প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৯
ইনান হাওলাদার
গতকাল রাতে পুকুরপাড় থেকে এসে মন খা”রাপ করে অনেকক্ষণ বসে ছিল আহি।বাইরে নাচ – গানের অনুষ্ঠান হলেও সে একবারের জন্যেও রুম থেকে বের হয়নি।তবে তূর্য ব’কেছে বলে নয়।এমনিই মন চায়নি।
এরকম ব’কা’ব’কি তো তূর্য ভাই রোজই করে।এসব তার কাছে নতুন কিছু নয়।যদিও কালকের ব’কাবকি একটু ভিন্ন কায়দায় ছিল।
এদিকে বাইরে ফুল ভলিউমে গান চলায়
কিছুতেই ঘুম আসছিল না তার।তাই সে সারা রাত জেগে উপন্যাসের বইটা শেষ করেছে।
এখন ঘড়ির কাঁটায় সকাল ছয়টা বাজে।উপন্যাসের বইটা শেষ করে দুনিয়ার কথা জমে আছে।পেটের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো কাউকে তো বলতে হবে।নাহলে পেট ফে’টে ম’রে যাবে সে।তাই আর দেরি না করে তারিনের নাম্বারে কল করলো । প্রথম কয়েকবার কল হয়ে কেটে গেলেও চার বারের মাথায় সেটা রিসিভ হলো।তারিন কলটা রিসিভ করেই ঘুম কাতুরে কন্ঠে বলল,
“এত সকাল সকাল কল দিয়েছিস কেন?”
” একটা সিরিয়াস কথা শোন , বে’ইবি ”
” বলো, বে’ইবি ”
” তোকে বলেছিলাম না ,কে যেন আমাকে দুইটা উপন্যাসের বই দিয়েছে? একটা পড়ে শেষ করলাম মাত্র। ভাইই…নায়কটাকে ভালোবেসে ফেলেছি । এখন কোথায় পাবো ওকে! ”
” আজিমপুরে !”
” কী হয়েছে তোর? তূর্য ভাইয়ের মতো ত্যাঁ’ড়া কথা বলছিস কেন?আচ্ছা ,বাদ দে !তোকে নায়কের চেহারা আর স্বভাব – চরিত্রের বর্ণনার কিছু কিছু অংশ ছবি তুলে দিয়েছিলাম,দেখেছিস? ”
” হুমম! দেখেছি ”
” এমন পোলা কোথায় পাওয়া যায় ?” , আহ্লাদী কন্ঠে বলল আহি।
অল্প কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো তারিন,
” তোদের বাড়িতে ! মানে,বর্ণনা আর হাবভাব তো অলমোস্ট তোর তূর্য ভাইয়ের মতো।”
” জানি তো ! ”
” তাহলে তোর ভাইকে পটিয়ে ফেল ” হাসতে হাসতে বলল তারিন।
” পা’গল তুই? ওই ট্রাউজার ভাইকে আমি জীবনেও বিয়ে করবো না । ওনার মতো খ’চ্চর,একরো’খা, মা’রাটে লোককে বিয়ে করলে মা’র খেতে খেতে আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে ”
” তোমার ওই উপন্যাসের নায়কও এমনই, বে’ইবি।শুধু সাজিয়ে গুছিয়ে লিখেছে এই যা ”
” চুপ কর তুই! এই কথা তূর্য ভাইয়ের কানে গেলে আমাকে মে’রে শুঁটকি দিবে সাথে তোকেও “খুব সাবধানে ফিসফিস করে বলল আহি।যদি কেউ শুনে ফেলে এই ভ’য়ে।
” আহি আপু,আহি আপু ” আহিকে ডাকতে ডাকতে রুমে আসলো তাহি।তার চোখে – মুখে উৎফুল্লতা ছোঁয়া। আহি কল কেটে মোবাইলটা পাশে রাখলো।জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তাহি ফের বলল,
” দ্রুত ব্রাশ করো।সবাই নদীতে গোসল করতে যাবে ”
ছোট থেকেই শহরে বড় হওয়ায় সেভাবে কখনোই নদীতে গোসল করা হয়নি।এবারই হয়তো জীবনের প্রথম। তাই আহির চোখে – মুখেও উৎফুল্লতার জোয়ার বয়ে গেল।
” কে কে যাবে ?”
” সব্বাই!আমি, তুমি,ভাইয়া,শান্ত ভাইয়া ,প্রান্ত ভাইয়া,মেহেদী ভাইয়া,শবনম আপু , আরো কয়েকটা ভাইয়া আর আপু।এবার তাড়াতাড়ি চলো ”
বলে আবার দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বাইরে চলে গেল সে। আহি দ্রুত বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে একটা সুতি থ্রি পিস পরে নিল ।এক প্রকার দৌঁড়ে বাড়ির গেটের সামনে গেল। সবাই বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে তিনটা ভ্যান গাড়ি রাখা।বাড়ি থেকে নদীর দূরত্ব বেশ খানিকটা হওয়ায় ভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ছেলেরা সবাই লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে আহি এদিক – ওদিক চোখ ঘুরিয়ে তূর্যকে খুঁজলো।তূর্যকে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখা তার অনেকদিনের খায়েশ।আজ যদি দেখতে পারে তাহলে চট করেই একটা ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দিবে।তূর্য ভাইয়ের প্রে’স্টিজ পাঞ্চার করতে পারলে আহা কী শান্তি! তবে এসব সুখের ভাবনা বেশিক্ষণ স্থায়ী করতে পারল না সে ।এতগুলো লুঙ্গিম্যানের মধ্যে একটা ট্রাউজারম্যান দাঁড়িয়ে আছে।মধ্যে না ,এক পাশে ! এ যেন গোবরে পদ্মফুল! না,এবারও একটু ভুল হয়ে গেল।পদ্মফুলে গোবর !
এতক্ষণ আহির জন্যেই অপেক্ষা করছিল সবাই। সে আসতেই একে একে সবাই ভ্যানে উঠতে আরম্ভ করলো।তারা মোট ১২ জন হওয়ায় তিনটা ভ্যানে সুন্দর মতো ধরে গিয়েছে।আহি দৌঁড়ে গিয়ে একটা ভ্যানের পিছনে বসলো।মেহেদী বোধহয় আহির বসার অপেক্ষা করছিল।আহি বসা মাত্র সে গিয়ে পাশের সিটটা দখল করলো।বাকি দুইটা ভ্যান ভরে গেলেও তাদের ভ্যানের একটা সিট এখনো ফাঁকা। কেউ একজন বাদ পড়েছে মনে হয়।কয়েক মিনিট পর তূর্য ভ্যানের সামনে এসে দাঁড়ালো। সবকটা ভ্যানের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে গ’ম্ভীর কণ্ঠস্বরে আহিকে বলল,
” সামনে যা !”
” আমি পিছনে বসবো ,তূর্য ভাই ”
” এক কথা বারবার রি’পিট করব না আমি। নাউ,গো এহেড ”
শান্ত অথচ শীতল কণ্ঠের হুমকিতে ভ’য় পেলো আহি।তবে সেটা প্রকাশ না করে থ’মথমে মুখে সামনে গিয়ে বসলো সে।আর মনে মনে হাজারটা গা’লি ছুড়লো। তবে তার পাশের সিটে শবনম থাকায় কোনো সমস্যা হয়নি, দশ মিনিটের রাস্তা বকবক করতে করতে পৌঁছে গিয়েছে।
এদিকে মেহেদী মনে মনে যত আশা নিয়ে আহির পাশে উঠেছিল তার সবটাই ভে’ঙে চু’র’মা’র হয়ে গেল।মিনিমাম একটা কথা বলারও সুযোগও পেলো না ।
আঁকাবাঁকা সরু ইটের রাস্তার বুকের উপর দিয়ে পরপর তিনটি ভ্যান সারি বেঁধে চলছে।সকাল সকাল বের হওয়ায় পরিবেশটা খুবই স্নিগ্ধ । আকাশ ভেদ করে সূর্যটা কিছুক্ষণ আগে উঠলেও তাপটা এখনো প্রখর নয়।রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ গাছের দরুন রাস্তার কোথাও সূর্যের আলো পড়ছে তো কোথাও ছায়া। কেউ কেউ গ্রামের এই প্রকৃতি ফোনবদ্ধ করছে।
বেলা তখন ১০ টা।বরযাত্রী যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে সবাই।নিজেদের গাড়িসহ আরো কিছু সংখ্যক ভাড়া করা গাড়ি বাড়ির সামনের রাস্তায় সিরিয়াল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।একদম সামনে বরের গাড়ি ।খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে সেটা। বাড়ির মাথার লোকগুলো সবটা ঠিকঠাক ভাবে হচ্ছে কিনা সেটা দেখছে।শুক্রবার হওয়ায় তাদের ইচ্ছা কনের বাড়িতে গিয়েই জুম্মার নামাজ আদায় করবেন।
কনেপক্ষদেরও সেই কথাই জানানো হয়েছে।
আসলাম চৌধুরী অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছেন বাড়ির ছোট সদস্যরা অনুপস্থিত। ভেবেছিলেন হয়তো বাড়ির সামনের খোলা জায়গা আড্ডা দিচ্ছে।কিন্তু সেখানেও না দেখে পুনরায় অন্দর মহলে ফিরে আসলেন তিনি । রান্না ঘরের দিকে মারুফা বেগমকে দেখতে পেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
” বাড়ির বাচ্চারা কোথায় ?”
” তারা তো সেই সকালে নদীতে গোসল করতে গিয়েছে।এখনো অবধি খবর নেয় ”
” নদীতে গোসল করতে গিয়েছে মানে?তূর্য ব্যতীত একটাও তো সাঁতার জানে না। ওদের যাওয়ার অনুমতি কে দিলো,মেজো বউ?” বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বললেন আকবর চৌধুরী।
” তূর্যও আছে,ভাইজান।সমস্যা হবে না । ” স্ত্রীর হয়ে আসলাম চৌধুরী নিজে উত্তর দিলেন।
” তূর্য একা কয়টাকে দেখবে?বি’পদ – আ’পদের কথা কিছু বলা যায়?”
” তুমি চি’ন্তা করে রো’গ – বা’লায় ডেকে এনো না । নেও পানি খাও ” বলে স্বামীর দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন পারভিন বেগম।
“বাড়ির আরেকজন বলা নেয় , কওয়া নেয় ,হুট করে ঢাকা চলে গিয়ে কল করে জানাচ্ছে সে রাজধানীতে।গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।এতই যখন কাজ আসার দরকার কী ছিল? বুড়গুলো যদি এসব করে বেড়ায় ছোটরা তো করবেই। প্রে’সার না বাড়িয়ে উপায় আছে কী? ”
কাল লায়েক শিকদারের ক্যাম্পে নাকি আ’গুন লেগেছে।লেগেছে বলতে লাগানো হয়েছে ।তাদের ভাষ্যমতে সেটা বর্তমান মেয়রের লোকেরা করেছে।মেয়র গো’পন বৈ’ঠক করে রাজধানীর বাইরে গিয়েছে আর এদিকে আ’গুন দিতে তার লোকদের লিলিয়ে দিয়েছে।যাতে তার দিকে আঙুল না ওঠে । কাল রাতেই হঠাৎ এই কথা কানে আসে আসিফ চৌধুরীর ।কাউকে কিছু না জানিয়ে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। জানালে যেতে দিতো না বলেই মূলত না জানিয়ে বের হয়েছেন তিনি।তাই গন্তব্যে পৌঁছেই বড় ভাইকে সেটা ফোন করে জানিয়েছে।
আহি আজ ডাস্টি রোজ শেডের একটা লেহেঙ্গা পড়েছে। যার ওপর সোনালি সুতোয় করা জটিল কারুকাজ, মুক্তোর মতো চিকচিকে পাথর আর সূক্ষ্ম সিকুইনসের ঝিলিক। ওড়নায় ঘন মুক্তো আর জরি কাজ। হাতে জড়ানো চুড়িগুলো যেন আলাদা এক সৌন্দর্য বহন করে—মোটা আর চিকন সোনালি চুড়ির মিশ্রণ, যার মাঝে ঝরে পড়েছে মুক্তোর গাঁথুনি।
চুলে কোনো শক্ত খোঁপা নেই, নেই কোনো কড়া বাঁধন। তার লম্বা কালো চুল একপাশে সরে পড়েছে কাঁধ বেয়ে, আলতো করে গড়িয়ে পড়ছে গায়ের ওপর। তবে আজ সুতার মতো টানটান চুল গুলোকে কৃত্রিম ভাবে ঢেউ খেলানো হয়েছে।
আর গলার কাছে এক সরু হার, সূক্ষ্ম নকশা আর মুক্তোর কাজ করা, যেন তার পরিধানের পরিপূর্ণতা ঘোষণা করছে। খুব ভারী নয়, কিন্তু এতটাই পরিমিত আর মার্জিত যে চোখ আটকে যায়।
সব মিলিয়ে একদম পুতুলের মতো দেখা যাচ্ছে আহিকে।যেন রক্তে – মাংসে গড়া পুতুল একটা।
সিরিয়াল দিয়ে রাখা গাড়িগুলোর ছয় নম্বর টায় সে বসে আছে।গরমে অবস্থা খারাপ।লেহেঙ্গার ওড়নায় মোটা করে পাড় বাঁধানো কারুকাজ থাকায়।সেটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে বাতাস নেওয়ার চেষ্টায় আপাতত ব্যস্ত সে।যদিও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এমনিতেই গরম তার উপর তিন জনের সিটে চারজন বসে আছে।গরমে একদম জান বেরিয়ে যাচ্ছে।
তাদের বাড়ি থেকে আসা গাড়িগুলোর প্রত্যেকটাই এসি লাগানো।তবে সেগুলোর একটায় ওঠার সৌভাগ্যও হয়নি তার।
মেহেদী বাইক নিয়ে যাচ্ছে ।একটু আগে সে আহিকে অনেকবার বলেছিল তার সঙ্গে যেতে।কিন্তু,সেই যায়নি !বাড়ির প্রেসিডেন্টের ভ’য়ে।যে ভালোবাসে সে শা’সন,ব’কাঝকাও করতে পারে।কিন্তু যে ভালোবাসে না, সে ব’কাঝকা করে কোন অধিকারে ? ভালোবাসার সময় কখনোই তূর্য ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।অথচ,ব’কা’ব’কি করার সময় সবার আগে থাকবে।এসব আবোল তাবোল
ভাবনার মাঝে সে গাড়ির জানলার দিয়ে দেখতে পেল কালো রঙের স্যুট পরিহিত এক মানব গেইট ঠেলে বাইক নিয়ে বের হচ্ছে। আজ কি সুন্দর দেখাচ্ছে তূর্য ভাইকে।যদিও প্রতিদিনই তাকে সুন্দর দেখায় । বাহ্যিক ভাবে তূর্য ভাই কতটা হ্যান্ডসাম।
সুদর্শন এক পুরুষ। অভ্যন্তরীণভাবেও যদি এমনটা হতো তাহলে সে তারিনের কথা মতো তূর্যকে পটিয়ে ফেলত। যদিও পটাতে পারত কিনা স’ন্দেহ।তবে চে’ষ্টার কোনো কমতি রাখতো না সে।
এখন এতসব ভাবনার সময় নেয় , দ্রুত গাড়ি থেকে বের হলো সে।যে ভাবেই হোক তাকে বাইকে যেতে হবে।নাহলে গরমে ম’রে পড়ে থাকবে।যেই ভাবা সেই কাজ।দুই হাতে লেহেঙ্গা সামান্য উঁচু করে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তূর্যের সামনে গেল। তারপর দুই হাত দ্বারা দুই হাঁটুতে ভর করে হাঁ’পাতে হাঁ’পাতে বলল,
” আমাকে বাইকে নিবেন,তূর্য ভাই ?”
” না ”
গম্ভীর কণ্ঠের কা’ট’কা’ট উত্তর শুনে সোজা হয়ে দাঁড়ালো আহি।অ’নুনয়ের সুরে ফের বলল,
” নিয়ে চলুন ,প্লীজ। গাড়িতে অনেক ক্যা’চিং ”
” মেহেদীর সাথে যা।সেও বাইক নিয়ে যাচ্ছে” বলে বাইকে উঠে বসলো তূর্য।
” আর কখনো কারো হাতে মেহেদী দিতে যাব না। ”
” হাতে কেন? পুরো শ’রীরে লাগিয়ে দে। হু কেয়ার’স?”
“তাহলে খোটা দিচ্ছেন কেন? আর না নিলে আমি সেই কথা বলে দিবো?”
” কোন কথা ?”ভ্রূদ্বয় আড়াআড়ি ভাবে কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো তূর্য।
” সেই কথা !” আসলে এমন কথাও নেয় যেটা আহি বলে দিবে।শুধু শুধুই ভ’য় দেখানোর জন্য এমনটা করছে সে। তবে এটা যে মি’থ্যা কথা সেটা তূর্যও ভালো করেই জানে।তাই সে বলল,
” যাহ বল !”
নাহ!ভ’য় দেখিয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না।পুনরায় অ’নুনয় – বি’নয় করে আহি বলল,
” তূর্য ভাই নিন,নাহলে কা’ন্না করে দিবো ”
” দে ” বলেই বাইকে স্টার্ট দিল তূর্য। বাইক স্টার্ট হওয়ার শব্দে আহি পিছন থেকে সেটা টেনে ধরে সত্যি সত্যি চেঁ’চিয়ে কা’ন্না আরম্ভ করলো।যদিও সবটা নাটক।সেটা তূর্যেরও অজানা নয়।তাই সে চি’বিয়ে চি’বিয়ে বলল,
” ড্রামা না করে ওঠ । স্টুপিড !”
তূর্যের এক কথায় আহি কান্না থামিয়ে বাইকে উঠে বসলো।কার্য হাসিল করতে পেরে মহাখুশি সে।বাইকে ওঠার সাথে সাথে গলার সুর পাল্টে গেল তার।বরাবরের মতো করে বলল,
” আপনি তো বাইক আনেননি।তাহলে এটা কোথায় পেলেন ?”
” তোর বাপ যৌ’তুক দিয়েছেন ”
” আপনাকে যৌ’তুক দিতে যাবে কোন দুঃ’খে ,খ’চ্চর লোক?”
কথাটা মনে মনে বললেও সামনা সামনি বলার সা’হস দেখালো না আহি। বাই এনি চান্স ,বাইক থেকে ফেলে দিলে কী অবস্থা হবে তার ?
অসহ্য রকমের ডি’প্রেসড হয়ে তূর্যের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আহি। মানুষ বিয়ে বাড়িতে কেন আসে? অবশ্যই আনন্দ করতে! কিন্তু সেটা আর হচ্ছে কই? তার কত ইচ্ছা ছিল বিয়ে বাড়ি গিয়ে বরের সাথে গেইটে দাঁড়াবে, আনন্দ করবে।কিন্তু সেটা তূর্য ভাই হতে দিলো কই? এই যে একটু আগে বাইক থেকে নেমেই দৌঁড় লাগিয়েছিল সে, গেইটে দাঁড়াবে বলে।কিন্তু তখনই তূর্য খপ করে তার বাহু ধরে বলে ওঠে,
” কোথায় যাচ্ছিস ?”
সে মিষ্টি করে উত্তর দিলো,
” গেইটে ” আর তূর্য ভাই জ্বি’ভটাকে নিম তিতা বানিয়ে বলল,
” চুপ চাপ এখানে দাঁড়া ”
সেই তখন থেকে সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।লোকটা এমন ভাবে হাত ধরে রেখেছে যেন ছাড়লেই পালিয়ে যাবে সে। নিজে তো দিব্যি ফোন স্ক্রল করে যাচ্ছে।আর এদিকে যে তার হাত ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে এদিকে কোনো খেয়াল আছে তার ? এর চেয়ে বরং গাড়িতে আসাই ভালো ছিল।এটলিস্ট গেইটে তো দাঁড়াতে পারত।
” এভাবে মোচড়া – মুচড়ি করছিস কেন,বে’য়াদব ?”
” ব্য’থা লাগছে ,হাত ছাড়ুন !” তূর্য হাত ছেড়ে দিলো।আহি মিনমিন করে ফের বলল,
” একটু যাই,তূর্য ভাই ”
” কী বললি? রিপি’ট কর “প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখতে রাখতে কথাটা বলল তূর্য।
” বলেছি ,আপনার বিয়েতে আমি কিন্তু সবসময় আপনার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকব।তখন কিন্তু গেইটেও দাঁড়াবো ! বুঝেছেন?”
” হুমম!পাশে দাঁড়িয়ে কেন থাকবি? বসে থাকবি! চল এখন ” বলে পুনরায় একই কায়দায় আহির হাত ধরে গেইটের ভিতরে প্রবেশ করলো তূর্য।
কয়েকবার” হ্যালো ” ” হ্যালো ” করার পরও পক্ষের থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে পিংকি ফের বলল,
” হ্যালো? শুনতে পাচ্ছিস না ? হ্যালো!”
” কী কবি ক,তুই কইলেই তো আমি কমু হ “গানের সুরে গেয়ে উঠলো নাবিল।
” তুই কেন? আমি তো আলিয়াকে কল করেছিলাম ”
” নাটক করস ? আলিয়াকে কল করছস,আর কল আইলো আমার নাম্বারে ?”কথাটা বলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো নাবিল।কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঠোঁট চেপে হাসি আটকে পুনরায় বলল,
” নাকি গত দুই দিন কল করি নাই বলে তুই থাকতে না পেরে কল করছস? ” আসল কথাটা ধরে ফেলায় ঘাবড়ে গেল পিংকি । প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
” কী হয়েছে তোর? কথার মাঝে একবারও গা’লি দিলি না যে ?আবার থেকে থেকে শুদ্ধ ভাষায়ও কথা বলছিস !”
” বা’ড়া গালি দিলেও দো’ষ,না দিলেও দো’ষ । কোন পথে যাব আমি ! বাই দ্যা মাটির রাস্তা, তোর জন্য গা’লি দেওয়া ছাইড়া দিতাছি।আর মনে উঠাইস না,বা’ড়া”
” আমি যা চাইব সব করবি?নিজেকে বদলেও ফেলবি?”
” চাহোংগে তুম জায়সা,
হো যাওঙ্গা ওয়াইসে
চাহো তো ওয়াদা ইয়ে লে লো
তুম এক মুসাফির হো
ম্যায় কোই রাহ অঞ্জানি
তুম এক মুসাফির হো
ম্যায় কোই রাহ অঞ্জানি
মন চাহা মোড় দে তো
মেরে ইয়ার বাত বান জানি ”
বউ নিয়ে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।ফেরার সময় আর আহি তূর্যের সাথে আসেনি। একটু ক’ষ্ট হলেও গাড়িতে এসেছে।
রাত তখন অনেকটা গভীর।প্রায় সবাই ই ঘুমিয়ে পড়েছে।
থেকে থেকে হাসি – ঠাট্টার রোল ভেসে আসছে।ছাদের একপাশে কয়েকটা মাথা গোল হয়ে বসে আছে। শান্ত,প্রান্ত,আহি আর মেহেদী।বৃত্তের মাঝখানে মুঠো ফোন রাখা।তাতে লুডো কিং খেলা হচ্ছে। পরপর তিন ম্যাচ খেলেছে তারা।সব বারই আহি হেরেছে।এই নিয়ে চতুর্থ ম্যাচ খেলা হচ্ছে। এই বার আহির ফিল্ড অনেকটাই ভালো।ফার্স্ট না হলেও হারবে না নিশ্চিত।একটু আগেই মেহেদী তার একটা পাকা ঘুটি কেটে দিয়েছে।সেটা নিয়ে বেজায় চ’টে আছে আহি।প্র’তিশোধ নিতে তার প্রত্যেকটা ঘুটি মেহেদীর পিছনে লাগিয়ে দিয়েছে। তাতে সে আবার হারলেও স’মস্যা নেয়।মেহেদীর একটা ঘুটি কাটতে পারলেই তার মনের খায়েশ মিটবে।আহির কান্ড দেখে প্রান্ত বলল,
” আরেহ,আহিপু তুমি মেহেদী ভাইয়ার পিছনে ব’খাটেদের মতো পরে আছো কেন?”
” আরে,পড়ুক! আমার কোনো প্রবলেম নেই ” বলেই বাকা চোখে আহির দিকে তাঁকালো মেহেদী।তার চোখে একরাশ মুগ্ধতা। একটা মানুষ এতটা কিউট কিভাবে হতে পারে? যেন সৃষ্টিকর্তার নিঁখুদ সৃষ্টি।যদিও প্রেমিকের চোখে তার প্রেমিকার বরাবরই সুন্দরী হয়।
” মেহেদী ভাইয়া আপনাকে আমি খাবই খাব। দেখে নিয়েন।শান্ত তুইও দেখিস ” আহির কোথায় ধ্যান ভাঙলো মেহেদীর। লুডুর খোটে চোখ নিবদ্ধ করে বলল,
” আহি বিশ্বাস করো,আমার খেয়াল ছিল না এটা তুমি। ”
” খেয়াল করুন বা না করুন আমি আপনাকে খাবই ”
” ছিঃ,আহিপু তখন থেকে খাওয়া খাওয়া করছিস।তুই কী খাবি ? আজ তো আদিল ভা…….”
” চোখে ঘুম নেয় তোদের ?এত রাতে খাওয়া – খাওয়ি করছিস এখানে !”
” ভাইয়া,আমি আমি কিছু বলিনি। আহিপু বলছে! ” তূর্যের ধ’মক শুনে কোনরকম কথাটা বলেই এক দৌঁড়ে নিচে চলে গেল শান্ত।তার দেখা দেখি প্রান্ত আর মেহেদীও এক পা দুই পা করে পেছাতে পেছাতে চোখের আড়াল হয়ে গেল।শুধু আহি একা পড়ে রইলো।এতে পালানোর কি আছে সেটাই সে বুঝছে না।
মুহুর্তেই শান্তর শেষ কথাটা তার মস্তিষ্কে বাড়ি খেলো। কিছু বলবে তার আগেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবটি বলে উঠলো,
” তোকে কি আলাদা করে ইনভিটেশন কার্ড দিতে হবে ?”
” বিশ্বাস করুন তূর্য ভাই ,আমি ঘুটি খাওয়ার কথা বলেছি।আমি ওইসব ভাবিনি।ক’সম! “সাফায় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল আহি।
” তোকে এ’ক্সপ্লেনেসন দিতে বলিনি ই’ডিয়েট।যা এখান থেকে ”
” খেলাটা শেষ করি ?এইবার আমার পজিশন ভালো,তূর্য ভাই।ওদের ডাকব? ”
” এক্ষুনি যাবি ? নাকি মা’র খেয়ে যাবি ?”
” এক্ষুনি যাবো ”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ১৮
বলে কোনো রকমে মোবাইলটা উঠিয়ে দৌঁড় দিলো আহি। সাথে নিজের ভাগ্যকে কয়েকটা কথা শোনালো।এই পর্যন্ত যতবার লুডু গেম খেলেছে একবারও জিততে পারেনি সে।এইবার একটু আশা ছিল ,তবে তার উপর এক বালতি জল ঢেলে দিলেন তূর্য ভাই।
