Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮৫ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮৫ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৮৫ (২)
Raiha Zubair Ripti

শেখরের সামনে গম্ভীর হয়ে বসে আছে ইকবাল। কিছুক্ষণ আগেই কথা কাটাকাটি হলো দুজনের। ইকবাল এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ নিজের বউ কে এখানে আনা টা কি খুব দরকার ছিলো? বউ তো। ঘরেই রাখতি। ”
শেখর মদের গ্লাসে মুখ ডুবিয়ে বলল-
“ কিসের বউ? কোনো বউ টউ হয় না আমার ও। ওরে আমি বিয়েই করছি এখানে আনার জন্য। ”
“ মেয়েটাকে ছেড়ে দেওয়া হোক। ”
শেখর চকিতে রক্তাক্ত চোখে তাকালো।
“ ছেড়ে দেওয়া হোক মানে? ছেড়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে এসেছি আমি এখানে? ”
“ একটা মেয়েকে ছেড়ে দিলে খুব অসুবিধে তোর হবে বলে মনে হয় না আমার। ”
“ এই বিষয়ে কোনো কথা আমি তোর সাথে বলতে রাজি নই। আমার জিনিস আমি কিভাবে সামলাবো তার সব টা আমি ঠিক করবো। তুই না।।”

“ বেশ,তাহলে আসছি। ”
শেখর চলে গেলো।
পূর্ণার মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে আছে প্রেমা। কেমন মা মা লাগে নিজেকে। পূর্ণা ফিটারে দুধ ভরছে। বুক থেকে খুব একটা দুধ নামে না। যার জন্য তোলা দুধ খাওয়াতে হয়। পূর্ণা ফিটারে গরম দুধ ঢালতে ঢালতে বলল-
” আচ্ছা প্রেমা…তুমি শেখরের কি দেখে বিয়ে করছিলে? না মানে এত বছর ধরে সংসার কিভাবে করলে? ”
প্রেমা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো এ কথা শুনে। কেউ কি জেনে এমন লোক কে বিয়ে করে?
“ অপারগ হয়ে করতে হলো বিয়ে টা। ”
“ অপারগ হয়ে মানে? ”
“ অল্প বয়সে একজনের প্রেমে পড়েছিলাম আমি। সে ছিলো আবার শেখর দের প্রতিদ্বন্দ্বী। শেখর সেটাই সহ্য করতে পারে নি। আমার সাথে খারাপ আচরণ করেছিলো বলে সোলেমান তাকে মেরেছিল। সেই ক্ষোভেই আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আমাকে শেখরকে বিয়ে করতে এক প্রকার বাধ্য করা হয়। ”

“ সোলেমান.. উনি তোমার প্রেমিক?”
“ হু। ”
“ তারপর কি হলো? ”
“ আমার আম্মা ক্যান্সারের রোগী ছিলো। বাবা আমাদের তেমন দেখতো না। একই বাড়িতে থাকতাম। কিন্তু আম্মার চিকিৎসার কোনো খরচ তিনি দিতে চাইতেন না। একদিন আম্মার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ হলো। হসপিটালে নিলাম। ডক্টর জানালো অনেক টাকা লাগবে। টাকা দিলেই চিকিৎসা শুরু করবেন। সোলেমান তখন দেশের বাহিরে ছিলো। ওর কাছে আমি আমার পরিবারের ভেতরকার কথাবার্তা বলতাম না। যতটা পারতাম আড়াল করতাম। আমি নিজে যতটুকু পারতাম তাই করতাম মায়ের জন্য। সেদিন আর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করতে না পেরে সোলেমান কে ফোন দিলাম। এই আশায় যে সোলেমান ফোনটা ধরবে,আমি ধার হিসেবে টাকা চাইবো। কাজকর্ম করে তারপর টাকা গুলো শোধ করে দিব। প্রথম বার ফোন ঢুকলো। তারপর আর ফোন ঢুকলো না সোলেমানের ফোনে। বন্ধ বললো ফোন। অথচ গতকাল রাতেই আমাদের কথা হলো। কত কি বলা হলো একে ওপর কে। এদিকে আমি দিশেহারা, এত টাকা কোথায় পাবো? আব্বার কাছে গেলাম। রীতিমত হাতে পায়ে ধরে বললাম ধার হিসেবে দিতে। আব্বা সোজা মানা করে দিলেন, তিনি দিতে পারবেন না টাকা। আমার সেদিন এত অসহায় লাগছিলো কি বলবো। রাস্তায় ভিক্ষুকের মতো মানুষের কাছে আমি হাত পাততে শুরু করলাম। কেউ দিলো,আবার কেউ দিলো না। ২০০ টাকা হলো। অথচ আমার লাগবে ২ লাখ। আমি হসপিটালে ফিরলাম। দেখলাম আমার আম্মা কে কেবিন থেকে বের করে করিডরে স্ট্রেচারে শুইয়ে রাখছে। আমার আম্মা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আমি দৌড়ে আম্মার শিয়রের কাছে বসে আম্মার যন্ত্রণা দেখে পুড়তে লাগলাম। সেদিন বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তি ছিলাম আমি প্রেমা। মায়ের জন্য কিচ্ছু করতে পারছিলাম না। সারা টা রাত আমি আমার মায়ের যন্ত্রণায় কাতরানো মুখটা দেখে পার করলাম। সেই রাতে না হলেও হাজার বার আমি ফোন করেছিলাম সোলেমান কে। সোলেমানের ফোন সেই যে বন্ধ তো বন্ধই। আর খুললো না। সকালেই দেখলাম শেখর আসলো হসপিটালে। এসে আমার করুন অবস্থা দেখে বলল- সে দিবে টাকা।

আমার মনে তখন সন্দেহ জাগলো না। শুধু মাথায় ঘুরলো আমার আম্মা এবার তাহলে বাঁচবে এই যন্ত্রণা থেকে। আমি যেন একটু আশার আলো দেখতে পেলাম। কিন্তু সেই আশার আলো খুব বেশি সময় ক্ষণস্থায়ী হলো না। শেখর শর্ত জুড়ে দিলো। সে টাকা দিবে এক শর্তে। আমার তাকে বিয়ে করতে হবে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো এই কথা শুনে। মনে পড়লো সে একটা অমানুষ। তাকে বিয়ে করবো! আর তাছাড়া আমি সোলেমান কে কথা দিয়েছিলাম। সোলেমান ফিরলে সোলেমানের সাথে আমার বিয়ে। আমি এই শর্ত শোনার সাথে সাথে বলে দেই লাগবে না টাকা। আমি ফের সোলেমান কে ফোন করি। এবার বন্ধ। এদিকে আম্মার আহাজারি আমি ঠিক ভুল বুঝতে পারছিলাম না। আমাকে যে তখন কেউ একটু এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে- চিন্তা করো না আমি আছি তো। তেমন একটা মানুষও ছিলো না। তখন বয়স বা কত আমার? হয়তো ১৯-২০ হবে। শেখর ফের বলতে লাগলো- তুমি রাজি হতে যত দেরি করবে ততই তোমার আম্মা কষ্ট পাবে,চিকিৎসা হবে না। অবশেষে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মা-রা যাবে।

আমি সুলতান বাড়ির দিকে ছুটলাম। যদি ইব্রাহিম ভাইকে পাই। তাকে বলবো। বাশার চাচাকে বলবো। সে যতই আমাকে অপছন্দ করুক। ভাইস্তার জন্য হলেও তো সাহায্য করবে আমায়। তাদের থেকে সাহায্য নিবো। সোলেমান কে জানাতে বলবো। সোলেমান জানতে পারলে ঠিক চলে আসবে ছুটে পাগলের মতো। কিন্তু সুলতান বাড়ির ভেতরে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হলে না। সুলতান নিবাসের গেট থেকেই আমাকে তাড়িয়ে দিলো দারোয়ান। বলা হলো- বাড়িতে কেউ নেই। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলাম । কেউ আসলো না। অগ্যতা যখন দেখলাম এক শেখর ছাড়া আর কেউ নেই সাহায্য করার। তখন আমি শেখরের সব শর্তে রাজি হয়ে গেলাম। শেখর সে কথা শুনে দু লাখ টাকা বের করে আব্বার হাতে দিয়ে বলল- চিকিৎসা শুরু করার জন্য। আমি অবাক হলাম। কি আশ্চর্য টাকা গুলো আব্বার কাছে কেনো দিচ্ছে? হসপিটালে দিয়ে আসতে বললাম শেখর কে। শেখর জানালো আব্বা নাকি দিয়ে আসবে।

আমাকে বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে বললো। আমি আম্মার সাথে দেখা করতে চাইলাম। বাড়ি থেকে বের হতে দিলো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম আম্মার চিকিৎসা হচ্ছে তো? শেখর জানালো হচ্ছে। অথচ আমার হৃদয় মানতে নারাজ। সেজন্য আমাকে নিয়ে শেখর হসপিটালে গেলো। কেবিনের বাহির থেকে দেখলাম আমার আমৃমার মুখে মাক্স লাগানো। দেখে মনে হচ্ছে চিকিৎসা চলছে পুরোদমে। ভেতরে যেতে চাইলাম। শেখর যেতে দিলো না। দেখতে দিয়েছে এটাই নাকি অনেক। বাড়ি নিয়ে আসলো। এদিকে আমার ফোনটা কোথায় জানি না। ফোনের কথা আমার মাথা তেই নেই। আমি শুধু তখন আম্মা কে নিয়ে ব্যস্ত। বিয়ের বেনারসি আনা হলো। পড়ার সাথে সাথে মনে হলো আমি কাফনের কাপড় পড়লাম অগ্রীম। মনে পড়লো সোলেমান ফিরে এসে যখন দেখবে আমি আর তার নেই তখন কি হবে? ছেলেটা ভেঙে পড়বে। আমাকে ঘৃণা করবে। করবেই তো। এই ছেলেটাকেই তো আমি ভালোবাসা শেখালাম। আমি দারোয়ান চাচার কাছে ছুটে গেলাম। চাচার থেকে ফোন টা নিয়ে সোলেমানের নম্বরে কল করলাম ঢুকলো না। আমি বাশার চাচার নম্বরে কল করলাম। চাচা ফোন রিসিভ করলো। আমি জানালাম আমার বিয়ের বিষয় টা। চাচা জানালো সে সোলেমান কে খবর টা পাঠাচ্ছে। আমি সোলেমানের অপেক্ষা করতে লাগলাম। যদি এসে যায়, আমি চলে যাব লোকটার সাথে। এদিকে কাজি চলে আসছে। আমার মুখ দিয়ে তখন কবুল বের হচ্ছে না। ভেতরে ভেতরে আমি চিৎকার করে করে সোলেমান কে ডেকে ডেকে ম’রে যাচ্ছি। অথচ সোলেমান আসছে না। আমার চিৎকার ফুরাচ্ছে না। আমার আর্তচিৎকার সেদিন কেউ শুনতে পারে নি। চোখে জল নিয়ে আমি পরিশেষে সোলেমানের জন্য অপেক্ষার অপেক্ষা শেষ করে নিজের জীবনটা নরকে পরিনত করার জন্য অন্য কারো হয়ে গেলাম। ”

“ সোলেমান কি তাহলে আসে নি? ”
প্রেমার চোখ তখন জলে টইটম্বুর। মুখে রয়েছে হাসি। হাসির মানে টা ঠিক বুঝতে পারলো না পূর্ণা।
“ এসেছিলো তো সোলেমান। কবুল বলার শেষে বিদায়ের সময় এসেছিল। ”
“ তখন কি হলো? সোলেমান কে কি বলেছিলে? ”
“ শেখর যা যা শিখিয়ে দিয়েছিল তোতা পাখির মত তাই বলেছি। বলেছি সোলেমানের অবর্তমানে আমি শেখরের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছি। সোলেমান সে-সব শুনে মা’রতে এসেছিলো আমায়। আমাকে ঠকবাজ বিশ্বাসঘাতক বলছিলো। সেই সাথে বারবার বলছিলো বিয়ে হয়ে গেছে ওকে ফাইন,কোনো সমস্যা নেই। ডিভোর্সের ব্যবস্থা করবে। তারপরও যেন আমি তার হয়ে থাকি। আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিলো আমি ঠকবাজ নই। আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। তোমাকে আমার সবটা জানানোর সব চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার কথা গুলো, আমার আর্তনাদ গুলো তুমি অব্দি পৌঁছাতে পারলো না। কিন্তু বলতে পারলাম না। সেদিন নিজ চোখে দেখলাম আমাকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় সে কতটা পুড়লো। আমাকে না পাওয়ায় কাতরালো। পুড়তে পুড়তে অভিশাপ দিলো- আমি প্রেমা যেন জীবনে কখনও সুখী না হই। আল্লাহর কি রহমত,সোলেমানের অভিশাপ ফলে গেলো। ”

“ সেই সোলেমান কি আর জানতে পারে নি তাহলে তোমার অবস্থার কথা? ”
“ না। সে জানে আমি বিশ্বাসঘাতক এক নারী। ”
“ আমার নিজেরই কান্না পাচ্ছে। না জানি তুমি কিভাবে সহ্য করেছো এসব। সোলেমান কি পারতো না খোঁজ নিয়ে সত্য টা জানতে? ”
“ ওর রাগ খুব ভয়ংকর। একবার কারো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তার সম্পর্কে খোঁজা তো দূরে থাক। ভাবাও বন্ধ করে দেয়। ”
“ তোমার আম্মা কি বেঁচেছিল? ”

“ উঁহু। আম্মার আম্মা সেদিনই মরে গিয়েছিল হসপিটালের করিডরে কাতরাতে কাতরাতে। আমার জন্মদাতা পিতা চিকিৎসা করায় নি আমার মায়ের। সবটা মিথ্যা ছিলো। সেদিন যে দেখলাম মায়ের চিকিৎসা হচ্ছে। ওটা পুরোটাই মিথ্যা। একটা মৃ’ত মানুষের মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগিয়ে রাখা হয়েছিল। যাতে আমি বুঝতে না পারি আমার মা আর নেই পৃথিবীতে। বুঝতে পারলেই যে বিয়ে টা আর হতো না। সেজন্য আমাকে আমার আম্মার কাছে যেতে দেওয়া হয় নি। আমি বোকা বুঝতে পারি নি। মায়ের মৃত্যুর চার দিনের মাথায় এই সত্য টা জানতে পারি যে মা আর নেই। আমাকে মায়ের চিকিৎসার কথা বলে ঠকানো হলো। আমি পৃথিবীতে সব দিক দিয়েই হেরে যাওয়া এক নারী। পৃথিবী এমন একটা জায়গা,যে পায় সে সব কিছু পায়। আর যে পায় না তার পায়ের নিচের মাটি টুকুও হারিয়ে ফেলে। আমি প্রেমা সব হারাইলাম,সুখ হারাইলাম,মানুষ হারাইলাম। হারাইলাম না শুধু দুঃখ। পৃথিবীতে অবশেষে আমি পেলাম একটা অসহায় জীবন। যেখানে মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই নেই। ”

“ আচ্ছা সোলেমানের জীবনে তোমার আর কোনো অস্তিত্বই নেই। সে-ও কি সংসার করছে? ”
“ হুমম। তার জীবনেও এসেছে এক মায়াবতী, রূপবতী, ভাগ্যবতী নারী। আমার সোলেমানের জন্য পারফেক্ট সেই নারী। আমার সোলেমান সুখে আছে তার স্ত্রী কে নিয়ে। ”
“ অথচ তুমি সুখে নেই। তারপরও আল্লাহ কে নিয়ে তোমার কত আশা! যারা দুনিয়ায় সব পেলো,তার কত লাকি। ”
“ শুনেছি হাশরের ময়দানে দুনিয়ায় যারা সব পেয়েছে তারা দেখবে যারা দুনিয়ায় কিছুই পায়নি তাদের জন্য আল্লাহর রহমত,পুরস্কার । আর সেটা দুনিয়ায় সব কিছু পাওয়ার থেকেও বেশি পাওয়া। আমি আল্লাহর দেওয়া সেই রহমত, সেই পুরস্কার পাওয়ার অপেক্ষায়। ”
“ তোমার আল্লাহ যেন তোমায় সব দেয় প্রেমা। আমি তোমাকে যতদিন পারি আগলে রাখার চেষ্টা করবো। ”
প্রেমা স্মিত হাসলো। পূর্ণার গালে হাত রেখে বলল-
“ আমাকে নিয়ে ভেবো না পূর্ণা। তোমার মেয়েটাকে নিয়ে ভাবার সময় এখন। তাকে আগলে রাখো। আমার যা হওয়ার হোক। ”
প্রেমা সিমরান কে পূর্ণার কোলে দিয়ে ওপাশ হয়ে শুয়ে পড়লো। পুরোনো ব্যথা গুলো তাজা হলো। সোলেমান কে কি শেষবারের জন্য হলেও আর কখনও দেখতে পারবে প্রেমা?

“ তুমি বরং এসো আমার অন্তিম বেলায়। আমি রয়েছি তোমার অপেক্ষায়। তোমাকে দেখেই না হয় আলিঙ্গন করে নিব মৃত্যুকে। কি সৃষ্টি কর্তা, পাবো তো দেখতে তাকে শেষ বার? ”
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইকবাল এতক্ষণ ধরে সবটা শুনলো। তারপর বাড়ি চলে গেলো। বাড়ি এসে পায়চারি করতে লাগলো। এমন একটা পবিত্র মেয়ের সাথে এত কিছু ঘটে গেছে! পাপ তো ইকবালও করে। কই কখনও তো অনুতপ্ত জাগে নি নিজের পাপের জন্য। আজ তাহলে কেনো অস্থির লাগছে এক অচেনা মেয়ের জীবনী শুনে? কেনো ইচ্ছে জাগছে তাকে মুক্ত করার? তাকে মুক্ত করা যে সহজ নয়। মৃত্যু যে তাহলে অনিবার্য।
ইকবাল থম মেরে বসে থেকে একটা সিদ্ধান্তে অটল হলো। বিরবির করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ পাপ করে মানুষ পাপে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মনুষ্যত্ব তখন কু’ত্তার পেটে থাকে। কিন্তু আজ আপনার দিকে তাকাতেই হঠাৎ করে পাপটা খুব ভারী লাগলো আমার প্রেমা। মনুষ্যত্ব জাগলো বোধহয়? আপনাকে বাঁচানোর লোভ হয়েছে। সেজন্য আমি আপনাকে বাঁচাবো। আমার জান প্রাণ দিয়ে হলেও আপনাকে আমি বাঁচাবো। আপনাকে বাঁচাতে না পারলে আমার বেঁচে থাকা আরেক টা পাপ হবে। ”

এজওয়ান আজকাল খুব দেড়ি করে বাড়ি ফিরে। এই যে মাহি অপেক্ষা করছে এজওয়ানের। বাশার সুলতান বলেছে ছেলের খোঁজ রাখতে। একটু যেন ভালো বউ হওয়ার চেষ্টা করে। এজওয়ান এজওয়ানের ফোনে ফোন করলো। দু বার কে’টে গেলো। মাহি ফের ভিডিও কল করলো। এজওয়ান রিসিভ করে টেবিলের সামনে রেখে দিলো কানে ব্লুটুথ গুঁজে।
মাহি দেখলো এজওয়ান বারে। আর মেয়েদের সাথে নাচছে। আর সেটা এজওয়ান এভাবে দেখাচ্ছে! মাহি ছি ছি করতে করতে বলল-
“ আপনার মতো ক্যারেক্টারলেস ছেলে আর দুটো দেখি নি আমি। ছিঃ আপনি না উঠতে বসতে বলতেন তরিকুলের বেটি প্লিজ লাভ মি। প্লিজ ফা’ক মি। এই তার নমুনা! বারে এসে মেয়েদের সাথে ঢলাঢলি করছেন!
এজওয়ানের কপালে দু ভাজ পড়লো এ কথা শুনে।
“ মে কারু তো শালা ক্যারেক্টার ঢিলা হ্যায়,ওর তুম কারো তো শালি ক্যারেক্টার লয়্যাল হ্যায়!”
“ মানে? ”
“ মানে টা হলো তুমি যখন স্বামী থাকা স্বত্তেও তোমার এক্স প্রেমিক সাফওয়ান কে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি নাকের পানি একাকার করে ফেলতে, তখন কি নিজেকে সতীসাবিত্রী ভাবতে নাকি? নিজের বেলায় ১৬ আনা আর আমার বেলায় ৪ আনা! ভীষণ বৈষম্য করছো তো। ”

“ সেটার শোধবোধ করছেন নাকি? ”
“ হু আর ইউ সিস্টার? ”
মাহি দাঁত চেপে বলল-
“ আমি আপনার বউ ভুলে গেছেন সেটা? ”
এজওয়ান ফোনের কাছে এসে ফোনটা টা হাতে তুলে নিয়ে বলল-
“ মিথ্যা অভিযোগ দিবেন না সিস্টার। আমি পিওর সিঙ্গেল। কোনো বউটউ নেই আমার। আপনি আমার মতো হ্যান্ডসাম একটা ছেলেকে দেখে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে গলায় ঝুলে পড়তে চাইছেন। আপনার মতো ১২ ব্যাটারি তো কখনই এজওয়ান সুলতানের বউ হতে পারে না।”
“ আপনি বাসায় আসুন শুধু আজকে। ”
“ বেহায়া, অশ্লীল মেয়ে কোথাকার। আমাকে বাসায় ডাকছো কেনো? ১৮+ কিছু করতে চাও নাকি? তাহলে শুনে রাখো মেয়ে, আমার ভার্জিনিটি আমি তোমার মতো ১৩ ব্যাটারি কে দিয়ে নষ্ট করতে চাই না। আমার বউয়ের জন্য তুলে রেখেছি এটা। তাকে দিয়েই নষ্ট করাবো। ইউ গো টু হ্যেল। বাই দ্যা ওয়ে বাসায় ফিরে দেখা হচ্ছে। আর সেটাও বেডে। ”
এজওয়ান কেটে দিলো।

সকালে যখন সোলেমান ঘুম থেকে উঠে আপাদমস্তক মেহরিন কে দেখে হোটেল রুমে তখন গতকাল রাতের কথা মনে করার চেষ্টা করে। আংশিক মনে আসে ঝাপ্সা। গায়ে শার্ট জড়িয়ে মেহরিনের গায়ে চাদর টা ভালো করে টেনে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় দরজায় কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে। ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজাটা খুলতেই আকস্মিক এক মেয়ে ঝাঁপিয়ে সোলেমানকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে সোলেমান কৌশলে সরে গিয়ে মেয়েটার গলা চেপে ধরে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরলো। মেয়েটা বুঝতে পারে নি সোলেমান এমন টা করে বসবে। মেয়েটা উচ্চস্বরে আওয়াজ করতে চাইলে সোলেমান আরো চেপে ধরে গলা। শাসিয়ে হুমকির স্বরে বলে-

“ আমার বউ ঘুমোচ্ছে। ডোন্ট শাউট। ”
মেয়েটার গলা ধরেই সোলেমান দরজার বাহিরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল-
“ খুবই কাঁচা আর বাজে প্ল্যান। এরপর থেকে এসব জাইঙ্গা মাইঙ্গা পড়ে ন’টি সেজে আমার সামনে আসবি না। ন্যাং’টা হয়ে ঘুরাঘুরি করলেও আমাকে পটাতে পারবি না। উল্টো বমি চলে আসবে আমার। নওয়াজ সোলেমান সুলতানের বেড একমাত্র তার বউয়ের জন্য উন্মুক্ত। তোদের জন্য পতিতালয় ঠিক আছে। ”
মেয়েটাকে যেভাবে ছুড়ে ফেলেছে সোলেমান, তাতে মেয়েটা ভীষণ ব্যথা পেয়েছে। এই ছেলে এভাবে ছুড়ে মারবে জানলে তো আসতোই না। সোলেমান মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো।
এখন রাত। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে বিকেলেই নিবাসে চলে এসেছি। এখন তারা বলেকনিতে বসে আছে। এজওয়ান কে এত রাতে বাড়ি ফিরতে দেখে মেহরিন তাকালো সেদিকে। লোকটার করা একটা ভুলের মাশুল কিভাবে দিতে হচ্ছে! এজওয়ানের ভালোবাসা কি মাহি বুঝতে পারবে কোনোদিন?
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-

“ এজওয়ান ভাইয়া আর মাহি আপুর সম্পর্ক কি কখনও স্বাভাবিক হবে না? ”
“ জানি না। ”
“ খারাপ লাগে দেখতে। ভাইয়া কতটা পাগল আপুর জন্য। ”
“ মেহরিন…”
“ হু। ”
“ একটা কথা সব সময় মনে রাখবে। মানুষ আসলে আমাদের কে যেটা দেখায় প্রকৃতপক্ষে সে সেটা নয়। আর যেটা মানুষ লুকায়। সেটাই তাদের আসল রূপ। তাই কারো বাহ্যিক আচরণ, কথাবার্তা দেখে তাকে জাজ করে ফেলো না সাথে সাথে হু? আর মানুষের উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে তাকে নিজের চাইতেও বেশি বিশ্বাস করো না। মানুষ চেনা কঠিন এই পৃথিবীতে। ”
মেহরিন প্রথমে বুঝলো না। সোলেমান আকাশ পানে একবার তাকালো। কি অপূর্ব লাগছে আকাশ টাকে। জ্যোৎস্নার আলোয় আলোকিত পুরো নগর। মেহরিন উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে সোলেমানের দিকে। সোলেমান একবার তাকালো, তার পরপরই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। একটু আগে বলা কথাটার মানে কি বুঝতে পেরেছে মেহরিন? বোধহয় পেরেছে। সোলেমান স্থির রইলো। তার বলা একটা কথাও তো মিথ্যা না। সত্যিই তো বলেছে। সোলেমান ডান হাতটা বাড়িয়ে মেহরিন কে টেনে আনলো বুকে। এতো কেনো যে ভালোবাসে এই মেয়েটা সোলেমান কে। সোলেমান মেহরিন কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মেহরিনের হাতের আঙুলের ভাজে নিজের আঙুল ঢুকিয়ে চেপে ধরে প্রশ্ন করার মতো গুনগুন করে গেয়ে উঠলো –

mera sath kahan tak dogi tum
mai des bides ka banjara..
itna na mujhse tu pyar
badha ke mai ek badal avara…
kaise kisi ka sahara banun
ke mai khud beghar bechara…
মেহরিন স্বামীর বুকে মাথা টা ঠেসে পুরো ভর ছেড়ে দিলো। মুঠোয় বন্দী থাকা হাতের দিকে তাকালো। দৃষ্টি স্থীর সেখানে। সুলতান সাহেব সবসময় মেহরিন কে ধাঁধার মধ্যে রাখে। প্রতিটি কথার পেছন একটা করে ধাঁধা থাকে। মানে উত্তর টা সে বলবে না। উত্তর টা মেহরিন কেই খুঁজে নিতে হবে না হয় বুঝে নিতে হবে। রহস্যময় ব্যক্তির যত রহস্য মার্কা কথাবার্তা। মেহরিন ও কি কম নাকি? খুঁজে নিবে ধাঁধার উত্তর। সোলেমানের করার প্রশ্ন টার উত্তর মেহরিন সোলেমানের ভাষাতেই ফিসফিস করে গেয়ে বলল-

o neel gagan ke dewaane tu
pyar na mera pehachane..
mai Kab tak saath chalun tere
jab tak na kahe tu mai hara..
is liye tujhse main pyar karun
ke tu ek badal avara..
janam janam se hun sath tere
ke naam mera jal ki dhara…
সোলেমান হাসলো। মেহরিনের কপালে গাঢ় চুম্বন একে দিলো। সোলেমানের কেন যেন মাঝেমধ্যে একজনের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে। ভাগ্যিস সে ঠকিয়েছিল। ভাগ্যিস মেহরিন নামের মেয়েটা তার জীবনে এসেছে। সোলেমান মনে মনে আওড়ালো-
“মেহরিনের জন্য হলেও তোমাকে আমি ক্ষমা করা দিব প্রেমা। ”

এজওয়ান রুমে ঢুকে দেখলো মাহি সোফায় বসে আছ। অপেক্ষা করছে নাকি এজওয়ানের? এজওয়ান শিস বাজাতে বাজাতে ঢুকলো। সবেই চোখটা লেগে এসেছিল মাহির। এজওয়ানের শিসের শব্দে তাকালো।
“ এসেছেন তাহলে নোংরা লোক। ”
এজওয়ান দাঁড়িয়ে গেলো এ কথা শুনে।
“ আমি নোংরা লোক মানে? ”
“ সরি লম্পট হবে। ”
“ ফর হোয়াই? ”
“ ভেবে দেখুন। ”
“ ভেবে দেখলাম। আচ্ছা তুমি আমার সাথে এমন বৈষম্য করো কেনো? এটা কিন্তু খুবই খারাপ একটা কাজ।”
“ কি বৈষম্য করেছি আমি আপনার সাথে? ”
“ এই যে তুমি স্বামী ছাড়া পরপুরুষের সাথে ঢলাঢলি করলে কোনো দোষ হয় না। আর আমি মেয়েদের সাথে নাচলেই যত দোষ!
মাহি উঠে দাঁড়িয়ে বলল-

“ পিঠ আর পা’ছা নিজের টা নিজে, কেউ দেখতে পারে? ”
এজওয়ান ঠোঁটে তর্জনী আঙুল ঠেকিয়ে চিন্তিত হয়ে বলল-
“ নিজের দোষ দেখতে হলে কি নিজের পিঠ ও পাছা দেখাটা বাধ্যতামূলক? ”
“ অবশ্যই। ”
এজওয়ানের রাগ হলো।
“ কোন শালার ব্যাটারা এসব ফাদারফা’কিং কথাবার্তা বলছে তোমায়?
“ সব লোকই বলে। ”
“ নিজের দোষ দেখার জন্য যদি নিজের পাছা দেখা বাধ্যতামূলক হয়ে থাকে তাহলে আসুন আপনার পাছা ও পিঠ আপনার টা আপনাকে দেখানোর ব্যবস্থা করি। তাহলে যদি একটু নিজের দোষ গুলো দেখতেন পান। ”
মাহি জিজ্ঞেস করলো-
“ কিভাবে? ”
এজওয়ান মাহি কে টেনে আয়নার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল-
“ আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া আয়নার দিকে তাকা তুই। তোর দোষ তোর পাছা তুই দুইটাই দেখতে পারবি। এতেও যদি দেখতে না পারিস পাছা পিঠ। তাহলে আমি ছবি তুলে দিব তোর পিঠ পাছার। তারপর তোকে দেখাবো। এরপরও যদি নিজের দোষ তুই অস্বীকার করিস, তাহলে হামানদিস্তা দিয়ে তোকে পিষে মারবো আমি তরিকুলের বেটি। আসছে দোষের সাথে পাছা আর পিঠের তুলনা দিতে। এক্কেরে পাছা কে’টে হাতে ধরায় দিব।”
মাহি হতবিহ্বল হয়ে গেলো এজওয়ানের থেকে এমন কথা শুনে।

পরের দিন পতিতালয় আসলো ইকবাল। প্রেমার সাথে তার কথা বলাটা জরুরি। সেজন্য পূর্ণা কে ডেকে বলল কথা বলবে। পূর্ণা জানালো প্রেমা জোহরের নামাজ আদায় করছে। ইকবাল দরজার বাহিরে অপেক্ষা করলো। প্রেমার নামজ শেষ হতেই পূর্ণা জানালো ইকবাল তার সাথে কথা বলবপ। কথাটা শুনে অনেক অবাক হলো প্রেমা। ইকবাল কি এমন কথা বলবে তাকে? দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো। ইকবাল সালাম দিলো। প্রেমা সালামের জবাব দিয়ে বলল-
“ কি বলবেন? ”
ইকবাল ছোট একটা ছুরি দিলো প্রেমার দিকে বাড়িয়ে। তারপর বলল-
“ এটা সবসময় কাছে রাখবেন। কেউ আসলেই সোজা মে’রে ফেলবেন। বাকিটা আমি সামলে নিব। আর হু..আমি আপনাকে খুব শীগ্রই এখান থেকে বের করবো। ”
প্রেমা ছুরিটার দিকে তাকালো। তাকে একা কেনো বের করবে? প্রেমা তো একা মুক্ত হবে না। হলে এখানকার সব মেয়েকে মুক্ত করবে। প্রেমা বুঝতে পেরেছে ,এখানকার সব মেয়েই মুক্ত ভাবে বাঁচতে চায়।

“ আপনি আমাকে সাহায্য করবেন কেনো? কোন স্বার্থ লুকিয়ে আছে এখানে? ”
“ স্বার্থ তো লুকিয়ে আছে অবশ্যই। ”
“ কি সেটা বলুন। ”
“ সময় হলে বলবো। ”
“ আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমাকে একা কেনো বের করবেন? উদ্দেশ্য কি আপনার? বের করলে সব মেয়েকে বের করুন। ”
ইকবালের কপালে দু ভাজ পড়লো।
“ আমি আপনার দায়িত্ব নিয়েছি। বাকিদের না। ”
“ আমি তো নিতে বলি নি আমার দায়িত্ব। মুক্ত ভাবে বাঁচার অধিকার সবারই আছে,শুধু আমার একার না। আসতে পারেন আপনি,আমার দরকার নেই আপনার সাহায্যের। ”
“ আপনার কাছে কি আপনার ইজ্জতের মূল্য নেই প্রেমা? ”
“ আমার ইজ্জতের দাম আমার জীবনের চেয়েও মূল্য। ”
“ তাহলে? ”

দাহশয্যা পর্ব ৮৫

“ ভিতুর মতো ভয়ে আমি একা নিজের ইজ্জত বাচাঁনোর জন্য পালিয়ে যাব! অন্য দের কি হবে? ”
“ ওরা বেচে দিয়েছে ওদের ইজ্জত। ”
“ ভুল। জোর করে বেচানো হয়েছে। ”
“ আপনি তাহলে পালাবেন না? ”
“ সবাই কে সাথে করেই পালাবো আমি। ”
প্রেমা চলে গেলো। ইকবাল মাথার চুল গুলো চেপে ধরলো। আসলো একজন কে বাঁচাতে। আর ম্যাডাম বাকি সবার লিস্ট ধরিয়ে দিলো! উনাকে বাঁচাতে গেলেই তো শরীরের র’ক্ত ঝড়াতে হবে। এখন সবাই কে বাঁচাতে গেলে আর কি কি ঝড়াতে হতে পারে???

দাহশয্যা পর্ব ৮৫ (৩)