প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪৩
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
মাঠের চারপাশে বিজয়ের উল্লাস। খান আর ইসলাম বাড়ির মেয়েরা হৈহৈ করছে। কারণ আজ ক্রিকেট ম্যাচে তাদের বাড়ির ছেলেরা জিতেছে । সবাই শুভ্র কে বাহবা দিচ্ছে। শুভ্র তাদের দেখে হাসছে। মূলত তার কারণেই জিতেছে তাদের টিম। শুভ্র হাসতে হাসতে হঠাৎ হাঁসি থামিয়ে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিতেই তাঁর ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেললো। সবাই এখানে কিন্তু লামিয়া কোথায়। আজ কী সে আসে নি? না না ক্রিকেট ম্যাচ থাকলে তো লামিয়া সবার আগে দৌড়ে আসে তাঁর শুভ্র ভাইয়ের খেলা দেখতে তাহলে আজকে কোথায় সে। ভেবেই শুভ্র হামিদার দিকে তাকিয়ে লামিয়া কোথায় জিগ্যেস করতে যাবে তাঁর আগেই পিছন থেকে ডাক শুনতে পেলো।
” তুবলো ভাই, তুবলো ভাই তুমি জিতেছো তুবলো ভাই। ” বলতে বলতে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে দৌড়ে আসছে পাঁচ বছরের লামিয়া।
ডাক শুনেই শুভ্র মুচকি হেঁসে পিছন ঘুরে লামিয়া কে তাকাতেই তাঁর মুখের হাসি উড়ে গেলো। কারণ লামিয়ার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সাকিব। লামিয়া বিরক্ত হয়ে অন্যদিক দিয়ে শুভ্রর দিকে যেতে চাইছে কিন্তু সাকিব তাঁকে যেতে দিচ্ছে না।
তা দেখে শুভ্রর ভীষণ রাগ হলো। তাই রেগে চেঁচিয়ে উঠলো ” সাকিব ওর সামনে থেকে সরে দাঁড়া, ওকে বিরক্ত করিস না। ওকে বিরক্ত করা আমার মোটেও পছন্দ না। তাই ভালোয় ভালোয় বলছি সরে দাঁড়া নয়তো খুব খারাপ হবে।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
শুভ্রর কথা শুনে সাকিব ঘাড় ঘুরিয়ে সয়তানি হাঁসি দিয়ে তাকালো শুভ্রর দিকে। সাকিব শুভ্রর চিরো শত্রু। একটু আগে সাকিব ও তাঁর দলকেই
হারিয়েছে শুভ্ররা। প্রতিবারই হেরে যায় তাঁরা শুভ্র আর শুভ্রের দলের কাছে। এতে সাকিব শুভ্রের ওপর এইবার অনেক ক্ষেপেছে। এতোক্ষণ সাকিব চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জ্বলতে জ্বলতে দেখছিলো তাদের আনন্দ উল্লাস। হঠাৎ লামিয়া কে দেখতে পেয়েই মনের মধ্যে সয়তানি বুদ্ধি এসে ভর করলো। কারণ এখানে সবাই জানে লামিয়া শুভ্রর জান। লামিয়া কে বিরক্ত করলে শুভ্র তা সহ্য করতে পারবে না। আর শুভ্র কে রাগানোর জন্যেই লামিয়া কে আটকেছে সাকিব।
শুভ্রর কথা শুনে খান আর ইসলাম বাড়ির ছেলে মেয়েরা হৈচৈ থামিয়ে সামনে তাকালো।
” সরে দালাও তাকিব ভাই। আমি তুবলো ভাইয়ের কাছে যাবো।” সাকিব কে সরতে না দেখে লামিয়া বেশ বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো।
সাকিব শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” তোকে তো আমি যেতে দিবো না তোর শুভ্র ভাইয়ের কাছে।”
” কেনু যেতে দিবা না সলে দালাও আমি যাবো। তুবলো ভাই কিতু বলো না। দেকো তাকিব ভাই যেতে দেয় না তোমাল কাছে।” বলেই বেশ অসহায় চোখে তাকালো শুভ্রর দিকে।
” সাকিব সরে দাঁড়া আর ওকে আমার কাছে আসতে দে। আমি শেষ বারের মতো বলছি। ”
দাঁতে দাঁত চেপে বললো শুভ্র।
” কী করবি তোর কাছে না যেতে দিলে?” রাগ দেখিয়ে বললো সাকিব।
” সাকিব রাগাস না আমাকে। ওর থেকে সরে দাঁড়া।”
” দাঁড়াবো না সরে! দরকার পরলে ওর সাথে ঘেঁষে দাঁড়াবো। কী করবি তুই?” বলেই লামিয়ার ছোট্ট ছোট্ট ঝুঁটি করা চুল গুলো টেনে দিলো।
সাকিব চুল টান দিতেই লামিয়া ব্যাথায় “আহ্” বলে উঠতেই শুভ্র রেগে দৌড়ে গিয়ে সাকিবের নাকে ঘুষি মেরে বসলো। সাফওয়ান, রাশেদ, লাবিব, আবির, জাহিদ সবাই দৌড়ে গিয়ে ফেরালো। নাকে ঘুষি পরতেই সাকিবের নাক থেকে রক্ত বেরিয়ে এলো।
রক্ত দেখে সাকিব আরো রেগে গেলো। লামিয়া ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সব। সাকিব পাশে তাকিয়ে দেখলো শুভ্র রাগে ফুঁসছে। আর তাকে রাশেদ ধরে রেখেছে। তা দেখে সাকিব দৌড়ে গিয়ে লামিয়া কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। কারণ এই মেয়ের চুল টানার কারণেই শুভ্র তাঁর নাক ফাটিয়ে দিয়েছে। তাই সে রেগে লামিয়া কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।
সাকিব লামিয়া কে ধাক্কা মারতেই লামিয়া তাল সামলাতে না পেরে ঠাস করে পড়ে গিয়ে কপালে ইটের টুকরো লেগে একটু খানি কেটে যেতেই গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এলো। রক্ত দেখে লামিয়া জোড়ে চিৎকার করে উঠলো।
হঠাৎ সাকিবের এমন কান্ড আর লামিয়ার রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে সবাই ভয় পেয়ে গেলো। কেউ ভাবতে পারে নি সাকিব লামিয়া কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে।
শুভ্র লামিয়া কে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে দৌড়ে লামিয়ার সামনে বসে কপালে হাত চেপে অস্থির কণ্ঠে বলে উঠলো
” আমার সোনা, এই সোনা পাখি উঠ। কী হয়েছে তোর? বেশি কষ্ট হচ্ছে তোর? এই সোনা চোখ বল আমাকে বেশি কষ্ট হচ্ছে । জান জান বেশি কষ্ট হচ্ছে? কথা বলছিস না কেনো এই সোনা পাখি। ”
হামিদা, রাশেদ, আরিফ, লামহা, সাফওয়ান, আবির, হাফসা, ফারিয়া, ছবি, তায়েব, লাবিব, তায়েবা, মাহির ফাহিম শারমিন সবাই লামিয়া কে ডাকছে কিন্তু লামিয়ার কোনো সারা শব্দ নেই। দেখে হামিদা কেঁদে উঠলো।
শুভ্রর চোখ বেয়ে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে।
সাকিব ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ মাহির চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো। পাশ থেকে ক্রিকেট ব্যাট হাতে তুলে দৌড়ে সাকিবের পায়ে বারি বসিয়ে দিলো। সাকিব ব্যাথায় চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়তেই তায়েব দৌড়ে দিয়ে সাকিব কে ইচ্ছে মতো মারতে লাগলো। সাকিব তাদের বড় হওয়ায় মারতে বেশ কষ্ট হলেও কষ্ট হচ্ছে তাদের। কিন্তু আজকে এই ছেলে কে মেরেই শান্ত হবে তাঁরা দুজন। তাঁদের বোনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার সাধ আজ মিটিয়ে দিবে।
শুভ্র তা দেখে চোখ মুখ শক্ত করে চোখ মুছে হামিদার কাছে লামিয়া কে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সাকিব কে ইচ্ছে মতো পেটাতে লাগলো।
রাশেদ, সাফওয়ান, আরিফ, আবির, জাহিদ, লাবিব ও দৌড়ে গিয়ে শুভ্র কে না ছাড়িয়ে ইচ্ছে মতো মারলো সাকিব কে। সাকিব মার খেয়ে কেঁদে ওঠে বললো ” আমি ইচ্ছে করে করে নি। আমি একটু ধাক্কা দিয়েছি কিন্তু ওর কপাল যে কেটে যাবে তা জানতাম না। মাফ করে দে তোরা আমাকে।”
কথা শুনে সবাই থেমে গেলেও শুভ্র থামলো না। শুভ্র মারতেই আছে সাকিব কে।
ছবি বাড়িতে গিয়ে সবাইকে জানাতেই বাড়ির সবাই দৌড়ে এলো। লতিফা বেগম মেয়েকে দেখে কেঁদে উঠলো। হামিদ সাহেব লামিয়া কে কেলে তুলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলো দ্রুত। সেই সাথে বাড়ির সবাই।
শুভ্রা শুভ্র কে সাকিবের থেকে সরিয়ে নিয়ে শুভ্রর হাত ধরে সবার সাথে চলে গেলো হাসপাতালে।
ডক্টর লামিয়ার কপাল ড্রেসিং করে দিয়ে বললো ” ভয়ের কিছু নেই। একটুখানি কেটে গিয়েছে আর রক্ত দেখে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। একটু পরেই জ্ঞান ফিরবে। চিন্তা করবেন না।” বলেই ডক্টর চলে গেলো।
” মা, মা ওর কিছু হবে না তো মা। ওও চোখ খুলছে না কেনো?” মায়ের কোলে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে কেঁদে বললো শুভ্র।
” কিছু হবে না বাবা। ওও ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে বাবা কান্না করো না। একটু পর দেখবে চোখ খুলবে। ” শুভ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো শুভ্রা।
মায়ের কথায় শুভ্র কান্না থামালেও মন শান্ত করতে পারছে না। মন তাঁর অস্থির হয়ে আছে। যতোক্ষণ পর্যন্ত লামিয়ার জ্ঞান না ফিরবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে স্থির থাকতে পারবে না সে।
লতিফা বেগম এর কোলে লামিয়া গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। শুভ্র ছলছল চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে। পাজি টা তাঁকে কাঁদিয়ে দেখো কীভাবে ঘুমিয়ে আছে মায়ের কোলে। আর ওই সাকিব কে আমি ছাড়বো না। ভেবেই চোখ মুখ শক্ত করে ফেললো শুভ্র।
কিছুক্ষণ পর লামিয়া কে নিয়ে সবাই বাড়িতে ফিরলো। লামিয়ার এখনো ঘুম ভাঙে নি। এই নিয়ে শুভ্র আরো অস্থির হয়ে উঠেছে। সে ভীষণ ছটফট করছে। তা দেখে লতিফা বেগম লামিয়া কে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে শুভ্র কে নিজের কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে বেশ নরম সুরে বললো
” এমন ছটফট করছিস কেনো আব্বা?”
” জানি না! ভালো লাগছে না আমার।”
” কেনো লাগছে না?”
” জানি না মামনি! কিন্তু আমার না বুকে অনেক কষ্ট হচ্ছে কেনো জানি। তোমার মেয়ের কিছু হলে আমার ভালো লাগে না।”
লতিফা বেগম না চাইতেও ফিক করে হেসে উঠলো। শুভ্র তা দেখে মুখ ফুলিয়ে বললো ” ওইখানে তোমার মেয়ে পড়ে আছে আর তুমি হাসছো মামনি?”
” না না কোথায় হাসছি বাপ। একদম হাঁসি নি আমি।” বলেই হাসতে হাসতে মুখ চেপে ধরলো।
বাহিরের থেকে হামিদ সাহেব লতিফা বেগম কে ডাক দিতেই লতিফা বেগম শুভ্রর দিকে তাকিয়ে হেঁসে বললো ” আব্বা আপনার বউ কে একটু দেখে রাখেন আমি এখন ই আসছি। ” বলেই বেরিয়ে গেলো।
লতিফা বেগম বেরিয়ে যেতেই শুভ্র বিছানায় উঠে লামিয়ার পাশে বসে লামিয়ার কপালে হাত রাখতেই লামিয়া পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালো। লামিয়া চোখ খুলেছে দেখে শুভ্র যেনো প্রাণ ফিরে পেলো। শুভ্রর চুপসে যাওয়া মুখে হাসি ফুটলো।
লামিয়া চোখ খুলতেই শুভ্র কে দেখে ঝটপট শোয়া থেকে উঠে বসে দাঁত কেলিয়ে হেঁসে বললো ” তুবলো ভাই ।”
লামিয়ার কথা শুনে হেঁসে উঠলো। তারপর গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বললো ” সোনা তোর কী কপালে বেশি ব্যাথা করছে?”
লামিয়া হাঁসি মুখে মাথা ডানে বামে নাড়ালো। তা দেখে শুভ্র হেঁসে লামিয়ার কপালে চুমু খেয়ে বললো ” হুমমম, ব্যাথা হবে কেনো? তুই তো আমার স্ট্রোং সোনা ।”
” ইসটং মানে কী তুবলো ভাই?”
” ওইটা স্ট্রোং হবে, ইসটং না সোনা। আর স্ট্রোং মানে হলো শক্ত, শক্তিশালী , মজবুত । আর আমার সোনা তো অনেক শক্তিশালী তাই না?”
” হুম হুম তুবলো ভাই আমি অনেক ইসটং।”
শুভ্র হেঁসে বললো ” ওইটা স্ট্রোং হবে।”
” ইসটং।”
” স্ট্রোং।”
” ইসটং।”
শুভ্র ঠোঁট চেপে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকা হাসলো। এই মেয়েকে এখনো পর্যন্ত তাঁর নিজের নাম ই ঠিক ভাবে শেখাতে পারলো না আর এই স্ট্রোং শেখানোটা তো বিলাসিতা। ভেবেই শুভ্র ভিতরে ভিতরে দুঃখ প্রকাশ করলো। লামিয়া শুভ্র কে এটা ওটা বলে খিলখিল করে হাসছে। শুভ্র এক গালে হাত রেখে লামিয়ার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে তাঁর সব কথা শুনেছে।
” শু….শুভ্র ভাই।” অবিশ্বাস্য চোখে সামনে তাকিয়ে বেশ কাঁপা কাঁপা গলায় ডেকে উঠলো লামিয়া।
শুভ্র মাথা নিচু করে বসে ছিলো। লামিয়ার ডাক শুনে শুভ্র চট করে মাথা তুলে তাকালো, তারপর আবার দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো। আজ যে সে তাঁর প্রেয়সীর কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে তা শুভ্র বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।
লামিয়ার চোখ জ্বলছে, গলা কাঁপছে। মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না তাঁর। তবুও আবার কাঁপা কাঁপা গলায় বেশ কষ্টে বলে উঠলো ” চুপ করে থাকবেন না শুভ্র ভাই এটা আপনি তাই না।”
শুভ্র ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো সে জানে সে ধরা পরে গিয়েছে তবুও নিজেকে সামলে জোড় করে ঠোঁট টেনে হেঁসে বললো
” কে শুভ্র মিস? আপনি কা……”
ঠাসসস,,,,, পুরো রুম কাঁপিয়ে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলো লামিয়া শুভ্রর গালে। শুভ্রর গালে থাপ্পড় পড়তেই শুভ্র হালকা হেঁসে লামিয়ার দিকে তাকাতেই দেখলো লামিয়া অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে রাগে। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হালকা সোনালী রঙের চোখের মনি গুলোকে আগুনের ফুলকির মতো মনে হচ্ছে। চোখ মুখ কঠিন হয়ে উঠেছে তাঁর।
লামিয়া এগিয়ে গিয়ে শুভ্রর গলা চেপে ধরলো। বেশ শক্ত করে গলা চেপে ধরায়, লামিয়ার হাতের নখ গুলো শুভ্রর গলায় বিঁধে গেলো। শুভ্র তবুও চুপচাপ তাকিয়ে আছে লামিয়ার চোখের দিকে। শুভ্রর কেনো যেনো হাঁসি পাচ্ছে লামিয়া কে দেখে। তবুও নিজের হাঁসি আটকে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। লামিয়া শুভ্রর গলা চেপে ধরে রেগে চেঁচিয়ে বললো
” বেইমান, কী ভেবেছিস তুই আমাকে হ্যাঁ চিনবো না তোকে আমি হ্যাঁ? আমাকে কী তোর বলদ মনে হয়?
আর কতো কষ্ট দিবি আমাকে? সন্দেহ তো সেই প্রথম দেখাতেই হয়েছিলো কিন্তু আজকে আমি একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট তুই শুভ্র তাই না?”
শুভ্র চুপ করে তাকিয়ে আছে কোনো কথা না বলে। শুভ্রর নিরবতা দেখে লামিয়ার রাগ আরো বেড়ে গেলো। শুভ্রর গলা ছেড়ে রেগে শুভ্রর আরেক গালে ঠাঁটিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে শুভ্রর গাল চেপে ধরলো। তারপর রাগে হিসহিসিয়ে বললো ” স্বার্থপর লোক কথা বলছিস না কেনো উত্তর দে, দে উত্তর। বোবা হয়ে গিয়েছিস ? কথা বলতে পারিস না জবান খোল। এতো বছর কোথায় ছিলিস তুই? বল আমাকে। কেনো এতো গুলো বছর আমার থেকে দূরে থেকেছিস? আমাকে কেনো এতো কষ্ট দিয়েছিস? এতো গুলো দিন কেনো বড় ভাইয়ের বন্ধুর পরিচয় দিয়ে এসেছিস আমাকে বল। চুপ করে থাকবি না বেইমান, স্বার্থপর। এতো গুলো বছর পর তুই ফিরে আসায় আমি খুশি হবো নাকি তোর দেওয়া কষ্ট তোকে ফিরিয়ে দিবো? জবাব দে আমাকে?”
শেষের কথা টুকু বলতেই লামিয়ার গলা ভেঙে এলো। লামিয়ার পুরো শরীর কাঁপছে। চোখ বেঁয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। গলা শুকিয়ে আসছে। ভিতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে তাঁর। শুভ্রর নিরবতা লামিয়া মানতে পারছে না।
শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। লামিয়ার চোখ থেকে ঝড় ঝড় করে পানি পড়ছে। হালকা গোলাপী ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। শুভ্র কে নিরব দেখে লামিয়া আরো জোড়ে শুভ্রর গাল চেপে ধরে রাগে হিসহিসিয়ে বললো ” কথা বল আমার সাথে আমি আজকে সব জানতে চাই, সব সব সব জানতে চাই। কেনো ছেঁড়ে চলে গিয়েছিলি আমাকে রেখে? কেনো মিথ্যে বলেছিস তুই মরে গিয়েছিস?”
বলেই থামলো লামিয়া। বেশ হাঁপিয়ে উঠেছে সে। বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে লামিয়া। কিছু একটা ভেবেই লামিয়ার বুক ভার হয়ে উঠলো। শুকনো ঢোক গিলে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো ” তাঁর মানে ছবি আর তুই এক সাথেই ছিলি এতো গুলো বছর তাই না?”
শুভ্র চুপ কোনো কথা নেই তাঁর মুখে। লামিয়া তা দেখে তাছিল্য হাসলো। তাঁর যা বোঝার বোঝা হয়ে গিয়েছে।
বুকের ভিতরে অনেক যন্ত্রণা হচ্ছে তাঁর। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লামিয়া শুভ্রর গাল ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়ে শুভ্রর থেকে সরে আসতেই শুভ্র লামিয়ার কোমড় চেপে ফ্লোরে শুয়ে দিয়ে লামিয়ার উপর উঠে শুভ্রর সমস্ত শরীরের ভার ছেড়ে দিলো।
” ছাড় আমাকে স্পর্শ করবি না আমাকে। তোর স্পর্শ আমার ঘৃণা লাগছে। ঘৃণা করি তোকে ছাড় আমাকে। ” ভাঙা গলায় ছটফট করতে করতে বলে উঠলো লামিয়া।
শুভ্র তবুও কিছু বলছে না। চুপচাপ তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
” ছাড় আমাকে নয়তো কসম খারাপ হয়ে যাবে ছাড় আমাকে। এতো গুলো বছর ওই ছবির সাথে থেকেছিস তুই, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এক সাথে থেকেছিস তোরা। ঘৃণা করি তোদের। ঘৃণা করি, ঘৃণা করি তোর স্পর্শ কে । যে হাত দিয়ে ছবি কে স্প……”
আর বলতে পারলো না শুভ্র লামিয়ার ঠোঁট চেপে ধরলো। লামিয়া শুভ্রর বুকে ধাক্কা কিল ঘুষি মারছে তবুও ছাড়ছে না শুভ্র।
লামিয়া ছটফট করতে লাগলো। তবুও শুভ্রর কোনো হেলদোল নেই। সে দিব্যি নিজের তৃষ্ণা মেটাতে ব্যাস্ত।
প্রায় এক মিনিট পর লামিয়া কে ছেড়ে দিলো। লামিয়া শুভ্র কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে রাগি দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্র তা দেখে মুচকি হাসলো। লামিয়া শুভ্রর হাঁসি দেখে এগিয়ে গিয়ে শুভ্র কে আরো একটা থাপ্পড় মারতেই শুভ্র রুম কাঁপিয়ে লামিয়ার গালে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। লামিয়া গালে হাত দিয়ে শক্ত চোখে তাকালো শুভ্রর দিকে। হঠাৎ শুভ্র লামিয়ার গলা চেপে দেয়ালে ঠেসে ধরলো। শুভ্রর চোখ লাল টুকটুকে হয়ে আছে। লামিয়া চোখ বন্ধ করে গলা থেকে শুভ্রর হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। শুভ্র তা দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে গলা ছেড়ে দিলো। গলা ছাড়তেই লামিয়া চোখ খুলে শুভ্রর দিকে তাকালো। কেনো যেনো ঘৃণা লাগছে এই মুখটা দেখে। শুভ্র লামিয়ার গাল স্পর্শ করতেই লামিয়া ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো ” বলছি না স্পর্শ করবি না আমাকে। ঘৃণা করি তোর স্পর্শ কে। বুঝতে পেরেছিস?”
শুভ্র তা শুনে পিছিয়ে গেলো। লামিয়া কান্না ভেজা চোখে তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্র আরো লামিয়ার থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দাঁড়ালো। তারপর মলিন হেঁসে বললো
” এতো ঘৃণা করিস আমাকে? এতো ঘৃণা আমার উপর? এতো ঘৃণা। তুই এতোটা নিষ্ঠুর হয়ে গেলি? ”
” হ্যাঁ হ্যাঁ ঘৃণা করি তোকে। তুই একটা মিথ্যাবাদী লোক, একটা বেইমান, স্বার্থপর লোক। দিনের পর দিন মিথ্যা বলে এসেছিস তুই আমার কাছে। এতো বছর পর এসে নাটক করছিস আমার সাথে , নাটক? এই তুই কি জানিস এতো গুলো বছর আমি কীভাবে থেকেছি? তুই কি জানিস তোর সাথে কথা বলতে না পারার দুঃখ কতো খানি? তোর অভাবে আমার ভিতরে কেমন যন্ত্রণা হয় এটা কি তুই জানিস? তুই কি জানিস তোর সাথে একটু কথা বলার জন্য কেমন ছটফট করেছি? কথার পিপাসা পানির পিপাসার থেকেও তীব্র এটা কি জানিস তুই? ”
বলেই লামিয়া কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো ফ্লোরে। তা দেখে শুভ্র এগিয়ে এসে লামিয়া কে ধরতে চাইলো কিন্তু লামিয়া থামিয়ে দিলো। তারপর নিজেকে সামলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো
” এই পৃথিবীতে সব চেয়ে অসহায় অনুভূতি আমার তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু তোমাকে দেখতে পারছি না। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তোমার কাঁধে মাথা রেখে কান্না করতে করতে মনের সব কষ্টের কথা তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু পারছি না।
জানো শুভ্র ভাই আমি যখন পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেতাম তখন আমি আশেপাশে তাকিয়ে তোমাকে খুঁজতাম এই বুঝি আমার শুভ্র ভাই এখন ই এসে আমাকে তুলে উঠাবে সেই আশা নিয়ে তাকাতাম কিন্তু পেতাম না তোমাকে। জানো একবার হোস্টেলে থাকা কালীন আমাকে অনেক ছেলে মেয়ে ধরে মেরেছিলো । আমি তোমাকে খুঁজেছি কিন্তু পাই নি। সেদিন অনেক অসহায় লেগেছিলো নিজেকে। তুমি চলে যাবার পর আমাকে সেফ করার জন্য কেউ ছিলো না। আমার ছায়া ছিলো না আমার সাথে। তুমি তো জানোই আমি ভীষণ ভীতু ছিলাম কাউকে তেমন কিছু বলতে পারতাম না।
মন ভীষণ নরম ছিলো। আমি এতো কঠিন হতে চাই নি শুভ্র ভাই। আমি তো এমন ছিলাম না শুভ্র ভাই। কিন্তু সেদিন সবার মার খাওয়ার পর রাতের বেলা তোমার আর ওই মেয়ের এক সাথে যেই ছবি গুলো দেখেছিলাম তাঁর উপর তুমি ও সেদিন বলেছিলে তুমি সেই মেয়েটা কে ভালোবাসো আর বিয়েও করবে সে রাতে আমি কীভাবে ছিলাম একমাত্র আমি জানি। তুমি সে সব কথা বলে তো আমার সাথে যোগাযোগ ই বন্ধ করে দিয়েছিলে। তুমি কীভাবে জানবে বুঝবে আমার কষ্ট?
যে বুকে তোমাকে আগলে রেখেছিলাম তুমি সেই বুকেই ছুরি টা মেরেছো শুভ্র ভাই। একটা বার ভাবলে না আমার কি হবে। এই মেয়ে শুভ্র ছাড়া অচল একদম অচল, শুভ্র না থাকলে এই মেয়ে কীভাবে থাকবে এই চিন্তা এক বারো করো নি তুমি। সবচেয়ে বড় কষ্ট টা আমার এখানেই লেগেছে শুভ্র ভাই। তোমার দেওয়া এই কষ্ট টা আমার ছোট্ট মন তখন মানতে পারে নি। নিজের ভালোবাসার মানুষের পাশে অন্য কাউকে দেখে বুকের ভিতরে কেমন যন্ত্রণা হয়েছে তা তোমাকে কীভাবে বোঝাই। আমি যন্ত্রণা মেনে নিতে পারি নি তাই নিজেকে পরিবর্তন করতে শুরু করলাম। এরপর হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে তোমাকে আর খুঁজতাম না,নিজেই উঠে দাঁড়াতাম । কষ্ট পেলে তোমার কাঁধ আর খুঁজতাম না, তোমাকে দেখার ইচ্ছে হলে ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, তোমার সাথে কথা বলার জন্য মন ছটফট করলে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিতাম।
কেউ আমাকে একটা মারলে দুটো দিয়ে আসতাম। পরিবর্তন হয়ে গেলাম।”
বলে থামলো লামিয়া। বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে লামিয়া। শুভ্র বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লামিয়া ঢোঁক গিলে আবার বলতে শুরু করলো ” আর রইলো নিষ্ঠুর এর কথা। আমি নিষ্ঠুর তাই না?? ঠিক আছে আপনার কথাই ধরে নিলাম। তবে আমি এমন নিষ্ঠুর ছিলাম না।
ওই যে কথায় আছে না, প্রত্যেকটা মেয়ে নিষ্ঠুর হওয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। তবে সময়ের ব্যবধানে সে কতটা নিষ্ঠুর হয় সেটা কেবল তার অতীতের উপর নির্ভরশীল।
আমি ও আমার অতীত আর আমার প্রিয় মানুষটির জন্য আজ এমন নিষ্ঠুর হয়ে গিয়েছি। ”
বেশ কাঁপা কাঁপা গলায় বলে থামলো লামিয়া। শুভ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া কে সেদিন রাগের মাথায় ওইসব কথা বলে দিয়েছিলো। আর রাগ করে ফোন বন্ধ করে দিয়েছিলো। কিন্তু যখন রাগ কমেছে তখন ফোন করার মতো পরিস্থিতি ছিলো না।
শুভ্র মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বললো ” জানি আমি তোকে কষ্ট দিয়েছি। তোর ছোট্ট মনটা কে বিষিয়ে দিয়েছি। তাঁর জন্য আমাকে যে শাস্তি দিবি আমি মাথা পেতে নিবো কিন্তু তুই ব্যাতীত অন্য কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না ছিলো, না আছে আর না কোনোদিন থাকবে। আমি সেদিন রাগের মাথায় বলেছিলাম ওই মেয়েকে আমি ভালোবাসি বিশ্বাস কর তুই ছাড়া এই শুভ্রর হৃদয়ে আজ পর্যন্ত কোনো নারীর জায়গা হয়নি আর হবেও না।”
শুভ্রর কথায় লামিয়া উঠে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্য হাসলো। শুভ্র তা দেখে ধীর পায়ে এগিয়ে লামিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। লামিয়া এক পা পিছিয়ে যেতেই শুভ্র লামিয়ার কাঁধে মাথা রেখে ভাঙা গলায় বললো ” তোকে বিশ্বাস করানোর মতো আমার হাতে কোনো প্রমাণ নেই যে ভ্রমর , তবে তুই আমাকে যা শাস্তি দিবি আমি তা মাথা পেতে নিবো। কিন্তু আমাকে রেখে তুই ও চলে যাস না ভ্রমর তাহলে এই দুনিয়ায় আমার বেঁচে থাকা কষ্টের হয়ে যাবে। তুই শুধু তোর কষ্ট টা দেখলি কিন্তু আমি যে আমার সুন্দর একটা পরিবার হারিয়ে তোকে হারিয়ে কীভাবে দিন কাটিয়েছি তা দেখলি না ভ্রমর। কতোদিন খালি পেটে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, রাস্তায় রাত কাটিয়েছি, কতো বড় বিপদ আপদ থেকে বেঁচে ফিরেছি সেটা শুধু আমি জানি। তুই যেমন আমাকে দেখের জন্য ছটফট করতি আমিও তোকে দেখার জন্য ছটফট করতাম। তোকে না দেখতে পেয়ে আমার বুকের মধ্যে কেমন যে যন্ত্রণা হতো রে ভ্রমর যদি তোকে দেখাতে পারতাম তাহলে তুই আজ এই অভিযোগ করতে পারতি না। তবে আমাকে মাফ করে দে ভ্রমর আমাকে মাফ করে দে। যাস না আমাকে রেখে আমি এতিম ছেলে তুই ছাড়া দুনিয়াতে আমার আর কেউ নেই এখন যদি তুই ও চলে যাস তাহলে আমি কীভাবে বাঁচবো?”
বলেই নিরবে কেঁদে উঠলো শুভ্র। লামিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে হয়তো ভেবেছিলো শুভ্র যেহেতু বেঁচে আছে তাহলে তাঁর শুভ্রা মা আর বাবাই ও বেঁচে আছে কিন্তু শুভ্রর কথা শুনে লামিয়া পাথর হয়ে গেলো।
শুভ্র লামিয়ার গলায় মুখ গুঁজে নিরবে কান্না করছে। লামিয়া পিছন থেকে শুভ্র কে ধরলো না, আর না শান্তনা দিলো। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া।
শুভ্রর নিরব কান্না থেমে গেলো। হঠাৎ শুভ্রর হাত পা ছেড়ে দিলো। নিচে পড়ে যেতে নিলেই লামিয়া শক্ত করে শুভ্র কে আঁকড়ে ধরলো। কিন্তু শুভ্রর শরীর ভারি হওয়ায় লামিয়া তাল সামলাতে না পেরে লামিয়া শুভ্র কে নিয়ে বিছানায় পড়ে গেলো। লামিয়া তাড়াতাড়ি করে শুভ্রর মাথার নিচে হাত রাখলো, যদি হাত না রাখতো তাহলে এখন ই খাটের কোনায় বারি খেয়ে মাথা ফেটে যেতো। লামিয়া বিছানা থেকে উঠে শুভ্রর মাথার নিচ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে শুভ্রর পা তুলে দিলো বিছানায়। লামিয়া জামার হাতায় চোখ মুছে বিছানায় বসে শুভ্রর মাথার নিচে বালিশ দিয়ে দিলো।
চোখ বুলালো পুরো মুখে। এতো বছর পর প্রিয় মানুষটাকে দেখে লামিয়া প্রথমে শক ছিলো, তার উপর যাকে এতো গুলো বছর মৃত ভেবে এসেছে তাঁকে সামনাসামনি দেখে লামিয়া অনেকটা আশ্চর্য হয়েছিলো। তবে শুভ্র কে প্রথম দেখায় আর তাঁর চাল চলন দেখে কেমন জানি খটকা লেগেছিলো লামিয়ার। আবার ছবি বেঁচে আছে এতো বছর পর ছবি কে দেখেছে।
এসব নিয়ে লামিয়ার মনে বারবার অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো কিন্তু কাউকে কিছু বলে নি।
তাঁর উপর সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলো লোকটার বুকের পুড়ে যাওয়া ক্ষতের দাগ দেখে। একদিন খেলতে খেলতে শুভ্র আগুনে পড়ে গিয়ে তাঁর শরীরের আগুন লেগে গিয়েছিলো। ভাগ্য ভালো ছিলো সেদিন পাশেই পুকুর ছিলো। গাঁয়ে আগুন লাগতেই শুভ্র দ্রুত পুকুরে লাফ দিয়েছিলো। বেশি কোনো ক্ষতি না হলেও বুকটা সেদিন ঝলসে গিয়েছিলো। ভেবেই লামিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে তাকালো শুভ্রর দিকে। অবশেষে তাঁর প্রিয় মানুষ তাঁর সামনে শুয়ে আছে। তবে এই লোকটা কে সে এমনে এমনে ছেঁড়ে দিবে না। শাস্তি দিবে এই লোক কে তবে তাঁর আগে সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে। আর এই সবকিছুর প্রশ্ন কেবল একজনই জানে। ভেবেই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
তারপর আলমারি থেকে একটা কালো রঙের টিশার্ট বের করে গাঁয়ে জড়িয়ে দিলো। পরনে এখনো কোমড়ে টাওয়াল। দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। টিশার্ট তো পরিয়ে দিলো কিন্তু প্যান্ট কীভাবে পড়াবে? ভেবেই বিরক্ত লাগলো।
কিছু একটা ভেবে আলমারি থেকে একটা ট্রাউজার এনে দাঁড়ালো । তারপর টেবিল থেকে শুভ্রর ফোন হাতে নিয়ে ফোনের ক্যামেরা অন করে দিয়ে এক সাইডে ফোন রেখে চোখ বন্ধ করে শুভ্র কে ট্রাউজার পড়িয়ে দিয়ে গাঁয়ের উপর কমফোর্ট টেনে দিয়ে ক্যামেরা অফ করে ফোন আগের জায়গায় রেখে দিলো।
পাশে তাকিয়ে দেখলো জ্যাকি ঘুমিয়ে আছে। এতোক্ষণ চিল্লাচিল্লিতে কোথায় গিয়েছিলো কে জানে। এখন আবার এসে দিব্যি ঘুমাচ্ছে। বাড়িতে ব্ল্যাকি কী করছে আল্লাহ্ জানে খাবার খেয়েছে কি না তাও তো জানে না সে। ভেবেই বেশ চিন্তিত হলো। তারপর সামনে তাকিয়ে শুভ্রর দিকে তাকালো। কান্নার কারণে ফর্সা মুখ খানা লাল হয়ে উঠেছে।
লামিয়া হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো শুভ্র মুখ খানি। তারপর গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে কপালে গভীর চুম্বন একে দিলো। তারপর হাত তুলে মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো তাঁর কাছে তাঁর প্রিয় মানুষটিকে তাঁর কাছে সুস্থ ভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। হাজার হলেও ভালোবাসে সে এই মানুষটাকে। লামিয়া শুভ্রর দিকে তাকিয়ে মলিন হাসলো। দু গালে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললো
” চিন্তা করো না তোমার সঙ্গ না পেলে গতির সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবো। তবুও অন্য কারোর সঙ্গে নিজেকে জড়াবো না।” একটু থেমে হালকা হেসে বললো ” তুবলো ভাই।” বলেই আবারো কপাল গভীর চুমু খেয়ে উঠে জানালায় গিয়ে দাঁড়ালো। জানালার গ্রিলে হাত রেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে গুন গুন করে প্রিয় গান গেয়ে উঠলো
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৪২
~ আমি তোমারো বিরহে রহিব বিলীন,
তোমাতে করিবো বাস,
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষো মাস।।।
যদি আরো কারে ভালোবাসো,
যদি আর ফিরে নাহি আসো।
তবে তুমি যাহা চাও,
তাই যেনো পাও, আমি যতো দুঃখ পাই গো
আমারো পরানো যাহা চায়।।
