প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৮
insia isha chowdhury
নিলুফার কথা শুনে টিনার বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল। কাঁপা হাতে সে দ্রুত নিলুফার হাত থেকে রাফির দেওয়া চিরকুটটি ছিনিয়ে নিল। কাগজটা মেলে ধরতেই চোখ আটকে গেল সেখানে লেখা কয়েকটি শব্দে–
“আপনারা সবাই আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এখন আমার বিশ্বাসঘাতকতা কেমন লাগছে?
আমি যখন দেশে ফিরেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম আমার বিয়েটা সুজির সঙ্গে হবে। কিন্তু না, আপনারা আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছেন। তাই আমিও আপনাদের একটা সারপ্রাইজ দিলাম।
আর যাকে আমি কোনোদিনও ভালোবাসতে পারব না, তাকে আমি কেন বিয়ে করতে যাব?”
চিরকুটের প্রতিটি শব্দ টিনার হৃদয়টাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। শেষ লাইনটায় এসে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না সে। হাত থেকে চিরকুটটা আলগা হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। পরক্ষণেই টিনা হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। চোখের কোণ বেয়ে নেমে এলো অশ্রুর ধারা। ছোটবেলা থেকেই টিনাকে তার বাবা আর ফুপি একটি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন একদিন রাফির সঙ্গেই তার বিয়ে হবে। সেই স্বপ্নকে ঘিরেই কত শত কল্পনা, জমে ছিল তার মনে।
আজ যখন সেই স্বপ্নটা সত্যি হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল, তখনই রাফি তাকে একা করে দিয়ে চলে গেল। যে মানুষটাকে ঘিরে টিনা এতদিন ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিল, সেই মানুষটির কাছ থেকেই আজ সে শুনল সে কোনোদিনও তাকে ভালোবাসতে পারবে না।
নিজের গাড়ির টায়ারে সজোরে এক লাথি বসিয়ে দিল রাফি। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেল তার। গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তভরা কণ্ঠে বলল,
“টায়ারটা পাংচার হওয়ার আর সময় পেল না! তার ওপর এক্সট্রা টায়ারও নেই। ওই অসভ্য অপয়া মেয়েটাকে দেখার পরপরই এমন হলো। এখন মনে হচ্ছে সারাদিনটাই আমার খারাপ যাবে।”
কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো ঋতুর বিকট চিৎকার। রাফি চমকে পেছন ফিরে তাকাতেই বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল তার। ঋতু চিৎকার করতে করতে তার দিকেই দৌড়ে আসছে। আর তার ঠিক পেছনেই একটি কুকুর তীব্র গতিতে ছুটে আসছে। রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল। আশপাশে জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই। কুকুরগুলোর চেহারাও কেমন যেন বুনো দেখলেই গা শিউরে ওঠার মতো।
রাফি হতভম্ব হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল।
এর মধ্যেই ঋতু দৌড়াতে দৌড়াতে তার একেবারে কাছে চলে এলো। পেছনে তাকিয়ে কুকুরগুলোকে দেখে আর এক মুহূর্তও ভাবল না। কোনোরকমে দৌড়ে এসে রাফির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে। রাফি এবার বুঝতে পারল, কুকুর যদি তাদের ধরে ফেলে, তাহলে কামড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানেই হয় না। ঋতুর মনে হলো, রাফির গাড়িটা নিশ্চয়ই তাকে এই বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে। সে রাফিকে গাড়িতে তুলে নেওয়ার কথা বলতে যাবে, তার আগেই রাফি হঠাৎ তার এক হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। কোনো কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই ঋতুকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়ে দিল রাফি।
পেছন থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ ক্রমেই কাছে আসতে লাগল। ভয়ে ঋতু আর রাফি দুজনেই রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের ভেতর দৌড়াতে শুরু করল। একদিকে প্রাণভয়ে দৌড়, অন্যদিকে ঋতুর পরনে লেহেঙ্গা সব মিলিয়ে তার অবস্থা একেবারে নাজেহাল। হাঁপাতে হাঁপাতে বিরক্তিতে বলে উঠল ঋতু,
“আশ্চর্য! আপনি কি পাগল নাকি? আপনার কাছে গাড়ি ছিল, তাহলে আমরা এভাবে দৌড়াচ্ছি কেন?”
দৌড়াতে দৌড়াতেই রাফি হাঁপাতে হাঁপাতে রাগী গলায় উত্তর দিল,
“তোমার কি মনে হয়, আমি ইচ্ছে করে দৌড়াচ্ছি? গাড়ির টায়ার পাংচার হয়ে গেছে। তার ওপর এক্সট্রা টায়ারও নেই। গাড়ি ঠিক থাকলে, পাগল আমি কি এভাবে দৌড়াতাম? পাগল মহিলা!”
ঋতু আর কোনো উত্তর দেওয়ার অবস্থায় ছিল না। এতক্ষণ দৌড়ানোর ফলে বুকটা প্রচণ্ড ওঠানামা করছে। ঠিকমতো শ্বাস নিতেও পারছে না সে। পা দুটোও আর চলতে চাইছে না। হঠাৎ রাফির চোখে পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক বটগাছ। কুকুরটা বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এখন যদি কোনোভাবে বটগাছটার আড়ালে লুকিয়ে পড়া যায়, তাহলে হয়তো কুকুরটা তাদের খুঁজে পাবে না।
আর এক মুহূর্তও দেরি করল না রাফি। ঋতুকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত বটগাছটার পেছনে গিয়ে বসে পড়ল সে। ঋতু হাঁপাতে হাঁপাতে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই রাফি এক হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। চোখ বড় বড় করে ঋতুর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“চুপ! একটাও কথা বলবে না। কোনো শব্দ যেন না হয়।”
রাফির এমন আচরণে ঋতু রাগে চোখ পাকিয়ে তাকাল তার দিকে। কিন্তু রাফি সেদিকে ভ্রুক্ষেপই করল না। বরং আরও কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আঙুল ঠোঁটের কাছে নিয়ে আবারও ফিসফিস করে শাসিয়ে বলল,
“ডু নট মেক এ নয়েজ!”
কিছুক্ষণ দুজনেই বটগাছটার আড়ালে চুপচাপ বসে রইল। ঋতু আর কোনো কথা বলছিল না দেখে রাফিও অনেক আগেই তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছিল। প্রায় দশ-এগারো মিনিট পর রাফি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে দেখল, কুকুরটা আশপাশে কোথাও আছে কি না। এদিক-ওদিক ভালো করে তাকিয়ে অবশেষে বুঝতে পারল, কুকুরটা সেখান থেকে চলে গেছে। রাফি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই টের পেল, ঋতু তার পেছন পেছন এসে দাঁড়িয়েছে। রাফি ঘুরে ঋতুর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী এমন অকাম করেছিলে যে কুকুরটা তোমাকে এভাবে তাড়া করছিল? অথচ তুমি যেমন বিরক্তিকর, কুকুরটাও মনে হয় তোমার প্রতি বিরক্ত হয়ে গেছে।”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে নিজের সাফাই গেয়ে বলল,
“আমি তো কিছুই করিনি! হেঁটে যাচ্ছিলাম, আর কুকুরটা রাস্তায় শুয়ে ছিল। ভুল করে ওর গায়ের ওপর পা পড়ে গিয়েছিল। আর আপনি কী বললেন, আমি নাকি কুকুরটাকে বিরক্ত করেছি?মোটেই ইচ্ছে করে করিনি। আমি কি জানতাম নাকি এমন হবে?”
রাফি বিরক্ত হয়ে বলল,
“তা জানবে কেন? তুমি তো সব সময় সব জায়গায় গিয়ে শুধু ঝামেলা করো। ফালতু একটা”
ঋতুও একটুও পিছিয়ে না গিয়ে বলল,
“কী? আমি ফালতু? আর আপনি বুঝি খুব ভালো?”
“অবশ্যই আমি ভালো। এই জন্যই তো এত কিছুর পরও তোমাকে বাঁচিয়েছি।”
ঋতু তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন করল,
“এত কিছুর পরও মানে কী? আর আপনি তো নিজেই কুকুরের ভয়ে পালিয়েছেন!”
রাফির ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম।
“এবার কিন্তু তুমি বেশি বেশি বলছ।”
ঋতু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“একদম ঠিকই বলছি।”
রাফি বুঝে গেল, এই মেয়ের সঙ্গে যত প্যাঁচাল পারবে, ঝামেলা ততই বাড়বে; কমবে না। তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। দ্রুত পা বাড়িয়ে হাঁটা শুরু করল সে। ঋতুও যতই বলুক, শেষ পর্যন্ত সে রাফির পেছন পেছন হাঁটা শুরু করল। কিন্তু কিছুদূর যেতেই নতুন বিপদ দেখা দিল। কুকুরের ভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তারা জঙ্গলের ঠিক কোন পথ দিয়ে ঢুকেছিল, সেটা দুজনের কারও মনে নেই। মেইন রোড কোন দিকে, সেটাও আর বোঝা যাচ্ছে না। বরং রাস্তা খুঁজতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকে পড়ছে।
চারপাশের ঘন গাছপালা আর অচেনা পরিবেশ দেখে ঋতুর ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল। এবার আর কোনো কথা বলল না সে। নীরবে রাফির পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। এদিকে রাফি বারবার রাস্তা খুঁজেও কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না। যতই সামনে এগোচ্ছে, ততই পথ হারিয়ে ফেলছে। অবশেষে বিরক্তি আর রাগে সে পেছন ফিরে ঋতুর উদ্দেশে বলল,
“এই সবকিছু তোমার জন্য হয়েছে! তোমাকে এখানে আসতে কে বলেছিল? তুমি আমার সামনে আসার পরপরই আমার গাড়ির টায়ার পাংচার হলো। তুমি ওদিকে গিয়েছিলে বলেই কুকুর তোমাকে তাড়া করল। আর এখন তোমার জন্যই আমরা এই জঙ্গলের মধ্যে আটকা পড়ে আছি। সব দোষ তোমার! তোমাকে কে বলেছিল আমার সামনে এসে পড়তে?”
ঋতু কষ্টভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, এখন সব দোষ আমার? আমি কি ইচ্ছে করে আপনার সামনে পড়েছি?”
একটু থেমে ঋতু এবার কণ্ঠে অভিমান মিশিয়ে বললো,
“আমি যদি সোহেল ভাইয়ের কথা শুনে বাড়ি থেকে না বের হতাম, তাহলে আজ এত কিছুই হতো না।”
রাফি নির্বিকারভাবে বলল,
“তো কী দরকার ছিল বাড়ি থেকে বের হওয়ার? নিজের ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে থাকতে। তাহলে আজ এই পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।”
ঋতু মলিন হেসে বলল,
“বাড়িতে থেকেও তো শান্তি ছিল না। আজ আমার বিয়ে ছিল। আর আমি সেই বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছি।”
রাফি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
“ওহ! তোমার আজকে বিয়ে ছিল?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আমি বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছি।”
রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“যাক, ওই ছেলেটা বেঁচে গেছে।”
ঋতু অবাক হয়ে তাকাল।
“মানে?”
রাফি এবার বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“মানে, তুমি তো বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছ। যার সঙ্গে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল, সেই ছেলেটার জীবন বেঁচে গেছে। ওই ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে হলে তো তার পুরো জীবনটাই খারাপ হয়ে যেত! দেখো, আমার সঙ্গে তোমার মাত্র কিছুক্ষণ আগে দেখা হয়েছে। এর মধ্যেই তুমি কত ঝামেলা করেছ! আর ওই বেচারা যদি তোমার সঙ্গে সারা জীবন কাটাত, তাহলে তার অবস্থা কী হতো, একবার ভেবে দেখেছ?”
কথাগুলো শুনে ঋতুর মাথায় রাগে রক্ত উঠে গেল।
এতক্ষণ হাতে তুলে রাখা লেহেঙ্গার অংশটা সে এবার ছেড়ে দিল। তারপর রাগে ঝটকা দিয়ে রাফির পাঞ্জাবির কলার চেপে ধরে বলল,
“কী বললেন? আপনার সাহস কত বড়! আপনি আমাকে অপমান করছেন?”
রাফি তার হাত সরানোর চেষ্টা করে ঋতুর দুটো হাতের ওপর নিজের হাত রেখে কড়া গলায় বলল,
“ঋতু, বিহেভ ইউরসেলফ!”
ঋতু আরও রেগে গিয়ে বলল,
“কিসের বিহেভ? আমাকে উল্টাপাল্টা কথা বলবেন আর আমি কিছু বলব না?”
দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। রাফি একদিকে ঋতুর হাত সরানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ঋতুও রাগে কিছুতেই তাকে ছাড়ছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তে বিপত্তি ঘটল। রাফির পা হঠাৎ একটা ছোট গর্তে আটকে গেল। সামনে থেকে ঋতুর টান, আর নিজের ভারসাম্য দুটো একসঙ্গে সামলাতে না পেরে রাফি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। আর যেহেতু তখনও সে ঋতুর হাত ধরে ছিল, তাই টান লেগে ঋতুও তার সঙ্গে মাটিতে পড়ে গেল। প্রচণ্ড শব্দে দুজন একসঙ্গে মাটিতে আছড়ে পড়ল। হঠাৎ নিচে পড়ায় রাফির শরীরের পিঠের জায়গায় তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল। তার ওপর ঋতুও এসে পড়েছে একেবারে তার বুকের ওপর। রাফি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই মেয়েটার কারণে আজকের দিনটা যে তার জীবনের সবচেয়ে দুর্বিষহ দিন হয়ে উঠতে চলেছে, সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না।
কিছুক্ষণ আগেই সুপ্তি আর সোহেলের বিয়েটা সম্পন্ন হয়েছে। পুরোটা সময় সুপ্তি কাঠের পুতুলের মতো নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল। মুখে কোনো কথা নেই। প্রণয় একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। সময় প্রায় চারটা বাজতে চলেছে। অথচ ঋতুর এখনো কোনো খোঁজ নেই। বিষয়টা নিয়ে সে এরই মধ্যে সোহেলের সঙ্গে কথা বলেছে। সোহেল জানিয়েছে, ঋতুকে সে শুধু এক-দেড় ঘণ্টার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও ঋতু কেন ফিরছে না, সেটাও তার বোধগম্য হচ্ছে না।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই বাড়িজুড়ে শুরু হয়ে গেল বেশ জমজমাট খাওয়া-দাওয়া। চারপাশে ব্যস্ততা। প্রণয়ের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। ঋতু এখনো কেন বাড়িতে আসছে না। আর সূচনার হিজাবটা একটু খুলে যাওয়ায় সে কিছুক্ষণ আগে নিজের ঘরে গিয়েছিল। সুন্দর করে আবার হিজাবটা ঠিকঠাক করে নিয়ে নিচে নেমে এল। সিঁড়ি থেকে নামতেই দূর থেকেই তার চোখে পড়ল প্রণয়কে। একপাশে বসে আছে সে, মুখটা গম্ভীর, দৃষ্টি অন্যমনস্ক। সূচনা এক ঝলক দেখেই বুঝে গেল প্রণয় কিছু একটা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। আর সেই চিন্তার কারণ যে ঋতু, সেটা বুঝতে তার খুব বেশি সময় লাগল না। হওয়ারই কথা। এতক্ষণ হয়ে গেল, অথচ ঋতুর কোনো খোঁজ নেই।
একবার সূচনার ইচ্ছে হলো প্রণয়কে বলতে যে, আজ রাফিরও এনগেজমেন্ট। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে থামিয়ে দিল সে। রাফির নাম শুনলেই প্রণয়ের মাথা আবার গরম হয়ে যাবে এটা সে ভালোভাবেই জানে। তাই বিষয়টা নিয়ে কাউকে কিছু বলেনি সূচনা। অন্যদিকে সোহেল যেন আনন্দে প্রায় পাগল হয়ে গেছে। জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তগুলোর একটি আজ সত্যি হয়েছে সুপ্তি এখন তার স্ত্রী। সেই আনন্দে তার মুখের হাসি কিছুতেই থামছে না। কিছুক্ষণ পর জামিউল ইসলামের সঙ্গে বেশ খোশমেজাজে গল্পে মেতে উঠল সোহেল। তবে জামিউল ইসলাম জানেন, সুপ্তিকে জোর করে এই বিয়েতে রাজি করানো হয়েছে। আর এখন যদি বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরপরই সুপ্তিকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে বিষয়টা নিয়ে যে নতুন করে ঝামেলা তৈরি হতে পারে, সেটা তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন। তার ওপর সুপ্তির গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে আর মাত্র একটি সেমিস্টার বাকি। মেয়ের পড়াশোনাটাও তিনি কোনোভাবেই থামাতে চান না। তাই সোহেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একসময় জামিউল ইসলাম নিজেই প্রসঙ্গটা তুললেন। শান্ত গলায় বললেন,
“সোহেল, সত্যি বলতে আমি কখনোই চাইনি আমার মেয়ের বিয়েটা এভাবে হোক। আমার ইচ্ছে ছিল অনেক ধুমধাম করে, আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে, আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে মেয়েকে বিদায় দেব। কিন্তু পরিস্থিতি এমন দিকে গড়াল যে শেষ পর্যন্ত এভাবেই বিয়েটা হয়ে গেল।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বললেন,
“তাই আমি চাই, অন্তত ছয় মাস পর আবার বড় করে অনুষ্ঠান করা হোক। তখন সবাইকে নিয়ে, আমাদের মতো করে, ধুমধাম করে সুপ্তিকে তোমাদের বাড়িতে তুলে দেব। আপাতত ও এখানেই থাকুক। এই ছয় মাস ও নিজের মতো করে সময় নিক, পড়াশোনাটা শেষ করুক। আর তুমিও এই সময়টা ওকে দাও।”
জামিউল ইসলামের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল সোহেল। সোহেলের মুখের হাসিটা এবার কিছুটা নরম হয়ে এল। অবশ্য সে একটুও আপত্তি করল না। বরং মনে মনে সেও চেয়েছিল সুপ্তিকে একটু সময় দিতে। এতকিছুর পর হঠাৎ করে তাকে নিজের জীবনে মানিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। এটা সোহেলও বোঝে। তাই শান্ত গলায় বলল,
“আপনি যেটা ভালো মনে করেন, সেটাই হবে আঙ্কেল। আমার কোনো আপত্তি নেই। আমিও চাই সুপ্তি একটু সময় নিক। নিজের মতো করে সবকিছু বুঝে নিক। ছয় মাস পর যখন ওকে নিয়ে যাব, তখন যেন ওর মনে কোনো দ্বিধা না থাকে।”
জামিউল ইসলাম সোহেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সূচনা ধীরে ধীরে গিয়ে প্রণয়ের পাশে বসে পড়ল। প্রণয় মুখ তুলে তার দিকে তাকাতেই সূচনা মিষ্টি করে হেসে দিল। নিজের জীবনে প্রণয়কে আগাগোড়াই খুব কম হাসতে দেখা গেছে। বলতে গেলে মানুষটাই ভীষণ ব্যস্ত আর গম্ভীর প্রকৃতির। নিজের ভাই-বোনদের সঙ্গেও খুব একটা ফাজলামি করার মানুষ সে নয়। বরং ঋতু যতবার দুষ্টুমি কিংবা ফাজলামি করত, বেশিরভাগ সময়ই রবিনের সঙ্গেই করত। ঋতু আর রবিনের ঝগড়া তো ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। অথচ সেইসব ঝগড়াঝাঁটির সামান্য ছিটেফোঁটাও প্রণয়কে কখনো স্পর্শ করত না।
কিন্তু সূচনার ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা।
মেয়েটা যখনই তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে, প্রণয় বেচারা ঠিক আইসক্রিমের মতো গলে যায়। যতই গম্ভীর থাকুক, যত বড় চিন্তাই মাথায় থাকুক সূচনার একটুখানি হাসিই মুহূর্তে ওর সমস্ত কঠোরতা ভেঙে দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। এতক্ষণ ধরে ঋতুকে নিয়ে দুশ্চিন্তার ভাঁজ কপালে নিয়ে বসে থাকা প্রণয়ও সূচনার হাসি দেখে অজান্তেই হেসে ফেলল। তবে মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের কোলাহলটা তার কাছে অসহ্য লাগতে শুরু করল। এই মুহূর্তে কোনোটাই ভালো লাগছে না তার। কোনো কথা না বলে প্রণয় হঠাৎ সূচনার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে নিল। তারপর তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পুলসাইডের দিকে চলে গেল।
পুলসাইডটা তুলনামূলক নিরিবিলি। একপাশে একটা দোলনাও রয়েছে। দোলনাটা অবশ্য ঋতুর আবদারেই এখানে বসানো হয়েছিল। প্রণয় দোলনায় গিয়ে বসল। তারপর পাশে তাকিয়ে সূচনাকে চোখের ইশারায় বসতে বলল। সূচনা মুচকি হেসে দোলনায় বসে পড়ল। তারপর কোনো দ্বিধা না করে মাথাটা প্রণয়ের কাঁধে এলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। তারপর সূচনা নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা, ঋতু তো এই বিয়েতে একদমই রাজি ছিল না। তাহলে সুপ্তি আপু সবাইকে কেন বলল, ঋতু এই বিয়েতে রাজি? বিষয়টা কি একটু ভাবার মতো নয়?”
প্রণয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
“অবশ্যই ভাবার মতো। এই বিষয়টা নিয়ে কথা হয়েছে। ঋতু বাড়িতে ফিরলে আরও খোলাখুলিভাবে কথা হবে। আর এখন বাড়িতে অনেক মেহমান রয়েছে। সবার মাঝখানে ব্যক্তিগত কোনো কথা বলা ঠিক হবে না।”
সূচনা মাথা নেড়ে ছোট্ট করে বলল,
“হুমমমমম…”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কি ঘুম পেয়েছে?”
সূচনার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল,
“কই না তো! একদমই না।”
তারপর একটু থেমে মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“বাড়িতে এত বড় একটা নাটক হয়ে গেল, এরপর আবার আমার ঘুম পাবে কীভাবে? আর বিশ্বাস করুন, আমার জীবনে বিয়ে নিয়ে এমন নাটক আমি আগে কখনো দেখিনি!”
কথাটা বলেই সূচনা খিলখিল করে হেসে উঠল।
একসময় হাসতে হাসতে তার পেট ব্যথা হয়ে গেল। সে এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে হাসতেই থাকল।
প্রণয় বাঁকা চোখে তার দিকে তাকাল। তারপর কপাল চুলকে বলল,
“এত হেসো না ওয়াইফি। কোন দিক থেকে আবার বাঁশ চলে আসে, কে জানে!”
প্রণয়ের কথাই সূচনার হাসি আরও বেড়ে গেল। হাসতে হাসতেই সে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরও বাঁশ আসার বাকি আছে বুঝি?”
ব্যথায় নাক-মুখ কুঁচকে রাফি শেষমেশ চিৎকার করে উঠল,
“ফর গডস সেক, ঋতু! আমার ওপর থেকে ওঠো। জানে মেরে ফেলবে নাকি আমাকে?”
রাফির চিৎকার শুনে ঋতুও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বেচারা রাফিও কোমর চেপে ধরে কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসল। তারপর ঋতুর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
“তুমি কি আদা-জল খেয়ে আমার পেছনে লেগেছ, আমাকে মারার জন্য?”
ঋতু অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
“আশ্চর্য! আমি কেন আপনাকে মারতে চাইব? যেটা হয়েছে, ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট!”
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তোমার সঙ্গে থাকলে শুধু অ্যাক্সিডেন্টই হবে। ঝামেলা হবে। ভালো কিছু কোনোদিনই হবে না।”
ঋতু কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক তখনই আকাশের বুক চিরে বিকট শব্দে বজ্রপাত হলো।
বেশ অনেকক্ষণ ধরেই আকাশে মেঘ জমে ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই সেই মেঘগুলো আরও ঘন হয়ে চারপাশ ঢেকে ফেলল। আকাশ বারবার গর্জে উঠতে লাগল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চারদিকও ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছিল। আর এই অন্ধকারটাই ছিল ঋতুর সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ। ঋতু অন্ধকার ভীষণ ভয় পায়। তাই চারপাশ যতই অন্ধকার হয়ে আসছিল, ততই ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করতে শুরু করল। রাফি কিছু না বলে আবার হাঁটা শুরু করল।
ঋতু কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ভয়ে ভয়ে আবার পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। বেশ খানিকটা দূরে চোখে পড়ল একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর। ঘরটার অবস্থা দেখেই বোঝা যায়, বহু পুরোনো। কোথাও টিন মরচে পড়ে গেছে, কোথাও দেয়ালের অংশ ভেঙে আছে। চারপাশটাও বেশ নির্জন। রাফি কিছুক্ষণ ঘরটার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো এখানে কেউ থাকে। যদি সত্যিই কেউ থাকে, তাহলে তারা হয়তো মেইন রোডের পথটা দেখিয়ে দিতে পারবে। অন্তত এই অচেনা জায়গা থেকে বের হওয়ার একটা উপায় পাওয়া যাবে।
এই আশাতেই রাফি আর ঋতু কুঁড়েঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। তবে সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকল না। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করতে লাগল।
কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ধ্যেই আকাশ তার সমস্ত রাগ উজাড় করে দিল। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নেমে এল। মুষলধারে বৃষ্টি। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ ঝাপসা হয়ে গেল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা মাটিতে পড়ে ছিটকে আসছে, বাতাসে উড়ে আসছে ঠান্ডা পানির ছিটে। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো উপায় রইল না। রাফি একবার ঋতুর দিকে তাকাল। মেয়েটা ইতিমধ্যেই ভয়ে কুঁকড়ে গেছে, তার ওপর এই বৃষ্টি। অগত্যা দুজনেই দ্রুত কুঁড়েঘরটার ভেতরে ঢুকে পড়ল। ভেতরে ঢুকেই রাফির চোখে পড়ল একটা ছোটখাটো চৌকি। ঘরের এক কোণে সেটি রাখা। আরেক পাশে গুছিয়ে রাখা রয়েছে কিছু মানুষের জামাকাপড়।
রাফি কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল।
তাহলেই বোঝা গেল এখানে কেউ না কেউ থাকে।
অপরিচিত মানুষের ঘরে এভাবে অনুমতি না নিয়ে ঢুকে পড়াটা রাফির নিজের কাছেও খুব একটা ভালো লাগল না। কিন্তু বাইরে তখন এমন বৃষ্টি যে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো উপায় নেই। তার ওপর কুঁড়েঘরটার ভেতরটাও একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। রাফি বিরক্তিতে মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এই পরিস্থিতিতে ঠিক কী করা উচিত, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না সে।
অন্যদিকে ঋতু ভয়ে নিজের লেহেঙ্গার কাপড় মুঠো করে খামচে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে রাফির গা ঘেঁষে। অন্ধকারটা তার সমস্ত সাহস কেড়ে নিয়েছে। কিছু বলার চেষ্টা করেও পারছে না সে। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কুঁড়েঘরের দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ না থাকায় বৃষ্টির পানি ছিটকে ছিটকে ভেতরে ঢুকছিল। রাফি বিরক্ত হয়ে দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল। রাফি একটু পিছিয়ে আসতেই অন্ধকারে একা হয়ে যাওয়ার ভয়ে ঋতু তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে তার পাঞ্জাবির একটা অংশ শক্ত করে চেপে ধরল। হঠাৎ পেছন থেকে টান অনুভব করায় রাফি ঘুরে তাকাল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বিপত্তি ঘটল। মাটির ঘরের ভেতর বৃষ্টির পানি ঢুকে মেঝেটা একেবারে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল। ঋতুর পা হঠাৎ পিছলে গেল।
ঋতু পড়ে যাওয়ার আগেই রাফি মুহূর্তের মধ্যে দুহাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলল। একটুখানি দেরি হলেই মাটিতে পড়ে যেত ঋতু। রাফির এক হাত ঋতুর বাহু শক্ত করে ধরে রেখেছে, অন্য হাত তার কোমরের কাছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবকিছু থমকে গেল। বাইরে তখনও অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। দরজার ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসা ঠান্ডা পানিতে রাফির পাঞ্জাবির পেছনের অংশ ইতিমধ্যেই ভিজে গেছে। ভেজা কাপড় শরীরে লেগে আছে, অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। রাফি নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল, ঋতু ভয়ে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। সে ধীরে ধীরে ঋতুকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আকাশ ফাটিয়ে প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হলো।
বিকট শব্দ হলো। ঋতুর শরীর মুহূর্তের মধ্যে শিউরে উঠল। পরের মুহূর্তেই কোনো কিছু না ভেবেই সে রাফিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতটাই আকস্মিক ছিল ব্যাপারটা যে রাফি কয়েক মুহূর্তের জন্য একেবারে স্থির হয়ে গেল। ঋতু তার বুকের সঙ্গে মুখ গুঁজে দিয়েছে। দুহাত দিয়ে পেছন থেকে রাফির পাঞ্জাবি এমন শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে, যে ছেড়ে দিলেই তাকে কেউ নিয়ে যাবে। রাফির বুকের ওপর ঋতুর কাঁপুনি স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছিল। আর তারপর ঋতু কেঁদে উঠল।
ধীরে ধীরে ঋতু কান্নায় ভেঙে পড়ল। রাফির চোখেমুখের সমস্ত বিরক্তি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
রাফি বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে। কারণ ঋতুকে সে যতটুকু চেনে, তাতে সামান্য ভয় পেয়ে এভাবে কারও বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কাঁদার মেয়ে সে নয়। রাফি অনুভব করল, ঋতুর আঙুলগুলো তার পাঞ্জাবি এমন শক্ত করে খামচে ধরে আছে যে মনে হচ্ছে, কাপড় ভেদ করে তার পিঠে নখ বসিয়ে দেবে। কিন্তু সেসব নিয়ে রাফির বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা হলো না। ঋতুর শরীর কাঁপছে। ওর নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আর চোখের সামনে একের পর এক পুরোনো দৃশ্য ভেসে উঠছে। সবকিছু মিলেমিশে ঋতু আরো বেশি আতঙ্কিত হল। সে আরও শক্ত করে রাফিকে আঁকড়ে ধরল।
“না… না… প্লিজ… এইসব বন্ধ কর…”
কথাগুলো বলতে বলতে ঋতু আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। রাফি হতভম্ব হয়ে গেল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। ঋতু কীসের কথা বলছে, কী বন্ধ করতে বলছে? কিছুই ওর মাথায় ঢুকছে না। তবু এই মুহূর্তে প্রশ্ন করার মতো পরিস্থিতি নয়। ঋতুকে সামলানোর জন্য রাফি ধীরে ধীরে নিজের দুহাত তার চারপাশে জড়িয়ে নিল। তারপর খুব আলতো করে ঋতুর মাথায় হাত রাখল।
আঙুলগুলো চুলের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল,
“রিলাক্স, ঋতু… কিছুই হয়নি। কিছুই হয়নি। তুমি নিরাপদে আছো।”
কিন্তু ঋতুর কানে তার কোনো কথাই পৌঁছাল না।
সে শুধু বারবার ভয়ে মাথা নাড়তে লাগল।
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৭
“না… না…” চোখের পানি থামছেই না। বরং রাফির বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে আরও জোরে কেঁদে চলল সে।
ঠিক তখনই রাফির পেছন থেকে এক বয়স্ক মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। কণ্ঠে ছিল খানিকটা ভর্ৎসনার সুর,
“আস্তাগফিরুল্লাহ! এইহানে এইসব কী অনৈতিক কাম হইতাছে রে ছিঃ ছিঃ!”
