Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩ (২)
ইনান হাওলাদার

তূর্য ছোটকাল থেকেই কারো সাথে রুম শেয়ার করতে অভ্যস্ত নয়।তাই তারা তিনটা রুম বুক করেছে।একদম কর্নারে বেলকনিসহ রুম তূর্যের।তার পাশের রুমে তাসিন আর নাবিল।মাঝে দুইটা রুম গ্যাপ দিয়ে পরেরটায় পিংকি আর আলিয়া।তারা চেয়েছিল ছেলে তিনজন এক রুমে থাকবে।কিন্তু তূর্য তাদের সাথে রুম শেয়ার করায় অমত করলে তাসিন বলেছিল,

“এখন আমাদের সাথে রুম শেয়ার করতে পারছিস না।বিয়ের পর কী করবি ?তখন তো বেডও শেয়ার করতে হবে”
তখনই কাটকাট কন্ঠে উত্তর ভেসে আসে,
” দিস ইজ নান অফ ইউর বিজনেস ”
প্রায় অনেকক্ষণ হয়েছে ভোরের আলো ফুটেছে।তূর্য এখনো বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।পরনে শুধু একটা ট্রাউজার । কোমর পর্যন্ত কম্বল দ্বারা আবৃত করে রাখা।কাঁচের জানালাটা সামান্য ফাঁকা হয়ে থাকায় সেখান থেকে একগুচ্ছ আলোক রশ্মি তার বলিষ্ঠ পিঠে স্থান পেয়েছে।আলোকরশ্মিটা একদম তির্যকভাবে পড়েছে।গায়ের রং ধবধবে ফর্সা অর্থাৎ কৃতিম উজ্জ্বল্য নয় ,আবার শ্যামলার গভীরতাও নয়।মাঝামাঝি এক দৃঢ় অকৃত্রিম আভা হওয়ায় পিঠে যেন জ্বলজ্বল করছে।এরইমধ্যে সেই আলোকরশ্মি গুচ্ছ নিজ ইচ্ছায় স্থান পরিবর্তন করে সুদর্শন পুরুষটার কপাল আর চোখ জুড়ে পড়লো।তাদের কিরণে কপালের এলোমেলো সিল্কি চুলগুলো যেন ঝকঝক করছে।এরমক পরিস্থিতিতে তাকে দেখলে যেকোনো রমণীর ঘোর লেগে যেতে পারে।কিন্তু বিছানায় পড়ে থাকা লোকটার মনে হয় ভালো লাগলো না।আলোকরশ্মি থেকে বাঁচতে নাক – চোখ কুঁচকে সমগ্র মুখটাকে বালিশের ভিতর ডাবিয়ে দিলো।

গত রাতে মার্কেট থেকে ফিরতে লেট হওয়ায় তূর্য আর কল ব্যাক করেনি।ঘুমের ভিতর হঠাৎ মস্তিষ্কে কড়া নাড়লো কথাটা।হাতের আন্দাজে বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখার জন্য সাইড বাটনে প্রেস করলো।হঠাৎ আলোয় ভ্রু – চোখ একসাথে কুঁচকে পিটপিট করে ফোনের স্ক্রিনে তাঁকালো সে।
বেলা অনেকটা গড়িয়ে গেছে । দ্রুত বিছানা ত্যাগ করে ফ্রেশ হলো। গায়ে একটা টিশার্ট জড়িয়ে ফোন হাতে বেলকনিতে রাখা পশমি চেয়ারে বসলো।পারভিন বেগমের নাম্বারে কল করলো।কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। এমন কখনও হয়নি।যেখানে একবার রিং হতে না হতেই রিসিভ হয়।সেখানে তিন তিন বার কল করেও কোনো সাড়া শব্দ পেলো না ।

কিছুক্ষণ নিউজফিড স্ক্রল করে রুমে গিয়ে ল্যাপটপ এনে পুনরায় বেলকনিতে গিয়ে বসলো সে।কিছু একটা ভেবে আবার কল করলো মায়ের নাম্বারে।দুইবার রিং হতেই রিসিভ হলো এবার।তবে অপর পাশের ব্যক্তিকে দেখে যতটা না মেজাজ বিগড়েছে তার চেয়ে বেশি মেজাজ বিগড়ালো তার ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে।
” তুই কী করছিস আমার রুমে ?”
” আসলে তূর্য ভাই,আমার একটা টিশার্ট প্রয়োজন । আপনাকে তো আমি কল করেছিলাম।কিন্তু আপনি ছিলেন না।তবে আমি একটা গোপন তথ্য জেনে গেছি।তাই না বলেই দুটো টিশার্ট নিলাম ।এখন তো আপনি কিছু বলতেও পারবেন না।আর কিছু বলতে গেলে আমি আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারব । আর….”
” দুটো টিশার্ট দিয়ে কি করবি ?” তূর্য কথা না বললে বোধ হয় আরো অনেক কিছু বলতো আহি।তবে কী গোপন তথ্য জেনেছে সেটা ঠাওর করতে পারল না তূর্য।এসব নিয়ে তার মাথা ব্যথাও নেয়।নিশ্চিত মনের আন্দাজে উদ্ভট কিছু ভেবে বসে আছে।এসব ঘটনা আগে পরেও কম ঘটেনি।

” আসলে প্রথমে একটা নিয়েছিলাম ।কিন্তু সেটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।তাই আরেকটা নিয়েছি ।এটাও নষ্ট হওয়ার পথে।আরেকটা নিবো,তূর্য ভাই?”
” দেখি ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে রুমটা দেখা তো !”
আহি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভালো করে রুম দেখলো।যাক! যা হবার দুটো টিশার্টের উপর দিয়ে হয়েছে।বড় বাঁচান বাঁচিয়েছেন আল্লাহ ।মনে মনে কথাগুলো ভাবতে না ভাবতেই বিছানার দিকে চোখ গেলো তার।মুহুর্তেই এতক্ষণ ধরে চাপিয়ে রাখা রা’গটা মস্তিষ্কে দা’উদা’উ করে জ্বলে উঠলো। সারা বিছানায় রঙের মাখামাখি।সাদা বেড শিটটা যেন রঙিন রংধনুতে পরিণত হয়েছে। দাঁতে দাঁত পি’ষে ফের বলল,

“বিছানার কী হাল করেছিস ?”
” আপনার বুঝি একটাই বেড শিট?না তো! তাহলে এত রে’গে যাচ্ছেন কেন ? ”
” বল কী করলে তুই আমার রুমে আসা অফ করবি?”
“উমমম …এক কাপ দুধ চা বানিয়ে খাওয়ালে।না থাক! আপনার কষ্ট কমিয়ে দেই,লাল চা খাওয়ালেও হবে”
” নীল চা খাওয়াবো।খাবি?”
“সেটা আবার কিভাবে বানাবেন, তূর্য ভাই?”একটু ভেবে প্রশ্ন করলো আহি।
” বি’ষ মিশিয়ে ”

সে তো ভেবেছিল হয়তো হার:পিক নয়তো জামায় দেওয়া ব্লু দিয়ে বানাবেন তূর্য ভাই।এতে বড় জোর পেট খারাপ হয়ে কয়েকদিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকত।কিন্তু এই লোক তো পুরো দুনিয়া ছাড়ার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে।
” থাক আর জানে মা’র’তে হবে না।চলে যাচ্ছি আপনার রুম থেকে ।আর টিশার্টও কিনে দিবো,বিয়ের পর আমার স্বামীর টাকা দিয়ে।”
” তোর স্বামীর টাকার গু’ষ্টি কি…. ” কথাটা আর শেষ করলো না তূর্য।ফোনটা কেঁটে দিলো সে।রা’গের মাথায় কিনা কি বলে বসবে ।তারপর দেখা গেলো কথা ঘুরে ফিরে তার গায়েই পড়ল।

আজ সাজেক ট্যুরের তৃতীয় দিন।সবাই মিলে কংলাক পাহাড়ে গিয়েছে।সাজেকের সবচেয়ে উঁচু স্পট। এখান থেকে ভোরের কুয়াশা আর সন্ধ্যার সূর্যাস্ত খুবই সুন্দর লাগে।তাই তারা কুয়াশা দেখার জন্য খুব ভোরে বেরিয়েছে।পিংকির শরীরটা আজ ভালো নেয়। কাল অনেকক্ষণ ধরে হাজাছড়া ঝর্ণায় ভেজার দরুন জ্বরজ্বর লাগছে।তাই সে থেকে গিয়েছে।বাকিরা অনেক রিকোয়েস্ট করেও নিতে পারেনি।

“তুই ওগো লগে যাস নায় ক্যান?”
দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বলল নাবিল।
” তুই যাসনি কেনো?আর আমি একটা মেয়ে মানুষ।তুই দরজায় নক না করে ঢুকলিই বা কোন আক্কেলে?”
” কথা কম কস বা’ড়া । ডুকছি তো কি হইছে ? আমি কী তোর সাথে অ’শ্লী’ল’তা করতাছি ?”
” ভালোই তো শুধু কথা শিখে গেছিস ”
” এই নাবিল সব পারে বুজসোস? জাস্ট চর্চা করি না বা’ড়া ”
” যা! এখন রুম থেকে বের হয়ে দেখা ”
নাবিল হঠাৎ পিংকিকে ধাক্কা দিয়ে নরম হতে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো।হঠাৎ আক্রমণে পিংকি চিৎ’কার করে উঠতে ধরেছিল।কিন্তু তার আগেই নাবিল তার মুখ চেপে ধরে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,

” হুস….! দেখ তোর জন্যে শুদ্ধ ভাষায় কথা কওয়ার ট্রাই করতাছি।বা’ড়াও কইতাছি না বা’ড়া ”
বলে পিংকির মুখ থেকে নিজের এক হাত সরিয়ে নিলেও অপর হাতখানা দ্বারা তাকে চেপে ধরে আছে। বাধন থেকে ছোটার জন্য পিংকির ছটফটানি দেখে ফের বলল,
” মানলাম বাপ – মায় তোর নাম পিংকি রাখছে।তাইতে কী মাংকির মতো লাফালাফি করতে হইবো বা’ড়া ?
” এই নাপিতের বা’চ্চা কথা কম বলে দূরে সর ” নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল পিংকি।
” নে বা’ড়া দিলাম ছেড়ে।তুই এখন যাইয়া মর ” বলে পিংকিকে ছেড়ে দিলো সে।যেভাবে রুমে এসেছিল ঠিক সেভাবে আবার বেরিয়ে গেলো।তবে এবার অধরে মিষ্টি হাসির রেখা দেখা গেলো।আর পিছনে রেখে গেলো দোটানায় ভুগতে থাকা এক মানবিকে।

তূর্য কংলাক পাহাড় থেকে ফিরেছে প্রায় আধ ঘন্টা হয়েছে।পাহাড়ে থাকাকালীন পারভিন বেগমকে কল করেছিল ভোরের কুয়াশা দেখানোর জন্য।রিসিভ হচ্ছে না দেখে একে একে বাড়ির প্রত্যেকের ফোনে কল করেছে।কিন্তু কেউই রিসিভ করলো না।প্রথমে ভেবেছিল পারভিন বেগমের ফোন আহির কাছে তাই হয়তো রিসিভ করছে না।কিন্তু প্রত্যেককে ফোন দিয়ে যখন না পেলো ।তখনই হোটেলে ব্যাক করেছে।
আজ সকালে হুট করেই মনের ভিতর কেমন করে উঠেছিল।এখন আবার বাড়ির কেউই কল রিসিভ করছে না দেখে মনটা ভীষণ কু ডাকছে।যদিও এসবে বিশ্বাসী না সে।তবুও মনের ভিতরের অ’স্থিরতা তাকে কাবু করে ফেলছে।সবার কথা বাদ যাক,বাবা – কাকারাও ফোন তুলছেন না কেন?

টেনশনে মাথা কাজ করছে না তার।ফোন হাতে বারবার বেলকনির এপাশ ওপাশ পায়চারি করছে।ঘুরতে এসে সে কোনো ভুল করে ফেললো না তো? মায়ের কিছু হয়েছে? নাকি ছোট বাবার? লায়েক শিকদার কিছু করেনি তো?
লায়েক শিকদার আর আসিফ চৌধুরীর মধ্যে দ্ব’ন্দ্ব শুধু ক্ষ’মতা নিয়ে নয়,এর পেছনে নিশ্চয় অন্য কোনো কারণ আছে।সেটা অনেক আগেই আন্দাজ করেছে তূর্য।সেটা নিয়ে সে আসিফ চৌধুরীর কাছে যতবার জিজ্ঞেস করেছে ততবার তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেছেন।এবার বাড়ি ফিরে সে যে করেই হোক সত্য জেনে ছাড়বে।কিন্তু তার আগে একবার বাড়িতে কথা তো বলতে হবে!হঠাৎ বাড়ির ল্যান্ডলাইন এর কথা মাথায় আসলো।এতক্ষণ কেনো মাথায় আসেনি সেটা ভেবে মনে মনে নিজেকে কয়েকটা গা’লি দিয়ে ফোন লাগালো।দুইবার রিং হয়ে হয়ে কেঁ’টে গেলো।তৃতীয়বারের মাথায় রিসিভ হলো।তবে ওপাশ থেকে ফুঁ’ফিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনে তূর্যের অস্থিরতা আরো বেড়ে গেলো।সে একমুহুর্তের জন্য ভাবলো এটা আহি কিন্তু পরমুহুর্তেই ঠাওর করতে পারল কণ্ঠের মালিককে।তারমানে বাড়িতে সত্যিই কিছু হয়েছে।সে উ’দ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,

“কী হয়েছে ভাইয়া? কান্না করছিস কেনো?”
“……..”
” কথা বল, তাহি।ভাইয়ার টেনশন হচ্ছে তো ”
” আহি আপু…..”
” আহি আপু কী? মে’রেছে তোকে?” তূর্য ভালো করেই জানে আহি কখনো ছোট ভাই – বোনদের গায়ে হাত তুলে না তবুও জিজ্ঞেস করলো। সে আজ খুব করে চাইছে বোনের কান্নার কারণ যেন এটাই হয়।কিন্তু অপর পাশ হতে বাচ্চা কন্ঠটা ফুঁ’ফিয়ে ফুঁ’ফিয়ে বলে উঠলো ,
” না …”
” তাহলে ?তাহলে কী হয়েছে।কান্না থামিয়ে বল ভাইয়া,প্লীজ”

” আহি আপু কাল সন্ধ্যায় ওর ফ্রেন্ড ,তারিন আপুদের বাড়িতে গিয়েছিল।সেই ভোরে রওনা দিয়েছে। ছয়টার সময়।কিন্তু এখনো ফেরেনি।একটা দু’ষ্টু লোক ফোনে টাকা চেয়েছে।আব্বু টাকা দিয়ে দিয়েছে।কিন্তু লোকটা আর কল ধরছে না ”
কোনো রকমে হেঁ’চকি তুলে তুলে কথাটা বলে আবারো কান্না আরম্ভ করলো তাহি।
” বড় কেও থাকলে তার কাছে ফোনটা দে ”
” …………..”
” কী হলো , তাহি? ” ধম’কের সুরে বলল তূর্য।এই প্রথম বারের জন্য তাহির সাথে সে উচ্চস্বরে কথা বলল।পরমুহুর্তেই আবার নরম কণ্ঠে বলল,
” বড় কেও থাকলে তার কাছে দে ভাইয়া ”
” কে…ও নেয়।মে..জো মা অসু..স্থ হয়ে প..ড়েছে। আ..ম্মু,ছোট মা সে..খানে ।আ..র আব্বুরা স..কলে আ..পুকে খুঁ..জতে বেরিয়েছে।”

“আমি দেখছি,ভাইয়া।ভাইয়া আছি না আপুকে ঠিকই খুঁজে বের করব।কান্না থামাও আপি।ওকেই? ” কথাটা শেষ করেই বেরিয়ে পড়ল তূর্য।কল কেটেছে কিনা সেই খেয়ালটুকুও নেয় তার।বোনকে তো বলে দিলো খুঁজে বের করবে।কিন্তু কি করে? এখান থেকে ঢাকা ফিরতে কম হলেও সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগবে।পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় চার পাঁচটা বাজবে।তখন যদি সাথে করে নিয়ে আসতো তাহলে আর এমনটা হতো না।কেনো আনলো না?
তূর্য এভাবে ছুটতে দেখে তাসিন পেছন থেকে ডেকে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৩

” এভাবে কোথায় ছুটছিস,তূর্য?এই ?”
” আ’ম গোয়িং ব্যাক টু ঢাকা ।তোরা ফেরার সময় আমার ল্যাগেজ সাথে করে নিস”
“হঠাৎ কেনো? আরে চেঞ্জ করে তো যা।এভাবে টি – শার্ট ,ট্রাউজার পরেই যাবি ?তূর্য ”
অপরপক্ষ থেকে আর কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে বাকি বন্ধুদের কাছে ছুটলো তাসিন।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৪