প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৫
ইনান হাওলাদার
সকালটা এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা সোনালি রোদ মেঝের ওপর গলে পড়ছে।আহি ঘুম থেকে উঠেছে কিছুক্ষণ হয়েছে। চোখে মুখে এখনও আলস্য লেগে আছে তার।
সে ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলো। সেখানে প্রান্ত আর তাহি দু’ষ্টুমি করছিল।তাকে দেখেই তাহি দৌঁড়ে গিয়ে পাশে বসে বললো আর বলল,
” আপু সকালে আমি তোমার রুমে গিয়েছিলাম।তুমি ঘুমিয়েছিল তাই ডাকিনি।লোকগুলো কি তোমাকে মে’রেছে গো?” শেষ বাক্যটা মুখ কালো করে বলল ।
” নাহ রে…! শুধু একটু না খাইয়ে রেখেছিল ”
আহির বাম গালে থাকা হাতের আঙুলের ছাপের দিকে নজর গেল তাহির।ফর্সা গালে আঙুলের দাগ গুলো যেন জ্বলজ্বল করছে। গুণে গুণে তিনটা আঙুলের ছাপ।তবে প্রথম দুইটা স্পষ্ট হলেও বাকি একটা অতটা স্পষ্ট নয়।সেটা দেখে তাহি স’ন্দিহান কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
” তাহলে তোমার গালে কিসের দাগ?”
” গাল লাল কিসে? পিরিতের বি’ষে নাকি…..”
” আরে তূর্য ভাই চড় মে’রেছে ক’ষে ”
প্রান্ত বাকি গানটুকু শেষ করার আগেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে গানের সুরে গেয়ে ওঠে শান্ত।তারপর আহির অন্য পাশে বসতে বসতে বলল,
” তাহলে আহিপু? চ’ড় খেয়ে তোর ফিলিংস কেমন? আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারিস! ”
যখন তূর্যের মুখে শুনেছিল কাল সারাদিন শান্ত – প্রান্তও তাকে খুঁজে বেরিয়েছিল।তখন আহি আবেগে আপ্লুত হয়ে মনে মনে ভেবে নিয়েছিল ওদের সাথে আর ঝ’গড়াঝাঁটি করবে নাহ।কিন্তু না! এরা আসলে ক্ষ’মার যোগ্য না।নেহাত চোয়াল ব্য’থা থাকার কারণে ঝ’গড়াটা করতে পারছে না ।নাহলে আজকে এদের খবর করে ছাড়ত সে।
” এই বাড়ির সবচেয়ে বড় সন্তান তূর্য ভাই।তারপর আমি,তারপর তোরা।তূর্য ভাই আমার বড় বিধায় সবসময় আমাকে ব’কা’ব’কি করেন। কাল তো মে’রেই বসলেন।কিন্তু আমি কখনো তোদের মে’রেছি বল? মেরেছি? মা’রিনি তো!এটা নিয়ে তোদের শুকরিয়া করা উচিত।তূর্য ভাইয়ের বি’রুদ্ধে ক’ঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত তোদের।সেটা না করে আমাকে নিয়ে ট্রল করছিস তোরা? এটা কি ঠিক বল ?”আস্তে আস্তে কোনরকমে গাল নাড়িয়ে বলল আহি।
শান্ত নিজের হাসি চেপে ঘনঘন দুইপাশে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,
” না…না…।একদম উচিত না।”
তার সাথে প্রান্তও ভো’লাভালা মুখ করে বলল,
” মোটেও ঠিক না।তীব্র নি’ন্দা জানাচ্ছি আমি ”
আহি যদিও বুঝতে পারল ওরা ম’স্করা করেই এসব বলছে ।তবুও কিছু বলল না।সোজা ডাইনিং টেবিলে চলে গেলো।এরা সবাই একই রকম।শুধু তাহিটা একটু ভালো আছে।তবে সেও মাঝে মাঝে হিট’লারি করে।
খাবার টেবিলে আহি আগে বসলেও এখন একে একে সবাই উপস্থিত হয়েছে।আকবর চৌধুরীকে কাল রাত ১২ টার দিকে বাড়িতে আনা হয়েছে।
এমনি দিন হলে খাওয়ার ভিতরে এতক্ষণে হাজারটা কথা বলত আহি। খাবারে থাকা মরিচের খোসা চুপিচুপি শান্ত বা প্রান্তের প্লেটে দিয়ে সাধু সেজে বসে থাকতো।যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে নাহ।এইযে আজকে কুমড়া রান্না করা হয়েছে।আহি ভালো করে জানে তূর্য কুমড়ার তৈরি কিছুই খায় না।এজন্যই ইচ্ছা করে কুমড়ায় নিজের প্লেট ভর্তি করে তূর্য বুঝে ওঠার আগেই তার প্লেটে ঢেলে দিয়ে ভোলাভালা মুখ করে বসে থাকতো।তারপর তূর্য যখন চোখ গ’রম করে চাইতো তখন সে মুখটাকে আরো ইনোসেন্ট বানিয়ে আদুরে কন্ঠে বলতো,
” অনেক বেশি নেওয়া হয়ে গিয়েছে।তাই আপনাকে দিলাম ।আ..ল্লা..হ!আপনি তো আবার কুমড়া খান না।খেয়াল ছিল না,তূর্য ভাই। রা’গ করিয়েন না।”
কিন্তু আজ চুপচাপ খাবার গিলছে।এসবের কিছুই করছে না সে।যদিও চোয়াল ব্যথা থাকার কারণে খাবার চিবোতে একটু কষ্ট হচ্ছে।এজন্য এতক্ষণে শ খানেক গালি দিয়েছে তূর্যকে।
সে নাহয় অপ’রাধ করেছে।এখন সেটা তো করা হয়ে গিয়েছে!শুধু শুধু মে’রে কি লাভ পেলো লোকটা? নিজের গায়ের জোর দেখানোর জন্য এমনটা করলো? তাকে তো দেখেই বোঝা যায় শ’রীরে গন্ডা’রের মতো শক্তি।মে’রে দেখানোর কী আছে!
তবে আহির এভাবে শান্ত হয়ে যাওয়া আকবর চৌধুরী খেয়াল করলেন।তিনি আহির উদ্দেশ্যে বললেন,
” যেটা করেছ,সেটা তো করেই ফেলেছ।এখন মন খারাপ করে বসে থাকলে চলবে? মন খারাপ না করে এডমিশনে মন দেও।কিসের জন্য কোচিং করতে চাইছ?আর রেজাল্ট বেরোবে কবে ,কিছু জানো ?”
আহি বেশ বুঝতে পারল তার বড় আব্বু এখন খুবই সিরিয়াস ।নাহলে তুমি করে বলতেন না।
” দেড় – দুই মাস পর।আর আমি ডক্টর হতে চাই “এমনি সময় ফটফট করে উত্তর করলেও আজ খুব শান্ত শিষ্ট ভাবে বলল আহি।
” তাহলে কাল গিয়ে উন্মেষে ভর্তি হয়ে এসো। বাড়িতে টিচারও রেখে দিবো আর তূর্য তো আছেই ! ”
বাবার কথা শুনে তূর্য একবার অসহায় দৃষ্টিতে বাবার দিকে চাইলো।এমনিতে সুযোগ পেলেই রুমে ঢুকে কু কর্ম করে বেড়ায়।এবার তো আরো সুযোগ পেয়ে গেলো। রুম ত্যাগ করে কিনা সন্দেহ! এই জীবনে যে কয় দিনই আহি তার রুমে পড়তে গিয়েছে প্রতিবারই টেবিলেক্লথ পাল্টাতে হয়েছে তার।না পাল্টে উপায় আছে?কলমের কালি দিয়ে পুরো শেষ করে ছাড়ে।তূর্যের বরাবরই সাদা রংটা পছন্দের।তাই তার রুমের অধিকাংশ ,বলতে গেলে সবকিছুই সাদা।
এটা নিয়ে কিছু বলতে গেলেই বলবে,
” খান তো বাপের হোটেলে।একটু ঘনঘন টেবিলক্লথ চেঞ্জ করলে কিই বা হয়েছে!পাঁচ – ছয়শো এর বেশি তো আর নিবে না ”
অথচ ডামাস্কের টেবিলক্লথ সম্পর্কে কোনো আইডিয়া আছে ওর? ইডিয়েট একটা !
” ডাক্তার তো একজন আছেই।তুই বরং অন্য কিছু হ ” তূর্যের ধ্যা’ন ভাঙলো আসিফ চৌধুরীর কথায়।
” হ্যাঁ,তোর ছোট চাচার মতো পলিটিশিয়ান হ ” আকবর চৌধুরীর কথা শুনে শান্ত বলল,
” হ্যাঁ,হ্যাঁ বড় আব্বু।তারপর আমরা স্লোগান দিবো ‘ হাসিনা আপা,খালেদা খালার দিন শেষ ! আহি আপার বাংলাদেশ ‘ ”
শান্তর কোথায় একযোগে সবাই হেসে দিলেন।
” তাহলে আহি আজকেই চল ভর্তি করে রেখে আসি ” একপলক দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাঁকিয়ে সময়টা মেপে নিলেন আকবর চৌধুরী।তারপর কথাটা বললেন।
” না, বড় আব্বু।গালের দাগ মুছে গেলে তারপর যাবো ”
হালকা গা গরম হওয়ায় এসি অফ করে শুয়ে আছে আহি।হাতে লতা বেগমের মোবাইল।তিনি কোনো ফেসবুক চালান না দেখে আহি নিজে একটা একাউন্ট খুলেছিল।তবে নিজের নাম দিয়ে নয়, ফেক নামে। এই বিষয়ে বাড়ির কেউই জানে না।
আহির বন্ধু মহলের একটা মেসেঞ্জার গ্রুপও আছে। সেখানেই ম্যাসেজে কথা বলছিল সে।কিন্তু কথার মধ্যেই হঠাৎ করে দেখলো সে লিভ নিয়েছে।আজব! সে তো লিভ নেয়নি । তাহলে এটা কিভাবে হলো? মোবাইলের মধ্যেও কি আবার জ্বিন – ভূতের বসবাস আছে নাকি?পুনরায় যে তাকে অ্যাড দিবে সেটাও হচ্ছে না।
গ্রুপের এডমিন হলো আরাফ।সে এখন অনলাইনে নেয়।নিশ্চয় পড়ালেখা করছে।
মন খারাপ করে ফোনটা রেখে দিলো আহি।এখন বাকিরা কত কথা বলবে অথচ সে উপস্থিত থাকবে না।যদিও তাদের প্রত্যেকের ইনবক্সে গিয়ে সে বলে এসেছে ,
” তোরা আর কেউ একটাও ম্যাসেজে দিবি না বলে দিলাম ” তবুও তার মনটা আকুপাকু করছে।যদি ওরা কথা বলে? না জানি কত কিছুই মিস করে ফেলবে! এরইমধ্যে পারভিন বেগম তার রুমে প্রবেশ করলেন।বড় মাকে দেখে উঠে বসলো আহি। পারভিন বেগম তার পাশে বসে বললেন,
” আমাদের হবু ডাক্তার কী করছে?”
” আগে এইচ এস সি তো পাশ করি!” বলেই হেসে দিলো আহি।
” এটা কেমন কথা? পাশ করবি না মানে? আমার মেয়ে ভালো ফলাফল করে পাশ করবি আমি জানি।কিন্তু….”ক’পট রা’গ দেখিয়ে বললেন তিনি।
” কিন্তু কী,বড় মা?”
” শোন তোকে একটা ঘটনা বলি । আই এ পরীক্ষার পর তো তোর নানাভাই আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলো।কিন্তু আমার একটা বান্ধবি ছিল। সে যেমন পড়া লেখায় ভালো ছিল তেমনি চেহারাও মাশাআল্লাহ।আর চুলও ছিল একদম তোর মতো।কিন্তু ,ডাক্তারি পড়া পড়তে পড়তে সব চুল পড়ে গিয়েছে ”
” সত্যি বড় মা ? মেডিকেলে পড়তে গেলে চুল পড়ে যায়? কই? তূর্য ভাইয়ের তো পড়েনি!”পারভিন বেগমের কথা শুনে কৌতূহলী কন্ঠে বললো আহি ।
” তূর্য তো ছেলে মানুষ আর ওর চুল লম্বা নাকি ? তুই একটু চুলের যত্ন নিস ।আমি এখন আসছি। রান্না করতে হবে ”
কী বলল বড় মা? তার চুল পড়ে টা’ক্কু হয়ে যাবে? তাহলে কেমন দেখা যাবে?তার চুল দেখে সবাই কত প্রশংসা করে।সেই চুল পড়ে গেলে হবে? তাছাড়া,নিজের জামাইকে চুলগুলো দেখানোর আগেই যদি পড়ে যায় তাহলে তো দুঃখের সীমা থাকবে না।এটা তো কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না।দরকার হয় সে ডক্টর হলোই না।তাতে কী হয়েছে?তার ডাক্তার হওয়ার মূল উদ্দেশ্য তো ছিল তূর্যকে একটা ভুলভাল ইন’জেকশন দেওয়া ।দিলো না ইন’জেকশন ! কী হবে তাতে? সে কি ম’রে যাবে নাকি? যাবে না।
কিন্তু হবু বরকে চুল দেখাতে না পারলে ঠিকই ম’রে যাবে।তার পুরো জীবনই বৃথা হয়ে যাবে। কাল বরং সবাইকে বলে দিবে সে ভার্সিটির জন্য কোচিং করতে চায়।
” বড় মা ? আমি ডক্টর হবো না ! ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ব ”
প্রায় দরজা অতিক্রম করে ফেলেছিলেন পারভিন বেগম।আহির কথা শুনে আবার ফিরে আসলেন।
“কিন্তু ঢাকা ভার্সিটি তো বাড়ি থেকে অনেকটা দূর হয়ে যাবে।তুই বরং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িস।বাড়ি থেকে কাছে হবে।”
” তাতে কী হয়েছে? আমি হোস্টেলে বা ম্যাসে থেকে পড়ব।”
” সেখানের রান্না খেতে পারবি ? আর আমাদের ছেড়ে কিভাবে থাকবি,হ্যাঁ?”
আহি কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বলল,
” ঠিকই বলেছেন বড় মা।আমি বরং জাবিতেই পড়ব ”
” যা ভালো বুঝিস কর । আমি এখন আসি ” বলেই চলে গেলেন পারভিন বেগম।মুখে মুচকি হাসি ।ত
বে এভাবে তাড়াহুড়ো করে আসার একটাই কারণ , তিনি এতক্ষণ ধরে যত গুলো কথা বললেন সব অন্য কারো শেখানো বুলি।এরপর যদি আহি আরেকটা প্রশ্ন করে তিনি উত্তর দিতে পারবেন না। প্যাঁ’চ লেগে যাবে।তবে অনেকটা অবাক হলেন তিনি।যে এতগুলো কথা শিখিয়ে দিলো তাকে ,সে কীভাবে জানলো আহি এই কথা গুলোই বলবে ?আশ্চর্য ব্যাপার !আর আহি যদি ডাক্তার হয় তার স’মস্যা কোথায়?
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ – কালাম করে বিনা কারণে বান্ধবীর ব্যাপারটাও মি’থ্যা বলতে হলো।
টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে ফাইল,কাগজ আর কিছু রিপোর্ট। কোনোটা অসমাপ্ত আবার কোনোটা শুধুমাত্র একটা সইয়ের অপেক্ষায় আছে।আসিফ চৌধুরী সেগুলো দেখে দেখে সাইন করছেন।কোনোটা আবার একপাশে রেখে দিচ্ছেন।এরই মধ্যে দরজার ওপাশ থেকে কড়া নাড়ার শব্দ হলো।দরজায় যেহেতু কড়া নাড়ছে তাহলে এটা লতা বেগম হবেন না তিনি নিশ্চিত।তবে কি সত্যিই তূর্য এলো? কাল আহিকে নিয়ে ফেরার পর তূর্য সরাসরি আসিফ চৌধুরীর কাছে যায় আর বলে ,
” ছোট চাচ্চু আপনার থেকে আমার কিছু জানার আছে। পারলে আগামীকাল একটু তাড়াতাড়ি ফিরবেন ”
এই ছেলে কী প্রশ্ন করবে সেটা তিনি আগেই আন্দাজ করতে পেরেছেন।ভেবে একটা হায় ছাড়লেন তিনি।তারপর বললেন,
” কে? তূর্য?এসো !”
“সাবেক মেয়র লায়েক শিকদারের সাথে আপনার কিসের শত্রু’তা? ” রুমে প্রবেশ করেই তূর্য সরাসরি প্রশ্ন করলো।
” রাজ’নৈতিক!সেটা তো তুমি ভালো করেই জানো! ”
” প্লীজ টেল মি দ্যা ট্রুথ।প্লীজ ! আ’ম রিকুয়েস্টিং ইউ ”
” ওসব ঘৃ’ণিত অতীত বাবা।তুই যেনে কী করবি ? ওই প’শুর ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না “বলে একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেললেন আসিফ চৌধুরী।যেন হঠাৎ করে বুকটা ভারী হয়ে উঠল।
” ওই প’শুর জন্যেই কিন্তু আপনাদের মেয়ে এখনো আপনাদের চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ”
” নাহ! ওই প’শুর জন্যেই আমাদের মেয়েটা বিপদের মুখে পড়েছিল ”
” আমি স্যিউর না হয়ে কোনো কথা বলিনা সেটা আপনি ভালো করেই জানেন।এবার অন্তত সত্যিটা বলুন ,প্লীজ!”
এবার যে তূর্য সত্যিটা না জেনে ছাড়বে না সেটা বুঝতে পারলেন আসিফ চৌধুরী।তাই নিজেকে প্রস্তুত করলেন অ’ভিশপ্ত অতীতটা তুলে ধরার জন্যে।
তাসিন আর নাবিল মুখোমুখি বসে আছে।দুজনেরই মে’জাজ তুরুঙ্গে।তূর্যকে ওভাবে পাগলের মতো ছুটতে দেখে তারাও সেদিনের সন্ধ্যার গাড়িতে বাড়ি ফিরেছে।বন্ধুকে এভাবে ছুটতে দেখে কারা পারে বসে থাকতে? কিন্তু মহাশয় বন্ধুকে সেই কাল থেকে ফোন করে রিসিভ করাতে পারছে না।অথচ বন্ধুর টেনশনে তারা ম’রে যাচ্ছে। এমন ভাবে ছুটছিল যেন ওর বউ ম’রে গিয়েছে।
এদিকে তাদের বাড়িতে পা ফেলার নাম নেওয়াও নি’ষেধ।যদিও নি’ষেধ করার পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে।তাদের পেট একটু পাতলা কিনা! কখন, কোথায় কী বলে ফেলে বলা মুশকিল।
“ভাই,এ মানুষ নাকি রো’বট? মনে কি কোনো ফিলিংস নেই ? ম’রে গেল কিনা জানতেও তো মানুষ কল ব্যাক করে।”
” ফিলিংস কি তোরে দেহায়বো বা’ড়া?তুই অর বউ লাগোস?”
” ফিলিংস কি খালি রো’মান্সের হয়? অন্য কোনো ফিলিংস নেই দুনিয়ায়? শালা!আর যদি ওই একটা ফিলিংসই পৃথিবীতে থেকে থাকে তাহলে সেটাও ওর নেয়।”
” তা ঠিক কইছস ।ধুর বা’ড়া! আন্টির নাম্বারে কল দিলেই তো হয় ।”
” আগে বলবি তো ! দাঁড়া এক্ষনি দেই ”
আবদ্ধ ঘরে চলছে শুনশান নীরবতা।আসিফ চৌধুরী আর তূর্য মুখোমুখি বসে আছে। আসিফ চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।তূর্যের মনে অনেক কৌতূহল থাকলেও চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেয়। সে তো বরাবরই এরকম।তার বাইরে দেখে ভিতর কেউ আন্দাজ করতে সক্ষম হবে নাহ।তবে আসিফ চৌধুরী তো আর তেমন নন।তার চোখের কোণে আর্দ্রতা জমে উঠল।তবে নিজেকে সামলে বলতে আরম্ভ করলেন তিনি,
“পঁচিশ বছর আগের ঘটনা।তখন তুই খুবই ছোট।তিন বা চার বছরের অবুঝ শিশু।তাই হয়তো কিছুই মনে নেয় তোর।
লায়েক আর আমি খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।সেই ছোটকাল থেকে।যাকে বলে গলায় গলায় বন্ধুত্ব! ছাত্র জীবন থেকেই ওর রাজ’নীতির প্রতি আকর্ষণ ছিল।আমার ভালো লাগতো না।তবুও বন্ধুত্বের খাতিরে দুই একটা ঘটনায় জড়িয়ে পড়তাম।একদিন বড় ভাইজান আর তোর দাদা অনেক ব’কাবকি করতেন এটা নিয়ে।তারা রাজ’নীতি পছন্দ করত না।এখনো করে না। তারপর থেকে আমি আর কোনো রাজ’নৈতিক কার্যকলাপে নিজেকে জড়াতাম না।
দেখিস না তোর বাবা আমায় এখনও এটা নিয়ে সবসময় খোঁ’চা মেরে কথা বলে ।সকালেও তো বলল।আচ্ছা যাক গে সেসব কথা!
তবে এটা নিয়ে আমাদের বন্ধুত্বে কোনো ঝামেলা হয়নি। ”
একটু থামলেন আসিফ চৌধুরী।সামনের টেবিলে থাকা গ্লাস এগিয়ে দিলো তূর্য।তিনি এক ঢোক পানি গিলে পুনরায় বলা আরম্ভ করলেন,
“কোনোদিন ছোট মায়ের বাপের বাড়ি গিয়েছিস? যাসনি! তোদের বলা হয়েছে লতার বাবা – মা,ভাই – বোন কেউ নেয় পৃথিবীতে।কিন্তু সেটা সম্পূর্ণই মি’থ্যা! স্বয়ং লায়েক শিকদারই ওর আপন বড় ভাই।আর ওর মাও এখনও বেঁচে আছেন।মু’মূর্ষ রোগী হয়ে।
তবে লতা আর আমার মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না।লায়েক তার একমাত্র ছোট বোনের বিয়ে খুব ধুমধাম করে ঠিক করে।সব কিছু স্বাভাবিকভাবেই হচ্ছিল।হঠাৎ আমার আমার কাছে একটা খবর আসে,যার সাথে বিয়ে ঠিক করা হয়েছে সে আসলে ভালো লোক নয়।বিভিন্ন অ’নৈতিক কার্যকলাপের সাথে যুক্ত।আমি সেটা লায়েককে জানায়।কিন্তু ও বিশ্বাস করে না।প্রমাণ চায় সে।কিন্তু তখন আমার কাছে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না ।তাই দিতে পারিনি।
এটা নিয়ে আমাদের অনেক কথা কা’টাকাটিও হয়।আবার সবটা ঠিক হয়ে যায়।লতাকে আমি আমার নিজের বোনের মতো দেখতাম ।এদিকে ওর ক্ষ’তিটাও মেনে নিতে পারছিলাম না।তাই আমি লতাকে সবটা জানায়।বলি লায়েককে বুঝিয়ে বলতে।কিন্তু ও বরাবরই ওর ভাইকে ভ’য় পায়।আমাকে বলে কিছু করতে।ততক্ষণে সকল চে’ষ্টা করে ব্য’র্থ আমি।এভাবে বিয়ের দিনও ঘনিয়ে আসে।আমি আর কিছুই করতে পারলাম না।তারপর বিয়ের আগের দিন রাতে লতা অনেক কা’ন্নাকাটি করে। যে করেই হোক বিয়ে ভা’ঙতে বলে। পরে আমি বা’ধ্য হয়ে ওকে নিয়ে পালিয়ে যায়।তবে বিয়ে করার উদ্দেশ্য মোটেও ছিল না।ভেবেছিলাম পর্যাপ্ত প্রমাণ জোগাড় করে লতাকে তার ভাইয়ের হাতে তুলে দিবো।কিন্তু কোনো একটা কারণে আমরা বিয়ে করতে বা’ধ্য হই।
তারপর লায়েকের সাথে অনেকদিন যাবৎ ঝা’মেলা চলতে থাকে।প্রায় ছয় মাস পর ও নিজের ভু’ল বুঝতে পারে।এসে ক্ষ’মা চায় আমার কাছে।তার পাশাপাশি আরেকটা প্রস্তাবও রাখে ” এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন আসিফ চৌধুরী।এবারের ঘটনাটা বলতে যেন বুক চিরে যাচ্ছে ।ঠোঁট ভেদ করে কথারা আসতে চাইছে না।নিজেকে সামলানোর সুযোগ দিলো তূর্য।তার চোখে এবার কৌতূহল স্পষ্ট।কোন সত্যের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে জানা নেই তার।তবুও অজানা কারণে ভিতরটা ছট’ফট করছে।আবার বলতে শুরু করলেন আসিফ চৌধুরী ,
” আমাদের তিন ভাইয়ের আদুরে একটা বোন ছিল । তোমাদের একমাত্র ফুপি।তোমার মনে নেয় হয়তো।তার হাত চাইলো আমাদের কাছে।আমরাও রাজি হয়ে গেলাম।কিন্তু ওই জা’নোয়ার …….”এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না আসিফ চৌধুরী।কা’ন্নায় ভে’ঙে পড়লেন।তূর্য মনে হয় বাকি কথাটুকু আন্দাজ করতে পারলো।তবুও চাচার মুখ থেকে শোনার প্রয়াস।সে আসিফ চৌধুরীর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৪
” শান্ত হোন,ছোট চাচ্চু । এভাবে ভে’ঙে পড়বেন না। ”
” ওই জা’নোয়ার আমার আদরের একমাত্র বোনকে বিয়ে করে হ’ত্যা করে ” গলা কেঁ’পে উঠেছে আসিফ চৌধুরীর।আর কথা বলার অবস্থায় নেয় তিনি। বুঝতে পারলো তূর্য।তার নিজের বুকের ভিতরও য’ন্ত্রণা হচ্ছে।মনে না থাকুক। কিন্তু দেখেছে তো।অনেক আদর করতেন নিশ্চয়।ফুপিরা তো মায়ের মতোই ভালোবাসেন।তবুও সে তো আদর পেয়েছে।আহি,শান্ত,প্রান্ত,তাহি ওরা তো মোটেই পায়নি।আজ,এখানে ,এই জায়গা যদি আহিটা উপস্থিত থাকতো তাহলে এতক্ষণে নিশ্চয় কেঁদে ফেলত।অনেক আবেগী কিনা!
” এমনও তো হতে পারে ফুপিকে তিনি মা’রেননি।হয়তো অন্য কেউ আপনাদের মধ্যে ভু’ল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছে।”
