Home নোলকের নতুন শাড়ি নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ২

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ২

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ২
ইলোরা ফারদিন

হাসান দরজা খুলেই দেখে তার মা রেগে মেগে একাকার অবস্থা। এতোক্ষণে মায়ের চিৎকার চেচামেচিতে বিয়েতে আসা অন্যান্য অতিথীরাও জেগে গিয়েছে। সবাই বৈঠক রূমে ভীড় জমিয়েছে।
হাসান শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,” কি হয়েছে মা? এভাবে সাজ সকালে চেচামেচি করছো কেনো? আত্মীয়স্বজনে রা কি ভাববে?”

” ওসব কথা বাদ দে। আমি যে সকাল থেকে না খেয়ে আছি সে বিষয় কি খেয়াল আছে তোর? তোর ওই ছোটলোক বউ রান্না ঘরে না যেয়ে এখনো ঘরে ঢুকে আছে? সাহস কতবড় ওর।”
“এখানে সাহসের কি আছে মা? ওর শরীর ভালো নেই। আর বাসায় তো রতনের বউও আছে। ওকে বললেই পারতে আজকে সকালের নাস্তাটা করে দিতে।”
ছেলের কথায় থমথম খেলেন ফরিদা বানু। হাসানের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু রতনের শ্বশুর পুলিশ। ওর বউ শিক্ষিত মেয়ে। সে কি আর শ্বশুর বাড়ির কাজ করবে। তবু তেজ দেখিয়ে তিনি বললেন,” রতনের বউ কেনো করবে? ও কি পারে না কি এসব কাজ?”

হাসান কিছু বলার আগেই পেছন থেকে নোলক এসে বলল,” কেনো পারবে না আম্মা? সতেরো বছর বয়সে যখন আমি এ সংসারে বউ হয়ে আসলাম, তখন আমিও কিছু পারতাম না। মনে নেই আপনার? কত বার হাট কেটেছি, হাত পুরেছি। কই কোনোদিন তো এতো দরদ দেখান নি। উলটো বলেছেন কাজে ফাকি দিতে আকাম ঘটাই আমি। একদিন তরকারিতে লবণ সামান্য কম হওয়ায় পুরো তারকারি ফিকে ফেলে দিয়েছিলেন। আমাকে ফিয়ে আবার রান্না করিয়ে নিয়েছিলেন, ভুলে গিয়েছেন সেসব দিনের কথা আম্মা?
যেভাবে আমাকে রান্না ঘরের কাজ শিখিয়েছিলেন, ঠিক ওভাবেই এখন আপনার মেঝো বউমাকে দিয়েও ঘরের কাজ শেখান। আর তার বিয়ের ছয় মাস হয়ে গিয়েছে, এখন সে আর নতুন নেই। সাত বছর আমি খেটেছি, এবার অন্তত সে খাটুক
যেহেতু ঘরে এখন দুজন বউ। কাজও তাই দুজনে মিলেই করব। আমি একা ঝিগিরি খাটতে পারব না।” বলে সে আবার ঘরে
নোলকের কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলেন ফরিদা বানু। এ কোন নোলককে দেখছেন সে। এই মেয়ে যে কিনা আগে তার সামনে ভয়ে কাপত, সে এভাবে মুখের উপর কথা বলছে!

সকালের নাস্তার জন্য সবাই বৈঠক ঘরে বসেছে। হাসান যেয়ে হোটেল থেকে খাবার নিয়ে এসেছে। সবার খাবার মাঝেই নোলক হাসানকে জিজ্ঞেস করলো,” এই যে খাবার গুলো আনলেন, বিল কত এসেছে?”
পাশ থেকে বিনু বলল,” এখন বিল নিয়ে এতো কষ্ট পাচ্ছ, তখন নিজেই রান্নাটা করলে ভাইয়ার এতোগুলো টাকা নষ্ট হতো না।”
নোলক বিনুকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে হাসানকে আবার জিজ্ঞেস করলো,” কি ব্যাপার বললেন না তো খরচ কত হলো?
হাসান ভালোই বিব্রত হলো, এতোগুলো আত্মীয়স্বজনের সামনে এভাবে নাস্তার দাম জিজ্ঞেস করার মানে টা কি। নোলক কি চায়। বলল,” ঘরে এসব কথা হবে, এখন থাক।”
কিন্তু নোলক তো নাছর বান্দা, সে আবার জিজ্ঞেস করল,” খরচ কত হয়েছে বলেন আগে।”
বিরক্তি নিয়ে হাসান বলল,” চার হাজার।”

এবার সবাইকে অবাক করে দিয়ে নোলক রতনকে বলল,” রতন ভাই, দুই হাজার টাকা দেন।”
রতন অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,” আমি দুই হাজার টাকা কেন দিব ভাবি?
” কেনো মানে? এই পরিবারের কি একমাত্র ছেলে তোমার বড় ভাই? এতোদিন নাহয় তোমার চাকরি বাকরি ছিল না, তাই তোমার ভাই সব দায়িত্ব নিজে পালন করেছে। কিন্তু এখন তো তোমার চাকরি আছে। মাসে মোটা অংকের বেতন পাও, তাহলে এখন কেনো সব দায়িত্ব তোমার ভাই একা পালন করবে?
আজকে নাস্তার বিল এসেছে চার হাজার, দুই হাজার তুমি দিবে আর দুই হাজার তোমার ভাই।”
নোলকের কথায় ফুসে উঠলো রতনের স্ত্রী। গর্জে উঠে বলল, ” রতন কেনো দিবে? রতন কি বলেছিল বড় ভাইয়াকে আগ বারিয়ে খাবার আনতে। যেমন এনেছে তেমন দিক নিজে বিল।”
রতনও সে বিষয়ে সায় দিল।

” তাই বুঝি? তাহলে এটাই হলো, আজ থেকে এই সংসারে কোনো খরচ আমার স্বামী একা করবে না। যা খরচ হয় তিন ভাই মিলে করবে। নাহয় আমার স্বামীকে আমি এক টাকাও খরচ করতে দিব না।”
এর মধ্যে হাসানের ছোট ভাই আতংকিত কণ্ঠে বলল,” আমি কি করে খরচ দিব ভাবি। আমি তো এখনো পড়াশুনা করছি।”
” ভালো তো, এই যে শখ করে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছো, তার খরচ আশা করি জানা আছে। একবারও ভেবেছো ওই খরচ জোগাতে তোমার ভাইয়ের নিজের হাতে কোনো টাকা থাকে কি না। গত এক বছর ধরে ওই দুটা শার্ট অদল বদল করে তোমার ভাই অফিসে যায়। এক টাকাও তার সেভিংস নেই। আজকে তোমার ভাই মরলে, কালকেই আমাকে থালা হাতে রাস্তায় বসতে হবে। তোমরা যেমন, আমার বোঝা হয়ে গেছে। তোমার ভাই মরলে আমাকে আর আমার বাচ্চাদের এক কাপড়ে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলবে তোমরা। রতন ভাইয়ের কাছে দুই হাজার টাকা চাইলাম দেখে সে আর তার স্ত্রী রেগে গেল, আর তারা নাকি নিবে আমার আর আমার বাচ্চাদের দায়িত্ব।”
এরপর থেমে এবার হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল,” আজ দুপুরে যদি এক টাকাও খরচ করেছো। তোমার একদিন কি আমার এক দিন। আর মিনুর বিয়েতেও আমি তোমাকে আর একটা টাকাও খরচ করতে দিব না। হয় দুই ভাই ভাগাভাগি করে খরচ করবে আর নাহয় আম্মার একাউন্টে যে জমানো টাকা রয়েছে তা দিয়েই সে মেয়ের বিয়ে দিবেন। ” বলেই নোলক ঘরে চলে গেল

নোলক যেতেই ফরিদা বানু কাদতে কাদতে বলল, ” এ কি দিন আসলো। এ কোন কাল নাগিনীকে ঘুরে আনছি আমি। আমার পোলাদের ভাগ করতে চায়। আমার মেয়ের সুখ দেখে হিংসা করে। তুই আজকেই এই নাগিনী টাকে তালাক দিবি হাসান। এটা তোর মায়ের আদেশ। নাহলে আমার মরা মুখ দেখবি।”
হাসান এবার তাচ্ছিল্য হেসে বলল,” কই নিজের মেঝ ছেলেকে তো কোনো দিন এমন কসম দেও নি মা। আমাকে এরকম কথা বলার আগে একবারও ভাবলে না আমি নোলকে ছাড়লে আমার বাচ্চা দুটোর কি হবে? সব সময় শুধু নিজেদের স্বার্থের কথাই ভেবে গেলে মা?

বাবা মারা যাওয়ার পর তোমার অন্য বাচ্চাদের দায়িত্ব নিতে যেয়ে আমার পড়াশুনা বন্ধু হলো। বাধ্য হয়ে সরকারি স্কুলে পিয়নের চাকরি নিলাম। সেই অল্প বেতন দিয়েই তোমার সব বাচ্চাদের পড়াশুনা করালাম। বাবার জমি বেচে সেই টাকায় তোমার মেঝো ছেলের চাকরি নিয়ে দিলা, তোমার বড় মেয়ের বিয়ে দিলাম। বাকি টাকা তুমি নিজের লকারে রেখে দিলে । কিন্তু সে টাকায় আমারও ভাগ ছিল। সেটা আমায় দিলে না।
বিয়ের বয়স হওয়া সত্ত্বেও আমার বিয়ে দিলে তেত্রিশে যেয়ে। এখন আমার বয়স চল্লিশ। শরীর ভেঙে পরেছে। ক’দিন বাচবো জানি না।

কিন্তু আমার কিছু হলে আমার স্ত্রী সন্তানদের কি হবে মা? আজ যা দেখলাম, অনেক কিছুই বুঝেছি। নোলকের ভয় অহেতুক না। মা ভাই বোনের কথা ভাবতে যেয়ে নিজের স্ত্রী সন্তানদের প্রতি অবিচার আর করতে রাজি না আমি। হয় খরচে রতনও হাত দিবে। নাহয় তুমি তোমার ব্যংকে হাত দেও।”
রতন ফট করে বলল,” আমি কোনো টাকা দিব না। আর ভাইয়া তুই তোর দায়িত্ব পালন করেছিস, এসব নিয়ে এতো কথা বলার কিছু নেই।”

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১

হাসান ভাইয়ের দিকে চেয়ে তাচ্ছিল্য হাসল,তার বিনুকে বলল,” তোর ভাবির গহনা দুপুরের মধ্যে ফেরত দিবি, নাহয় পুলিশ ডাকতে বাধ্য।”
ভাইয়ের কথা মাটিতে বসে পরলো বিণু! ভাই কি এখন তাকে পুলিশে দিবে!!!!

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৩