Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৭

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৭

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৭
আরাফাত আদনান সামি

প্রায় ঘণ্টা খানিক পর মায়ার জ্ঞান ফিরল। নিস্তব্ধ ঘরটায় জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকা নরম আলো তার মুখে পড়ছে। আস্তে আস্তে চোখ মেলে চারপাশে তাকাল সে। মাথা কেমন ঘুরছে, শরীর ভারী লাগছে। কিছুটা বিভ্রান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“আমি কোথায়? এটা কার রুম?”
সোফায় বসে থাকা কৌশিক চমকে উঠল। মায়ার চোখ খোলা দেখে একটু স্বস্তির হাসি ফুটল তার মুখে, কিন্তু পরক্ষণেই একটা অজানা লজ্জায় দৃষ্টি নামিয়ে নিল। তবুও সাহস সঞ্চয় করে উঠে এল মায়ার পাশে।
মায়া নিভু নিভু চোখে তাকাল তার দিকে, কণ্ঠে হালকা কাঁপুনি,
“আমি কোথায়? কে আপনি? আমাকে এখানে কেন এনেছেন? কে আপনি?”
কৌশিকের ভ্রু কুঁচকে গেল। ঠোঁটে তির্যক হাসি টেনে গম্ভীর স্বরে বলল,
“মাই ড্রামা কুইন, ড্রামাটা এবার বন্ধ করো। রুমটা দেখে চিনতে পারছ না? এটা আমার রুম। যা কয়দিন পর আমার থেকে আমাদের রুম হবে বুঝলি?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কৌশিকের কণ্ঠের কঠোরতা মায়ার ভেতরে যেন হালকা কাঁপন তুলল। সে তাড়াতাড়ি উঠে বসল, চুলগুলো ঠিক করতে করতে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। ঘরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দেওয়ালে ফ্রেমে ঝোলানো কিছু ছবি, এক কোণে রাখা গিটার সবই কৌশিকের পরিচিত গন্ধে ভরা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হালকা অভিমানের সুরে বলল,
“এমন করে বলার কী আছে? একটু শান্তভাবে কথা বলা যায় না?”
কৌশিক তাকিয়ে রইল তার দিকে। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,’এটা কী হলো? ও কীভাবে,এমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে? ওর তো এতক্ষণে লজ্জায় লাল-নীল-বেগুনি হয়ে যাওয়ার কথা! কিন্তু ওর মুখে একটুও লজ্জার ছাপ নেই কেনো? একটু আগের ঘটনা ওর মনে নেই নাকি?’
তার চোখে বিস্ময়, মুখে অল্প কৌতুকের ছায়া। মায়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচু করে বলল,

“আচ্ছা মায়া, তোর কিছু মনে নেই?”
“কিসের কথা বলছেন আপনি?”
“তোর একটুও লজ্জা করছে না আমার সঙ্গে কথা বলতে?”
মায়া ভ্রকুচকে বলল,
“আপনার সঙ্গে কথা বলতে কেনো লজ্জা করবে শুনি?”
“না এমনি বললাম।”
এ কথা বলে কৌশিক চুপ হয়ে গেল। মায়াকে আড়চোখে দেখে সে মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল,‘আশ্চর্য, এত কিছু ঘটে গেল আর কিছুই মনে নেই? উফ্, আমিও না, নিশ্চয় লজ্জা পাবে বলে এমন ভাব করছে।’
ঠিক সেই মুহূর্তে মায়া হঠাৎ জোরে চেচিয়ে উঠল,

“আআআআআ… কৌশিক ভাইয়া, বাঁচান, আআআআআাাাাাাাাা..…!”
চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গেই মায়া কৌশিককে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল।শার্ট খামচে ধরে সে নিজের মুখ লুকাল কৌশিকের বুকে। কৌশিক মায়ার চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেল। সাথে সাথে বলল,
“কী হয়েছে, মায়া…?”
মায়া কৌশিকের বুক থেকে মাথা না উঠেই বলল,
“সরান আগে ওদের কে…”
“কাদের সরাবো এখানে তুই আর আমি ছাড়া কেউ নেই?”
“না আছে….”
“কীহ্…!”
বলেই কৌশিক রুমের চারিপাশে নজর বুলাল অতঃপর আবার বলল,

“কই কোথাও তো কেউ নেই?”
“না আছে…”
“কে?”
“ইঁদুর…”
“কীহ্!”
“হ্যাঁ দুটো বড় বড় ইঁদুর আছে এখানে।”
মায়া এখনো কৌশিকের বুক আকড়ে ধরে মুখ গুজে আছে। কৌশিক মায়ার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“এখানে তো কোনো ইঁদুর নেই! আর যে চিৎকার দিছোস, থাকলেও এতক্ষণে তোর চিৎকার শুনে বিনা টিকিটে বাংলাদেশ থেকে উগান্ডা চলে গেছে। এত জোরে কেউ চিৎকার দেয়?”
কৌশিক কথাটা বলা মাত্রই মায়া তার বুকের বাম পাশে সজোরে একটা কামুড় বসিয়ে দিল। কৌশিক তীব্র ব্যথা অনুভব করল।

“আাাা… মায়া, কী করছিস! ছাড়া এটা তোরটার মতো কোনো কাজের না। কামুড় বসালেও কোনো লাভ হবে না, মায়া। ছাড়, ব্যথা পাচ্ছি তো।”
মায়া সাথে সাথে কৌশিকের বুক থেকে মুখ তুলে নিয়ে বিছানার এক কিনারে গিয়ে বালিশ বুকে গুজে বসল। মায়া সরতেই কৌশিক শার্টের আরো কয়েকটা বোতাম খুলল। কামুড় বসানো স্থানে রক্ত জমে গেছে, সাথে গোল করে চারিদিকে ধারালো দাঁতের চিহ্ন। কৌশিক শার্ট সরিয়ে মায়াকে দেখিয়ে বলল,
“দেখ, কী করেছিস! এগুলো কী তোর দাঁত না, করাত শালি রাক্ষসী রাণী কটকটি। আরেকটু হলে তো দাঁতগুলো সব বুকে ঢুকে যেত। এভাবে কেউ কামুড় দেয় নাকি?”
মায়া ভ্রকুচকে বলল,

“বেশ করেছি…”
“চুপ শালি।যা মজা করার করে নে এই তো আর কয়টাদিন,সময় আমারো আসবে যেই বরাবর কামুড় টা বসালি না ঠিক সেই বরাবর কামুড় দিয়ে সুধে আসলে তুলে নিব দেখিস শালিি।”
“ছিহ্ কীসব কথা বার্তা। মুখে লাগাম লাগান,অসভ্য।”
“চুপ শালি, একদম চুপ, আর আমাকে আগে এটা বল, ইঁদুর দেখে এমনে কেউ চিৎকার দেয়?”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া সব ভুলে একটু বাচ্চাসলুভ স্বরেই বলল,
“কী করবো কৌশিক ভাই আমি ভিষণ ভিষণ ভিষণ ভিষণ ভিষণ ভিষণ ভিষণ ভিষণ……”
কৌশিক গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“মরি ভিষণ এর পরে বল।”
মায়া ঠোঁট গুলো বাকিয়ে বলল,
“জানেন কৌশিক ভাই আমি ভিষণ ভয় পাই ইঁদুর দেখে।তখন দেখেন নি ইঁদুর আমার কাছে ছিল বলে ভয়ে কীভাবে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম।”

“হোয়াট?”
“কী হয়েছে?”
“মানে ইঁদুর দেখে তখন জ্ঞান হারিয়েছিলি?”
“হ্যাঁ আর তাও দু’দুটো বড় বড় ইঁদুর ছিল তাই বেশি ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি।”
কৌশিক মায়ার কথা শুনে ঠাস করে কপালে হাত রেখে দিয়ে বলল,
“ছিহ্ মাইরি….”
“কী হলো কৌশিক ভাই?”
“কিছু না।”
“কিছু তো হয়েছে!কৌশিক ভাই বলেন না।”
“যা হবার তা তো হয়েই গেছে। বাদ দে…”
“এই এই আমি অজ্ঞান অবস্থায় আপনি আবার আমার সাথে উল্টো পাল্টা কিছু করেন নি তো?”
“ধ্যাৎ চুপ থাক তো, তোর সাথে আমি আর কী করবো যা হবার তো সব আমার সাথেই হয় তবে মানতে হবে খাষা এক্ষাণ কপাল আমার।”
মায়া কৌশের এই কথায় তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বলল,

“এই রুমে আপনার মতো একটা জলজন্তু ষাড় থাকে এটাই কী যথেষ্ট নয়? সাথে ইঁদুর পালার কী দরকার?”
এমন সময় মায়ার মুখ থেকে এই কথা শুনে খুশির মাঝে কৌশিক বেশ রেগে গেল। মায়ার পানে রক্তিম চোক্ষ নিক্ষেপ করে ধমকের স্বরে বলল,
“থাপ্পড় চিনিস?এক থাপ্পড়ে চার আটা ৩২ পার্টি খুলে হাতে ধরিয়ে দিব।”
মায়া কৌশিকের ধমকে থতমত খেয়ে গেল। আকড়ে ধরল বালিশ, সাথে সাথে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা নোনাজল। কৌশিক তা দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। ‘প্রতি কথায় এত মুড সুইচিং হয় কীভাবে এই মেয়ের?’মনে মনে ভাবল কৌশিক।
কৌশিক সাথে সাথে মায়ার কাছে এসে বসল। হাত দিয়ে চোখ মুছে দিতে চাইলে মায়া বলল,

“একদম ছোবেন না আমায়। আপনি একদম ভালো না। আপনার সঙ্গে এখন থেকে কোনো কথা নেই আমার। আপনার সঙ্গে এখন থেকে আড়ি।”
“কিন্তু আমি তো তোর সাথে আড়ি করবো না।”
“না করলে নাই কিন্তু আমি আর আপনার সাথে কথা বলবো না। থাকেন আপনি আপনার রুমে…”
বলেই মায়া যেই বিছানা থেকে উঠে চলে যেতে যাবে ওমনি কৌশিক মায়ার এক হাত ধরে নেয়,সাথে সাথে এক হেঁচকা টানে মায়াকে তার কোলে বসিয়ে দিয়ে বলল,

“আমার পারমিশন ছাড়া কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?”
“ছাড়ুন আমার হাত আমার ব্যথা লাগছে।”
“সরি সরি সরি।”
“আপনার সাথে কোন কথা নাই ছাড়ুন আমায়।”
“সরি বললাম তো।”
“বললাম না ছাড়ুন আমায়।”
“যা আর ধমক দিব না। এবার তো…”
কৌশিকের কথাটা টান দিয়ে মায়া অভিমানী স্বরে বলল,
“না এইভাবে ক্ষমা করবো না।”
“তাহলে…!”
“একটা গান বলেন তাহলে করবো না হলে করবো না।”
“ওহ্ এই ব্যাপার এটা তো আমার বা হাতের খেলা দাঁড়া এখনি বলছি….।”
“এই না না শুধু গান গাইলেই হবে না সাথে আমার একটা শর্ত আছে।”
“না না আমি কোন শর্ত মর্ত মানতে পারবো না।”
“আপনার সাথে না আড়ি করলাম? ছাড়ুন আমায় ছাড়ুন বলছি…”
“শুনছিতো তোর বাল, বল কী তোর শর্ত?”

“এমন একটা গান গাইতে হবে যেই গানের মাধ্যমে আপনি আমাকে প্রপোজ ও করবেন আর আপনার গানও বলা হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ উল্টো পাল্টা গান বললে চলবে না কিন্তু, না হলে…”
“আরে আরে বলছি তো আমি। এমন কোনো গান আছে নাকি নেই তা ভাবার সুযোগ তো দিবি নাকি?”
“ওনলি ফাইভ মিনিটস ওকে!”
“ওকে।”
বলেই কৌশিক ভাবতে শুরে করে দিল। এমন কী গান আছে যেটা দিয়ে গান আর প্রপোজ দুইটাই হবে?ভাবতে ভাবতে চারমিনিট কেটে গেল। মায়া বলল,
“অলরেডি চার মিনিট শেষ। আপনার কাছে আর মাত্র এক মিনিট আছে মিস্টার। গান খুজতে খুজতে দেখছি হাবুডুবু খেয়ে যাচ্ছেন।”
মায়ার কথা শুনে কৌশিকের কিছু একটা মনে পড়ল বলে। সাথে সাথে কৌশিক বলে উঠল,

“এই এই কী বললি…”
“কেন খারাপ কিছু বললাম নাকি?”
“না লাস্টে কী বললি তুই আমাকে? আমি কী গান খুজতে গিয়ে কী খাচ্ছি?”
“হাবুডুবু, কেন?”
কৌশিক এক হাত দিয়ে মায়ার গাল আলতো টেনে দিয়ে বলল,
“নিজেই এক সমস্যা আবার নিজেই সমাধান উফ্ সুইটহার্ট তো আমি….”
কৌশিকের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মায়া বলল,
“শেষ পর্যন্ত সামান্য একটা গান খোজার শোখে পাগল হয়ে গেলেন নাকি?”
“পাগল আমি নই পাগল এবার তোকে বনাব।গান শুনার জন্য তৈরি হো।”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া ভ্রকুচকাল। বলল,

“নিশ্চয় গান না পেয়ে নিজে একটা বানাইছেন তাই না? এইসব কিন্তু একদম চলবে না বলে দিলাম।”
“নাহ্ আমি কেন বানাতে যাবো? গানটা তো আগে শুন। তারপর না হয় যা বলার বলিস।”
বলেই কৌশিক মায়ার হাতটা আস্তে করে ছেড়ে দিল।কৌশিক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কোণের দিকে রাখা পুরনো গিটারটা তুলে আনল সে। কতদিন যে এই গিটারে হাত দেয়নি! ধুলো জমে গেছে তার গায়ে, কিন্তু আজ কেমন যেন গিটারটাও প্রাণ ফিরে পেল, যেন সে-ও জানে আজ কৌশিকের মনে কিছু বিশেষ আছে।

গিটার হাতে নিয়ে মায়ার সামনে এসে বসে পড়ল কৌশিক। গিটারের তারগুলোয় হাত বুলিয়ে নিল, যেন পুরনো বন্ধুকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখছে। আঙুলের ডগায় কিছুটা কাঁপুনি, কিন্তু মন দৃঢ়। এতদিন বাদে বাজাতে বসেছে সে, অথচ আশ্চর্য আজ কোনো ভুল নেই, কোনো সংশয় নেই। দুইবার কাশি দিয়ে গলাটা একটু পরিষ্কার করল কৌশিক। এক মুহূর্তের জন্য মায়ার দিকে তাকাল, সে তখন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কৌশিকের দিকে, নিঃশব্দ, নিশ্বাসটাও যেন আটকে আছে কোথাও।কৌশিক হালকা হাসল। তারপর গিটারের তারে একটানা আঙুল চালিয়ে প্রথম কর্ডটা বাজাল। মৃদু সুরে ঘর ভরে উঠল। মায়ার পানে নিবিষ্ট চোখে তাকিয়ে, গভীর এক অনুভূতি নিয়ে কৌশিক গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করল……

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৬

মন খালি খালি তুই তুই করে
তুই তুই করে,তুই তুই করে
এই বুকে চোরাবালি চুঁই চুঁই করে
ছুঁই ছুঁই করে,তুই তুই করে
এখন আর কী করার
হয়ে যা তুইও ফেরার
প্রেমে চল হাবুডুবু হাবুডুবু খাই
দু’জনে চল ডুবে ডুবে ভালোবেসে যাই

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৮