Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৮

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৮

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৮
নাজনীন নেছা নাবিলা

আজ নীলা ইকরা কে ইউনিভার্সিটিতে যেতে মানা করে দিয়েছে এবং বলে দিয়েছে যাতে ক্যাব বুক করে হসপিটালে চলে যায়।ইকরাও নীলার কথা শুনলো।আর সেই জেন্টলম্যান কে ধন্যবাদ জানানো বাকি।আর শুধু মুখে ধন্যবাদ দিলে কি চলবে? তাই ইকরা ভাবলো হসপিটালে যাওয়ার সময় কিছু নিয়ে যাবে লোকটির জন্য।সে
তৈরি হতে লাগলো।এখন তার শরীর একদম চাঙ্গা।নীলা কিছুক্ষণ আগেই তৈরি হয়ে চলে গেছে ।ইকরা ভেবেছিল প্রথম বার পরিবার থেকে এতটা দূরে তার উপর অসুস্থ হয়তো তার সুস্থ হতে অনেক বেগ পোহাতে হবে। কিন্তু নীলা যেন তার আপন মানুষ হয়ে উঠেছে। তাকে তো গতকাল থেকে কিছু করতেই দিচ্ছে না।

এমনি তার শাড়িটা পর্যন্ত ধুয়ে দিয়েছে।একা একাই রান্না করেছে আবার মাঝ রাতে ইকরার জর উঠেছিল নীলা তার সেবা করেছে‌‌।আবার সকালে একাই সব রান্না করে ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছে।আজ আগে আগে বের হয়ে গিয়েছে।বলে গিয়েছে কি এক বিশেষ কাজ আছে। ইকরার বোধগম্য হলো না এখানে নীলার কি এমন বিশেষ কাজ আছে।সে তো কেবল এই মেয়েটির জীবন চক্র দেখে হতাশ হচ্ছে। মেয়েটি যত রাগী তার মন ততই নরম। মেয়েটি ভালোবাসা পেলেই গলে যায়‌। ঠিক যেমন এখন তার কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেয়ে তাকে তিন গুণ ভালো ব্যবহার ফিরিয়ে দেয়। মেয়েটি জীবনে কাছের মানুষ থেকে কেবল ভালোবেসে চেয়েছিল।অথচ সেই কাছের মানুষ গুলো তাকে এই ভালবাসা বাদে সব দিয়েছে। ধোঁকা, কষ্ট, অপবাদ।আর কি মেয়েটি কাউকে ভরসা করতে পারবে? ইকরা তো মন থেকে নীলার ভালো চায়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নীলা সপিং মল থেকে বেশ কয়েকটি চুইংগাম এবং গ্লাভস কিনে নিল। এবং চুইংগাম গুলো টুপা টুপ করে মুখের ভেতর পুরে নিল। আজকে তো সে প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে। তার সাথে পাঙ্গা নেওয়া কাকে বলে সে বুঝিয়ে দিবে।তার বান্ধবীর এই অবস্থা তার জন্যই হয়েছে।সে গেলে তো তখনই মেয়েটি কে দেখে নিত। কিন্তু তখন দেখতে পারে নি তো কি হয়েছে এখন দেখে নিবে ‌আর এমন ভাবেই দেখে নিবে যে আর দেখার মতোন থাকবে না।

মিহাল শরীর থেকে ঘাম গড়িয়ে পরছে জিম করার কারণে। কখনো ডাম্বেল কার্ল,তো কখনো ডাম্বেল শোল্ডার,আবার লেগ প্রেস মেশিন তো আবার ল্যাট পুলডাউন। বাড়িতেই তার জিম করার জন্য একটি রুম বরাদ্দ। সেখান জিম করার সকল সামগ্রী আছে।তার মাথা গরম থাকলেও জিম করে আবার মন ভালো থাকলেও জিম করে। কিন্তু মন বেশি ভালো থাকলে সে হর্স রাইডিং করে।আজ দুঃখ জনক ভাবে তার প্রাণ প্রিয় ঘোড়া অসুস্থ তাই জিম করেই কাঁটাচ্ছে।আর ভাবছে কি করে মেয়েটিকে কষ্ট না দিয়েই সব কাজ করতে পারে।সে আসলেই মেয়েটি কে বিন্দু মাত্র কষ্ট দিতে চায় না। এক হাত দিয়ে ডাম্বেল উঠাতে আর নামাতে নামাতে মনে মনে বলছে______

“তোমার চোখ আমি পড়ে ফেলছি নীলাঞ্জনা। বুঝে ফেলেছি তুমি ভালো নেই।আর তোমার এই লুকায়িত কষ্টের কারণ নিঃসন্দেহে সা*লা ইরফান।ওকে তো আমি জেন্ত পুতে ফেলবো। প্রথমে তো ভেবেছিলাম ওকে খুঁজে বের করে শুধু উত্তম মধ্যম দিব। কারণ যেহেতু সে আমার মামাতো ভাই তাই আমার মা আর মামার কথা ভেবে তাকে ছাড় দিতাম। কিন্তু সে তো তোমাকে কষ্ট দিয়েছে, হয়তো এখনো দিচ্ছে।আর যে আমার নীলাঞ্জনা কে তাকে আর যাই হোক আমি সুখে থাকতে দিব না।”

নিজের কথায় মিহাল নিজেই অবাক হচ্ছে। সে বারবার মেয়েটিকে আমার নীলাঞ্জনা আমার নীলাঞ্জনা করে সম্বোধন করছে। আদৌ কি মেয়েটি তার নীলাঞ্জনা হবে? আর কেনই বা সে বার বার আমার আমার করছে?সে কি মেয়েটির মায়ায় জড়িয়ে পরেছে?
সে নিজের মনকে জিজ্ঞেস করল____
তার মানে কি নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা? যার জন্য আমি এত গুলো বছর ধরে অচেনা ভাষা দিয়ে কবিতা লিখে আসছি?
কোথা থেকে গানের লাইন ভেসে আসছে_____

লিখেছিলো সে এক কবিতা,
নাম তার নীলাঞ্জনা
তার সেই পেমের ভাষা
চিরদিনই ছিলো অচেনা
সে যে প্রদীপের সিখা ছিলো
সে যে জিবনে এক আশা ছিলো
সে যে পূর্ণিমা রাত ছিলো
সে যে ভালবাসার গান ছিলো।

ইকরার পরনে লাইট পিঙ্ক কালারের বোরকা সাথে মেচ করে হিজাব।আজ আর মাস্ক পরে নি।জর ছেড়েছে তো তাই গরম লাগছে।সে ক্যাবে বসে আছে। উদ্দেশ্য তার হসপিটালে যাওয়ার। হাতে গোলাপি গোলাপ ফুল নিল একটি। শুধু মুখে তো আর ধন্যবাদ বলা ভালো দেখায় না।তাই ফুল নিয়ে নিল।তার গাড়ি থামলো ইউরোপীয় হাসপাতাল জর্জেস পম্পিডো এর সামনে।ইকরা গাড়ি থেকে নেমে পেমেন্ট করে দিল‌। পার্স থেকে মুনভির দেওয়া কার্ড বের করে নিল। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে ডাঃ শাহরিয়ার মুনভি।ইকরা যেই না হসপিটালের ভেতর যাওয়ার জন্য পা বাড়াল ওমনি হঠাৎ তার নজরে গেল কটন ক্যান্ডি।তার ভীষণ প্রিয় তাই আর দেরি না করে টপাটপ কিনে নিল। নিজের জন্য ২ দুটো কিনে নিল।তার আবার একটা তে হয় না।পরে ভাবলো সেই জেন্টলম্যান এর জন্যও নিয়ে নেওয়া উচিত। তারপর আর কি? মুনভির জন্যও দুটো কটন ক্যান্ডি নিয়ে হসপিটালে চলে গেল।

নীলা সব গুলো ক্লাস করে নিল। মুখে তার চুইংগাম।এক টা দুইটা না বরং এক সাথে ১০ টা।মুখ এক দম ফুলে আছে। অবশ্য মাস্ক পরার কারণে তা বোঝা যাচ্ছে না। একটু পর হবে তার ইকোনমিক ক্লাস।এখন ব্রেক টাইম‌ আর এই সময়েই তাকে তার কাজ করতে হবে। লিসা মিহাল এর কেবিন এর ঠিক বরাবর করিডোরে বসে আছে। এখান থেকে মিহাল বের হলেই দেখতে পাবে সে। অবশ্য দরজা ভেরানো এবং রুম টি কাঁচের বলে সে মিহাল কে দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু ভেতর থেকে বাইরে সবটাই দেখা যায়।
নীলা এসে লিসার পেছনে দাঁড়ালো‌।লিসা নিজের গ্যাং নিয়ে বসে ছিল।মিহাল কেবিনের দরজা দিয়ে লক্ষ্য করল নীলাঞ্জনা কে।আর সেখানে লিসা ছিল বিধায় তার বুঝতে সময় লাগলো না যে এখন কিছু হতে চলেছে।তাই চটপট নিজের ল্যাপটপ সামনে নিয়ে সিসিটিভির ফুটেজ কানেক্ট করে দেখতে লাগলো সেখানে কি হয়। অবশ্য কথাও শোনা যাবে কারণ ভয়েস সিস্টেম আছে।

লিসা নিজের পিছনে কারোর উপস্থিত টের পেতেই পেছনে তাকালে।তার সাথে সাথে তার গ্যাং এর সকলেই পিছনে তাকালো।নীলা নিজের মাস্ক খুলে সব গুলো দাঁত কেলিয়ে এক অদ্ভুত হাসি দিল।সেই হাসি দেখে মিহালের কাশি উঠে পরলো। সে টেবিলের উপর থাকা ক্লাস থেকে পানি খেয়ে নিল। পানির শেষ ঢোক গিলার আগে কম্পিউটারে ভেসে থাকার স্কিনে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখে মুখ থেকে তার পানি পরে গেল।

লিসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীলা মুখ থেকে বাবল ফুলালো। লিসা প্রশ্নাত্মক ভঙ্গিতে চেয়ে রইল কেবল।নীলার হাতে গ্লাভস পরা ছিল। মুখ থেকে চুইংগাম বের করে লিসার চুলের মাঝ বরাবর লাগিয়ে দিল।মিহালের চোখ আপনা আপনি বড় বড় হয়ে গেল।মুখ হা হয়ে গেল এমন দৃশ্য। ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকের মেয়ের সাথে এমন কাজ করে ফেলল। মেয়েটি সাহস আছে বলতে হবে। লিসা আর তার সঙ্গপঙ্গ খেপে উঠলো।লিসার চুল কোমরের নিচে ছাড়িয়ে ছিল। নীলা একদম লিসার কাঁধের চুল থেকে পিঠে চুল পর্যন্ত চুইংগাম লাগিয়ে দিয়েছে।লিসার সাঙ্গপাঙ্গ নীলা কে কিছু বলতে যাবে তখনি লিসা তাদেরকে বলল যাতে তারা সবাই মিলে লিসার চুল থেকে চুইংগাম ছড়ায়। সবাই মিলে লিসার চুল টানাটানি করতে লাগলো। কিন্তু ফলস্বরূপ চুইংগাম লিসার চুলে আরো লেগে যাচ্ছে।

নীলা এই সব দেখে শব্দ করে হাসতে লাগলো। তার এখন মনের স্বাদ মিটেছে। নীলার হাসি দেখে লিসার রাগ আরো বেড়ে গেল।সে নীলার দিকে তাকিয়ে রক্ত লাল চোখ হুংকার দিয়ে বলল____
হাউ ডেয়ার ইউ? ডু ইউ নো হু আই এম? আই উইলমেইক ইউর লাইফ লাইক হেল।
মিহালের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার নীলাঞ্জনার সাথে কেউ এভাবে কথা বলবে এইটা সে বরখাস্ত করবে না। সে বসা থেকে উঠে পরল এবং সেখানে যাওয়ার জন্য পা বাড়ানো। কিন্তু ল্যাপটপ থেকে নীলার বলা কথাগুলো ভেসে আসতেই তার পা জোড়া থেমে গেল।

নীলা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলতে শুরু করল_____
আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট টু নো ইওর নেম। ডোন্ট মেস উইথ মি। আই হ্যাভ ফুটেজ অন মাই ফোন অফ এভরিথিং ইউ ডিড অন দা ডে অফ দা ইভেন্ট।
লিসা দমে গেল‌। কারণ সে জানে তার বাবা অনেক স্ট্রিক। যদি তার বাবা এই সম্পর্কে জানতে পারে তাহলে তাকে এই ইউনিভার্সিটি থেকে বের করে দিবে। এবং সে আর যাই হোক এই ইউনিভার্সিটি থেকে চলে যেতে চায় না আর সবার সামনে অপমানিত হতে চায় না। আর এই মেয়েটাকে সে যতটুকু চিনতে পেরেছে ততটুকুতে বুঝতে পেরেছে যে মেয়েটি মিথ্যে বলার মেয়ে না। যেহেতু মেয়েটি একথা বলছে তার মানে অবশ্যই মেয়েটির কাছে প্রমাণ আছে। সে ভাবল এখন ভালো হয়ে কথা বলতে হবে। তাই নিজের সুর গরম করে বাংলা ভাষায় বলল____

তুমি একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের সাথে এমনটা কি করে করতে পারলে? এখন এই চুল নিয়ে আমি কি করে হাঁটবো সবার সামনে? এখন তো আমার লজ্জা করবে। কি করে আসব আমি মানুষের সামনে? লোকো লজ্জায় তো আমি মাথা উঁচু করতে পারবোনা। তুমি কি করে পারলে কাজটা করতে?
লিসা আসলে সেন্টি কার্ড পাবার জন্যই এমন ভাবে নাটক করছে। মিহাল আবার নিজের চেয়ারে এসে বসলো। সে দেখতে চায় তার নীলাঞ্জনা এই জবাবে কি বলে।
নীলার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।সে লিসার চোখে চোখ রেখে বলল ____
ইউ লিসা রাইট। এই ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকের মেয়ে। তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি আমি। প্রথম প্রশ্ন ছিল জানি কি?

নীলা একটু ভাববার ভঙ্গি পড়ে তারপরও বলতে শুরু করল____
ও হ্যাঁ আমি একটা মেয়ে হয়ে কি করে তোমার সাথে এমন করতে পারলাম তাই তো? তাহলে তুমি একটা মেয়ে হয়ে সেইদিন আরেকটি মেয়ের পরনের কাপড় কি করে ছিঁড়ে ফেলতে পারলে? সেখানে একটি মেয়ের মানহানির বিষয়। আমি তো কেবল তোমার চুলে চুইংগাম লাগিয়েছি। তুমি চাইলেই চুল কেটে ফেলতে পারো। নিউ স্টাইল হয়ে যাবে তোমার জন্য। কিন্তু একবারও সেই মেয়েটির কথা ভেবে দেখেছো? অন্ধকার রুমে বন্দি থাকার জন্য সেই মেয়েটি কি অবস্থা হতে পারতো? তার পরনের কাপড় যে তুমি ছিঁড়ে ফেললে সে কি করে মানুষের সামনে যেত? সবাই তো তাকে নিয়ে মজা করত। তখন তুমি একবারও ভাবোনি যে তুমি একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সাথে কি করে কাজটি করতে পারছো? তখন তোমার মনে এই প্রশ্ন আসেনি? অথচ আজ নিজের জন্য ঠিকই প্রশ্ন করছো বাহ্ বাহ্।

আর যদি বল যে লোকো লজ্জার কথা তাহলে সবার আগে তো তুমি একজন মুসলিম তাই না? তাহলে আল্লাহর ভয় নেই তোমার? এই সব পোশাক পরে আসো কখনো এইটা মনে হয় না যে আল্লাহর সামনে কি করে দাঁড়াবে? তখন লজ্জা কোথায় যাবে তোমার? অথচ এখন মানুষের সামনে স্টাইল করতে পারবেনা দেখে তার চিন্তা করছো তুমি। আরে তোমার তো আমাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। কারণ আমি তোমার চুলে চুইংগাম লাগিয়েছি ফলস্বরূপ এখন তোমাকে তোমার চুল কাটতে হবে। আর চুলের কাটা এখন সুন্দর হবে না কারণ চুইংগাম একেক জায়গায় লেগেছে। তাই এখন তুমি চুল খোলা রেখে আসতেও পারবেনা। তখন তোমাকে না হয় উইগ পড়তে হবে আর না হয় হিজাব পড়তে হবে। কিন্তু আমি পরামর্শ দেবো তোমাকে হিজাব পরার।

তোমার নিজের চুল কভার করা হবে আবার সোয়াব না কমাতে পারলেও পাপ কামানোর কিছুটা বন্ধ হবে। একটা কথা কান হলে খুব শুনে রাখো নিজেকে পর্দার মাঝে রেখে আল্লাহকে সন্তুষ্টি না করতে পারলেও যাইহোক নিজেকে বেপর্দায় রেখে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করো না। স্বাভাবিক থাকো, নিজেকে বেশি খোলামেলা করো না তাহলেই তো হয়। এসব কথা তোমাকে বলে অবশ্য লাভ নেই তবুও বললাম। আর হ্যাঁ আরেকটা কথা ভুলেও আমার সাথে পাঙ্গা নেওয়ার চেষ্টা করবে না। তোমার জীবন নড়ক বানাতে এই নীলা মির্জা দ্বিতীয়বার ভাববে না। বেশি উড়লে বলে তোমার চুল কাটতে বাধ্য করেছি। আরো বেশি বাড়াবাড়ি করলে হাত পা কেটে বসিয়ে রাখবো। তখন আমিও দেখবো কি করে তুমি বেশি উড়ো।

তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটি স্কার্ফ বের করে লিসার মুখের উপর ছুড়ে মেরে বলল____
এইটা পড়ে বাড়ি ফিরে যাও। আমি তোমার মত অসভ্য, নির্লজ্জ না যে আরেকটা মেয়ে সম্মানের কথা ভাববো না।
বলেই গট গট করে সেই জায়গা ত্যাগ করল নীলা।মিহালের ঠোঁটের স্মিত হাসি ফুটে উঠল।সে একা একাই হেসে বলল______

ওয়াহ্ কি লীলা দেখাইলা,
নীলা রানী।
নীলাঞ্জন তো নিক নেম দিয়েছিলাম বটে,
কিন্তু আজ থেকে তুমি আমার ঝাঁসি কি রানী ।
মিহাল একা একাই হাসলো কতক্ষণ। তারপর কিছু একটা মনে পড়তেই তার টনক নড়ে উঠলো। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্থান থেকে উঠে পরল। এবং মনে মনে বলল____
ডোন্ট ওয়ারী নীলাঞ্জনা, আমি তো আছি তাই না? তুমি ক্রাইম করবে এবং আমি তার প্রমাণ মুছে ফেলব।
একা একা কথাগুলো বলেই সে ফুটেজ রুমের দিকে পা বাড়ালো। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা এখন কম্পিউটার থেকে তাকে ডিলিট করতে হবে। একদম সকল প্রমাণ মুছে ফেলতে হবে। সে চায়না নীলা কোন ঝামেলায় পরুক।

ইকরা কাউন্টারে থাকা মেয়েটিকে বারবার রিকোয়েস্ট করছে যাতে ডাক্তার মুনভির সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু মেয়েটি একটা কথাই বলে যাচ্ছে ____
গতকাল রাতে ডাক্তার মুনভি নাকি নাইট ডিউটি করেছিল। এবং ডিউটি করে চার ঘন্টা আগে ঘুমিয়েছে। এখন আর যাই হোক তাকে জানানো সম্ভব না।
কিন্তু ইকরার কাছে কথাটি সত্য লাগলো না। সে ভাবছে হয়তো তাকে মিথ্যে বলা হচ্ছে। বেশি কিছু না ভেবে নিজের ফোন দিয়ে করল এবং মুনভির দেওয়া কার্ড থেকে নাম্বার উঠিয়ে ফোন লাগালো।

মুনভি নিজের ক্যাবিনের সোফায় ঘুমিয়ে ছিল। ফোনে অবশ্য এলার্ম সেট করা ছিল। ২ ঘণ্টা পর এমনিতেই এলার্ম বাজতো। তার গভীর ঘুম ভেঙে গেল ফোনের বিকট রিংটোনে শব্দে। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে হাত বাড়িয়ে সোফার পাশে থাকা ছোট্ট টেবিল থেকে নিজের ফোন হাতে নিল। মুখে মুখে তার বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। ভীষণ বিরক্ত বোধ করেছে তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য। এবং যে ব্যক্তিটি তার ঘুমের হাত ঘটিয়েছে তার ওপরও সে ভীষণ চটে আছে। ঘুম জড়ানো কন্ঠে ফোন রিসিভ করে রাগ দেখিয়ে যেই না কিছু বলতে নিবে অমনি অপর পাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠ শুনে তার চোখের ঘুম উধাও হয়ে গেল। তার কটন ক্যান্ডি তাকে ফোন করেছে। এই মেয়েটির নিঃশ্বাসে শব্দ যেন তার চিনতে অসুবিধা হবে না। সেই জায়গায় তো মেয়েটি নিজ মুখে জিজ্ঞেস করছে__

ডাঃ মুনভি? পুরো একটি শব্দ বলেছে মেয়েটি । মুনভি কি করে না চিনে থাকতে পারে নিজের কটন ক্যান্ডি কে।সে শোয়া থেকে উঠে বসলো এবং ফোন কানের কাছ থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গলা পরিষ্কার করে আবার বলতে শুরু করল___
হ্যাঁ আমি ডাক্তার মুনভি।
ইকরার ঠোঁটে হাসির ঝলক ফুটে উঠল। সে কাউন্টারে থাকা মেয়েটির নামে নালিশ করতে করতে বলল___
আমি জানতাম আপনি আমার ফোন ধরবেন। আপনাদের কাউন্টারে এইসব কোন বাচ্চাদেরকে রেখেছেন? এত করে বললাম যে আপনি আমাকে বলেছেন আপনার সাথে দেখা করতে আমাকে যেন একটু দেখা করিয়ে দেয় আপনার সাথে। কিন্তু এই মেয়েটি মানতেই চাইছে না বলছে আপনি নাকি ঘুমিয়ে আছেন? ও আচ্ছা আপনি কি সত্যিই ঘুমিয়ে আছেন? আমি কি আপনার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালাম ডাক্তার ?
শেষের কথাটা ইকরা একটু মিনমিন করে বলল। মুনভি ঠোঁট

কামড়ে ভেসে উঠল। মেয়েটা নিজেই বাচ্চাদের মতো নালিশ করছে আরেকজনের নামে। অথচ আরেকজনকেই বাচ্চা বলছে। আর সে যদি এখন মেয়েটিকে বলে যে সে ঘুমিয়ে ছিল এবং ফোনের রিংটোনের শব্দে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছে তাহলে মেয়েটি নিশ্চিত অপরাধবোধ করবে। তাই স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো____
আসলে মানুষ এসে বিরক্ত করে তো তাই তাদেরকে বলা হয়েছে কেউ এসে জিজ্ঞেস করলে যাতে এই কথা বলে। আমি তার তরফ থেকে তোমার কাছে মাফ চেয়ে নিচ্ছি। আর আমি কাউন্টারে কল করে বলে দিচ্ছি যাতে তোমাকে আমার ক্যাবিনে নিয়ে আসে। এখানে আসো তারপর কথা বলছি।

ইকরা হুম বলে ফোন কেটে দিল।মুনভি কাউন্টারে কল দিয়ে বলল ইকারা কে যেন তার কেবিনে নিয়ে আসে। তারপর তাড়াতাড়ি সোফা থেকে উঠে সোফা গুছিয়ে নিলো। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে আসলো যাতে তাকে দেখে ইকরা বুঝতে না পারে যে সে ঘুমিয়ে ছিল। ইকরা আসার আগে সে একদম ফ্রেশ হয়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়ল। এমন ভাব নিয়ে বসেছে যেন সে জেগেই ছিল এবং খুব ব্যস্ত নিজের কাজে।
ইকরা দরজা নক করতেই মুনভি চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে পরলো। ইচ্ছে করলেও দৌড় দিয়ে দরজা খুলে মেয়েটিকে সম্মান দিয়ে তার কেবিনে আনতে। কিন্তু সব সময় সব ইচ্ছে পূরণ করা যায় না। তাই আবার নিজের চেয়ারে বসে মুখে গম্ভীর ভাব আমার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে গেল। এবং গম্ভীর কন্ঠে দরজার ওপর পাশে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিকে আসতে বলল ।

ইকরা মুখ ভরা হাসি নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল। আর এক হাতে একটি গোলাপ ফুল আর দুইটা কটন ক্যান্ডি। আরেক হাতে আরো দুইটা কটন ক্যান্ডি।
মুনভি দাঁড়িয়ে ইকরার সাথে কুশল বিনিময় করলো। তার তো ইচ্ছে করছে খুশিতে পুরো হসপিটালে মিষ্টি বিতরণ করতে।
ইকরা মুনভির দিকে গোলাপি রঙের গোলাপ ফুলটি মুনভি দিকে এগিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল____

আপনি আমার অনেক বড় উপকার করেছেন। আপনাকে যত ধন্যবাদ দেব ততই কম পরে যাবে। আর শুধু মুখে ধন্যবাদ দিতে অদ্ভুত লাগছিল তাই এই ছোট্ট উপহার আপনার জন্য আনলাম। আসলে কখনো কাউকে ফুল দেইনি তাই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি যে কি ফুল আনব অথবা কি রঙের ফুল আনব। তাই আমার যেটা পছন্দ হলো সেটাই নিয়ে আসলাম আপনার জন্য।

মুনভির ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। প্রথম কোন মেয়ে তাকে ফুল দিচ্ছে। তাও আবার নিজের ভালোবাসার মানুষের কাজ থেকে ফুল পাবার অনুভূতি একদম ভিন্ন। মুনভি এই মুহূর্তে পুরোপুরি নিজের অনুভূতি সম্পর্কে জানতে পারবো। আসলেই সে তার কটন ক্যান্ডি কে ভালোবেসে ফেলেছে।সে হাসি মুখে ইকরার কাছ থেকে গোলাপ ফুল দিয়ে নিল। মুখ দিয়ে তার শব্দ বের হচ্ছে না। তবুও অনেক কষ্টে ছোট্ট একটি থ্যাঙ্ক ইউ দিল। এর থেকে বেশি কিছু বলতে পারল না। ইকরা এইবার তার দিকে কটন ক্যান্ডি বাড়িয়ে দিয়ে বলল____
আমার কটন ক্যান্ডি খুব পছন্দ। নিজের জন্য নিয়েছিলাম ভাবলাম আপনার জন্য নিয়ে আসি। যদি আপনি খেতে পছন্দ করেন তাহলে এই দুটো নিতে পারেন আপনার জন্যই আনা।
মুনভির আর অনুভূতি দমিয়ে রাখতে পারল না। ঠোঁটে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটল। সে বাচ্চাদের মতো উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠলো ____

আই লাভ কটন ক্যান্ডি। এইটা আমার খুব পছন্দের। থ্যাংক ইউ সো মাচ।
ইকরা হেসে উঠলো। লোকটা নিতান্তই একজন জেন্টালম্যান। তার বেশ ভালো লাগলো লোকটি সাথে কথা বলে। তারা দুজন মিলে কথা বলতে লাগলো আর কটন ক্যান্ডি খেতে লাগলো। ইকরা কথা বলছে আর মুখই তাকে দেখে যাচ্ছে এবং কটন ক্যান্ডি খাচ্ছে। এবং মনে মনে বলছে____

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৭

বিয়ের আগে অর্থাৎ আজকে তোমার দেওয়া কটন ক্যান্ডি খাচ্ছি বিয়ের পরে,,,,
মুনভি ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠলো নিজের মনে মনে বলা কথাগুলো দেখে।
অথচ সে যে গত সারারাত জেগে ছিল এখন তো আর ঘুমোনোর প্রয়োজন সেই দিকে তার একটু চিন্তা নেই। সে এখন নিজের কটন ক্যান্ডির সাথে সময় কাটাতে ব্যস্ত।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৯

1 COMMENT

Comments are closed.