প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৮
ইনান হাওলাদার
আহি তার ছোট তিন ভাই – বোনদের সারা বাড়ি খুঁজছে। অথচ কোথাও পাচ্ছে না।
সে তো প্রমিজ করেছে চোর হলেও আর কখনও খেলার মাঝে চলে আসবে না।তাহলে ওরা লুকিয়ে লুকিয়ে কোথায় খেলছে? এসব চিন্তা করতে করতে নিচে নামলো আহি। মা – বড় মার – ছোট মা সবাই কাজ করছে।তাই সে টিভি অন করল।১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে একবার এক চ্যানেল তো আরেকবার আরেক চ্যানেল পাল্টা – পাল্টি করে অধৈর্য হয়ে লতা বেগমের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।তিনি ময়দা মাখা শেষ করে সিঙ্কের ভেতর ডলে ডলে হাত পরিষ্কার করছিলেন ।আহির মুখ দেখেই বুঝেছেন সে ছোট ভাই – বোনদের খুঁজছে কিন্তু মারুফা বেগমের ভয়ে ‘তারা কোথায়’ সরাসরি জিজ্ঞেস পারছে না।মারুফা বেগম আহিকে বলে দিয়েছেন তাদের সাথে ছেলে খেলা না খেলতে।লুকোচুরি খেলে খেলুক।তাই বলে ক্রিকেটও খেলবে? লোকে দেখলে কী বলবে? দা’মড়া মেয়ে ম’দ্দা খেলা খেলে বেড়ায়!একটা ভালো বিয়ের সম্বন্ধ আসবে?
লতা বেগম একবার জায়ের মুখের দিকে তাঁকালেন তারপর চুপিচুপি আহি কে বললেন,
” ওরা দেখ বাগানে ” আহি শোনা মাত্র ছোট মায়ের গালে একটা চু’মু দিয়ে দাঁত বের করে দৌঁড়ে বাগানে চলে গেল।
মারুফা বেগম বিষয়টা ধরতে পেরে ছোট জা কে বকতে আরম্ভ করলেন ।
সেটা দেখে পারভিন বেগম বললেন,
” আরে মেজো,তুই একটু বেশি বেশিই করিস।মেয়েটা কতটুকু বড়ই বা হয়েছে।এত চেঁ’চামেচি করিস না তো ”
” ওর বয়সী কত মেয়ের দেখো বিয়ে করে বাচ্চা – কাচ্চা হয়ে গেছে।আর ওকে দেখো ! একটু বুদ্ধি – শুদ্ধি নেয় ঘটে ।দিনভর ছোট ভাই – বোনদের সাথে ঝ’গড়া – মা’রা’মা’রি করবে । আর সুযোগ পেলেই তূর্যকে জ্বা’লাবে । সেদিন তূর্য বলল না?ওর কোন শপিচ হারিয়ে গেছে।আমি নিশ্চিত ওটা আহিই ভে’ঙে গায়েব করে ফেলেছে ।এমন উড়ন’চ’ণ্ডী মেয়েকে বিয়ে করবে কে ,বুবু ? তুমিই বলো !”
পারভিন বেগম মুচকি হেসে বললেন,
” ওর বিয়ে নিয়ে তোর চি’ন্তা করতে হবে না ! দেখবি এক রাজপুত্তুর এসে ছোঁ মে’রে নিয়ে যাবে।তখন আবার কা’ন্নাকাটি করে দ্বি’মত করিস না যেন!”
লতা বেগম বললেন,
” আরে মেজো বুবু,আমার শান্ত বা প্রান্ত দুইটার একটা যদি আহির থেকে ১ দিনের বড়ও হতো।তাহলে আমিই মেয়েটাকে বাড়ি ছাড়া হতে দিতাম না।ও চলে গেলে বাড়িটা পুরো নিরিবিলি হয়ে যাবে । আচ্ছা বড় বুবু?
তূর্যটা যদি আরেকটু ছোট হতো তাহলে একটা ব্যবস্থা করা যেতো।কি বলো?
আমদের সময় তো এটুকু বয়সের পার্থক্য কিছুই ছিল না।কিন্তু এখনের ছেলে – মেয়েদের কথা তো আর বলা যায় না।”
মারুফা বেগম ধ’মকে বললেন,
” তুই থাম ছোট! তূর্য বাড়িতেই আছে।কথাটা কানে গেলে কিন্তু তুল’কালাম কা’ন্ড ঘটাবে। তোকেও বলি হারি! এসব কথা মাথায় আসে কি করে? মনে নেয় তোর, ছোট বেলায় মা তূর্যকে এসব বলে খেপাতেন আর ও গিয়ে আহিকে ধরে মা’রতো “বলেই হাসতে শুরু করলেন।
চৌধুরী বাড়ির প্রথম সন্তান হলো তূর্য।আর বাড়ির প্রথম সন্তান হওয়ার আদরের শেষ ছিল না ।
তূর্যের বয়স যখন ৯ তখন চৌধুরী বাড়িতে দ্বিতীয় সন্তান অর্থাৎ আহির আগমন ঘটে।বাবা – কাকাদের কাছে কন্যা সন্তানেরা একটু বেশিই আদুরে হয়।তবে তূর্যকেও তারা অসম্ভব ভালোবাসতেন।কিন্তু আহি আসার পর যখন বাড়ির তিন কর্তাসহ বাকিরা তাকে আদর করতো,কোলে নিতো।তখন সেটা দেখে তূর্যের হিং’সা হতো।আহিকে কেউ কোলে নিলেই তূর্য মুখ গো’মড়া করে দুই হাত বুকে বেঁধে এক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রা’গে ফুলত।
এমনকি সুযোগ পেলে আহিকে মেরেও বসত ।আর আহি কা’ন্না করলে কেও যদি জিজ্ঞেস করতো ” কি হলো? বনু কান্না করছে কেন,বাবা?”
তখন সে বলতো,” তোমাদের আল্লাদি মেয়েকে মনে হয় মশা কাঁ’মড়েছে।মশা কাঁ’মড়ালেই কাঁদতে হয় নাকি ? আমাকেও তো কাঁ’মড়ায় । কই? আমি তো কাঁদি না!”
একদিন মারুফা বেগম জোর করে আহিকে তূর্যের কোলে বসিয়ে দেয় ।আর আহিও আর লোক পেলো না, তূর্যের কোলে গিয়েই প’টি করে দিয়েছে।তূর্য ওমনি আহিকে ধপা’স বিছানায় ফেলে দিয়েছিল।আর ওয়াশরুমে গিয়ে টানা ৪ ঘন্টা ধরে আস্ত একটা সাবান নিজের উরুতে ঘ’ষতে ঘষ’তে শেষ করেছিল।
এসব কান্ডকারখানা দেখে তূর্যের দাদী আনোয়ারা বেগম বলতেন,” বুঝলি তূর্য ? আহি বড় হলে ওকে তোর সাথে বিয়ে দেবো । কেমন হবে বল?”
সাথে সাথে তূর্য কান্না শুরু করে দিতো ।আহিকে সারা বাড়ি খুঁজে যেখানে পেতো সেখানে গিয়ে মে’রে রেখে আসতো।
তবে আস্তে আস্তে সবটা ঠিক হয়ে যায়।৬ মাস যেতেই সেও আহিকে আদর করতে শুরু করে।বাইরে কোথাও গেলে নিজে খাবার কিনুক আর না কিনুক আহির জন্য কিছু না কিছু নিয়েই আসতো।কখনও খালি হাতে ফিরত না।
আর তূর্য বাড়ি ফেরা মাত্রই খাবারের লোভে আহি দৌঁড়ে তার কাছে চলে যেতো।তূর্যও খাবারের লোভ দেখিয়ে সারা মুখে আহির থেকে চু’মু খেয়ে তারপর খাবার দিতো।
ঝাড়বাতির বিশাল আলোয় ঝলমল করছে ড্রয়িং রুম। দেওয়ালে টাঙানো দামি চিত্রকলা।মেঝেতে পুরু কার্পেটের উপর পা ফেললে কোনো শব্দই শোনা যায় না ।যেন বিলাসিতার এই আবহও এক অদৃশ্য ষ’ড়যন্ত্রের সাক্ষী।
লায়েক শিকদার ও লাতিন শিকদার বসেছেন নরম সোফার দুই প্রান্তে।মাঝখানে সোনালি কারুকাজ করা টেবিল রাখা।তাদের সামনে ক্রি’স্টালের গ্লাসে ম’দ ঝিকমিক করছে।বাইরের শহরে কোলাহল থাকলেও এখানে এক অদ্ভুত নীরবতা,কেবল দামি ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে।
লাতিন শিকদার কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন,
” জনগণের মনে পুনরায় জায়গা করতে হলে কথার জাদু লাগবে,ভাইজান।আসিফ চৌধুরীর দু’র্বলতার তারে টান দেও,তাহলেই সে ভে’ঙে পড়বে।”
” কথার জাদুই যথেষ্ট নয়, প্রমাণও গড়ে তুলতে হবে।স’ন্দেহের ছোট্ট বীজ বপন করে দে,জনগণ সেটাকেই বড় করে তুলবে।”
গ্লাসে ম’দ ঢালতে ঢালতে বললেন লায়েক শিকদার।
“ভাইজান,জনগণের পাশাপাশি ওর নিজেদের দলের মধ্যেও ভা’ঙন ধরতে হবে ”
” ওর ভিত এতটাও দু’র্বল নয়,লাতিন।তবে একটা কথা মাথায় রাখিস,জনগণ বোকা নয়।তারা দেরিতে হলেও সত্য বুজতে পারে”
” জ্বি,ভাইজান।”
” আর জনগণের কানে কানে গু’জব ছড়িয়ে দে।আজকের যুগে সত্য খবরের চেয়ে মি’থ্যা গুজব অনেক দ্রুত ছড়ায়।একবার মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করল সত্য – মি’থ্যা গুলিয়ে ফেলবে।”
আলোচনার মধ্য দিয়ে বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে।
ঘর ভরে উঠলো এক নিঃশব্দ ভারে।যেন প্রকৃতিও তাদের ষড়যন্ত্রের সাক্ষী।
তাদের চোখে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি____ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মাদকতাময় প্রত্যাশা।
ষড়যন্ত্র যতই ডাকা থাকুক বিলাসিতার আড়ালে,একদিন তা প্রকাশ হবেই।এটা বোধ হয় তাদের জানা নেয়।
প্রতিদিনের মতো আজও তাহি,শান্ত আর প্রান্ত ক্রিকেট খেলছে।তবে বাগানে।অনেক অনুরোধ করে তূর্যের আয়ত্ত থেকে ব্যাট – বল এনেছে।তবে প্রমিজ করে আসতে হয়েছে তারা আর ছাদে খেলাধুলা করতে পারবে না।বিশেষ করে যে সময়ে তূর্য বাড়িতে থাকবে।
তারাও সেই শর্ত মেনে তবে ব্যাট – বল হাতে পেয়েছে।আহি দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে বলল,
” এই ,আমিও খেলব ”
শান্ত ব্যাটিং করছিল ।সে হাত উঁচু করে ইশারায় প্রান্তকে বল করতে নিষেধ করে বলল,
” না,আহিপু।তোকে নিবো না।মাঝপথে খেলা রেখে চলে যাবি ”
” না না।যাবো না প্রমিজ ! ”
” পাক্কা প্রমিজ ? ”
” হ্যাঁ,হ্যাঁ,পাক্কা !দে ,দে, বল দে,প্রান্ত ”
প্রান্ত বল দিতে দিতে বলল,
” আজ খেলা রেখে চলে গেলে তোমাকে শা’স্তি দেওয়া হবে আহিপু ”
” আচ্ছা ,দিস ! এক কাজ কর আমরা নতুন করে শুরু করি ”
তারাও আহির কথা অনুযায়ী টস করে খেলা শুরু করেছে।প্রথমেই তাহির ব্যাটিং তারপর আহি,তারপর প্রান্ত এবং সবার শেষে শান্ত। তাহি ব্যাটিং করছে ,শান্ত বল করছে ,প্রান্ত আর আহি ফিল্ডিং করছে।৫ থেকে ৭ টা বল করার পর তাহি আউট হয়ে গেল।এবার আহির পালা।বল করছে প্রান্ত ।
আহি আউট না হলেও একটা বলও ব্যাটে লাগাতে পারছে না।এভাবে কিছুক্ষন খেলার পর সেও আউট হয়ে গেল।
” আহিপু আউট,আউট ! ব্যাট দাও”
” না না।হবে না।আমি রেডি ছিলাম না ।”
শান্ত বলল,
” রেডি ছিলি না, মানে কি? ব্যাট দে প্রান্তকে ”
” বললাম না ,রেডি ছিলাম না। তাহির কাছে বল দে।ও বল করবে ”
” হ্যাঁ, ওর কাছে দিবো আর ইচ্ছা মতো পে’টাবা ।শখ কত !”বলে প্রান্ত আহির থেকে ব্যাট কেঁড়ে নিয়ে গেল।
” আচ্ছা তাহলে আমিও খেলব না ।খেল তোরা ” বলে আহি চলে যাচ্ছিল । শান্ত পথ আটকে বলল,
” প্রান্ত কী বলেছিল তোকে? মাঝপথে চলে গেলে শা’স্তি পেতে হবে।তুই আমাদের তিন জনের থেকে গুণে গুণে তিন সাতা একুশটা কি’ল খেয়ে পরে যাবি।আর তাহি ,তুই ওকে না মা’রলে আগামী দিন থেকে তোকেও আর খেলায় নিবো না।”
” আচ্ছা মার! তাহি তুই মা’রবি আমাকে ?” শেষ কথাটা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল আহি।
তাহি মাথা নিচু করে রেখেছে।সে তো মা’রতে চায় না।এদিকে না মারলে শান্ত – প্রান্ত তাকে আর খেলতে নিবে না।মা’রতে তো হবেই।
” আচ্ছা বুঝেছি ,বুঝেছি ! সবাই মা’রবি ! মা’র,মা’র !অ’সহায় পেয়েছিস তো ,মে’রে নে।তবে হিসাব করে মা’রিস । বাড়ির হেড অফিসে না’লিশ যাবে । আজকে ছোট বাবাকেও বলবো ”
” আচ্ছা বলো ! আমারও বলবো।প্রতিদিন তুমি এসে এসে নাটক করবা তা তো হবে না ” কথা টা বলেই প্রান্ত আহির পিঠে কি’ল আরম্ভ করলো । সাথে শান্তও শুরু করলো।
এই সুযোগে তাহি আস্তে করে ২ টা কি’ল মেরে বলল ,
” আমার শেষ ”
আহি মা’র খেয়ে যেন পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না ।পুরো পিঠ অ’বশ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।কি’ল তো নয় যেন ভাদুরে তাল ফেলেছে পিঠে।আহির চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেছে।তবে সেটা মা’রের ব্যথায় নয়,অভিমানে!
সে কান্না করতে করতে দৌঁড়াতে লাগলো।আজ সব কটাকে মা’র খাওয়াবে।এত জোরে মারুফা বেগমও তাকে মা’রে না। কিভাবে ওরা এত জোরে মা’রতে পারলো ? তাহিকে যে, সে প্রতিদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় চকলেট এনে খাওয়াতো । সে ও মা’রল?এই নিয়ে কতদিন তূর্যের ব’কা খেয়েছে সে । তবুও গায়ে না মেখে চকলেট আন্তই।আজ কয়েকদিন বাইরে যাওয়া হয় না তাই চকলেটও আনতে পারে না।এই দুইদিন পুরোনো সব ভুলে গেলো? তাহির চেয়ে তো নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাটকের মোহাম্মদী বেগও ভালো ছিল।
এগুলো ভাবছিল আর দৌঁড়াচ্ছিল আহি।মাঝে পথে মনে হলো কারো সঙ্গে ধা’ক্কা খেল।ক্রিয়া – প্রতিক্রিয়া বলের দরুন সে কিছুটা পিছিয়ে গেল। পা থামানোর আগেই কারো ক’র্কশ কন্ঠের ধ’মক শুনতে পেল,
” ই’ডিয়েট ! দেখে চলতে পারিস না? এক চ’ড়ে দাঁত সবগুলো ফেলে দেবো ”
আহি সামনে তাঁকিয়ে দেখতে পেলো তূর্য অ’গ্নি দৃষ্টি মেলে তাঁকিয়ে আছে।রা’গে চোখ – মুখ লাল হয়ে আছে।তূর্যের হাতে থাকা কফিতে তার সাদা টি – শার্ট ভিজে গেছে ।
আহি একবার নাক টেনে নিলো তারপর বললো,
” তাতে কি হয়েছে? একটু কফিই তো পড়েছে।আপনি দেখতে পান না? ”
” এক চ’ড় খেলে বুঝবি আমি দেখতে পাই কিনা ”
” আজকে যদি গুড়ো থেকে বুড়ো অব্দি সবকটার নামে না’লিশ না করেছি তাহলে আমার নামও আহি না ” বলে আহি আবারও কাঁন্না করতে করতে দৌঁড় আরম্ভ করলো।
তূর্য চোখের ইশারায় বাকি তিনটাকে ডেকে এনে বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৭
” কী হয়েছে? ও কাঁদছে কেন?”
” আহিপু অলওয়েজ খেলা রেখে চলে যায়।তাই আজ মে’রেছি”
” এজন্য মা’রবি ? ও তোদের বড় হয় না? বড়দের রেসপেক্ট করতে হয় জানিস না ?”
” ভাইয়া ,আপনিও তো ওর বড় হন।ও যে মাত্র আপনাকে বুড়ো বলে গেলো তখন?”
” ও বে’য়া’দব তাই তোরাও বে’য়া’দব হবি?”
