দুইজনাতেই পর্ব ৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
বাইরে তখন প্রচন্ড বৃষ্টির ধারা। সাথে ঝড়ো বাতাস। আশপাশে বইছে শীতল এক বাতাস। দ্বিতীকে অনেকবার আরেকটু থাকার জন্য বললেও দ্বিতী থাকল না। এই মুহুর্তে চলে যাবে মানে এই মুহুর্তেই চলে যাবে। সাজিয়া আফরোজ অবশেষে হতাশ হয়ে ছেলেকেই বলল,
“ সাক্ষ্য, দিয়ে আয় না মেয়েটাকে একটু। এই ঝড় বাতাসে একা একা কি করে যাবে বল? যা বৃষ্টি বাইরে। ”
দ্বিতী তড়িৎ বেগেই তাকাল। তীব্র বিরোধীতা করে উত্তর দিল,
“ লাগবে না সাজি আম্মু। আমি একাই যেতে পারব। এইটুকু পথ যেতেও বুঝি আমাকে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হবে? ”
সাক্ষ্যর মা মিনমিন করে চাইল। এই যে সাক্ষ্য একটু আগেই দ্বিতীর প্রতি তীব্র অনীহা নিয়ে কথাগুলো বলেছিল তা যে দ্বিতী শুনেছে তা বুঝতে আর বাকি থাকল না উনার। ছোটশ্বাস ফেলে বুঝিয়ে বললেন,
“ আম্মু, বুঝার চেষ্টা কর। বাইরে যা বৃষ্টি একা যেতে পারবি না তো। সন্ধ্যা হয়ে গেল প্রায়। সাক্ষ্য দিয়ে আসুক না।”
“ না! আমি উনার সাথে যাব না। ”
সাক্ষ্য শুধু শুনছিল। ভ্রু বাঁকিয়ে একবার চাইলও দ্বিতীর দিকে। এতোটা ত্যাড়া কেন মেয়েটা? ছোটশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই পকেটে হাত গুঁজে গম্ভীর গলায় বলল,
“ আম্মু, নিচে যাচ্ছি। তোমার বান্ধবীর মেয়েকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে হাজির হতে বলো। নয়তো নিয়ে যেতে পারব না। ”
এইটুকু বলেই ধুপধাপ পা ফেলে দ্বিতীর সামনে দিয়েই চলে গেল মানুষটা। ভাবখানা এমন যেন বাধ্য হয়েই রাজি হচ্ছে দ্বিতীকে নিয়ে যেতে। নয়তো নিতই না। দ্বিতীও একাই যাবে। ঐ মানুষের সামনে দিয়েই একা একা যাবে। কি ভেবেছে? এতোটা বেহায়া? যে লোক নিজের মায়ের সামনেও তাকে নিয়ে এতোটা অবহেলা দেখাচ্ছিল সে লোকের সাথে যাবে সে? কোনমতেই না।
সাজিয়া আফরোজ বহু কষ্টেই দ্বিতীকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বলল সাক্ষ্যর সাথে যেতে। অথচ দ্বিতী নিজের সিদ্ধান্তেই স্থির। অবশেষে বলেও এল যেতে পারব এইসেই। তারপরই হুড়মুড় করে নিচে নামল। ঠিক গেইটের সামনেই সাক্ষ্যকে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল পেছন থেকেই৷ দ্বিতী দেখল পেছন থেকেই। অতঃপর ওখানটায় কেউই দাঁড়িয়ে নেই যেন এমন ভাবেই ওই পথটুকু দিয়ে হেঁটে গিয়ে গেইট পেরিয়ে দাঁড়াল রিক্সার জন্য। সাক্ষ্য খুব সূক্ষ্ম চোখেই দেখল তা। ঠিক তার একটু পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মেয়ে টা। বৃষ্টির ছিটকে এসে সরাসরি পড়ছেই শরীরে৷ খুব দ্রুত জামাটাও ভিজে যাবে বোধহয়। তবুও একইভাবেই ওখানেই দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে ফিরে এমন ভাবে চেয়ে আছে যেন সে সাক্ষ্যকে দেখেইনি। সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলে। ছাতাটা দ্বিতীর দিকে এগিয়ে ধরেই নিজেও দুয়েক পা এগিয়ে দাঁড়াল। দ্বিতীর পাশে দাঁড়িয়েই ছাতাটা ধরতেই দ্বিতী মাথা তুলে চাইল। অতঃপর নিজের মাথার উপর আকস্মিক ছাতাখানা দেখতে পেয়েই ছিটকে দূরে সরল। আরেকটু দূরে দাঁড়িয়ে ফের একইভাবেই অন্যদিক ফিরে তাকাল। এই পর্যায়ে দ্বিতী শুধু একটুই ভিজল না, অনেকটুকুই ভিজে গেল জামার অংশ। ওড়নাটা বৃষ্টির দাপটে ভিজে গিয়েছে। দ্বিতী তবুও ওভাবেই স্থির দাঁড়ানো। হাত উঁচিয়ে ঘড়িতে একবার সময়ও দেখল। অপরদিকে সাক্ষ্য শুধু ভ্রু কুঁচকাল। ভাব দেখাচ্ছে এই মেয়ে? এটিটিউড দেখানোয় পন্ডিত সাক্ষ্যকেই এখন এই মেয়ে এটিটিউড দেখাচ্ছে? সাক্ষ্য ফের আবারও পা এগিয়ে দ্বিতীর পাশে দাঁড়াল। বাম হাতে ফের আবারও মাথার উপর ছাতাটা মেলে ধরে ডান হাতে টেনে ধরল দ্বিতীর কোমড়। যেন আগে থেকেই জানত দ্বিতী এখনই ছিটকে দূরে সরে যাবে। তাই তো আগে আগেই শক্ত করে কোমড় চেপে ধরল। গম্ভীর, দৃঢ় গলায় বলল,
“ এত এটিটিউড কার সাথে দেখাচ্ছেন হু? সাহস খুব না? ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকিয়ে চাইল। বিদ্যুৎ গতিতে ছিটকে দূরে সরতেও চেয়েও সরা হলো না। এমনভাবে চেপে ধরেছে যে দ্বিতীর রাগে চোখমুখ লাল হয় এল। মুখে তীব্র ক্ষোভ নিয়েই সাক্ষ্যর দিকে তাকিয়েই বলল,
“ কি সমস্যা স্যার? রাস্তাঘাটে এসব অসভ্যতা করছেন কেন? ”
সাক্ষ্য ছাড়ল না। একইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল দ্বিতীর কাছাকাছি। উত্তর করল,
“ অসভ্যতা করার অধিকার আছে বলেই করছি। ”
দ্বিতী উত্তরে চুপ হলো না। মুহুর্তেই জানাল,
“ বউ করতে চেয়েছে সাজি আম্মু, আপনি তো চাননি। সুতারাং আপনার অধিকার থাকার ও তো কথা নয় স্যার।”
সাক্ষ্য তাকাল স্থির- শান্ত এক চাহনিতেই। এটা সত্য তাদের আকদটা হয়েছিল কোন প্ল্যান ছাড়াই। তার আম্মু হুট করে চেয়েছিল বলেই আকস্মিক আকদটা হয়েছিল। একদম হুট করেই। সাক্ষ্য এই নিয়ে মায়ের উপর কিছুটা রেগেছিলও। কিন্তু তাই বলে বিয়ে করল সে, আর অধিকার থাকবে না ? সাক্ষ্য চোখে হেসে চাইল। বলল,
“ আম্মু বউ করতে চেয়েছে। কিন্তু বউ হলেন কার? আমার ? নাকি আম্মুর? তো? কার অধিকার থাকবে? ”
দ্বিতী এবারে আর উত্তরই করল না।দেখা গেল তুমুল বৃষ্টিতেই একটা রিক্সা অবশেষে এল। দ্বিতী মুহুর্তেই বলল,
“ ছুঁইছুঁই স্বভাব দেখিয়ে অধিকার ফলাতে আসবেন না, ওকে? দ্বিতী মেনে নিবে না। একদম হাত ভেঙ্গে দিব। ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকাল। বাহ! আকদ হওয়া বউ তার হাত ভেঙ্গে দিবে। গর্ব করা উচিত কি? সাক্ষ্যর তো হাসি ফেল। তবুও হাসি চেপে গেল। দ্বিতী তাকে একপ্রকার ধাক্কাধাক্কি করে ফেলে রেখে রিক্সায় উঠতেই পরপর সাক্ষ্যও উঠল। দ্বিতীর পাশে ঠিক শরীর ছুঁইছুঁই করে বসেই ধীর কন্ঠে জানাল,
“ আমি অপেক্ষায় থাকলাম আমার ছুঁইছুঁই স্বভাবের বিনিময়ে হাতভাঙা উপহার পাওয়ার জন্য । ”
এইটুকু বলেই রিক্সাওয়ালা মামাকে বলে উঠল,
“ চালান মামা। ”
রিক্সাওয়ালা চালাতেই নিচ্ছিল। অথচ ঠিক তখনই দ্বিতী বলল,
“ আপনি উঠলেন কেন হুহ? নামুন। এক্ষুনি নামুন। আমি আপনার সাখে যাব না। ”
রিক্সাওয়ালা ফিরে চাইল মাথা কাত করেই। সাক্ষ্য একবার দ্বিতীর দিকে চেয়েই চাইল উনার দিকে। চোখে হেসে বলল,
“ আপনি চালান মামা। ওরকম একটু আধটু ঝগড়া তো হয়ই। ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকাল। কি ধূর্ত লোক! কি ভাবে নিজেকে? কোথাকার কোন রাজপুত্র সে?
সাম্য বন্ধুদের সাথে হোস্টেলেই থাকে। তার ধারণা বাড়িতে তাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যা গুরুত্ব দেওয়া হয় কথাকেই দেওয়া হয়। বয়সে দুইজনের খুব একটা তফাৎ না থাকাতে ছোটকাল থেকে মা বাবা সবসময় দুইজনের তুলনাই দেখিয়ে এসেছে আঙ্গুল তুলর। যে তুলনার মাপকাঠিতে সাম্য তার মা বাবার চোখে সবসময়ই ছিল পিঁছিয়ে। আর কথা ছিল এগিয়ে। কথা সাম্য আর সাক্ষ্যর ফুফাতো বোন। ফুফি মারা যাওয়ার পর প্রায় ছয় বছর বয়সেই ওকে এনেছিল তার মা বাবা। সাম্যর তখন আট বছর বয়স। ঠিক তখনই থেকে বাড়িতে তার আদর কমতে শুরু করল। আর সব আদর গিয়ে জমল কথার থলিতে। এই নিয়েই মূলত কথাকে সহ্য করতে পারে না সাম্য। দেখলেই গা জ্বলে এমন যেন। আজও জ্বলল। দীর্ঘ তিনদিনের ট্যুর দিয়ে সাম্য যখন বাড়ি ফিরল সর্বপ্রথমই বাবার হাতে চড় খেল। তারপরই চেঁচামেচি করে বলে গেল,
“ এত বড় হয়েছো অথচ মা বাবাকে চিন্তায় রাখতে ভালো লাগে তোমার? ফোন অফ রেখেছো কেন? কোন আক্কেলে? বাইরে গিয়েছো ভালো কথা, ফোন অন রাখা যেত না? খোঁজখবর নেওয়া যেত না? মা বাবার খোঁজ নাও কখনো? শুধু আলতু ফালতু আড্ডাতেই মন দিতে পারো। তোমার বয়সী তো কথাও। ও তো এমন করে না। তোমার মতো বেয়াদব তো হয়নি ও। ”
সাম্য ফুঁসল রাগে। বাবার চড়খানা খাওয়ার পর থেকেই কথার উপর জন্মেছে এক অদৃশ্য রাগ। কেন ঐ মেয়ের সাথেই সবসময় তার তুলনা করে বাবা মা? কেন? সাম্যর তো সহ্য হয় না। আর এই সহ্য না হওয়ার মাঝেই কথা এল কফি নিয়ে। বেশ উচ্ছ্বাস নিয়েই বলল,
“ সাম্য? সাজেক গিয়েছিস? কেমন মজা করেছিস? ছবি তুলেছিস না? দেখা, দেখা তো দেখি কেমন ছবি তুলেছিস। ”
সাম্য এক টানেই কথার হাত থেকে কফির মগটা ছিনিয়ে নিল। কপাল কুঁচকে রাগে ক্ষোভে বলল,
“ আমি তোর ছোট না কাঁথার বাচ্চা কাঁথা! গুণে গুণে দুই বছরের বড়। তুই কোন সাহসে আমায় তুই তুই করে বলিস? কয়বার বলেছি আমায় আপনি করে বলতে? ”
কথা চুপ হয়ে গেল যেন এবারে। যতোটা উচ্ছ্বাস ছিল সাম্যর রাগ দেখে ততোটাই উদাস হলো। উত্তর স্বরূপ বলল,
“ আমি তো ভাইয়াকেও তুমি করে বলি সাম্য। ”
দুইজনাতেই পর্ব ৫
সাম্যর রাগে মুখই লাল হলো। ছোট বাচ্চাদের মতো রাগ ফুসতে ফুঁসতে কথার হাত চেপে বলল,
“ আবার নাম ধরে ডাকছিস? সাহস কত তোর! ”
এতোটাই জোরে চেপে ধরল যেন কথার নরম হাত যেন ভেঙ্গে যাবে। কথার ব্যথা লাগল। চোখ টলমল হয়ে এল একমুহুর্তেই। কিছু না করলেও সাম্য সবসময় এমন কেন করে তার সাথে? কি দোষ?
