আমার আলাদিন পর্ব ৩৬
জাবিন ফোরকান
ফ্যামিলি কেবিনের বিছানায় গোল হয়ে ঝালমুড়ি আর কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে বসেছে সকলে। সাইবান একটা চেয়ার নিয়ে কাছাকাছি বসেছে, কারণ বিছানায় তার জায়গা হয়নি। তার বুকে লেপ্টে ইযান ঘুমিয়ে আছে। ছেলেকে সাবধানে ধরে রেখেছে সে। সারিকার হাতে একটা খালি বোতল। সে গুণে গুণে সবার দিকে তাকিয়ে সে গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করল,
“ওকে, সবাই রেডি? আমরা ট্রুথ অর ডেয়ার খেলছি। বোতলের মুখ যার দিকে ঘুরবে, সে দুটো অপশন পাবে। ট্রুথ নিলে আমরা তাকে একটা প্রশ্ন করব, সেই প্রশ্নের সত্যি সত্যি জবাব দিতে হবে। মন থেকে। আমরা না বুঝলেও আল্লাহ কিন্তু ঠিকই বুঝবে, সো মিথ্যা হইতে সাবধান!”
সারিকার কথায় অনেকে হেসে ফেলল। সে পুনরায় বলল,
“আর ডেয়ার নিলে একটা টাস্ক কমপ্লিট করতে হবে। যেকোন কিছু বলা হতে পারে করতে। মেনে নিতে হবে। না মানলে পেনাল্টি হিসাবে আমরা যা বলব, তাই মাথা পেতে নিতে হবে। ওকে? এবার শুরু করলাম।”
সবার মাঝে বসে সুগন্ধা ভয়ে ভয়ে নিজের হাত দুটো জুড়ে প্রার্থনায় লিপ্ত হয়ে গেল। সারিকা বোতলটা মাঝখানে রেখে ঘুরিয়ে দিল। বনবন করে ঘুরল সেটা। সঙ্গে সকলের হৃদস্পন্দন হলো বাঁধনহারা। বোতলের মুখটা ঘুরতে ঘুরতে থামল অনুরাগের দিকে।
“ইয়ে, অনু! পেয়েছি তোকে!”
শীষ বাজিয়ে হাততালি দিয়ে উঠল তিতলি। অনুরাগ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মাথায় হাত বোলালো। মৃদু হাসি গোপন করে বলল,
“ট্রুথ।”
“যাহ্ শালা, ডেয়ারে আসল মজা। এই ভাই আমি জানিনা এই শালাকে তোমরা প্রশ্ন করো।”
তিতলি হাল ছেড়ে মুখ ফুলিয়ে বসে রইল। সাইবান ঘুমে কাদা হয়ে যাওয়া ইযানকে নিজের কাঁধে শুইয়ে জানাল,
“ওর এমন কোনো ডার্ক সিক্রেট নেই যেটা আমি জানিনা। তাই তোরাই প্রশ্ন কর।”
“জীবনে কয়টা প্রেম করেছ?”
হঠাৎ করে প্রশ্নটা করল সারিকা। একদম স্বাভাবিকভাবেই। সকলে উৎসাহ নিয়ে তাকাল একমাত্র ইরাম বাদে। সে প্রশান্ত চোখে একবার সারিকা এবং অতঃপর অনুরাগের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করল। অনুরাগকে অবশ্য তেমন বিব্রত মনে হলোনা। দ্বিধাহীন জবাব দিল সে,
“একটাও না।”
“আজকালকার ছেলে হয়ে একটাও প্রেম করনি এটা বিশ্বাসযোগ্য?”
সারিকার দ্বিতীয় প্রশ্নে একগাল হাসল অনুরাগ,
“ট্রুথ চেয়েছেন, সত্যিই বলেছি। বিশ্বাস করা না করা আপনার ব্যাপার।”
“ভাই ও সত্যিই বলছে। প্রেম আর অনুরাগ পৃথিবীর উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু।”
চোখ উল্টে মন্তব্য চালান করল তিতলি। সাইবান তেমন কিছু বললনা। চোখ ফিরিয়ে ছেলে ঠিকঠাক ঘুমুচ্ছে কিনা খেয়াল করল। সকলের মাঝখানে হঠাৎ সুগন্ধা বলে উঠল,
“আচ্ছা প্রেম ছিল না, কিন্তু অনুভূতিও আছিল না? ঐযে, ক্রাশ আরকি।”
সুগন্ধার অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটি সকলকে জমিয়ে দিল ক্ষণিকের জন্য। অনুরাগ প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ পেলনা। এর আগেই সারিকা মাঝখানে বলে উঠল,
“একটাই প্রশ্ন করা যায় সুগন্ধা। তুই আরেকটা প্রশ্ন করতে পারবি না। আমি বোতল ঘুরাচ্ছি আবার।”
“অনুভূতি ছিল।”
সারিকা বোতল ঘোরাতে উদ্যত হলেও অনুরাগের উত্তরে থমকে গেল। ঝট করে ফিরে তাকাল। ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে নেই, দৃষ্টি আপতিত সুগন্ধার উপর। সকলের পিনপতন নীরবতার মাঝে অনুরাগ বেশ শান্ত
স্বরেই বলে গেল,
“সেটাও একজনই। তাকে পেলাম না, তাই আর কোনো অনুভূতি জীবনে আসলোনা।”
“পাইলেন না কেন?”
সুগন্ধা যেন মুহূর্তমাঝে ডুবে গিয়েছে। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অনুরাগের দিকে। মৃদু হেসে অনুরাগ সোজা হয়ে বসে তার চোখে নরম দৃষ্টি ফেলে বলল,
“ভালোবাসলেই পেতে হবে এমন কোথাও লিখা আছে? কৃষ্ণ কি রাঁধাকে পেয়েছিলেন?”
চোখ পিটপিট করল সুগন্ধা।
“কিন্তু ওনাদের তো আত্মার মিলন হইসিল।”
অনুরাগের হাসিটা একটুখানি প্রশস্ত হলো।
“আমার ভাগ্যে সেটা নেই।”
পরিস্থিতি ক্রমশ গভীর হয়ে যাচ্ছে দেখে ইরাম বিষণ্নতা দূর করে বলল,
“সারিকা, বোতল ঘোরাও।”
এতক্ষণ বরফের মতন বসে থাকা সারিকা এবার মাথা দুলিয়ে বোতলটা ঘুরিয়ে দিল। সামান্য হাত কাঁপল তার, যা সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে গেল সে। বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে বোতল এবার গিয়ে থামল তিতলির উপর।
“ইয়েস! ডেয়ার বেবি!”
“লঞ্চের রেলিংয়ে উঠে একটা লাফ দে।”
সাইবানের কথায় তিতলি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল,
“তোর সমস্যাটা কি? আমি মরে গেলে তুই খুশি হবি না? দাড়া, দিচ্ছি এক্ষুণি লাফ!”
অনুরাগ তিতলির হাত টেনে বসিয়ে দিল,
“বাবারে বাবা, মাথা দেখি বুলেট ট্রেনের গতিতে চলে। ও মজা করছে আর তুইও সেই তালে ধেই ধেই করে নাচছিস। আমার কথা শোন। তোর ডেয়ার হলো তুই তোর কোকিলা কন্ঠে আমাদেরকে একটা গান গেয়ে শুনাবি। ওকে? নে, আমি তবলা বাজাচ্ছি তুই ভটভটি চালু কর!”
“কিহহহ! আমার গান তোর ভটভটি মনে হয়? দাড়া, দেখাচ্ছি তোকে!”
অনুরাগ এতক্ষণ ঝালমুড়ি রাখা বিশাল বাটিটা তুলে সত্যি সত্যি তবলার ভঙ্গিতে বাজাতে শুরু করল। সাইবান একটা চামচ তুলে তালে তালে গ্লাসে বাড়ি দিতে লাগল। বন্ধুদের দলের কান্ড দেখে হাসি আটকে কোনমতে তাকিয়ে থাকতে পারল শুধু বাকিরা। তিতলি চোখ বুঁজে মারাত্মক কর্কশ কন্ঠে গাইতে শুরু করল,
“এভরি নাইট ইন মাই ড্রিমস~আই সি ইউ~ আয় ফিল ইউ~দ্যাট ইয হাউ আই নো ইউ গো অন~”
গানের সুরটা খারাপ না, কিন্তু তিতলি অহেতুক জোর দিয়ে রীতিমত চিৎকার করে গাইছে। দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে শাহরুখ খানের মতন করে দাঁড়িয়েছে, যেন সে বিছানায় না, কোনো হাইলি প্রোফেশনাল ব্যান্ড মেম্বারদের সঙ্গে স্টেজে আছে। সামনে হাজারো দর্শক! তালি দিতে দিতে গলার অসহ্য চিৎকারে না পারতে হিসিয়ে উঠল ইরাম, তার কাঁধে কান গুঁজে রইল সুগন্ধা। তিতলি চেঁচিয়ে গাইছে,
“নিয়ার~ফার~ হোয়্যারএভার ইউ আর~আই বিলিভ দ্যাট দ্যা হার্ট ডায গো অওওওওন!”
“শালীকে থামা, শালীর ভোকাল কর্ড ছিঁড়ে যাবে।”
কানে হাত চেপে এক হাতে অনুরাগকে ঠেলে দিল সাইবান। অনুরাগ একটা বালিশ তুলে ধপাস করে তিতলির মুখ বরাবর মারতেই মেয়েটা পা হড়কে বিছানায় আছড়ে পড়ল। গান বন্ধ হয়ে গেল সহসাই।
“ভালো ডেয়ার করেছিস, টাইটানিকের গান গেয়ে। এবার যদি এই লঞ্চ ডুবে দেখিস তিতলি, তোকে সবার আগে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলব আমি। কান দুটো বিষিয়ে দিল, উফ, ভগবান!”
কানে আঙুল চালাল অনুরাগ, এখনো শ্রবণ ইন্দ্রিয় সচল আছে বলে স্বস্তি পেল। অপরদিকে অট্টহাসি হাসতে হাসতে উঠে বসল তিতলি। সবাইকে শাস্তি দিয়ে সে বেশ মজায় আছে। মাথা ঝিমঝিম করছে সারিকার, চিৎকারের কারণে। বোতলটা নিয়ে সে দ্রুত ঘুরিয়ে দিল তিতলি আরেকটা গান ধরার আগেই। এবার নির্দেশিত হলো সারিকার নিজের দিকেই।
“ট্রুথ!”
দুহাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তাড়াতাড়ি বলল রমনী।
“তাহলে বলো, পোটলার কাজিন কতদূর? পৃথিবীতে আসবে নাকি মঙ্গল থেকে নামানোর চিন্তাভাবনা নেই তোদের?”
প্রশ্নটা করল সাইবান। সারিকা ক্রোধে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“একটা চোপাড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দেব, বেয়াদব! বড় বোনকে এসব প্রশ্ন করিস, নির্লজ্জ!”
“ওমা। পরিবার পরিকল্পনার কথাই তো জিজ্ঞেস করলাম এতে এত রেগে যাওয়ার কি আছে? নাকি দুলাভাইয়ের পাওয়ার কম? তা অবশ্য হতেও পারে, সবাই তো আমার মতন বিনা শ্রমে বাপ হতে পারেনা।”
দুষ্টুমির হাসি হাসল সাইবান। ঘুমন্ত ইযানের পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে খানিক ভাব নিল। সারিকা একটি হাত বাড়িয়ে তক্ষুনি ভাইয়ের বাহুতে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল। পাল্টা চুল টানা খেল নিজেও।
“তোর মাথা কম। তুই দেখেছিস?”
“দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিস নাকি?”
বাঁকা হাসল সাইবান। সারিকা তেঁতে উঠল,
“ইরাম আপু, ওকে থামান বলে দিচ্ছি। নাহলে আজকে আমার হাতে ও এমন মারটা খাবে যে দুইদিন কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবেনা।”
ইরাম সাইবানের দিকে চেয়ে সত্যি সত্যি ইশারা করল চুপ থাকতে। সারিকা ততক্ষণে নিজের ক্রোধ সামলে চুপচাপ বসল, দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে হৃদয় শান্ত করে শেষমেষ জবাব দিল,
“আমরা এখনো এসব নিয়ে কিছু ভাবিনি। আমি আর মিসির দুইজনই কাজে ব্যস্ত থাকি। যখন মনে হবে বাচ্চার দায়িত্ব নিতে পারব, মা বাবা হওয়ার যোগ্যতা হয়েছে, তখন প্ল্যান করব।”
“তাইলে আপনার হইতে হইতে আমাদের ভাইজানের আরও দুইটা হইয়া যাবে, পরিশ্রমের সহিত।”
সুগন্ধা মন্তব্য না করে পারলনা। অট্টহাসি হেসে উঠল সবাই। তৎক্ষণাৎ ক্ষীপ্র গতিতে এগোল সাইবানের হাত। সুগন্ধার বেণী ধরে দুটো পাক্কা মারবে সে, এক্ষুণি! কিন্তু ইরাম মাঝখানে থাকায় তার হাতটা চাপড় দিয়ে সরিয়ে দিল। ধমকাল,
“কুচুপু উঠে যাবে। যাও, ওকে রেখে এসো।”
উঠে দাঁড়িয়ে সুগন্ধার দিকে নীরবে অশনি দৃষ্টি ফেলল সাইবান। একলা পেলেই হয়েছে শুধু। অদূরে গিয়ে সোফার উপর রাখা বেবি ক্যারিয়ারে ছেলেকে শুইয়ে দিয়ে আবার ফিরে এলো সে। ততক্ষণে মুখ টিপে হেসে নিল সকলে। বোতল ঘোরানো হলো আবার। এবার পড়ল বরাবর সুগন্ধার দিকে।
“ডেয়ার ডেয়ার!”
“তোমার ডেয়ার এটাই যে এরপরে যার দিকে বোতল ঘুরবে তার সঙ্গে একটা রেসলিং ম্যাচ খেলতে হবে।”
ইরাম বলল। সবাই চমকে উঠে সহমত জানাল। পছন্দ হয়েছে।
“হায় হায় আফা! এইভাবে বেঈমানিটা করলেন আমার সাথে?”
ততক্ষণে বোতল ঘুরিয়ে দিয়েছে সারিকা তীব্র উত্তেজনায়। সেটা গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে পড়ল ঠিক যে বান্দার কামনায় সকলে ছিল। সাইবান! বাঁকা হেসে হাতের আঙুল মটকাতে মটকাতে উঠে দাঁড়াল সে,
“আয় জরিনার আম্মা সকিনা, তোর সাথে একটু কুতকুত খেলি!”
সাইবানের শক্তিশালী বাহু লক্ষ্য করে ঢোক গিলল সুগন্ধা।
“আমারে বাঁচান, আফাজান! মুরগির মতন একটা পাক্কা মারব আমারে! ইয়াআ!”
“জেগে ওঠো নারী শক্তি, লড়াই করো, লড়াই করো!”
তিতলি তালি দিতে দিতে চিয়ার করতে লাগল। অত্যন্ত মজাদার হয়ে উঠল সময়টা। যা হওয়ার তাই হলো। সাইবানের কিছুই করার প্রয়োজন পড়লনা। সে শুধু সুগন্ধার পিঠে কনুই দিয়ে একটা ঠেলা দিল, তাতেই মেয়েটা ধরাশায়ী হয়ে মেঝেতে শুয়ে গড়াগড়ি দিতে লাগল।
“আমি আম্মাজানের কাছে বিচার দিমু! ভাইজান, আপনার উপর তামান্না ভাটিয়ার অভিশাপ পড়ুক!”
“কি বললি? ওরে দুর্গন্ধ!”
দুজনের ঐতিহাসিক লড়াই দেখে মিটমিট করে হাসল অনুরাগ। খেয়াল করলনা কতক্ষন যাবৎ তার দিকে অপলক চেয়ে ছিল এক রমণী।
বেশ অনেকটা সময় কেটে গেল সবার খেলায়। একেকবার একেকজনের কাজকর্মে রীতিমত হাসাহাসির রোল পরে গেল চারপাশে। লঞ্চের যাত্রাটা হয়ে উঠল দারুণ উপভোগ্য। সবার দিকে দুই তিনবার করে ঘুরলেও একবারও ইরামকে বাগে পায়নি কেউই। বোতলটা যেন নাছোড়বান্দা, পণ করেছে ইরামের দিকে ঘুরবেই না। শেষমেষ সারিকার হাত থেকে সুগন্ধা বোতলটা কেড়ে নিল,
“আফাজান আমারে দেন। এইভাবে হইব না। ছু মন্তর ছু, কালা কুত্তার গু!”
মন্ত্রপূত ফুঁ দিয়ে সুগন্ধা বোতলটা ঘুরিয়ে দিল। নিঃশ্বাস আটকে দেখল সবাই। অবশেষে, অপেক্ষার অবসান ঘটল। বোতলটা ইরামের দিকে গিয়ে থামল।
“ইয়েস! ইয়েস! এটাকে বলে কালা কুত্তার অভিশাপ!”
সবাই একসাথে গর্জে উঠল জিত হাসিল হতেই। ইরাম সবার উত্তেজনা দেখে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“ডেয়ার।”
ইরামের বলতে দেরি, তিতলির সুযোগটা লুফে নিতে একটুও দেরি হলোনা। যেন সে বহুক্ষণ যাবৎ পরিকল্পনা করে রেখেছিল। অন্য কেউ কিছু বলার আগেই তিতলি বলে বসল,
“আমাদের সবাইকে এক মিনিট নেচে দেখাতে হবে।”
প্রথমটায় সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। তিতলির কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? ইরামের সঙ্গে নাচ জিনিসটা যায় নাকি? সে যে ধরণের শান্ত আর জটিল মস্তিষ্কের মেয়ে! অনুরাগ বাঁধ সাধল,
“আমরা বরং অন্য কিছু দেই। আরও ফানি।”
“কেন? আমরা সবাই তো যা দেয়া হয়েছে চুপ করে করেছি। ইরাম আপু… আই মিন ভাবী নাচলে দোষ কোথায়? বয়স হয়ে গিয়েছে মানি, কিন্তু এখানে আমরা সবাই তো বন্ধু বন্ধু। উই সি, উই ডোন্ট জাজ!”
হাত চাপড়ে হেসে উঠে বলল তিতলি। এতক্ষণ যাবৎ যে মজার মুহূর্তটা গড়ে উঠেছিল, সেটা কেমন যেন হঠাৎ করেই ভেঙে গেল। প্রত্যেকের মুখ থমথমে হয়ে রইল। সাইবান নিজের হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল। ভ্রু কুঁচকে সে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু এর আগেই ইরামের কন্ঠ ধ্বনিত হলো,
“নো। প্লীজ জাজ।”
হুট করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রমণী। হেঁটে গেল কেবিনের মাঝখানের ফাঁকা মেঝেতে। সুগন্ধার দিকে চেয়ে সে কাঁধের ওড়না পেঁচিয়ে কোমরে বাঁধতে বাঁধতে আদেশ করল,
“নজরুলের গানটা ছাড়ো, শুকনো পাতার নূপুর পায়ে…”
প্রথমটায় সুগন্ধাও থ হয়ে রইল। পরক্ষণেই অবশ্য ফোন নিয়ে ভলিউম বাড়িয়ে নেট থেকে গানটা বের করে ছাড়ল। সারিকা, অনুরাগ, তিতলি, সুগন্ধা প্রত্যেকে বুঝি একদম নিঃশ্বাস আটকে সামনের দিকে চেয়ে রইল। গানের সুরে ভরে উঠল সমস্ত কেবিন। ইরাম অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছে। চুলগুলো খোঁপা থেকে খুলে দিয়েছে। অবশেষে গানের লাইন প্রতিধ্বনিত হলো দেয়ালে দেয়ালে,
~ইরানী বালিকা যেন মরুচারিণী
পল্লীর প্রান্তর বন মনহারিণী~
ইরামের শরীর দুলে উঠল তালে তালে। হাতের আঙুলের মাঝে ফুটল নাচের মুদ্রা। তরঙ্গের মত খেলে চলল সে মেঝে জুড়ে। নমনীয়ভাবে বেঁকে গেল শরীর, কখনো এদিকে, কখনো সেদিকে। যেন কলকলে নদী, যেথায় দরকার সেথায় বাঁকে। অপলক নয়নে চেয়ে রইল সকলে। আর সাইবান। সে সবার থেকে আলাদা। তার চোখজোড়া আটকে আছে অর্ধাঙ্গিনীর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে।
~ছুটে আসে সহসাই গৈরিক বরণী
বালুকার উড়নি গায়~
দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে ঘুরতে লাগল ইরাম। সে জানে, শাস্ত্রীয়ভাবে ধরতে গেলে তার মুদ্রাগুলো একদম পারফেক্ট হচ্ছে না। অনেক বছরের অবহেলার ফল। সে নাচছে শুধুমাত্র কিছু স্মৃতি থেকে। কিন্তু সাধারণের দৃষ্টিতে এসব দোষত্রুটি ধরা পড়বেনা। তারা শুধু দেখে যাচ্ছে ইরামের কোমল অবয়বের তরঙ্গশৈলী।
~জল তরঙ্গে ঝিলমিল ঝিলমিল
ঢেউ তুলে সে যায়~
চোখ বুঁজে ফেলল ইরাম। ঘুরতে লাগল আপনমনে, যেন এই ঘূর্ণনের কোনো শেষ নেই। বন্ধ চোখের পাতায় ভাসল এক লুকায়িত স্বপ্ন। বাবার মৃত্যুর পর যে স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়েই থেকে গিয়েছে তার। পেটের দায়ে, জীবনের তাগিদে শখের স্থান ছিলনা কোনো। অথচ সেই শখটা আজও কেমন তার আত্মায় মিশে আছে। অধিকাংশ শাস্ত্রীয় বিদ্যাই সে ভুলে গিয়েছে। অথচ তার শরীর ঠিকই মনে রেখেছে কেমনভাবে দুলতে হয়, কেমনভাবে ঢেউয়ের মতন তালে তালে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে হয়। ইশ! যদি ঠিক এমন করেই সব দুঃখ, দুর্দশাকে ভুলে যাওয়া যেত? যদি এভাবেই নাচের মুদ্রায় জগৎটাকে জিতে যাওয়া যেত! তবে কি খুব ক্ষতি হত?
সঙ্গীতের সাথে সাথেই থামল ইরাম। মেঝেতে বসে সুন্দর এক ইতি টানল। তার খোলা চুলগুলো ছড়াল বাতাসে। ওড়নার কাপড় এলিয়ে পড়ল স্রোতের মতন। হাঁপাল ইরাম সামান্য। চোখ খুলে সামনে তাকাল। দেখতে পেল বরফের মতন জমে থাকা প্রত্যেকটি মুখ। তিতলির চোখজুড়ে অবিশ্বাস। কিন্তু সেসব তার কেন যেন দেখতে ইচ্ছা হলনা। অজান্তেই দৃষ্টি গিয়ে থামল চেয়ারে বসে থাকা পুরুষটির দিকে। স্বামী তার একনাগাড়ে চেয়ে আছে, চোখের পলক ফেলছেনা। ঠোঁটজোড়া একটুখানি ফাঁক হয়ে আছে। ঘাড়ের দিকটায় কয়েক ফোঁটা ঘাম চিকচিক করছে। নাচছিল ইরাম, অথচ পাগলের মতন হাঁপাচ্ছে সাইবান। ওই ঘন কালো চোখের মাঝে ধোঁয়াশা দেখল রমণী, যেন ঝড়ের ঝাঁপটায় তোলপাড় খেলে যাচ্ছে উপকূলে।
“মাইন্ড ব্লোয়িং!”
সবার আগে হাততালি দিয়ে উঠল অনুরাগ। অতঃপর একে একে অন্যরাও। অথচ সাইবান একচুল নড়লনা। ওই একইভাবে বসে চেয়ে রইল। বরফে পরিণত হয়েছে সে সম্পূর্ণ। ইরাম আস্তে করে উঠে দাঁড়াল মেঝে থেকে।
“ভাবীজান! আপনি এত্ত সুন্দর নাচ পারেন, কই কখনো তো বললেন না!”
সুগন্ধা মহা বিস্ময় নিয়ে বলল। ইরাম মুচকি হাসল,
“তেমন কিছু না। ছোটবেলায় কয়েক বছর কত্থক শিখেছিলাম। সেটাই আরকি। বেশিরভাগই ভুলে গিয়েছি এখন। একটু আধটু মনে আছে।”
বলতে বলতে বিছানায় ফিরে এলো ইরাম।
“এই যদি একটু আধটু হয়, তাহলে পুরোটা মনে থাকলে কি হত আর ভাবতে চাইছিনা।”
সারিকা মন্তব্য করল। আর সমস্ত সময়টা জুড়ে শুধু দুটো মানুষই একদম নীরব, বিহ্বল হয়ে থাকল। এক তিতলি। অন্যজন সাইবান। ইরাম অন্তত কিছু আশা করেছিল। তবে সাইবানের কাছ থেকে তেমন কোনো মন্তব্যই এলোনা। উল্টো অনুরাগ যখন জিজ্ঞেস করল,
“কিরে ব্যাটা? তোর কেমন লাগল?”
সাইবান নড়লনা, কিছু বললনা। শুধু নিজের ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেলল। তার অভিব্যক্তি বোঝা মুশকিল। কেমন একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। ইরাম অস্ফুট কন্ঠে বলল,
“আলাদিন…?”
ঠিক তখনি হুট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সাইবান। ইরামের দিকে তাকালনা পর্যন্ত। বরং অহেতুক কঠোর গলায় বলল,
“খেলা শেষ! আমি বাইরে বাতাস খেতে যাচ্ছি।”
এটুকুই। না কোনো ব্যাখ্যা, না কোনো কিছু। সাইবান হনহন করে হেঁটে দরজা খুলে কেবিনের বাইরে চলে গেল। বাকিরা সবাই হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল শুধু। ইরামের মনটা কেমন যেন চুপসে গেল। নিজের কোলের দিকে তাকিয়ে রইল সে। কি আশা করছিল সে? একটা মন্তব্য? কিছুটা প্রশংসা? হয়ত বা! সে করলেও বা কি, না করলেও বা কি? বাকিরা তো করেছে! অথচ এরপরও তার এমন খারাপ লাগছে কেন?
বেশ কিছুক্ষণ পর।
ইযানকে খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর সময় আরেক দফায় আশাহত হতে হলো ইরামকে। রাতের খাবার শেষে কেবিনে সাইবানের বদলে এসে ঢুকল সুগন্ধা। ইরাম অবাক হয়ে গেল। মেয়েটি বিছানার এক কোণায় বসে বেণী পাকানো চুল খুলতে খুলতে জানাল,
“ভাইজান আমাদের কেবিনে গিয়ে বলে আমি যেন আজকে আপনার সাথে ঘুমাই।”
“আর ও নিজে?”
সুগন্ধা কাঁধ তুলে বলল,
“উনি বলে অনুরাগ দাদার সাথে ঘুমাইবেন।”
বিছানা ঝেড়ে বালিশ গোছাতে লাগল সুগন্ধা। ইরাম এক কোণায় বসে ছেলেকে বুকে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। সাইবান এমনটা কেন করল? সে তো কথা দিয়েছিল তারা এই ট্যুরে একসাথে থাকবে! ভীষণ অভিমান জমলো রমণীর মনে। কিন্তু কিছুই বলল না সে। বেশ হয়েছে! থাক সে দূরে, ইচ্ছামতন। ইরামের আর কিছুই যায় আসেনা!
সত্যিই কি যায় আসেনা?
গভীর রাত। ঠিক কয়টা বাজে কারোরই খেয়াল নেই। রয়েল কেবিনের ভেতর সকলে নিদ্রাচ্ছন্ন। দুই তলা কেবিনটির নিচতলার বিছানায় ঘুমিয়েছে সাইবান আর অনুরাগ। উপরের তলায় তিতলি এবং সারিকা। লাইট বন্ধ। থেকে থেকে লঞ্চের দুলুনি টের পাওয়া যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে তাই অনুরাগের ঘুম আসছেনা। তবুও চোখ বুঁজে মরার মতন পড়েছিল সে। কতক্ষণ কেটেছে হিসাব নেই। পাশ থেকে হালকা নড়চড়ের কারণে মাথাটা কাত করে তাকাল। বড় একটা কম্বল ব্যবহার দুজনে। আবছা আঁধারিতে কিছুই চোখে পড়লনা প্রথমে। পরে দেখা গেল কম্বল। সাইবান একেবারে মুড়ি দিয়ে শুয়েছে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো কম্বলের ভেতর হালকা আলো দেখা যাচ্ছে। চোখ কচলে ভালোমত তাকাল অনুরাগ। না, ঠিকই দেখছে। ওটা ফোনের আলো খুব সম্ভবত। কিছুক্ষণ আগেই তো ঘুমে কাদা হয়ে ছিল ছেলেটা। এখন তবে লুকিয়ে লুকিয়ে কি দেখছে?
কৌতূহল থেকে অনুরাগ অত্যন্ত সাবধানে ধীরে ধীরে কম্বলের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দিল। সাইবান নিজের কাজে এতটাই মগ্ন ছিল যে ঘুমন্ত ভাবা বন্ধুর নড়াচড়া খেয়ালই করলনা। অনুরাগ সন্তপর্নে কম্বলের ভেতর পিছন থেকে সাইবানের ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে গেল, চোখ মেলে হতবাক হয়ে দেখল সামনের দৃশ্য। সাইবান পাশ ফিরে শুয়ে আছে। হাতে ফোন। ফোনের ব্রাইটনেস একেবারে লো থাকা সত্ত্বেও অন্ধকারের কারণে ভালোই চোখে পড়ছে। আর সেই ফোনের স্ক্রিনে ভাসছে ইরামের নাচ! চোখ বড় বড় হয়ে গেল অনুরাগের। নিঃশ্বাস আটকে নীরবে দেখল সে। খেলার সময় ইরামের নাচের ভিডিও। অদ্ভুত এক অ্যাঙ্গেল থেকে ভিডিওটা করা হয়েছে, বাঁকাভাবে চোখে পড়ছে। এটা সাইবানের কাজ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ছেলেটা সবার থেকে লুকিয়ে ভিডিও কখন করল? করেছেই যখন, এখন এভাবে দেখছে কেন?
অনুরাগ পাক্কা দশ মিনিট ওভাবেই ঘাপটি মেরে বন্ধুর কান্ডকারখানা দেখে গেল। সাইবান ইরামের নাচের ভিডিওটা বারবার দেখছে, শেষ হয়ে গেলে আবার টেনে প্রথম থেকে শুরু করছে। মাঝে মধ্যে আবার বিশেষ কিছু জায়গায় পজ করছে, ইরামের হাতের মুদ্রা জুম করে দেখছে, কখনো বা চোখ, কখনো চুল, কখনো বা ঠোঁট! প্রতিটি কোণ থেকে, যতবার, যত রকমভাবে সম্ভব সাইবান ভিডিওটা দেখেই চলেছে। অনুরাগের মুখস্ত হয়ে গেল, কখন, কোথায়, কোন সেকেন্ডে কি হবে না হবে! কোথায় কোথায় সাইবান পজ করবে! অথচ ছেলেটা সামান্য বিরতি দিচ্ছে না। বারবার, বারবার একই কাজ করে যাচ্ছে বিরতিহীনভাবে। এক, দুই, তিন, ষোলো, বত্রিশের পর অনুরাগ গোণা ছেড়ে দিল। আর সম্ভব না তার পক্ষে এসব দেখা।
সাইবানের কাঁধে অবশেষে হাত রেখে উপস্থিতি জানান দিল সে,
“এজন্যই বউয়ের কেবিন থেকে পালিয়ে এসেছেন মিস্টার আলাদিন?”
“ইয়া আল্লাহ্!”
অস্ফুট স্বরে ভড়কে উঠল সাইবান। হাত থেকে ফোনটা পিছলে বিছানায় পড়ে গেল। কম্বল ছুঁড়ে উঠে বসে গেল সে, প্রসারিত দৃষ্টিতে ধরা পড়া চোরের ভঙ্গিতে চেয়ে দেখল অনুরাগকে।
“তুই ঘুমাসনি?”
অনুরাগ মাথার নিচে দুহাত দিয়ে আয়েশ করে শুয়ে বন্ধুর চেহারার দিকে তাকাল।
“ঘুমালে মাঝরাতের বিনোদন মিস করে যেতাম।”
আলো আঁধারের মাঝেও সাইবানের উজ্জ্বল ত্বকে ফুটে ওঠা লালিমা স্পষ্ট দেখা গেল। ধরা খেয়ে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফেলল সে। অনুরাগ দুর্ধর্ষ বন্ধুকে এমন নেতিয়ে পড়া লজ্জাবতীর মতন আচরণ করতে দেখে বেশ বিনোদন পেল।
“তুই পারলে বৌদিকে পুতুলের মতন কাঁচের বাক্সে সাজিয়ে শুধু আজীবন দেখেই যাবি।”
“অনুরাগ! ভালো হচ্ছেনা কিন্তু!”
গুঙিয়ে উঠে ফিসফিস করল সাইবান। অনুরাগ একগাল হাসল,
“এত অনুভূতি বুকে চেপে থাকছিস কীভাবে? এখানে এলিই বা কেন? কেবিনে থাকার দরকার ছিল বৌদির সাথে। তাহলে অন্তত কিছুমিছু হতো!”
“সেটাই তো সমস্যা।”
দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল সাইবান। বালিশে মুখ গুঁজে রেখে বলল,
“ওখানে থাকলে আমি নিজেকে আটকাতে পারতাম না, অনুরাগ। ওনার আশেপাশে থাকলে আমি হায়েনা হয়ে যাই, হায়েনা!”
কেবিনের ভেতর ইযান এবং সুগন্ধা দুজনই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ইরাম বেরিয়েছে বাইরে। তার কিছুতেই ঘুম আসছেনা। মনে অভিমান আর মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা। করিডোরের বেশিরভাগ লাইট নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। লঞ্চের ভেতরের অধিকাংশ যাত্রী নিদ্রাচ্ছন্ন। বাতাসে যেন এখন বরফ ঝরছে। ইরাম সাইবানের দেয়া জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে বেরিয়েছে। তবুও কানে বাতাস লেগে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। থামলনা সে। রেলিং ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে এগোল, উদ্দেশ্যহীনভাবে। নিজেকে নিজেই বুঝতে পারছেনা ইরাম। সে তো পণ করেছিল, নিজের ক্যারিয়ার গড়া পর্যন্তই এই সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবে। অথচ আজ একটা দিন তার সমস্ত অনুভূতিকে এভাবে বদলে দিল কীভাবে? অভিমান কেন হবে তার? সাইবান তার প্রশংসা করল কি না করল, বলল কি না বলল, তার সাথে থাকল কি না থাকল এতে তো তার কিছুই যায় আসার কথা না! অন্তত এতদিন কিছুই যায় আসতনা! কিন্তু আজ এমন অস্বস্তি কেন লাগছে? সাইবান শুধু এক কেবিন থেকে অন্য কেবিনে গিয়েছে, এটুকু কাণ্ডে এত দূরত্ব কেন অনুভূত হচ্ছে?
“কি হয়েছে তোর ইরাম?”
নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল রমণী। অথচ উত্তর মিললনা। সে কি দূর্বল হয়ে পড়ছে? এই দূর্বলতার পরিণতি কি ভয়ংকর নয়? অজান্তেই ইরামের পা দুটো তাকে ঠিকই রয়েল কেবিনের দিকে নিয়ে গেল। সে টের পেল মাঝপথ পর্যন্ত পৌঁছে। এখানে কি করছে সে? সাইবানের ঠিকানায় কেন এসে দাঁড়াল? ইরাম আতঙ্কিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে উল্টো ঘুরে গেল। চলে যাওয়া দরকার তার। কিন্তু পারলনা। সামনের একটি দৃশ্য তাকে থমকাতে বাধ্য করল।
অদূরে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিতলি। মেয়েটির ভঙ্গিমা কেমন যেন। মাথাটা নুইয়ে আছে, শরীর হালকা দুলছে। চুলগুলো খোলা। তীব্র বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইরাম পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। কিছু একটা অদ্ভুত লাগছে তার কাছে। তাই আলতো করে হাত রাখল সে তিতলির কাঁধে।
“তিতলি?”
তিতলি মুখ তুলে ইরামের দিকে তাকাল। তখনি রমণী টের পেল একটা কটু ঘ্রাণ। তিতলির চেহারায় টকটকে লাল ভাব, চোখে ধোঁয়াশা। বুঝতে সমস্যা হলোনা ইরামের। মেয়েটা ড্রাংক। না চাইতেও চিন্তা হলো তার,
“তুমি কেবিনের বাইরে কি করছ এই অবস্থায়? বিপদ হলে? আমার সাথে আসো।”
তিতলির একটা হাত ধরে ইরাম টানল, অথচ মেয়েটাকে একচুল নড়াতে পারলনা। তিতলি একটা ঝটকা দিয়ে উঠল, ইরামের হাতটা ছিটকে গেল।
“নিজেকে খুব চালু মনে করেন আপনি, তাইনা?”
তিতলি গর্জে উঠল। মাদকের প্রভাবে তার জিভ জড়িয়ে গিয়েছে, হালকা টলছে সে। ইরাম ঘুরে দাঁড়াল। শক্ত গলায় বলল,
“তুমি এখন কথা বলার অবস্থায় নেই। আমার সাথে চলো, এক্ষুণি।”
“আমাকে আদেশ করার আপনি কে? আমি কি করব, না করব, কোথায় থাকব না থাকব, কাকে ভালো বাসবো না বাসবো বলে দেয়ার আপনি কে? ইউ বিচ!”
ইরাম হাত মুঠো পাকিয়ে ফেলল। নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করল। সে বুঝতে পারছে তিতলির মাথা ঠিক নেই। সে কি বলছে তা হয়ত নিজেও জানেনা। একটি নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ইরাম এগোনোর চেষ্টা করল,
“ফাইন, তিতলি। কাম ডাউন। আমি তোমার ক্ষতি করতে আসিনি। কেমন হয় যদি আমরা কেবিনে ফিরে এরপর কথা বলি?”
“ক্ষতি করেননি? আমার জীবনের একমাত্র ধ্যান, জ্ঞানকে কেড়ে নিয়ে বলছেন ক্ষতি করেননি? নাটকবাজ! মিথ্যাবাদী! হোম রেকার!”
ইরামের দৃষ্টি শক্ত হয়ে গেল।
“স্টপ ইট তিতলি। স্টপ ইট রাইট নাউ।”
তিতলি টলতে টলতে কয়েক পা এগিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল ইরামের। চোখে চোখ রেখে বলল,
“করবনা স্টপ। আপনি করেছেন? আপনার জন্য, শুধুমাত্র আপনার জন্য আমার জিনি আজ আমার কাছে নেই। শুধুমাত্র আপনার জন্য আমি আমার ভালোবাসা পাওয়ার আগেই হারিয়ে ফেলেছি। কেন এসেছেন আপনি? যে গর্তে ছিলেন সেখানেই থাকতেন। কেন আমাদের মাঝে এসে দাঁড়ালেন?”
হুট করে ইরামের গায়ে জড়ানো সাইবানের জ্যাকেটটা দেখে তিতলির চোখ ঝলসে উঠল। হাত বাড়িয়ে কলার আঁকড়ে ধরল সে, হুংকার দিয়ে উঠল,
“কেন? কেন? কেন? শুধু আপনিই কেন? কেন আমার জিনি শুধু আপনাকেই চায়? কেন ও আমায় দেখেও দেখে না? আমার অনুভূতির কোনো দাম নেই? ওর জগতে শুধু আপনি! ওর শয়নে, স্বপনে, মরণে, জীবনে শুধু ইরাম! ইরাম! আর ইরাম! কেন! আমি কি দোষ করেছি? আমার জায়গাটা হাতিয়ে নিলেন কেন আপনি? শুরু থেকে ওর সাথে আমি ছিলাম! আপনি ছিলেন না!”
“তিতলি আমার কথা…!”
“না না না! আপনি ছিলেন না। ওর সাথে আপনি ছিলেন না, আপনার কোনো অস্তিত্ব ছিলনা ওখানে। জিনি যখন চুরমার হয়ে ভেঙে গিয়েছিল, যখন তিল তিল করে নিজেকে গড়েছিল, আপনি ওর পাশে ছিলেন না। আমি ছিলাম! আমি ওর হাত ধরেছি, ওর বুকে সাহস দিয়েছি, ওকে আগলে রেখেছি। আপনি কিছুই করেননি! অথচ আজ সবকিছুই আপনার!”
তিতলির হাত দুইটি চেপে ধরেও ছাড়াতে পারলনা ইরাম। পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটি, শক্তি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। চোখ উপচে অশ্রু গড়াতে শুরু করেছে। ইরাম একটা ধমক দিতে বাধ্য হলো,
“নিজেকে সামলাও! তোমার মাথা ঠিক নেই।”
“আমার মাথা আপনি ঠিক থাকতে দেননি। আপনি আমার থেকে সব কেড়ে নিয়েছেন। যে জিনিস আপনি গড়েননি, সেই জিনিস আমার থেকে চুরি করেছেন। আপনি আপনার এক্সের সাথে মজায় মজায় থেকেছেন যখন এই আমি, শুধু এই আমি ছিলাম জিনির পাশে!”
আমার আলাদিন পর্ব ৩৫
ইরামকে ঝাঁকিয়ে কেঁদে চিৎকার করে উঠল তিতলি,
“আমার জিনি ভাঙতে ভাঙতে আর নিতে না পেরে সু*ইসাইড করতে গিয়েছিল, নিজেকে মে*রে ফেলতে চেয়েছিল…আপনি ছিলেন না ইরাম…তখন আপনি ছিলেন না ওর পাশে….আমি ছিলাম!”
বরফ হয়ে গেল ইরাম। তিতলি চিৎকার করে অনেক কিছুই বলে গেল এরপরও, অথচ তার মাথায় আর কিছুই ঢুকলনা। ওই একটা শব্দই তার কানের ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।
সু*ইসাইড—আ*ত্মহ*ত্যা—আলাদিন।
