Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৫

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৫

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৫
আরাফাত আদনান সামি

​চিটাগং পোর্টের সেই রক্তে রাঙানো, অভিশপ্ত জেটি থেকে ধুলো, বারুদ আর সমুদ্রের নোনা বাতাস উড়িয়ে যখন ‘চৌধুরী গ্রুপ’-এর কালো রাজকীয় হেলিকপ্টারটি ঢাকার আকাশে ডানা মেলল, তখন ভেতরের পরিবেশটা কোনো জীবন্ত কবরস্থানের চেয়ে কম ছিল না। রোটরের একটানা কানফাটানো ‘বপ-বপ’ শব্দটা যেন মৃত্যুর এক কর্কশ বাদ্যি বাজিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই যান্ত্রিক শব্দের চেয়েও হাজার গুণ তীব্র আর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠছিল কৌশিকের বুকের ভেতরের আদিম হাহাকার। ​হেলিকপ্টারের পেছনের প্রশস্ত, বিলাসবহুল সিটে মায়াকে নিজের কোলের উপর পাঁজাকোলা করে ধরে পাথরের মতো বসে আছে কৌশিক। মায়ার নিস্প্রাণ মাথাটা ওর বাম বাহুর ওপর বড্ড অসহায়ভাবে এলিয়ে আছে। ফার্স্ট এইডের ড্রেসিংটা ভেদ করে তাজা, তপ্ত লাল রক্ত অনবরত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে কৌশিকের ধবধবে সাদা শার্টের হাতায়, তার বুকে, তার পুরো অস্তিত্বে। মায়ার নরম শরীরটা প্রতি সেকেন্ডে মাইনাস তাপমাত্রার বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছিল; ঠোঁট দুটো বিবর্ণ, ফ্যাকাশে নীল বর্ণ ধারণ করছে। যেন জীবনপ্রদীপটা নিভে যাওয়ার শেষ প্রস্তুতি চলছে।

​“মায়া,জান আমার, আমার দিকে তাকাও। দেখো একদম চোখ বন্ধ করবে না! আমি তোমাকে ঘুমাতে দেব না, মায়া! খবরদার চোখ বন্ধ করবে না!”
​কৌশিকের কণ্ঠস্বর হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের বিকট শব্দকে চিরে এক পৈশাচিক আর্তনাদের মতো শোনাল। ওর ডান হাতের কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো মায়ার গালে লেগে থাকা শুকনো আর তাজা রক্তের ওপর স্লাইড করছিল। যে কৌশিক নীর চৌধুরীকে পুরো বিজনেস ওয়ার্ল্ড চেনে এক নির্মম, পাষাণ, অহংকারী আর ইস্পাত-কঠিন মনের মানুষ হিসেবে,যার এক একটা চোখের ইশারায় কোটি টাকার বাজার ওলটপালট হয়ে যায়,সেই মানুষটা আজ ওর বুকের ওপর এক ফোঁটা নিশ্বাসের জন্য ছটফট করা মেয়েটার সামনে সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ওর চোখ বেয়ে অনবরত তপ্ত অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল মায়ার নিথর কপালে, রক্তের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল সেই জল।
​“রোহিত! পাইলটকে বল স্পিড বাড়াতে! আর কতক্ষণ লাগবে ঢাকা পৌঁছাতে? আই সোয়্যার রোহিত, মায়ার যদি কিছু হয়ে যায়, আমি এই আকাশ, এই হেলিকপ্টার, এই পুরো দুনিয়াটা জ্বালিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেব! আমি কিচ্ছু আস্ত রাখব না!”

​কৌশিক বাঘের মতো গর্জে উঠলেন, কিন্তু ওর গলার সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য আজ এক আদিম, তীব্র ভয়ে কাঁপছিল। নিজের সর্বস্ব হারিয়ে ফেলার ভয়! ​সামনের সিটে বসা রোহিত অনবরত ওর ল্যাপটপ আর ফোনে তাদের পার্সোনাল হসপিটালের ডিরেক্টরের সাথে কথা বলছিল। ওর নিজের চোখ দুটোও কান্নায় আর আতঙ্কে লাল হয়ে উঠেছে। ও ফোন কানের কাছে চেপে ধরে অত্যন্ত দ্রুত, কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“ব্রো, ওল্ড এয়ারপোর্টে আমাদের হসপিটালের আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স অলরেডি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ডক্টর সালাহউদ্দিন ওনার বেস্ট সার্জিক্যাল টিম নিয়ে ওটি-র সামনে রেডি। আর মাত্র দশ মিনিট, ব্রো! তুমি ভাবিকে ধরে রাখো, প্লিজ ভাবির কথা বলাতে থাকো… মনে হচ্ছে ভাবির পালস রেট খুব দ্রুত ড্রপ করছে!”
​মায়ার নিস্তেজ হাতটা কৌশিকের শক্ত হাতের মুঠোয় ছিল। হুট করেই মায়ার আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে উঠল, যেন যাওয়ার আগে শেষবারের মতো স্পর্শটা চিনে নিতে চাইল। ওর আধবোজা চোখের পাতা দুটো এক মিলিমিটার ফাঁক হতেই কৌশিক ওর মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এল। ওর তপ্ত, উথাল-পাথাল নিশ্বাস মায়ার বরফ-শীতল ঠোঁটে আছড়ে পড়ছিল।

​“কৌ…শিক… বড্ড… ঠান্ডা… লাগছে…”
​মায়ার কণ্ঠস্বর এতটাই ফিসফিসে আর ক্ষীন ছিল যে ওটা যেন কোনো মৃতদেহের শেষ আকুতি, এক টুকরো করুণ আর্তি।
​“আমি আছি তো, জান। এই তো দেখ আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে আছি। তোমার কিচ্ছু হবে না। তোমার কৌশিক তোমার কিচ্ছুটি হতে দিবে না। এই কৌশিক থাকতে তোমার কিচ্ছু হতে পারে না!”
​কৌশিক ওর দুই বাহুর বাঁধন আরও শক্ত করে মায়াকে নিজের বুকের পাঁজরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ধরল, যেন ওটা কোনো সুরক্ষামূলক দেয়াল। সে ওর ঠোঁট দুটো মায়ার বরফ-শীতল ঠোঁটের ওপর সজোরে চেপে ধরল; যেন নিজের শরীরের সমস্ত উষ্ণতা, নিজের শরীরের সমস্ত প্রাণ সে ফুঁকে দিতে চায় ওর মায়ার ভেতরে। কিন্তু মায়ার চোখের পাতা দুটো আবার ধীরে ধীরে, নিষ্ঠুরভাবে বন্ধ হয়ে গেল। ওর হাতের সেই আলগা বাঁধনটা পুরোপুরি আলগা হয়ে কৌশিকের কোল ঘেঁষে নিচে ঝুলে পড়ল।
​“মায়াআআ!”
​কৌশিক এক বুকফাঁটা, আকাশ কাঁপানো চিৎকার দিয়ে উঠল। ওর পুরো দুনিয়াটা যেন এক সেকেন্ডে এক গভীর, অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে গেল।

​তেজগাঁও ওল্ড এয়ারপোর্টে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার পর থেকে চৌধুরী পার্সোনাল হসপিটালের তিন তলার ওটি (Operation Theater)-র সামনে পর্যন্ত সময়টা কীভাবে কেটেছে, কৌশিকের তা বিন্দুমাত্র মনে নেই। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ। ওর পুরো শরীর এখন মায়ার রক্তে মাখামাখি। ওর সেই রাজকীয়, অহংকারী অবয়ব এখন ধুলো, কাদা আর ছাইয়ে মলিন। ওটি-র ওপরের সেই লাল লাইটটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে, যা প্রতি সেকেন্ডে ইঙ্গিত দিচ্ছিল ভেতরে এক একটা প্রাণের চূড়ান্ত, নির্মম যুদ্ধ চলছে। ওটি-র সামনের ওয়েটিং এরিয়ার সোফাগুলোতে উদ্বিগ্ন মুখে মাথা নিচু করে বসে আছেন আসিফ চৌধুরী আর আশরাফ চৌধুরী সাথে মাহিমা চৌধুরী, নিধি আর তিয়াশাও এসে পৌছেছে। সবার চোখে-মুখে শ্মশানের নীরবতা। সাথে এসেছে মায়ার বাবা-মা, অমিতাভ পাটোয়ারী ও রুবিনা পাটোয়ারী। রুবিনা পাটোয়ারী অনবরত বুকে চাপড়ে চোখের জল ফেলে চলেছেন, আর অমিতাভ পাটোয়ারী নিজের কাঁপতে থাকা স্ত্রীকে বৃথা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যদিও ওনার নিজের চোখ দিয়েও জল ঝরছিল। তিয়াশা এক কোণে দেওয়ালে মাথা ঠুকে অনবরত নিজের হাত কামড়ে কাঁদছে। ওর বারবার মনে হচ্ছে, ওর এই সামান্য, নির্বোধ ভুলের জন্য আজ ওর কলিজার টুকরো ভাবি মৃত্যুর দোরগোড়ায়।

​হুট করেই ওটি-র ভারী, স্টিলের দরজাটা ঠেলে বাইরে এলেন ডক্টর সালাহউদ্দিন। ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, মুখটা অত্যন্ত গম্ভীর আর ফ্যাকাসে। ওনাকে দেখা মাত্রই কৌশিক এক হিংস্র পশুর মতো লাফে এগিয়ে গিয়ে ওনার শার্টের কলারটা দুই হাত দিয়ে খপ করে চেপে ধরল। ওর চোখের সেই খুনে, রক্তপিপাসু চাহনি দেখে ডক্টর সালাহউদ্দিনের মতো অভিজ্ঞ ডাক্তারও ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেলেন।
​“আমার মায়া কেমন আছে, ডক্টর? ওর জ্ঞান ফিরেছে তো? ও আমার সাথে কথা বলছে না কেন! ও ভেতর থেকে আমাকে ডাকছে না কেন? কী হলো জবাব দিন!”
​কৌশিকের কর্কশ কণ্ঠস্বর পুরো করিডোরের দেওয়ালে হাতুড়ির মতো আঘাত করল। আশরাফ চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এসে কৌশিকের হাত দুটো ডক্টরের কলার থেকে প্রায় জোর করে ছাড়িয়ে দিলেন।
​“কৌশিক! শান্ত হ বাবা! ডক্টরকে আগে কথা বলতে দে!”
​ডক্টর সালাহউদ্দিন একটা গভীর, যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওনার চশমাটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত ভাঙা গলায় বললেন,

“মিস্টার চৌধুরী, আই অ্যাম ভেরি সরি টু সে, বাট পেশেন্টের কন্ডিশন অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল, হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। ওনার মাথার পেছনের হাড়টায় প্রচন্ড জোরে আঘাত লেগেছে,একটা বড় ফ্র্যাকচার হয়েছে, যার কারণে ইন্টারনাল হেমোরেজ (Internal Hemorrhage) বা ব্রেইন ব্লিডিং হচ্ছে। ওনার মাথা থেকে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ওনার ইমিডিয়েট মেজর সার্জারি দরকার, অন্যথায় ওনাকে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
​কৌশিক পাগলের মতো চিললিয়ে উঠল,
“তাহলে করছেন না কেন? কিসের অপেক্ষা আপনাদের? টাকা? চৌধুরী গ্রুপের অর্ধেক প্রোপার্টি আমি এখনই এই হসপিটালের নামে লিখে দেব, জাস্ট স্টার্ট দ্য সার্জারি! যে-কোন মূল্যে আমার মায়াকে এনে দিন!”
​ডক্টর সালাহউদ্দিন অত্যন্ত অসহায় আর রুদ্ধশ্বাসে বললেন,
“টাকা কোনো সমস্যা নয়, মিস্টার কৌশিক। সমস্যা হলো রক্ত। মায়ার ব্লাড গ্রুপ হচ্ছে অত্যন্ত রেয়ার ‘O Negative (O-)’। ওনার শরীর থেকে এত বেশি ব্লাড লস হয়েছে যে, ওনার শরীরে নতুন করে অন্তত চার ব্যাগ ও-নেগেটিভ রক্ত এই মুহূর্তে পুশ না করলে ওনার হার্ট যেকোনো সময় ফেইল করবে, হি ইজ ডাইং! আমাদের নিজস্ব ব্লাড ব্যাংকে মাত্র এক ব্যাগ ছিল, যা অলরেডি ওনাকে দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন ব্যাগ রক্ত না পেলে আমরা ওটি স্টার্ট করতেই পারছি না।”

​ডক্টর একটু ওনার চশমাটা মুছে আবার বললেন,
“আচ্ছা, পেশেন্টের কী বাবা-মা আসেননি?”
ডক্টর এর কথা শুনে ​অমিতাভ পাটোয়ারী পাগলের মতো দৌড়ে ডক্টরের কাছে গিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা দু’জনেই এখানে আছি, বলুন ডক্টর! কী করতে হবে?”
​“কী লাগবে মানে? আপনারা বুঝতে পারছেন না? মেয়েটা তো আপনাদেরই, তাই না? তাহলে রক্ত নিয়ে এত চিন্তা কিসের? আপনাদের দু’জনের মধ্যে কারও না কারও রক্ত ওর সঙ্গে মিলবে। অ্যাম আই রাইট? জলদি ব্লাড টেস্টের জন্য চলুন!”
​অমিতাভ পাটোয়ারী ডক্টরের এই কথা শুনে যেন এক বজ্রপাতের মুখোমুখি হলেন। তিনি অত্যন্ত অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে পাশে দাঁড়ানো রুবিনা পাটোয়ারী’র দিকে তাকালেন।
​এমন সময় কৌশিক ছিটকে এসে অমিতাভ পাটোয়ারী কাছে ওনার হাত দু’টো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে আকুল হয়ে বলল,
“হ..হ্যাঁ! এটা তো আমার মাথাতেই আসে নি! আব্বা, দ্রুত বলুন না, আপনাদের রক্ত তো ওর সাথে মিলবেই। চলুন, ভেতরে চলুন!”

​অমিতাভ পাটোয়ারী কোনো কথা বললেন না, পাথর হয়ে রইলেন। কৌশিক অস্থির হয়ে আবার বলল,
“কী হলো আব্বা? কথা বলছেন না কেন? সময় চলে যাচ্ছে তো!”
​কথাটা বলেই কৌশিক উন্মাদের মতো দৌড়ে গেল রুবিনা পাটোয়ারী’র কাছে। রুবিনা পাটোয়ারী তখন অনবরত চোখের জল ফেলছেন। কৌশিক ওনার সামনে মেঝেতে ধপাস করে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত চেপে ধরে বলল,
“আম্মা, আপনি অন্তত কিছু বলুন! আমার মায়াকে বাঁচান! আমার মায়াকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন, আম্মা। আমি ওকে ছাড়া মরে যাব, আমি বাঁচতে পারব না আম্মা! মায়া তো আপনাদেরও কলিজার টুকরো একমাত্র মেয়ে, তাই না? তাহলে এত সংকোচ কিসের? রক্ত দিন আম্মা!”
​অমিতাভ পাটোয়ারী দূর থেকে এক বুকফাটা, আর্তনাদভরা কণ্ঠস্বরে বলে উঠলেন,
“এখানে সময় নষ্ট করো না কৌশিক। আমাদের দু’জনের মধ্যে কারোর রক্ত মায়ার সাথে ম্যাচ করবে না! কোনোদিনও করবে না,কারণ আমাদের দু’জনেরই ব্লাড গ্রুপ হচ্ছে (O+), আর মায়ার (O-)!”
​কথাটা বলেই অমিতাভ পাটোয়ারী দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কথাটা কৌশিকের কানে পৌঁছানো মাত্রই তার মাথায় যেন পুরো আকাশটা হাজার টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ল। সে এক লহমায় স্তব্ধ, নিথর হয়ে গেল। ওপাশ থেকে ডাক্তার চোখ বড় বড় করে বলে উঠলেন,

“ইম্পসিবল! এটা কী করে সম্ভব? বায়োলজিক্যাল বাবা-মায়ের রক্ত আর সন্তানের রক্ত এভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত কী করে হতে পারে? যেকোনো একজনের রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ম্যাচ করার তো কথা, তাই না? ও পজিটিভ বাবা-মায়ের সন্তান ও নেগেটিভ… হাউ ইজ দিস পসিবল?”
​ডাক্তার একটু থেমে করিডোরের থমথমে পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত সন্দিহান গলায় বললেন,
“প্লিজ, ডোন্ট মাইন্ড। আচ্ছা, মায়া কি আসলেই আপনাদের নিজের গর্ভজাত সন্তান? নাকি… নাকি ও অ্যাডপ্টেড?”
​এই একটিমাত্র প্রশ্ন হসপিটালের ভেতরের পুরো পরিবেশটাকে মুহুর্তের মধ্যে এক অদ্ভুত, ভয়ঙ্কর থমথমে আবহে বদলে দিল। সবাই যার যার জায়গায় স্তব্ধ, পাথর হয়ে রইল। এক এক ফোঁটা নীরবতা যেন সুইয়ের মতো বিঁধছিল।
​কথাটা শুনে পাশ থেকে অমিতাভ পাটোয়ারী সমস্ত শোক ভুলে অপমানে ডাক্তারের দিকে তেড়ে যেতে লাগলেন। কৌশিক আর রোহিত কোনোমতে ওনাকে মাঝপথে শক্ত করে আটকাল। অমিতাভ গর্জে বলে উঠলেন,
“মুখ সামলে কথা বলুন, ডাক্তার সাহেব! আর কীসব আজেবাজে, নোংরা কথা বলছেন আপনি এই বিপদের সময়? ও… ও আমাদেরই সন্তান! বুঝেছেন আপনি?”

​ডাক্তার ভয়ে একটু পিছিয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন,
“দেখুন, আই অ্যাম রিয়ালি সরি। আমি জাস্ট মেডিকেল সায়েন্সের দিক থেকে কথাটা বলতে চেয়েছি, আমার কথার অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ছিল না।”
​এবার কৌশিক এক ভয়ঙ্কর, জান্তব হুঙ্কার দিয়ে গর্জে উঠল,
“প্লিজ! দয়া করে আপনারা সবাই একটু থামবেন? এদিকে আমার মায়ার প্রাণ ওটি’র বেডে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর আপনারা… আপনারা এখানে জাত-কুল নিয়ে পড়ে আছেন? ছিঃ!”
​কৌশিক নিজের মাথার চুল খামচে ধরে, নিজেকে বৃথা শান্ত করতে করতে পাগলের মতো আবার বলল,
“এখন আমি (O-) রক্ত কোথায় পাব? কোথায় গেলে পাব আমার মায়ার জীবনকাঠি? কে দেবে আমার মায়াকে রক্ত?”

​আবারও কৌশিকের মুখ থেকে রক্তের তীব্র সংকটের কথা শোনা মাত্রই করিডোরের সবার বুকটা দমে গেল। ও-নেগেটিভ! এই দুর্লভ রক্ত পাওয়া মানে অতল রাতে খড়ের গাদায় সুই খোঁজার চেয়েও কঠিন। রোহিত চট করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাঁপাকাঁপা আঙুলে ডায়াল করতে করতে বলল,
“আমি,আমি ঢাকার সব বড় ব্লাড ব্যাংক, রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, পিজি হাসপাতাল, ল্যাবএইড,সব জায়গায় কল করছি! কেউ না কেউ তো থাকবেই!”
​ডক্টর সালাহউদ্দিন অত্যন্ত করুণভাবে ওনার হাতটা তুলে রোহিতকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আমরা অলরেডি আমাদের পার্সোনাল সোর্স থেকে ঢাকার প্রতিটা কোণায় চেক করেছি, মিস্টার রোহিত। দুর্ভাগ্যবশত, ঢাকার কোনো ব্লাড ব্যাংকেই ও-নেগেটিভ রক্তের এক ফোঁটা স্টকও অবশিষ্ট নেই। আমাদের হাতে সময় মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, খুব বেশি হলে ১২০ মিনিট। এর মধ্যে রক্ত এনে ওনার শরীরে পুশ করতে না পারলে, মিসেস মায়াকে বাঁচানো আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। শি উইল লিভ আস।”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৪

​ডক্টরের এই শেষ নিষ্ঠুর বাক্যটি শোনা মাত্রই কৌশিকের পুরো শরীর এক মুহূর্তের জন্য একদম অসাড়, স্থির হয়ে গেল। শরীরের সমস্ত ভর, সমস্ত শক্তি যেন এক সেকেন্ডে উবে গেল। সে নিজের ভারসাম্য রাখতে না পেরে এক-পা পিছিয়ে গিয়ে পেছনের ঠান্ডা দেয়ালের সাথে ধপাস করে ঠেকল। রুবিনা পাটোয়ারী সোফায় ধসে বসে নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের মাথায় উন্মাদের মতো আঘাত করতে লাগলেন। তিয়াশা এক তীব্র চিৎকার দিয়ে ওটি-র বন্ধ দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ​পুরো করিডোর জুড়ে যেন এক জ্যান্ত লাশের নীরবতা, তীব্র বেদনা আর গুমরে মরা কান্নার রোল নেমে এল ও
অপর দিকে কৌশিক এক জীবন্ত লাশের মতো শূন্য চোখে ওটি-র লাল বাতিটার নিচে মায়ার আবছা মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here