Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৬৬

দাহশয্যা পর্ব ৬৬

দাহশয্যা পর্ব ৬৬
Raiha Zubair Ripti

সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেহরিন পাশে সোলেমান কে পায় নি। পুরো বাড়ি খুঁজেছে পায় নি। ফোন দিয়েছে ধরে নি। চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। অ্যালিজা লুকাস অয়নকে জিজ্ঞেস করলে তারাও জানাচ্ছে তারা জানে না সোলেমান কোথায় গিয়েছে। সকালের খাবার টাও মেহরিন খেতে পারলো না। অস্থির হয়ে আছে। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী অথচ মানুষটাকে সে সকাল থেকে দেখছেই না! আশ্চর্য তার কি মনে নেই আজকের দিনের কথা? মেহরিন ভেবেছিল আজ নিজের হাতে রান্না করবে সোলেমানের সব ফেবারিট খাবার গুলো। কিন্তু লোকটা বেপাত্তা! রাগ হচ্ছে মেহরিনের। পুরো রুম জুড়ে পায়চারি করছে। ঘড়ির কাটা এখন দশটা বেজে ১২ মিনিট। এমন সময় বাড়ির দোরগোড়ায় এসে হাজির হলো একটা পার্সেল। অ্যালিজা রিসিভ করে মেহরিনের হাতে দিলো। পার্সেলের উপরে কিছু লেখা নেই। মেহরিন খুলতে শুরু করলো। প্রথমেই পেলো একটা চিরকুট। চিরকুট টা খুলতেই অতিপরিচিত হাতের লেখা দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না কার চিঠি এটা।

প্রিয় অর্ধাঙ্গিনী, আমার সাম্রাজ্যের একমাত্র রানী,আমার অন্তরাত্মা, আমার বিবিজান.. তোমাকে এই অধমের তরফ থেকে আকাশের বুকে থাকা গুনে শেষ করতে না পারা তারা গুলোর সমান ভালোবাসা। যেই ভালোবাসায় মৃত্যু ব্যতিত কোনো বিচ্ছেদ নেই, সেই ভালোবাসা আমাদের হোক। not only for today or tomorrow, I choose you for lifetime and i promise you, it is never going to change. তোমার সাথে আমার এই ১ বছরের পথ চলা টা গিয়ে ঠেকুক ১০০ বছরে।
তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে এসো। আমি অপেক্ষায় আছি তোমার।
ইতি তোমার
অপেক্ষায় অপেক্ষাকৃত পুরুষ।
মেহরিন চিঠিটা পাশে রেখে বাকি জিনিস গুলো বের করলো। একটা লং গ্রাউন অফ হোয়াইট কালারের। সাথে ম্যাচিং হিজাব,জুতা।

অ্যালিজা মেহরিন কে তৈরি করে দিলো। মেহরিন বেশ বুঝলো সুলতান সাহেব নিশ্চয়ই কিছু একটার প্ল্যান করেছে। কিন্তু কি হতে পারে সেটা বুঝতে পারছে না। মেহরিন আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো। অ্যালিজাও রেডি হয়ে নিয়েছে। মেহরিন কে নিয়ে বাহিরে আসতেই দেখলো লুকা আর অয়নও রেডি। অ্যালিজা মেহরিন কে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়িটা গিয়ে থামলো সোলেমানিয়া মসজিদের সামনে।
গাড়ি থেমে যেতেই মেহরিনের বুক ধুকপুকানি যেন বেড়ে গেল। এতক্ষণের অস্থিরতা, অভিমান, রাগ সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত আবেগ তৈরি করলো ভেতরে।
মেহরিন নামতেই দেখতে পেলো সামনে দাঁড়িয়ে আছে সোলেমান। পড়নে অফ-হোয়াইট স্যুট।
মেহরিন তাকিয়ে রইলো স্তব্ধ হয়ে।
সোলেমান এগিয়ে এলো ধীরপায়ে, চোখের কোনে গভীর প্রশান্তি। মসজিদের আঙিনায় আগে থেকেই কিছু আলেম বসে ছিলেন। তাদের সামনে মাটিতে খেজুরের ঝুড়ি রাখা, সাথে দুটো পানির কলস। কোনো বাড়তি চাকচিক্য নেই, নেই জৌলুস।
অ্যালিজা, লুকাস আর অয়ন পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে।
সোলেমান হাত বাড়িয়ে মেহরিনকে ইশারা করলো-

“ চলো, আমাদের ভালোবাসার যাত্রা আবার শুরু করা যাক আল্লাহকে সাক্ষী রেখে।”
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠলো। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো-
“ আবার বিয়ে! ”
সোলেমান মৃদু হেসে বললো-
“ জ্বি বেগম। প্রথম বিয়েটা ছিলো হয়তো রীতি মেনে, সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে দায়সারাভাবে পালিত করেছিলাম। তোমাকে তোমার প্রাপ্য টা দিতে পারি নি। এইবার আমি আজ, এই সোলেমানিয়া মসজিদে, আবার তোমাকে আমার অর্ধাঙ্গিনী করে নিতে চাই।”
সোলেমান মেহরিন কে নি আলেমের সামনে বসলো পাশাপাশি।
আলেম স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন—

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
আজকের এই বরকতময় দিনে, নওয়াজ সোলেমান সুলতাম এবং মেহরিন তাবাসসুম আপনাদের দু’জনকে আল্লাহ্‌র নামে ফের নিকাহ্‌র বন্ধনে আবদ্ধ করা হচ্ছে। নিকাহ্‌ হলো ইবাদত, নিকাহ্‌ হলো অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করার মাধ্যম। আপনারা একে অপরের জন্য পোশাকস্বরূপ, আপনারা একে অপরকে রক্ষা করবেন, সম্মান করবেন, এবং ভালোবাসবেন আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য।”
এরপর তিনি কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করলেন-
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও, আর তিনি তোমাদের মধ্যে স্থাপন করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” (সূরা রূম: ২১)
আলেম আবার বললেন—

“ নওয়াজ সোলেমান সুলতান, আপনি কি আল্লাহর নামে, সাক্ষীদের সামনে, পূর্ণ ভালোবাসা ও দায়িত্ব নিয়ে মেহরিন তাবাসসুম কে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছেন?”
সোলেমান মেহরিনের দিকে একবার তাকিয়ে বলল-
“কাবুল করছি।”
আলেম মুখ ফেরালেন মেহরিনের দিকে—
“ মেহরিন তাবাসসুম , আপনি কি আল্লাহর নামে, সাক্ষীদের সামনে, পূর্ণ ভালোবাসা ও দায়িত্ব নিয়ে সোলেমানকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করছেন?”
সোলেমান মেহরিনের হাত চেপে ধরলো। চোখে চোখে ভরসা দিলো। মেহরিনের খুব আব্বা আম্মার কথা মনে পড়ছে। তারা আজ এখানে থাকলে তার আব্বা তার পাশে বসে ঠিক এভাবেই ভরসা দিত। মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলতো-

“ বাবা আছে তো আম্মা। চোখ বুজে দম নিয়ে বলে দাও। ”
মেহরিনের চোখ বেয়ে দু ফোটা অশ্রু গড়ালো। হাতটায় ভর দিয়ে বলল-
“কাবুল করছি।”
আলেম হাত তুলে দোয়া করলেন-
“আল্লাহ্‌ আপনাদের দাম্পত্য জীবনকে হালাল ভালোবাসার সৌন্দর্যে পূর্ণ করুক। আপনাদের মধ্যে থাকুক প্রশান্তি, মমতা ও রহমত। তোমরা যেন একে অপরের চোখের শান্তি হন। এবং এই বন্ধন কেয়ামত পর্যন্ত কল্যাণের কারণ হোক।”
এরপর উপস্থিত সবাই মাথা নিচু করে আমিন বললো।
বিয়ে শেষে সোলেমান খেজুরের একটা টুকরো মেহরিনের মুখে তুলে দিলো, মেহরিনও তার হাতে খাওয়ালো। হাসি আর অশ্রু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো।
মসজিদের আঙিনায় আজ খুশির ঢেউ। মসজিদে আসা প্রতিটি মানুষ কে খেজুর দেওয়া হলো। সবাই এই দম্পত্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করলো।
বিয়ের সব আয়োজন শেষ হলে সোলেমান মসজিদে একটা মোটা অঙ্কের টাকা ডোনেশন করে। তারপর কিছুক্ষণ মসজিদে বসে থেকে বেরিয়ে আসে বউ নিয়ে।
গাড়ি চলছে তার দ্রুত গতিতে। সন্ধ্যার আলো

সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে এখন একটা রেস্টুরেন্টে যাবে। রেস্টুরেন্ট টা আজকের জন্য পুরো টা বুক করেছে। বাহিরের কোনো মানুষ আজ ঢুকতে পারবে না। রেস্টুরেন্টের সামনে আসতেই সোলেমান গাড়ি থেকে নেমে মেহরিন কে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। খুব সুন্দর করে ডেকোরেশন করা হয়েছে। টেবিলের উপর হরেক রকমের খাবার,ক্যান্ডেল, ফুলের তোড়া,পাপড়ি। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার এগিয়ে এসে তাদের অভ্যর্থনা জানালো। সোলেমান মেহরিন গিয়ে টেবিলের সামনে বসলো। হাল্কা মিউজিক বাজছে। সোলেমান পকেট থেকে একটা ডায়মন্ড রিং বের করে মেহরিনের হাতে পড়িয়ে হাতের পিঠে চুমু খেলো।
আংটি টা অসম্ভব সুন্দর। কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে বলল-
“ অসম্ভব সুন্দর এটা। ধন্যবাদ আপনাকে,আমায় এত সুন্দর সুন্দর অমায়িক অনুভূতির সাথে পরিচয় করানোর জন্য।”

সোলেমান মুচকি হাসলো। নিজ হাতে খাবার সার্ভ করলো। মেহরিন হাল্কা খেলো। খাওয়া দাওয়া শেষে তারা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশ ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করলো। লোকজন তেমন নেই এই রাস্তায়। হাঁটতে হাঁটতে মেহরিন অনুভব করলো তার জীবন টা আশ্চর্যজনক ভাবে ভীষণ সুন্দর। এত সুখ,এত আনন্দ তার মতো একটা সামান্য মেয়েও পাচ্ছে ভেবে ভীষণ অবাক হচ্ছে। সৃষ্টি কর্তা তাকে এত সুখ দিলেন! এত সুন্দর একটা জীবন দিলেন! শুকরিয়া আদায় করেও মনে হয় কম হয়ে যাচ্ছে করা। এই সুখটা তার জীবনে মৃত্যুর এক সেকেন্ড আগ অব্দি যেন একই জায়গায় স্থীর হয়ে থাকে। কোনো দুঃখ কোনো ঝড়ঝাপটা যেন না আসে তার জীবনে। তার আশেপাশের সকল মানুষ যেন ভালো থাকে তার সাথে।

মেহরিন সোলেমানের বাহুটা জড়িয়ে ধরলো। দৃষ্টি কালো আকাশের দিকে রেখে বলল-
“ জীবন টা কি সুন্দর সুলতান সাহেব! আপনি জীবনে আসায় যেন দ্বিগুণ হয়ে গেলো। ধন্যবাদ আপনাকে আমার জীবনে আসার জন্য। সারাজীবন এভাবেই থাকুন। একটুও বদলাবেন না। ”
সোলেমান হাতের উপর হাত রাখলো। রাস্তার পাশ দিয়ে ৫ জন লোক যেতে লাগলো। দুজন বয়স্ক দম্পত্তি তাদের সামনে দু’জন ইয়াং দম্পতি কোলে এক কি দেড় বছরের একটা মেয়ে বেবি। সোলেমান সেদিকে তাকিয়ে ইয়াং দম্পতি কে প্রথমে দেখিয়ে তারপর বয়স্ক দম্পত্তি কে দেখিয়ে বলল-
“ আমাদের এখান থেকে ওখান অব্দি যেতে হবে মেহরিন। শক্ত হাতে সাথে থেক তুমি । অনেক টা লম্বা পথ পাড়ি দেওয়া এখনও বাকি। আমরা কেবল সূচনায় দাঁড়িয়ে । উপসংহারে যেতে হবে এক সাথে। ”

“ ভালোবাসি আপনায় সুলতান সাহেব। ”
“ কতটুকু? ”
“ উদাহরণ চাচ্ছেন? ”
“ মেবি। ”
“ আমি আপনাকে ততটুকু ভালোবাসি,যতটুকু ভালোবাসলে এই জীবনে আর অন্য কাউকে ভালোবাসার ইচ্ছা জন্মাবে না..”
“ তাহলে তো মারাত্মক ভাবে ভালোবাসছো আমায়। ”
“ নিঃসন্দেহে। ”
সোলেমান এক হাতে মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে গুনগুন করে গাইলো-
~ তোমার এতো ভালোবাসা আমি
বলো কোথায় রাখি
বুকের খাঁচায় বন্দি থেকো
ওগো অবুঝ পাখি
তোমার প্রেমে আমি অন্ধ
ফিরে যাওয়ারর পথ বন্ধ
ইচ্ছে করে জনম ভরে করি গো আদর
তুমি আমার জান বন্ধু অন্তরের অন্তর
তুমি আমায় কইরো না গো কোন দিও পর…

পুলিশ স্টেশনে বসে আছে এজওয়ান আর মাহি। কোনো খোঁজ নাকি পাওয়া যাচ্ছে না তরিকুল চৌধুরীর। মাহির জাস্ট বিরক্ত লাগছে। এত গুলো পুলিশ থাকতেও উনি পালিয়ে গেল! পুলিশ ফোর্স এমন ফালতু কেনো? ভবিষ্যতে এরা জনগনের হাতে এমন বকা খাবে যে উঠতে বসতে শুধু বকা খেয়েই পেট ভরাবে। ফালতু প্রশাসন।
হাবিব এসে বলল-
“ চারিদিকে লোক লাগিয়েছি। আশা করছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে খুঁজে বের করবো। আপনারা সাবধানে থাকবেন। ক্ষতি করতে পারে। ”
মাহি উঠে দাঁড়ালো।
“ ২৪ ঘন্টার মধ্যে খোঁজ না পেলে তখন কি হবে? ”
“ আশা রাখছি পেয়ে যাব। ”
“ যদি না পান। আপনাদের ব্যবস্থা আমি করছি। এই ব্যাডা চলুন। ”
মাহি বেরিয়ে গেলো। এজওয়ান বুড়ে আঙুল দেখিয়ে বলল-

“ অল দ্য বেস্ট হাবিবুল্লাহ। বউ আমার আপনাদের দেখে নিবে। সামান্য অপরাধীই সামলাতে পারেন না। আর আসছেন দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে! উত্তম মাধ্যম দেওয়া উচিত আপনাদের। সরকারের টাকায় খাচ্ছেন আর পেটের চর্বি বাড়াচ্ছেন। চর্বি কমানের ব্যবস্থা করা উচিত। শ্বশুর খুঁজে না দিলে শাহবাগে গিয়ে আন্দোলন করবো আমি হু।।”
এজওয়ান কথাগুলো বলেই বেরিয়ে আসলো। গাড়ির কাছে এসে দেখলো মাহি চিন্তিত। এজওয়ান ড্রাইভিং সিটে বসে বলল-

“ আরেহ্ চিন্তা করো না। পুলিশ ব্যর্থ হলে আমি আছি তো। আমি খুঁজে বের করবো। ”
মাহি জানতে চাইলো-
“ কি করে? ”
“ সিক্রেট। তোমায় যেভাবে খুঁজে বের করছি সেভাবেই শ্বশুর কেও খুঁজে বের করবো। ”
“ পুলিশ, সিআইডি, আর্মি হেল্প করেছিল আপনায়। ”
“ অতি সামান্য। না করলেও আমি নিজের ক্ষমতা দিয়েই বের করে নিতাম। ”
“ আপনি কে বলুন তো? কিসের ক্ষমতা আছে আপনার? ”
“ টপ সিক্রেট তরিকুলের বেটি। জেনে গেলে তো সব শেষ। ”
“ লুকোচুরি কিসের? ”
“ লুকোচুরি করে খেলায় যে মজা সেই মজা আর কোথাও নেই। হাহাহাহাহ্, মুখোশ পড়ে থাকতে ভালোই লাগে তাই না বলো? চোখের সামনেই থাকে অথচ আমরা পুরো পৃথিবী ঘুরে খুঁজি তাদের। ”
মাহি ভরকে গেলো।
“ মানে? ”
“ মানে এই যে তোমার বাপই মেন কালপ্রিট অথচ সে তোমার সামনেই ছিলো তাকে না মে’রে মা’রতে গেছিলাম আমার বাপ কে! তোমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আমি কি করতাম তার জানো? ”
“ কি করতেন? ”
“ নিজ হাতে জ’বাই দিয়ে খিচুড়ি রেঁধে কু’ত্তাকে খাওয়াতাম। কিন্তু আনফরচুনেটলি তুমি হওয়ায় কিছুই করতে পারি নি। ”

“ করতেন। না করেছে কে? ”
“ মাই হার্ট স্যে- ডোন্ট হার্ট ইউর গার্ল এজওয়ান। ডোন্ট হার্ট। ”
নিবাসে আসার ৭ ঘন্টা পর থানা থেকে খবর আসলো চট্টগ্রামের এক জঙ্গলে তরিকুল চৌধুরীর মৃ’ত দেহ পাওয়া গেছে। কথাটা শুনে মাহি দুই সেকেন্ড থম মেরে ছিলো। খু’ন হয়েছে তরিকুল চৌধুরী!
এজওয়ান মাহিকে নিবাসেই থাকতে বলল। কিন্তু মাহি থাকলো না। এজওয়ানের সাথেই বের হলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।
গভীর এক জঙ্গলে অতি নিকৃষ্ট ভাবে পড়ে আছে তরিকুল চৌধুরীর মৃ’ত দেহ। খুব বাজে ভাবে শরীর টা কোপানো হয়েছে। শরীর থেকে মাংস খুলে জায়গায় জায়গায় পড়ে আছে। মাথার উপরের অংশ টা একেবরে আলাদা হয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষ এই মৃ’ত দেহ দেখলে সাথে সাথে বমি করে দিবে নিশ্চিত। মাহি একবার দেখলো উল্টি এসে গেলো কেনো জানি। খুব আফসোস হচ্ছে যে মে’রেছে তার জায়গায় মাহি থাকলে আরো জঘন্য মৃ’ত্যু উপহার দিত এই তরিকুল চৌধুরী কে। জ্যান্ত শরীরে আ’গুন ধরিয়ে দিত। তার আগে পাগলা কু’কুর দিয়ে শরীর টা খুবলে খাওয়াতো। আফসোস হচ্ছে এই কারনে মৃ’ত্যু টা অন্য কেউ দিলো বলে।
কিন্তু দিলো টা কে? শা’লার গবেট পুলিশ বলছে হয়তো ডাকাতদের কবলে পড়েছিল। কিন্তু কথা হচ্ছে ডাকাতরা কি’বা নিবে তার থেকে যে হত্য করবে এভাবে? কি ছিলো? থানায় নিশ্চয়ই তার কাছে ফোন টাকা পয়সা ছিলো না। তাহলে কিসের জন্য মারবে?
এজওয়ান ঠোঁট বাকিয়ে দেখছে মৃ’ত দেহ টা। হাবিবের দিকে তাকিয়ে বলল-

“ মৃ’ত্যু টা তেমন একটা জম্পেশ করে দেয় নি তারা। তাই না কনস্টেবল ওহৃ সরি ইন্সপেক্টর হাবিব? ”
হাবিব ভ্রু কুঁচকালো। এই জঘন্য মৃ’ত্যু টা দেখেই বলছে জম্পেশ মৃ’ত্যু দেয় নি! এর চেয়েও জঘন্য মৃ’ত্যু দেওয়া যায়?
এজওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে বলল-
“ তরিকুলের বেটি কাঁদবে না? ”
মাহি ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ কাঁদবো কোন দুঃখে? ”
“ তোমার বাবা যে আর নেই এই পৃথিবীতে। আল্লাহ! কাঁদবে না তুমি!”
“ না। আমার চোখের জল এতোটাও সস্তা না যে উনার মতন নিকৃষ্ট মানুষের মৃ’ত্যু দেখে কাঁদবো। ”
“ ইউ হ্যাপি? ”
“ ভীষণ। ”
“ তাহলে আই ও হ্যাপি। আমি ভাবছিলাম তুমি কাঁদলে আমিও তোমার দেখাদেখি একটু কান্নার অভিনয় করবো। মানে চোখে গ্লিসারিন নিতাম। সেজন্য দেখো গ্লিসারিন ও নিয়ে আসছি পকেটে করে। ”
এজওয়ান পকেট থেকে গ্লিসারিন টা বের করে দেখালো। মাহি সরু চোখে তাকালো। আল্লাহ! এই লোকটা এমন কেনো!

তরিকুল চৌধুরীর মৃ’ত দেহ টা ঢাকায় এনে পোস্টমর্টেমে পাঠানো হলো। তাকে মূলত ধারালো কুড়াল দিয়ে মা-রা হয়েছে। মা’রার আগে তাকে নেশা জাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়েছিল।
সন্দেহজনক ভাবে প্রথম সারিতে হাবিব টার্গেট করলো মাহি কেই। মাহির সাথেই তরিকুল চৌধুরীর সাপ নেউলে সম্পর্ক। হয়তো মাহিই করেছে বা করিয়েছে আর এখন অভিনয় করছে তাদের সামনে। আর দ্বিতীয় সারিতে রাখলো এজওয়ান কে।
রোজ দু বেলা করে হাবিব আসে সুলতান নিবাসে কথা বলতে। এজওয়ান রীতিমতো বিরক্ত হাবিবের উপর।
ঊর্মি কিছুটা সুস্থ হতেই মহাদবপুর রেখে এসেছে ইমন। শোনা যাচ্ছে সেপ্টেম্বরের দিকেই বোধহয় স্কুল কলেজ সব খুলে দেওয়া হবে আস্তেধীরে। ইতি বেগম চেয়ারম্যান বাড়ি গিয়েছে ধারের টাকা দিতে। এখনও তারা এক লাখ টাকার মতো দেনা। ইমন দশ হাজার দিয়ে গেছে সেটাই দিতেই গেছে।
চেয়ারম্যান টাকা টা নিলো। ইতি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল-

“ মাত্র ১০ হাজার দিলে! বাকি টাকা কবে দিবে ইমনের মা? দু বছর ধরে টানতেছো। ”
ইতি বেগম বলল-
“ ভাই আস্তেধীরে শোধ করে দিব। বুঝেনই তো ছেলেটা যা টাকা পায় সেটা দিয়ে ওর নিজের চলাফেরা সংসারের খরচ করে যা বাকি থাকে সেটাই আপনার হাতে তুলে দেই। আর কয়টা মাস সময় দেন। ”
“ তোমারে একটা কথা বলবো বলবো বলে আর বলা হচ্ছে না। ”
“ জ্বি ভাই বলেন কি কথা? ”
“ ঊর্মি রে আমাদের সোহানের জন্য নিতে চাই। তুমি যদি রাজি থাকো তাহলে প্রস্তাব নিয়ে যাইতাম। একটা আত্মীয়র সম্পর্ক হয়ে গেলে তখন আর এই লেনদেন সব চুকে যেত। সোহানের বেশ পছন্দ ঊর্মি কে। ”
ইতি বেগম দোটানায় পড়ে গেল। নিঃসন্দেহে সোহান একটা ভালো ছেলে। তবে এত বড় বাড়ির সাথে সম্বন্ধ করবে! না বিষয় টা ভালে দেখায় না।

“ ইমনের সাথে কথা বলে নেই ভাই। দেখি ইমন কি বলে। ”
“ আচ্ছা ইমন কি বলে জানাইও আমায়। ”
ইতি বেগম বাড়ি ফিরে ইমন কে ফোন করে সব বলল। ইমন সাথে সাথে না করে দিল। টাকার পার্ট চুকানোর জন্য এই সম্বন্ধ শুনেই মেজাজ গরম হয়ে গেছে ইমনের। সে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চেয়ারম্যানের টাকাটা শোধ করে দেওয়ার চেষ্টা করবে। ইমনের আত্মমর্যাদা টা একটু বেশিই। এই সম্বন্ধে রাজি হলে ভবিষ্যতে তার বোন কে যে খোঁটা শুনতে হবে না এই টাকা নিয়ে তার কি গ্যারান্টি? আর তাছাড়া বোন টা এইচএসসি আগে পাশ করুক।
ঊর্মি জানে না চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে তার বিয়ের জন্য প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ইতি বেগম জানায় নি। জানানোর প্রয়োজন মনে হয় নি। যাকে জানানোর প্রয়োজন মনে হয়েছে তাকেই জানিয়েছে।
পরের দিন চেয়ারম্যান কে বলল ইমন এখনই বিয়ে দিবে না বোনের। এইচএসসি টা শেষ হলে ভাববে। চেয়ারম্যান সাহেব কিছুটা রেগে গিয়েছিল। এত বড় বাড়ি থেকে প্রস্তাব পাঠালো নিজ থেকে আর এরা না করে দিলো! শুধু মাত্র ছেলের পছন্দ বলেই বলেছি। তা না হলে এমন বাড়িতে কে বিয়ে দেয় ছেলের! যাদের নুন আনতে পান্তা ফুড়ায়! শুধু বলল-
“ টাকাটা তাড়াতাড়ি শোধ করার চেষ্টা করো। ”

অন্ধকার এক ঘর,ঘরের ভেতর বাহিরে আলো প্রবেশ করে না বললেই চলে। কাঠের এক চৌকিতে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে এক রমণী । শিকলে হাত পা বাঁধা। পাশেই খাবারের থালায় খাবার পঁচে আছে। জানা গেলো দুটো দিন ধরে কিছুই খাচ্ছে না।
খবর পেয়েই রুমের ভেতর প্রবেশ করলো কেউ। নাম ধরে ডাকলো রমণীর। রমণী সাথে সাথে পেছন ফিরলো। চিনতে বোধহয় পারলো না তার সামনে থাকা মানুষটিকে। মুখ স্পষ্ট নয়।
“ খাবার খাচ্ছিস না কেনো? ”
কথাটা রমণীর কানে আসতেই রমণী বলে উঠলো-
“ আমি থাকবো না এখানে। ওরা আমায় মা’রে। খুব মারে। দেখো গাল দিয়ে র’ক্ত বের হচ্ছে। ”
রমণীর গালের এক সাইডে দেখা গেলো র’ক্ত। চ’ড় টা যে রমণীর সামনে থাকা মানুষটাই মে’রেছে। যদি বুঝতো তাহলে বোধহয় বাচ্চাদের মতন করে এভাবে অভিযোগ জানাতো না।

“ কথা না শুনলে তো মারবেই। ”
“ আমাকে নিয়ে যাও না। ওরা পঁচা। আমার সাথে বাজে কাজ করে। আমি আমার ছেলের কাছে যাব। ও কোথায়? ও আমায় খুঁজে না? আমার ছেলেটা কাঁদছে আমায় না পেয়ে। আমি ওর কান্নার আওয়াজ পাচ্ছি। তোমরা পাচ্ছ? ঐ তো মা মা বলে কাঁদছে। ”
“ নাম কি তোর ছেলের? ”
রমণী ভাবুক হয়ে গেল। মনে পড়ছে না কি নাম তার ছেলের?
“ কি নাম আমার ছেলের? তোমরা জানো? চিনো আমার ছেলেকে? চিনলে ওকে বলো আমাকে এখানে আঁটকে রেখেছো তোমরা। আমার ছেলে এসে আমাকে নিয়ে যাবে। ”

দাহশয্যা পর্ব ৬৫

“ আসবে না তোর ছেলে। ”
কথাটা শেষ করেই এগিয়ে আসলো। হাতে থাকা ইনজেকশন টা পিঠে পুশ করে দিলো। ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে গেলো। মিনিট দুয়েকের মধ্যে রমণী সেন্সলেস হয়ে ঢুলে পড়ে গেল বিছানায়।

দাহশয্যা পর্ব ৬৭