প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৭
আরাফাত আদনান সামি
মায়ার এমন ভাবনার মাঝে রুমে হঠাৎ করেই প্রবেশ করলেন রুবিনা পাটোয়ারী। হাতে খাবারের ট্রে, মুখে হালকা গম্ভীরতার ছাপ। টেবিলে ট্রেটা রেখে তিনি চোখ ঘুরালেন মায়ার দিকে। মায়া তখন সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে কী যেনো ভাবছে।
রুবিনা পাটোয়ারীর ভ্রু কুঁচকে উঠল। ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে মায়া?”
কানে মায়ের কণ্ঠ ভেসে আসতেই মায়ার চোখ খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে দেখে সে দ্রুত সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।
“কী হয়েছে আম্মু?”
কণ্ঠে মমতা থাকলেও বিরক্তির আভাস লুকিয়ে গেল না। বলল,
“সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি, কী হয়েছে তোমার?”
মায়া হালকা হেসে বলল,
“আমার আবার কী হবে আম্মু?”
রুবিনা পাটোয়ারী এবার স্পষ্ট বিরক্ত গলায় বললেন,
“খাবার খাওয়ার জন্য নিচ থেকে কতবার ডাক দিলাম তোমাকে শুনতে পাও নি?”
মায়া মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলল,
“আসলে মা, আমি খেয়াল করি নাই।”
“তা তো দেখলামি। টেবিলে খাবার রাখা আছে, এবার খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
এই বলে রুবিনা পাটোয়ারী হন হন করে বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে। মায়া আর দেরি করল না। ওয়ারড্রব খুলে একটি তোয়ালে বের করল। তারপর ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দিকে এগোল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। বেশকিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো মায়া। তোয়ালে দিয়ে হাত মুখ মুছে দিল। সাইট টেবিল থেকে খাবার নিয়ে সোজা গিয়ে বসে পড়ল খাটে। মোটামুটি প্রাপ্ত বয়স হলেও খাবারের সময় বাচ্চামো স্বভাব টা আর গেলো না। ফোন বের করে ফোনে একটা কার্টুন ছেড়ে খেতে শুরু করল মায়া।
এদিকে কৌশিক এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাইরে সকালের পাখির কিচিরমিচির শব্দ চারপাশ ভরিয়ে তুলেছে। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া উত্তপ্ত রোদ সরাসরি তার চোখে এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল। কৌশিক শরীরটা মুচড়ে এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে পড়ল।
অন্যদিকে রান্নাঘরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৌশিকের মা মাহিমা চৌধুরী এবং কাকিমা সায়রা চৌধুরী। নানা রকম রান্নার ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কাজ প্রায় শেষের দিকে, এমন সময় রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল কৌশিক। পড়নে কালো প্যান্টের সাথে সাদা শার্ট, নিখুঁতভাবে ইন করা।
মুখে হালকা ক্লান্তির ছাপ নিয়েই বলল,
“মা, আমাকে কিছু খেতে দাও তো, ভীষণ খিদে পেয়েছে।”
মাহিমা চৌধুরী হেসে জবাব দিলেন,
“পাবেই তো! এত বেলা পর্যন্ত ঘুমালে খিদে না পেয়ে উপায় আছে? তুমি গিয়ে টেবিলে বসো, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
কোনো কথা না বাড়িয়ে কৌশিক সোজা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ল। মুহূর্তেই মাহিমা চৌধুরী আর সায়রা চৌধুরী একে একে নানা পদ সাজিয়ে দিলেন টেবিলে। তারপর দু’জনেই কৌশিকের সাথে বসে খাওয়া শুরু করলেন।
সবাই খাবারে মনোযোগী, এমন সময় কৌশিক প্রশ্ন করল,
“আম্মু, আব্বু আর কাকা কোথায়? কাউকে তো দেখছি না।”
খেতে খেতে মাহিমা চৌধুরী উত্তর দিলেন,
“তোমার আব্বু আর কাকা সিলেটে গেছে।”
“কেনো?”
এইবার উত্তরটা দিলেন সায়রা চৌধুরী। নরম স্বরে বললেন,
“সিলেটে আমাদের নতুন কোম্পানি শুরু হতে যাচ্ছে। সেটারি উদ্বোধন করতে গেছেন উনারা।”
কৌশিক অবাক চোখে বলল,
“ওহ্, গ্রেট!”
মাহিমা চৌধুরী হালকা হাসলেন,
“তোমাকে নিতে চেয়েছিল তোমার আব্বু। কিন্তু তুমি তখন ঘুমাচ্ছিলে বলে আর ডাকেননি।”
কৌশিক ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ঘুমাচ্ছিলাম তো কী হয়েছে? ডাকলেই তো আমি যেতাম। নতুন কোম্পানিটা একবার ঘুরে দেখে আসা যেত।”
“আচ্ছা, আরেকবার গেলে দেখা যাবে।” নিশ্চিন্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন মাহিমা চৌধুরী।
সময় কেটে গেলো বেশ কিছুক্ষণ। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেলেন। চারদিকে নীরবতা নেমে এলো। নিজের রুমে সোফায় হেলান দিয়ে বসল কৌশিক। তার চোখে ভেসে উঠল অচেনা এক গভীরতা, যেন ভেতরে ভেতরে কোনো অজানা ভাবনায় ডুবে গেছে সে। কী এমন ভাবছে সে, যার কারণে মনটা এত চিন্তিত লাগছে? নাকি কালকের ঘটনা এখনও মনে ঘুরপাক খাচ্ছে? এইসব প্রশ্নের ভেতরই কৌশিক বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে দিল। মনে পড়ে গেল কিছু, আর সঙ্গে সঙ্গে সে হঠাৎ সিট মেরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।
কৌশিক রুম থেকে বেরিয়ে নেমে এল। বাড়ির সদর দরজা পার হওয়ার মুহূর্তেই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ,
“কৌশিক ভাইয়া! কৌশিক ভাইয়া, কোথায় যাচ্ছো তুমি? আমাকেও নিয়ে যাও না।”
কৌশিক পেছন ফিরে তাকাল। বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“মরতে যাচ্ছি, যাবি আমার সঙ্গে?”
তিয়াশা লজ্জা মাখা মুখে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানেই যাবো কৌশিক ভাইয়া।”
“ননসেন্স…”
এই বলে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল কৌশিক।
তিয়াশা সেখানে থেমে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার মুখে,
“আমার থেকে কতদিন পালাবে কৌশিক ভাই? একদিন না একদিন তোমাকে আমার জালে ধরা দিতেই হবে।”
এই ভাবনা নিয়ে হাসতে হাসতে তিয়াশা ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
দেখতে দেখতে সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকাল, আর বিকাল থেকে রাত হয়ে গেল। বাতাসে দিনের ছাপ নিঃসন্দেহে মিশে আছে। তখন ঘড়ির কাঁটা ঘুরে রাত প্রায় ১ টা।
‘পাটোয়ারী মঞ্জিলের’ সবাই খাবার শেষ করে সেই কতক্ষণ আগেই শান্তি খুঁজতে নিজেদের রুমে চলে গেছে। ঘরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা, শুধু মাঝে মাঝে দূরের ঘড়ির টিকটিকি শোনা যাচ্ছে। আর কেবল ঘরের কোণে থেকে দেখা যায় ফ্লুর লাইটের নরম আলোর মাঝে থমথমে ছায়া।
পাটোয়ারী বাড়ির সবাই এখন গভীর ঘুমে আছন্ন। মায়া সবুজ কালারের নাইট ড্রেস পড়ে ঘুমাচ্ছে। জানালা দিয়ে ভেসে আসছে মৃদু ঠান্ডা বাতাস। সেই বাতাসে ঘুমের মাঝেই মায়ার শরীর শিউরে উঠছে শতবার। ঘুমের ঘরে মায়া বার বার নড়ে উঠছে। যেনো তাে কেউ শরীরে কম্পন তোলা স্পর্শ করছে। মায়া ঘুরের ঘরে বার বার নড়ে উঠছে। মুহুর্তের মধ্যে ঠান্ডা কনকনে বাতাসে মায়ার নাইট ড্রেসের উপরের কর্তিটা পিঠ থেকে সরে গেলো৷জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় ফর্সা পি*ঠ আরো দৃষ্টি কাড়ছে। সেই পিঠে কেউ তিব্র ভাবে চুমু খেয়ে যাচ্ছে বারবার। ঘুমের ঘরেই মায়া বেশ অসস্তি ফিল করে। মায়ার চোখ,মুখ, গলা, দিয়ে ঘাম পড়তে থাকে। হঠাৎ করেই মায়ার গভীর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই সে নড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার শরীরে একটুও শক্তি নেই মনে হচ্ছিল, যেন তার দেহকে কেউ বশ করে রেখেছে। প্রতিটি স্পন্দন স্থবির হয়ে গেছে; মায়া একটুও নড়তে পারছে না।
বাইরে ঝড়ো বাতাস বইছে। জানালার পর্দা ঢেউয়ের মতো সরে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে চাঁদের হালকা আলো রুমের ভিতরে ছড়িয়ে পড়ছে। আলো যথেষ্ট স্পষ্ট নয়, তবুও মায়া বুঝতে পারছে রুমের মধ্যে সে একা নেই; এখানে আরেকটি প্রাণ আছে। মায়া তৎক্ষণাৎ চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরল। হঠাৎ আতঙ্কে তার হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেল। সে গাত দিয়ে প্রচেষ্টা করল, হাত দিয়ে মুখ থেকে হাতটা সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শত চেষ্টা করেও কোনো কাজ হল না। তার দেহ যেন শিকলবদ্ধ হয়ে গেছে কারো কাছে। নড়তে পারছে না, আর চিৎকারের কোনো সুযোগ নেই।
“চিৎকার করিস না সুইটহার্ট। ধরা পড়লে আর যাবিন মিলবে না। অবশ্য আমি চাই ধরা পড়তে, আমি চাই তোর জেলে সারাজীবনের জন্য বন্ধি হতে কিন্তু আপসোস তুই বন্ধি করছিসও না আবার হচ্ছিসও না।”
কণ্ঠ টা শুনে মায়ার আর বুঝতে বাকি রইল না এটা কে। মায়া দুইহাত দিয়ে জোরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে কাশতে লাগল। মায়ার বুক আপ-ডাউন করছে বার বার। হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে বলল,
“এ..এ..এটা কী ধ..ধর…ধরনের অসভ্যতামি ক.. কৌশিক ভাই। আর আপনার সাহস কী করে হলো এত রাতে এইখানে এসে আমাকে এইভাবে ছোয়ার। ছিহ্ বিন্দু পরিমাণ লজ্জা-বোধ টুকু নেই আপনার মাঝে?”
কৌশিক দাড়ানো অবস্থায় পাশ থেকে চেয়ার টেনে বসে খাটে দু’পা তুলে দিল ঠিক মায়ার সামনে। মায়ার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুচকি হেসে বলল,
“কেন তুই জানিস না আমার যে সরম-লজ্জা নেই। তোর জন্য চিন্তায় চিন্তায় আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে তাই আমি এসে তোর যত্ন নিচ্ছিলাম আর তুই কিনা আমাকেই রাগ দেখাচ্ছিস?”
মায়া বিছানা থেকে যেই উঠতে যাবে ওমনি কৌশিক চেয়ার থেকে উঠে মায়াকে যাপটে ধরে বিছানায় শুয়িয়ে দিল। মায়া এবারো ছুটার চেষ্টা করলো কিন্তু পড়ল না। মায়া এবার বেশ রেগে গেলো। বলল,
“এগুলো কী অসভ্যতামি রছেন আমি কিন্তু চিৎকার করবো বলে দিলাম।”
কৌশিক মুচকি হেসে বলল,
“আমি চাই না এইভাবে কট খেয়ে আমাদের বিয়ে হোক। তবে এখকার যুগে এটাই ট্রেন্ডিং চলতাছে হয় কট খেয়ে বিয়ে করো না হয় পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করো। আচ্ছা তোর যদি কট খেয়ে বিয়ে করার এতটাই ইচ্ছা থাকে তাহলে তুই চিৎকার কর আর চিন্তা করিস না আমি কট খাওয়া বিয়েতেও রাজি আছি। চিৎকার না করতে পারলে আমারে বল আমি করি। আয় তাহলে দুইজন একসাথেই চিৎকার করি ফু…”
কৌশিক যেই চিৎকার করতে যাবে এমনি মায়ার কৌশিকের মুখ চেপে ধরল। বলল,
“এই না’না’না কী করছেন আপনি?একদম চিৎকার করবেন না আ..আমি এইসব কিছু করবো না,না আপনি করবেন। কৌশিক ভাই প্লিজ এবার আমাকে ছাড়ুন।”
“ঠিক আছে করবো না তবে একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“আমার ঠোঁটে একটা কিস দে।”
“কীহ্?আপনার মাথা ঠিক আছে? পাগল হয়ে গেলেন নাকি?”
“না আমি ঠিকই আছি দে না একটা কিস।”
“প্লিজ ছাড়ুন আমায়।”
“আমি কী বলছি সেটা বল একটা কিসই তো, একটা কিস দিলে কী এমন ক্ষতি হবে?দেনা রে..”
“এই হাতির মতো শরীরের পুরো ভরটা আমার উপরে কেনো দিচ্ছেন আমি পিষে যাচ্ছি তো ছাড়ুন আমায়।”
“কথা ঘুরাছ কেন? দিবি কীনা সেটা বল।”
“আগে ছাড়ুন আমায়।”
“না আগে আমার কথার উত্তর দে।”
“উত্তর দিলে কী ছেড়ে দিবেন?”
কৌশিক মায়ার কথায় বেশ খুশি হয়ে গেলো।বলল,
“সত্যিই ছেড়ে দিবো।”
“আচ্ছা দিচ্ছি:- উত্তর। উত্তর দিয়ে দিছি এবার ছাড়ুন আমায়। আমি আপনার কথা রাখছি এখন আপনি আপনার কথা রাখেন।”
মায়ার এমন ফাজলামোতে কৌশিক বেশ রেগে গেলো। বলল,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৬
“মজা নিচ্ছিস আমাকে নিয়ে দাড়া দেখাচ্ছি।”
এই বলে কৌশিক মায়ার নিকে আস্তে আস্তে ঝুকতে থাকে। মায়া ভয়ে কুকড়ে যায়।বলল,
“ক..কী করছেন আপনি উত্তর বলতে বলছেন আমি উত্তর বলছি তো, প্লিজ কৌশিক ভাই এমন করবেন না ছাড়ুন, ছাড়ুন আমায়। এবার কিন্তু বেশি বেশি হচ্ছে।”
কৌশিক নিভু নিভু চোখে নরম স্বরে বলল,
“আই’ম লুজিং কন্ট্রোল, সুইটহার্ট, বেয়ার উইথ মি ফর ওয়ান আওয়ার।”
“এই না….”
