Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৮

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৮

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৮
জান্নাত নুসরাত

আমিরার দু-ভাই নাছির মঞ্জিলের সোফার উপর বসে আছে। বসে বসে দেখছে বাড়ির কারুকার্য। কালো কারুকার্যে সোনালি আভা ফুটানো। রান্না ঘরে দু-জন মহিলাকে ছুটতে দেখা যাচ্ছে। বয়স্ক জনের পরণে সুতি কাপড়ের কামিজ, আর মেয়েটার গায়ে শাড়ি। শালীন ভাবে পরেছে। লম্বা আঁচল প্যাঁচানো কাঁধ পর্যন্ত। বেনি করে রাখা চুলগুলো ঝুলছে কোমরের কাছে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই আহসান দেখল বয়স্ক এক লোক লাঠিতে ভর দিয়ে এসে বসছেন তাদের সম্মুখে। বাসায় পরার সাধারণ স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি। গা থেকে মিষ্টি সুভাস বের হচ্ছে। বসেই শুধালেন,”কেমন আছেন?

আমিরার বড় ভাই আহসান উত্তর দিলেন,”জ্বি ভালো আছি। আপনারা কেমন আছেন?
নাছির সাহেব ভালো আছেন বলতেই সেখানে এসে হাজির হলো নুসরাত। চুলগুলো বাঁধা ছিল কাকের বাসার মতো মাথার উপর। মেসি চুলের মধ্যে চশমা আটা। এক চোখ খোলা এক চোখ বন্ধ। গায়ের টি-শার্টে হাজারটা ভাঁজ। ট্রাউজারের এক পা কিছুটা উপরে আর এক পা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেদিকে তার ধ্যান নেই। নাজমিনে বেগমকে ডাকল,”আম্মায়া?
জবাব আসলো না। তবুও নিজের কথা বলল,”এক কাপ কফি দাও, না হয় কিছু খেতে দাও। খিদে লেগেছে।
কথা শেষ করে সামনে তাকাতেই চোখাচোখি হলো আমিরার বড় ভাই আহসান আর ছোট ভাই হাসানের সাথে৷ বিব্রত হওয়ার কথা থাকলেও বিব্রত হলো না। স্বাভাবিকভাবেই চোখ সরিয়ে নিল। ভাবল কথা বাড়াবে না, কিন্তু নাছির সাহেবই তাকে ডেকে এনে বসিয়ে দিলেন পাশে। এরপর ইরহামকে ও ডেকে এনে বসালেন। তারা দু-জনেই বিরক্ত মুখে বসে রইল আহসান আর হাসানের সামনে। হাসান বৃথা হাসার প্রচেষ্টা করল। বলল,”কেমন আছেন আপনারা?

নুসরাতকে উত্তর না দিতে দেখে ইরহামই উত্তর দিল,”আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
এরপর আর কথা বাড়াল না তারা দু-জন। আহসান ব্যস্ত হলো নাছির সাহেবের সাথে। কথার এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করল সে,”আমিরা কোথায়, তাকে কেন দেখছি না?
নাছির সাহেবের কন্ঠে বিস্ময়,”ওমা ও তো ওই বাড়িতে।
হাসান জিজ্ঞেস করল,”কোন বাড়িতে?
নুসরাত উত্তর দিল,”সৈয়দ বাড়িতে।
দু-জন মাথা দোলাল। উঠে দাঁড়াতে যাবে বিদায় নিয়ে তার পূর্বেই নাজমিন বেগম বললেন,”আরে আরে যাচ্ছো কোথায়, নাশতা করে যাও।
তারা মানা করে দিতে চাইলেও তাদের বসানো হলো ডায়নিং এ। ভদ্রতার খাতিরে ইরহামকে ও বসতে হলো। সৌরভিকে খাবার সার্ভ করতে দেখে আহসান শুধালেন,”উনি কে? চিনতে পারলাম না তো?

নাজমিন বেগমই উত্তর দিলেন,”আমার পুত্রবধু।
অবাক নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারা। নুসরাত সৌরভিকে উদ্দেশ্য করে বলল,”তুই বস, আমি সার্ভ করছি।
আহসান কিছু একটা জানার ভঙ্গি করে আবারো জিজ্ঞেস করল,”সুন্দর দেখতে একজন মেয়ে ছিলেন আপনাদের বাড়িতে, উনি কোথায়? দেখছি না যে?
ইরহাম বলল,”আমাদের বাড়ির সব মেয়েই সুন্দর, আপনি কার কথা বলছেন?
“গোলগাল দেখতে মুখ ছিল। বিয়ের দিন দেখা হয়েছিল উনার সাথে। উনার ধাঁচের চেহারা। রঙ ফরসা ছিল।
কথা শেষ করল নুসরাতের দিকে ইশারা করে। ইরহাম মাথা দোলাল। বলল,” ওওও ইসরাত আপুর কথা বলছেন?

মাথা দোলাল সে। নাজমিন বেগমই বললেন,”ও তো ফ্রান্সে।
আহসান খাবার মুখে তুলে কপালে ভাঁজ ফেলল। বলল,”পড়াশোনা করার জন্য?
নাছির সাহেব বললেন,”পড়াশোনা করতে যাবে কেন? ওর তো পড়া কমপ্লিট। ওর হাজবেন্ডের কাছে। ওরা ফ্রান্সে থাকে।
আহসানের চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে এমন হলো। বলল,”উনার বিয়ে হয়ে গেছে?
“বিয়ে হবে না, আশ্চর্য! ওর বয়স এখন সাতাশ।
হা করে তাকিয়ে মাথা দোলাল আহসান। নুসরাত বলল,” হা বন্দ করুন।
চুপচাপ মুখ বন্দ করে নিল সে। এবার নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,”এখন বলবেন না, উনার ও বিয়ে হয়ে গেছে!

নুসরাত আহসানের সেই কথার উত্তর দিল রয়েসয়ে,”বলার কিছু নেই, আমার বিয়ে হয়ে গেছে। কিছু মনে করবেন না, দাওয়াত দিতে ভুলে গেছি। আমিরা ও মনে করেনি আপনাদের কথা।
আহসান, হাসান কেশে উঠল। তাদের হতবিহ্বল মুখ চোখ দেখে পানি ঢেলে দিল ইরহাম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বলল,”আহান আর আমিরাকে কল দিয়েছি ওরা আসছে এখানে।
আহসান বলল,“আরে আরে কল দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আমরাই চলে যাব৷
তাদের কথার ভেতরই আরশ এসে এ বাড়িতে প্রবেশ করল। তাকে দেখেই নাজমিন বেগম অবাক। তাকিয়ে রইলেন হা করে। বললেন,”আরশ, তুমি এটা?
সে হেসে এসে জড়িয়ে ধরল একপাশ থেকে। চুমু খেল গালে। নরম হাসির শব্দ প্রতিধ্বনি হলো। তারপর জিজ্ঞেস করল,”আপনাকে ‘ও’ বলেনি আমি এসেছি?
নাজমিন বেগম দু-পাশে মাথা দোলালেন। বললেন,”কিছুই বলেনি।
আহসান কিছুক্ষণ আরশের দিকে তাকিয়ে খাবারের দিকে ধ্যান দিল। হাসান হাসল সামান্য। জানতে চাইল,”উনি কী আপনার হাজবেন্ড?

নুসরাতকে নড়তে দেখা গেল। মুখ প্যাঁচার মতো বানিয়ে রেখেছে৷ ইরহামই উৎসাহ নিয়ে বলল,”হ্যাঁ!
হাসানের ঠোঁটের কোণে কটাক্ষের হাসি ঝুলল। গলা খাদে নামিয়ে নিজের সাথেই বিড়বিড় করছে,”দেখতে কিছুটা সিভিলিং এর মতো মনে হয়।
নুসরাতের উত্তর আসলো তার মতোই নিচু স্বরে,”আমরা ভাই বোনই। তাই মুখের ধাঁচ এমন। আপনার সমস্যা?
হাসান চোখা নয়নে তাকিয়ে নিজের নাশতার দিকে চোখ দিল। নাজমিন বেগন আরশকে বললেন,”নাস্তা না করলে বসে যাও।
আরশ মানা করল সে খাবে না। নাজমিন বেগম জিজ্ঞেস করলেন,”আশ্চর্য, কেন খাবে না? শরীর খারাপ?

“তা না, পেট খারাপ করেছে।
“ কী খেয়েছ?
“ও বাড়ির পানি ভুলে ভুলে রাতে খেয়ে ফেলেছি। মনে ছিল না বাজার থেকে কিনে আনতে।
নাজমিন ছেলেটার কথায় আশ্চর্য হতে ভুলে গেলেন। বললেন,”মেডিসিন নিয়েছ?
“জ্বি!
নুসরাতকে দেখা গেল ভাবনাহীন। নাজমিন বেগম বললেন,” তোর সামান্য চিন্তা লাগছে না, এমন গালে হাত দিয়ে বসে আছিস কেন?
নুসরাত মায়ের দিকে তাকাল। চিন্তায় হাজারটা ভাঁজ পড়েছে কপালে। এত যদি চিন্তা লাগে তাহলে কোলে তুলে আল্লাহ আল্লাহ শুরু করো না কেন? তার সাথে হাউকাউ করছে কেন? তবুও মুখ বুজে রইল, চ্যাঁচাতে ইচ্ছে করছে না। দায়সারা ভঙ্গিতে উত্তর দিল,“চিন্তা লাগছে নাকি লাগছে না তা কী মুখের মধ্যে ফুটিয়ে তুলে দেখাতে হবে আমার চিন্তা লাগছে? পেট খারাপ হয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া উনার পেটটা-ই তো খারাপ। যাই খান না কেন, পেট খারাপ হয়ে যায়।

নাজমিন বেগম তবুও দায়সারা হতে পারলেন না নুসরাতের কথায়। বিরক্ত হলেন। এভাবে মুখের উপর পটর পটর করায়। তাই তার থেকে চোখ সরিয়ে আরশকে বললেন,”কিছু খাবে? দিব?
নুসরাত চোখ মুখ কঠিন করল। বলল,”তোমাকে আমি কখন বলেছি আমাকে খেতে দিতে, তুমি এখন আমাকে ফেলে আরশ ভাইকে নিয়ে পড়েছ?
আরশ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,”তোর কী জ্বলছে, আমাকে মেঝ মা কেয়ার করছে বলে?
“আশ্চর্য, আমার জ্বলতে যাবে কেন? আমি শুধু বলছি আমাকে খাবার দিতে।
আরশ হাসল। গা জ্বালানো হাসি। নুসরাত সতর্ক করল,”একদম ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসবেন না৷
আরশ আরাম করে বসল। বলল,”হাসলে তোর সমস্যা কী ভাই?
নুসরাত মাথা দোলাল। বলল,”অবশ্যই আমার সমস্যা আছে। আপনি গতকাল থেকে হিহি হিহি করতেই আছেন।

“তুই ও কর হিহি হিহি। মানা করিনি তো আমি।
“ আপনার মতো মেন্টাল আমি, যে হুদাই হিহি করব? এত রঙ লেগেছে কেন মনে?
“বলতে বাধ্য নই, একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় আমার।
“আম্মা তুমি আমাকে খাবার দিবে?
নাজমিন বেগম বললেন,” দিচ্ছি, দাঁড়া আগে আরশকে কিছু দিয়ে নিই।
“আরশ ভাই বলল তো কিছু খাবে না। তারপরও কী খাওয়াবে?
আরশ বলল,” তোর সমস্যা কী? আমাকে কিছু যদি মেঝ মা খেতে দেয় এতে তোর এত রাগার কী আছে?;

নাজমিন বেগম তার সামনে হট চকলেট এর কাপ রাখলেন৷ নুসরাত কতক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে দড়াম করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। বলল,”তাহলে আপনি বসে বসে গিলুন, আমি যাচ্ছি।
পা দাপিয়ে চলে গেল। মাকে বলতে ভুলল না,”মনে রেখো সব। কী ব্যবহার করছ আমার সাথে? সবাইকে দেখে নিব। আপনাকেও দেখে নিব আমি।
আহসান আর হাসান খাওয়া বাদ দিয়ে তাদের দিকে তাকাচ্ছিল। নতুন মেহমানের সামনে খাবার নিয়ে কারা ঝগড়া করে? এই পরিবারের লোক কী এমন আশ্চর্য? তাদের ভাবনার ভেতর আরশ নিজেও উঠে দাঁড়াল। নুসরাতের পিছু পিছু ছুটল। ড্যাব ড্যাব করে তাকানো দেখে নাছির সাহেব বললেন,”ওতে কিছু মনে করো না, এরা এমনই করে। ভালোবাসা বেশি তো, তাই ঝগড়া ও বেশি হয়।

নাছির মঞ্জিলের বাহিরে এসে দাঁড়াল নুসরাত। মৃদু বাতাস এসে গায়ে বারি খাচ্ছে। সোসাইটির অনেক মহিলারা হাঁটাহাঁটি, গল্প গুজব করছে। আকাশটা সাধারণ দিনের তুলনায় মেঘলা৷ নুসরাত সেদিকে তাকাতেই আরশ এসে তার সামনে দাঁড়াল। বলল,”বাটপারি করেছিস কেন?
নুসরাত অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,“কোথাকার বাটপারি?
“বাটপারি করছিস না? গতকাল রাতে তোর আমার সাথে থাকার কথা ছিল। কল ধরছিলি না কেন? কতটা কল দিয়েছি, হিসেব আছে?
নুসরাত দায়সারা উত্তর দিল,”খেয়াল করিনি।
“যাই হোক, আপনি লেনদেন এখনো ক্লিয়ার করেননি তাই আমার থেকে কিছু আশা করবেন না।
“আবারো লেনদেন?
“হ্যাঁ! এত টাকা পয়সা দিয়ে করবেন কী? একটু আমার মতো গরীবদের বিলি করুন।
আরশ পকেটে হাত দিয়ে ঝুঁকে আসলো নুসরাতের দিকে। তার পরণে লোয়ার নেক ট্যাঙ্ক টপস, উপরে কালো রঙের জ্যাকেট। বুকের অধিকাংশ উন্মুক্ত। তাই সেদিকে চোখ গেল একবার নুসরাতের পরপর আবারো চোখ সরিয়ে নিল সে। আরশ ফিসফিস করে বলল,”আমি টাকা পয়সা পাব কোথায়? আমি কী কয়েকটা আয় করি?
নুসরাত চোখা নয়নে তাকে দেখল। বলল,“ আয় করেন না? আপনি বেকার?

“অবশ্যই আমি বেকার।
নুসরাত পকেট হাতড়ে কার্ড বের করল। দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,” এটা তাহলে কার? বেকার তাহলে বড়লোকের কার্ড নিয়ে ঘুরছেন কেন?
আরশ আরেকটু কাছ ঘেঁষল। নুসরাতের মুখের কাছে নিজের মুখ ঠেকাল। তার নাক স্পর্শ করল নুসরাতের নাকে। বলল,”তোর কী আমি কাছে আসলেই দুনিয়ার সব লেনদেন এর কথা মনে পড়ে? হু? আমি কী টাকার পাহাড় নিয়ে ঘুরছি?
“ অবশ্যই!
“তোর লেনদেন সব ক্লিয়ার করা।
“ আপনার ও পাওনা আপনাকে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
“কখন?
“ গতকাল।
“প্রমাণ কী?
ত্যক্ত শ্বাস ফেলল৷ বলল,” আপনার কী বিরক্ত লাগে না? এত বিরক্ত করছেন কেন আমাকে?
আরশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“ আমি বিরক্ত করছি?

“ তো করছেন না? আসছেন থেকেই হিসাব ক্লিয়ার করতে চাচ্ছেন? আপনি কী এডিক্টেড? হিসাব ক্লিয়ার করলামই তো গতকাল। আর কি চাই আপনার? আমার জান নিয়ে নিতে চান?
“এই মুহুর্তে তোমাকে পুরোটা পেলেই হবে, জানের প্রয়োজন নেই।
নুসরাত ঠোঁটের কোণ উঁচাল শ্লেষ করে। বলল,” আরশ ভাই, একটা কথা বলি?
“বল!
“এমন উইয়ার্ড লাইন আমার সাথে বলবেন না। শুনলেই গা গুলায়।
আরশ তার দিকে গ্রীবা সামান্য ঝোঁকাল,“কেন সুইটহার্ট, সমস্যা কী?
নুসরাত আরশকে দূরে ঠেলে দিল। বলল,”দূরে, দূরে, গায়ের উপর উঠে আসবেন না।
আরশ চোখ মুখ কালো করে বলল,”তোর সমস্যাটা কী?
নুসরাত শ্রাগ করল,“ আমার কী সমস্যা হবে?

“ অবশ্যই তোর সমস্যা আছে, নাহলে এমন ব্যবহার কেন?
“আমার ব্যবহারই এমন।
“ উঁহু, তুই আমার সাথে নাটক করছিস?
“আশ্চর্য, আপনার সাথে আমি নাটক করব কেন?
“ ন্যাকামি করবি না একদম!
“আমি ন্যাকামি করছি?
“ হ্যাঁ করছিস!
“তাহলে এই ন্যাকার কাছে এসেছেন কেন? যান, দূরে গিয়ে মরুন।
“ তুই আমাকে মরতে বললি?
“হ্যাঁ বলেছি, সমস্যা?

আরশ কিছুক্ষণ নুসরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। তাদের ঝগড়া এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখছিলেন একজন ভদ্রমহিলা। জিজ্ঞেস করলেন,” তোমরা স্বামী স্ত্রী?
দু-জনে দু-জনের থেকে দূরে চলে গেল ছিটকে। সমস্বরে বলল,”নাহ্! এ কে আমি চিনি না।
আরশের কথা নুসরাতের কানে আসতেই চোখ ছোট ছোট করে সে তার দিকে এগিয়ে গেল আঙুল তুলে। শাসিয়ে জিজ্ঞেস করল,”মিথ্যা বললেন কেন?
আরশ চোখ ছোট ছোট করল। অবাক কন্ঠে জানতে চাইল,“কী মিথ্যা বলেছি?
নুসরাত তার মুখের উপর আঙুল তুলে বলল,“মিথ্যা বলেননি আপনি?
আরশের চোয়াল ঝুলে গেল। দু-পাশে মাথা দোলাল নিষ্পাপ ভঙ্গিতে। নুসরাত হাত তুলে তার চোখের দিকে তাক করে বলল,”এখন এমন নিষ্পাপ চোখ বানাচ্ছেন যেন জীবনে মিথ্যা কথা বলেন না আপনি?
ভদ্রমহিলা থামানোর চেষ্টা করলেন। বললেন,”আরে, আরে, করছ কী?
নুসরাত তার দিকে তাকাল চোখ দুটো সরু করে। বলল,”আমাদের কথার মধ্যে বাঁ-হাত ঢোকাবেন না।

ভদ্রমহিলার থেকে চোখ সরিয়ে নিতেই তিনি চলে গেলেন তাদের ছেড়ে৷ তাদের উপর তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। নুসরাতের সেই সময়ের কথার আরশ উত্তর দিল,“আমার চোখ এমনই। তাছাড়া তুই এক কথা থেকে অন্য কথায় যাচ্ছিস কীভাবে?
“তাহলে আগের কথাই যাই। আপনি কেন মিথ্যা বললেন আমি আপনার স্ত্রী না? আমি আপনার স্ত্রী না, এত বড় মিথ্যা কথা? আগে তো এত মিথ্যা কথা বলতেন না। এসব মিথ্যা কথার ট্রেনিং আপনাকে কে দিচ্ছে?
আরশ হতবাক মুখে তাকিয়ে বলল,”তুই ও তো বললি আমি তোর স্বামী না।
নুসরাত দু-পা বাড়িয়ে একদম আরশের সামনে এসে দাঁড়াল,“তো কী হয়েছে? আমি বলেছি বলে আপনাকেও বলতে হবে?
“আমার কাছে ওই সময় আর কোনো কথা মাথায় আসেনি৷
আরশের কথা শেষ হতে দিল না নুসরাত। ভেংচি কেটে বলল,“মাথায় আসবে না কেন? হু? আর আমরা বিবাহিত না হলে আপনি অফিসে কিস করতে পারতেন আমাকে? এতটা চুমু খেলেন ওগুলা কী?

নুসরাত দু-পাশে মাথা দুলিয়ে সেগুলো যেন ফেলে দিল। বলল,”যাই হোক,ওইসব বিষয়ে আমার কিছু যায় আসে না৷ পুরোনো দিনের নই আমি। তাছাড়া ওইটা কোনো কিস ছিলই না। আমি মনে করি না ওইটা কিস ছিল বলে। প্যারিসে তো মানুষ এভাবেই চুমু খেয়ে দেখা করে। তবুও আমরা তো প্যারিসে নেই, বাংলাদেশে আছি৷ আপনার উচিত ছিল না এতক্ষণে আমাকে মানিয়ে নেওয়া, মিথ্যা কথাটা বলার জন্য?
“তুই কোন কথা থেকে কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছিস বুঝতে পারছিস? আমাকে সুযোগ দিচ্ছিস কথা বলার? মানিয়ে নিব কীভাবে?

আরশের চেহারার সামনে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে এসে দাঁড়াল নুসরাত। কিড়মিড় করে উঠে বলল,“কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? শুধু আপনার কৃতকর্মের কথা ফাঁস করছি। কিস করতে তো বলছি না? আপনার মতো তো মিথ্যা বলিনি, যে আমি অবিবাহিত৷
“এই তো বললি এটা কোনো কিসই ছিল না৷ আর তুই অবিবাহিত। আমরা স্বামী স্ত্রী না।
“তো সেটা ধরে আপনি বসে থাকবেন। একঘন্টা আগে ওই কথা আমি বলেছি৷ আপনার কী কোনো কমনসেন্স নেই। মানাচ্ছেন না কেন আমাকে?
“তোকে কী মানাব আমি? তোকে দেখে তো মোটেও রেগে থাকতে মনে হচ্ছে না।
“আরশ ভাইইইই…
“কী?
“ আমি আপনাকে ডিভোর্স দিব। যে লোক ঠিক ভাবে চুমু খেতে পারে না, তার সাথে কোনো সম্পর্ক আমি রাখব না।

“কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিস? মাথা ঠিক আছে?
“ এতদিন ঠিক ছিল না, এবার মস্তিষ্ক নিজের জায়গায় এসেছে। এক্ষুণি আমি যাচ্ছি… সব ব্যবস্থা করতে।
আরশ তার হাত আঁকড়ে ধরল। ভ্রু উচিয়ে শুধাল,”কী করতে যাচ্ছিস তুই?
“ডিভোর্স দিতে যাচ্ছি।
আরশ মাথা দোলাল উপর নিচ। দাঁতের নিচে ঠোঁট পিষে বলল,“ বুঝিনি, কী বলেছিস?
“বাংলায় শুনতে চাচ্ছেন নাকি ইংরেজি?
“বাংলায় বল, ইংরেজিতে বল, যে যে ভাষা জব্দ আছে সব ভাষায় বলতে শুরু কর।
নুসরাত জিভ দিয়ে গাল ঠেলল। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে চাইল, পেরে উঠল না। আরশ ইশারা দিচ্ছে তাকে, সে বলল,”স্পষ্ট ইংরেজি তে বলছি৷ আপনি তো ইংরেজি জানেন, তাই না? নাকি জানেন না?

“বল, শুনছি আমি। স্পষ্ট ইংরেজিতে।
“ আই ওয়ান্ট আ ডিভোর্স!
“হুদাই লাফাচ্ছিস নাকি সত্যি ডিভোর্স চাস?
“চাই!
আরশ হেসে ফেলল। বলল,“যা মিথ্যুক।
“আমি মোটেও মজা করছি না। মজা হিসেবে নিবেন না। এটা একটি ইম্পর্ট্যান্ট কথা। আমাকে সিরিয়াস নিন।
“সিরিয়াস নিব তোকে?
“না নিলে নাই, আমি আপনাকে ডিভোর্স দিব।
কথাটা শেষ করে মুখ ঝামটা মেরে চলে যেতে নিলেই আরশ তার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরল। কন্ঠস্বর নামানো একদম,”কী মনে হয়, ডিভোর্স দিয়ে দিব তোকে? তোর ছেলে মানুষি কথায় আমি রাজী হয়ে যাব? এত কষ্ট করে পেয়েছি আবারো ছেড়ে দেওয়ার জন্য? হু? এখন তো মৃত্যু ও তোকে আমার থেকে দূর করতে পারবে না।
নুসরাত কান পরিস্কার করল যেন আরশের কথাগুলো সে শুনছেই না। কিন্তু মনোযোগ স্থির সেদিকে। বলল,”তাহলে ভয় পেয়ে থাকবেন আমাকে? না হলে রেখে চলে যাব। এবার বলুন আমাকে মানাচ্ছেন কখন?

“মানাতে হবে?
“ অবশ্যই! মিথ্যা বলেছেন আপনি। একজন স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে সদর্পে বুক ফুলিয়ে আপনি কীভাবে মিথ্যা বললেন?
“কিন্তু আমদের সব মিটমাট হয়ে গেছে। এখন তো আমরা স্বামী স্ত্রী!
“তো কী হয়েছে, স্বামী স্ত্রী হলে মানানো যাবে না? আশ্চর্য, আপনি তো কিছুই জানেন না।
আরশ দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। বলল,” তোকে মানানোর
জন্য কী করতে হবে?
নুসরাত চোখ দুটো বড় বড় করে দু-হাত তুলে কাঁধ ঝাঁকাল। তিরিক্ষি স্বরে বলল,”সেটা ও আমি বলে দিব? আশ্চর্য.. এই জন্যই আমি সম বয়সী বিয়ে করতে চাইনি। কে বিয়ে দিয়েছে আমাদের?
“তুই নিজেই বিয়ে করেছিস। তাছাড়া তুই বলে দিলে সমস্যা কী?
“ আরশ ভাই, আরশ ভাই, আপনি এত বোকা কেন? আমি যদি বলেই দেই তাহলে মানানোর প্রয়োজন কী? সমবয়সী বিয়ে করে ঠকে গেছি।
আরশ কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,“আমরা সমবয়সী?

“অবশ্যই! সমবয়সী না? আপনি আমার থেকে গণে গণে মাত্র পাঁচ ছয় বছরে বড় হবেন। বেশি তো না এটা।
“পাঁচ ছয় বছরে বড়, বড় না? তুই বয়সের তফাৎ কতটুকু সেটাকে বলছিস কোনো তফাৎ নয়।
“শুনুন আরশ ভাই, এটা আমার কাছে তেমন বেশি না। আমি ভাবতাম আমার বিয়ে হবে খুব বড় বয়সের লোকের সাথে, যে আমাকে রাগ করলেই সারপ্রাইজ দিবে, কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে আপনার সাথে।
“আমার সাথে বিয়ে হওয়ায় কী সমস্যা আছে?
“সমস্যা হবে কেন? আপনার সুন্দর একটা চেহারা আছে।
“ শুধু সুন্দর চেহারা?
“যতেষ্ট লম্বা ও আছেন।
ভ্রু কুটি করল সে,“যতেষ্ট লম্বা?
“ হ্যাঁ, কেন সমস্যা?
“যতেষ্ট লম্বা মানে তুই কী বোঝাতে চাচ্ছিস?

“ এই ধরুন আপনি আরেকটু লম্বা হলে আমি আপনার বুকের কাছে পড়তাম কিন্তু আপনি আরেকটু লম্বা না হওয়ায় আমি সেখানে পড়ছি না। আপনি কী কখনো এসব খেয়াল করেন? আমার সন্দেহ হয় আপনি কখনো কী আমার মুখটা ঠিকভাবে লক্ষ করেছেন!
আরশ কিয়ৎক্ষণ নুসরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এভাবে তাকানোতে নুসরাত দূরে চোখ সরিয়ে নিল। তারপরও যখন দেখল আরশ এখনো তাকিয়ে আছে সে ধাক্কা দিল তার বুকে। বিচ্যুতি ঘটল হাসির৷ বলল,”হয়েছে, আমি বলাতে এখন এভাবে তাকাতে হবে না।
আরশ তার দু-হাত নিজের বুকের কাছে চেপে ধরল। তখনো চোখ স্থির সামনে। ঠোঁট দিয়ে বেরিয়ে আসলো অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ,”তোকে সুন্দর দেখায়৷ আমি খেয়াল করেছি।
নুসরাত হাসল। হো হো করে হেসে ঢলে পড়ল আরশের গায়ের উপর,”আমার কী এখন লজ্জা পাওয়া উচিত, আরশ ভাই?
“তুই চাইলে পেতে পারিস৷
নুসরাত চোখ তুলে তাকাল। বলল,” ইসসস কী শখ! বললেই লজ্জা পেতে হবে? এভাবে লজ্জা লাগে না। কারণ লাগে লজ্জা পেতে?

“কারণ দিয়ে দিব?
“ না থাক….
থামল কিছুক্ষণের জন্য সে। আরশ তার কাঁধ চেপে ধরে হাঁটছে। আশপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল,”তুই যদি জানতে না চাস, তাহলে না বললাম।
“আরশ ভাই?
“ হু!
“কারণটা শুনি? জানতে ইচ্ছে করছে?
আরশ ঠোঁট টিপল। বাঁকা হাসি ভাসল ঠোঁটের কোণে। মাথা নামিয়ে আসলো নুসরাতের দিকে৷ সে জিজ্ঞেস করল,” গোপনীয় কিছু জেনে গেছেন?
“হ্যাঁ, তেমনই!
“ কী?
আরশ আরেকটু ঝুঁকল। নুসরাত দাঁড়িয়ে পড়ল। কান পাতল তার দিকে। কানের কাছে ঠোঁট রেখে ফিসফিস করছে,”হিন্ট দিব নাকি সব বলে দিব?
“বলে দিন, সাসপেন্স রাখবেন না৷
আরশের কন্ঠ আরো ঝুঁকল। ইশারা করল কিছু একটা। নুসরাত কপালে ভাঁজ ফেলল৷ মুখ ঘুরিয়ে আরশের দিকে তাকাতেই দু-জনের নাক স্পর্শ করল। সে শুধাল,”ওদিকে কী ইশারা করছেন?
আরশ আবারো ইশারা করল। নুসরাতের হাত ধীরে ধীরে নিজের উদরে এসে আটকে গেল। তড়াক করে তাকাল আরশের দিকে। সে হাসছে। বিশ্রী হাসি! চোখ দুটো মনে হলো কোটর ছেড়ে মেয়েটার বেরিয়ে আসবে। অবাক কন্ঠে জানতে চাইল,”আপনি জানলেন কীভাবে?

“ভুলে গেছিস গতকালের কথা?
“বাদ দেন ওসব।
“ লজ্জা পেয়েছিস?
“নাহ্… জানার কথা জেনে গেছেন লজ্জার পাওয়ার কী!
আরশের ঠোঁট বেয়ে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে গেল। বলল,”পাবি কী করে, সেই সিস্টেম আছে নাকি না, তাতেই তো সন্দেহ..!
“আপনি আমাকে অপমান করলেন? আমাকে আবারো অপমান করেছেন?
কথা শেষ করেই চ্যাঁচিয়ে উঠল নুসরাত। বলল,”যান, আর কোনো কথা নেই আপনার সাথে।
“আশ্চর্য, হয়েছে কী তোর? অদ্ভুত আচরণ করছিস তুই?
“কথা বলবেন না আমার সাথে।
“নুসরাত নাছির?
“নাম নিবেন নায়ায়া আমার!
“মিসেস আরশ?
“ওটা দিয়ে ও ডাকবেন না।
“সুইটহার্ট?
“ এভাবে ও না।
“তাহলে কীভাবে ডাকব?

“যেভাবে ইচ্ছে ডাকুন, তবুও আমাকে ডাকবেন না। আমি আপনাকে চিনি না।
“বেইবিগার্ল?
নুসরাত চুপ থাকল৷ আরশ আবারো ডাকল,”মিসেস নুসরাত নাছির…?
“ডাকতে মানা করেছি, না?
“ডাকলে সমস্যা কী?
“আগে আমাকে মানান তারপর আপনার সাথে কথা। এবার বলবেন না, কীভাবে মানাব? বলে দিব না৷
“ডিয়ার, বলুন কীভাবে আপনার রাগ ভাঙাতে হবে?
“ যেভাবে ইচ্ছে ভাঙান। আমি বলব না।
“বলে দিন, আপনার ইচ্ছেতে সব হবে।
“ আমি বলে দিলে হবে কীভাবে? আশ্চর্য, আরশ ভাই আপনার গার্লফ্রেন্ড ছিল না?
“নাহ্!

“ বিদেশ তাহলে এত বছর কী করেছেন? ভালো হয়েছে, গার্লফ্রেন্ড ছিল না, তাই পিওর ইন্টেক মাল পেয়েছি। যাই হোক, আমি বলে দিয়ে ভুলে যাব আমি আপনাকে বলেছি এটা। ওকে?
আরশ মাথা দোলাল। বলল,”আচ্চা!
নুসরাত বলল,”আপনি আমাকে ফুলের বুকেট এনে দিবেন আর আমি খুশি হয়ে যাব।
আরশ মাথা নাড়াতে যাবে সে বাঁধা দিল,”নায়ায়ায়া, আমার ফুল পছন্দ না৷ অন্য কিছু!
“অন্যকিছু?
“ হ্যাঁ, অন্যকিছু!
“কী?
নুসরাত মুখের উপর আঙুল রেখে ভাবল। কী চাইবে খুঁজে পেল না। ঠোঁট কামড়াল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অনেকক্ষণ পর বলল,”না বাদ দিন, কিছুর দরকার নেই।
আরশ ভ্রু কুটি করল। নুসরাতের চেহারা দিকে তাকিয়ে বলল,“ কিছু চাই না? শিওর?

“হ্যাঁ!
নুসরাতের হাতের আঙুলের ভাঁজে নিজের হাত ঢোকাল। বলল,” পাথর চাপা দিয়ে না বলতে হবে না৷ বলে ফেল কী চাই?
“একটা নেকলেস।
“একটা নেকলেস? ঠিক আছে। আমার পছন্দ মতো দিব। কোনো ধরণের নাক তোলা, পা তোলা চলবে না। রাজী?

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৭

“রাজী!
“ ডিল ডান?
“ডান!
“ওকেই?
“ ওকে!
“রাগ শেষ?
“ শেষ!

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৯