Home প্রিয় বেলিফুল প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২২

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২২

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২২
উম্মে হাবিবা

ক্যান্টিনের ভেতর তখন যেন হঠাৎ করেই সময় থমকে গেছে।
কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে ছাত্রছাত্রীদের হৈচৈ, চিৎকার আর উত্তেজনায় পুরো জায়গাটা সরগরম হয়ে ছিল, সেখানে রুদ্রের বজ্রকণ্ঠে মুহূর্তেই নেমে এসেছে পিনপতন নীরবতা।
রুদ্রের চোখের দৃষ্টি একবার ঘুরে গেল পুরো ক্যান্টিনে। মেঝেতে পড়ে থাকা স্যান্ডউইচ, ছড়িয়ে থাকা পানির ফোঁটা, সোহার এলোমেলো হয়ে যাওয়া হিজাব—সবকিছুই তার চোখ এড়াল না।
তারপর ধীর অথচ কঠিন গলায় বলল,

—”যে যার জায়গায় ফিরে যাও। এখানে আর একটা শব্দও শুনতে চাই না।”
রুদ্রের কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে, কেউ দ্বিতীয়বার কিছু বলার সাহস পেল না। কয়েকজন ছাত্রছাত্রী দ্রুত সরে গেল। যারা এতক্ষণ মোবাইলে ভিডিও করছিল, তারাও তাড়াতাড়ি ফোন নামিয়ে ফেলল।
রুদ্র তাদের দিকে তাকিয়ে বলে,এখানের কোনো গঠনার ভিডিও যদি বাহিরে লিক হয় সবাইকে শাস্তি দেয়া হবে নিজেদের ফোনের ভিডিও এখনি ডিলেট করো।
রুদ্র এবার সোহার দিকে তাকাল।
সোহা তখনও রাগে কাঁপছে। তার হিজাবটা সামান্য এলোমেলো হয়ে গেছে, চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
রুদ্র কিছু না বলে শুধু একবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—”আপনারা দুজন আমার সাথে চলুন। ”
সোহা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রুদ্রের গম্ভীর মুখ দেখে চুপ করে গেল।
অন্যদিকে যে মেয়েটা পুরো ঘটনার সূত্রপাত করেছিল, সে দাঁত চেপে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার নাম তাহি। কলেজে নিজের প্রভাব আর কয়েকজনের একটা দল নিয়ে দাপট দেখিয়ে চলার জন্য মেয়েটার বেশ নামডাক ছিল।
রুদ্র ক্যান্টিনের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীকে বলল,
—”এই ঘটনার একটা রিপোর্ট তৈরি করুন। আর যারা ঘটনাটা দেখেছে, তাদের নামও নোট করুন।”
তারপর সোহা ও তাহিকে সঙ্গে নিয়ে সোজা প্রিন্সিপালের অফিসের দিকে রওনা হলো।
প্রিন্সিপালের রুমে ঢুকতেই স্যার চশমার ওপর দিয়ে তিনজনের দিকে তাকালেন।
রুদ্র অনুমতি নিয়ে দুজন কে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে।
প্রিন্সিপাল জিজ্ঞেস করলেন__কোনো সমস্যা?
রুদ্র যতটুকু জানে তা সংক্ষেপে বললো,, তখনি ক্যান্টিনে একটা ছেলে এসে সিসিটিভি ফুটেজ দিয়ে যায়।
সব দেখে প্রিন্সিপাল বেশ রেগে যায়।

—”কী হয়েছে? এত সকালে ক্যান্টিনে মারামারি কেন?”
তাহি মাঝেমধ্যে নিজের পক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করলেও রুদ্রের বক্তব্যের পর ঘটনাটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেল।
প্রিন্সিপাল প্রথমে তাহির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—”তুমি প্রথমে সোহার খাবার ফেলে দিয়েছ?”
তাহি একটু থেমে বলল,
—”স্যার, কিন্তু ও আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিল।”
—”তাই বলে কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”
তাহি এবার চুপ।
প্রিন্সিপাল আবার বললেন,

—”তারপর তুমি তার হিজাব ধরে টেনেছ?”
তাহি এবার নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রিন্সিপাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বললেন,
—”কলেজে ব্যক্তিগত বিরোধ, অপমান, হাতাহাতি—কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। তোমার আচরণ শুধু নিয়মবিরুদ্ধ নয়, অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও খারাপ উদাহরণ।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি সিদ্ধান্ত জানালেন,
—”তাহি, তোমাকে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য কলেজ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। এই সময়ের মধ্যে কলেজে তোমার প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।”
কথাটা শুনে তাহির মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—”স্যার, দুই সপ্তাহ?”
—”হ্যাঁ। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।”
তাহি আর কিছু বলল না। কিন্তু বের হওয়ার আগে সে একবার সোহার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে রাগ, অপমান আর প্রতিশোধের একটা তীব্র আভাস ছিল।
সোহা বিষয়টা বুঝলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
তাহি দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।
প্রিন্সিপাল এবার সোহার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
—”সোহা, তোমার ওপর অন্যায় হয়েছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু যেহেতু তোমার ও সামান্য ভুল আছে তাই তোমাকে চার দিনের জন্য সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে নিজে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়বে না। সমস্যা হলে শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষকে জানাবে।”
সোহা মাথা নেড়ে বলল,
—”জি স্যার। আমি চেষ্টা করব।”
—”ঠিক আছে। তুমি যেতে পারো।”
—”জি স্যার।”
সোহা অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর প্রিন্সিপাল কিছুক্ষণ রুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন,
—”তোমার বউ তো বেশ রাগী মনে হচ্ছে!”
রুদ্রের গম্ভীর মুখেও এবার সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
প্রিন্সিপাল মজা করে বললেন,
—”সাবধানে থাকবে, ইয়াংম্যান।”
রুদ্র হালকা মাথা নেড়ে বলল,

—”চেষ্টা করব স্যার।”
তারপর মুচকি হেসে সেও রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
করিডোরে বের হতেই রুদ্র দূর থেকে সোহাকে দেখতে পেল। কিন্তু সোহা তখন রাইসার সাথে কথা বলতে বলতে গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
রুদ্র কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর নিজের ক্লাসের দিকে চলে গেল।
এদিকে রাইসা সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
—”কী রে! তোর মুখ এমন কালো হয়ে আছে কেন? প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে কী হলো?”
সোহা বিরক্ত গলায় বলল,
—”আর বলিস না! ওই মেয়েটার জন্য পুরো ঝামেলা। শেষে দুই সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড হয়েছে।”সাথে আমাকেও চার দিনের জন্য। একদিক থেকে ভালোই হলো কিছু দিন বাসায় গিয়ে ঘুরে আসা যাবে। অনেক দিন হলো যাই না।
রাইসা হাঁ করে বলল,

—”সত্যি?”
—”হ্যাঁ।”
—”তুই ঠিক আছিস তো?”
সোহা নিজের হিজাবটা ঠিক করতে করতে বলল,
—”আমি ঠিক আছি। তবে মেয়েটা এমনভাবে তাকাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল চোখ দিয়েই আমাকে পুড়িয়ে ফেলবে!”
রাইসা হেসে বলল,
—”তুইও কম যাসনি কিন্তু।”
সোহা চোখ বড় করে তাকাল।
—”আমি কী করেছি?”
—”পানি ছুড়ে দিয়েছিস!”
—”ও আমার খাবার ফেলে দিয়েছে!”
—”তারপরও!”
দুজনেই হাসতে হাসতে কলেজ গেটের কাছে চলে এল।
রাইসা হঠাৎ বলল,

—”আচ্ছা, আমি আজ ফুফুর বাসায় যাব।”
—”তোর ফুফুর বাসা তো আমাদের পথেই, তাই না?”
—”হ্যাঁ। চল, একসাথে বাসে উঠি।”
—”ঠিক আছে।”
দুজনেই বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটি বাসে উঠে পড়ল। বাসে বেশ ভিড়। অনেক কষ্টে করে দুজনের জন্য একটা সিট পাওয়া গেলনা। দুজনেই দাঁড়ে আছে।
কিছুদূর যাওয়ার পর রাইসার চোখ হঠাৎ সামনে গিয়ে আটকে গেল।
প্রেগন্যান্ট নারীদের জন্য নির্ধারিত সিটে একজন বেশ ভুঁড়িওয়ালা লোক আরাম করে বসে আছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলা।
রাইসা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—”আঙ্কেল, আপনি একটু উঠবেন? এই আপু টাকে বসতে দিন। দেখতেই তো পাচ্ছেন উনি প্রেগন্যান্ট।”
লোকটা বিরক্ত মুখে তাকিয়ে বলল,
—”প্রেগন্যান্ট হলে ঘরে বসে থাকুক। বাসে কী করছে?”
রাইসা হতভম্ব হয়ে গেল।
ঠিক তখনই সোহা কথাটা শুনে সামনে এগিয়ে গেল।
—”আরে রাইসা, তোর মধ্যে কি একটুও মনুষ্যত্ব নেই?”
রাইসা অবাক হয়ে তাকাল।
সোহা লোকটার দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর মুখে বলল,
—”দেখছিস না আঙ্কেলও প্রেগন্যান্ট!”
এক মুহূর্তের জন্য বাস নিস্তব্ধ।
তারপর সোহা লোকটার বিশাল ভুঁড়ির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

—”বরং উনার অবস্থা তো মনে হচ্ছে আরও সিরিয়াস। পেট দেখে তো মনে হচ্ছে টুইন বেবি হবে!”
বাসের ভেতর মুহূর্তেই হাসির রোল পড়ে গেল। কেউ মুখ চেপে হাসছে, কেউ আবার মাথা নিচু করে ফেলেছে।
সোহা আরও গম্ভীর মুখে বলল,
—”না না, আঙ্কেল আপনি বসেই থাকুন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার ডেলিভারি তো এখনই হয়ে যাবে। আমার তরফ থেকে আপনাকে অগ্রিম শুভেচ্ছা!”
লোকটার মুখ লাল হয়ে গেল।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে চাইল না।
চিৎকার করে ড্রাইভারকে বলল,
—”ভাই, বাস থামান!”
বাস থামতেই লোকটা দ্রুত নেমে গেল। বাসের ভেতর আবারও হাসির শব্দ উঠল। রাইসা সোহার হাত ধরে বলল,
—”তুই একটা আস্ত পাগল!”
সোহা হেসে বলল,

—”মানুষকে তার প্রাপ্য জায়গা দিতে হয়!”
তারপর সোহা উঠে সেই অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে নিজের জায়গায় বসিয়ে দিল।
মহিলাটি কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে বললেন,
—” তোমাদের অনেক ধন্যবাদ।”
সোহা মিষ্টি হেসে বলল,
—”এতে ধন্যবাদ দেওয়ার কী আছে আপু ? আপনি বসুন।”
কিছুক্ষণ পর সোহার নামার স্টপ চলে এলো। সে রাইসাকে বলল,
—”তুই সাবধানে যাস। ফুফুর বাসায় পৌঁছে আমাকে ফোন দিস।”
—”তুইও বাসায় গিয়ে ফোন করিস।”
—”ঠিক আছে।”
দুজন দুদিকে চলে গেল।

কলেজের কাজ শেষ করে রুদ্র সোজা অফিসে চলে গেল।আজ তার নতুন একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট জয়েন করার কথা।
নিজের কেবিনে বসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখছিল রুদ্র। কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ল।
—”স্যার, ভিতরে আসব?”
রুদ্র ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল,
—”আসুন।”
ম্যানেজার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে রুদ্রের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
ম্যানেজার বলল,
—”স্যার, উনি আপনার নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট। মিস মাইশা।”
নামটা শুনেই রুদ্র এবার চোখ তুলে তাকাল।
মুহূর্তেই চিনতে পারল।
এ যে সোহার ফুফাতো বোন—মাইশা!
রুদ্রের ভেতরে বিরক্তির ঢেউ উঠলেও মুখে তার সামান্যতম প্রকাশ ঘটল না। বরং আগের মতোই কঠিন, গম্ভীর মুখে বসে রইল।
অন্যদিকে মাইশার চোখে তখন অন্যরকম উচ্ছ্বাস।রুদ্রের এত কাছাকাছি কাজ করার সুযোগ সে কল্পনাও করেনি।
মাইশা মনে মনে ভাবল,

‘অবশেষে সুযোগটা পেলাম। এবার দেখি কতদিন আমাকে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখেন মিস্টার রুদ্র মেহতাব।’
তার নিজের সৌন্দর্য নিয়ে তার আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল। তার ধারণা ছিল, পুরুষরা তার রূপ আর ব্যক্তিত্বে সহজেই আকৃষ্ট হয়।যেমন করে তমাল কে সোহার থেকে কেড়ে নিয়েছিলো। ঠিক সে ভাবেই রুদ্রও শেষ পর্যন্ত তার ব্যতিক্রম হবে না—এমনটাই সে বিশ্বাস করত।
রুদ্র ঠান্ডা গলায় ম্যানেজারকে বলল,
—”উনাকে উনার ডেস্কে নিয়ে যান। প্রয়োজনীয় সব কাজ বুঝিয়ে দিন। আশা করব, উনি প্রতিটি দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করবেন। সামান্যতম ভুলও গ্রহণযোগ্য হবে না।”
মাইশা মৃদু হাসল।

—”জি স্যার।”
রুদ্র আবার ফাইলের দিকে মন দিল।
—”আপনারা আসতে পারেন।”
মাইশা ম্যানেজারের পেছনে বেরিয়ে গেল।
কেবিনের দরজা বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে তার ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে বলল,,,কত সময় আমাকে নিজের থেকে দূরে রাখবেন, মিস্টার রুদ্র মেহতাব—আমিও দেখব।’
রাত প্রায় দশটা।
মেহতাব বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সোহা কয়েকবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
রুদ্র এখনো ফেরেনি।
মুখে সে কোনো চিন্তার প্রকাশ করছে না, কিন্তু মনের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্থিরতা।
এত রাত হলো… এখনো এলেন না কেন?’
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
সকালেই রুদ্র তাকে নতুন ফোনটি দিয়েছিল। সোহা নিজের পুরোনো সিমটাও সেই ফোনে সেট করে নিয়েছিল।
অচেনা নম্বর দেখে প্রথমে সে কলটি ধরল না।
কিন্তু বারবার রিং হতে থাকায় শেষ পর্যন্ত কল রিসিভ করল।

—”হ্যালো?”
কোনো উত্তর নেই।
সোহা আবার বলল,
—”হ্যালো? কে বলছেন?”
নীরবতা।
সোহা বিরক্ত হয়ে বলল,
—”কথা না বললে ফোন করেছেন কেন?”
তারপর কল কেটে দিল।
ওপাশে রাফিন নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল।সে অনেক কথা বলতে চেয়েছিল।কিন্তু কিছু অনুভূতি মুখে আনা যায় না।কিছু কথা বলা মানেই হয়তো সম্পর্কগুলোকে অস্বস্তিকর করে তোলা।
রাফিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।কীভাবে বলব তোমাকে, সোহা?’ কিন্তু উত্তরটা তার নিজের কাছেও নেই।
হঠাৎ নিচে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।সোহা দ্রুত বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল।গাড়ি এসে থামতেই রুদ্র গাড়ি থেকে নামল।
ঠিক তখনই রুদ্রও স্বাভাবিকভাবে ওপরের দিকে তাকাল।দুজনের চোখাচোখি হতেই সোহা মুহূর্তেই লজ্জা পেয়ে গেল।
সে আর দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত ঘরের ভেতর চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর কলিং বেলের শব্দ হলো।রুনিয়া মেহতাব দরজা খুলে দিলেন।

—”এলে বাবা? যাও, আগে ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি খাবার দিচ্ছি।”
রুদ্র জুতো খুলতে খুলতে বলল,
—”না মা, খাব না। একজন ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং ছিল। সেখানেই ডিনার করে নিয়েছি।”
রুনিয়া মেহতাব একটু অবাক হয়ে বললেন,
—”তাহলে সোহা মাকে বলো এসে খেয়ে নিতে। মেয়েটা এখনো খায়নি।”
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
—”ও এখনো খায়নি?”
—”না। বললো ক্ষিদে পায় নি পরে খাবে।
রুদ্র বুঝলো হয়তো তার জন্যই অপেক্ষা করছিলো মেয়েটা।
রুদ্র এবার বলল,

—”ঠিক আছে। খাবারটা দিয়ে দাও । আমি রুমে নিয়ে যাচ্ছি।”
রুনিয়া মেহতাবের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
তিনি কিছু না বলে খাবার প্লেটে তুলে রুদ্রের হাতে দিয়ে দিলেন।
রুমে ঢুকে রুদ্র দেখল, সোহা বিছানার পাশে বসে বই পড়ছে।
রুদ্রও কোনো কথা না বলে খাবারের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
সোহা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল।তারপর আবার বইয়ের দিকে চোখ নামিয়ে নিল। মনে মনে ভাবল,
এত রাত করে এসে এখন আবার কী করছেন কে জানে!
প্রায় পাঁচ মিনিট পর রুদ্র ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল। খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে সোহার সামনে এসে বসল।
সোহা আড়চোখে একবার তাকিয়ে আবার বইয়ের দিকে মন দিল।
রুদ্র কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বইটা এক টানে নিয়ে নিল।
সোহা বিরক্ত হয়ে তাকাল।

—”কী সমস্যা? বই নিয়েছেন কেন?”
রুদ্র নির্বিকারভাবে বলল,
—”বই দিয়ে কী করছো?”
সোহা অবাক হয়ে বলল,
—”বই দিয়ে মানুষ কী করে?”
—”পড়ে।”
—”আমিও পড়ছি।”
রুদ্র বইটা উল্টে ধরে বলল,
—”উল্টো করে পড়ছো?”
সোহার মুখ থমকে গেল।
সে বইয়ের দিকে তাকিয়ে বুঝল সত্যিই এতক্ষণ সে বইটা উল্টো করে ধরে ছিল।
রুদ্রের ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
সোহা তাড়াতাড়ি বলল,

—”আপনি মিথ্যা বলছেন! আমি কখন উল্টো ধরলাম?”
—”হয়েছে। আর পড়তে হবে না। এদিকে এসো।”
—”কেন?”
—”খাইয়ে দিচ্ছি।”
সোহা একটু অবাক হয়ে তাকাল।
—”আপনি খাবেন না?”
—”আমি খেয়ে এসেছি।”
—”তাহলে আমার কাছে দিন। আমি খেতে পারব।”
রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
—”আমি কখন বললাম তুমি পারবে না?”
সোহা হাত বাড়িয়ে বলল,
—”তাহলে দিন।”
—”না।”
—”কিন্তু—”
রুদ্র খাবারের এক লোকমা হাতে নিয়ে বলল,

—”কোনো কথা না। চুপচাপ হা করো।”
সোহা কিছুক্ষণ রুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আস্তে করে মুখ খুলল।
রুদ্র শান্তভাবে তাকে খাইয়ে দিল।
প্রথম কয়েক লোকমা সোহা একটু অস্বস্তিতে থাকলেও ধীরে ধীরে তার অস্বস্তি কমে গেল। রুদ্রের আচরণে আজ অদ্ভুত একটা শান্ত ভাব ছিল।
একবার সোহা নিজে হাত বাড়িয়ে প্লেট নিতে চাইলে রুদ্র বলল,
—”আমি আছি তো।”
সোহা চুপ করে গেল। এই তিনটা শব্দ যেনো তাদের মাঝে থাকে অদৃশ্য দেয়ালটাকে ভেঙ্গে দিতে চাইলো।
রুদ্র একের পর এক লোকমা তুলে দিতে লাগল। মাঝে মাঝে সোহার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হচ্ছিল সে ঠিকমতো খাচ্ছে কি না।
শেষ লোকমাটা খাওয়ানোর পর রুদ্র গ্লাসটা এগিয়ে দিল।

—”পানি খাও।”
সোহা পানি খেয়ে গ্লাসটা পাশে রাখল। রুদ্রও প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নীরবতা। তারপর হঠাৎ রুদ্র সোহার দিকে এগিয়ে এসে তাকে সাবধানে কোলে তুলে নিল।
সোহা চমকে উঠল।
—”কি করছেন! অসভ্য লোক, নামান আমাকে!”
রুদ্র হালকা হেসে বলল,
—”এখনো তো কিছুই করিনি, তাতেই অসভ্য বলছো? তাহলে আমি যদি সত্যিই দুষ্টুমি করি, তখন কী বলবে?”
সোহা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।
রুদ্র তাকে ধীরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে পড়ল।
সোহা একটু সরে যেতে চাইলে রুদ্র ক্লান্ত গলায় বলল,

—”প্লিজ জান, নড়ো না। আজ ভীষণ ক্লান্ত। একটু ঘুমাতে চাই।”
সোহার মুখের বিরক্তি ধীরে ধীরে নরম হয়ে গেল।
সে কিছু বলল না।চুপচাপ রুদ্রের পাশেই শুয়ে রইল।
অদ্ভুতভাবে আজ তার নিজেরও রুদ্রের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে ইচ্ছে করল না। রুদ্র চোখ বন্ধ করে নিল।
আর সোহা কিছুক্ষণ চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে করে চোখ বন্ধ করল।
বাইরে তখন রাত আরও গভীর হচ্ছে।দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর সোহা রুদ্র কে ডাকলো,,

শুনছেন?
রুদ্র চোখ বন্ধ রেখেই গভীর স্বরে বললো___হুমম।
কাল একটু বাসায় দিয়ে আসবেন? অনেক দিন বাড়ির সবাইকে দেখি না।
ঠিক আছে সকালে দিয়ে আসবল, আর বিকালে গিয়ে নিয়ে আসবো।
এই না না আমি থাকবো কয়েক দিন।
রুদ্র এবার চোখ মেলে তাকালো সোহার দিকে। তাহলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্লিজ যাই, অনেক দিন যাই না।
তুমি চলে গেলে আমার কি হবে বউ। আমার যে তোমায় ছাড়া ঘুম আসেনা।
সোহা মুখ ফসকে বলে ফেলে__তাহলে আপনি রাতে চলে যাবেন আমার কাছে।
বলার পরপরঐ বুঝতে পারে কি বলেছে তাই আর কোনো কথা না বলে চুপকরে থাকে।
রুদ্র মুচকি হেসে সোহাকে আরো গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরে,, তার পর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে ; ঠিক আছে দিয়ে আসবো তার বদলে আমার ও কিছু চাই৷ কথা বলার সময় বার বার রুদ্রের ঠোঁট সোহার কানের লতিতে ছুঁয়ে দিচ্ছিলো।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২১

সোহা কেঁপে উঠলো। তারপর বললো কি_কি চাই আপনার।
সেটা কালকে বলবো,, এখন ঘুমাও জান। তার পর আলতো করে কপাল ছুঁয়ে দিলো।
রুদ্র মুখে বার বার জান শব্দ টা যেনো সোহার ভিতরে কিছু একটা নাড়িয়ে দিচ্ছিলো। মনে হচ্ছে তলপেটে হাজার হাজার প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here