Home প্রিয় পূর্ণতা প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫৫

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫৫

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫৫
তানিশা সুলতানা

“এই মেয়ে ময়লা পায়ে ভেতরে ঢুকছো কেনো? কি চাই?
সবে সদর দরজায় পা রাখতে যাবে নিশা তখনই গম্ভীর স্বরে বলা কথা গুলো ভেসে আসে। চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। দুই হাতে ওড়না খাঁমচে ধরে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে। ইফতিয়ার এগিয়ে আসে। তাদের বাড়িতে অপরিচিত কারো ঢোকা বারণ। সচারাচর ঢুকতে দেখা যায় না।
তাহলে এই মেয়েটি ঢুকছে কেনো? মেয়েটির পরনের জামাটি রং চটা। পায়ে জুতো নেই। এমন বিধস্ত কেউ চৌধুরী বাড়িতে ঢুকছে? নিশ্চয় কোনো পথচারী হবে। খাবারের সন্ধানে এসেছে। অনাথ অসহায়ও হতে পারে। সব দিক ভেবে ইফতিয়ার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এবং বলে

” এখানেই দাঁড়ান আমি খাবার আনছি। টাকা পয়সাও লাগবে কি?
চোখ দুটো জ্বলে ওঠে নিশার। মোটেও সে খাবারের খোঁজে এখানে আসে নি। চোখ তুলে এক পলক তাকায় ইফতিয়ারের মুখ পানে। ইফতিয়ার ইতোমধ্যেই কদম ফেলেছে দরজার ভেতরে। নিশা মিনমিন স্বরে বলে
“আমি আমেনা খালার কাছে এসেছি।
দাঁড়িয়ে যায় ইফতিয়ার। পেছন ফিরে আরও একবার তাকায় মেয়েটির পানে। দুই ভ্রু আড়াআড়ি ভাবে কুচকে মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। এমন কেউ তার মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছে?
” কারণ কি? কি চাই আপনার?
আমার মাকে ডাকলে দুই টাকা বেশি পাবেন বলে তাকে ডাকছেন?
অপমানে গা রি রি করে ওঠে নিশার। দুই গাল বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ে দুই ফোঁটা নোনাজল। খানিকটা শক্ত গলায় বলে

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“তিনিই ডেকেছেন আমায়। আমি কো ভিক্ষুক নয়। আপনার খালার মেয়ে।
নিজ বক্তব্য শেষ করে ইফতিয়ারকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে ইফতিয়ার। কি হলো এটা? তার খালাতো বোনও আছে?
নিশার মা আশা অসুস্থ। তিনি হাসপাতালে ভর্তি। ইফতিয়ারের তৈরি হাসপাতালেই রাখা হয়েছে তাকে
আমেনা বেগমের স্বামী প্রভাবশালী হলেও আশা বেগমের স্বামী নিম্নবিত্ত। তবে প্রচন্ড আত্ন মর্যাদা সম্পূর্ণ। কখনোই এক টাকাও আমেনা বেগমের স্বামীর থেকে নেয় নি।
আমেনা বেগম রান্না করছিলো। নিশা সোজা ঢুকে পড়ে কিচেনে।
এক প্রকার হাঁপাচ্ছে সে। বড়বড় কদমে হেঁটেছে কি না।

” খালা মা তোমাদের বাড়িতে থাকতে বারণ করেছে। আমি থাকতে পারবো না।
আমেনা বেগম কড়াইতে পানি দিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। সে ওদের জন্য রান্না করছিলো।
“কেনো নিশা?
থাকলে কি হবে?
” জানি না খালা। কিন্তু থাকবো না। মায়ের পাশেই থাকবো আমি৷
মূলত নিশা এখানে এসেছিলো রাত্রি যাপন করার জন্য। হাসপাতালের ফিনাইলের গন্ধে মাথা ব্যাথা করে তার। কিন্তু ইফতিয়ারের এমন অপমানে থাকার ইচ্ছেটা মরে গেছে। এখন এখান থেকে যেতে পারলেই বাঁচে।
“চল আমিও যাবো হাসপাতালে। তোর মায়ের কি সমস্যা শুনে তবে আসবো।
নিশা চমকায়। মায়ের কাছে বললে তো ধরা পড়ে যাবে।

” না না যেতে হবে না।
“তাহলে থাকবি তুই?
নিশা মাথা নারিয়ে সম্মতি জানায়। তখনই ড্রয়িং রুম থেকে ইফতিয়ারের কন্ঠস্বর ভেসে আসে। মা মা বলে ডাকছে। বুক কেঁপে ওঠে আমেনার। চোখ দুটো মুহুর্তেই চকচক করে ওঠে
” আমার আব্বা আইছে?
বলতে বলতেই দৌড় দেয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে ইফতিয়ারের বুকে। জাপ্টে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ইফতিয়ার মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত হতে বলে। কিন্তু আমেনা শান্ত হতে পারে না। সে তো ভেবেছিলো তার কলিজার টুকরো আর ফিরবে না। পূর্ণতাকে নিয়ে দূরে কোথাও সংসার করবে। কখনোই আর দেখতে পাবে না এই মুখখানা।

আল্লাহ তার মানিককে তার বুকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
আমেনা কাঁদতে কাঁদতে বলে
“আমি তো ভেবেছিলাম তুই আর ফিরবি না।
ইফতিয়ার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মায়ের মাথায় চুমু খায়
” কোথায় যাবো মা? তোমরা ছাড়া কে আছে আমার?
সময় নিয়ে শান্ত হয় আমেনা। ইফতিয়ার মাকে নিয়ে সোফায় বসে।
“পূর্ণতা কোথায়?
এবার ইফতিয়ারের চোখ ভিজে ওঠে। কান্না আটকে জবাব দেয়

” অভি নিয়ে গেছে ওকে। চলে গেছে দূরে কোথাও। আর ফিরবে না৷ আমি আর দেখতে পারবো না তাকে।
আমেনা বেগম বুঝতে পারে তার আব্বার কলিজা পুরছে। সে মরণ যন্ত্রণায় পুরছে। তাই কথা ঘোরানোর জন্য বলে
“আব্বা তুই একদিন খুব সুখী হবি। আল্লাহ অনেক সুখ দিবে তোকে।
তাচ্ছিল্য হাসে ইফতিয়ার।
” আমি যে ডালটা ধরি সেই ডালটাই ভেঙে যায়। সুখ আসবে কোথা থেকে? আমার একটা জীবন আফসোস আর হাহা কার করতে করতেই কেটে যাবে।
নিশা সবটাই দেখে। এবং বোঝার চেষ্টা করে আসলে কি হয়েছে। এতোবড় দামড়া ছেলেও কাঁদে? এতো টাকাপয়সা ওয়ালা মানুষদেরও দুঃখ আছে? তাদেরও কলিজা কাঁপে?
তারাও অসুখী?
আল্লাহ কি তাহলে ধনীদেরও সুখ দেয় নি?
নিশা ভাবছো এই দুনিয়ায় যাদের টাকা আছে তারাই সুখী। আজকে সেই ভাবনাটা ভুল প্রমাণিত হলো।

অভি যখন লুটিয়ে পড়েছিলো তখন পূর্ণতা দিশেহারা হয়ে উঠেছিলো। কি করবে বুঝতে পারছিলো না। তখন মনে পড়েছিলো ইফতিয়ারের কথা। এই মুহুর্তে তাকে সাহায্য করতে পারবে একমাত্র ইফতিয়ার। তাই তো অভির ফোন ঘেটে ইফতিয়ার নামে সেভ করা নাম্বারে কল করেছিলো। বলেছিলো তার বিপদের কথা। তখন ইফতিয়ার বলেছিলো
“চিন্তা করিও না পূর্ণতা৷ আমি আছি৷ তোমার অভি সুস্থ হয়ে যাবে।
অবচেতন অভির মুখ পানে তাকিয়ে পূর্ণতা প্রশ্ন করেছিলো
” এতো কেনো করছেন আমার জন্য?

“তোমার মাঝেই আমার সুখ বন্দী রয়েছে৷ তোমাকে ভালো রাখতে পারলেই আমার জীবন স্বার্থক। আমি বেঁচে আছি তোমার সুখের জন্য।
পরে ইফতিয়ারই এম্বুলেন্স কল করেছিলো। সেই এম্বুলেন্সে করেই অভিকে আনা হয়েছিলো হাসপাতালে। চিকিৎসার খরচটাও ইফতিয়ার বহন করেছে।
প্রথমবারের মতো পূর্ণতা ভেবেছে ইফতিয়ারের কথা। এই মানুষটা এতো বেশি কেনো ভালোবাসে তাকে? কি আছে তার মাঝে?
এই ভালোবাসার বিনিময়ে পূর্ণতা কিছুই দিতে পারে নি তাকে। আর পারবেও না।

অভি এবং পূর্ণতা নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছে। অভি পূর্ণের শান্তির নিবাসে এক সাপা রেখেছে দুজন। পূর্ণতাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে সবটা। আপাতত অভি রান্না করছে। পূর্ণতা পাশে বসে দেখছে আর জ্বালাচ্ছে অভিকে। কখনো পেটে গুতো দিচ্ছে। কখনো বুকের লোম টানছে। কখনো কুচকুচে কালো ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে।
আবার কখনো কান ধরে টানছে।

অভি গম্ভীর স্বরে কয়েকবার শ্বাসিয়েছে পূর্ণতাকে। তবুও ভয় পাচ্ছে না পূর্ণতা।
” এমপি সাহেব শুনুন। একটা কথা গুরুত্বপূর্ণ কথা।
অভি ব্যস্ত ভঙ্গিমায় বেগুন কাটছে। চুলায় ভাত বসিয়েছে। মাছও ভিজিয়ে রেখেছে।
“কাজ করছি পূর্ণতা। পরে শুনবো।
পূর্ণতা চেয়ারের ওপরে উঠে অভির মুখোমুখি হয়। গাল ফুলিয়ে বলে
” এখনই শুনতে হবে। পরে ভুলে যেতে পারি।
হাল ছাড়ে অভি। হাত থেকে চাকু ফেলে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে আসে। চোখে চোখ রেখে বলে
“বলো

পূর্ণতা মুচকি হেসে গলা জড়িয়ে ধরে অভির। ঠোঁটের নিচে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির মাঝে চুমু খায় এবং পরপরই চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে।
” এমপি সাহেব আগে দাঁড়ি কাটবেন। ইসস জঙ্গল জঙ্গল মনে হয়৷ ঠোঁটে ব্যাথা পেয়েছি। চুমু খেয়ে শান্তি নাই।
অভি পূর্ণতার কোমর জড়িয়ে ধরে। ঠোঁটের ভাজে ঠোঁট রেখে মাতাল স্বরে বলে
“নরম জায়গা থাকলে জঙ্গলে যাও কেন? ডিরেক্ট এখানে চলে আসতে পারো না?

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫৪

নিজ বক্তব্য শেষ করেই মেতে ওঠে পূর্ণতার ওষ্ঠের ভাজে সুখ খুঁজতে। কতো দিন বাদে এই সুখে ভাসছে অভি। কতো কাল পরে। বেসামাল হয়ে যাচ্ছে। এই সুখের নেশায় এতোদিন মাতোয়ারা হয়ে যাচ্ছিলো। ছটফট করেছে গলা কা টা মুরগীর ন্যায়। শক্ত পোক্ত হৃদয়ে ঘূর্ণিঝড় বয়েছে। প্রতিরাতে কল্পনায় অধুর ছুঁয়েছে। প্রহর গুনেছে কাছে পাওয়ার।
এখন শান্তি লাগছে। এতোদিনের অসুখ এক নিমিষেই সেরে গেলো। কলিজা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
ঠোঁটের সংঘর্ষের সাথে বাড়তে থাকে দুই হাতের বেসামাল বিচরণ। পাগল করে তুলছে পূর্ণতার ছোট্ট দেহখানা।

প্রিয় পূর্ণতা পর্ব ৫৬