Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮০ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮০ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮০ (২)
Raiha Zubair Ripti

সকালের নাস্তার টেবিলে শেখর ফের সামির কে দেখতে না পেয়ে গর্জে উঠলো। মহসিন আলী চায়ের কাপে সবেই চুমুক বসাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ছেলের এমন গর্জে উঠায় আর সেটা পান করতে পারলো না। শেখর ফোনে সময় দেখে বলল-
“ সামির কোথায়? ”
“ ফেরে নি। ”
“ ফেরে নি মানে! খোঁজ নাও নি কেনো? ”
“ ও কি ছোট বাচ্চা যে খোঁজ নিতে হবে? ”
“ ফোন করো। জিজ্ঞেস করো কোথায় আছে। আর ইমিডিয়েটলি বাসায় আসতে বলো। সুবহানের কানে গেলে খারাপ হয়ে যাবে। ”
মহসিন আলী পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন টা বের করে ফোন করলো সামিরের ফোনে। ফোন বেজেই চলছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না।

“ রিসিভ করছে না। ”
“ ওর ফ্রেন্ড দের জিজ্ঞেস করো। ”
মহসিন আলী সামিরের বন্ধু দের ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস। তারাও জানে না সামির কোথায়। গত পরশু সামির তাদের মাল নিয়ে আসতে বলেছিল। তারা ধানমন্ডির লেকে গিয়েছিল কিন্তু সামির নিজেই আসে নি। সেজন্য তারা চলে গেছিলো। মহসিন আলীর কপালে দু ভাজ পড়লো।
শেখর জিজ্ঞেস করলো-
“ কি বললো? ”
“ ওরাও জানে না সামিরের খবর। ”
শেখর ক্লাবে ফোন করলো। জিজ্ঞেস করলো সামির এসেছিল নাকি। তারাও জানালো সামির আসে নি। শেখর চিন্তিত হয়ে পড়লো। এই বে’য়াদব ছেলেটা আবার কোথায় কোন পিক ফেলতে গেলো। শেখর নিজের সোর্স কে সামিরের লোকেশন ট্র্যাকিং করতে বললো। তারা খোঁজ পেলে জানাবে।
শেখর খাবার টা খেয়ে নিলো। আজ কান্দাপাড়া যেতে হবে একবার। পতিতালয় থাকা মেয়েগুলোর নাকি খুব সাহস বেড়েছে। জোরজবরদস্তি করতে হয়। গিয়ে কয়েক ঘা দিয়ে ঠিক করতে হবে।
খাওয়া দাওয়া শেষ করেই সে চলে যায় কান্দাপাড়া ।

মহসিন আলী নাস্তা টা আর বাসায় করলেন না। এমনিতেই এখন বিএনপি দের কোনো ক্ষমতা নেই। ব্যবসা গুলোও ছেলেরা দেখছে। তিনি ক্লাব ঘরের দিকে চলে গেলেন। বাড়িতে পড়ে রইলো একা প্রেমা। সকালের সমস্ত কাজকর্ম সেরে একটু বেলকনির রোদে বসলো। ভেজা লম্বা চুল গুলো খুলে দিলো। আকস্মিক নিচ থেকে চেচামেচির আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো প্রেমা। আবার কি হলো? সবাই তো চলে গেল তাহলে চেঁচাচ্ছে কে? গলার স্বর শুনে মনে হলো শ্বশুর চেঁচাচ্ছে।
প্রেমা খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিচে আসলো। মহসিন আলীর পাশে সামির কে দেখে চমকে উঠলো। পুরো শরীর র’ক্তে রঞ্জিত। হাতের অবস্থা বাজে। কেমন থেঁতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। হাতের একটা আঙুলও নেই। কেমন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এই ভাবে প্রেমাও তো কাতরায় প্রতি সেকেন্ডে প্রতিটি মিনিটে। কেমন লাগছে এখন সামিরের? প্রেমার খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো।
প্রেমা এগিয়ে যেতেই মহসিন আলী কাউকে ফোন করে চিৎকার করে বলতে লাগলো-

“ কোন খা**কির পোলা আমার পুলার এই অবস্থা করছে? ঐ খা**কির পোলার র’ক্ত দিয়ে গোসল করতে না পারলে আমার শান্তি হইবো না। এই সামির বাপ আমার,ক কেডা তোর এই হাল করছে। খালি একবার নাম ডা ক ঐ খা**কির পোলার। ”
আরো বিশ্রী বিশ্রী ভাষায় মহসিন আলী কথা বলতে লাগলেন। প্রেমার গা গুলিয়ে আসলো। সামির যন্ত্রণার তাড়নায় কথা বলতে পারছে না। ক্লাব ঘরের পাশেই নাকি বস্তায় মুড়িয়ে রাখা হয়েছিল সামির কে। মহসিন আলীর এক চ্যালা প্রস্রাব করতে গিয়ে সামির কে পায়। তারপর তারাই ধরে নিয়ে আসে বাড়িতে। প্রেমা লক্ষ্য করলো পুরো হাত থেঁতলানোর পর মরিচের গুঁড়ো দেওয়া হয়েছে। কেমন বাজে গন্ধ বের হচ্ছে। কে করলো এমন অবস্থা?
এম্বুলেন্সের আওয়াজ কানে আসতেই মহসিন আলী ছেলেকে ধরে নিয়ে গেলো হসপিটালে।
এ আবার কি নতুন ঝামেলা শুরু হলো। এই ঝামেলার রেশ আবার প্রেমার উপর গড়িয়ে আসবে না তো? প্রেমা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চলে গেলো। ছেলে তাদের যন্ত্রণাও তাদের হওয়া উচিত। ছেলেকে অমানুষ বানালে তো এমন পরিনতি হবেই। কিন্তু করলো টা কে এমন? আর কিসের জন্যই বা করলো?

মেহরিন কলেজের করা নোটস গুলো নিয়ে পাশা ভিলায় এসেছে। সোলেমান ই নিয়ে এসেছে। আজ শুক্রবার কলেজ বন্ধ। ঊর্মি কে একটু দেখতে ইচ্ছে করলো। মেহরিন কে নামিয়ে দিয়ে সোলেমান এজওয়ান কে নিয়ে একটু এলাকায় বের হয়েছে। লাস্ট কিছুদিন ধরে বাশার সুলতান প্রচুর আহাজারি করছে এজওয়ান কে রাজনীতি তে আনার জন্য। সোলেমান একেই এতো এতো শত্রু জমাচ্ছে, এজওয়ান ঢুকলে একটু দল ভারী হয়। যদি এজওয়ান কে রাজনীতি তে আনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। তবে চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু সম্মতি প্রকাশ করলো। দেখা যাক তার ছোট ভাই কিভাবে রাজনীতি তে তার মতো রাজ করে বেড়ায়।

মেহরিন ঊমির রুমে ঢুকেই দেখলো ঊর্মি মনমরা হয়ে বসে আছে। কোলের উপর পড়ে আছে অবহেলিত ফোন ,যেটা দিয়ে ভাইকে ফোন করবে করবে বলেও সাহস করে আর করতে পারছে না। ইতি বেগম খোঁজ খবর নেয়। তবে নিজ থেকে ফোন দেয় না সেভাবে। ঊর্মি যে ভুল,, না না মারাত্মক অন্যায় করেছে এটা সে সেদিনও অস্বীকার করে নি আর আজও করছে না। ভবিষ্যতেও করবে না। কিন্তু ভালোবাসা যে তাকে অপরাধী বানিয়ে ফেললো। এমন অপরাধ তো ঊর্মি জীবনেও করে নি। এই একটা ভুল তার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পর্ক গুলোর ভেতর ফাটল ধরিয়ে দিলো। রাতের পর রাত যায় ঊর্মির চোখের জল ফুঁড়ায় না। ইব্রাহিম স্বামী হিসেবে আসলেই চমৎকার একটা মানুষ। এ নিয়ে ইতি বেগমেরও দ্বিধা নেই। তবে তাদের এভাবে ধোঁকা, মিথ্যা বলে বিয়ে করাটা ঠিক মেনে নেওয়ার মতো বিষয়ও না। ইতি বেগম তারপরও আশা করছে হয়তো কোনো একদিন ইমন স্বাভাবিক হবে বোনের সাথে। কিন্তু ইমন অনেক টা বদলে গেছে। খুব চাপা স্বভাবের হয়ে গেছে। ফোন দিলেই কেমন যেন পালাই পালাই করে কে’টে দিতে চায়। নিজেকে দূরে রাখতে চায়।

মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেলে ঊর্মির পাশে বসে কাঁধে হাত রাখলো । ঊর্মি চমকে উঠলো। মেহরিন কে দেখে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। হু হু করে কেঁদে দিলো । মেহরিন আগলে নিলো মেয়েটা কে। যতই হোক একমাত্র বন্ধু তো। তার কষ্ট দেখলে মেহরিনের ও কষ্ট লাগে। মেহরিন মাথায়,পিঠে হাত বুলিয়ে বলল-
“ শুনলাম ঠিক মতো খাচ্ছিস না। এই সময়ে ভালোমন্দ খেতে হয় ঊর্মি। নইলে বাবু সুস্থ থাকবে কি করে হু? ”
ঊর্মি কান্না চেপে বলল-
“ আমি একদম একা হয়ে গেছি মেহু। একদম একা। আমার কেউ নেই। ”
“ ধূর পাগলি। কে বলেছে তোর কেউ নেই? ভাইয়ার মতো একটা স্বামী পেয়েছিস। ইমন ভাইয়ার মতো ভাই পেয়েছিস,আমি আছি। চাচি আছে। তারপরও বলছিস কেউ নেই! পাগল মেয়ে। ”
“ ভাইয়া আমার সাথে কথা বলে না মেহু। আমি একটু কথা বলতে চাই। আমাকে বকুক,মারুক তারপর একটু বুকে টেনে নিক। মানুষ কত বড় বড় পাপ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ অব্দি ফেরায় না সেই বান্দা কে। কিন্তু আমার ভাই আমাকে ক্ষমা করতে পারছে না। এই যন্ত্রণা কতটা অসহায় মেহু। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ”
“ আচ্ছা আচ্ছা এখন চোখের জল মোছ। আমি তোর জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। ভাইয়া বললো তোর রুচিতে নাকি অনেক পরিবর্তন এসেছে। ম্যেডের হাতের রান্না খেতে পারিস না। তাই ভাবলাম আমি যখন আসছিই নোট নিয়ে তখন খাবার টাও নিয়ে যাই। ”

মেহরিন টিফিন বক্স টা বের করলো। পরোটা, গরুর মাংস ভুনা,পায়েশ আর বুটের ডাউল। ম্যেড এসে প্লেট দিয়ে গেলো। মেহরিন বেড়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিলো। কয়েক টুকরো খাওয়ার পর ওয়াশরুমে দৌড়ালো ঊর্মি। খুব বেশি খেতে পারে না। মেহরিন দেখলো একটা রুটি এখনও আছে। সেটা সাইডে রেখে হাত ধুতেই ঊর্মি ক্লান্ত দেহ নিয়ে বেরিয়ে আসলো। মেহরিন ওড়নার এক সাইড দিয়ে ভেজা মুখটা মুছে দিলো। ঊর্মি গা এলিয়ে দিলো বালিশে। পাশ থেকে ফোন টা নিয়ে ভাইয়ের নম্বরে কল করলো। কিন্তু ভাই রিসিভ করলো না। মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেললো।
“ আচ্ছা আমি ফোন দিচ্ছি ভাইয়াকে। ”
কথাটা বলেই নিজের ফোন টা হাতে নিয়ে টের পেলো ইমন ভাইয়ার ফোন নম্বর তার ফোনে নেই। ঊর্মির থেকে ফোন নম্বর টা নিয়ে মেহরিন ফোন করলো। দুবার বাজলো,লাস্ট বার দিতেই ফোন রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় ভেসে আসলো-

“ কে বলছেন? ”
মেহরিন আস্তে ধীর গলায় বলল-
“ আসসালামু আলাইকুম, আমি মেহরিন বলছি ভাইয়া। ”
ইমন কান থেকে ফোন টা সরিয়ে এনে নম্বর টা দেখলো। মেহরিন ফোন করেছে! সব ঠিকঠাক আছে? ইমন সালামের জবাব দিয়ে বলল-
“ সব ঠিকঠাক আছে মেহরিন? ”
“ ঊর্মি ফোন দিয়েছিল আপনাকে ভাইয়া। কথা বলবেন না বোনের সাথে? অপরাধ করেছে তার শাস্তি তো পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অপরাধ করে যে অনুশোচনার তাপে ভোগে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। মেয়েটা এখন অন্তঃসত্ত্বা। এই টাইম টাতে ওর হাসি খুশিতে থাকার কথা পরিবারের সাথে। অথচ আপনারা দূরত্ব বাড়িয়ে দিলেন। ”
“ দূরত্ব সে নিজ থেকেই বাড়িয়েছে। ভালো থাকার জন্যই তো এই দূরত্ব বাড়ালো। খারাপ থাকবে না নিশ্চয়ই। ”
“ আমি তো দেখছি কতটা ভালো আছে ঊর্মি,আর আপনারা কতটা ভালো আছেন। ভুল আমরা কম বেশি সবাই করি ভাইয়া। সেই এক ভুল ধরে থাকলে তো আর চলবে না। মেয়েটা ঠিক মতো খায় না। আপনাকে ফোন দিলে ফোন রিসিভ করেন না। একটু কনসিডার করুন। বোনের জন্য না হোক,বোনের অনাগত সন্তানের জন্য হলেও করুন। বাচ্চা টার তো দোষ নেই। ”

ইমন চুপচাপ শুনলো। মেয়েটা এমন কেনো? এতো শীতল এতো শান্ত এতো বুঝদার কেনো? মোতালেব ভুঁইয়া কেনো যে এই হাত টা ইমনের হাতে দিলেন না! একই এলাকায় মানুষ হওয়া ঊর্মি আর মেহরিন। অথচ কতটা পার্থক্য দু’জনের মধ্যে। নিশ্চয়ই ইমন দের পারিবারিক শিক্ষায় কোনো ত্রুটি ছিলো। ইমন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল-
“ চেষ্টা করবো। ঠিকঠাক মতো খাওয়া দাওয়া করতে বলো তাকে। নিজের সাজা যেন বাচ্চা টা না পায়। আমি সময় বের করে একদিন দেখা করে আসবো। ”
“ একটু কথা বলুন ফোনে। ”
ইমন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
“ আচ্ছা দাও। ”
মেহরিন ফোনটা বাড়িয়ে দিলো। ঊর্মি কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা কানে নিয়ে হ্যালো বললো। ওপাশ থেকে ইমন গম্ভীর গলায় বলল-
“ সমস্যা কি তোর? ঠিকঠাক মতো খাচ্ছিস না কেনো? এখন তো আর খাওয়ার কষ্ট নেই এখানে। নেই কোনো রান্না বান্নার চিন্তা, নেই কোনো অভাব অনটন। তাহলে এসবের মানে কি? এখন আর তুই একা নস,সাথে কেউ আছে। স্বার্থপর তো হয়েছিসই আরেকটু হ স্বার্থপর। এই স্বার্থপরে কেউ কষ্ট পাবে না। একটা প্রাণ বাঁচবে সুস্থ মতো। ছোট নেই আর তুই। ”
সকল কথার উত্তর কে ঊর্মি এই সাইডে রেখে দিয়ে ডুকরে কেঁদে বলে উঠলো-

“ ভাইয়া ক্ষমা করে দাও। আর জীবনেও এমন কিছু করবো না। এই প্রথম এই শেষ বার। ”
“ তোর জীবনে আমার অধিকার ফুরিয়ে গেছে সেদিনই। তাই আমার থাকা না থাকায় কিছু যায় আসবে না। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িই সব হয় মেয়েদের। আমরা হই অতিথি মাত্র। তবে চিন্তা করিস না। আমি তো ভাই,আমার দায়িত্ব আমি যখন পাল করবো বলেছি তখন পালন করবোই। ”
“ ফোন দিলে একটু রিসিভ করিও? একটু কথা বলো আমার সাথে। ”
“ ঠিক আছে ব্যস্ততা না থাকলে চেষ্টা করবো। নিজের খেয়াল রাখিস। রাখছি। ”
ইমন কে’টে দিলো। ফোনের স্কিনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মেহরিনের নম্বর টা সেভ করলো- “ তুমি অন্য গ্রহের চাঁদ ” লিখে। অপ্রাপ্তির ঝুলিতে এই মেয়েটাকে হারানোর ওজন মনে হয় নিজের জীবনের মূল্যের চেয়েও বেশি।
ঊর্মির এখন কিছুটা ভালো লাগছে। ঊমির মুখে প্রশান্তির ছাপ দেখতে পেয়ে মেহরিনের ও ভালো লাগলো। বেশ অনেকক্ষণ সে ঊর্মির কাছে থাকলো। ঊর্মির পেট টা হাল্কা উঁচু হয়েছে। মেহরিন এক ধ্যানে তাকিয়ে দেখলো। একদিন তারও নিশ্চয়ই এমন পেট উঁচু হবে। তার আর সুলতান সাহবের অংশ এভাবেই বেড়ে উঠবে পেটে। মেহরিন খুব যত্ন করবে সেই অংশটার।

সোলেমান এজওয়ান কে নিয়ে প্রথমে বৃদ্ধাশ্রমে আসলো। এই বৃদ্ধাশ্রমে প্রথম বার আসা এজওয়ানের। এজওয়ান ঢুকেই আবিষ্কার করলো খোলা মাঠে বাচ্চারা আর বৃদ্ধ মহিলারা সময় কাটাচ্ছে। এই বৃদ্ধাশ্রম টা ঠিক কে বানিয়েছিল এজওয়ান সঠিক জানে না। তার তেমন আইডিয়া নেই বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি কোন টা কার। সে বাহিরে জিনিস গুলো হ্যান্ডেল করতে সেরা। ট্রাক থেকে খাবার,পোশাক যাবতীয় যা যা দরকার মাসকাবারির সব প্রতি মাসের শুরুতে আনা হয়। এজওয়ান পিচ্চি দের দিকে এগিয়ে গেলো। এজওয়ান ভীষণ বাচ্চা ভালোবাসে। বাচ্চাদের জন্য সে অনেক কিছু করেছে অস্ট্রেলিয়ায়। যা হয়তো অনেকেই জানে না। বাট আনফরচুনেটলি তরিকুলের বেটির বোনের মেয়েটা কে একটু খারাপ ভাবে ব্যবহার করতে হয়েছে তার। এজওয়ান বাকি দিক দিয়ে নিকৃষ্ট হলেও বাচ্চার বেলায় সে নরম। বাচ্চাদের কষ্ট দেওয়া মানুষদের সে মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা করে। বিশেষ করে যেই সব বাবা মা বাচ্চাদের ছেড়ে দেয়। ইচ্ছে করে এজওয়ানের ঐ সব বাপ মা দের কু’ত্তার মতো পেটাতে। পর’কীয়া করার শখ তখন বুঝিয়ে দিতে ইচ্ছে করে । বাচ্চাকে সুস্থ জীবন দিতে পারবি না তাহলে জন্ম দিস কেনো তোরা? তোদের তো বেঁচে থাকারই অধিকার নেই। এজওয়ানের ঘৃণা লাগে এই পরকীয়া শব্দ টাকে। ইচ্ছে করে গ’লা টি’পে মে’রে ফেলতে পরকীয়া করা মানুষদের। তার মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এতদিনে এজওয়ানের হাতে খু’ন হয়ে যেত। খুবই সৌভাগ্য যে তিনি বেঁচে নেই। নইলে খবরের কাগজে এতদিনে হেডলাইনে থাকতো ছেলের হাতে মায়ের মৃ’ত্যু। মায়ার নামে এজওয়ান একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি কিনে দিয়েছে গুলশানে যা মাহি জানে না। জানে কেবল শাকিল। ক্ষতিপূরণ হিসেবে সে তার বিজনেসে সেই বছর ২৫% লসে শাকিল কে মার্কেট পাইয়ে দিয়েছে। আর শাকিল তা গ্রহণ ও করেছে। এজওয়ান হিসেব বরাবর করে দিয়েছে।

এজওয়ান বাচ্চাদের সাথে মিশে গিয়ে একদম বাচ্চা হয়ে গেল। সোলেমান দূর থেকে দেখলো ছোট ভাই টাকে। খুব কম সময়ই তারা ছিলো এক সাথে। যার দরুন ফোনের মাধ্যমেই বেশি যোগাযোগ করা হয়েছে। এজওয়ান মাত্রাতিরিক্ত একটা ট্যালেন্টেড ছেলে। ওর এই ট্যালেন্টেড হওয়ার পেছন দায়ী একমাত্র ওর একাকী। সোলেমান এজওয়ানের চেয়ে তুখোড় রাজনীতিবিদ, ম্যাচিউর, পাওয়ারফুল হলেও এজওয়ানের আলতু ফালতু উদ্ভট কাজকর্মের কাছে সে হেরে যাওয়া মানুষ। যথেষ্ট ভালোবাসে সে তার ভাইবোন দের। এজওয়ান আবার বাপের চেয়ে ভাইজান ভক্ত বেশি। বাপের সাথে বেয়াদবি করলেও ভাইজানের সামনে একদম সভ্য, শিশু নাদান ছেলে। এই সোলেমানের একটু চোট লাগলেই এজওয়ান পুরো পাগল হয়ে যায়। মানুষ ভালোবাসতে পারে মারাত্মক ভাবে এজওয়ান। অথচ এই ছেলের বুকে জমে আছে কত কষ্টের পাহাড়। সোলেমান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। সুলতান পরিবার হয়তো আসলেই কলঙ্কিত। নইলে কেনো একটা বাচ্চারও শৈশব আর বাকি পাঁচ টা বাচ্চাদের মতো হলো না? সবাই কেনো, হয় মা ছাড়া, না হয় বাপ ছাড়া আর নইলে একাকী বড় হয়েছে? সোলেমান হিসাব মিলাতে পারে না এটার।

অস্ট্রেলিয়ায় এজওয়ান এক অঘোষিত শাসক। ভার্সিটির সকলের মাঝে দাঁড় করালে সবার আগে যার দিকে চোখ যাবে সেটা নিঃসন্দেহে এই এজওয়ান। এজওয়ানের জন্য বেশ নামডাক পেয়েছে ভার্সিটি টা। তার তুখোড় মেধা, তার বেখাপ্পা চলাফেরা সবকিছুই যে নজর কাড়ার মতো।
এজওয়ান বৃদ্ধ দের কাছে গেলো। এই বুইড়া বয়সে কোথায় নিজের সন্তান নাতিনাতকুর দের সাথে থাকবে তা না, শালার ভণ্ড ছেলেরা বউ নিয়ে উয়া উয়া করে। এজওয়ান দেখলো এক বৃদ্ধ মহিলা কলার খোসা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। এজওয়ান টেনে নিয়ে ছাড়িয়ে দিলো খোসা। বৃদ্ধ মহিলার হাতে দিয়ে বলল-
“ আপনার ছেলে কি করে সুন্দরী লেডিস ? ”
মহিলা ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। চিনতে অসুবিধে হচ্ছে। আগে তো দেখে নি। কলা খেতে খেতে বলল-

“ জানি না। ”
“ নেই? ”
“ আছে। ”
” শুয়ামি কি নেই? ”
“ না। ”
“ ইশ বড় কষ্ট লাগলো। এমন এক ছেলে পয়দা করছেন যে বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে দেখছে না। ”
“ নিজের কর্মের সাজা পাচ্ছি বোধহয় এটা। ”
“ আপনিও আপনার শ্বশুর শাশুড়ীর সাথে এমন করেছিলেন নাকি? ”
“ কোনো এক মায়ের সন্তানের থেকে তার বাপ আলাদা করেছিলাম। সেজন্য বুঝি আজ আমি সন্তান হারার মতো একা। কারো দীর্ঘ শ্বাস লেগে গেছে। ”

“ কি করেছিলেন? ছেলের থেকে বাপ কেঁড়ে নিয়েছিলেন মানে? ”
“ সে অনেক কাহিনী। বললে ফুরোবে না। স্বামী আমাকে রেখে ২য় বিয়ে করেছিল। সেই স্বামী কে ধরে রাখার জন্য তালাক করিয়ে এনেছিলাম। এখন আমি নিজেই তালাক প্রাপ্ত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে পড়ে আছি। আমাকে তালাক দেওয়ার সেই লোক আরেকটা বিয়ে করেছিলেন। তার পাঁচ বছর পর কার এক্সিডেন্টে মা-রা যায়। ছেলেকে কষ্ট করে মানুষ করলাম। দিনশেষে আমার ঠিকানা হলো এখন বৃদ্ধাশ্রম। ”
এজওয়ান শ্বাস ফেললো একটা। যেমন কর্ম করবে তেমন ফল পাবে জেনেও আমরা সেই সব কর্ম গুলোই করে বসি। হাহাহা এটাই বাস্তব। কর্মও করবো ফলও ভোগ করবো। এজওয়ান সোলেমানের পাশে এসে দাঁড়ালো। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-

“ কেমন লাগলো? ”
এজওয়ান ভাবুক হয়ে বলল-
“ অনেস্ট রিপ্লাই দিব? ”
“ হুমম। ”
এজওয়ান গুনগুন করে গেয়ে উঠলো-
“ কারো চোখ ভালো কারো মুখ ভালো
কারো ফিগারের ইশারা…
এ যৌ’আনি চায় গুলামী,
মস্তি দিতে লাগবে তাই ইশারাআআআআআ…”
সোলেমান কান টেনে ধরলো এজওয়ানের। এজওয়ান কান ছাড়াতে ছাড়াতে বলল-
“ হোয়াটস রঙ উইথ ইউ ভাইজান? কান টানছো কেনো? অনেস্ট রিপ্লাই ই তো দিলাম। ”
“ বে’য়াদব অসভ্য ছেলে। ”

“ তুমি তো সভ্য। সভ্য হয়ে কি করলে? ইব্রাহিম ভাইয়ে বাপ হয়ে গেল। তুমি হতে পারলে না। তোমার পরেই তো আমার টার্ন। আমি কিন্তু ভাইজান ইব্রাহিম ভাইয়ের মতো ধোঁকা বাজ না। আমি সিরিয়াল মেইনটেইন করতে জানি। যে আগে বিয়ে করবে সে-ই আগে বাপ হওয়ার অধিকার রাখে। আর তুমি তো বুড়ো….
সোলেমানের চোখ পাকানিতে আর বলতে পারলো না সম্পূর্ণ কথাটা। এজওয়ান দাঁত কেলিয়ে বলল-
“ তুমি এখনও দশ বিশটা বাচ্চা ডিজার্ভ করো ভাইজান। এতো এতো সম্পত্তির দেখভালের জন্য ১০-২০ টা নিছকই কম মনে হচ্ছে। ২৫ টা হলে পারফেক্ট হবে। ”
সোলেমান এজওয়ানের পিঠে চাপড় মে’রে বলল-
“ ভাইজান হই আমি,তোর বন্ধু বাহাদুর নই। সো লাগাম টেনে কথা বল। ”
“ যেখানে আমার পশ্চাৎদেশেরই লাগাম নেই সেখানে মুখে আর কতই বা লাগাম থাকবে বলো। যাই হোক চলো এখন জনসেবা করে আসি। ”

সোলেমান এজওয়ান কে নিয়ে গলির মোড়ে থাকা এক বস্তির ভেতর ঢুকলো। এই বস্তির বেশির ভাগ মানুষই হয় ভিক্ষা করে না হয় ইট ভেঙে,এটা ওটা বিক্রি করে বেঁচে আছে। এজওয়ান সোলেমান হাঁটতে হাঁটতে এক বাড়ির উঠানে দাঁড়ালো। এক বৃদ্ধ মহিলা কুলোয় করে চাউল ঝাড়ছে। সোলেমান গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ আসসালামু আলাইকুম চাচি। ”
বৃদ্ধ মহিলা পিটপিট করে তাকালো।
“ কে রে? ”
এজওয়ান এগিয়ে গিয়ে বলল-
“ আপনাদের এলাকার এমপি আসছে। ”
বৃদ্ধ মহিলা ফের কাজে মনোযোগ দিয়ে বলল-
“ খাইয়া দাইয়া কাম নাই এমপি আইবো বস্তিতে। চাঁদা লইবার আইছো নি তোমরা? দেইখা তো ভদ্রলোক ই মনে হয়। ”
এজওয়ান নিজের দিকে তাকালো। কোন দিক দিয়ে মনে হলো তারা চাঁদা বাজ!
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।

“ চাঁদা নেওয়া হয় আপনাদের এখান থেকে? ”
“ হ প্রত্যেক মাসে আহে দুইডা বান্দর ব্যাডা। আইসা টাকা নিয়া যায়। ”
“ এ মাসে এসেছিল? ”
“ না আহে নাই। আইবো মনে হয় কাইল পরশু। ”
“ ঠিক আছে আমি বিষয়টা দেখবো। আর চাঁদা নিতে আসবে না কেউ। কিন্তু চাচি আপনার স্বামী কই? কথা ছিলো। ”
“ নাই। ”
“ কোথায় গেছে? ”
“ আমার জ্বালা যন্ত্রণা আর সইতে না পাইরা,আমারে একা রাইখাই ব্যাডায় ইন্না-লিল্লাহ বলে পটল তুলতে চলে গেছে। ”
এজওয়ানের মায়া হলো। আহারে বেচারা লোকটা বোধহয় এজওয়ানের মতো বউয়ের হাতে নির্যাতিত হয়।

“ কোন ক্ষেতে গেছে পটল তুলতে বলেন ডেকে নিয়ে আসি। এই বৃদ্ধ বয়সে কাজ করা উচিত না আপনার স্বামীর জন্য। ”
“ এই পটল সেই পটল ক্ষেত নারে পাগলা। ”
“ তাহলে কোথায় গেছে পটল তুলতে? ”
“ মইরা গেছে আমার ব্যাডায়। ”
“ ওহ্ আচ্ছা, তারমানে এখন আপনি সিঙ্গেল তাই তো? ”
“ সিঙ্গেল আবার কি? ”
“ সিঙ্গেল মানে আপনি দোকলা থেকে এখন একলা তাই তো? ”
“ হ এহন আমি ষিঙ্গেল। আমার কেউ নাই। ”
“ তাহলে চাচি আপনার জন্য একটা ভাতার ব্যবস্থা করে দেই? ”
বৃদ্ধা মহিলা চমকে উঠলো। মিছে রাগ দেখিয়ে বলল-
“ ধূর ব্যাডা, শরীর আর কুলায় না। এই বুইড়া বয়সে ভাতার দিয়ে কি করমু আমি? ”
এজওয়ান হতবিহ্বল হয়ে গেল। কি আশ্চর্য বুড়ো বয়সেই তো ভাতা দেওয়া হয়। জোয়ান বয়সে তো আর বয়স্ক ভাতা দিবে না।
সোলেমান নিজেও আকস্মিক এজওয়ানের মুখে ভাতার শব্দ টা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেবেছিল বয়স্ক ভাতার কথা বললো নাকি ঐ ভাতার কথা? এজওয়ান ফিসফিস করে বলল-

“ ভাইজান উনি ওমন করে উঠলো ক্যান? ভাতা তো বৃদ্ধ বয়সেই দেওয়া হয়। উনি এমন ভাবে বললেন শরীরে আর কুলায় না। শরীরে কুলায় না বলেই তো এই ভাতার ব্যবস্থা করা। বাট ওনার রিয়াকশন দেখে আমি লজ্জিত হয়ে পড়লাম। ”
সোলেমান বা হাত দিয়ে এজওয়ানের মুখ সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ চুপ থাক তুই গাধার বাচ্চা। একদম মুখ খুলবি না। ”

এজওয়ান মুখে আঙুল চেপে ধরলো। বাকি যা কথাবার্তা বলার সেসব সোলেমান ই বললো। অনেকক্ষন কথাবার্তা বলে সোলেমান এজওয়ান কে নিয়ে ক্লাবে গেলো। সামনে একটা সমাবেশ আছে। বাশার সুলতান চাচ্ছে সেই সমাবেশে এজওয়ান কে সবার সম্মুখে প্রকাশ করতে তাদের দলের জন্য। সোলেমান হু না কিছুই বললো না। এজওয়ানের উপর নির্ভর করছে এজওয়ান যাবে কি যাবে না। কিছুক্ষণ ভেবে কি মনে করে যেন এজওয়ান স্বীকার করলো সে রাজনীতি তে ঢুকে একটু দেখতে চায় বাংলাদেশের রাজনীতি ঠিক কেমন। সব কিছুর অভিজ্ঞতা থাকা ভালো। আগামী মাসেই রমনাপার্কে বিশাল আকারের সমাবেশ হবে। রাজনীতির প্রায় অনেক বড়বড় ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত থাকবে। সোলেমান কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকার পর হুট করে মনে পড়লো ইয়াসিনের কথা। ছেলেটাকে বললো সামনে আসতে না। আর ছেলেটা সত্যি সত্যি আসলো না সামনে! পাগল ছেলে একটা। পকেট থেকে ফোন বের করে কল দিতে গিয়েও বাশার সুলতান কি যেন একটা বললো,সোলেমানের আর ফোন দেওয়া হলো না। উঠে চলে গেল কোথাও একটা।

পুরো একটা রাত বাতাসি বাড়ির নামায় লাউ গাছের জাংলার নিচে কাটিয়েছে। শীতে শরীর জমে গেছে। কাঁপনি,তার উপর শরীরের আঘাত,শিয়ালের ভয় সব মিলিয়ে একটা রাত যেন মনে হলো ৩৬৫ দিনের সমান। চোখের পাতা এক সেকেন্ডের জন্যও বন্ধ করতে পারে নি বাতাসি। দীর্ঘ এক ৩৬৫ দিনের মতো রাত অতিক্রম করার পর ভোর হতেই বাতাসি হাঁটা ধরলো। পাশেই জহির কাকার দোকান। তার ফোনটা একটু চাইবে বাতাসি। একটু উনাকে ফোন দিয়ে বলবে যেন নিয়ে যায়। উনি তো আর গায়ে হাত তুলে না। যা বলে মুখ দিয়েই বলে। মায়ের মাইরের চেয়ে অনেক ভালো সেই তিক্ত কথা। পর তো। বাতাসি সহ্য করে নিবে। বাতাসিরা সহ্য করতেই এসেছে পৃথিবী তে। বাতাসি জহির কাকার দোকানে এসে দাঁড়ালো। জহির উদদীন তখন ক্রেতাকে পান বানিয়ে দিতে ব্যস্ত। আকস্মিক বাতাসি কে দেখে কিছুটা চমকে গেলো। গায়ে লেপ্টে থাকা আধভেজা জামাকাপড়ে লেগে আছে ময়লা। শরীরের জায়গায় গর্ত হয়ে রক্ত জমাট হয়ে বিঁধে আছে। জহির উদদীন জিজ্ঞেস করলো-

“ এই অবস্থা কেন তোর বাতাসি? আবার মারছে তোর মায়? তোর মা টা এতো পাজি কি বলবো আর। ”
বাতাসি হাত কচলে অস্বস্তি নিয়ে বলল-
“ কাকা একটু ফোনটা দেওয়া যাইবো? একটা কল দিতাম। ”
জহির উদদীনের বড্ড মায়া হলো। ফতুয়ার পকেট থেকে ফোনটা বের করে দিলো।
বাতাসি ফোনটা নিয়ে নম্বর উঠালো। ইয়াসমিন বেগম তার আর ইয়াসিনের নম্বর টা মুখস্থ করিয়ে দিয়েছিলেন। বাতাসি কাঁপা কাঁপা হাতে ইয়াসমিন বেগমের ফোনে কল লাগালো। ফোন বারবার বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে। বাতাসির একটু আশার আলোর অপেক্ষায় জ্বলতে থাকা প্রদীপ টা যেন কেমন কর্পূরের মতো উড়ে যেতে লাগলো ক্রমশ। ইয়াসমিন বেগমও কি তাহলে মুখ ফিরিয়ে নিবে এই বাতাসির থেকে? ফোন কেনো তুলছে না? বাতাসির যে খুব দরকার। নাহ্ কম করে হলেও বিশটা কল দিলো। একটাও রিসিভ হলো না। বাজতে বাজতে কেটে গেলো। উপায়ান্তর না দেখে শেষমেশ বাতাসি ইয়াসিনের নম্বর টা ডায়াল করলো। বাতাসি জানে ইয়াসিন ফিরিয়ে দিবে হয়তো। তারপরও বাতাসি একটু নির্লজ্জ হয়ে ফোনটা করলো। একবার কে’টে গেলো। দ্বিতীয় বারও কেটে কেটে যাবে এমন সময় ফোনটা রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে কোনো কথা না শুনেই বাতাসি বলতে লাগলো-

“ শুনুন,ফোনটা কাটবেন না। দয়া করে কাটবেন না ফোনটা। আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যান। আমি আপনাকে একটুও জ্বালাবো না,বিশ্বাস করুন। বলবো না আমাকে কেনো ভালোবাসেন না। আমাকে শুধু আপনার বাড়ির এক কোণায় একটু থাকতে দেন, যতটুকু জায়গায় একটা ভাঙা কলসি রাখা যায়,ততটুকু জায়গা হলেও চলবে আমার। ভাতটাও না হয় মেপে তিন বেলার জায়গায় এক বেলা দিয়েন। পান্তা, পঁচা যা দিবেন আমি চুপচাপ খেয়ে নিব। একটা তর্কও করবো না। আপনি চাইলে আরেকটা সুন্দর ফর্সা কোনো মেয়ে দেখে বিয়েও করতে পারেন। আমি একটুও বাঁধা দিব না। আমি জানি আমি অভিশাপ… কালির দাগ। আমার মতো মেয়েদের জায়গা হয় না কারো পাশে। শুধু আমাকে একটু আশ্রয় ভিক্ষা দেন। আজ আম্মা আমাকে কুত্তার মতো পিটিয়েছে…একটা আঘাতও বাদ রাখে নাই। পিঠটা এতটাই জ্বলছে যে জামাটা লাগলেই চোখে পানি এসে যায়। হাঁটতে গেলেই শরীর ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হয়…আমি এখন কোথায় যাবো বলুন? কার কাছে যাবো? আমি কিছুই জানি না কিছুই নেই আমার। একটু দয়া করুন আমার উপর। বিশ্বাস করুন আমি একটা চাকরি খুঁজবো। যে কাজই পাই করবো। ঝাড়ু দিব, বাসন মাজবো, মানুষের উঠোন ধোবো। তারপর পেয়ে গেলে আমি চলে যাব। ততদিন শুধু ততদিন,আপনি একটু সাহায্য করুন আমায়। করবেন একটু সাহায্য? ”

দাহশয্যা পর্ব ৮০

ওপাশ থেকে আর কিছু ভেসে আসলো না। কল কে’টে গেল। বাতাসি যেন এবার সত্যি সত্যি অথৈজলে ডুবে গেল। সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলো তাহলে এই বাতাসির থেকে! কেউ রইলো না বাতাসির জন্য! বাতাসি এবার হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লো। আকাশের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে বলে উঠলো-
“ আমারে আর কাঁদাইস না রে জীবন। আমারে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো এই পৃথিবীতে আর কেউ নাই। আমার ভাই নাই,আমার মা নাই,আমার বাপ নাই। অবশেষে কোথাও আর কেউ নাই…..”

দাহশয্যা পর্ব ৮০ (৩)