দাহশয্যা পর্ব ৭৭
Raiha Zubair Ripti
রাত বাজে আড়াই টা। বসার ঘরে একটা মানুষের জন্য জেগে আছে নিবাসের দুজন মানুষ। বাশার সুলতান পায়চারি করছে। কুকুর কামড়ে টামড়ে দেয় নি তো ছেলে কে? কোথায় আছে সেটাও তো বললো না। মাহি বসে বসে হাই তুলছে। দু একটা কামড় দিয়ে মাংস তুলে নিক বজ্জাতের। ২:৪৫ এ সদর দরজায় কলিং বেল বাজানো হয়। মাহি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এজওয়ান আসলো নাকি সোলেমান সুলতান আসলো?
কি একটা ভাবতে ভাবতে মাহি দরজা খুলে সামনে তাকাতেই চমকে উঠলো। কাদা দিয়ে শরীর জড়ানো এজওয়ান। মাহি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কুকুর কামড় দেয় নি? ”
এজওয়ান পাশ কাটিয়ে ভেতরে আসলো। শরীর থেকে কি বিশ্রী গন্ধ আসছে বাপ্রে! বাশার সুলতানের পেট মোচড় দিয়ে উঠলো। বলল-
“ যা যা তাড়াতাড়ি গোসল করে আয়। কুত্তার দৌড়ানি খেয়ে কি পাগাড়ে পড়ে গেছিলি নাকি? ”
এজওয়ান যেতে যেতে বলল-
“ বাহাদুর লা’ত্থি দিয়ে ফেলে দিছে আমায়। ”
কথাটা শুনে মাহি পেট ফেটে যাওয়ার মতো হেঁসে উঠলো। এজওয়ান তাকাতেই হাসি দমিয়ে বলল-
“ সরি কন্ট্রোল করতে পারছি না। ”
এজওয়ান অবাক হয়ে এগিয়ে আসলো। চমকানো কন্ঠে বলল-
“ এই তুমি হাসতেছো! সিরিয়াসলি! হ্যাঁ হ্যাঁ হাসবেই তো। স্বামীর বাজে, খারাপ অবস্থা দেখে তো তুমি হাসবেই। ”
“ কাঁদবো তাহলে? ”
“ সেই ভাগ্য কি আছে আমার? আমার জন্য কাঁদলে তো তুমি মাহি হেরে গেলে। ”
“ কোনো কম্পিটিশনে নেমেছি আমরা? ”
“ মেবি। ”
“ নাম কি? ”
“ Kill or be killed. ”
“ কে কাকে মারবে? ”
“ আমি তোমাকে। আর নইলে তুমি আমাকে। ”
“ মশা মে’রে কেউ হাত নষ্ট করে? ”
“ আমাকে মশার সাথে তুলনা করলে! তুমি তাহলে হাতি? তুমি কাদায় পড়লে আমি লা’ত্থি মারবো। ”
“ যান ডলে ডলে গোসল করুন। ছি কি বাজে দুর্গন্ধ। গোসল শেষে বডি স্প্রে মারবেন শরীরে।
এজওয়ান নিজের শরীর থেকে কাদা নিয়ে মাহির শরীরেও মাখিয়ে দিলো। মাহি রেগে বলল-
“ দেখলেন আঙ্কেল আপনার ছেলে এটা কি করলো? আমি কি এমনি রাগী আপনার গুনধর পুত্রের উপর? ”
বাশার সুলতান ও রাগ করলো এজওয়ানের উপর। এজওয়ান রুমে চলে গেল গোসল করতে। মাহিরও করতে হবে গোসল। বেয়াদব লোক ইচ্ছে করে মাখিয়ে দিলো কাদা।
এজওয়ান মাহিকে পেছন পেছন আসতে দেখে বলল-
“ গোসল করবে? চলো একসাথে করি। ”
“ কোনো দরকার নেই। আপনি করে আসুন। ”
এজওয়ান ঢুকলো গোসলে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গোসল করে তারপর সাদা টাওয়াল পেঁচিয়ে বের হলো। মাহি তার পড়নের টাওয়ালের দিকে তাকালো। ফ্লোর অব্দি গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মাহি আলমারি থেকে সেলোয়ার-কামিজ বের করতে লাগলো। তার পাশেই এজওয়ান ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মাহির কথা মতো বডি স্রে লাগাচ্ছে। মাহি আলমারির সামনে থেকে সরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো। এজওয়ান ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে সরে আলমারির কাছে যেতেই আকস্মিক টাওয়ালে টান লাগায় নিজের দিকে তাকালো। এ কি পড়নের টাওয়াল টা তো খুলে যাচ্ছে। মাহি নিজের পা তে টান লাগায় পেছন ফিরে তাকাতেই চোখ চড়কগাছে উঠে গেলো। সাথে সাথে হাত দিয়ে চোখ মুখ ঢেকে চিৎকার দিয়ে উঠলো। এজওয়ান তাড়াতাড়ি করে টাওয়াল টা জড়িয়ে নিলো। কাম সারছে রে। শালি তার মানসম্মান সব দেখে নিচ্ছিলো এখনই! এজন্যই লোকে বলে এজওয়ান আন্ডারওয়্যার পড়। আজ যদি পড়তো তাহলে কি এভাবে মান ইজ্জত হারাতে হতো? কি লজ্জা কি লজ্জা! এজওয়ান আলমারির ভিতর মুখ লুকিয়ে বলল-
“ বে’য়াদব মাহি। আমার সব দেখে ফেলছো তুমি?
যদিও মাহি চোখ পড়ার সাথে সাথে চোখ সরিয়ে ফেলছিল,দেখে নি। বাট এজওয়ান কে মিথ্যা বলল-
“ হ্যাঁ দেখে ফেলছি সব। কেঁচোর মতো দেখতে। ”
এজওয়ান মাহির দিকে একবার তাকালো। ফের আবার আলমারির ভিতর মুখ ঢুকিয়ে বলল-
“ নির্লজ্জ মেয়ে। দেখলে কেনো? আবার বলছো কেঁচোর মতো। অসভ্য মেয়ে। আমি লজ্জা পাচ্ছি।”
মাহি ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল-
“ সেম টু ইউ।”
এজওয়ান আলমারি থেকে টাউজার বের করে সেটা পড়ে নিলো।
বেহায়া নির্লজ্জ ছেলে লজ্জা কেনো পাচ্ছে? কি আশ্চর্য দেখলে বউ ই তো দেখছে।
বাতাসির বেশ ভালোই লাগছে ইয়াসমিন বেগমের সাথে থাকতে। কি আদর করে রাখে বাতাসি কে। দুজনে এক সাথে খাবার খায়,রান্নার কাজে হাতে হাতে এগিয়ে দেয় এটা ওটা। রাত হলে ইয়াসমিন বেগমের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে চাঁদ দেখে বাতাসি। ইয়াসমিন বেগম তখন মাথায় হাত বুলিয়ে এটা ওটা গল্প করে।
তেমনই আজ বাতাসি গল্পের এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলো-
“ আম্মা আপনার আর আব্বার বিয়ে কিভাবে হইছিলো? লাভ ম্যারেজ? নাকি পারিবারিক? ”
ইয়াসমিন বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো ঐ লোকটাকে বিয়ে করা। যদি সে বিয়ে না করতো, তাহলে হয়তো আজ তার জীবনটা অন্যরকম হতো।
একটা ছোট সংসার, স্বামী-সন্তান নিয়ে নিঃশব্দ সুখের পৃথিবী। কিন্তু না সেই ভুলের ফল আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে।
বাংলার বৈশাখ মাস। খেতের ধান কাটা চলছে।
গ্রীষ্মের রোদে মাঠের দিকে তাকালে দেখা যায়, সোনালি ধানের ছায়া যেন আকাশের আলোয় ঝলমল করে। আলি বাড়ির সামনে খড়ের পালা গাঁথা, একপাশে মাটি খুঁড়ে বানানো চুলায় ধান সিদ্ধ হচ্ছে। ইয়াসমিনের বাবা ইয়াকুব আলি গ্রামের মোড়ল, জমিজমার অভাব নেই, কিন্তু তার জীবনের একটা শূন্যতা ছিল। তার কোনো ছেলে নেই। স্ত্রী মারা গেছেন ছোট মেয়েকে জন্ম দিতে গিয়ে। তারপর থেকেই দু মেয়ে কে নিয়ে তিনি তার এই ভিটায় থাকেন। অবশ্য তখন যৌথ পরিবার ছিলেন। ইয়াকুব আলির ছোট ভাই ও তার বউ বাচ্চা রাও থাকতেন। কিন্তু বছর কয়েক যাওয়ার পরই তারা আলাদা হয়ে স্ত্রীর বাড়ি রংপুরের দিকে জায়গা কিনে বাড়ি করে চলে যান।
ইয়াসমিন বেগমের বয়স তখন সবে আঠারো। গ্রামের মেয়েদের তখনকার দিনে ১২ কি ১৩ বছর বয়সের দিকে বিয়ে দেওয়া হতো। সেই তুলনায় ইয়াসমিনের বয়স তখন বেশিই ছিলো। মেয়ে বিয়ে দিচ্ছেন না বলে ইয়াকুব আলি কে প্রায় কথা শুনতে হতো। বেশ বড় বড় ভালো ঘর থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসতো। কিন্তু ইয়াকুব আলি প্রতিবার মানা করে দিতেন। তিনি চেয়েছিলেন কোনো মা বাবাহীন ছেলের সাথে বড় মেয়ের বিয়ে দিতে। কারন ইয়াকুব আলির ছেলে নেই। তার এত বিশাল সম্পত্তি তার মেয়েরাই পাবে। ইয়াকুব আলি মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজছিলেন, কিন্তু মনের মতো পাচ্ছিলেন না।
তিনি চাইতেন, এমন একজন মানুষ যে একা, যার পেছনে শ্বশুরবাড়ির জটিলতা নেই।
যেন মেয়েটা এই ভিটাতেই থাকে, চোখের সামনে থাকে।কিন্তু তেমন পাত্র পাওয়া সহজ নয়।
একদিন খবর এলো। ঢাকা থেকে এক নতুন শিক্ষক এসেছেন, ইংরেজি পড়াবেন।
নাম রফিকুল ইসলাম। চশমা পরা, পরিপাটি পোশাক, গলায় নরম গলা।গ্রামের মানুষের চোখে সে একেবারে শহুরে ভদ্রলোক।
ইয়াসমিন প্রথমে তাকে দেখেছিল স্কুলের উঠোনে, সকালে অ্যাসেম্বলির সময়। তারপর দেখলো তাদের বাড়িতে। শহর থেকে এসেছে স্কুলে পড়াতে কিন্তু থাকার জায়গা নেই। ইয়াকুব আলি তাকে নিজের বাড়িতে আনলেন। দক্ষিণ দিকের টিনের ঘরে থাকার ব্যবস্থা করলেন। থাকার ব্যবস্থা তো হলো। কিন্তু খাবে কি? ইয়াকুব আলির সেটারও ব্যবস্থা করে দিলেন। খাবার টা তারাই দিতে লাগলেন। একপ্রকার অতিথির মতো আপ্যায়ন শুরু হলো। সেই দিক দিয়ে ইয়াসমিন বেগমের টুকটাক কথাবার্তা হতো রফিকুলের সাথে খাবার খেতে ঢাকার সময়। রফিকুল অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যেন অতিথি থেকে ইয়াসমিন দের খুব কাছের একজন হয়ে যায়। তাদের বিপদে আপদে এগিয়ে আসে। সাহায্য করে।
ইয়াকুব আলি কি মনে করে যেন তখন ভাবলেন- “ছেলেটা ভালোই তো, একা থাকে, বাবা-মা নেই… ইয়াসমিনের জন্য মন্দ হবে না।”
গ্রামের মাতব্বরদের থেকে এ বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তারাও সায় দিলো। বললো- শহরের ছেলে, চাকরি করে, বাবা মা নাই,পিছুটান নাই। বিয়ে দিলে ছেলে এ বাড়িতেই থাকবে এমন পাত্র আর মিলবে না।
এরপর একদিন এই বিয়ের বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন ইয়াকুব আলি রফিকুলের সাথে। রফিকুল সব শুনে জানালো- তার ইয়াসমিন কে বিয়ে করতে কোনো আপত্তি নেই। তাছাড়া তার বাবা-মা কেউ নেই, একাই থাকে, এখন আপনজন বলতে এই আলি পরিবারই, এই গ্রামের শান্ত পরিবেশেই তাদের সাথে থাকতে চায় সে।
বিয়েটা হলো বেশ ধুমধাম করে। ইয়াসমিন বিয়ের কিছু দিন পর আবিষ্কার করলো এক অচেনা রফিকুল কে। বিয়ের কয়েক মাস পর রফিকুল বারবার ঢাকায় যেতে শুরু করলো। কখনো অফিসের অজুহাত, কখনো নাকি মামাতো ভাইয়ের অসুখ। কিন্তু বিয়তে তো তাদের কাউকে ইয়াসমিন দেখলো না? রফিকুল এক সপ্তাহ দেড় সপ্তাহ করে থেকে আসতো। আর ফিরে আসার পর প্রায়ই ক্লান্ত, বিরক্ত,রেগে থাকতো।
ইয়াসমিন বেগম তখন অন্তঃসত্ত্বা। সে বুঝতে পারছিলো কিছু একটা ঠিক নেই, কিন্তু মুখে কিছু বলতো না।
ইয়াসমিন বেগম ভেবেছিল, বাচ্চা জন্মের পর হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ঠিক হয়নি কিছুই। ছেলে হবার দেড় বছর পর পরই হঠাৎ একদিন এক মহিলা এসে হাজির হলো আলিবাড়িতে। কোলে দুধের বাচ্চা নিয়ে বলল,
“আমি রফিকুল ইসলামের বউ। আর এই আমার ছেলে। আমি শুনেছি ও এখানে আবার বিয়ে করেছে?”
আলিবাড়ির উঠোনে যেন বজ্রপাত হলো।
ইয়াসমিন স্তব্ধ। ইয়াকুব আলি মাটিতে বসে পড়লেন। রফিকুল বললো তার মা বাবা কেউ নেই। অথচ আজ জানা গেলো তারা বেঁচে আছে। তার বউ বাচ্চা আছে। যে মানুষটাকে বিশ্বাস করা হয়েছিলো, সে তো আসলে একটা প্রতারক।
ঢাকায় বউ সন্তান রেখে গ্রামে এসে নতুন জীবনের নাটক খেলেছিলো সে।
ইয়াসিনের বয়স যখন দুই বছর তখন ইয়াসমিন বেগম আর রফিকুলের ডিভোর্স হয়ে যায়। ইয়াসমিন কে ডিভোর্স না দিলে প্রথম বউ মামলা করে দিবে। রফিকুল সেই ভয়েই ডিভোর্স টা দিয়ে দেয়। তার কয়েক বছর পর ইয়াকুব আলিও মা-রা যান। ছোট বোন কে ইয়াসমিন বেগম নিজে বিয়ে দিলেন। বোনের সম্পত্তি বোন কে দিয়ে দিলেন। আর নিজের নামে যা ছিলো সেগুলো দিয়ে জমিজমা চাষবাস করে চালালেও একসময় মনে হলো কিছু জমি বিক্রি করে দেওয়া উচিত। নগদ টাকার দরকার। ছেলে বড় হচ্ছে তার পড়াশোনা বড় হওয়ার জন্য। অর্ধেক জমি বিক্রি করে ছেলের নামে একাউন্ট খুলে সেখানে টাকা জমালেন। ইয়াসিন এখনও সেই একাউন্টের সম্পর্কে জানে না। ছেলে তার এইচএসসি দিয়ে আর পড়াশোনা করলো না।
“ কি হলো আম্মা? ”
ইয়াসমিন বেগমের ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো।
“ পারিবারিক ভাবে হয়েছিল বিয়ে। ”
“ অনেক ভালোবাসতো নিশ্চয়ই আপনাকে? ”
“ না আমাকে কখনও ভালোবাসে নি সে। তার সাথে আমার সংসার করার বয়স ছিলো মাত্র তিন বছর। তারপর আমরা আলাদা হয়ে যাই। ”
বাতাসি উঠে বসলো। আলাদা হলো কি জন্য? বাতাসি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো। ইয়াসমিন বেগম তার সাথে ঘটে যাওয়া কথা গুলো সব খুলে বলল। সব শুনে হতবিহ্বল হলো বাতাসি। ইয়াসিন জানেও না তার বাবার নাম কি! দেখতে কেমন!
বাতাসির কি যে মায়া হলো ইয়াসিনের জন্য। ইয়াসমিন বেগম পাশ থেকে ইনহেলার টা নিলেন। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। মুখে নিয়ে শ্বাসকষ্ট টা কমিয়ে বালিশের নিচে রাখলো। বাতাসি জিজ্ঞেস করলো-
“ আপনার শ্বাসকষ্ট আছে? ”
“ হ্যাঁ এটা শেষ হওয়ার দিকে। নতুন একটা কিনে আনতে হবে বাজার থেকে। তুমি শুয়ে পড়ো। আমি দরজা তালা লাগিয়ে আসতেছি।
ইমন ঢাকায় থাকাকালীন ই জুনায়েদ এর সাথে কথা বলেছে। ইমনের কোনো আপত্তি নেই বিয়ে নিয়ে। সে নিজেই এখন চাইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে টা যেন হয়ে যায়। বিয়ে নিয়ে সামনা-সামনি কথা বলার জন্য নওগাঁ এসেছে ইমন। আজ বিকেলে জুনায়েদ রা আসবে।
মেহরিন ও শুনেছে ঊর্মির বিয়ের খবর টা। সানজিদা বেগম দুপুরে কথা বলার সময় ফোনে বলেছে। মেহরিন তেমন মাথা ঘামালো না। ভালো ছেলে যেহেতু পেয়েছে তখন বিয়ে দিয়ে দেওয়াই শ্রেয়। তবে কার সাথে বিয়ে সেটা জানে না মেহরিন।
ঊর্মি ভয়ে কিছু বলতেও পারছে না। তার উপর আজ জানতে পারলো তার ভাই অনেক আগেই ইব্রাহিমের ওখান থেকে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। ইব্রাহিম তো বললো না কিছু। সে বলেছিল ভাই কে মানাবে। কই মানাতে পারলো না তো। ইমন এসে থেকে একটা কথাও বলে নি ঊর্মির সাথে। বিকেলে জুনায়েদ রা আসবে বলে তার বন্দোবস্ত করছে।
ঊর্মি যা বলার যা রাগ করার সব ইব্রাহিম কে ফোন করে ইব্রাহিমের উপর ঢেলে দিলো। এখন যদি তার ভাই বিয়ে দিয়ে দেয় তাহলে সে বিয়ে করে নিবে যদি ইব্রাহিম কিছু করতে না পারে তো। মাথা কাজ করছে না ঊর্মির। এখন বুঝতে পারছে সে কত বড় অন্যায় করে ফেলছে। তার উচিত হয় নি বিয়ে টা করার। উচিত হয় নি ইব্রাহিমের কথা শোনা। সে কি করে এই কাজ টা করলো? রীতিমত কান্না করে দিচ্ছে এসব ভেবে। কাউকে বলতে পারছে না যে সে বিবাহিত।
এদিকে ইব্রাহিম হাসফাস করতেছে ঊর্মি কে আজ দেখতে আসবে, বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করবে শুনে। সোজা ক্লাবে আসলো সোলেমানের কাছে। ইদানিং রাজনীতি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে গেছে সোলেমান। প্রায় মধ্য রাতে বোর্ড মিটিং হচ্ছে।
সোলেমান ইব্রাহিমকে হাসফাস করতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি হয়েছে? এমন হাসফাস করছিস কেনো? কোনো সমস্যা? ”
ইব্রাহিম মাথার চুলো গুলোর ভেতর বা হাত চালিয়ে বলল-
“ ইমনের বোন কে আমার লাগবে সোলেমান। যে করেই হোক তাকে আমার লাগবে। ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে।
“ কোন ইমন? ঐ ড্রাইভার? ”
“ হু। ”
“ কিসের জন্য লাগবে তোর ইমনের বোন কে? কি করতে চাস তার সাথে? ”
“ সংসার করতে চাই,সংসার। ভালোবাসি তাকে। ”
“ তুই কি আজকাল টিস্যুর মতো মেয়ে চেঞ্জ করা ধরলি নাকি? ”
“ মানে? ”
“ গত বছর না তুই মেহরিনের বান্ধবী.. নাম যেন কি?.. ”
“ ঊর্মি। ”
“ হ্যাঁ ঊর্মি। গত বছর না ঊর্মি ঊর্মি করলি। এ বছর তাহলে আবার ইমনের বোন বোন করছিস কেনো? ”
ইব্রাহিম সরু চোখে তাকালো।
“ ইমনের বোন আর মেহরিনের বান্ধবী ঊর্মি তারা দু’জনে সেম। একজনই। ঊর্মির ভাই হচ্ছে ইমন। ”
সোলেমান চকিতে চমকে উঠলো। মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো
“ হোয়াট! ”
“ কেনো তুই জানতিস না? ”
“ না। এই ইমনের প্রশংসাই করেছিল আমার বউ! সিরিয়াসলি! হায় আল্লাহ। ”
“ এখন বল আমি কি করবো? ঊর্মির বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে অন্য কোথাও ইমন। আমি চাইলাম আমাকে দিলো না। আমার ঊর্মি কে চাই সোলেমান। প্লিজ কিছু কর। ”
“ ইমন তার বোন দিতে না চাইলে আমি কি করতে পারি সেখানে? ”
“ কি আশ্চর্য তুই সাহায্য করবি না আমায়? ”
“ তুলে এনে দিব? ”
“ সেটা কখন বললাম? ”
“ তাহলে কি করতে বলছিস আমায়? ”
“ বিয়েটা যেন আমার সাথে হয়। আই মিন ইমন ওর বোন কে যেন আমায় দিয়ে দেয়। ”
“ ভিক্ষা চা গিয়ে দু হাত পেতে। ”
“ দিবে না রে দিবে না। তোর উপরে ক্ষেপে গিয়ে আমাকে শাস্তি দিচ্ছে। দেখ ভাই একটা সিক্রেট কথা বলি? ”
“ কি বল। ”
“ আমি আগেই একটা অকাজ করে রেখেছি। ”
“ কি? ”
“ ঊর্মি কে বিয়ে করে রেখেছি। ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো। ইব্রাহিম সব খুলে বলল। সব শুনে সোলেমান কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল-
“ বিয়ে তো করেই ফেলোছিস তাহলে মেয়েদের মতো কাঁদার কি মানে? যা গিয়ে নিজের অধিকার দেখিয়ে নিয়ে আয়। এখন তো বউ তোর। অধিকার বেশি তোর। ”
“ তুই চল সাথে। আমি ঝামেলা করে কিছু করতে চাইছি না। চাইছি সমঝোতা করে যেনো হয় সব। ”
সোলেমান চল বলে উঠে হাঁটা ধরলো।
ঊর্মি কে সবুজ রঙের একটা শাড়ি পড়িয়ে রেডি করা হয়েছে। জুনায়েদ আর তার মা বাবা এসেছে ঊর্মি কে দেখে একেবারে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে। বসার ঘরে চা নাস্তা খাচ্ছে আর কথাবার্তা বলছে। ঊর্মিকে রুম থেকে নিয়ে সোফায় বসালেন ইতি বেগম। ইতি বেগমের বোন, বোন জামাই,ছেলে জুনায়েদ দেখলো। নতুন করে আর কি দেখবে? ছোট থেকে তো দেখেই আসছে। তারা সোজা বিয়ের দিকে আগাতে লাগলো।
ঊর্মির ভয়ে বুক শরীর সব কাঁপছে। কান্নায় চোখ মুখ ফুলে গেছে কিন্ত মাথা নিচু থাকায় কারো দেখা হয় নি। তবে ইমনের নজর এড়ায়নি। সে দেখেছে বোন কে কাঁদতে। কেনো কাঁদলো আন্দাজ করেছে। ভালোবাসে? এমন লোকদের সাথে ভালোবাসা? তারা চোখের পলকে মানুষ খু’ন করে প্রমান লোপাট করে। ইমনের তো আরো বেশি খারাপ লাগছে মেহরিনের জন্য। মেয়েটার কপালে এমন স্বামী জুটলো! যখন জানবে তার স্বামী এমন তখন সামলাবে কি করে নিজেকে? ইমন তো নিজের বোন কে বাঁচিয়ে নিলো। তাকে বাঁচাবে কি করে ইমন?
বিয়ের কথাবার্তা বলার সময় বাহির থেকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে ইমন বলল-
“ আমি দেখছি কে। ”
ইমন এগিয়ে এসে দরজা খুলে সামনে তাকাতেই দেখলো সোলেমান আর ইব্রাহিম এসেছে। ইমন অবাক হলে এদের এখানে। জিজ্ঞেস করলো-
“ আপনারা এখানে? কি চাই? ”
সোলেমান বলল-
“ শুনলাম বোনের বিয়ে দিচ্ছ? ”
“ বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে বোন। ভাই হিসেবে আমার দায়িত্ব নয় কি এটা? ”
“ আলবাত এটা তোমার দায়িত্ব। এখন সামনে থেকে সরো। ”
“ কেনো? ”
“ ইব্রাহিমের বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা বলতে। ”
“ উনার বিয়ে নিয়ে? কার সাথে? ”
“ তোমার সাথে তো দিতে পারবো না ইব্রাহিমের বিয়ে। তাই তোমার বোনের সাথেই দিতে চাচ্ছি। তুমি কি ঢুকতে দিবে ভেতরে? নাকি বাহিরে দাঁড়িয়েই কথাবার্তা বলবো? ”
“ আমি তো উনাকে একবার বলেছি আমার বোন কে দিব না বিয়ে উনার সাথে। তাহলে বলার পরও এখানে এসে এসব বলার কি মানে? ”
“ তোমার বোন কে ডেকে আনো ইমন। খুব শর্ট করে কথাবার্তা শেষ করতে চাইছি। ”
“ আমাকেই বলুন। ভেতরে বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। আমি চাই না আপনাদের জন্য কোনো ঝামেলা হোক। ”
“ ওকে। ইব্রাহিম কাগজ টা দে। ”
ইব্রাহিম তার সাথে করে আনা বিয়ের কাগজপত্র সব সোলেমান হাতে তুলে দিলো। সোলেমান সেগুলো ইমনের কাছে দিয়ে বলল-
“ পড়াশোনা তো জানো। আশা করি পড়ার পর বুঝতে অসুবিধা হবে না। একজন বিবাহিত মেয়েকে দ্বিতীয়বার অন্য কোথায় বিয়ে দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড পেতে পারো। সঙ্গে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে। এখন বাকিটা তুমি ভেবে দেখো।”
ইমন প্রথমে বুঝলো না। তবে একের পর এক কাগজ উল্টেপাল্টে দেখার পর মাথায় বড়সড় একটা বাজ ভেঙে পড়লো। এ তো বিয়ের কাগজপত্র সব! ইমনের বিশ্বাস হচ্ছে না। ঊর্মির এত বড় সাহস আদোও হবে? কিন্তু কাগজ গুলো তো ফেইক মনে হচ্ছে না। তারমানে ঊর্মি সত্যি বিয়ে করেছে! কিন্তু কবে করলো? কি করে করতে পারলো এটা ঊর্মি! এত বড় প্রতারণা! ইমন রুমের ভেতরে ঢুকে কাগজ গুলো টেবিলের উপর রেখে ঊর্মির কাছে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি এসব? তুই বিয়ে করে নিয়েছিলি? এই এটা সত্যি? বল সত্যি? নাকি মিথ্যা? ”
সোলেমান ইব্রাহিম ভেতরে ঢুকে আসলো। ইব্রাহিম ঊর্মি কে শাড়িতে বসে থাকতে দেখে রাগ করলো। দেখতে এসেছে বলে শাড়ি টাড়ি পড়ে আসতে হবে?
ভাইয়ের প্রতিটা কথায় ঊর্মির কেঁপে উঠলো। এতদিন ভাবে নি এমন দিন আসবে তার। সে ভুল করেছে। খুব বড় একটা ভুল করেছে। এরজন্য যা শাস্তি দেয় ভাই তাই মাথা পেতে নিবে ঊর্মি। ঊর্মি সোজা ভাইয়ের পা জড়িয়ে কেঁদে উঠলো।
“ আমার অন্যায় হয়ে গেছে ভাই। আমার ভুল হয়ে গেছে। তুমি যা শাস্তি দিবা আমি মাথা পেত নিব।”
ঊর্মি ইমনের বিশ্বাস ভেঙে দিলো আজ। সত্যি বিয়ে করেছে তাদের না জানিয়ে লুকিয়ে গোপনে! এই দিন দেখার জন্য ইমন ছুটে চলছিল পাহাড় সমান দায়িত্বের ভাড় নিয়ে? তাদের শিক্ষায় কি তাহলে কোনো কমতি ছিলো?
ইতি বেগম এখনও কিছু বুঝতে পারে নি। ইমন কে জিজ্ঞেস করলে ইমন সব জানালো। ইতি বেগম সবার সামনে ঊর্মি কে দুটো চড় মারলো। তৃতীয় বার চড় দিতে গেলে ইব্রাহিম এসে ঊর্মি কে আগলে নেয়। ইতি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ প্লিজ ঊর্মি কে কিছু বলবেন না আন্টি। ওর কোনো দোষ নেই। ”
ইতি বেগমের রাগো শরীর জ্বলছে। পছন্দ ছিলো? বলতো। ভালো হলে তারা নিজ থেকেই বিয়ে দিত। কিন্তু না বলে বিয়ে কেনো করলো? এদিকে তারা বিষয়ে কথাবার্তা যে আগাচ্ছিল তখনও কেনো চুপ ছিলো? এখন যে লোক জানাজানি হলে?
ইতি বেগমের বোন খুব অপমানিত বোধ করলো। বোনের কাছে এত আশা নিয়ে মেয়েটাকে চাইলো। অথচ মেয়েটা এরকম একটা কাজ করে বসলো! পরিবারের কথাটা ভাবলো না? তারা আর থাকলো না। স্বামীই থাকতে দিলো না। রেগেই চলে গেলেন। স্বামীর রেগে যাওয়া দেখে ইতি বেগমের বোনও আর থাকতে পারলো না।
ইমন সোফায় মাথা চেপে বসে আছে। তার বোন এটা কি করলো! সে কোনো রাজনৈতিক বিষয় টানছে না। কিন্তু তার দলের লোক গুলো তো ঠিকই আঙুল তুলবে। বলবে ইমন তাদের দলে ঢুকেছে আওয়ামিলীগের গুপ্তচর হয়ে। তখন ইমন কি বলবে? তার জবাব দেওয়ার মুখ আছে?
এখন ইব্রাহিমের সাথে না দিয়েও তো আর কোনো উপায় দেখছে না। এই বোন আর ইমনের আগের বোন নেই। অনেক বড় হয়ে গেছে। নিজের জীবন নিয়ে ডিসিশন নিজে নিতে শিখে গেছে। ইমনের আর দরকার নেই তার। সেজন্যই তো এত বড় একটা কাজ করে ফেললো। একটা বারও ভাবলো না ইমনের কথা সে! বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে কি ইমন কম কষ্ট করেছে তার বোনের জন্য? যতটা পেরেছে তার সবটুকু সে করেছে। নিজের কথা না ভেবে তার কিসে ভালো হবে তা ভেবেছে। সেই বোনের থেকে পাওয়া এই আঘাত টা ইমন সামলে উঠতে পারছে না। তার কি করা উচিত? ঐ পরিবারে দিয়ে দেওয়া উচিত? নাকি ডিভোর্স করিয়ে আনবে? ডিভোর্স করালেও এর পর ঊর্মির ভবিষ্যৎ কি? পাগল পাগল লাগছে ইমনের নিজেকে। এমন একটা দিন যে সে দেখবে জীবনেও ভাবতে পারে নি ইমন।
সোলেমান আর ইব্রাহিম মেহরিন দের বাড়িতে এসেছে শুনে বেশ চমকালো। এর সাথে এটা শুনে আরো বেশি চমকালো যে ঊর্মি নাকি কয়েক মাস আগেই লুকিয়ে বিয়ে করেছে তাও আবার ইব্রাহিম কে। এসব কথা শুনে মাথা চারশো এঙ্গেলে ঘুরে গেল মেহরিনের। তার বিশ্বাস ই হচ্ছে না ঊর্মি এমনটা করেছে। ও এটা করতে পারলো কি করে? ইমন ভাই এত বড় ধাক্কাটা সামলাচ্ছে কি করে?
সন্ধ্যার পর মোতালেব ভুঁইয়া গিয়ে মেহরিন কে নিয়ে আসলে এ বাড়ি।
সোলেমান আর ইব্রাহিম তখন উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলো। মেহরিন কে আসতে দেখে সোলেমান তার পেছন পেছন রুমে আসলো। মেহরিন বোরকা টা খুলে সোলেমানের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো। কি বলবে বুঝতে পারছে না। মেহরিন শুধু বলল-
“ আমাকে একটু ঊর্মি দের বাসায় নিয়ে চলুন তো। মেয়েটা এত বড় একটা কাজ করতে পারলো কি করে? ও তো এমন ধরনের মেয়ে না। ”
সোলেমান নিয়ে গেলো। ঊর্মি তার রুমে কাঁদছে। ইমন সোফায় এখনও ঠাই বসা সেই আগের মতো। পাশে ইতি বেগম শক্ত মুখ করে বসা।
সোলেমান ভেতরে ঢুকে নি। বাহিরেই দাঁড়িয়ে রইলো। মেহরিন ভেতরে ঢুকে দেখলো ইমনের ভেঙেচুরে যাওয়া মুখটা। খুব বড় রকমের আঘাত পেয়েছে যে। মেহরিন কে দেখে ইতি বেগম নড়েচড়ে বসলো। ইমন একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো।
ইতি বেগম মেহরিন কে বলল-
“ শুনেছিস ঊর্মি কি করেছে? কি করে এটা করতে পারলো ও? জিজ্ঞেস করতো। আমার ইচ্ছে করছে ওকে মে’রে ফেলতে। এই দিন দেখার জন্য জন্ম দিয়েছিলাম? ”
মেহরিন ঊর্মির রুমে চলে আসলো। ঊর্মি ফ্লোরে বসে বিছানায় মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছে। মেহরিন গিয়ে পাশে বসলো। কাউকে নিজের পাশে বসতে দেখে ঊর্মি পাশ ফিরে তাকালো। মেহরিন কে দেখেই তাকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
মেহরিন একটুও আগলে নিচ্ছে না ঊর্মি কে।
“ বিশ্বাস কর মেহরিন আমার কি যেন হলো। আমি কারো কথা ভাবলাম না তখন। আমি বিয়ে করে নিলাম। আমি পাপ করে ফেলছি মেহরিন। ভাইয়া আমার সাথে কথা বলছে না। ভাইয়াকে বল সে যা শাস্তি দিবে আমি মাথা পেতে নিব। তারপরও যেন সে আমার সাথে কথা বলে। ”
যদিও বিয়ের মতো পবিত্র একটা জিনিস কখনোই পাপ হতে পারে না। তবে লুকিয়ে করাটা মোটেও ভালো কাজ না। পছন্দ ছিলো বাসায় বলতো।
“ কি শাস্তি দিবে তোকে ইমন ভাই ঊর্মি? কি শাস্তি দিতে বলছিস তাকে? মারবে তোকে? ”
“ যা ইচ্ছে হয় করুক। আমি বাঁধা দিব না। সে যদি বলে আ..মি পা..পাশা কে ছে…”
“ ইমন ভাই জীবনেও এটা বলবে না। তবে আমি সত্যি অবাক হলাম। আমার ঊর্মি,আমার প্রানপ্রিয় বান্ধবী এমন একটা কাজ করলো! ”
“ অ্যাম সরি মেহু,অ্যা’ম সরি। ”
মেহরিন চলে আসলো। ইতি বেগমের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ইমন আগের ন্যায় বসা। মেহরিন শুধু বলল-
“ ভীষণ অনুতপ্ত ঊর্মি। ভুল যে একটা করে ফেলেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন আপনারা বড়রা মিলে বুঝেশুনে তারপর আগান।”
ইমন এবার বলে উঠলো-
“ আমি এখন কি করবো মেহরিন তুমিই বলো? আমার কি করা উচিত? ”
“ আমি তো ভাইয়া বাহিরের মানুষ। আমি তো বলবো বিয়ে যখন হয়ে গেছে তখন দিয়ে দেন। কিন্তু আপনি তো ঊর্মির ভাই। আপনার নিজস্ব চিন্তাভাবনা যা বলে সেটাই করুন। আমি জানি আপনার চিন্তাভাবনা ভুল হবে না। একটু সময় নিয়ে ভাবুন। মেনে নিলে আর মেনে না নিলে কি কি ফেইস করতে হতে পারে সব নিয়ে ভাবুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন। ”
ইমন কিছু একটা ভেবে উঠে দাঁড়ালো। মেহরিন চলে আসলো বাহিরে। সোলেমান কখন থেকে অপেক্ষা করছিলো। মেহরিন আসতেই সোলেমান মেহরিন হাত ধরে বলল-
“ কি বোঝালে এতক্ষণ ধরে? ”
“ আমি কি বোঝাবো? ”
“ কি করলে তাহলে এতক্ষণ? ”
“ ইব্রাহিম ভাইয়া কাজ টা কি ঠিক করেছে? ”
“ অবশ্যই না। আমিও আজ জেনেছি। ”
“ ঊর্মি একা কষ্ট পাচ্ছে। ”
“ আমি তো দেখলাম ইব্রাহিম ও কষ্ট পাচ্ছে। কি সমস্যা তাদের বিয়ে টা মেনে নিলে বুঝলাম না। রাজনীতি করা লোকজন কি সংসার করে না? আমি করছি না? ”
“ আমরা করছি সংসার? ”
“ করছি না? ”
“ ওহ্ হ্যাঁ করছি তো। ৩৬৪ দিন দু দেশে থেকে ৩৬৫ দিনের দিন সাক্ষাৎ হয়। ”
“ এত বড় মিথ্যা এ্যালিগেশন আমার নামে! ভেরি ব্যাড। ”
“ আচ্ছা আচ্ছা চলুন। ”
বাসায় চলে আসলো মেহরিন আর সোলেমান। ইব্রাহিম মুখিয়ে ছিলো তাদের ফেরার। ফিরে আসতেই ইব্রাহিম অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি বললো তারা? ”
সোলেমান বলল-
“ আমি যাই নি ভিতরে। মেহরিন গিয়েছিল। শা’লা মেয়র হয়ে এমন মাইগা কাজ কিভাবে করতে পারলি? বিয়ে কেউ এভাবে করে? বুকের পাটা কি চুপসে গিয়েছিল? ”
“ ইমন তো আমাকে দিতে চাইছিলো না বোন। সেজন্য আমি ভেবেছিলাম এটা করলে ঊর্মিকে আমার থেকে আলাদা করা অসম্ভব। আমি কি কোনো পাপ করছি? মেহরিন তুমিই বলো। ”
মেহরিন তাকালো ইব্রাহিমের দিকে।
“ বিয়ে কখনও পাপ হতে পারে না ভাইয়া। যেহেতু পাপ না বিয়ে করা সেহেতু কেনো আমি লুকিয়ে করবো বিয়ে? ভাইয়া মানছিলো না? আমার পরিবার ছিলো আপনাদের পরিবার ছিলো তারা এসে বুঝালে ভাইয়া অবশ্যই বুঝতো। কিন্তু আপনি আর ঊর্মি এটা কি করে বসলেন? আপনি তো অনেক বড়। একটু তো ভেবে দেখতেন এটার জন্য ফিউচারে কি ফেইস করতে হতে পারে। ”
“ প্রেম ভালোবাসায় মানুষের হিতাহিতজ্ঞান লোপ পায় মেহরিন। এখন ইমন কে বলো তার বোনটাকে যেন দিয়ে দেয়। আমি কষ্টে রাখবো না। ইমনের চেয়েও ভালো ভাবে রাখার চেষ্টা করবো। আমি স্বামী হিসেবে বেস্ট হয়ে দেখাবো। জাস্ট ইমন কে তোমরা বুঝাও। ইমন রাজি না হলে ঊর্মি আসবে না আমার কাছে। ”
“ আব্বা আম্মা যাবে ইমন ভাইয়ের ওখানে। আশা করি ইমন ভাই সঠিক সিদ্ধান্তই নিবে। ”
দাহশয্যা পর্ব ৭৬
রাত ১ টার দিকে সানজিদা বেগম আর মোতালেব ভুঁইয়া ইমনের বাড়ি থেকে আসলেন। অনেক আলাপ-আলোচনা হলো ইমনের সাথে তাদের। পরিশেষে তারা একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছালো যে বিয়ে যেহেতু করেই ফেলছে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ডিভোর্সি মেয়েদের সমাজ ভালো চোখে দেখে না। নতুন করে আবার বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত ইব্রাহিমের সাথে যেহেতু ঐ বিয়ের সময় তারা কেউ ছিলো না। ইমন তার সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু করতে পারে ততটুকু করে বিয়ে দিয়ে দিবে বলল। বিয়ের পর ইমনের সাথে ঊর্মির কেমন সম্পর্ক হতে পারে সে নিয়ে ইমনের কোনো মন্তব্য নেই। গ্রামের লোকজন যেন না জানে যে ঊর্মির আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। সেজন্য ইমন বলেছে সুস্থ ভাবে যেমন পাত্রপক্ষ আসে সেভাবেই যেন আসা হয় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। গ্রামের লোকজন যেন ভাবে যে এটা পারিবারিক ভাবেই দেওয়া হয়েছে।
