প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৮
বন্যা সিকদার
এই বলেই উজান নিজের গায়ের শার্টের বোতামগুলো একে একে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল। তার ডান হাতের তালুতে যে তীব্র এসিডের যন্ত্রণা হচ্ছিল‚ মাংস পুড়ে যাচ্ছিল সেসবের কোনো তোয়াক্কা না করে সে শার্টটা গা থেকে খুলে মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। তার এই উন্মত্ত ও বিবস্ত্র রাগান্বিত অবস্থা দেখে মৌ ভয়ে এক্কেবারে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো কুঁকড়ে উঠল। উজান চৌধুরীর এমন দানবীয় রূপ মৌ নিজের জীবনে কোনোদিন দেখেনি। উজান এক হাত দিয়ে মৌ’কে মেঝে থেকে তুলে বিছানায় আছাড় মেরে ফেলে তার ওপর হিংস্র সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে উন্মাদের মতো মৌ’য়ের গলার ভাঁজে‚ ঘাড়ের নরম চামড়ায় নিজের ধারালো মুখটা ডুবিয়ে দিতেই এতক্ষণ ছটফট করতে থাকা মৌ’য়ের হাত-পায়ের নড়াচড়া হুট করেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। উজান কামনার ও রাগের ঘোরেও মৌ’য়ের এই আকস্মিক শান্ত হয়ে যাওয়াটা টের পেয়ে এক পলকের জন্য মুখ তুলে তার দিকে তাকাল।
আর তাকানো মাত্রই তার মাথার সমস্ত মদের নেশা এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে দেখতে পেল মৌ’য়ের চোখ দুটো বোজা‚ ফর্সা গালটা থাপ্পড়ের চোটে লাল হয়ে ফুলে গেছে আর সে পুরোপুরি ‘সেন্সলেস’ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। পরক্ষণেই উজানে’র মস্তিস্কে তীব্র এক ধাক্কা লাগল। সে বুঝতে পারল রাগের মাথায়‚ পজেসিভনেসের ঘোরে সে মেয়েটার সাথে আজ কী জঘন্য অপরাধ করতে যাচ্ছিল। সে সটান হয়ে বিছানা থেকে অনেকটা দূরে সরে এলো। নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো খামচে ধরে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। নিজের ভেতরের মনুষ্যত্ব আজ তাকে তীব্র ধিক্কার দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“শাট আপ উজান। শিট ড্যাম ইট। উজান এটা তুই কী করতে যাচ্ছিলি? তুই নিজের জেদ আর হিংস্রতার জন্য আজ নিজের পিচ্চি বউটার ওপর হাত তুললি? তার ফুলের মতো শরীরে আঘাত করলি?
উজান এবার নিজের ভেতরের সমস্ত হিংস্রতা ঝেড়ে ফেলে এক বুক কাঁপানো আতঙ্ক নিয়ে খানিকটা ঝুঁকে গেল মৌ’য়ের দিকে। কিন্তু মেয়েটা তখনও এক্কেবারে নিস্পন্দ‚ অচেতন অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। তার এই নিথর অবস্থা দেখে উজানে’র বুকের ভেতরের হৃদপিণ্ডটা যেন প্রতি সেকেন্ডে হাজার মাইল গতিতে লাফাচ্ছে। হঠাৎ করেই তার বুকের বাম পাশটায় এক তীব্র‚ সুতীব্র ব্যথা শুরু হলো। সে তো মৌ’য়ের এমন একটা করুণ অবস্থা কোনোদিনও চায়নি। তবে কেন‚ কোন আদিম হিংস্রতার বশে সে আজ অমন এক ভয়ংকর পাগলামি করে বসল। উজান নিজের বিবেককে আজ কোনো জবাব দিতে পারছে না। সে পরম মায়ায় আর অনুশোচনায় মৌ’য়ের বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাওয়া নরম হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরল। তারপর অত্যন্ত অপরাধীর মতো মিনমিন স্বরে ভাঙা গলায় আওড়াতে লাগল।
“পিচ্চি এই পিচ্চি প্লিজ ওপেন ইয়োর আইজ। প্লিজ টক টু মি। একটা বার অন্তত কথা বলো না আমার সাথে। সরি…আই অ্যাম রিয়েলি রিয়েলি সরি পাখি। আমি এসবের কিছুই ইচ্ছে করে করতে চাইনি। আমি তো কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি আমার এই পুঁচকে পিচ্চিটাকে নিজের হাতে এভাবে আঘাত করে বসব। প্লিজ একটা বার চোখ মেলো‚ যা খুশি শাস্তি দাও আমাকে তবুও এভাবে চুপ করে থেকে ভয় দেখিয়ো না।
কিন্তু মৌ’য়ের দিক থেকে কোনো রকম রেসপন্স এলো না। সে আগের মতোই সমস্ত জাগতিক অনুভূতি হারিয়ে অবশ হয়ে শুয়ে রইল। ধীরে ধীরে তার হাত-পায়ের তালুগুলো যেন শীতকালের বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। তা দেখে উজানে’র বুকের ভেতরটা ধকধক করে উঠল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে মৌ তার আজকের এই আকস্মিক দানবীয় ব্যবহারে মরণাত্মক ভয় পেয়েছে। কিন্তু সেই বা তখন কী করবে? সে নিজেও তো রাগের মাথায় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। এবার উজানে’র মনে এক তীব্র ভয়ের পাহাড় এসে জমা হলো তার এই চপল‚ অভিমানী পিচ্চি বউটা জ্ঞান ফেরার পর আদেও কি কোনোদিন তার সাথে আর কথা বলবে? মেয়েটা তো বড্ড বেশি অভিমানী। এই পিচ্চি মেয়েটা যদি চিরকালের জন্য তার ওপর থেকে নিজের অধিকার তুলে নেয়‚ যদি কোনোদিন তার সাথে আর কথা না বলে। তখন কী হবে? তখন সে কীভাবে‚ কোন মুখে এই অবুঝ মেয়েটার পাহাড়সম অভিমান ভাঙাবে?
উজান আর নিজের মাথায় কিছু চিন্তা করতে পারছে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমাজ তাকে ‘জ্ঞানী প্রফেসর’ তকমা দিলেও আজ মনে হচ্ছে তার সমস্ত বোধবুদ্ধি এক নিমেষে লোপ পেয়েছে। নয়তো একটা সামান্য কারণে কেউ নিজের অর্ধাঙ্গিনী‚ এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের গায়ে ওভাবে হাত তোলে? অবশ্য এই কারণটুকু দুনিয়ার বাকি সব মানুষের কাছে বড্ড সামান্য মনে হলেও উজান চৌধুরীর মনস্তত্ত্বে এটা মোটেও সামান্য নয়। মেয়েটাকে সে মুখে স্বীকার করে না হয়তো ভালোবাসে না; কিন্তু তাকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে হাসাহাসি করতে দেখাটা উজান নিজের জীবনের বিনিময়েও সহ্য করতে পারে না। মৌ’কে অন্য কারো বুকের মাঝে জড়িয়ে থাকতে দেখলে উজানে’র মনে হয়‚ তার সাজানো পুরো পৃথিবীটা বুঝি এক পলকে ওলটপালট হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এসব এলোমেলো আর আবুল-তাবুল চিন্তার ঘোর কাটল উজানে’র। সে তখন নিজের অজান্তেই মৌ’য়ের নিথর শরীরটাকে নিজের চওড়া বুকের সাথে শক্ত করে লেপ্টে ধরে বসেছিল।
মৌয়ে’র এই ফর্সা‚ বিষণ্ন আর ফুলে যাওয়া মুখখানা দেখে উজানে’র নিজের প্রতি এক তীব্র ঘৃণাবোধ হচ্ছে। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তড়িঘড়ি করে কাঁপানো হাতে ইফাত’কে ফোন দিল। ফোনে উজানে’র কান্নারত কণ্ঠ শুনে ইফাত আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। ঠিক মিনিট দশেকের মধ্যে সে চৌধুরী মঞ্জিলের ফ্যামিলি ডক্টরকে সাথে নিয়ে সরাসরি উজানে’র বেডরুমে এসে প্রবেশ করল। ইফাত রুমে ঢুকে আরেক দফা চরম অবাক ও স্তব্ধ হলো। কারণ উজান তখনও উন্মাদের মতো মৌ’কে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে লেপ্টে ধরে আড়ালে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। ডক্টরকে দেখা মাত্রই উজান কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মৌ’কে বিছানায় ঠিকঠাক মতো শুইয়ে দিল। এরপর ডক্টর অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মৌ’য়ের পালস চেক করলেন এবং স্টেথোস্কোপ দিয়ে ভালো করে চেক-আপ করতে লাগলেন। আর এই পুরোটা সময় ইফাত এক কোণে দাঁড়িয়ে আহাম্মকের মতো নিজের বন্ধুর এই অদ্ভুত ও পাগলাটে রূপ দেখছিল। তার মাঝেই উজান আর নিজের ভেতরের উদগ্রীবতা চেপে রাখতে পারল না তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।
“আ আ আংকেল আমার পিচ্চি ঠিক আছে তো?
ডক্টর উজান’কে ওভাবে কাঁপতে দেখে চশমাটা ঠিক করতে করতে মৃদু হাসলেন‚ “রিলাক্স উজান। এতটা হাইপার বা প্যানিক হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি এখানে। মৌ হুট করে মানসিকভাবে ভীষণ বড় কোনো শক বা ভয় পাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সেন্সলেস হয়ে পড়েছে। তবে হ্যাঁ মেয়েটাকে শারীরিক দিক থেকে বড্ড দুর্বল মনে হচ্ছে। মৌ ঠিকঠাক মতো সময়মতো খাবার-দাবার খাচ্ছে তো? দেখো উজান তোমায় আমি প্রফেশনাল দিক থেকে আগেই বলে দিচ্ছি তোমাদের দুজনের বয়সের পার্থক্য কিন্তু অনেক বেশি। সো‚ বুঝতেই পারছো আমি কথাটা কেন বললাম? অল্প বয়স হলেও তোমাকে সামলানোর ক্ষমতা ওর মধ্যে থাকলেও তোমাকে আরো সচেতন ও সংযত থাকতে হবে।
ডক্টরের কথা শুনে উজান নিজের অপরাধী মুখটা নিচু করে অত্যন্ত আমতা আমতা করে বলল‚ “কিন্তু আংকেল আমাদের মধ্যে তো আসলে তেমন কিছু…
”আমি সব বুঝতে পারছি উজান। লাল টুকটুকে বউ ঘরে রেখে নিজেকে সামলে দূরে সরিয়ে রাখা তোমার মতো জন্য বড্ড টাফ‚ তবুও একটু খেয়াল রাখতে হবে মেয়েটার ওপর। বেশি জোর-জুলুম করা এই বয়সে ওর শরীরের জন্য ঠিক নয়। তাছাড়া ওর শরীরটাও এখন একটু গরম লাগছে‚ মনে হচ্ছে রাতে বেশ জ্বর আসবে। আমি কিছু মেডিসিন দিয়ে যাচ্ছি। তুমি এখনই সেগুলো এনে খাইয়ে দিও। সকালের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।
ডক্টরের এই চরম ভুল ও রোমান্টিক ধারণার কথা শুনে এই বিপজ্জনক ও থমথমে পরিস্থিতিতেও ইফাত এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁট চেপে শব্দহীন হাসল। অবশ্য এখানে ডক্টরের কোনো দোষ নেই‚ মেঝের ভাঙা কাঁচ আর উজানে’র খালি গা দেখে যে কেউ এটাই ধরে নেবে। এরপর ডক্টর প্রেসক্রিপশনটা ইফাতে’র হাতে দিয়ে তার সাথেই রুম থেকে বিদায় নিলেন। ডক্টর চলে যাওয়ার পর উজান এক মুহূর্তও রুমে বসে রইল না। সে নিজেই এই গভীর রাতে মেডিসিন আনার জন্য বাইরে বেরিয়ে পড়ল। তার চেনা পরিচিত একজনের পার্সোনাল ফার্মেসি থাকায় তাকে এই মাঝরাতেই ফোন করে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সব কটা জরুরি মেডিসিন নিয়ে ঝড়ের গতিতে আবার রুমে ফিরে এলো সে।
রুমে ফিরে এসে উজান দেখল মৌ’য়ের এতক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে। তবে সে স্বাভাবিক হয়নি‚ এখনো ভয়ের চোটে বিছানার এক কোণে নিজের শরীরটাকে একদম গুটিয়ে গোল হয়ে ব’সে আছে। ঠিক তখনই উজানকে হসপিটালে ওভাবে রেগে চলে আসতে দেখে তুবা আর আরিয়ান হসপিটাল থেকে দ্রুত বাড়ি ফিরে এসেছিল। তারা রুমে ঢুকে মৌ’য়ের এই অবস্থা দেখে তাকে আগলে ধরেছিল। উজান নিজের হাতে মেডিসিনের প্যাকেটটা নিয়ে মৌ’য়ের দিকে এক পা এগোতেই মৌ তীব্র আতঙ্কে বিছানার আরও পেছনের দিকে পিছিয়ে গেল। সে নিজের দুই হাত দিয়ে তুবা’র শরীরটাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার পেছনে মুখ লুকাল। মৌ’য়ের অবাধ্য চোখ দুটো থেকে তখন অনবরত নোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে বিছানার চাদরে মিশে যাচ্ছিল। উজানে’র এই রূপ দেখে মেয়েটার বুকের ভেতরটা যে কতটা কাঁপছিল তা তার চোখের দিক তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়। উজান নিজের ভুল ভাঙানোর জন্য আর একটু কাছে এগিয়ে যেতেই মৌ এবার নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তীব্র চিৎকার করে উঠল।
”ভা ভা ভাবি প্লিজ এই লোকটাকে এক্ষুনি এই রুম থেকে চলে যেতে বলো। এই রাক্ষস লোকটা আমার কাছে আবার কেন আসছে? প্লিজ ভাবি ওনাকে আমার থেকে দূরে যেতে বলো‚ আমি ওনার কাছে যাব না।
“পিচ্চি প্লিজ এমন করো না। শান্ত হও আমি তো তোমায়…
”একদম আসবেন না আপনি আমার কাছে। ভাবি ওনাকে বলো না দূরে সরতে। এই হিংস্র লোকটা আবারও আমাকে ওভাবে মারবে। আমি আর এখানে থাকব না ভাবি। তোমার দুটি পায়ে পড়ি তুমি আমায় গ্রামে দিয়ে এসো। আমি আর কোনোদিন কোনো জন্মেও এই বাড়িতে ফিরে আসব না। আ আ আ আব্বু তুমি কই গো? প্লিজ আমাকে এসে নিয়ে যাও তোমরা। আমি আর এই বাড়িতে থাকব না। এখানকার একটা মানুষও ভালো না‚ সবাই শুধু আমাকে কষ্ট দেয়। আম্মু ও আম্মু তোমার মতো মায়া দিয়ে কেউ ভালোবাসে না আমায় এখানে। আমি থাকব না এখানে‚ আমি চলে যাব।
মৌ’য়ের এই কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলা প্রতিটা আর্তনাদ আর মা-বাবার জন্য আকুতি যেন এই মুহূর্তে উজান চৌধুরীর বুকটা মাঝখান থেকে চিরে দু-টুকরো করে দিল। মেয়েটার সাথে সে তখন কোন রাগের মাথায় ওমন পৈশাচিক পাগলামি করতে গিয়েছিল‚ তা ভেবে এখন নিজের ওপর নিজেরই ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। উজান আর কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দ্রুত বিছানায় উঠে গিয়ে মৌ’য়ের একটা হাত শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরল। “পিচ্চি প্লিজ এমন পাগলামি কোরো না। আমি জাস্ট রাগের মাথায় একটু বেশি করে ফেলেছি। তাই বলে তুমি এই সামান্য কারণে আমাকে এভাবে একা ফেলে চলে যাবে?
মৌ উজানে’র হাতের ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই নিজের হাতটা ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ছটফট করতে লাগল। কিন্তু উজানও আজ নাছোড়বান্দা‚ সেও হাত ছাড়ল না। মৌ এবার কাঁদতে কাঁদতে তীব্র হেঁচকি তুলে উহানে’র ওই বিষাদগ্রস্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল‚
“আমি চলেই যাবো। অনেক দূরে চলে যাবো। আর কখন আপনাকে বিরক্ত করতে আসবো না। আমি আপনাকে চিরকালের জন্য মুক্তি দিয়ে দেবো।
কথাটি শেষ করেই মৌ নিজের ভেতরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় এনে উজান’কে নিজের কাছ থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর বিছানা থেকে নেমে একপ্রকার দৌড়েই দরজা খুলে ওই কক্ষ ত্যাগ করে বাইরের দিকে ছুটে চলে গেল। সে তো নিজের বাপের বাড়িতে বড্ড আদরে‚ রাজকন্যার মতো বড় হয়েছে। যেখানে তার চোখে সামান্য এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লে‚ বাপের বাড়ির সবাই তাকে হাসানোর জন্য পাগল হয়ে যেত। যে মেয়েকে আজ পর্যন্ত নিজের বাবা-মা একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত দেয়নি। সেই অতি আদরের নিষ্পাপ মেয়েটাকে আজ এই পাষাণ উজান চৌধুরী ওভাবে সজোরে থাপ্পড় মেরে মেঝেতে ফেলে দিয়েছে। মৌ আজ উজানের ভেতরের যে কুৎসিত ও হিংস্র ফেসটা দেখেছে‚ তা তার ওই ছোট্ট নরম মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। সামান্য একটা কারণে উজান তাকে এত বড় শাস্তি দিল‚ এতগুলো নোংরা কথা শোনাল এই ভেবেই মৌ’য়ের মনের গহীনে এক তীব্র‚ তিতকুটে ও বিষাক্ত অভিমান এসে জমা হয়েছে। মৌ’য়ের ওভাবে উন্মাদের মতো রুম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তুবা আর আরিয়ানও দ্রুত তার পিছু পিছু রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৭
সবাই চলে যাওয়ার পর উজান বরফের মতো নিস্পন্দ‚ নিথর হয়ে বসে রইল। তার কান জুড়ে তখন কেবল মৌ’য়ের শেষ কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ‘আমি আপনাকে চিরকালের জন্য মুক্তি দিয়ে দেবো!
মেয়েটা কি সত্যিই তাকে ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে যাবে? কিন্তু উজান তো নিজের মনের অবচেতনেও এটা কোনোদিন চায় না। ঠিক তখনই, ইফাত অত্যন্ত শান্ত পায়ে সামনে এগিয়ে এলো। উজানে’র এই চরম ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে থাকার করুণ দশা দেখে নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ ভুলে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে উজানে’র কাঁধের ওপর পরম ভরসার একটা হাত রাখল। কাঙ্ক্ষিত হাতের সেই চেনা ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই এতক্ষণ পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকা উজান এক পলকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সে নিজের সমস্ত পুরুষালি অহংকার আর ইগো একপাশে ঠেলে দিয়ে ইফাত’কে দুই হাতে আষ্ঠেপৃষ্ঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
উজানে’র আহাম্মিক এমন কান্ডে ইফাত……
