প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৬
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
গাড়ির ব্রেক কষার শব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে পথচারী আর স্টুডেন্টদের হাঁটার গতি একটু থমকে গেল। চকচকে কালো কালারের গাড়িটা থামতেই ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এলেন প্রফেসর জিয়ান। স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে তিনি গাড়ির অন্য পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই রিত্তিকা নামল।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের পরিবেশ কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ক্যাম্পাসের শত শত জোড়া চোখ এখন শুধু এই দুজনের দিকেই নিবদ্ধ। প্রতিদিনের এই দৃশ্যটা এখন শিক্ষার্থীদের কাছে একটা রহস্যের মতো। একজন প্রভাবশালী, বদমেজাজি আর গম্ভীর প্রফেসরের গাড়িতে করে প্রতিদিন একটা মেয়ে ক্যাম্পাসে আসে—এটা নিয়ে গুঞ্জনের শেষ নেই। আড়ালে-আবডালে ফিসফিসানি আর সমালোচনার ঝড় ওঠে ঠিকই, কিন্তু জিয়ানের সেই রক্তচক্ষু আর চরম ব্যক্তিত্বের সামনে কারো সাহস হয় না সামনাসামনি কিছু জিজ্ঞেস করার। সবাই তাকে সমীহ করার পাশাপাশি বেশ ভালোই ভয় পায়।
গাড়ি থেকে নেমে রিত্তিকা ব্যাগটা কাঁধে ঠিকঠাক করতে করতেই জিয়ান ওর একদম কাছাকাছি এলেন। গলার স্বর কিছুটা নিচু কিন্তু বেশ স্পষ্ট করে বললেন, “ক্লাস শেষ হলে গেটের কাছে এসে ওয়েট করবে।”
রিত্তিকা একটু গা-ঝাড়া দিয়ে আলতো হেসে বলল,
__”আচ্ছা।”
জিয়ান ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় যোগ করলেন,
__ “আর ক্লাসে বা ক্যাম্পাসে কোনো ছেলের সাথে অহেতুক কথা বলবে না, মনে থাকে যেন।”
জিয়ানের এই অতি-অধিকারবোধ দেখে রিত্তিকা মনে মনে হেসে ফেলে মুখে দুষ্টুমির ছাপ এনে বলল,
__ “ওকে, একশো বার বলবো!”
জানে যে এই মেয়ে টা এক নাম্বারের বেয়াদব তাই জিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে লম্বা পা ফেলে ডিপার্টমেন্টের দিকে হেঁটে গেলেন। আর রিত্তিকা সোজা চলে গেল ক্লাসরুমের দিকে।
প্রথম পিরিয়ডে একটা কুইজ টেস্ট ছিল। টেস্ট শেষ হতে না হতেই রিত্তিকার মাথায় অলসতা চেপে বসল। টানা ক্লাসে বসে থাকতে আর একদমই ইচ্ছে করছে না। সে তার পাশে বসা জিয়াকে একটু কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে বলল,
__ “জিয়া, চল না রে ক্যানটিনে যাই! আর ক্লাস করতে একদম ভালো লাগছে না।”
জিয়া চোখ দুটো বড় বড় করে ফিসফিস করে বলল,
__ “পাগল নাকি তুই! এখন ভাইয়ার ক্লাস আছে। ভুলেও এসব ভাববি না।”
__”ধুর, ভালো লাগে না!” রিত্তিকা মুখ হাঁড়ি করে বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসল।
জিয়া রিত্তিকার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,
__”আচ্ছা, তুই বাড়ি কবে ফিরবি বল তো? তোকে ছাড়া ভালো লাগছে না”
রিত্তিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
__”চলেই তো আসছি, তোর ভাই কি আমায় শান্তিতে বাড়ি থাকতে দিল?”
__”কবে আসলি? বাড়িতে তো যাসনি !
রিত্তিকা হালকা হি হি করে হেসে বলল,
__ “তোর ভাইয়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে একদম আটকে রেখে দিয়েছে। আর জানিস, ফ্ল্যাটটা কি সুন্দর করে সাজানো! সত্যি বলছি, নিশ্চিত তোর ভাই অন্য কোনো মেয়েকে নিয়ে ওখানে থাকত, নয়তো একটা ছেলে একা একা এত সুন্দর করে ঘর সাজায় নাকি!”
জিয়া চোখ কপালে তুলে বলল,
__ “কি সব ভুলভাল বকছিস তুই!”
__”ঠিকই তো বলছি! নাহলে কি আর…”
রিত্তিকার কথা আর শেষ হলো না। ক্লাসের দরজায় এসে দাঁড়ালেন প্রফেসর জিয়ান। ক্লাসরুমের আমেজ নিমেষেই বদলে গেল। চটজলদি সব স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে উঠে তাঁকে সালাম জানাল। জিয়ান সংক্ষেপে সালামের উত্তর দিয়ে গম্ভীর মুখে সরাসরি হোয়াইটবোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং আজকের লেসন ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন।
পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। কিন্তু দশ মিনিট পার হতেই রিত্তিকার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। পড়ালেখায় মন বসে না দেখে সে চুপিচুপি বেঞ্চের নিচে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল।
পাশে বসে জিয়া আড়চোখে তা দেখে ভয়ে আঁতকে উঠে ফিসফিস করল,
__”ক্লাসে ফোন বের করছিস কেন? ভাইয়া দেখলে একদম কাঁচা গিলে খাবে কিন্তু!”
__”রাখ তো তোর ভাইয়ের বকা! অত ভয় পাই না আমি,” রিত্তিকা চাপা গলায় বলল।
সে সোজা হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে জিয়ানের আইডিতে টাইপ করে মেসেজ পাঠাল:
_ ‘দেখুন প্রফেসর, বাসায় সুন্দর বউ থাকতে অন্য মেয়েদের দিকে বেশি নজর দিলে আপনার সেই সুন্দর বউ কিন্তু নিজের হাতে আপনার চোখ তুলে নেবে!’
জিয়ান তখন বোর্ডে মনোযোগ দিয়ে ইকুয়েশন লিখছিলেন। ঠিক তখনই ডেস্কে রাখা তাঁর ফোনটায় মৃদু নোটিফিকেশনের টোন বেজে উঠল। ক্লাস চলাকালীন জিয়ান সচরাচর ফোন ধরেন না, তবে মেসেজ কার তা দেখতে ফোনটা হাতে নেওয়ার পরই রিত্তিকার চ্যাট হেড ভেসে উঠল।
মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে জিয়ানের গম্ভীর ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। তিনি ফোনটা টেবিলে রেখে সোজা ঘুরে দাঁড়িয়ে রিত্তিকার বেঞ্চের দিকে তাকালেন।
অত্যন্ত প্রফেশনাল কণ্ঠে জিয়ান হাঁক ছাড়লেন,
__ “মিস পুকি, স্ট্যান্ড আপ!”
রিত্তিকা চমকে উঠে ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোজা জিয়ানের দিকে তাকাল। পুরো ক্লাসের চোখ এখন রিত্তিকার দিকে।
জিয়ান হাত দুটি পেছনে বেঁধে গম্ভীর গলায় বললেন,
__”আপনার কি মিনিমাম কমনসেন্স নেই যে ক্লাস চলাকালীন সময়ে এভাবে ফোন ব্যবহার করছেন?”
রিত্তিকা নির্দ্বিধায় বানিয়ে বলল,
__ “কই স্যার? আমি তো ফোন চালাচ্ছি না।”
__”তাই? আমি কি তাহলে ভুল দেখলাম?” জিয়ানের গলায় চাবুকের মতো ধার। “ক্লাস শেষ হলে সোজা আমার অফিসে আসবেন আপনি। সিট ডাউন।”
রিত্তিকা চরম বিরক্তি নিয়ে বসে পড়ল আর বিড়বিড় করে বলল,
__ “খারুস প্রফেসর একটা! ঢং দেখে বাঁচি না।”
পাশে বসা জিয়া রিত্তিকার কানের কাছে এসে নিচু গলায় বলল,
__ “দেখলি তো? কতবার বললাম ফোন বের করিস না! এখন গিয়ে অহেতুক বকা খা।”
ক্লাস শেষ হতেই জিয়ান ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পর রিত্তিকা গুটিগুটি পায়ে জিয়ানের অফিসের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে বলল,
__”মে আই কাম ইন, স্যার?”
ভিতর থেকে জিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ইয়েস।”
রিত্তিকা ভেতরে ঢুকে দরজাটা হালকা টেনে দিতেই দেখল জিয়ান নিজের রিভলভিং চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে তার দিকে হেঁটে আসছেন। জিয়ানের এই ধীরগতির শান্ত কিন্তু চতুর হেঁটে আসা দেখে রিত্তিকা কেমন যেন নার্ভাস হয়ে পড়ল।
সে একধাপ পিছিয়ে গিয়ে ঢোক গিলে বলল,
__”এ… এভাবে এগিয়ে আসছেন কে… কেন?”
রিত্তিকার ঘাবড়ে যাওয়া দেখে জিয়ানের ভাবান্তরে কোনো পরিবর্তন হলো না। সে একদম রিত্তিকার মুখোমুখি এসে থামল। রিত্তিকা পিছু হটে গিয়ে পেছনের দেয়ালের সাথে লেগে যেতেই জিয়ান নিচু হয়ে বললেন,
__ “আসতে পারি না আমি?”
__”না, পারেন না! এটা কিন্তু ভার্সিটি।…” রিত্তিকা চোখ বড় বড় করে বলল।
জিয়ান হালকা হেসে রিত্তিকার দুপাশে দেয়ালে হাত রেখে ওকে একদম আটকে ফেলে বললেন,
__”তাহলে বাড়িতে হলে কিছু করতে দিতে বুঝি?”
কথাটা শেষ করেই জিয়ান রিত্তিকাকে টান মেরে নিজের একদম বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।
__”আমি কিন্তু এমন কিছু বলি নাই!”
__”তাহলে কি বলেছেন, একটু শুনি?” জিয়ান নিজের মুখটা রিত্তিকার গলার খাঁজে গুঁজে দিলেন।
উষ্ণ শ্বাসের ছোঁয়ায় রিত্তিকার পুরো শরীরে একটা তীব্র শিহরণ বয়ে গেল। সে জিয়ানের বুকে হাত দিয়ে ঠেলার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, __”ছাড়ুন না আমাকে! প্লিজ…”
জিয়ান ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,
__”আমার যে আপনাকে খুব চাই, মিস পুকি পাই।”
রিত্তিকা কিছুটা মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
__ “নিজের স্টুডেন্টকে এসব কথা বলতে একটুও লজ্জা লাগে না আপনার?”
__”উঁহু, একেবারেই না। আমি তো আমার স্টুডেন্টকে নয়, আমার বউকে বলছি। আর আমার বউই তো একটু আগে মেসেজে হুকুম দিল তার দিকেই যেন তাকিয়ে থাকি,” জিয়ান একটু দুষ্টুমি করে বললেন।
__”আমি আপনার বউ-টউ না, আমি এখন শুধু আপনার স্টুডেন্ট!”
__”ডোন্ট ডিস্টার্ব,” জিয়ান ঘাড়ের কাছে আর একটু গভীরভাবে মুখ গুঁজতেই রিত্তিকা ছটফট করে উঠল।
__”আহা ছাড়ুন না! এটা ভার্সিটি। কেউ যদি হঠাৎ দেখে ফেলে, কালকে থেকে আর মুখ দেখাতে পারব না।”
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জিয়ান এবার রিত্তিকাকে ছেড়ে দিলেন। জামার কলারটা একটু ঠিক করে নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, “চল, বাড়ি যাই।”
__”কিন্তু আমার তো আরেকটা ক্লাস বাকি আছে এখনও!”
__”আজ আর কোনো ক্লাস করা লাগবে না। ব্যাক প্যাক করো,” জিয়ানের কণ্ঠে সেই আদেশসূচক সুর।
রিত্তিকা আর তর্ক করল না। জিয়াকে বলে জিয়ানের সাথে ভার্সিটির থেকে গাড়িতে গিয়ে উঠল।
গাড়িটি যখন আবার এসে থামল, রিত্তিকা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল এটা জিয়ানের সেই ব্যক্তিগত এপার্টমেন্টের পার্কিং এলাকা।
রিত্তিকা অবাক হয়ে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
__”আমরা আবার এখানে কেন এলাম? নিজের বাড়ি যাব না?”
জিয়ান গাড়ি লক করতে করতে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন,
__”না, আজ এখানেই থাকব।”
জিয়ানের কথার পর রিত্তিকার আর কথা বাড়ালো না। সে চুপচাপ লিফটে উঠে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করল। সারাদিনের ধকল আর গরমে রিত্তিকার শরীর রিফ্রেশ করার দরকার ছিল। সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল শাওয়ার নেওয়ার জন্য।
কিন্তু শাওয়ারের কাছে গিয়েই বাঁধল বিপত্তি। রিত্তিকার হাত লেগে বেসিনের পাশে রাখা শ্যাম্পুর বড় বোতলটা উল্টে গিয়ে বেশ কিছুটা শ্যাম্পু ওর গায়ে পড়ে গেল।
__”ধুর ছাই!” রিত্তিকা বিরক্ত হয়ে ভাবল, যখন শ্যাম্পু পড়ে গেছেই, তখন একবারে ভালো করে শাওয়ার নিয়েই বের হওয়া যাক।
সাবান-শ্যাম্পু মেখে বেশ যত্ন নিয়ে শাওয়ার শেষ করার পর রিত্তিকার হঠাৎ খেয়াল হলো—সে তো পরার জন্য কোনো চেঞ্জিং সাথে করে ওয়াশরুমে আনেনি!
তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে রিত্তিকা মাথায় হাত দিয়ে বসল,
__ “এখন আমি কি করব! কোনো জামাকাপড় না এনেই তো শাওয়ার নিয়ে নিলাম! বাইরেই বা যাই কীভাবে? ধুর, এত ভুল হয় আমার!”
কোনো উপায় না দেখে রিত্তিকা ভেজানো দরজার কাছে এসে হালকা গলা চড়িয়ে ডাকল,
__”প্রফেসর সাহেব! ও প্রফেসর সাহেব!”
ভেতর থেকে আর একটু জোরে ডাকল,
__ “আমার জামাটা একটু দিন না প্লিজ, আমি তো ভেতরে কোনো ড্রেস আনি নাই!”
বাইরে থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। ফ্ল্যাটটা একদম নিঝুম মেরে আছে। রিত্তিকা ধরে নিল জিয়ান হয়তো নিচে গেছে বা অন্য কোনো ঘরে আছে, তাই শুনতে পাচ্ছে না।
হঠাৎই ওর মনে পড়ল—আরে! এটা তো জিয়ানের ফ্ল্যাট। এখানে তো তার পরার মতো কোনো মেয়েদের ড্রেস আসার কথাই না! জিয়ান কোথা থেকে দেবে?
কথাটা মনে হতেই রিত্তিকার নিজের বোকামিতে কান্না পেয়ে গেল। ভেজা অবস্থায় বাথরুমে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়!
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৫
হতাশ হয়ে চারপাশে তাকাতেই ওর নজর গেল বাথরুমের হ্যাঙ্গারে ঝুলতে থাকা জিয়ানের একটা ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা ফরমাল শার্টের দিকে। আর কোনো উপায় না পেয়ে রিত্তিকা শার্টটা পেড়ে নিল। হাঁটুর খানিকটা ওপর পর্যন্ত নেমে আসা জিয়ানের ঢিলেঢালা বিশাল শার্টটা গায়ে জড়িয়ে, হাতা দুটো কয়েক ভাজ করে গুটিয়ে সে আস্তে করে বাথরুমের দরজাটা খুলল।
