Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮১ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮১ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮১ (২)
Raiha Zubair Ripti

রাগে,বাজে এক বিতৃষ্ণার অনুভূতি তে রীতিমত মেহরিনের গা কাঁপছে। ইচ্ছে করছে মেয়েগুলো কে কিছু শক্ত কথা শোনাতে। যা জানে না তা নিয়ে কিভাবে এমন এক অস্বাভাবিক অস্বাস্থ্যকর কথা বলে উঠে? এই তো সোলেমান ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পরই মেয়েগুলো তাদের সিট থেকে উঠে এসে মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-

“ মেহরিন মামনি…তোমার আঙ্কেল চাচ্চু, মামু যাই লাগুক সোলেমান স্যার। তুমি তোমার সেই আঙ্কেল চাচ্চু মামুর সাথে আমাদের সেটিং করায় দাও । বিশ্বাস করো আমরা তার সব কথা শুনে চলবো। উনি যা বলবে অক্ষরে অক্ষরে তা বিনাবাক্যে মেনে নিব। তুমি শুধু তোমার আঙ্কেলকে পেতে আমাদের সাহায্য করো। তাকে পটানোর টিপস দাও। বউ হতে চাই তার। তোমায় ফুচকা খাওয়াবো দু প্লেট। চাইলে কাচ্চি,হ্যাঁ সুলতান ডাইনে গিয়ে সোলেমান সুলতানের নামে কাচ্চিও খাওয়াবো তোমায়। তারপরও সাহায্য করো আমাদের। তোমার আঙ্কেল টা দেখতে সেই হ্যান্ডসাম । একটু তাকালেই দিল গার্ডেন গার্ডেন হয়ে যায়। ”
মেহরিন কথা গুলো শুনে জাস্ট থ হয়ে গেল। সোলেমান সুলতান মেহরিনের মামু,চাচ্চু আঙ্কেল! আহাম্মক মেয়ে গুলো তাদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক টাকে বাবা মেয়ে তে নিয়ে গেছে! অভদ্র মেয়ে গুলো। তোরাও তো সেম বয়সী মেহরিনের। তাহলে তোরা কি করে বলিস বউ হওয়ার কথা?

“ তোমাদের মাথা ঠিক আছে? কি সব আজেবাজে নোংরা কথা বলছো। ”
“ নোংরা কথা কোথায় বললাম? পৃথিবীতে কি টিচার আর স্টুডেন্ট রা রিলেশন বিয়ে করে না? ”
“ করবে না কেনো। ”
“ তাহলে নোংরা কেনো বলছো? তুমি সাহায্য করো আমাদের। তোমার আঙ্কেল তার সম্পর্কে তুমি ভালোই জানবে। আমাদেরকে তার পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে বলো। ”
ঊর্মির কি যে রাগ হলো। বে’য়াদব মেয়েগুলো কে সবেই বলতে যাচ্ছিলো…বে’য়াদব সোলেমান সুলতান মেহরিনের মামু চাচ্চু আঙ্কেল না। মেহরিনের স্বামী। কিন্তু টিচার আসায় আর বলা হলো না।
মেয়ে গুলো আশায় আছে মেহরিন কে তারা পটিয়ে সোলেমান সুলতান কে পটাবে। মেহরিন বিতৃষ্ণা নিয়ে বাকি ক্লাস গুলো করলো। মন বসছে না পড়ায়। মেয়ে মানুষ এত ছ্যাচড়া এত বেহায়া হয় কি করে? রাগে দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছে করলো মেহরিনের। কি বাজে বিকৃত ভাবে বাবা মেয়ে বানিয়ে দিলো! কোনোদিন ভুলবে না আজকের দিনটা মেহরিন।
ক্লাস শেষে যখন সোলেমান আর মেহরিন বাড়ির পথে ফিরছিলো তখন সোলেমান লক্ষ্য করলো মেহরিন মুখটা কেমন থমথমে হয়ে আছে। সোলেমান গাড়ি চালাতে চালাতে জিজ্ঞেস করলো-

“ কি হয়েছে? মুখ এমন বাংলার ঙ এর মতো কেনো? ”
মেহরিন ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। মুখের নিকাব গাড়িতে উঠার সাথে সাথেই খুলে ফেলেছে মেহরিন।
“ আপনি আর কলেজে যাবেন না। ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
“ কেনো? ”
“ আমি চাই না আপনি আর কলেজে আসুন। আমি এ-ও চাই না, আমাকে বাজে কোনো অস্বাস্থ্যকর কথাবার্তার সম্মুখীন হতে হোক। ”
“ কে কি বলছে? নাম টা বলো শুধু। ”
“ আপনার স্টুডেন্ট গুলো। ”
সোলেমানের কপালে দু ভাজ পড়লো।
“ আমার স্টুডেন্ট গুলো! কি করছে তারা? ”
“ এখনও কিছু করে নি। সামনে করবে। এখন শুধু বলেছে। ”
“ কি? ”

“ বলেছে আপনি আমার মামু চাচ্চু আঙ্কেল লাগেন! আমি যেন আপনার সাথে ওদের সেটিং করিয়ে দেই! ”
কথাটা কর্ণকুহর হতেই সোলেমান জোরে ব্রেক কোষে গাড়ির। মুখ থেকে ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে আসে— হোয়াট দ্যা ফা’ক!
মেহরিনের দিকে তৎক্ষণাৎ চেয়ে বলল-
“ তুমি কি বললে ওদের? ওরা কেনো আমাকে তোমার বাবার বয়সী বানালো? রাসকেল গুলোকে চ’ড়াতে পারলে শান্তি পেতাম। কোন দিক দিয়ে আমাকে তোমার বাবার বয়সী মনে হয়? জামাই কেনো ভাবলো না? জামাই ভাবতে সমস্যা কি? ”
“ ভেবেছে তো জামাই। ”
“ তাহলে বাবা কেনো বানালো। ”
“ বাবা তো বানিয়েছে আমার। আর জামাই বানাচ্ছে আপনাকে তাদের। ”
“ অসভ্য ইতর মেয়ে গুলো। এখন কি শার্টের পিছনে ইয়া বড়বড় করে লিখে দিব মেহরিন তাবাসসুম আমার বউ। বউকে কেনো মেয়ে বানাচ্ছিস তোরা পাপীর দল। ঠাটা প’ড়ুক সরাসরি তোদের পাপিষ্ঠ মুখে। সব কটাকে প্রি-টেস্টে ফেল দিব। তুমি কিছু বলো নাই? ”

“ বলার আগেই স্যার চলে আসছিলো। আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়েছে এসব শুনে। আপনি বিবাহিত এটা জানে না কেউ? বউ না হয় আমি সেটা অজানা থাকতে পারে। বাট আপনি তো একজন পপুলার ফিগার। ওরা তো আপনাকে ফলোও করে শুনেছি। তাহলে অজানা থাকে কিভাবে? ”
সোলেমান কপালে বৃদ্ধা আঙুল স্লাইড করতে করতে বলে-
“ আমি পাবলিকলি এনাউন্সমেন্ট করি নি যে আমি বিবাহিত। হাতে গোনা কয়েকজন জানে শুধু। ”
মেহরিন কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকালো। বিয়ের বয়স তাদের ২ বছর হতে চললো। আর তার স্বামী এখনও পাবলিকলি জানায় নি সে বিবাহিত! মেয়ে গুলো তো তাহলে সিঙ্গেল ভেবে নজর দিবেই। মেহরিন আর কোনো কথা বললো না সারা রাস্তা। সোলেমান বুঝলো বউ বিষয়টা নিয়ে হেব্বি রেগে আছে। নিবাসে ফিরেই ফোন টা নিয়ে তার অ্যাকাউন্টে ঢুকে একটা ম্যারিড স্ট্যাটাস দিলো। বিয়ের ডেট ও দিলো ২০২০ সালের জুন মাসের ২৬ তারিখ।

সাথে সাথে রিয়াক্ট কমেন্ট শেয়ারের বন্যা বসে গেলো পোস্ট টায়। তাদের ক্রাশ বিয়ে করেছে! আর সেটাও ২০ সালে। আর সে জানাচ্ছে ২২ সালে এসে! অনেকে ভাবছে হয়তো ভুলে পোস্ট করেছে। কিছুক্ষণ পর ডিলিট করবে। আবার অনেকে সিরিয়াস হয়ে গেছে। হাঁটুর বয়সী মেয়ে গুলো কমেন্ট বক্সে এসে ফিট খেয়ে কাঁদছে। সোলেমান নোটিফিকেশন মিউট করে দিলো। সবাই বউয়ের নাম জানতে চাইছে। কোন মেয়ে যার ভাগ্য এমন সোনা দিয়ে বাঁধা যে সোলেমান সুলতানের বউ হয়েছে। সোলেমানের এই পোস্ট টা নিয়ে রীতিমত নিউজ হয়ে গেছে। খবরের চ্যানেল গুলোতে দেখাচ্ছে ঢাকার ৮ আসনের এমপি বিবাহিত। আর সেটা ২০ সাল থেকে। মেয়ের নাম ঠিকানা পরিচয় এখনও অজানা। নেটিজেনরা কিভাবে হাহাকার করছে। অনেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
মাহি আর এজওয়ান একত্রে বসে এই নিউজটাই দেখছিলো। অবশেষে পাবলিকলি প্রকাশ হলো খবরটা। মাহি হতাশার সুরে বলল-
“ ইশ মেয়ে গুলোর কি কষ্ট হচ্ছে। তাদের ক্রাশ বিবাহিত। ”

এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে।
“ বাই এনি চান্স তোমারও কষ্ট হচ্ছে না তো? ”
“ আমার কষ্ট হতে যাবে কেনো? ”
“ তোমার চরিত্র তো আবার ফুলের মতো পবিত্র। তাই জিজ্ঞেস করা। ”
“ শাট-আপ এজওয়ান। আপনার মতো না আমি। ”
“ আমার মতো হতেও পারবা না জীবনে। ”
“ হতেও চাই না। ”
“ আমিও চাই না তুমি আমার মতো হও। আর শোনো ২৭ তারিখ তুমি নিবাসের বাহিরে এক পাও রাখবে না। ”
“ কেনো রাখবো না? ”
“ কারন আছে বলেই তো বলছি। ”
মাহি ভাবলো ২৭ তারিখ আসলে কি। মনে পড়তেই তারপর বলল-
“ ২৭ তারিখ আপনাদের সমাবেশ আছে তাই না? আমি শুনলাম আপনি রাজনীতি তে ঢুকছেন? ”
“ হুমম। সবই সঠিক শুনেছেন আপনি। ”
“ তাহলে তো আমাকে যেতেই হবে সমাবেশে। দেখি দ্যা গ্রেটেস্ট এজওয়ান সুলতান মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিভাবে বাপ ভাইদের মতো ভাষণ দেয়। ”

“ মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়ার রেকর্ড আছে আমার। তাই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিও না যখন তখন যা-তা বিষয় নিয়ে। আর তুমি বেডি মানুষ সমাবেশে যাইবা কোন বাল ফেলাতে? বেডা মাইনসের ঢলাঢলি খেতে? নাকি তোমার এক্স সাফওয়ান কে আমার বডিগার্ড হিসেবে হায়ার করেছি তাকে দেখেতে কোনটা? ”
মাহি সাফওয়ানের নাম টা শুনে যতটা না চমকালো,তার চেয়ে বেশি চমকালো সাফওয়ান কে এজওয়ান তার বডিগার্ডের জন্য হায়ার করেছে! ইচ্ছে করেই করেছে অসভ্য ছেলে।

“ কি হলো কথা বন্ধ হয়ে গেল কেনো মুখের? ”
“ আপনি ইচ্ছে করেই সাফওয়ান কে নিজের বডিগার্ড বানিয়েছেন তাই না? ”
“ অবশ্যই। ”
“ সাফওয়ান কে সাফওয়ানের মতো থাকতে দিন।”
“ ডিউটি ইজ ডিউটি। তার সাথে লুডু খেলার জন্য নিশ্চয়ই হায়ার করা হয় নি। বাংলাদেশের একজন নাগরিক আমি। আমার সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো তাদেরই। ”
“ বাংলাদেশের নাগরিক আপনি? আপনার তো এই দেশের নাগরিকত্ব নেই। ”
“ নিয়েছি। এক সাথে একাধিক দেশের নাগরিকত্ব নেওয়া যায়। ”
“ কত দেশের নাগরিক আপনি? ”
“ দুটোর নামই জেনে রাখো। বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়া। ”
“ আপনি আস্ত একটা মিস্ট্রি এজওয়ান সুলতান। ”
“ আর তুমি সেই মিস্ট্রির আশেপাশে ঘোরা বিষধর কোবরা সুইটহার্ট। তা তোমাকে যে ও বাড়ি থেকে ফোন দিলো সকালে। কি বললে তুমি? ”

মাহির মনে পড়লো সকালে চৌধুরী বাড়ি থেকে ফোন দেওয়া হয়েছিল। তরিকুল চৌধুরীর মৃ’ত্যুর পর তার বিজনেস রীতিমত রসাতলে যাওয়ার পথে। মোহনা জানালো বিজনেসের সব দায়দায়িত্ব শাকিল কে দিয়ে দিলে মাহির কোনো আপত্তি থাকবে কি না। তরিকুল চৌধুরীর ২য় ঘরের ছেলেটা এখনও ছোট। বিজনেস সামলানোর বয়স হয় নি। আর মাহিরও তেমন ইন্টারেস্ট নেই তরিকুল চৌধুরীর কোনো বিজনেস টাকা পয়সা ধন-দৌলত নিয়ে। সেজন্য মাহি বলেছিল- শাকিল ভাইয়া যেহেতু বিজনেসম্যান, তরিকুল চৌধুরীর সাথে বিজনেস পার্টনার ও ছিলো। সেহেতু উনি ভালোই সামলাতে পারবে। সব জানাশোনা ওনার।”
“ কি হলো? কি জিজ্ঞেস করলাম? ”
“ বলেছি শাকিল ভাইয়া সামলাক। আমার কোনো অসুবিধা নেই। ”
“ তোমার বাপের বিজনেস শাকিল কেনো সামলাবে? ”
“ উনি ছাড়া সামলানোর মতো আছে কে? ”
“ তুমি সামলাবে। ”
“ কখনই না। উনার সম্পত্তির উপর আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ”
“ তরিকুলের বেটি। বি প্র্যাক্টিক্যাল। অস্বীকার করতে পারবে না। তারই মেয়ে তুমি। তার সকল কিছুর উপর তোমার অধিকার আছে। পরের ছেলের হাতে সব তুলে দেওয়া মোটেও ভালো কাজ নয়। নিজের অধিকার নিজের আয়ত্তে রাখতে শিখো। হেলাফেলা করো না। এই পৃথিবীতে টাকা যশ আছে যার,পৃথিবীতে রাজত্ব করার ক্ষমতা আছে তার। তোমার বাপের কোম্পানি থেকে আমি আমার হাত সরিয়ে নিয়েছে। এখন প্রতিদ্বন্দ্বী আমরা। শাকিল সামলাতে পারবে না দুই ব্যবসা কে এক সাথে। তুমি গিয়ে হাল ধরো। আমি সাহায্য করবো তোমায়। ”

“ ডুবে যাক। তারপরও আমি হাত দিব না ওখানে।।আর আপনারা না বিজনেস পার্টনার ছিলেন? প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন কেনো? ”
“ আমি করেছি তাই। তাছাড়া তুমি তো বিজনেস সামলাতেই পারবে। এতদিনে আমি এজওয়ান বেশ ভালোই বানিয়েছি তোমায় বিজনেসে। আমাদের অফিসে না থেকে নিজের বাপের ব্যবসাটাকে নতুন রূপে নতুন ভাবে পরিচয় করাও। নিজের আলাদা নাম যশ কামাও। আমি এজওয়ান আছি তোমার আগেপিছে পাছায় ব্যাক টু ব্যাক বলার জন্য। ”
“ আপনি আমার পাছায় থাকেন আর মাথায় থাকেন,আমি বিজনেস সামলাতে পারবো না। আমার এতো সময় নেই। ”
এজওয়ান অবাক হওয়ার ভান করে বললো-
“ সিরিয়াসলি তোমার সময় নেই বলছো! সারাদিন তো ফ্রী ই থাকো। আর গিয়ে দেখো শাকিল তোমাকে বিজনেসের দিকটা সামলাতে দেয় কি না। ”
“ কেনো দিবে না? আমি ইচ্ছে পোষণ করলে ভাইয়া না করার কে? ”
“ ইচ্ছে পোষণ করে দেখো তাহলে। আসছি এখন। ”
“ কোথায় যাচ্ছেন? ”
“ আজ তোবারক রান্না করা হইছে তরিকুলের বেটি। গিয়ে একটু লবন টেস্ট করে আসি। তুমি খাবা? পলিথিনে করে নিয়ে আসবো? ”
“ দরকার নেই। ”
“ ওকে,তাহলে আসছি। টাটা আই লাভিউ। ”
এজওয়ান চলে গেলো। মাহি ভাবতে লাগলো এজওয়ানের বলা কথা গুলো। ভাইয়া কি না করবে মাহি বিজনেস সামলাতে চাইলে? কিন্তু না কেনো করবে?
এজওয়ান রমনায় এসে দেখলো খিচুড়ি রান্না শেষ। মুরগী দিয়ে রান্না করা হইছে। এজওয়ান কে দেখেই ছেলেপেলে লম্বা করে সামাল দিলো। এজওয়ান সালাম শুনে বিরবির করে বলল-

“ শালার ব্যাটারা জীবনে বাপ মা রে দেস না সালাম। আর নেতা ফেতাদের সালামের উপর বসিয়ে রাখিস। গোলামের জাত। ”
লোকজন ওয়ান টাইম প্লেট হাতে নিয়ে এগিয়ে আসতেছে খিচুড়ি নিতে। ছেলেপেলে এজওয়ান কে বলল-
“ ভাই আপনার হাত দিয়ে দেন খিচুড়ি। ”
এজওয়ান পাতিলের সামনে দাঁড়ালো। সবার থালায় দিলো খিচুড়ি। দুই পাতিল রান্না করা হইছিলো। আল্লাহর রহমতে মনে হলো ঢাকার সব আখাইয়ারা চলে আসছে খেতে। পাতিলে একটু খানি ছিলো খিচুড়ি। একজন কে দিয়ে দেওয়ার পর যখন সামনে আরেকটা প্লেট হাজির হলো। তখন এজওয়ান সামনে না তাকিয়েই বলে-
“ খিচুড়ি শেষ,আর নাই। বাসায় গিয়ে রেঁধে খান এখন। ”
কথাটা এজওয়ান শেষ করতেই,সামনে থাকা ব্যক্তিটা বলে উঠলো-

“ কেমন খিচুড়ি রাঁধছেন যে দিতে না দিতেই শেষ হয়ে গেল। আর শেষ হলো তো হলো আমার বেলাতেই! ”
এজওয়ান মাথা তুলে তাকালো। এক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। এজওয়ানের চেনা চেনা লাগলো। কোথায় যেন দেখেছিল?
“ আপনার কপাল খারাপ,তাই আপনি আসতেই শেষ হয়ে গেছে। বাই দ্যা ওয়ে আপনাকে এতো চেনা চেনা লাগছে কেনো? ”
লোকটার চেনা চেনা লাগছে এজওয়ান কে। ভাবলো কই দেখেছে। একটু ভাবতেই মনে পড়লো,ক’দিন আগে চা খেতে এসেছিল তার দোকানে টাকা ছাড়া।
“ আমার দোকানে চা খেতে আইছিলেন টাকা ছাড়া। আমি রশি দিয়া বাইন্ধা রাখতে চাইছিলাম মনে আছে? ”
লোকটা এতো জোরে বলছে যে সবাই কথাটা শুনে এজওয়ানের দিকে তাকালো। এজওয়ান পারছে না একটা চড় মে’রে বলতে -তোর গলার আওয়াজ কমা জাউরা।
“ মনে পড়ছে? ”
“ হ মামা হ মনে পড়ছে। আপনার শরম করলো না যারে বাইন্ধা রাখতে চাইছিলেন তার সভায় এসে খিচুড়ি খাইতে? ”
“ খিচুড়ি তো দেন নাই। তাই শরম করতাছে না। ”
“ নাই বলেই তো দেই নাই। ২৭ তারিখে এসে খেয়ে যাইয়েন। গরু দিয়ে রাঁধবে তখন। ”
“ ভোট দিমু না মিয়া আপনারে। ”
“ সেই দুঃখে দেখেন আমি হাত পা ছুঁড়ে দিয়ে কিন্তু কাঁদবো। প্লিজ ভোট দিবেন আমাকে। আমি জিতলে কিন্তু উন্নয়ন হবে ঘরে ঘরে। ”

“ উন্নয়ন লাগবে না ঘরে আমার। ”
লোকটা চলে গেল। বাশার সুলতান ফোন করে এজওয়ান কে পার্টি অফিসে আসতে বললো। তাদের দলের কিছু লোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে।
পার্টি অফিসে বাশার সুলতান, সোলেমান বসে আছে মিটিং টেবিলের সামনে। শিক্ষা মন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রী আর দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী এসেছে। সোলেমানের সাথে সাপেনেউলে সম্পর্ক অর্থ মন্ত্রীর। সোলেমান মিটিং- এ অর্থ মন্ত্রীর কোনো কথাকেই পাত্তা দিচ্ছে না। এমন ভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে যেন এই কক্ষে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। একটা ফোনকল আসায় সোলেমান বাহিরে চলে যায়। অর্থমন্ত্রী কিড়মিড় করতে লাগলেন। বাশার সুলতানের দিকে তাকিয়ে বললেন-
“ তোমার ভাতিজা চরম লেভেলের একটা বেয়াদব, ঠেঁটা, অহংকারী, বাশার। এটাকে রাজনীতি তে আসতে দিয়েছো কেনো? আমাদের সবার রাজনীতি কে হারাম বানিয়ে দিচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার ছোট ছেলেকে ঢুকিয়ে সোলেমান কে সরাও। ”
বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকালো এমন কথা শুনে।
“ এজওয়ান রাজনীতি তে ঢুকলে আপনাদের লাভ কোথায় সেটাই তো বুঝতেছি না। ”
“ সোলেমানের মতো তো আর বেয়াদব না তোমার ছেলে। ”
বাশার সুলতান হেঁসে উঠলো। তার ছেলে নাকি বে’য়াদব না।
“ আচ্ছা, দেখা সাক্ষাৎ করার পর যেন এই ধারণা না বদলায়। ”
এজওয়ান আসলো তার মিনিট দশেক পর। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বাপ বয়সী বয়স্ক লোকদের দেখে কিছুক্ষণ থ হয়ে গেল। তারপর মুখে হাসি ঝুলিয়ে চেয়ারে বসতে বসতে বলল-
“ গুড ইভনিং বয়স্কগন্স। ”
সবাই একে ওপরের দিকে তাকালো। হোয়াট মিনস বয়স্কগন্স?
শিক্ষা মন্ত্রী বলল-

“ বয়স্কগন্স মানে? ”
“ বয়স্কগন্স মানে বয়স্ক মানুষ। আপনি শিক্ষা মন্ত্রী রাইট? এটার মানেও আস্ক করতে হয়! আপনি কি পাশ? ”
“ অনার্স পাশ। ”
“ দেশের শিক্ষা মন্ত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতা যদি সামান্য অনার্স পাশ হয়,তাহলে তো দেশের পোলাপান এমন বাজে রেজাল্ট করবেই। ৩৩ এ পাশ। সেই ৩৩ মার্কই তুলতে এক একটা স্টুডেন্টের জামাকাপড় ভিজে যায়। ”
অর্থ মন্ত্রী শুধু দেখেই যাচ্ছে এজওয়ান কে। এই বেডা তো সোলেমানের থেকেও জাউরা আর বাঁচাল। কেমন ঠেস মেরে মেরে কথা বলে। অর্থমন্ত্রী গলা ঝেড়ে বলল-
“ সোলেমান তো নেক্সট নির্বাচনে শুনলাম আমাকে উচ্ছেদ করে মন্ত্রী হবে। তা তুমি কি এমপি পদে দাঁড়াবে নাকি? ভাইয়ের জায়গায় বসবে?”
“ ঠিক নাই,কই দাঁড়াবো আর কই বসবো।”
“ তুমি চাইলে আমি তোমাকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে মন্ত্রী বানাতে পারি। বিনিময়ে তুমি শুধু আমাদের সাথে থাকবে,আমাদের হ্যাঁ তে হ্যাঁ আর না তে না বলবে। ”
এজওয়ান কফির মগে চুমুক বসিয়ে বলল-
“ প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে কি আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানানো যায় না? তাহলে তো আমি আপনাদের সাথেই থাকতে পারি। একটু কথা বলে দেখুন তো আপার সাথে। দয়ামায়া করে যদি আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দেয়। তাহলে আমি ট্রাস্ট মি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। ”

অর্থমন্ত্রী বিস্ময় হয়ে গেলো এমন কথা শুনে। বেয়াদব ছেলে প্রধানমন্ত্রী হতে চাচ্ছে!
“ তুমি তো দেখছি তোমার ভাইয়ের চেয়েও বেশি বেয়াদব এজওয়ান। কোন সাহসে প্রধানমন্ত্রী হতে চাও? কি যোগ্যতা আছে তোমার? ”
“ আপনি যোগ্যতা ছাড়া যেভাবে অর্থমন্ত্রী হলেন। তার চেয়ে বেশি যোগ্যতা আমার আছে। সেই হিসেবে তো আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা বলতেই পারি। আর রইলো বেয়াদবের কথা? আপনার ভাষ্যমতে আমি বেয়াদব। আমার ভাষ্যমতেও আপনি বেয়াদব। আসুন তাহলে বেয়াদবে বেয়াদবে,বেয়াদব প্লাস হয়ে দু’জনই ভালো হয়ে যাই। আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বলি জয় বাংলা,বঙ্গবল্টুর লুঙ্গি সামলা…. জয় সেক্সহাচিনা, লজ্জায় বাঁচি না। ”
মন্ত্রী দুজন রাগে কাঁপতে লাগলো।

পরের দিন মেহরিন কলেজে আসতেই ক্লাসে ঢুকে মেয়ে গুলোর ফ্যাকাসে মুখ দেখে প্রথমে বুঝতে পারলো না কি হয়েছে। মেহরিন কে তারা দেখামাত্রই দৌড়ে এসে বলল-
“ এই তুমি তোমার আঙ্কেল কে বলে দিছ আমাদের কথা তাই না? সেজন্য গতকাল সে ম্যারিড স্ট্যাটাস দিছে। তুমি বলে দিতে সে বিবাহিত। তাহলে তো আমাদের মন টা এভাবে ভাঙতো না। ”
মেহরিন ফোনের দিকে তাকালো। সোলেমানের পেজ খানা দেখা যাচ্ছে। ২৪ ঘন্টাও হয় নি। এরমধ্যে ৫৫৮ হাজার লাইক,১১ কে কমেন্ট আর ৪কে শেয়ার হয়ে গেছে।
“ এখন তো জানলে তোমরা সে বিবাহিত। ”
“ হুমম। দিল টুট গ্যায়ি হামারা। বাই দ্যা ওয়ে তার বউ কে? অনেক সুন্দরী তাই না? ”
“ জানি না। ”
“ দেখো নাই তোমার আন্টিকে তুমি? ”
মেহরিন বিরক্ত হলো।

“ কি আন্টি আঙ্কেল লাগিয়ে রাখছো তোমরা? সোলেমান সুলতান আমার আঙ্কেল লাগতে যাবে কেনো? ”
“ মামা চাচা কে তো ইংরেজি তে আঙ্কেলই বলে। ”
“ তোমরা এক একজন পুরোই পাগল জানো সেটা? সোলেমান সুলতান না আমার আঙ্কেল লাগে আর না মামা চাচা। ”
“ তাহলে কি লাগে? ভাই? কিন্তু ভাই হলে মাই গার্ল বললো কেনো? মাই সিস্টার ই তো বলতে পারতো। ”
“ আমি বলছি আমি তার কি লাগি। ”
কথাটা বলতে বলতে সোলেমান ক্লাসে ঢুকলো। মেয়ে গুলো চমকে উঠলো। সোলেমানের হাতে আজ বাঁশের কুঞ্চি আছে। মারবে নাকি। হায়হায় ভাইকে আঙ্কেল বানিয়ে ফেলছিলো।
সোলেমান মেয়েগুলের দিকে একবার তাকালো। চোয়াল তার শক্ত হয়ে আছে।
“ আমার বিষয়ে জানার খুব আগ্রহ তোমাদের তাই না? ওকে। পড়াটা আগে শেষ করছি তারপর আগ্রহ মেটাচ্ছি। ”
সোলেমান খুব কঠিন কঠিন টপিক থেকে প্রশ্ন করলো। দু একজন পারলো। বাকি সবাইকে যারা পারলো না তাদের কান ধরে দাঁড় করালো।

” গতকাল তোদের মধ্যে কারা আমাকে মিসেস মেহরিন সুলতানার বাবা সমতূল্য মামা চাচা আঙ্কেল বানিয়েছিস? ”
কথাটা এতো ভয়ংকর গলায় বললো যে মেয়েগুলো আপনা-আপনি হাত উঁচু করলো। সোলেমান শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বলল-
“ বাপ ডাক আমাকে তোরা। বল আমি তোদের বাবা সমতূল্য মামা চাচা। ”
মেয়ে গুলো চমকে উঠলো এমন কথা শুনে। বাবা বলবে তারা সোলেমান সুলতান কে! নো।
সোলেমান ওদের চুপ থাকতে দেখে বলল-
“ কিছু বলেছি কিন্তু আমি। রেসপন্স না পেলে সব কটাকে কিন্তু মাঠে নিয়ে গিয়ে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবো। করবো সেটা? ”
মেয়ে গুলো দু দিকে মাথা নাড়ালো।
“ তাহলে বল। ”
ক্রাশের মুখে একেই তুই ডাক শুনে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো ওদের। এখন নাকি জোর করিয়ে বাপ ডাকাবে!
“ আপনি আমাদের বাপ সমতূল্য মামা চাচার মতো। ”
“ মনে থাকবে? আর জ্বালাবি তোরা মেহরিন কে? ”
“ না আর জ্বালাবো না আপনার বোন কে। ”
সোলেমান কুঞ্চি দিয়ে জোরে কোষে একটা বাড়ি মারলো বেঞ্চে। তারপর দাঁত চেপে বলল-
“ ছাগলের দল এখন আবার বোন বলছিস কেনো? বউ হয় বউ। নওয়াজ সোলেমান সুলতানের একমাত্র বউ। এমন ভুল দ্বিতীয় বার করলে সব কটাকে কলেজ থেকে বের করে দিব,মূর্খ জাতি। ”
ক্লাসের সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লো। মেহরিন সোলেমান সুলতানের বউ! এই পিচ্চি মেয়ে তার বউ! সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মেহরিনের দিকে। মুখ দেখেনি এখনও তারা কেউ মেহরিনের। দেখতে চায় কত সুন্দরী বউ বিয়ে করেছে সোলেমান সুলতান।

এদিকে তারা মোহরিনের সেম বয়সী হয়ে সোলেমান সুলতানের বউ হতে পারবে। বাট মেহরিন কে মানতে পারছে না। তাদের কাছে পিচ্চি মনে হচ্ছে!
বাতাসির দিন গুলো একটু স্বস্তিরই যাচ্ছে। কোনো কিছুর কষ্ট হচ্ছে না। ইয়াসিন দুপুরের দিকে জিজ্ঞেস করলো সেদিন- পড়াশোনা করতে চায় কি না বাতাসি।
বাতাসি জানালো সে পড়তে চায়। অন্তত এসএসসি পাশ টা করতে চায়। তাহলে নিজের জন্য কিছুটা হলেও কিছু করতে পারবে। ইয়াসিন ঢাকারই একটা হাইস্কুলে বাতাসি কে ভর্তি করিয়ে দিছে। নীলক্ষেত থেকে বই খাতা কিনে দিয়েছে। বাতাসি আর্টসের স্টুডেন্ট। ইয়াসিন ছিলো সাইন্সের স্টুডেন্ট। আর্টস সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই তার। বাতাসি যেহেতু পড়াশোনায় পিছিয়ে গেছে সেজন্য সে বাতাসির জন্য টিচার রাখলো। কোচিং সেন্টারে গিয়ে পড়তে হবে। সকাল ৮ -২ টা অব্দি ক্লাস স্কুলের। তারপর ৪-৬ অব্দি কোচিং।
স্কুল ছুটির পর বাতাসি বাসায় এসে গোসল করে খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে তারপর যায় কোচিং করতে।

দাহশয্যা পর্ব ৮১

কোচিং শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। ইয়াসিন কখনও আসে তো কখনও আসে না। হয়তো সময় হয় না আসার। বা ইচ্ছে হয় না আসার। বাতাসি তখন একা একাই সেই অন্ধকার পথ হেঁটে বাসায় আসে। চলতি পথে হয়তো ইয়াসিন বাতাসির সাময়িক সময়ের জন্য মাঝেমধ্যে সহচরী হবে। কিন্তু বাতাসির এই দীর্ঘ লম্বা পথটা যে বাতাসি কে একাই পাড় করতে হবে। ইয়াসিনের কাছে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি কিছুই পেলো বাতাসি এই কদিন। কৃতজ্ঞ থাকবে সারাজীবন। আর হ্যাঁ সেই কৃতজ্ঞতা বাতাসি অবশ্যই পূরণ করবে, ইয়াসিন কে এই যন্ত্রণাদায়ক শেকলে বাঁধা নামক বিয়েটা থেকে পুরোপুরি ভাবে মুক্তি দিয়ে।

দাহশয্যা পর্ব ৮১ (৩)