নে আদরে জড়িয়ে মন বার্থডে স্পেশাল পর্ব
সিনথিয়া
“ আমার একটা ছেলে বাবুও চাই! আজ চাই! এক্ষুনি চাই! শেহজাদ! আপনি যদি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আপনার ল্যাপটপ বন্ধ না করেন তাহলে কিন্তু আগামী পাঁচ বছর আপনার সাথে আমার কথা বলা বন্ধ! কোনো কথা নেই! নেই মানে নেই! সারাজীবনের জন্য কাট্টু!”
ডিসেম্বরের মধ্যরাত। তুষারের শামিয়ানা টাঙিয়ে যখন শহর ঘুমায়, তখনও ব্যালকলোনিতে কান পাতলে শোনা যায় কনকনের ঠান্ডা বাতাসের শোঁশোঁ শব্দ। শেহজাদ কোলের উপর ল্যাপটপের রেখে স্ক্রিনে স্টুডেন্টদের এসাইনমেন্ট দেখছিল।
আরশির কাটাকুটির কথা শুনেও সে চোখ তুলে তাকালো না। ফ্রেমলেস চশমা আর সফেদ টার্টলনেক সোয়েটার-জিন্সে মালবুজ মানুষটা আজ এতো বছর পরও ভীষণ চুপচাপ, ভীষণ গম্ভীর।
“ আপনি আমার কাট্টুকে পাত্তা দিচ্ছেন না! তাই তো? হুহ! শুনুন, একবার কনুই আঙুল দিয়ে কাট্টু করলে কিন্তু আপনি আর আমার সাথে ভাব করতে পারবেন না৷ আপনার এই গোটা জগত সংসারের মাত্র একপিস বউ! ভেবে দেখুন!”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ল্যাপটপের কি-বোর্ডে দৌঁড়ানো আঙুলগুলো এবার থামলো আরশির কথায়। নীলাভ অক্ষিযুগল স্ক্রিন থেকে উঠে দৃষ্টি ফেললো আরশির পানে। শক্ত পেশানি আর ধারালো চোয়ালে অস্পষ্ট হাসির রেখা ফুটে উঠলেও মেয়েটা ধরতে পারলো না তা। শেহজাদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে শুধালো,
“ আরশি! প্রথমত তুমি প্রতিটা জিনিসকে এই অদ্ভুত নামগুলো দেয়া কবে ছাড়বে?”
আরশি ভ্রু কুঁচকে ফেললো অমনি।
“ মাইন্ড ইয়র টোন প্রফেসর! আমার সাথে কীভাবে কথা বলবেন?”
হাসি চেঁপে মুখের সামনে হাত মুঠো করে হালকা কাশলো শেহজাদ। পরপর গলা থেকে মেকি শ্লেষ দূর করে বলল,
“ উহুম! ওকে ম্যাম, উড ইউ মাইন্ড টু এক্সপ্লেইন মি, হোয়াট ইজ কাট্টু?”
“ কাট্টু মানে কাট্টি! আড়ি! আপনার আর আমার আনঅফিশিয়াল যুদ্ধ!”
আরশি বুকে হাত গুঁজে চোখে চোখ রেখে জবাব দিলো। শেহজাদ কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো ওর দিকে তাকিয়ে থেকে যখন হুঁশে ফিরলো তখন বুক চিড়ে বেরিয়ে এলো এক প্রকাণ্ড দীর্ঘশ্বাস। বাচ্চাদের তাদের বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড়ি আর ভাব নেয়ার বয়সে, বাচ্চাদের মা তার সাথে আড়ি নিচ্ছে।
শেহজাদ ল্যাপটপ কোল থেকে নামিয়ে মেঝেতে পা রাখল। স্লিপার পরে উঠে দাঁড়িয়ে রওনা হলো লাইব্রেরী ঘরের দিকে। আরশিও হাল ছাড়লো না। হ্যামিলনের বাঁশিয়ালা গল্পের বাচ্চাগুলোর মতো ছুটে গেলো শেহজাদের পেছন পেছন।
“ আপনি কেনো বুঝতে পারছেন না! একটা ছেলেবাবু ভীষণ দরকার!”
“ আর তোমার মাথায় এই কথাটা কে ঢুকালো যে আমাদের ছেলে বাবু দরকার?”
শেহজাদ ফিলোসোফির উঁচু শেলফ থেকে একটা বই নামাতে নামাতে প্রশ্ন ছুড়লো। আরশিরও যেন হুট করে কিছু একটা মনে পড়ে গেলো অমনি। ওভার সাইড হুডি আর লেগিংস পরনের মেয়েটা খুশিতে ঝুমঝুম করে উঠে বললো,
“ কেনো? যেদিন আমার গ্রাজুয়েশন শেষ হলো? কনভোকেশনের দিন? আপনি বলেননি আমাকে যে আমাদের একটা ছেলে বাবু চাই?”
শেহজাদ পুরোনো একটা ফিলোসোফি বইয়ের পাল্টা ওল্টাতে ওল্টাতে থমকালো। বিরান চোখে তাকিয়ে দেখল পুতুলের মতো মুখখানায়। তারপর আরশির সব খুশি এক নিমিষে গুড়িয়ে দিতেই যেন বলে উঠলো,
“ চার বছর আগের কথা আরশি। চার বছর। যেখানে তোমার গায়নাকোলোজিস্ট, আমাদের বারবার করে নিষেধ করেছেন আরেকটা বাচ্চা নেয়ার ব্যাপারে, সেখানে বারবার তুমি কেনো জেদ ধরছো?”
আরশির হাসিখুশি মুখটায় রাতের অন্ধকার নামল। চার বছর, চার বছর কম চেষ্টা করেনি আরশি আরেকটা বাচ্চার জন্য। কিন্তু ডক্টরের এক কথা। শায়নী আর আরাধ্যা হওয়ার সময় অতিরিক্ত রক্তপাত আর পেরিপোর্টাম কার্ডিওর শিকার হয় আরশি। মায়ের হার্ট দূর্বল হয়ে পড়ায় বাচ্চাদেরকে বাঁচানোও দায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সার্জনদের জন্য। তারপরও আল্লাহ বাঁচিয়ে দেন ওদের।
কিন্তু ডক্টর বারবার করে বলে দেন, পরেরবার আরশির জন্য গর্ভধারণ মানে হাই প্রেগন্যান্সি রিস্ক। শেহজাদ তবুও ওর গ্রাজুয়েশনের পর ওকে নিয়ে নিউইয়র্কের বড় বড় সব গায়নাকোলোজিস্টদের সাথে কথা বলে। আর যখন সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, তখন আল্লাহর ইচ্ছেতেই ধৈর্য্য চলে আসে ওদের মনে। ওদের ছেলে নেই তো কি হয়েছে? দু দুটো জান্নাতের চাবি তো আছে!
তবুও আরশি মন খারাপ করে। চোখমুখ অন্ধকার করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। শেহজাদ ওকে আটকাতে গিয়েও পারে না। পেছন থেকে ডাকতে গিয়েও পারে না। হাজার হাজার বইয়ের মাঝে মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিচ্ছু করতে পারে না মানুষটা।
প্রলম্বিত শ্বাস ফেলা ছাড়া যখন আর কোনো উপায় থাকে না, তখন পুরোটাই আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয় তার বান্দা। শেহজাদও তাই করলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে পুনরায় হাতে ধরে রাখা পুরোনো ধূলোজমা বইয়ে মনোযোগ আনলো। আর তার একটু বাদেই ধুপ করে কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ এলো পাশ থেকে।
চকিত সেদিকে তাকাতেই দেখলো আরশি মেঝেতে। মাথার উপরে বই। আশেপাশেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু। চোখজোড়া ছলছল করছে তরুণীর। এই রে!
শেহজাদ দৌঁড়ে আসে ওর কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে মাথার উপর থেকে বই সরায়। তারপর মেয়েদের যেভাবে কোলে তোলে, বউকেও সেভাবে তুলে দাঁড় করায়।
“ তুমি না রুমে চলে গেলে? এখানে এলে কখন? আমি আরো ভাবলাম গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছো!”
আরশির ওর হুডিতে লেগে থাকা ধূলো আর মাকড়সার জাল ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
“ তা তো ভাববেনই। আগে বয়স কম ছিল, তখন রাগ করলেই পিছন পিছন ছুটে আসতেন! আর এখন? বুড়ো হয়ে যাচ্ছি বলে শুধু ভেবে নিলেন আমি ঘুমিয়ে গেছি? ব্যাস? হয়ে গেলো? আর কোনো দায়িত্ব নেই? বউয়ের মান ভাঙানোর আর কোনো ইচ্ছে নেই? তাই তো?”
ম্যাডাম তারমানে আজ ঝগড়া করার মুডেই আছে। শেহজাদ মনে মনে হাসলেও চুপচাপ মাথা নুইয়ে বউয়ের ঝাড় খেলো। একটা টু শব্দ করলো না। তারপর যখন মেয়েটা আরেকদিকে ফিরে একটু শান্ত হলো? তখন আস্তে করে শুধালো,
“ বইগুলো তোমার মাথার উপর পড়লো কী করে?”
আরশি ঘাড় ঘুরিয়ে তপ্ত চোখে তাকাতেই আবার চোখ নামিয়ে ফেললো শেহজাদ। “বউয়ের রাগ ভয়ংকর। আর রাগের সময় চোখাচোখি হয়ে গেলে তো সর্বনাশ। ভস্ম হয়ে যাবে তুমি বৎস!”
আয়ানের কথা মনে পড়তেই শেহজাদ প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করলো।
“ না মানে, বইয়ের কত বড় সাহস! আমার বউয়ের মাথার উপর এসে পড়ে। এতো মোটা মোটা বই! তোমার কোথাও লাগেনি তো স্নোফ্ল্যাক্স? কাছে আসো তো, দেখি আবার ফুলে টুলে গেলো কি না কোথাও?”
শেহজাদ যে এখনো সিরিয়াস না, সে তখন থেকেই চিন্তার নামে মজা উড়াচ্ছে ওর, সে খুব ভালোমতোই বুঝতে পেরেছে আরশি৷ তবুও বরফ গলে গেলো। আরশিও এক পা দু’পা করে শেহজাদের বুকের কাছে এসে দাঁড়াল। আনতনয়না মৃদু স্বরে বললো,
“ শেলফ উঁচু ছিল। আর ফিকশনের বইগুলো সব উপরে। আঙুলে ভর দিয়ে একটা নামাতে গিয়ে দশটা মাথার উপরে এসে পড়েছে।”
শেহজাদ নিম্নাষ্ঠ পিষলো দাঁতের ফাঁকে নিয়ে। মনোযোগী শ্রোতার মতো আরশির অভিযোগ শুনলো, কিন্তু তবুও বললো না, ফিকশনের বইগুলো আসলে উপরের শেলফের রাখার আইডিয়াটা কার! কে চাইতো, তার আরশি এখনো শেলফ থেকে কিছু নামাতে না পারলে তাকে ডাকুক।
ওদিকে আরশি ঠোঁট উল্টে আছে। শেহজাদের হাসি পেলেও মায়া হলো ভীষণ বউয়ের জন্য। পরপরই ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
“ রুমে চলো! আদর করে দিচ্ছি! ব্যথা সেরে যাবে!”
আরশি কথার তালে তালে বললো,
“ আমি কী আরাধ্যা আর শায়নী নাকি যে আদর করে দিলে ব্যথা সেরে যাবে? মাথায় বরফ দিতে হবে। আমি আইসব্যাগ নিয়ে আসছি। তালুটা জ্বলছে এখনো। মাথা ভো ভো করে ঘুরছে। মাথায় ইট পড়লেও মনে হয় কেউ এতো ব্যথা পায় না! ”
আরশি আরো কিছু বিড়বিড় করতে করতে আরো একবার ঘর থেকে বের হতেই, দু’দিকে মাথা নাড়লো শেহজাদ। যে মেয়ে নিজেই এখনো বাচ্চা সে দু দুটো বাচ্চা কী করে সামলাচ্ছে একমাত্র উপরওয়ালাই জানে!..
শেহজাদ যখন ফ্লোর থেকে সবকটা বই তুলেছে তখনই ধুপধাপ আওয়াজে আবারও দরজার সামনে এসে দাঁড়াল মোজা পরা পা দুটো। শেহজাদ বই হাতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই আরশি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে শুধাল,
“ আপনি একটু আগে কী বললেন?”
“ কী বললাম?”
শেহজাদ বেখেয়ালিভাবে শুধালেও আরশির উৎসাহ কমলো না।
“ ঐ যে, একটু আগে বললেন না রুমে চলো, আদর করে দিচ্ছি! ব্যথা সেরে যাবে! সত্যি রুমে গেলে আজ আদর করবেন?”
মেয়ে এতক্ষণে বুঝেছে। শেহজাদ এবার পুরোপুরি ওর দিকে ফিরলো। পা থেকে মাথা অবধি তাকিয়ে শুধালো,
“ তুমি এটা জিজ্ঞেস করতে এভাবে দৌঁড়ে দৌঁড়ে এসেছো? তুমি না আইসব্যাগ আনতে গেলে?”
“ গিয়েছিলাম তো! ফ্রিজের কাছে যেতেই মনে পড়লো আজ চার বছর পর আপনি নিজে থেকে আমাকে আদর করার কথা বলেছেন। এজন্যই তো এক ছুটে…”
শেহজাদ ওর কথা শেষ করতে দিলো না, মাঝপথেই ব্যস্ত হলো বই গোছাতে। আরশি নিজেও আর সামনে এগোলো না। যতই হোক, ওর একটু হলেও তো এখনো বোধ বুদ্ধি আছে নাকি? দুই বাচ্চার বাবাকে এভাবে সরাসরি আদর টাদরের কথা বললে বেচারা লজ্জা পাবে, এটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু শেহজাদ কতটুকু লজ্জা পেলো তা বোঝা গেলো না। যতক্ষণ না সে বইগুলো গুছিয়ে রাখলো, ততক্ষণ আরশি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো দরজায়। ব্যথা ট্যাথা ভুলে গেলো। আইসব্যাগের কথা ভুলে গেলো। শেহজাদ শুকনো ঢোক গিললো আরশির চওনি দেখে। চোখ সরিয়ে যখন আবার কাজে মন দিতে গেলো তখনই মেয়েটা টেনে টেনে বললো,
“ বুকশেলফ এভাবে গোছাতে হয় না!”
“ তাহলে কীভাবে গোছাতে হয়?”
“ খালি গায়ে, মাসল টাসল দেখিয়ে!”
শেহজাদ বই রেখে ওর দিকে ফিরে বললো,
“ ম্যাডাম, এটা ডিসেম্বর! এখন মাসল টাসল দেখিয়ে নিমুনিয়া বাঁধানোর কোনো শখ আপতত আমার নেই! তোমার থাকলে, গো অন…খুলে ফেলো হুডি! হু কেয়ারস?”
আরশির হাসি টাসি দপ করে নিভে গেলো। গাল ফুলিয়ে চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বললো,
“ আনরোম্যান্টিক প্রফেসর! বুড়ো বেটা! আর জীবনেও যদি আমি আদরের জন্য হ্যাংলামো করেছি আপনার সামনে!”
“ আইডিয়া ভালো! তবে আনরোম্যান্টিক নই! নইলে এখন আমি রোম্যান্স শুরু করলে এই বইগুলো আজ সারারাতেও আর গোছানো হবে কি না সন্দেহ!”
শুনে ফেলেছে? শেহজাদ আরশির কথা শুনে ফেলেছে? কিন্তু কীভাবে? এই লোক কি ঠোঁট পড়তে পারে? আরশি তাজ্জববোনে গেলো। আর তখনই,
“ আম্মুউউউ! শায়নী আবারও পি করে দিয়েছে বিছানায়! ইয়াককক!”
মেয়ের ডাক শুনে আরশি নড়েচড়ে উঠলো। আরাধ্যার গলা এটা। একদম শেহজাদের মতো শুচিবায়ুর স্বভাব। শেহজাদ যেমন স্নোবলের পটি দেখে ইয়াক ইয়াক করতো, আরাধ্যাও তাই করে।
“ আসছি মা! দাঁড়াও, আসছি!”
আরশি যাওয়ার আগে এক নজর শেহজাদের দিকে তাকালো। হতভম্ব চোখদুটো দেখলো, শেহজাদ ঠোঁট টিপে হাসছে!
“ এতো বড় মেয়ে এখনো বিছানায় হিসু করছে আর আপনি হাসছেন?”
শেহজাদ মুহূর্তেই হাসি থামিয়ে স্বাভাবিক গলায় শুধালো,
“ বড়? কোথায় বড়? মাত্র সাত বছর বয়স। আঠারো বছর বয়স অবধি সবাই বাচ্চা! ইনফেক্ট আমার মেয়েরা আমার কাছ সারাজীবন বাচ্চাই থাকবে!”
আরশি রাগ দেখাতে গিয়েও হেসে ফেললো। তারপর যেতে গিয়ে কিছু একটা মনে করে আবার থামলো। দরজার ওপাশ দিয়ে লাইব্রেরীর ভিতর শুধু মুখ ঢুকিয়ে শুধালো,
“ কাল কত তারিখ? মনে আছে তো?”
শেহজাদের মনে আছে, অবশ্যই মনে আছে। তবুও মুচকি হেসে বলে উঠলো,
“ কেনো? কালকে স্পেশাল কিছু আছে নাকি?”
আরশি মাথায় হাত রাখলো। তারপর সাবধান করার মতো করে বলে গেলো,
“ এটাও ভুলে গেছেন?”
শেহজাদ ঠোঁট টিপলো। ভুলে গেছে? অসম্ভব! যে দিনে তার মেয়ে দুটো পৃথিবীর আলো দেখলো, সে বাবা হলো, এমন একটা দিন ভুলে যাওয়ার মতো ভুল কি করা যায়?
আজ ১৮-ই ডিসেম্বর। নিউইয়র্কের রাস্তা ডিসেম্বরের শুরু থেকেই ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে সাজলেও হাসান ভিলা আজ সেজেছে আরাধ্যা এবং শায়নীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে। দেয়ালেজুড়ে হরেকরকমের ফেইরি-লাইটস লাগিয়ে, বসার ঘর, স্টাডিরুম বেলুন দিয়ে সাজিয়ে টাজিয়ে হুলস্থুল অবস্থা। সন্ধ্যা থেকে এসব তদারকি করছেন মেহমেদ।
“ এতোকিছু আয়োজন করার কী দরকার ছিল বাবা?”
মেকি অভিমান ভরা কন্ঠ শুনে মেহমেদ পেছন ফিরে তাকালেন। কালো টার্টলনেক ফুল স্লিভ ব্লাউজের সাথে মেরুন রঙের শাড়ি পরেছে আরশি। সাথে কালো পশমি শাল। চুলগুলো মেসি বান করে উপরে তুলে রাখায় পুতুলের মতোই লাগছে ওকে। মেহমেদের প্রবীন ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটলো মেয়ের কথা শুনে।
“ আমি তো কিছুই করিনি। তোমার শাশুড়ীকে গিয়ে দেখো! সে আমার থেকে আরো একধাপ এগিয়ে। কোনো কিচ্ছু শেফকে রান্না করতে দেয়নি। নাতনিদের জন্মদিনে আজ সব নিজের হাতে রেঁধেছে!”
আরশির মান অভিমান বরফের মতো গলে গেলো। নরম হয়ে এলো চোখজোড়া। সত্যিই! মেহমেদ আর মরিয়ম ওর জীবনে আল্লাহর দেয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত। নইলে ছেলের বউ হয়েও কেউ ওর মতো এতো আদর পায়?
বসার ঘরের সোফায় গোল হয়ে বসেছে সবাই। ছেলেদের সবার পরনে কালো ফরমাল স্যুট, ব্লেজার। মেয়েরা শাড়ি। শুধু বাচ্চাগুলো পার্টি গাউন আর প্রিন্সেস ক্রাউন মাথায় দিয়ে এর ওর পিছে ছুটে বেড়াচ্ছে।
আয়ান কিছু একটা বলে সবাইকে হাসাচ্ছে। আর জারা রাগী রাগী চোখে দেখছে তাকে। সন্তানসম্ভবা এমিকে বুকে আগলে আগলে রাখছে অভি। একমুহূর্তও চোখের আড়াল হতে দিতে দিচ্ছে না।
স্নোবল আর কোকোকেও শীতের হুডি পরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ওদের সামনে প্যালেটসের বাটি। তবে বাচ্চারা একটু পরপর এসে কোলে নিয়ে দলাই-মলাই করে আবার রেখে যাচ্ছে জায়গামতো। সাধারণত খরগোশ আট বছরের বেশি বাঁচে না, কিন্তু আরশির স্নোবল এখনো ওর সাথেই আছে। ছেড়ে যায়নি, একা করেনি।
“ আসতে পারি?”
রেপারে মোড়ানো চারকোনা বক্স বুকে আগলে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ানো বাচ্চা ছেলেটা, ইংরেজিতেই জিজ্ঞেস করলো ওদের। পরনে কানটুপি, মাফলার, জিন্স, ডেনিম জ্যাকেট। হ্যাজেল রঙা চোখে একরাশ সংশয়, ভয়।
বসার ঘরের সবার হাসি আড্ডা বন্ধ হয়ে গেলো। সবার চোখ এখন সদরদরজায়। শেহজাদ উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে বাচ্চাটার কাছে গেলো। হ্যাজেল রঙা চোখগুলো তখনও সন্ত্রস্ত চোখে দেখছে ওকে।
শেহজাদ মুচকি হেসে বাচ্চাটার ভয় দূর করার তাগিদে শুধালো,
“ অবশ্যই পারো ইয়াংম্যান! কিন্তু তার আগে তো বলতে হবে তুমি কে?”
“ আমি আলিয়ান। শায়নীর…”
“ বাবা! হি ইজ মাই বয়ফ্রেন্ড!”
আলিয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই কেউ একটা চেঁচিয়ে উঠলো শেহজাদের পেছনে দাঁড়িয়ে। আর সেই কেউ একটা স্বয়ং শায়নী। শেহজাদের গুণধর কন্যা।
শেহজাদ চোখ কপালে তুলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ ও তোমার বয়ফ্রেন্ড?”
শায়নী কিছু বলার আগেই আলিয়ান সজোরে দুপাশে মাথা নাড়লো। নিজের ভাষাতেই বোঝানোর চেষ্টা করলো,
“ আঙ্কেল, আমি শুধু ওর ফ্রেন্ড! বয়ফ্রেন্ড নই!”
জারাও ততক্ষণে উঠে এসেছে। আলিয়ানের কাছে এসে, ওকে দেখলো। পরপর কিছু একটা মনে পড়তেই শেহজাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ ভাইয়া, ওকে আমি চিনি। আমাদের স্কুলেই পড়ে। বোর্ডিং এ থাকে। আলিয়ান। আয়রা, আরাধ্যা, শায়নী ওদের ক্লাসফেলো।”
চার বছরের গ্রাজুয়েশন, এক বছরের পোস্ট গ্রাজুয়েশন আর এক বছর প্রাইভেট ফার্মে জব করে আরশি হাল ছেড়ে দিলেও জারা এখনো আয়ানের গ্র্যানীর সেই কিন্ডারগার্ডেন স্কুলটাতেই পড়াচ্ছে। মেয়েদেরও ভর্তি করেছে সেখানে।
শেহজাদ বোনের কথায় মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালো। আলিয়ানকে ভিতরে এনে সোফায় বসিয়ে ঘুরে দেখলো, আরশি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শায়নীর সামনে।
“ কতবার বলেছি, এসব পঁচা শব্দ। তুমি বয়ফ্রেন্ড মানে জানো, যে আলিয়ানকে তোমার বয়ফ্রেন্ড বলছো?”
শায়নী ঠোঁট ভেঙে মাথা নোয়ালো। কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“ আই উইল ম্যারি হিম। আলিয়ানকে আমি বিয়ে করবো, তাই ওকে আমার বয়ফ্রেন্ড বানিয়েছি!”
শায়নীর মুখে বিয়ের আধো বুলি শুনে আরশি চোখ রাঙালেও সবাই হেসে গড়াগড়ি খেলো। আয়ান আলিয়ানের কাছে গিয়ে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কী? করবে আমাদের মেয়েকে বিয়ে?”
আলিয়ান একবাক্যে জানালো,
“ নো ওয়ে। ও গতকাল চুল টেনে দিয়েছে আমার!”
শায়নী রাগী গলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানালো,
“ কারণ তুমি আমাকে রিজেক্ট করেছিলে আলিয়ান! তাই তোমার চুল টেনে দিয়েছি!”
আরশির চোখ তালুয় উঠিয়ে মেয়েকে দেখলো। যে মা কখনো কোনো ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি, তার মেয়ে কিনা স্কুলে গিয়েই ছেলেদের প্রপোজ করে ফেলেছে?
শেহজাদ আঙুল দিয়ে কপাল ডললো টেনশনে। আয়ান কোনো মতে হাসি চেপে আবার আলিয়ানকে শুধালো,
“ কিন্তু তুমি তো আজ ওর জন্য গিফট নিয়ে এসেছো!”
আলিয়ান চোখ নামিয়ে নিলো। মৃদু স্বরে আওড়ালো,
“ কজ আই ফেল্ট গিল্টি! আমার খারাপ লাগছিল ওর জন্য!”
সবার মনোযোগ আলিয়ানের দিকে ফিরতেই মায়ের সামনে থেকে ছুটে এসে শেহজাদের পায়ের পিছনে লুকালো শায়নী।
হাত টেনে পানিতে টইটম্বুর চোখ তুলে বললো,
“ বাবা! সেভ মি!”
শেহজাদ শ্বাস ফেলে মেয়েকে কোলে নিলো। তারপর শায়নীকে সহ আলিয়ানের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বললো,
“ তোমার চুল টেনে দেয়ার জন্য আমি ওর হয়ে সরি! বাট ইউ আর আ ব্রেভবয়। তোমার বাবা-মা কোথায় থাকেন? তুমি কি একা এসেছো এখানে?”
আলিয়ান শেহজাদের দিকে তাকিয়ে উপরনিচ মাথা নাড়লো। তারমানে একা এসেছে। তারপর মাথা নিচু রেখেই বললো,
“ আমার মা-বাবা নেই।”
কথাটা বুঝতে যেন সময় লাগলো শেহজাদের। আলিয়ান! অরফেন? এতিম? ওর মা-বাবা নেই?
আরশিও ততক্ষণে মেয়ের রাগ ভুলে আলিয়ানের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। পরপর গালে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে কোলে তুলে নিতেই ছেলেটা লজ্জায় যেন আরো মিইয়ে গেলো ওর কাঁধের সাথে।
জারা ওদের কাছে এসে ধীর স্বরে বললো,
“ আলিয়ানকে ওর এক পরিচিত আঙ্কেল এসে স্কুলের বোর্ডিংএ দিয়ে যায়। আমাদের স্কুল থেকে অনেক বাচ্চা এডপ্ট হয়েছে। ভেবেছিল ওকেও হয়তো কোনো ফ্যামিলি এডপশনের জন্য নিয়ে নেবে। কিন্তু ও এতো লাজুক! এতো দূর্বল। শুরু শুরতে ভীষণ কান্নাকাটি করতো। অসুস্থ থাকতো। এখন অবশ্য একটু একটু সামলে নিয়েছে নিজেকে!”
ততক্ষণে মরিয়মও এসেছে দাঁড়িয়েছে মেহমেদের পাশে। সবটা শুনে কিছু একটা ভাবলেন। পরপরই আনন্দ চকচক করে উঠলো ওনার প্রবীণ চোখজোড়া।
মেহমেদের কানের পাশে এসে আস্তে করে বললেন,
“ তুমি শায়ানকে একটু বলো না বাচ্চাটাকে যেন ওরা এডপ্ট করে নেয়? কি সুন্দর ফুলের মতো ফুটফুটে একটা ছেলে। আরশির কোলে কেমন মাথা লুকিয়ে রেখেছে। আমাদের মেয়েটার বুকটাও শান্ত হতো!”
মেহমেদ হাসান কিছু বলতে গিয়েও যেন পারলেন না। তারপর মাথা নুইয়ে শুধু শ্বাস ফেলে বললেন,
“ জোর করে কিছু হয়না মারু! পৃথিবীতে কত বাচ্চাই অনাথ। সবাই কি একটা ভালো পরিবার পায়? সবার কি মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়? তবুও তো রুশাদের স্কুলটা কত উন্নত! আয়ান দু-হাত ভরে ঢালে। আলিয়ান যদি এডপ্ট নাও হয়, তবুও ওখানে ভালো থাকবে।”
কিন্তু মরিয়মের মুখের কথা কেড়ে নিলো শেহজাদ। আরশির কোলে বাচ্চাটাকে দেখে কেমন বেখেয়ালে জারাকে বলে উঠলো,
“ এডপশন নিতে গেলে কিছু ফরমালিটিজ তো নিশ্চয়ই আছে? সব কিছু রেডি করে রাখিস। আর আলিয়ানের দরকারি যা যা আছে সবকিছু। আমি কালকে গিয়ে ওকে নিয়ে আসবো!”
সবাই বিস্ফোরিত চোখে শেহজাদকে দেখলো। কারণ এটা তো বিস্ফোরণই বটে। আরশি কতক্ষণ তো কিছু বলতেই পারলো না। জারা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে শুধালো,
“ ভাইয়া? তুমি আলিয়ানকে এডপ্ট করবে?”
শেহজাদ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তারপর শায়নীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ আলিয়ান এ বাড়িতে আসলে তুমি কী করবে?”
শায়নী দু’হাত দু’দিকে বাড়িয়ে বললো,
“ অনেএএএএক আদর করবো!”
সবাই আরো একবার হেসে খুন হলো মেয়ের কথায়। আরাধ্য সোফায় বসে ম্যাথ করতে করতে দুপাশে মাথা নাড়লো। সে বাবার মতোই চুপচাপ। ভীষণ গম্ভীর, ভীষণ পড়াকু। তার এসবে কোনো ইন্টরেস্ট নেই। আর শায়নী? সে মায়ের মতো ছটফটে। দূরন্ত। পড়াশোনা বাদে সবকিছুতে তার তুমুল আগ্রহ।
রাতে আলিয়ানকে আরশি নিজের হাতে খাইয়ে দিলো। মুখের সামনে খাবার ধরতেই ছেলেটা লক্ষ্মী বাচ্চার মতো হা করলো। আর তারপরই খাবার মুখে নিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আরশি ব্যস্ত হয়ে পড়লো ওর কান্না দেখে। পানির গ্লাস নিয়ে চিন্তিত গলায় শুধালো,
“ ঝাল লেগেছে বাবা? এই নাও পানি খাও?”
শেহজাদ দুই মেয়েকে খাইয়ে দিতে দিতে ওদের দিকে তাকালো। আলিয়ানকে আনত মুখেই দুপাশে মাথা নাড়তে দেখে আরশি ফের নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ তাহলে কাঁদছিলে কেনো?”
“ মায়ের কথা মনে পড়ছিল। কত দিন এভাবে কেউ খাইয়ে দেয় না। বোর্ডং এ সবাইকে নিজের হাতে খেতে হয়! আর আঙ্কেলের বাসাতেও!”
আরশির চোখ ভিজে উঠলো আলিয়ানকে দেখে। ওর কথা শুনে। এইটুকু বাচ্চা, এতোটা একা? ওকে কেউ খাইয়ে দেয়ার কেউ নেই, অথচ শায়নী আর আরাধ্যাকে এখনও ওরা কত আহ্লাদ করে খাইয়ে দেয়। যেদিন শেহজাদ ব্যস্ত থাকে, আরশিও ব্যস্ত থাকে, সেদিন মেহমেদ আর মরিয়ম তো ওদের পিছনে সারাক্ষন ছুটোছুটি করে। আর এই ছেলেটা?
আয়ান রুথকে কোলে নিয়ে জারার হাত থেকে খাবারের লোকমা মুখে তুলে নিতে নিতে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ সারাজীবনে তুই একটা ভালো কাজ করলি ভাই। আমার শ্বশুর তো আমাকে আরেকটু হলেই বাউন্ডারির বাইরে করে দিচ্ছিল বিয়ের আগে, আর আলিয়ান ছোট থেকেই ওর শ্বশুরের কাছে কাছে থাকেবে! আ’ম সো প্রাউড অফ ইউ।”
“ শাট আপ!”
আয়ান “শাট আপ” হলো না। শেহজাদকে ও আগেও পাত্তা দেয়নি, এখনও দেয়না। ও ওদের দুইবছরের ছেলে রুথকে কোলে নিয়ে আরো অনেক কিছু বলে সবাইকে হাসালো। আর ফাঁকে ফাঁকে জারা আয়রা আর ওর বাবাকে একসাথে খাইয়ে দিলো। কারণ রুথের ঘুম ভেঙে গেলে, ছেলেটার চিৎকারে আর কারোর খাওয়াই হবে না তখন।
খাওয়া দাওয়ার পরপরই এমির শরীর খারাপ লাগা শুরু হলো। অভিও আর বেশিক্ষন আড্ডা দিতে পারলো না। সবার থেকে বিদায় নিয়ে এমিকে নিয়ে রওনা হলো বাড়ির উদ্দেশ্যে।
মেহমেদ আর মরিয়মও আয়রাকে নিজেদের সাথে নিয়ে গেলো ঘুম পাড়াতে। ওদিকে আরশির কোলেই আলিয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। শেহজাদের স্টাডি রুমে এখন শুধু দুই বন্ধু, জারা, আরশি আর ওর মেয়েরাই জেগে আছে।
আরাধ্যা কাউচে বসে স্টোরি বুক পড়ছে। তার এদিকে কোনো মনোযোগ নেই।
আয়ান শেহজাদকে আবারও কিছু একটা বলছিল, কিন্তু ওদের কথার এক ফাঁকেই শায়নী বাবার কোলে উঠে, শেহজাদের গালের দুপাশে দু’হাত রেখে জিজ্ঞেস করে বসলো,
“ বাবা! তুমি কাকে বিশি ভালোবাসো? আমাকে নাকি আরুকে?”
শেহজাদ হতচকিত চেয়ে দেখলো মেয়েকে। শায়নী যে ভীষণ সিরিয়াস একটা প্রশ্ন করে ফেলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আয়ান মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলে ফেললো,
“ এই রে! কাজ সেরেছে!”
শেহজাদ অপ্রস্তুত হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। তারপর ধীর স্বরে আওড়ালো,
“ তোমাদের দু’জনকেই আমি সমান ভালোবাসি!”
কিন্তু শায়নী শুনলো না। সে গাল ফুলিয়ে বললো,
“ দু’জনকে একসাথে সমান ভালোবাসা যায় না। আলিয়ান বলেছে, ও ক্লাসের সবার মধ্যে আমাকে বেশি ভালোবাসে বলেই আমি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। তুমি পৃথিবীর সব আম্মুর মধ্যে শুধু আমার আম্মুকেই বেশি ভালোবাসো বলে আম্মু তোমার বউ। তারমানে নিশ্চয়ই তুমি আমার আর আরুর মধ্যেও যেকোনো একজনকে বেশি ভালোবাসো?”
শেহজাদ ফ্যালফ্যাল করে একবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে একবার আরশির দিকে তাকালো। আরশি তখন ঠোঁট টিপে মুচকি মুচকি হাসছে। মানে হলো, নাও এবার দেখো কেমন লাগে!
শেহজাদ মেয়ের মাথার এলোমেলো চুল আর প্রিন্সেস ক্রাউনটা ঠিক করে দিতে দিতে বললো,
“ তার আগে তুমি আমাকে বলো, আজ তোমার আর আরাধ্যার মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি গিফট পেয়েছে?”
শায়নী হাতের কর টিপে টিপে কিছু একটা গুনলো। তারপর অনেক ভেবে জানালো,
“ আমরা দু’জনই সমান সমান গিফট পেয়েছি!”
শেহজাদ আবারও প্রশ্ন করলো,
“ আচ্ছা, আজকে আরাধ্যা আর তোমার মধ্যে কার ড্রেসটা সবচেয়ে বেশি প্রিটি?”
শায়নী আবারও ভেবে চিন্তে বললো,
“ আমাদের দুজনের ড্রেসই তো প্রিটি!”
“ আর বাবা খাইয়ে দেয়ার সময় কাকে আগে খাইয়ে দেয়?”
“ দু’জনকেই একসাথে খাইয়ে দেয়!”
শেহজাদ মুচকি হাসলো। তারপর মেয়ের গালে চুমু খেয়ে বললো,
“ তাহলে তোমার কেনো মনে হলো মামণি যে তোমাদের দু’জনের মধ্যে কাউকে একটু বেশি আর কাউকে একটু কম ভালোবাসবো? আমি তোমাদের দু’জনকেই সমান ভালোবাসি!”
শায়নী প্রশ্নের উত্তর পেয়ে বিজয়ীর হাসি হাসলো। প্রথমে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে ফোকলা হেসে বললো,
“ তুমি এই পৃথিবীর বেস্ট বাবা!”
আর তারপর আরাধ্যার দিকে তাকিয়ে বললো,
“ অতো পড়ে লাভ নেই! বাবা বলেছে সে আমাদের দু’জনকেই সমান ভালোবাসে। বিশি পড়লেই বাবা তোমাকে বিশি ভালোবাসবে না। হুহ!”
আরাধ্যার শায়নীর দিকে তাকালো না, কিন্তু শায়নীর কথা শুনে সবাই হোহো করে হেসে উঠলো। শায়নীও হাসলো। তারপর আরশি যখন ওদের ঘুম পাড়াতে রুমে নিয়ে যাবে বললো, তখনই বায়না জুড়ে দিলো সে! আজ শায়নী কিছুতেই অন্য ঘরে ঘুমোবে না। সে বাবার সাথে ঘুমোবে। বাবা মায়ের মাঝে শুয়ে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমোবে। আরাধ্যাকে সাইডে একটু জায়গা দেবে, কিন্তু সে থাকবে মাঝখানে।
আয়ান রুথকে জারার কোলে দিয়ে শায়নীর কাছে গিয়ে বললো,
“ আজ বাবাকে মাম্মামের কাছে গল্প শুনতে দাও। কাল নাহয় তোমরা শুনবে। দেখছো না বাবা টেনশনে কেমন ঘামছে তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে। বাবাকে একটু গল্প শুনে রিল্যাক্স হতে দাও!”
অমনি আয়ানের কান টেনে ধরলো শেহজাদ।
“ কিসব হাবিজাবি জিনিস বলছিস ওকে?”
আয়ান ব্যথায় কুইকুই করতে করতে বললো,
“ আমি কোথায় হাবিজাবি জিনিস বললাম! এজন্যই বলে মানুষের ভালো করতে নেই! উফফ!”
চাঁদের গায়ে মেঘ জমেছে। তুষারপাতে ঢেকে গেছে শহরের সমস্ত ব্যস্ততা। নীরব, স্থবির পাইন গাছটাও অপেক্ষার প্রহর গুনছে। আর ভাবছে, কখন সকাল হবে?
“ আরেকটু লম্বা হোক আজ রাতটা। আজ আরেকটু দেরিতে সকাল হোক!”
শেহজাদের চুলে হাত বুলোতে বুলোতে আরশি থেমে গেলো। কোলের উপর রাখা মুখখানার উপর ঝুঁকে শুধালো,
“ এটা আবার কেমন কথা? কেনো সকাল দেরিতে হবে?”
শেহজাদ আড়মোড়া ভেঙে আবারও আরশির কোলেই ঘুমের প্রস্তুতি নিলো। কম্ফোর্টার টেনে বললো,
“ রাত শেষ হয়ে গেলো তো এতো আরাম পাবো না। সকালে আবার ব্যস্ত হয়ে যেতে হবে!”
শেহজাদ আফসোসের সাথে বললেও আরশি ঠোঁট টিপলো। বেশ অনেকক্ষণ পর যখন বুঝলো শেহজাদ ঘুমিয়ে পড়েছে তখন আস্তে করে ওর কানের পাশে মুখ নিয়ে বললো,
নে আদরে জড়িয়ে মন শেষ পর্ব
“ আলিয়ানকে আনার জন্য থ্যাঙ্কু। শায়নী আর আরাধ্যার বেস্ট বাবা হওয়ার জন্যও আপনাকে থ্যাঙ্কু!”
“ আর বেস্ট হাজবেন্ড হওয়ার জন্য বুঝি কিছু না?”
শেহজাদ চোখ বন্ধ করে নিম্নাষ্ঠ কামড়ে হেসে বললেও আরশি ভূত দেখার মতো সরে এলো ওর কানের পাশ থেকে। অবিশ্বাস নিয়ে শুধালো,
“ আপনি ঘুমোননি এখনও?”
