Home নূর এ সাহাবাদ নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬২

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬২

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬২
জান্নাতুল ফেরদৌ

সারা রাত মহলে ফেরে নি সুনেহেরা। দুর্গের সবাই বেশ চিন্তিত। চারিদিকে অঙ্কুরের লোক ক্ষ্যাপা কুত্তা হয়ে আছে। এর মধ্যে কোথায় গেল সুনেহেরা। ভোরের আলো ফুটার পর পাহাড়ের পাদদেশে তাজা সবজি সংগ্রহ করতে যায় কয়েকজন নারী সৈনিক। রাতের শিশিরে ঘাসগুলো ভিজে আছে। নদীর পাড় জুড়ে হালকা কুয়াশা। এদিকে লোকজন আসে না বললেই চলে। সারা বছর জনমানব হীন থাকে পাহাড়ের এই পৃষ্ঠ। বেতের ঝুড়ি নিয়ে ৬ জন নারী সবজি তুলছে। পাহাড়ি সবজি। তাদের জালে একটা বন্য মুরগিও ধরা পড়েছে। মুরগিটাকেও ছাড়িয়ে থলিতে ভরে নিল।
হঠাউ একজন দেখলো দূরে নদীর ধারের বালুচরে একটা মানুষ পড়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিল কোনো মৃতদেহ। সাম্প্রতিক সময়ে এত যুদ্ধ, এত রক্তপাত হয়েছে যে এমন দৃশ্য নতুন কিছু নয়। কেউ ভ্রুক্ষেপ করলো না কিন্তু সলযে প্রথমে দেখেছে সে সবাইকে বলল

“এই এই। চুল গুলো সোনালি লাগছে না লাশ টার? দ্যাখ ভালো করে তোরা”
আরও কাছে যেতেই একজন চমকে উঠলো।
“শাহজাদি!”
বালুর ওপর অচেতন হয়ে পড়ে আছে সুনেহেরা।
চুল গুলো এলোমেলো। কাপড় ধুলো আর কাদায় মাখামাখি। হাতের চামড়াও কয়েক জায়গায় ছড়ে গেছে। মনে হচ্ছে রাতভর সে এভাবেই পড়ে ছিল।
একজন সৈনিক দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসল। নাড়ি পরীক্ষা করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
“বেঁচে আছেন। বেচে আছে রে। তাড়াতাড়ি তোল ওনাকে”
সঙ্গে সঙ্গে তাকে তুলে ঘোড়ায় বসানো হলো।
দুই পাশ থেকে ধরে রাখা হলো যাতে পড়ে না যায়। তারপর দ্রুত রওনা দিল সবাই। কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছালো জঙ্গলের অন্তরালে থাকা সেই প্রশিক্ষণ দুর্গে। সুনেহেরাকে নিয়ে যাওয়া হলো সবচেয়ে উঁচু কক্ষটায়। সেখানে হেকিম থাকে। সকাল কেটে দুপুর চলে এলো। তবুও জ্ঞান ফিরলো না মেয়ে টার। নারী সৈনিকদের মুখেও উদ্বেগ। কারও সাহস হচ্ছে না বেশি প্রশ্ন করার।
মোটামুটি সবাই জানে, গত রাতে সে মাহাদির খোঁজে বের হয়েছিল। অবশেষে বেলা গড়িয়ে যখন বিকেলের দিকে সূর্যের আলো জানালার গরাদ ছুঁয়ে ঘরে ঢুকছে, সুনেহেরার চোখের পাতা খুলল। চারপাশে অপরিচিত মুখ। ঘর টাও অচেনা। হেকিম মাথায় হাত দিয়ে ডাকলো

“শাহজাদি? আপনি শুনতে পাচ্ছেন?”
সুনেহেরা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। গত রাতের স্মৃতিগুলো একে একে মনে পড়তে লাগল। তার পাথর মানব আর নেই। সে ও নরপিশাচ দের দলে নাম লিখিয়েছিল। নিজের জমিদার কে হত্যা করেছে। তার ভালোবাসা কে ছুরিকাহত করে হত্যা করেছে।
সুনেহেরার বুকের ভেতর ও যেন কেউ ছুরি ঘুরিয়ে দিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তার চোখ দিয়ে পানি এক ফোটাও বের হলো না। হেকিম আবার ডাকল
“শাহজাদি? কিছু বলুন।”
সুনেহেরা যেন শুনছেই না। তার চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে মাহাদির মুখ টা। খুব কম দেখা হয়েছে ওই মুখটা। মাঝেমধ্যে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে হতো। কিন্তু লজ্জায় বলতে পারতো না বর্ম খুলুন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। সুনেহেরা একইভাবে বসে আছে। কারও সাথে কথা বলছে না। মনে হচ্ছে তার ভেতরের সব শব্দ মরে গেছে।

আর কাঁদছে না। শুধু পাথরের মতো বসে আছে।
শেষ মুহূর্তেও মাহাদি তার দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিল। এ দৃশ্য কি আর শাহজাদি এত সহজে ভুলতে পারবে? মাহাদির হাসি দেখতে কত পাগলামিই না করেছে সে। লোকটা হাসতো কম। বুকের ভেতর টা মোচড় দিল। শত চেষ্টা করেও আর হাসাতে পারবে না মাহাদি কে। ওই মুখটা আর কখনো দেখা হবে না এ জীবনে।
চন্দ্রা সারারাত একটুও ঘুমাতে পারে নি। চোখ বন্ধ করলেই অরণ্যর মুখটা ভেসে উঠছে। গোটা রাত নির্ঘুম কাটানোর পর সকাল হলেও তার বুকের ধুকপুকানি কমলো না। আবিদ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে কী হয়েছে। চন্দ্রা প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে। বলেছে অন্ধকারে কাউকে দেখে ভয় পেয়েছিল। এর বেশি কিছু না। এ বিষয়ে জানাজানি হলে কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেড়িয়ে যাওয়ার হবে। সেই ঝুঁকি চন্দ্রা নেবেই না। বহু কষ্টে এদের বিশ্বাস অর্জন করেছে। কোনো রকম বোকামি করা যাবে না। আয়নার সামনে বসে নিজের মুখের দিকে তাকালো চন্দ্রা। মুখটা ফ্যাকাশে চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে এক রাতে। গলার দাগও এখনও দেখা যাচ্ছে। বহু বছর আগের চাপা পড়ে থাকা কবরটা যেন হঠাৎ খুলে গেছে। যে অতীতকে সে মৃত ভেবেছিল, সেটাই আবার ফিরে এসেছে। এমন অসম্ভব কি করে সম্ভব হলো। বিষয়টা নিয়ে অঙ্কুরের সাথে কথা বলতে হবে।

কারণ ১৫ বছর আগে যা ঘটেছিল, তা মারজান এর পরিকল্পিত হলেও তাদের একজন ছিল চন্দ্রা নিজে। তখন সে এই পরিবারের অংশ ছিল না।
সেই সময় মারজানের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।
গোপনে। রুবায়েত এর সঙ্গে বাইজিদ এর বিয়ে, সে রাতেই অরণ্যের অঘটন। সব ছিল তাদের পরিকল্পিত। মূলত রত্নার চিকিৎসার অযুহাতে চিকিৎসা বিজ্ঞানী দের রাজ্যে ঢোকানোই ছিল তাদের নিগুঢ় রহস্য। এই মরণ খেলার প্রত্যেকটি খেলোয়াড় বাইজিদ এর আপন সেজে খেলেছে।
আর চন্দ্রারও তখন এ পরিবারে ঢুকতে হতো।
সরাসরি এই জমিদার পরিবারে প্রবেশ করা তার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু ভেতরে একবার ঢুকতে পারলে অনেক কিছু সম্ভব। সে ভালো করেই জানতো, বাইজিদের মতো মানুষ তাকে কোনো দিন স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবে না। সেটা সে প্রথম দেখাতেই বুঝেছিল। তাই অন্য পথ বেছে নিল।

অন্ধকার, নোংরা পথ। রত্না কে মেরে সে বাইজিদ এর নিকট ভালো সাজতে রত্না সাজলো। দেখালো একদল আসামী কে। তাদের শাস্তি দিতে রত্না কে আনা প্রয়োজন। রত্না নিজে সাক্ষী দিলে তবেই বিচার হবে। একদিকে সে নিজে এই পরিবারে ঢুকলো আরেকদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানী দের নিয়ে ঘাটি করলো উত্তর প্রাসাদে। বোনের মৃত্যু তে বাইজিদ এী মস্তিষ্ক তখন আওলা ঝাওলা। সেই সুযোগ টাই নিল এরা। তবে রত্নার আত্মহত্যার পর তাদের একটা গোপন পরামর্শের দরকার পরেছিল। ফাঁকা জায়গা বলতে কারাগার ই শ্রেয়। তাই কারাগারেই শলা পরামর্শ করে নেয়। সেসব শুনেছিল অরণ্য। নিজের মৃত্যুর আগে শুনলো প্রেয়সীর শোক সংবাদ। কি নিদারুণ যন্ত্রণা নিয়ে মারা গেছিল ছেলেটা।

চন্দ্রা দুই হাতে মাথা চেপে ধরলো। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। না। এটা হতে পারে না।
সে নিজের চোখে দেখেছিল অরণ্যকে মৃত্যুর পর দাফন করা হয়েছে। সেখান থেকে ফিরল কি করে? তাহলে গতরাতে সে কাকে দেখলো? ভূত? না। ভূতে সে বিশ্বাস করে না। কিন্তু যদি সত্যিই অরণ্য বেঁচে থাকে? তাহলে সব শেষ, সব।
চন্দ্রার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠলো।
শীতের মধ্যেও তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। অরণ্য যদি ফিরে এসে থাকে… তবে সে প্রতিশোধ নিতেই ফিরেছে। আর তার প্রথম লক্ষ্য কে হবে? সেটা আন্দাজ করতে চন্দ্রার এক মুহূর্তও লাগলো না।

বাকের শাহ্‌র মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো সাহাবাদ যেন শোকে ডুবে গেছে। রাজ্যবাসী চেয়ে বাইজিদ এর পানে। সে যদি এখন সুদিন ফেরাতে পারে। অঙ্কুর রাজ্য টাকে শেষ করে দিচ্ছে। সাহাবাদ এর সূর্য বুঝি এই অস্তিমিত যায়। প্রশিক্ষণ দুর্গের ভেতরও সেই একই পরিবেশ।
কারও মুখে হাসি নেই। নারী সৈনিকেরা কালো কাপড় বেঁধেছে বাহুতে। এটা নাকি মিশরের শোক পালনের রীতি। সন্ধ্যায় কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে। কিন্তু বাইজিদ কে দেখে মেহেরুন্নেসার অদ্ভুত লাগছিল। দুই দিন ধরে মেহেরুন্নেসা তাকে লক্ষ্য করছে। সে আগের মতোই আচরণ করছে।
অবশেষে আজ বিকেলে মেহেরুন্নেসা আর থাকতে না পেরে বললো,
“আপনি কি একটুও কষ্ট পাচ্ছেন না?”
বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বললো,
“আমার সঙ্গে চলো।”

আর কোনো ব্যাখ্যা দিল না। মেহেরুন্নেসা তার পিছু পিছু বেরিয়ে এলো। দুর্গের মূল অংশ পেরিয়ে তারা জঙ্গলের দিকের সরু পথ ধরলো। পথটা খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। আগাছা জন্মেছে। শুকনো পাতায় ঢেকে আছে মাটি। হাঁটতে হাঁটতে তারা দুর্গের পেছনের আরও নির্জন অংশে পৌঁছালো।
চারপাশে বিশাল গাছ। সূর্যের আলোও ঠিকমতো ঢুকতে পারে না। বাইজিদ থামলো। মেহেরুন্নেসা সামনে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। দুটি কবর পাশাপাশি। খুব যত্ন করে বানানো। একটার শিলালিপিতে লেখা রত্নপ্রভা অন্যটাতে অরণ্য শাহ্।
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
আশ্চর্য হয়ে বললো,
“এটা…এটা কী?”
বাইজিদ নিচু হয়ে কবর দুটোর ওপর জমে থাকা শুকনো পাতা সরিয়ে দিল। মনে হলো বহুবার এমন করেছে সে। তারপর শান্ত গলায় বললো,
“এটাই তাদের প্রকৃত কবর।”
মেহেরুন্নেসা হতবাক।

“কিন্তু…মহলে তো কবর আছে! যেখানে সবাই যায়! যেখানে দোয়া পড়ে! যদিও সেখানে একটা কবর। শুধু অরণ্যের”
বাইজিদ মাথা তুললো। তার চোখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি।
“হ্যাঁ জানি। তবে মহলের কবরগুলো লোক দেখানো। মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
“কীইইই? কবর কী করে লোক দেখানো হয় শাহজাদা?”
“অরণ্য কে আব্বা মহলে কবর দিতে দেয় নি। আর রত্না কে তো সরিয়ে আনা হয়েছিল। কোনো ধর্ষ’কের কবর জমিদার গোরস্তানে হবে না বলেছিল হা হা। জানো মেহের ওরা খুব ভাগ্য বান। প্রেমিক প্রেমিকা একদিনে মৃত্যু বরণ করা কিন্তু সহজ কথা নয়”
মেহেরুন্নেসা শ্যাওলা পড়া পাথরের ফলকের দিকে তাকিয়ে বলল
“ওরা দুজন পরাজিত প্রেমিক প্রেমিকা। যারা নিয়তির কাছে হেরে গেছে”
বাইজিদ বুকে হাত গুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“ভুল বললে নূর। ভালোবাসা কখনো পরাজয় মানে না”
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগলো। হঠাৎ তার মাথায় একটা প্রশ্ন এলো। তাদের ভালোবাসা ও তো কত ঝড় তুফান পেরিয়ে এখন এই ওবদি এসেছে। বাইজিদ এর দিকে তাকিয়ে বলল
“শেষ বয়সে আমাদেরও এমন এক জোড়া কবর হোক। আপনি আর আমি গত হই এক দিনে।”
বাইজিদ চোখ সরু করে তাকালো

“এমনটা কেন বলছো? মরার শখ জাগল বুঝি”
“শাহজাদা! আমি আগে মারা গেলে কখনো আপনি আমায় ভুলে যাবেন না তো?”
বাইজিদ কিছু ভাবার ভঙ্গিতে ভ্রু কুচকে মেহেরুন্নেসার কাধে হাত রেখে বলল
“ইহকালে যদি কোনোদিন তুমি তোমার হৃদয় থেকে আমার নাম মুছতে পারো….!
সেদিন আমিও তোমায় ভুলে যাবো, যদি পারো চেষ্টা করো”

সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে লালচে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশে। জঙ্গলের গাছগুলোকে দূর থেকে কালো ছায়ার মতো লাগছে। সুনেহেরা ছটফট করছে প্রশিক্ষণ দুর্গে বসে। একজন নারী সৈনিকের মুখে সে শুনেছে, ভোরে কিছু সৈনিক গিয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে মাহাদির দেহ নিয়ে এসেছে। তারপর কোথায় নেওয়া হয়েছে কেউ জানে না।
শেঅ মূহূর্তে মাহাদি তাকে একটা বুনো গোলাপ দিয়েছিল। পাহাড়ের গায়ে জন্মানো লাল সুবাসিত একটা গোলাপ। তখন রাগে রাগে, ঘৃণায়, ক্রোধে সে ফুলটার দিকেও তাকায়নি। অথচ এমন ফুল দিয়ে ভালোবাসা জানানোর জন্য কত বায়না ই না করেছে মাহাদির কাছে। তার দেওয়া ফুলটা অবহেলায় ফেলে আসলেও এখন মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস সেটাই।

উঠে দাঁড়ালো সে। কাউকে কিছু না বলে দুর্গ থেকে বেরিয়ে গেল। জঙ্গলের পথটা সে চিনে ফেলেছে। কয়েকদিন আগেও এই পথ দিয়েই এসেছিল। পথে শুকনো পাতার ওপর পা পড়ছে।
খসখস শব্দ হচ্ছে। দূরে পাখিরা শেষবারের মতো ডেকে বাসায় ফিরছে। সুনেহেরা দ্রুত হাঁটতে লাগলো। প্রায় দৌড়াতে শুরু করলো। খানিকটা দৌড়ে সামনে দেখা দিল সেই পাহাড়। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো তার। কষ্ট করে ঢাল বেয়ে উঠতে লাগলো সে। চূড়ায় উঠে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে। ওপরে সবসময়ই একটু বেশি হাওয়া বয়। চুলগুলো উড়তে লাগলো। ওড়নাও বারবার কাঁধ থেকে সরে যাচ্ছে। অবশেষে চূড়ায় পৌঁছালো তাহলে। চারপাশে ফুরফুরে বাতাস। নিচে বিশাল নদী। দূরে সূর্যের শেষ আলো। সুনেহেরা চারপাশে খুঁজতে লাগলো। তার বুক ধুকপুক করছে। যদি না পায়? সত্যিই হারিয়ে গেল নাকি?
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা পাথরের পাশে। সেখানে পড়ে আছে একটা বুনো গোলাপ। এখনও শুকিয়ে যায়নি পুরোপুরি।
সুনেহেরা এগিয়ে গেল ফুলটার দিকে। হাঁটু গেড়ে বসলো। কাঁপা কাঁপা হাতে ফুলটা তুলে নিল।
কি এক যন্ত্রণা তাকে আকড়ে ধরলো। কলিজায় রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
সুনেহেরা ফুলটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরলো। আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। ফুলটা বুকে চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।

“সুনেরাহ”
সুনেহেরা চমকে উঠলো। দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ। সন্ধ্যার আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু অবয়বেই সে টের পেল। সুনেহেরা দ্রুত চোখ মুছে নিল। কিছু বলবে বুঝতে পারছে না। বাইজিদ সামনে এগিয়ে এলো। তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো সুনেহেরার হাতে ধরা গোলাপটার ওপর। কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথা বললো না। তারপর খুব শান্ত গলায় বললো
“এত কাঁদছিস কেন?”
সুনেহেরার বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠলো। হাত থেকে প্রায় গোলাপটা পড়ে যাচ্ছিল। সুনেহেরা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। তার হাতের মুঠোয় ধরা গোলাপটা কাঁপছে। বাতাসে চুল উড়ছে। বাইজিদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গম্ভীর কন্ঠে বলল
“মেরে দিলি আমার বন্ধুকে।?”
সুনেহেরার বুক ধক করে উঠলো। চোখ ভিজে গেল।

“ভাইজান…”
বাইজিদ হাত তুলে থামিয়ে দিল।
“জানিস গত রাতে আমি একটা গোপন সুড়ঙ্গের খোঁজে গেছিলাম। বহুদিন ধরে যার সন্ধান করছিলাম। সেখানে মাহাদির সাথে দেখা হয় আমার।”
সুনেহেরা চমকে উঠলো। বাইজিদ দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে বললো,
“ও জানতো তুই আসবি।”
সুনেহেরা ফিসফিস করে বললো,
“কিভাবে?”
“কেউ খবর দিয়েছিল ওকে। রাতে তুই এই পাহাড়ে আসবি ওর সাথে দেখা করতে।”
সুনেহেরা স্থির হয়ে গেল। বাইজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“কি ছটফটেই না লাগছিল রে তাকে। ভালেবাসার কি শক্তি বল। ওমন গম্ভীর মানুষ টাও একটা হাঁটুর বয়সী মেয়েকে একটা বার দেখার জন্য ছটফট করছিল”
সুনেহেরার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। বাইজিদ এবার তার হাতে ধরা গোলাপটার দিকে তাকালো।

“এই ফুলটা চিনিস?”
সুনেহেরা কাঁপা গলায় বললো,
“মাহাদি দিয়েছিল…”
বাইজিদ ম্লান হেসে বললো
“এই ফুলের জন্য আধা রাত জঙ্গলে ঘুরেছে পাগলটা”।
সুনেহেরা অবিশ্বাস নিয়ে তাকালো। বাইজিদ বললো,
“পাহাড়ের ঢালু পাশের যে কাঁটাবন আছে। সেখান থেকে তুলেছে এই ভিন্ন প্রজাতির গোলাপ। এই জাতের গোলাপ খুব কম জন্মায়। বছরে একটা দুটো ফুটলেও ভাগ্যের জোরেই যায়। এই ফুলের বিশেষত্ব কি জানিস? শুকানোর পর বেশ মজবুত থাকে। পচে নরম হয়ে যা না। আজীবন সংগ্রহ করে রাখা যায়। অনেকে অলংকার করেও পরে”
সুনেহেরার গলা আটকে এলো। বাইজিদ আবার বলল
“ও বলছিল, শাহজাদি ফুল ভালোবাসে। কখনো কিছু দিই না। আজকে গেলে খালি হাতে যাওয়া যাবে না।”
এবার সুনেহেরা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না।
ধপ করে বসে পড়লো মাটিতে। বাইজিদ নিচু স্বরে বললো,

“জানিস সবচেয়ে কষ্টের কথা কী?”
সুনেহেরা মাথা তুললো না।
“শেষবার যখন ওর সাথে দেখা হয়েছিল…ও একবারও নিজের কথা বলেনি। চারবার জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি ঠিক আঋো তো? কিন্তু ও শুধু তোর কথা বলেছে।”
বাইজিদ আকাশের দিকে তাকালো।
“আমার মনে হয় না পৃথিবীতে কেউ কখনো তোকে মাহাদির মতো ভালোবেসেছে।”
সুনেহেরা এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
গোলাপটা বুকের সাথে চেপে ধরে। কাঁদতে কাঁদতেই বলল

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬১

“ও নরপিশাচ দের দলে যোগ দিয়েছিল। ও আমাকে এতিম করেছে। আমার আব্বাকে হত্যা করেছে। আর কারও ক্ষতি করার আগে ওকেই শেষ করে দিয়েছি। যাকে হত্যা করেছি, সেই মাহাদি কে আমি ভালোবাসিনি। আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম, সে ন্যায়পরাণ যোদ্ধা ছিল। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতো না। আর এই মাহাদি নিজের মালিক কে হত্যা করেছে। আমার আব্বা…”
সুনেহেরার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইজিদ ধমকে উঠলো
“কি তখন থেকে আব্বা আব্বা করছিস হ্যা? আমি আদেশ দিয়েছিলাম মাহাদি কে বাকের শাহ্ কে খু”ন করতে”

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here