান ঢাকার বাহিরে। তারা এই সুযোগ টাই কাজে লাগাবে৷ রাত যখন মধ্যাংশ হবে তখনই তারা কাজে বেরোবে। তবে কি কাজ সেটাই বলা হচ্ছে সবাই কে। অনেক ক্ষোভ জমা আছে। তার এক পার্সেন্ট শোধ নিবে। কাজ গুলো করা হবে আগামীকাল খুব সূক্ষ্ম ভাবে। প্রথমে ক্লাব ঘরে আগুন দিবে তারপর সোলেমানের চ্যালাদের ধরে ধরে পেটাবে। অলরেডি দলের লোক দের জ্বালতন করা শুরু করে দিয়েছে।
মেহরিন তার নিজের রুমে। এখনও মেহেদি দেওয়া শেষ হয় নি। ঊর্মি বেনারসি শাড়ি টা নিয়ে রাখলো বিছানায়। রুমাইসা দেখছে মেহেদি দেওয়া। সেরিন মেহেদি দিতে দিতে বলল-
-” তুমি মেহেদি দিবে না রুমাইসা?
-” দিয়ে দিন আপু। আমি তো দিতে পারি না।
সেরিন মেহরিন কে দিয়ে শেষ করে রুমাইসা কে দিতে লাগলো। রুমাইসা মেহরিন কে জিজ্ঞেস করলো-
-” মেহরিন তুমি তো ভাইয়া কে দেখলে না। ভাইয়া এসেছে।
কথাটা শুনে মেহরিন কিছুটা শীতল হয়ে গেলো। নিঃশ্বাসটা কিছু সময়ের জন্য দ্রুত হলো। উনি এসেছেন! ঊর্মি বিছানায় বসে বলল-
-” হ্যাঁ তোর বর, তোর শ্বাশুড়ি আর এক ড্রাইভার এসেছে।
রুমাইসা ভ্রু কুঁচকালো।
-” কাকে ড্রাইভার বলছো? ওটা ইব্রাহিম ভাইয়া। আমার ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড।
-” ওহ্ আসলে চেহারা দেখি নি তো। সাদা পাঞ্জাবি ছিলো উনার শরীরেও আবার ড্রাইভিং সিটে বসে ছিলো তো। আর এমপি দের সাথে তো ড্রাইভার ই থাকে সেজন্য আর কি..
মেহরিন চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ঊর্মির দিকে।
-” এমপি মানে?
-” হ্যাঁ তোর বর তো এমপিই।
-” তুই জানলি কি করে?
-” ইমন ভাইয়ার সাথে যেদিন দেখা করতে গিয়েছিলাম না তেহরান ভাইয়ার সাথে? সেদিন তো উনি ত্রাণ বিলাচ্ছিল লোকেদের। তো সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম তেহরান ভাইকে উনি কে। তো বলেছিল উনি এমপি।
মেহরিনের ভারী রাগ হলো। তার বরকে সে দেখে নি অথচ ঊর্মি দেখে নিলো!
-” আমাকে তো জানাস নি।
-” তখন কি আর জানতাম নাকি ওটাই তোর বর। আজ সে না জানলাম শাড়ি নিতে গিয়ে। চল দেখিয়ে আনি তোর বরকে আমি।
ঊর্মি মেহরিনের হাত ধরে দরজার কাছটায় আসলো। বসার ঘরে উঁকি দিতেই দেখলো কেবল আফিয়া সুলতান ই বসে আছে সানজিদা বেগমের সাথে।
ঊর্মি আশেপাশে তাকালো। কই গেলো তারা?
-” তুই গিয়ে ভেতরে বস আমি দেখে আসি কই ভাইয়া।
ঊর্মি বাড়ি থেকে বের হয়ে উঠানেই আশেপাশে তাকাতেই দেখলো বাড়ির কাঁঠাল গাছের নিচে বসে আছে ইব্রাহিম। ঊর্মি এগোতেই দেখলো আরেক সাদা পাঞ্জাবি পড়া লোক ফোনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে। মূলত ইয়াসিন ফোন করেছে সোলেমান কে। সোলেমান ঢাকা ছেড়ে আসতে না আসতেই বলে বিরোধী দলের লোকেরা হম্বিতম্বি শুরু করে দিয়েছে এলাকায়। সোলেমান ইয়াসিন কে শুধু কালকের দিনটা সামলাতে বললো। পরশুই সে চলে আসবে। সোলেমান ফোন টা কেটে ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” আমি গাড়িতে গেলাম। মা আর রুমাইসা কে নিয়ে সাথে আয়।
-” চোখ মুখে রাগের ছাপ কেনো? সব ঠিক আছে?
-” তাড়াতাড়ি ঢাকা ফিরতে হবে। এই বিয়ের চক্করে না জানি কোনো বড় ধরণের ক্ষতি হয় আমার।
-” কি হয়েছে বলবি তো।
-” ওরা হম্বিতম্বি শুরু করেছে আমার অবর্তমানে। মাঙ্গের নাতি গো ইচ্ছে করে জ’বাই দিতে। পঙ্গু একটা দল তাদের আবার এত হম্বিতম্বি কিসের?
-” জানিসই তো খালি কলসি বাজে বেশি। তার উপর কত বছর ধরে ক্ষমতাহীন অকজ হয়ে আছে। টেনশন নিস না আমি আসছি ওদের নিয়ে, তুই যা নিজেকে শান্ত কর।
সোলেমান চলে গেল। ইব্রাহিম উঠে দাঁড়ালো। বসার ঘরের দিকে যেতে গিয়ে ঊর্মির সাথে চোখাচোখি হয়। ইব্রাহিম দৃষ্টি নামিয়ে ভেতরে চলে গেল। ঊর্মিও পেছন পেছন আসতে নিলে পেছন থেকে ডেকে উঠেন ইতি বেগম। তিনি ক্ষেতে যাবেন সবজি আনতে। ঊর্মি কে বাসায় গিয়ে থাকতে বললো। ঊর্মি ভেতরে আর না ঢুকে বাড়ি চলে আসলো। ইব্রাহিম আফিয়া বেগমের কানে ফিসফিস করে বলল-
-” খালা আর কতক্ষণ? সোলেমান গাড়িতে চলে গেছে। ভীষণ রেগে আছে।
-” রেগে আছে কেনো?
-” ঢাকায় সমস্যা হচ্ছে তার অনুপস্থিতিতে। বাড়ি যেতে বলছে তাড়াতাড়ি। সব তো দেওয়া শেষ। সন্ধ্যা তেও আসবেন নাকি?
-” হুমম।
-” উঠুন তাহলে।
আফিয়া সুলতান রুমাইসা কে ডেকে উঠলেন। রুমাইসা মেহেদী ভর্তি হাত নিয়ে বের হলো। আফিয়া সুলতান বললেন এবার তাদের বের হতে হবে। রুমাইসা হাঁটা ধরলো। মেহরিন দরজার কাছে আসতেই দেখলো এক লোক সাদা পাঞ্জাবি পড়া আফিয়া সুলতানের পেছন পেছন যাচ্ছে। মেহরিন ভাবলো এই কি তার বর? চেহারা তো দেখা হলো না। তার বিয়েটা এমন কেনো? সে এখনও তার বরটাকে দেখতেই পেলো না। দেখা কেনো দিচ্ছে না লোকটা?
বিকেলের আগ দিয়ে তানজিলা বেগম দুই ছেলে তানভীর ও তেহরান কে নিয়ে মেহরিন দের বাড়ি আসলো ঢাকা থেকে। আমগীর হোসেন আসেন নি ঘর বাড়ি একা ফেলে। মেহরিনের নানা নানি কে সেই সকালে আনতে গেছে মোতালেব ভুঁইয়া। তেহরান পুরো বাড়ি দেখলো। বাড়ির বাহিরে কোনো ঝাড়বাতি লাগানো হয় নি। স্টেজ সাজানো হয় নি। চেয়ারম্যানের বলে নিষেধ আছে এতে। তেহরান চেয়ারম্যান কে গালি দিলো। তার নিজের মেয়ের বিয়ে হলে তো সে নিজেই আগে দৌড়ে গিয়ে বক্স,লাইটিং করতো সারা বাড়ি।
মেহরিন দের বসার ঘর টাই সাজানো হলো হলুদের জন্য। মোতালেব ভুঁইয়া সন্ধ্যার আগ দিয়ে শ্বশুর শাশুড়ি কে নিয়ে বাড়ি আসলেন। তানজিলা বেগমের সাথে চোখাচোখি হয়েছিল তাদের কিন্তু রহমান সাহেব দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিল।
গাঢ় বাসন্তী কালারের শাড়ি পড়ানো হয়েছে মেহরিন কে। এই শাড়িটা সকালে আনা প্যাকেট গুলোর ভিতর ছিলো। গলুদের গয়না,সাজসজ্জার জিনিস ও আছে। সেরিন সাজালো বোন কে। তেহরান দরজায় হেলান দিয়ে মেহরিন কে দেখে বলল-
-” ছোট বোনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অথচ আমার বিয়ে হচ্ছে না। এই দুঃখ আমি কোথায় রাখবো সেরিন?
ঊর্মি ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল-
-” এই দুঃখে কচু গাছের সাথে ফাঁসি নেন ভাই।
তেহরান পাশ ফিরে তাকালো ঊর্মির দিকে। ঊর্মির পরনে কাঁচা হলুদ কালারের শাড়ি।
-” মেহরিনের কোনো ননদ টনদ নেই?
সেরিন এগিয়ে এসে বলল-
-” আছে তো রুমাইসা।
-” তো মেহরিন কে বল বিয়ের পর সেটিং করিয়ে দিতে আমার সাথে।
-” যে মেয়ে নিজে জীবনে প্রেম করে নি সে মেয়ে তোকে সেটিং করায় দিবে! হা করে ইল্লি বল। আর ভালো হয়ে যা। আত্মীয়র ভেতর আত্মীয় পাকাশ না। আমাদের আত্মীয়তা আরো বড় করে আলাদা আলাদা জায়গায় বিয়ে করে। সানজিদা বেগম আফিয়া সুলতান দের খবর নিলেন তারা কতদূর। জানালেন এসে গেছে প্রায়।
গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো বাড়ির পুঁচকে সদস্য রা। পুঁচকে বলতে তানভীর,তেহরান,সেরিন,
অনিক। একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড় হলো। গাড়ির ভেতর থেকে নেমে আসলো বাশার সুলতান,আমিরুল সুলতান রুমাইসা ইব্রাহিম। তেহরান ইব্রাহিম কে দেখে অবাক হলো। তাদের মেয়র মেহরিনের গায়ে হলুদে! এদিকে ঊর্মি দূর থেকে অবাক হলো ইব্রাহিম কে এখানে দেখে। মেহরিন আর উনার গায়ে হলুদ কি এক সাথে হবে নাকি?
ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানানো হলো। ঊর্মি তেহরানের দিকে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
-” আচ্ছা ছেলে মেয়ের গায়ে হলুদ কি একই সাথে মেয়ের বাড়িতে হয়?
তেহরান ভ্রু কুঁচকালো কথাটা শুনে।
-” কেনো বলো তো?
-” দুলাভাই আসলো যে উনাদের সাথে।
-” কোন দুলাভাই?
-” আপনাদের ঢাকার এমপি।
-” সে কেনো তোমার দুলাভাই হতে যাবে?
-” আপনাদের এমপির সাথেই তো মেহরিনের বিয়ে।
তেহরানের চোখ বড় বড় হয়ে গেল কথাটা শুনে। অবিশ্বাসের সুরে বলল-
-” কিহ!
-” হ্যাঁ। কিন্তু ছেলে মেয়ের গায়ে হলুদ একসাথে বিষয় টা কেমন লাগছে না?
-” কিন্তু আমি তো এমপি কে দেখলাম না।
-” চোখ কি পকেটে ঢুকিয়ে রাখছেন নাকি? সামনে দিয়েই তো গেলো কেবল সাদা পাঞ্জাবি পড়া।
-” সাদা পাঞ্জাবি পড়া ওটা এমপি কে বললো তোমায়?
-” সেদিন ই তো বলেছিলেন।
-” কোন দিন?
-” ঐ যে শাহবাগে সেদিন বললেন। উনার নাম নওয়াজ সোলেমান সুলতান।
তেহরান কপাল চাপড়ালো।
-” ছা’গল মেয়ে উনি এমপি হতে যাবেন কেনো? উনি তো মেয়র।
ঊর্মির সব মাথার উপর দিয়ে গেলো।
-” কিহ্ বলছেন সব তো মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আমার।
-” গা’ধা মেয়ে সেদিন যেই লোক ত্রান সামগ্রী বিলাচ্ছিলেন তিনি মেয়র ইব্রাহিম পাশা। আর যে ত্রান গুলো পাঠিয়েছে তিনি ছিলেন এমপি নওয়াজ সোলেমান সুলতান।
-” তারমানে এখন যে গেলো সে মেহরিনের স্বামী না?
-” তোমায় কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে। তারপর ও শিওর হওয়া যাক চলো।
তেহরান এগিয়ে আসলো সানজিদা বেগমের কাছে। ইব্রাহিম কে দেখিয়ে বলল-
-” খালা উনি কে?
সানজিদা বেগম ইব্রাহিম কে দেখে বলল-
-” সোলেমানের বন্ধু।
তেহরান এবার বুঝলো। তাদের এমপি সাহেবের সাথে তাদের মেহরিনের বিয়ে হচ্ছে।
সবাই চলে আসায় গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু করা হলো। মেহরিন কে নিয়ে আসলো ঊর্মি সেরিন৷ ইব্রাহিম সোফায় বসে ছিলো। বউকে আনা হচ্ছে বলে সামনে তাকাতেই দেখলো বউ আসছে। বউয়ের মুখ ঢাকা হাজার টাকার নোট দিয়ে। ইব্রাহিম মেহরিনের থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকাতেই ঊর্মি কে দেখে চোখ মুখ কুঁচকে আসলো। আশ্চর্য এই মেয়ের না বউয়ের জায়গায় থাকার কথা? সে কি ভুল মেয়েকে সোলেমানের বউ ভেবেছিল তাহলে? পাশে থাকা রুমাইসা কে জিজ্ঞেস করলো-
-” ঐ মেয়েটা কে রুমাইসা?
-” কোন মেয়ে?
-” ঐ যে কাঁচা হলুদ কালারের শাড়ি পড়া মেয়েটা।
রুমাইসা ঊর্মির দিকে তাকালো। সন্দেহান চোখে ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” কি ব্যপার ইব্রাহিম ভাই? পছন্দ টছন্দ করে বসলে নাকি?
ইব্রাহিম চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল-
-” যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটা বল।
-” উফ রাগ করছো কেনো কাউকে বলবো না। আমি সাহায্য করবো তোমায়।
-” আমি বলেছি আমি পছন্দ করি? কে ঐ মেয়ে?
-” ওর নাম ঊর্মি। মেহরিনের বেস্ট ফ্রেন্ড। পাশেই ওদের বাড়ি।
-” সোলেমানের বউ ও না?
-” কি বলছো এসব,ভাইয়ার বউ তে ঐ যে তোমার সামনেই বসা মেহরিন।
ইব্রাহিম নিজেকে শ’খানেক বকা দিলো। একে কি না সোলেমানের বউ ভেবেছিল!
সানজিদা বেগম আফিয়া সুলতান কে ডেকে নিলেন মেহরিনের গায়ে হলুদ ছোঁয়ার জন্য। আফিয়া সুলতান আর আমিরুল সুলতান এসে হলুদ ছুইয়ে দিলো। বাশার সুলতান দূর থেকে মেহরিন কে দেখলো। মেক-আপে বয়স বোঝা গেলো না মেহরিনের। মেক-আপে তো বেশ রূপবতীই লাগছে। হাল্কা গোলগোল গড়ন। শারীরিক গঠন ও পারফেক্ট। আমিরুল সুলতান বাশার সুলতান কে বলল হলুদ ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য। বাশার সুলতান এগিয়ে এসে হলুদ ছুঁয়ালেন। আড় চোখে কিছুক্ষণ মেহরিন কে পরখ করলেন। এবার রুমাইসা আর ইব্রাহিম কে যেতে বললে ইব্রাহিম মানা করলো। হলুদে তার এলার্জি আছে। রুমাইসা একাই গেলো। মেহরিন কে হলুদ লাগিয়ে শুভেচ্ছা জানালো। তেহরান দূর থেকে রুমাইসা কে দেখলল। ঊর্মি কে জিজ্ঞেস করলো-
-” ওটা কে ঊর্মি?
-” ওটা তো রুমাইসা আপু। মেহরিনের ননদ।
-” বেশ রূপবতী সুন্দরী তো। মেহরিনের স্বামীর আপন বোন নাকি?
-” হ্যাঁ।
তেহরান পুরো হলুদের সময় টা রুমাইসা কে দেখলো। রুমাইসা বিষয়টা খেয়াল করেছিল কিন্তু কিছু বলে নি লোকজন থাকায়।
সুলতান বাড়ির ছাঁদে বসে সিগারেট খাচ্ছে সোলেমান আর আনোয়ার সুলতান। দাদা নাতি অনেক গুলো দিন বাদে একসাথে ধুমপান করছে। জানে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না তারপরও খাচ্ছে। পাশের মদের বোতল গুলো পড়ে আছে। আনোয়ার সুলতান সিগারেটে টান দিয়ে বলল-
-” বিয়েটা করতে নিজ থেকে রাজি হলি কি করে সোলেমান?
সোলেমান সিগারেটের ধোঁয়া আকাশ পানে ছেড়ে দিয়ে বলল-
-” কেনো রাজি হলাম বলোতো?
-” জানি না দেখেই তে জিজ্ঞেস করলাম। তোর মা তো কতকিছু ভেবে রেখেছিল তোকে রাজি করানোর জন্য।
-” কি কি ভেবেছিল?
-” আমাকে অসুস্থ হবার অভিনয় করতে বলেছিল।
সোলেমান মুচকি হাসলো৷ তার মায়ের কাজকর্ম গুলো কেমন বাচ্চাদের মতন।
-” মায়ের কাজের জন্য হেল্প হ্যান্ড আনার জন্য রাজি হয়েছি৷ তোমায় টাইম টু টাইম ঔষধ দিবে সেজন্য রাজি হয়েছি৷ রুমাইসার সাথে গল্প করবে ঘুরবে সেজন্য রাজি হয়েছি।
-” নিজের জন্য রাজি হোস নি?
-” বোধহয় না।
-” বিয়েটা কিন্তু কোনো ছেলেখেলা নয়। একটা মেয়ে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি আসে শুধু এসব করার জন্য না। স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আসে।
-” ভালোবাসা! এটা তো কবেই আমি ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি ডাস্টবিনে ৷ ভালোবাসা দেওয়ার মতন কিছু নেই।
ইয়াসিনের বাড়িতে আজ এসেছে ইমন। এতক্ষণ ক্লাব ঘরেই ছিলো। ছেলেপেলে দের সজাগ রেখে ইয়াসিন এক প্রকার জোর করেই নিয়ে এসেছে৷ এক তালা একটা বাড়ি। দুটে রুম। ইমনের এসে থেকেই কেমন অস্থির লাগছে। হাসফাস করছে। ইয়াসিন জিজ্ঞেস করলো-
-” কি হয়েছে ভাই?
ইমন আশেপাশে তাকিয়ে বলল-
-” হুট করে কেমন জানি অস্থির লাগা শুরু করেছে ইয়াসিন। বুঝতে পারছি না হঠাৎ এমন কেনো হচ্ছে?
-” ডক্টরের কাছে যাইবেন?
-” গেলেই বলবে করোনা হয়েছে৷ করোনা না হলেও সুস্থ মানুষ কে অসুস্থ বানিয়ে দিবে।
-” ঠান্ডা পানি খাবেন?
-” দাও।
ইয়াসিন ঠান্ডা পানি দিলো। ইমন খেলো। খানিকটা সময় চুপ করে বসে রইলো। আকস্মিক এখন আবার বুকে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। ইমন বুক ডলে ইয়াসিন কে বললো তার শরীর টা ভালো লাগছে না বিশ্রাম নিবে।
ইয়াসিন রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলল ইমন কে। ইমন রুমে এসে শুয়ে পড়লো। এপাশ-ওপাশ করতে লাগলো। হুট করে এমন কেনো অস্বস্তি আর অসহায় মনে হচ্ছে? এমন তো হয় নি আগে।
দাহশয্যা পর্ব ১০
ইমন বালিশ চেপে ধরলো মুখের উপর। ঘুমানোর চেষ্টা করলো। নাহ্ ঘুম আসছে না। ইমন উঠে বসলো। বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো। আকাশে আজ চাঁদ নেই। আছে কালো মেঘ। ইমনের কেনো জানি আজ দুটো জিনিস খুব মনে পড়ছে। এক মেহরিন আর দুই গিটার।
মনে শুধু এখন একটাই আর্জি—
-❝ মিলন হবে কত দিনে..
আমার মনের মানুষের সনে…
