Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৯

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৯

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৯
insia isha chowdhury

সূচনা চোখ দুটো ছোট ছোট করে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে সূচনা ভাবল, এই লোকটা একদমই হার মানার পাত্র নয়। সে তো শুধু মজা করেই বলেছিল যে তার প্রেমের প্রস্তাব পেতে বেশি ভালো লাগে। আর সেটারই পাল্টা জবাব দিতে প্রণয় এমন ভাব নিয়ে বলেছে, তারও নাকি ঠিক তেমনই বিয়ের প্রস্তাব পেতে ভালো লাগে! ভাবতেই সূচনার ভেতরটা কেমন যেন জ্বলে উঠল। কত বড় হারামি একটা!
তবে পরক্ষণেই সূচনার মাথায় দুষ্টু একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে সূচনা আচমকাই হালকা ধাক্কা দিল তাকে। তারপর নিজেকে প্রণয়ের বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েক কদম দূরে সরে দাঁড়াল।
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে নিজের কুঁচকে যাওয়া শার্টের দিকে তাকিয়ে রইল। শার্টের এই অবস্থা সূচনার জন্যই হয়েছে।
সূচনা আবার একধাপ এগিয়ে এসে দু’হাত কোমরে রেখে কটমট চোখে বলল,

“ছি ছি, কি লজ্জার কথা!”
প্রণয় কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।
“মানে? তুমি কি বলতে চাইছো?”
সূচনার চোখ-মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
“মানে এটাই বলতে চাইছি, আপনি একজন স্যার হয়ে এসব কিভাবে করতে পারেন?”
“আশ্চর্য! আমি আবার কি করলাম?”
“কি করেছেন মানে? একটু আগে নিজেই তো বললেন, আপনার বিয়ের প্রস্তাব পেতে ভালো লাগতো। তার মানে আপনি সব মেয়েদের ফাসিয়ে তাদেরকে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে বেড়াতেন। আর যখন ঐ সকল মেয়ে আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিত তখন আপনি ওদের রিজেক্ট করে দিতেন আর এটাই আপনার ভালো লাগতো যে ওরা আপনাকে বিয়ের স্বপ্ন দেখুক! এসব উপভোগ করতেন! তারপর বিয়েও করতেন না! আপনি তো ভীষণ খারাপ মানুষ!”

প্রণয় এবার নিচের দিকে তাকিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে মাথা নাড়ল।
“ইউ নো হোয়াট? আমার আগেই বুঝে যাওয়া উচিত ছিল যে তুমি এসব কথার আসল মানে বোঝো না।”
কথাটা বলেই সে শার্টটা পুরোপুরি খুলে ফেলল। মেদহীন শরীর, চওড়া কাঁধ আর সুঠাম গড়নের জন্য প্রণয়কে আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল। শার্টটা কাউচের ওপর ছুঁড়ে রেখে দু’হাত ওপরে তুলে স্ট্রেচ করতেই তার হাতের পেশিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। সূচনার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।
এই লোকটা কি সত্যিই এতটা নির্লজ্জ? একটা মেয়ের সামনে এভাবে কেউ শার্ট খুলে ফেলে নাকি!
সে তড়িঘড়ি করে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়াল
“আপনার কি কোনো কমনসেন্স নেই? আমি এই ঘরে আছি আর আপনি দিব্যি নিজের শার্ট খুলে ফেললেন!”
প্রণয় ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল,
“এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? একটু আগেও তো খুব সাহস নিয়ে আমাকে জেরা করছিলে।”
“আমি জেরা করছিলাম মানে কী? উল্টো আপনি নিজেই আমাকে জেরা করছিলেন।”
প্রণয় ক্লোজেট থেকে আরেকটা শার্ট বের করে গায়ে জড়াল। তারপর ধীরেসুস্থে বোতাম লাগাতে লাগাতে অর্ধেকটা পড়া হয়ে যেতেই সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,

“অনেক নাটক হয়েছে। এবার স্বাভাবিক হও। তুমি এমন ব্যবহার করছ যেন আমি আমার বডি তোমাকে দেখানোর জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
প্রণয়ের কথায় সূচনা একটুও দমে গেল না। বরং চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ তো, তাই তো মনে হচ্ছে। আপনি যেসব করছেন, সেগুলোর মানে তো এটাই দাঁড়ায়।”
প্রণয় বিরক্ত গলায় বলল,
“কি সবের মানে? কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলো তুমি!”
কথাটা বলেই সে সূচনার কাঁধ ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল। আচমকা এতটা কাছে চলে আসায় সূচনা থমকে গেল। প্রণয় তখন সাদা রঙের একটা শার্ট পরে আছে। বুকের কাছে উপরের কয়েকটা বোতাম খোলা, যার ফাঁক দিয়ে তার বুকের কিছু অংশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চুলের কয়েকটা গোছা কপালের উপর এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। আর সেই অগোছালো সৌন্দর্যটাই যেন তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। নিজের অজান্তেই সূচনার দৃষ্টি আটকে গেল প্রণয়ের উপর।
নিঃসন্দেহে মানুষটা ভীষণ সুদর্শন। আর তার সেই তীব্র ব্যক্তিত্ব অদ্ভুতভাবে সূচনাকে টানছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই যেন নিজের ভাবনাতেই চমকে উঠল সূচনা। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে মনে মনে বলল,

“না না না! এই জল্লাদের উপর আমি আগে ক্রাশ খেতে পারি না। আগে উনাকেই আমার ফাঁদে ফেলতে হবে!”
সূচনা আবারও মনে মনে ভাবল,
“শুনেছি, মানুষ নাকি যাকে খুব সহজে পেয়ে যায়, একসময় তার মূল্য দিতে ভুলে যায়। আর প্রণয় তো আমাকে কত সহজেই পেয়ে গেছে! তাহলে আমি যদি এত সহজে ধরা দেয়, পরে কি আদৌ আমার কোনো মূল্য থাকবে প্রণয়ের কাছে?”
নিজের ভাবনাতেই ডুবে ছিল সূচনা। হঠাৎ প্রণয়ের কণ্ঠে চমকে উঠল।
“কি ব্যাপার, ওয়াইফি? কি এত ভাবছো?”
‘ওয়াইফি’ শব্দটা কানে যেতেই সূচনা ভ্রু কুঁচকে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“ওয়াইফি?”
প্রণয় ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
“হ্যাঁ, ওয়াইফি। এখন থেকে তোমাকে আমি যা বলব, তুমি সেটাই করবে।”
সূচনার চোখ গোল হয়ে গেল।
“কি করব?”

“এখন তুমি পড়তে বসবে।”
কথাটা শুনে সূচনা এমন মুখ করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর কথা শুনেছে।
“ইয়া আল্লাহ! আপনি কি পাগল? সকাল থেকে কতক্ষণ পড়েছি জানেন? এখন আর আমার পক্ষে পড়াশোনা করা সম্ভব না।”
প্রণয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“সামনে তোমার এইচএসসি পরীক্ষা। এখন তোমার সারাদিন পড়াশোনা করা উচিত। তোমার একটাই কাজ আর সেটা হলো পড়াশোনা করা।”
সূচনার মুখটা সাথে সাথেই মলিন হয়ে গেল।
“তাই বলে কি আমি চব্বিশ ঘণ্টা পড়াশোনা করব? আপনি তো দেখি আমাকে মেরেই ফেলতে চান! ভেবেছিলাম বিয়ে হয়েছে, অন্তত এসব থেকে একটু বাঁচব। কিন্তু না…আমি তো দেখি আকাশ থেকে পড়ে খেজুর গাছে আটকে গেছি!”
তার বিরক্ত ভরা মুখ দেখে প্রণয় হেসে ফেলল। তারপর আচমকাই ঝুঁকে সূচনার গালে হালকা করে কামড় বসিয়ে দিল।

“আহ!” ব্যথায় আর বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল।
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে গালে হাত চেপে তীব্র রাগে বলল,
“আশ্চর্য! এগুলো কি ধরনের আচরণ?”
প্রণয় একদম শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“এগুলো বরের মতো আচরণ।”
সূচনার চোখ-মুখ বিস্ময়ে ভরে গেল। গালে হাত রেখেই সে বলল,
“মানে? বর হলেই কি এমন আচরণ করতে হবে?”
প্রণয় ভীষণ ভাব নিয়ে বলল,
“অবশ্যই। এটা হচ্ছে আদর্শ বরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।”
“তাহলে আপনি নিশ্চয়ই ‘বর আচরণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ থেকে কোর্স করে এসেছেন?”
“হুম। আর সেখানে আমাকে শেখানো হয়েছে, বউ বেশি কথা বললে গালে হালকা কামড় দিয়ে শান্ত করতে হয়।”
সূচনার চোখ কপালে উঠে গেল।

“কি ভয়ংকর শিক্ষা! তাহলে আমি এখনই এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করবো।”
প্রণয় এবার হেসে সূচনার আরও একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“মামলা করতে পারো। তবে শাস্তি হিসেবে তোমাকেই সারাজীবন এই বরের সাথে থাকতে হবে।”
কথাটা শুনে সূচনার মুখটা অজান্তেই লাল হয়ে গেল। সে দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“আমি কিন্তু আপনার মিষ্টি মিষ্টি কথায় গলবো না।”
“তাই নাকি?”
“একদম।”
“তাহলে পাঁচ মিনিট পরে বই নিয়ে পড়তে বসে যেও।”
মুহূর্তেই সূচনার মুখের সব লজ্জা উধাও হয়ে গেল।
“আপনি রোমান্টিকতা থেকে হঠাৎ পড়াশোনায় চলে যান কিভাবে?”
প্রণয় শান্ত গলায় বলল,
“কারণ আমার বউকে আমি শুধু ভালোবাসতেই না, সফল হতেও দেখতে চাই। আর তোমার গালে যে কামড়ের দাগ পড়েছে, আশা করি সেটা নিয়ে তুমি আর ঘর থেকে বের হবে না। ভালোভাবে পড়াশোনা করবে। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। ফিরে এসে যেন দেখি তোমার সব পড়া শেষ।”
প্রণয়ের গম্ভীর কথাগুলো শুনে সূচনা কিছুক্ষণ ঠোঁট চেপে রাখল। কিন্তু পরমুহূর্তেই মুখ ফসকে দুষ্টুমি ভরা স্বরে বলে ফেলল,

“না না, আমি তো বাইরে গিয়ে সবাইকে দেখাবো–দেখো, আমার জামাই আমাকে কামড়ে দিয়েছে!”
কথাটা কানে যেতেই প্রণয় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে এসে সূচনার মুখ চেপে ধরল। চোখেমুখে বিস্ময় আর অস্বস্তি মিশিয়ে নিচু গলায় বলল,
“এই মেয়ে তুমি কি পাগল? তোমার মাথায় কোনো বুদ্ধিসুদ্ধি নেই?”
সূচনা ধীরে ধীরে তার হাতটা নিজের মুখ থেকে সরিয়ে নিল। তারপর ভীষণ নিরীহ মুখ করে বলল,
“একদম ঠিক বলেছেন। আমার মাথায় আসলেই কোনো বুদ্ধিসুদ্ধি নেই। সেই জন্যই তো আপনাকে বিয়ে করেছি। বুদ্ধিসুদ্ধি থাকলে কি আর আপনাকে বিয়ে করতাম?”
প্রণয় চোখ ছোট ছোট করে সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
“তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছো আমাকে বিয়ে করে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করে ফেলেছো?”
সূচনা ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে বলল,
“আমি কিন্তু সেটা বলিনি। আপনি নিজের মনগড়া কথা নিজেই বুঝে নিচ্ছেন।”
প্রণয় এবার এক হাত দিয়ে সূচনার কোমর টেনে নিজের কাছে এনে বলল,
“না, আমি খুব ভালো করেই বুঝেছি। আর এটাও বুঝেছি তোমার শাস্তি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।তার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।”

সূচনা সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে বলল,
“মানে! কি করবেন আপনি?”
প্রণয় মুচকি হেসে সূচনার গালের কামড়ের দাগে আঙুল ছুঁইয়ে বলল,
“এখন কিছুই করবো না। কিন্তু রাতে হিসাবসহ সব বুঝে নিবো।”
সূচনা ভড়কে গিয়ে বলল,
“আল্লাহ! আপনি মানুষ তো? নাকি লুকিয়ে কোনো ভিলেনের ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন?”
প্রণয় শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“তোমার জন্য আমি যা, সেটাই যথেষ্ট। আর আমি বাসায় এসে যেন দেখি তোমার সব পড়া কমপ্লিট। আর যদি তুমি পড়া কমপ্লিট না করো তাহলে কিন্তু তোমার খবর আছে।”
কথাটা বলেই প্রণয় ফোনটা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। আর সূচনা না পেরে আবার পড়তে বসলো।
রবিন আজ এয়ারপোর্টে যাবে ঋতুকে রিসিভ করতে। তিন ভাইবোনের মধ্যে ঋতুই সবার ছোট। বর্তমানে সে কানাডার একটি ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে পড়াশোনা করছে। এক্সামের চাপ আর সঠিক সময়ে টিকিট না পাওয়ার কারণে নিজের সবচেয়ে আদরের ভাই, প্রণয়ের বিয়েটা সে মিস করেছে। আর ঠিক এই কারণেই পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বৌভাতের অনুষ্ঠানটা দুই দিন পরে করা হবে। যাতে ঋতুও সেই আনন্দের অংশ হতে পারে।

আজ ঋতুকে আনতে যাবে রবিন, আর তার সঙ্গে অবশ্যই থাকবে প্রণয়ও। প্রণয় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই রবিন গাড়ির চাবিটা হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
“ভালো হয়েছে তুই তাড়াতাড়ি চলে এসেছিস। চল, সময় হয়ে যাচ্ছে।”
প্রণয় হালকা মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, চল।”
বরাবরের মতোই ড্রাইভিং সিটে বসল প্রণয়। পাশে গিয়ে বসল রবিন। তারপর ধীরে ধীরে গাড়িটা শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে ছুটে চলল। বেশ কিছুক্ষণ পর তারা এয়ারপোর্টের সামনে এসে গাড়ি পার্ক করল। দু’ভাই অপেক্ষা করতে লাগল তাদের ছোট্ট বোনটার জন্য।
অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হচ্ছিল না। ঠিক তখনই মানুষের ভিড়ের মাঝখান থেকে খুশিতে উজ্জ্বল একটা পরিচিত মুখ ভেসে উঠল। ঋতু দু’হাতে নিজের লাগেজ টেনে নিয়ে সে এগিয়ে আসছে। পরনে হালকা রঙের সুন্দর একটি টপস আর স্কার্ট, গলায় স্কাফ চোখে স্টাইলিশ গগলস, হাতে ব্র্যান্ডের ঘড়ি। তাকে দেখামাত্রই রবিন আর প্রণয় দু’জনেই এগিয়ে গেল।
একজন তার হাত থেকে বড় লাগেজটা নিল, আরেকজন ছোট ব্যাগটা। যেন এই কাজ গুলো ওদের দুজনের প্রতিদিনেরই অভ্যাস।

তারপর বরাবরের মতোই শুরু হলো তাদের সেই চেনা প্রশ্নগুলো–
“আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?” – “তোর এক্সাম কেমন হয়েছে?” – “এত শুকিয়ে গেছিস কেন?” – “ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস তো?”
ঋতু বিরক্ত হওয়ার ভান করলেও, ভেতরে ভেতরে এই প্রশ্নগুলোই তার সবচেয়ে আপন লাগে। কারণ যখনই সে ফোন করে কিংবা ভিডিও কলে কথা বলে, তার দুই ভাই প্রায় একইভাবে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে।
ঋতু এবার চোখ থেকে গগলসটা খুলে হালকা বিরক্তির সুরে বলল,
“উফ্ ভাইয়া! তোমরা কি এসব কথা ছাড়া আর কিছু বলতে পারো না?”
তারপর মুখ ঘুরিয়ে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“বাই দ্য ওয়ে, ভাইয়া কংগ্র্যাচুলেশন।”
প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

“থ্যাঙ্ক ইউ।”
এবার রবিন হেসে বলল,
“ঋতু, তুই কিন্তু এখনো তোর ভাবীর একটা ছবিও দেখিসনি।”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, কারণ আমি আমার ভাবিকে সামনে থেকে দেখব। ছবিতে দেখে কী মজা আছে নাকি?”
প্রণয় এবার একটু গম্ভীর স্নেহমাখা গলায় বলল,
“আচ্ছা, অনেক হয়েছে। এবার গাড়িতে গিয়ে বস। তোর জন্য বাসায় সবাই অপেক্ষা করছে। বাসায় গিয়ে সবার সঙ্গে মন খুলে গল্প করিস।”
ঋতু ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা নেড়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল, আর তার দুই ভাই পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে শুরু করল।
তিনজন গাড়িতে উঠে বসতেই আবার পথচলা শুরু হলো। শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িটা এসে থামল মির্জা বাড়ির সামনের বিশাল লোহার গেটের কাছে। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই ঋতু আর রবিন ব্যাগপত্র নিয়ে নেমে পড়ল। ঠিক তখনই স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেই প্রণয় শান্ত গলায় রবিনকে বলল,
“আমার একটু কাজ আছে। বাসায় ফিরতে দেরি হবে। তোমরা ভেতরে যাও।”
রবিন মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই প্রণয় আবার গাড়ি চালিয়ে চলে গেল অন্যদিকে। এদিকে ঋতু যেন আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারছিল না। ছোটাছুটি করতে করতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল সে। ড্রয়িংরুমে বসে শায়লা খাতুন আর রিমা তখনও কথা বলছিলেন ঋতুর বিষয়ে যে এত দেরি হচ্ছে কেন, মেয়েটা ঠিকঠাক পৌঁছেছে তো?

ঠিক সেই সময় পেছন দিক থেকে হঠাৎ করেই এক জোড়া নরম হাত শায়লা খাতুনের গলা জড়িয়ে ধরল। আর আবেগী কন্ঠ ভেসে আসলো
“মা, আমি চলে এসেছি!”
চেনা কণ্ঠটা কানে যেতেই শায়লা খাতুন মুহূর্তেই আবেগে ভেসে গেলেন। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে মেয়েকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“আমার মা এসে গেছে! তোকে আমি কতটা মিস করেছি জানিস?”
ঋতু মায়ের কাঁধে মুখ গুঁজে হেসে বলল,
“আমিও তোমাকে অনেক মিস করেছি, মা।”
তারপর সে এগিয়ে গেল রিমার দিকে। মুখভরা হাসি নিয়ে বলল,
“আরে ভাবি! তুমি কেমন আছো?”
“আমি ভালো আছি ঋতু। তোর আসতে অসুবিধা হয়নি তো?”
“না না কোন অসুবিধা হয়নি।”
মেঝেতে বসে খেলছিল ছোট্ট তামজিদ। কিন্তু নিজের প্রিয় ফুফিকে দেখামাত্রই খেলনা ফেলে দৌড়ে এসে তার গা ঘেঁষে দাঁড়াল।

“ফুফি!”
ঋতু হেসে তাকে কোলে তুলে নিতেই তামজিদ ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগের সুরে বলল,
“তুমি আমার জন্য চকলেট আনো নি।”
ঋতু মজা করে তার নাক টিপে দিয়ে বলল,
“অবশ্যই এনেছি! আমার বাবাটার জন্য চকলেট না এনে কি পারি?”
এরপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“মা, বাবা কোথায়?”
শায়লা খাতুন হালকা বিরক্তি বোধ করে বলে উঠলেন,
“আর বলিস না! কত করে বললাম একটু পরে ঋতু আসবে, এখন যেও না। কিন্তু কাজ আছে বলে বের হয়েই গেল। বলেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে।”
ঠিক তখনই নিচতলার হৈচৈ, আর হাসির উপরে নিজের ঘরে বসে থাকা সূচনার কানে পৌঁছাল।
এমন আওয়াজ শুনে মুহূর্তের মধ্যেই সূচনার পড়াশোনা চাঙ্গে উঠে গেল। ও টেবিলে থাকা বই খাতা গুলো গুছিয়ে রেখে দ্রুত মাথায় ওড়না জড়িয়ে আয়ানার সামনে নিজের গাল টা ভালো মতো দেখলো তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।
এদিকে ঋতু তামজিদকে কোল থেকে নামিয়ে দিল তারপর চারপাশে তাকিয়ে হঠাৎ খানিকটা জোরেই বলে উঠল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৮

“আশ্চর্য! আমার ছোট ভাবি কোথায়?”
শায়লা খাতুন কিছু বলতে যাবে তার আগেই দেখল সূচনা নিচে নামছে। শায়লা খাতুন তখনই মুচকি হেসে সিঁড়ির দিকে ইশারা করলেন। আর ঋতুর উদ্দেশ্যে বললেন,
“ওই যে সূচনা। তোর নতুন ভাবি।”
কথাটা শুনেই ঋতু পেছনে ফিরে তাকাল। আর তাকিয়েই যেন সময় থমকে গেল। সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সূচনার চোখেও তখন বিস্ময়ের ছায়া। দু’জনেই স্থির দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঋতুর ঠোঁট কাঁপল সামান্য। বিস্ময়ে ভরা অস্ফুট কণ্ঠে সে বলে উঠল,
“আরে তুই এখানে কী করছিস?”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১০