আমার আলাদিন পর্ব ৩৭
জাবিন ফোরকান
ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছলে মানুষ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত প্রাণটি কেড়ে নেয়ার চিন্তাভাবনা করতে পারে ইরামের জানা নেই। সে এই বিষয়টির ঘোর বিরোধী। জীবনে এমন কোনো সমস্যা থাকা সম্ভব নয়, যার জন্য নিজেকে শেষ করে দিতে হয়। থাকলে সে নিজেও কবেই শেষ হয়ে যেত! আদতে নিজের প্রাণ ধ্বংস করা মানুষগুলো কি জিতে যায় নাকি হেরে যায়?
তিতলির কথা শুনে এমন হাজারো চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল ইরামের মাথায়। দুহাতে মুখ চেপে তার সামনে কাঁদছে মেয়েটি। সাইবান? অমন শক্ত একটা ছেলের সঙ্গে সু*ইসাইড বিষয়টা কি আদৌ মানানসই? কিন্তু, গভীরভাবে ভাবলেই অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়। সেই মায়াবী, বোঝদার, স্বপ্নীল ছেলেটার হঠাৎ এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠা, দায়িত্ব ভুলে বাউন্ডুলে জীবন বরণ করে নেয়া, এসব কি এমনি এমনি হয়েছে? মাঝখানের অনেকগুলো বছর ইরামের অজানা। কি হয়েছিল সেই সময়টায়, যখন সে সাইবানের পাশে ছিলনা? এতটাই দূর্বিষহ হয়ে গিয়েছিল সবকিছু, যে এর চাইতে মৃত্যুকে আগলে নেয়া সহজ মনে হয়েছিল ছেলেটার কাছে?
“তিতলি!”
হঠাৎ চাপা গর্জনে ইরাম চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলো। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল দাঁড়িয়ে আছে অনুরাগ। চেহারায় অসম্ভব একটা ক্রোধ। এই ছেলেকে এমনভাবে রেগে যেতে এই প্রথম দেখল সে। হনহন করে এগিয়ে এসে খপ করে তিতলির কব্জি আঁকড়ে ধরল সাইবানের সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি।
অনুরাগের চোখ থেকে আজ ঘুম বিদায় নিয়েছে। সাইবান বেশ কিছুক্ষণ বাদে ঘুমিয়ে পড়লেও তার আর ঘুম হয়নি। চুপ করে শুয়ে ছিল। তখনি দুই তলা থেকে নিঃশব্দে তিতলিকে নেমে আসতে লক্ষ্য করেছে সে। কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ মেয়েটি কেবিনের বাইরে চলে গিয়েছিল। অনুরাগ ভেবেছিল, হয়ত তার মতোই ঘুম আসছেনা বিধায় বাইরে বাতাস খেতে গিয়েছে। কিন্তু বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তিতলি না ফেরায় সে আর শুয়ে থাকতে পারেনি। ধীরেসুস্থে উঠে বাইরে এসেছে। করিডোর ধরে এগোনোর কিছুক্ষণ পরেই কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলা তিতলির কথাগুলো কানে গিয়েছে তার।
“তোর মাতলামি করা ছুটিয়ে দেব আজকে আমি। এক্ষুণি তোর বাবাকে ফোন করছি। বরিশালের ঘাটে পা দিয়ে মাত্র ফিরতি লঞ্চে তোকে যদি ঢাকা ফেরত না পাঠিয়েছি…!”
দাঁত কিড়মিড় করল অনুরাগ। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল তিতলি,
“হ্যাঁ। সব তো আমারই দোষ। তোরা শুধু আমাকেই পাস বলির পাঠা বানাতে। আমিই ভিলেন, আমিই কুটনি। তোরা বাকি সবাই দুধে ধোঁয়া তুলসীপাতা। ঠিক আছে?”
নিজের হাতটা ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল তিতলি। লাল হয়ে ওঠা টলটলে অশ্রুসজল চোখে অসম্ভব রাগ এবং অভিমান নিয়ে শেষ একবার ইরামের দিকে তাকালো সে,
“ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ জিনি! ইউ হেয়ার মি? ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ টু বি হিয ওয়াইফ!”
এটুকুই। আর দাঁড়ালনা তিতলি। সামান্য টললেও দ্রুত হেঁটে কেবিনের দিকে চলে গেল। প্রথমটায় অনুরাগ তাকে অনুসরণ করতে চাইলেও ইরামের গুরুতর অভিব্যক্তির দিকে চেয়ে শেষমেষ থমকে গেল। তিতলি আড়াল হয়ে যেতেই পিনপতন নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। ভাগ্য ভালো, তিতলির চিৎকারে অতি বিশেষ জোর না থাকায় লঞ্চের অন্যান্য যাত্রী কিংবা কেবিন স্টাফরা ছুটে আসেনি।
ঢেউয়ের তালে দুলছে লঞ্চ। খুব সম্ভবত এখন বিশেষ উত্তাল কোনো নদীর অংশ বেয়ে এগোচ্ছে, যেখানে ঢেউ বেশি শক্তিশালী। ইরাম রেলিং ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল। অনুরাগও একেবারেই চুপ। যে বিষয়টাকে সাইবান বহু বছর আগে কবর দিয়ে দিতে বলেছিল, সেই বিষয়টাই আজ তার স্ত্রীর সামনে উন্মোচিত হয়ে গিয়েছে। বন্ধু হিসাবে তার কি করা উচিত, কি বলা উচিত ভেবে দ্বিধায় ভুগছে সে। বেশ অনেকটা সময় বাদে মুখ খুলল ইরাম,
“তিতলি সত্যি বলেছে।”
রমণী প্রশ্ন করেনি। স্রেফ একটি বাক্য উচ্চারণ করেছে। অনুরাগ কিছু বললনা। চুপ করে রইল। তার নীরবতাই ইরামকে শতভাগ নিশ্চিত করল।
“সবাই জানে, শুধু আমি জানিনা?”
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চুলে আঙুল বোলালো ইরাম। অনুরাগ তৎক্ষণাৎ জানাল,
“কেউ জানেনা, সামিয়া আন্টি, আহমদ আংকেলও না। শুধু আমি, সারিকা আর তিতলি জানে।”
এবার সত্যিই অবাক হলো ইরাম। সাইবান এমন একটি গর্হিত পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেটা সামিয়া পর্যন্ত জানেন না? ইরামের দ্বিধা বুঝতে পারল অনুরাগ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানাল,
“তখন কেউ বাড়িতে ছিলনা। সামিয়া আন্টি সেমিনারের জন্য সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। আর আহমদ আংকেলও বিজনেস ট্যুরে ছিলেন।”
“তুমি জানলে কীভাবে?”
অনুরাগ একটি ঢোক গিলে উত্তর করল,
“সারিকা ফোন করেছিলেন। সাইবান তখন রুমের দরজা বন্ধ করে বসেছিল।”
“আর তিতলি?”
অনুরাগ ঘাড়ে হাত ঘষল,
“ও..ওকে…বলার প্ল্যান ছিলনা। কিন্তু, দাগ দেখে ফেলেছিল পরে।”
“কিসের দাগ?”
ইরাম অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে। অনুরাগ তাতে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাচ্ছে বারবার। কতটুকু প্রকাশ করা উচিত, কতটুকু না? জানেনা সে। তাই কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আমি সরি। সাইবানকে প্রমিজ করেছিলাম, কখনো এই বিষয়ে না মুখ খুলব, না তো কথা বলব।”
একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল ঘষল সে।
“কিন্তু যেহেতু বিষয়টা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সামনে এসেই গিয়েছে, তখন যদি আপনি জানতে চান, আমি…”
“না।”
অনুরাগ কথা শেষ করার আগেই শীতল গলায় বলল ইরাম। তাতে বান্দা থমকে গেল। প্রসারিত দৃষ্টিতে বিস্ময় নিয়ে তাকাল। ইরাম ঘুরে দাঁড়িয়ে অনুরাগের মুখোমুখি হলো,
“আমি তোমার কাছ থেকে কিছুই জানতে চাইনা অনুরাগ। যদি জানতেই হয়, আমি আলাদিনের কাছ থেকেই জানতে চাইব।”
অবাক না হয়ে পারলনা অনুরাগ। এমন একটা বিষয় সামনে আসার পরেও ইরাম শান্তভাবে গ্রহণ করছে, ঘাঁটাঘাঁটি করে কিছুই জানতে চাইছেনা ব্যাপারটা হজম করতে তাকে বেগ পোহাতে হলো। তবে কেন যেন বুকের ভেতর একটা ভালোলাগা ভর করল। ইরামের প্রতি আলাদা একটা সম্মান সৃষ্টি হলো।
“আই রেস্পেক্ট প্রাইভেসি। হতে পারে মানুষটা আমার সবচেয়ে কাছের, কিন্তু তারও প্রাইভেট লাইফ বলে একটা ব্যাপার আছে। সে যখন আমায় কিছু বলেনি, এর অর্থ সে চায়না আমি জানি। কিংবা আমি এখনো তার কাছে ওই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাতে পারিনি, যে পর্যায়ে গেলে কারো কাছে নিজের দূর্বলতা প্রকাশে দ্বিধা হয়না।”
রমণীর কথাগুলো শুনে অনুরাগের অশান্ত হৃদয়ে শান্তির প্রলেপ পড়ল বুঝি। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। ইরাম গভীর গলায় বলল,
“আজকে যা হয়েছে, সেসব আলাদিনকে জানানোর প্রয়োজন নেই। আমি এটাও চাচ্ছিনা, ও চাপে পড়ে আমার কাছে এসে মুখ খুলুক। আজকের কথা যদি আগামীকাল তিতলি ভুলে যায়, তাহলে ভালোই। যদি না ভোলে, ওকেও জানিয়ে দিও। আসছি, শুভরাত্রি।”
এটুকুই। ইরাম আর দাঁড়ালনা। হেঁটে হেঁটে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেল। অনুরাগ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। নদীর বাতাসের ঝাঁপটা এসে তার পরনের টি শার্ট, কপালে ছড়িয়ে থাকা চুল সবকিছু এলোমেলো করে দিল। ইরামের চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে রইল সে। পরক্ষণে অতি সূক্ষ্ম একটি মায়াবী হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। চুলে আঙুল চালিয়ে সে আপনমনে ফিসফিস করল,
“তুই জীবনে জিতে গিয়েছিস, ব্রো।”
উদ্ভট সব চিন্তার কারণে ইরাম সারারাত আর দুই চোখের পাতা এক করতে পারেনি। উল্টেপাল্টে স্মৃতির পাতা ঘেঁটেছে। কোথায় ভুল হয়ে গেল? কোথায় হিসাবটা গড়মিল হলো?
সাইবান এবং ইরামের সম্পর্কটা ছোটবেলায় ভাইবোনের থেকে বেশি কিছু ছিল। ইহান এবং রাহাতও ইরামের অতটা কাছাকাছি ছিলনা, যতটা ছিল সাইবান। ছেলেটা তাকে কেমন ভাবত, সে জানেনা। কিন্তু তার সকল না বলা কথা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা সবকিছুই ইরামের জানা ছিল। স্কুলে একটা পেন্সিল হারানো থেকে শুরু করে সামিয়ার থেকে লুকিয়ে বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে যাওয়ার মতন ব্যাপার নির্দ্বিধায় সে ইরামকে বলতো। বন্ধুত্ব? ভ্রাতৃত্ববোধ? নাকি অন্যকিছু? কি ছিল তাদের মাঝে? আজ সত্যিই ইরামের মনে প্রশ্ন জাগলো। এতটা কাছের মানুষ থেকে এতটা দূরের হওয়া যায়? কেমন যেন অপরাধবোধ হলো বুকের ভেতর। জীবনযুদ্ধে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল সে, যে তার ন্যাওটা ছেলেটা শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যুবক হতে হতে বিরাট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলে গেল, এতকিছু মোকাবেলা করল অথচ সে টেরটুকুও পেলনা? পায়নি, নাকি পাত্তা দেয়নি? সামিয়ার সাথে মুন্সীবাড়ির সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর থেকেই দুই পরিবারের দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইরাম তো কখনো সেসব দূরত্ব মানতে চায়নি। তবে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল কখন? কোথায় সমস্যা হলো?
সামিয়া এবং ইরামের মা লামিয়া, দুজন সৎ বোন। লামিয়া ছিলেন বড়। তার মায়ের মৃত্যুর পর ইরামের নানা, অর্থাৎ লামিয়ার বাবা আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। সেই ঘরের মেয়েই সামিয়া। তারা শুধু দুইজন বোন। কোনো ঘরেই ছেলে হয়নি। এজন্য অধিকাংশ সম্পত্তি সামিয়াদের চাচার ছেলেদের কাছে চলে গিয়েছিল। তবে ইরামের নানা তার দুই মেয়েকে দুটি বাড়ি দিয়ে গিয়েছিলেন। একটি মুন্সীবাড়ি, যেখানে এখন রাহাতরা থাকে। অন্যটা রাস্তার ওপারের সামিয়ার বাড়ি। দুই পরিবারই শুরু থেকে মধ্যবিত্ত ছিল। সামিয়া এম বি বি এস পাশ করার আগেই তার বিয়ে হয়ে যায়। তার স্বামী আহমদের অবস্থাও শুরুতে খুব বেশি ভালো ছিলনা। তাই নবদম্পতি স্ত্রীর বাড়িতেই থাকতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আহমদ ব্যবসা শুরু করেন। অনেক খারাপ দিন পেরিয়ে বহু বছর পরে তিনি সফল হন। এদিকে সামিয়াও তখন এম বি বি এস শেষ করে চাকরি নিয়েছেন। পাশাপাশি আরও বড় ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করছেন। তাদের অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। পুরাতন বাড়ির জায়গায় আস্তে আস্তে নতুন দেয়াল ওঠে, নতুন ঘর ওঠে, নতুন গাড়ি আসে বাড়িতে। মধ্যবিত্ত অবস্থা বদলে রূপ নেয় উচ্চবিত্তে। অপরদিকে ইরামের মা লামিয়ার সংসার তখনো একই জায়গায়। সরকারি চাকরিজীবী কিবরিয়া সাহেব অতি সৎ ব্যক্তি ছিলেন। ঘুষ, সুদ ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতেন, সরকারি মূল বেতনেই তিন ছেলে মেয়েকে মানুষ করছিলেন। তাই সেখানে উচ্চবিত্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা ছিল বিলাসিতা। হয়ত এই নিয়ে বোনের সঙ্গে কিছুটা হিংসা, রেষারেষি ছিল লামিয়ার। ইরাম এখনো ঠিকঠাক জানেনা, কোথায় সমস্যা হয়েছিল। এমনকি সামিয়া আর লামিয়া যে সৎ বোন, এটাও ছেলেমেয়েদের কেউই জানতনা। তবে কিবরিয়া সাহেবের মৃত্যুর পর, যখন লামিয়া মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, সংসারের দায়িত্ব ইরামের উপর বর্তে যায়, তখন এই নিয়ে রেষারেষি রীতিমত দক্ষযুদ্ধে পরিণত হয়।
লামিয়া তখন কিছুদিন ভালো থাকতেন, কিছুদিন বিছানায় পরে থাকতেন, মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। তার চিকিৎসা চলছিল। এমনই এক সময় যখন মাথাটা তার ঠিকঠাক ছিল, তখন সামিয়ার সাথে গোলযোগ বাঁধে তার। ইরাম জানেনা কি হয়েছিল। সে শুধু দৌঁড়ে গিয়ে দেখতে পায়, সামিয়াকে একের পর এক চড়, ঘুষি মারছেন লামিয়া। এই নিয়ে রীতিমত সালিশ বসে গিয়েছিল সমাজে। সেখানেই উঠে আসে চরম সত্যি, লামিয়া সামিয়া আপন বোন নয়! আহমদ নিজের স্ত্রীর অপমান মুখ বুঁজে সহ্য করেননি। সেই সালিশেই ইতি ঘটেছিল দুই বাড়ির আত্মার সম্পর্কের। মুন্সীবাড়ির মানুষগুলোর বিশ্বাস দোষ সামিয়ার, আবার ওই বাড়ির মানুষগুলোর বিশ্বাস দোষ লামিয়ার। যার যার বাবা মাকে রক্ষা করতে ছেলে মেয়েরাও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল। এভাবেই শেষ হয়ে গিয়েছিল সব।
ইরাম অস্বীকার করতে পারবেনা, শুরুতে তারও রাগ হয়েছিল। ওই বাড়ির মানুষগুলোকে তার সহ্য হতনা। কারণ আহমদ সালিশের ভরা মজলিসে তার বিধবা, মানসিক সমস্যায় ভোগা মাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে অনেক কথা বলেছিলেন। সেসব স্বার্থে লেগেছিল মেয়ে হিসাবে। অজান্তেই সামিয়া, আহমদ, সারিকা সবার উপরেই চাপা ক্ষোভ জমে গিয়েছিল তার। কিন্তু ওই একটা মানুষকে সে কোনোদিন ঘৃণা করতে পারেনি।
আলাদিন। প্রথম প্রথম কষ্ট হত ইরামের। যখন বিবাদের পর সাইবান আর তার কাছে যেতে পারতনা। লামিয়ার পাগলামির কারণে কোনো বাড়ির মানুষ একে অপরের মুখদর্শন পর্যন্ত করতে পারতনা। এভাবেই দূরত্ব বাড়তে বাড়তে একটা সময় গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। যত বড় হয়েছে ইরাম, তত বোঝা বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে। তাই আর অনুভূতি নিয়ে ভাবার সুযোগ পাওয়া যায়নি। সময়ের কালে কবে, কোথায়, কীভাবে ছোটবেলার সেই মধুর সম্পর্কটা হারিয়ে গিয়েছে, তা বিষাদপূর্ণ।
একদম শেষ রাতের দিকে চোখটা লেগে এসেছিল ইরামের। হয়ত টেনেটুনে ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়েছে। ভারী চোখের পাতা, কালো জগৎ। ঠিক এমন সময়েই সে নিজের গালে আলতো স্পর্শ পেল, সঙ্গে মিষ্টি কিছু শব্দ,
“গুই! আ আ…গুই!”
“মর্নিং মর্নিং। ইউ দেয়ার?”
“মু…দে!”
“মুতে না, মুতে না। তুই ছাড়া কেউ প্যান্টে মুতে না পোটলা!”
ইরাম চোখ পিটপিট করে তাকাল। ঘুম জড়ানো ধোঁয়াশা চোখ হালকা হতে কিছুটা সময় লাগল। অতঃপর সে স্পষ্ট দেখতে পেল। তার মুখের কাছে বসে আছে ইযান। ছেলের পিঠ ধরে বসিয়ে রেখেছে সাইবান। ইযান ঝুঁকে ইরামের গাল কামড়ানোর চেষ্টা করছে মাড়ি দিয়ে, জননীকে জাগানোর কি ভীষণ তাড়না!
“আইই!”
দৃশ্যটা এত আদুরে যে ইরামের ঠোঁটে মুহূর্তেই হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়ল। কম্বলের ভেতর থেকে হাত বের করে সে ইযানকে টেনে নিজের বুকে ঠেকাল। মাথায় অসংখ্য স্নেহের চুমু দিতে দিতে বলল,
“আমার আব্বুটা আমাকে ঘুম থেকে তুলছে? কত্ত বড় হয়ে গিয়েছে আমার বাবাটা! গুড মর্নিং!”
“মুউউ।”
ইরাম উঠে বসল বিছানায়, ইযান তার কাঁধে লেপ্টে রইল। আশেপাশে তাকাতেই সে দেখল ইতোমধ্যে কেবিনের ভেতর ব্যাগপত্র বের করে রাখা। বিছানার কম্বল বাদে অন্য সবকিছু গোছানো। চোখ কচলে তাকালো সে, সাইবান পুরোদস্তুর তৈরি। একটা ডেনিম জ্যাকেট আর ব্যাগী জিন্স পরনে। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে রাখা। এত সকালেও চেহারার ঔজ্জ্বল্য অসাধারণ। ঠোঁটে বিরাট হাসি। ওই হাসির দিকে চেয়ে ইরাম দ্বিধায় ভুগল। এমন অসাধারণ হাসির পিছনে হতাশা কীভাবে লুকিয়ে থাকে?
“লঞ্চ আর দশ মিনিটের ভেতর ঘাট দেবে। উঠে তৈরি হয়ে নিন। হালকা নাস্তা অর্ডার করেছি, এক্ষুণি চলে আসবে। আমি পোটলাকে রেডি করে দিচ্ছি।”
ইরাম বারণ করলনা। সাইবান ইযানকে নিয়ে সোফায় চলে গেল। ব্যাগ খুলে একটা ভারী পোশাক, টুপি, মোজা বের করে নিল। বাইরে ঠান্ডা বাতাস, আর বেশ সকাল হওয়ায় শীতের মতন আবহাওয়া। এই সচেতনতাটুকু ইতোমধ্যে সাইবানের মাঝে তৈরি হয়ে গিয়েছে লক্ষ্য করে ইরাম মুগ্ধ না হয়ে পারলনা। ইযান তেড়িবেড়ি করছে। সাইবান জামা পড়াতে গেলেই পা তুলে সটান তার থুতনি বরাবর লাথি হাঁকিয়ে দিল বাচ্চাটা। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সাইবান,
“পোটলা, তোকে পোটলায় বেঁধে পদ্মায় ফেলব কিন্তু!”
“গু!”
আরেকটা লাথি দেয়ার আগেই ছোট্ট পা খপ করে ধরে ফেলল সাইবান।
“হ্যাঁ। গু তো তোর সবচেয়ে পছন্দের। বড় হয়ে গুয়ের ট্যাংকির মেথর হবি কনফার্ম।”
এক হাতে পকেট থেকে নিজের ফোন বের করল সাইবান। কিছু বের করে ইযানের পাশে রেখে দিল। ক্ষীণ একটা সুর ভেসে এলো,
“আহ নু কাভালাইয়া~নু কাভালাইয়া~আহ আহ আহ~”
অদ্ভুত ভাষার একটা গান বাজছে। ইরাম ভাষাটা চিনতে পারলনা। কিন্তু এটুকু ঠিকই দেখল, ছেলে তার শান্ত হয়ে গিয়েছে। ড্যাবড্যাব করে ফোনের দিকে চেয়ে আছে একদৃষ্টে। নড়চড় বন্ধ। সাইবান বিজয়ীর হাসি হেসে সুরুৎ করে তাকে জামা, প্যান্ট পরিয়ে ফেলল।
“বাপকা ব্যাটা!”
ইরাম বিছানা ছেড়ে উঠে এলো। ব্যাগ থেকে নিজের নতুন একটা জামা বের করে সাইবানের দিকে তাকাল,
“গতকাল এখানে ঘুমালেনা যে?”
সাইবান এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। পরক্ষণে মাথা কাত করে ইরামকে দেখল। তার তীক্ষ্ণ ও গভীর চোখজোড়া নির্লজ্জভাবে ইরামকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল। রমণী তাতে ঘাবড়ে গেল। কেন যেন লজ্জাবোধ করল হঠাৎ। জিভে ঠোঁট চেটে নিয়ে সাইবান উত্তর করল,
“গতকাল এখানে থাকলে আমি না নিজে ঘুমাতাম, না আপনাকে ঘুমাতে দিতাম। সারা রাত শুধু খেলতাম আর খেলতাম।”
“কি খেলতে?”
ঢোক গিলে প্রশ্নটা করল ইরাম। তীর্যক হাসল সাইবান।
“টেস্ট ক্রিকেট খেলতাম। টি টোয়েন্টিতে আমার পোষায়না।”
ধড়ফড় করে উঠল ইরামের বুক। আর এক সেকেন্ডও সে দাঁড়ালনা। উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে বাথরুমের ভেতর ঢুকে গেল। সাইবানের দৃষ্টি তার অবয়বে ঘুরপাক খেয়ে গেল যতক্ষণ না সে সম্পূর্ণরূপে চোখের আড়াল হলো। পরক্ষণে আপনমনে হেসে সে ইযানের দিকে তাকাল যে তখনো হা করে ফোনের দিকে চেয়ে আছে। একটা আলতো চাপড় বসাল সে পোটলার পায়ে,
“খালি বাপের সম্পত্তির দিকে নজর না? শুনে রাখ পোটলা, দুইটা জিনিস বাপের কাছ থেকে কোনোদিন হাসিল করতে পারবিনা। এক তামান্না, দুই তোর মা।”
রুমটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। টেবিলের উপর জ্বলজ্বল করছে বেশ কয়েকটি মনিটর। সবগুলো মনিটরে একই চিত্র ভাসছে। এক সুদর্শন ছেলে, ঠিক ক্যামেরার দিকে চেয়ে নিজের মধ্যাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তার রক্তাভ চেহারা, সেই চেহারায় ভৌতিক উত্তেজনা। অরণ্য একনাগাড়ে দেখে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে তার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। ওই চেহারার খাঁজে খাঁজে কয় ফোঁটা র*ক্তবিন্দু, কয় ফোঁটা ঘাম আছে সেসবও গোণা আছে তার। ভ্রুর মাঝে চকচকে পিয়ার্সিং, চেহারায় বেপরোয়া অভিব্যক্তি। সবটাই কেমন অশরীরী ক্ষমতার জানান দিচ্ছে।
উঁহু। ক্ষমতা নয়। বোকামি।
চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে অরণ্য দেখতে লাগল। ভিডিও অন করে দিল। হালকা ঝাপসা ভিডিওতে সব দেখা গেল আবার শুরু থেকে। ভাঙচুর, তাচ্ছিল্য, বি*স্ফোরণ। অরণ্য হাজারবারের উপর দেখে ফেলেছে। অথচ এখনো বুঝি মন ভরছেনা তার। টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে হাতে রিমোট নিয়ে আয়েশ করে দেখছে সে।
মৃদু শব্দ করে রুমে প্রবেশ করল কেউ। একটা কাঁচের বোতল রাখল টেবিলের উপর। পুরুষালী কন্ঠে বলল,
“আর কতকাল শুধু দেখেই যাবেন, বস? অ্যাকশন নেবেন না?”
অরণ্য বাঁকা হাসল। সোজা হয়ে বসে বোতলটা হাতে নিল। এক কামড়ে ক্যাপ খুলে ঠোঁটে পুরে ফেলল। একদম অর্ধেক শেষ করে থামল সে। অতঃপর খসখসে হাসি হেসে বলল,
“দাবায় ঘোড়ার উস্কানিতে রাজার চাল দেয়াটা বোকামি জানিস না?”
লোকটা কিছু বললনা। নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। অরণ্য মনিটরে ভাসতে থাকা চেহারাটা দেখতে দেখতে জানাল,
“মানুষের দুঃখের সময়টা পন্ড করায় কোনো মজা নেই। মজা তো তখন আসে, যখন সুখের নদীতে দুঃখের ঝড় ওঠে।”
বোতলে আরেক চুমুক দিয়ে পুরোটা শেষ করে দূরে ফেলে দিল অরণ্য। হাত ইশারা করতেই লোকটা বোতল তুলে নিয়ে চলে গেল। পুনরায় অন্ধকারে ঢেকে গেল চারপাশ। শুধু রয়ে গেল অসংখ্য মনিটরে জ্বলজ্বল করতে থাকা বেপরোয়া মুখটা। অরণ্য নিজের পকেট থেকে একটা লকেট বের করল। সেটা খুলতেই রমণীর মুখটা ভেসে উঠল। হাস্যোজ্জ্বল, চিন্তাহীন, স্নিগ্ধ, মায়াবিনী। মনিটরের বরাবর করে লকেটটা তুলে ধরল অরণ্য। দুটো মুখই একসাথে দেখল এবার। বিনোদন পেল বেশ।
“ইরাম মির্জা সওদাগর..।”
আমার আলাদিন পর্ব ৩৬
অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল সে। চেয়ারে হেলান দিয়ে ধোঁয়াটে চোখে সামনে চেয়ে শূন্যতার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করল,
“আমি তোমার জীবনের বজ্রঝড়ের মেঘ কবিতা, দুঃখের বর্ষণে যাবনা, সুখের রোদে যাব। কবিতার রোদেলা আকাশ ছেয়ে ফেলা ঘন কালো মেঘ হব।”
অতঃপর চেয়ারে দুলতে দুলতে গুণগুণ করে অরণ্য গেয়ে উঠল,
“একেলা পাইয়াছি রে শাম, একেলা পাইয়াছি রে শাম, এই নিগূঢ় বনে~ আজ পাশা খেলব রে শাম~”
তীর্যক হাসল সে,
“আজ পাশা খেলব রে~শাম……..”
