Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৩
সাইদা মুন

—এতক্ষণে চলে আসার কথা…
তালহার কথাটা শেষ হতে না হতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাইরে থেকে দারোয়ানের উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
—বড় সাহেব! বড় সাহেব! বাড়িতে পুলিশ আইছে!
কথাটা যেন পুরো বাড়িজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। জাবেদের মুখের রঙ বদলে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের সমস্ত রক্ত যেন শুকিয়ে গেল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। অন্যদিকে তালহার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল মৃদু হাসি। সে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

—এসে গেছে তবে।
তারপর বিল্লাল সাহেব বলল,
—ওনাদের ভেতরে আসতে দাও।
কথাটা শুনে জাবেদ প্রায় লাফিয়ে উঠল,
—প…পুলিশ ভেতরে কেন আসবে।
মেহরীনের চাচা-চাচিও একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। শুকনো ঢুক গিলছেন বারংবার। পরিস্থিতি যে তাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে তাদের আর বাকি রইল না। তড়িঘড়ি করে দরজার দিকে এগোতে যেতেই তাহিয়া আর মেহেদি সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল। তাহিয়া দুই হাত গুটিয়ে বলল,
—কী হলো, চাচা-চাচি? এখন কোথায় যাচ্ছেন?
মেহেদিও ঠোঁট বাঁকিয়ে যোগ করল,
—পালাবেন নাকি?
দুজনের কথা শুনে চাচি প্রায় কেঁদে ফেলার মতো করে বললেন,

—আমরা আইতে চাইনি। জাবেদই টাকার লোভ দেখাইয়া আমাদের নিয়া আইছে। এসবের লগে আমাদের কোনো হাত নাই। আমরা কিছু করিও নাই খালি ওর লগে আইছি। যাইতে দাও, পথ ছাড়ো।
কথাটা শুনেই জাবেদ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল,
—ওহ! এখন সব দোষ আমার?
সে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলল,
—আপনারাই তো টাকার লোভে এত দূর ছুটে আইছেন। এখন যেই না পুলিশর নাম শুনেছেন সব আমার ঘাড়ে চাপাইতাছেন?
চাচিও আর চুপ রইলেন না পাল্টা বলল,
—তুই-ই তো কইছিলি সব ব্যবস্থা করা আছে!
—আমি একা করছি? আপনারা কি জানতেন না?
—মিথ্যা কথা কইস না। তুই সব নষ্টের মূল।

মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয়ে গেল তুমুল বাকবিতণ্ডা। একে অপরের ভেতরকার কথা ফাঁস করতে লাগল। এ দোষ দিচ্ছে ও কে। নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টায় কোনো কমতি রাখছে না কেউ। বাড়ির বাকিরা নির্বাক হয়ে শুধু সেই দৃশ্য দেখছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে না, তারাই যেন তাদের কৃতকর্ম ফাঁস করছে সকলের কাছে। ঠিক তখনই দরজার বাইরে অনেকগুলো বুটের শব্দ ভেসে এলো। একদল পুলিশ ঘরে প্রবেশ করতেই মুহূর্তের মধ্যে সব কণ্ঠ থেমে গেল। যারা কয়েক সেকেন্ড আগেও চিৎকার করছিল, তারা এখন থমথমে ভীত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দলের নেতৃত্বে থাকা অফিসার ভেতরে ঢুকতেই তালহা এগিয়ে গেল। দুজন একে অপরকে দেখেই পরিচিত হাসি বিনিময় করল। অফিসার হাত বাড়িয়ে দিলেন,

—কী ব্যাপার, তালহা সাহেব? হঠাৎ বাড়িতে ডাকলেন যে!
তালহা হ্যান্ডশেক করে বলল,
—আসুন, আগে বসুন।
দুজন সোফায় গিয়ে বসল। তারপর তালহা মুঁচকি হেসে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের দিকে ইশারা করে বলল,
—আসলে এনারা আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়। তাদের একটু খাতিরদারির প্রয়োজন আছে।
অফিসার বিস্মিত হয়ে বললেন,
—তাই নাকি? তাহলে শুনছি শেষমেশ বিয়েটা করেই ফেলেছেন।
তালহার মুখে শান্ত হাসি ফুটে উঠল,
—জি।
একবার মেহরীনের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
—শুভ কাজে দেরি কি।
—তা যা বলেছেন।
তালহা হালকা মাথা নেড়ে বলল,

—তো ঘটনা হচ্ছে, এদের নামে মানহানি, ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা, চাঁদাবাজির চেষ্টা, পরিচয় বিকৃতি, এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি তৈরি ও প্রচার, প্রতারণা, নারীকে মানসিকভাবে হয়রানি, নির্যাতনের চেষ্টা, যতগুলো প্রযোজ্য অভিযোগ আছে, সবকটির ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিন। আমি চাই, তাদের শাস্তি দেখে এই দেশের আর কেউ যেন ভবিষ্যতে আর কোনো মেয়ের জীবন নিয়ে এমন নোংরা খেলা খেলার সাহস না পায়।
তালহার কথা শুনে অফিসার খানিকটা নড়ে বসলেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—একটু আগে তো বললেন, এরা আপনার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়। তাহলে মামলা?
তালহা শান্ত স্বরেই উত্তর দিল,
—আমার শ্বশুর-শাশুড়ি কেউই বেঁচে নেই। এরা আমার স্ত্রীর চাচা-চাচি।
একবার জাবেদের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
—বাড়িতে এসে আমার স্ত্রীকে এবং আমার পরিবারকে হ্যনস্তা করেছে। এআই দিয়ে ছবি বিকৃত করে আমার স্ত্রীর নামে মিথ্যা অপবাদ ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। বাইরে এসব মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেছে। বারবার আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেছে এবং অকথ্য ভাষায় মানসিক নির্যাতন করেছে।
জাবেদ আর চুপ থাকতে পারল না। চিৎকার করে উঠল,

—মিথ্যা! সব মিথ্যা! আমরা কিছুই করি নাই।
তালহা শুধু মেহেদির দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। মেহেদি এগিয়ে এসে ছবিগুলো অফিসারের হাতে দিল,
—স্যার, এগুলো দেখুন।
ছবিগুলো হাতে নিয়ে অফিসার মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন। তালহা এবার নিজের মোবাইল বের করল,
—আর এটা শুনুন।
ভিডিও চালু হতেই ঘরে কিছুক্ষণ আগের সব কথোপকথন স্পষ্ট ভেসে উঠল। জাবেদের হুমকি। পাঁচ লাখ টাকা দাবির কথা। মেহরীনের চাচা-চাচি ও জাবেদের মাত্র বলা স্বীকারোক্তিসদৃশ কথাবার্তা। সবই পরিষ্কারভাবে রেকর্ড হয়েছে। তা শুনে তিনজনের মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল। জাবেদ আতঙ্কে বলে উঠল,

—এটা…এটা কবে রেকর্ড করলেন?
তালহা মুচকি হেসে ফেলল। সে তো আর এমনি এমনি শান্ত হয়ে বসে ছিল না। তারা যখন নাটক করছিল, সে তখন প্রমাণ জোগাড় করছিল। ঘটনা বুঝতেই তিনজন দিকবিদিকশুন্য হয়ে প্রায় দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে। তা দেখে অফিসারের নির্দেশে কয়েকজন কনস্টেবল তাদের পথ আটকাল। তা দেখে একেকজনের মনতি শুরু হলো
—ছাড়েন! আমরা কিছু করি নাই!
—আমাদের ফাঁসানো হচ্ছে!
—আর আসমু না ছাইড়া দেন।
কিন্তু কেউ তাদের কথা শুনল না। তালহা অফিসারের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
—ইন্সপেক্টর সাহেব, আপাতত এই প্রমাণগুলো কি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট?
অফিসার পুরো ভিডিওটি দেখে কনস্টেবলদের উদ্দেশে বললেন,
—ভিডিওটি জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন। ছবিগুলোও আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করুন।
তারপর সকলের উদ্দেশ্যে বলল,

—প্রাথমিকভাবে মামলা রুজু ও তদন্ত শুরু করার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। এগুলো জব্দ করা হবে, ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাও করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তির সিদ্ধান্ত দেবেন।
তালহা সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নেড়ে বলল,
—এটাই চাই। আইন যেন তার কাজটা করে।
তারপর নিচু স্বরে, দাঁতে দাঁত চেপে তালহা বলল,
—এই অমানুষগুলোর জন্য আমি আমার আপন মানুষ হারিয়েছি। আইন যেন এদের এমন শিক্ষা দেয়, যাতে আর কোনো মেয়ের জীবন নিয়ে এভাবে খেলা করার সাহস না পায়।
অফিসার গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে দুইজন কনস্টেবলকে নির্দেশ দিলেন,
—অভিযুক্তদের নিয়ন্ত্রণে নিন। কেউ যেন বের হতে না পারে।
কনস্টেবলরা এগিয়ে যেতেই জাবেদ হঠাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে অফিসারের সামনে এসে একটি কাগজ বাড়িয়ে দিল।

—স্যার, আগে এটা দেখুন। মেহরীনের বয়স এখনও আঠারো হয়নি। তালহা ওকে জোর করে বিয়ে করেছে। এটা বাল্যবিবাহ। ওর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিন।
অফিসার কাগজটি হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।
ঠিক তখনই তালহা শান্ত গলায় বলল,
—স্যার, কাগজটা একবার যাচাই করবেন। আমার ধারণা এটি জাল। আমার ওয়াইফের বয়স এখানে কমানো হয়েছে।
অফিসার মাথা নেড়ে এবার কাগজটির জন্মনিবন্ধন নম্বর সরকারি অনলাইন সার্ভারে যাচাই করলেন। কয়েক সেকেন্ড পর তাঁর মুখ কঠিন হয়ে উঠল,
—এই নম্বরে কোনো বৈধ জন্মনিবন্ধনের তথ্য নেই।
তিনি আবারও নম্বরটি মিলিয়ে দেখলেন। একই ফলাফল। অফিসার কাগজটি ভাঁজ করতে করতে কঠিন স্বরে বললেন,

—প্রাথমিকভাবে এটি জাল বা ভুয়া নথি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ভুয়া সরকারি কাগজ তৈরি ও ব্যবহার করাও গুরুতর অপরাধ। এটিও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।
এরইমধ্যে তালহা মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—মেহরীন, এদিকে আসো।
মেহরীন সামনে এসে দাঁড়াতেই তালহা বলল,
—আপনি চাইলে আমার স্ত্রীর জবানবন্দি নিতে পারেন। কোনো সন্দেহ রাখতে চাচ্ছি না আমি।
অফিসার জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন,
—আপনাকে কি জোর করে বিয়ে করা হয়েছে?
—না, স্যার।
—আপনাকে কি এখানে আটকে রাখা হয়েছে?
—না। আমি নিজ ইচ্ছায় আমার স্বামীর সঙ্গে আছি।
—অভিযোগকারীর কথা অনুযায়ী, আপনার উপর কেউ জোর-জবরদস্তি করছে?
—না, স্যার। একদমই না। বরং আমার চাচা-চাচিই টাকার লোভে আমাকে জোর করে বয়স্ক একজন লোকের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল।
অফিসার মনোযোগ দিয়ে শুনলেন জিজ্ঞেস করলেন,

—তোমার কথার পক্ষে কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ আছে?
মেহরীন মাথা নেড়ে বলল,
—জি, স্যার। আমাদের গ্রামের অনেক মানুষ বিষয়টা জানেন। আমার স্কুলের ম্যাডামও বিষয়টা জানেন। চাইলে গ্রামে গিয়ে তদন্ত করলে, আশপাশের মানুষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।
একটু থেমে সে আরও বলল,
—আমার স্কুলের শিক্ষিকার কাছেও আমি আগেই আশ্রয় নিয়েছিলাম এবং আমার কাগজপত্র জমা রেখেছিলাম। উনিও আমার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন।
অফিসার মাথা নেড়ে নোট নিতে নিতে বললেন,
—ঠিক আছে। বিষয়টি তদন্তের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে এ বিষয়েও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরপর অফিসার জাবেদ ও বাকিদের দিকে তাকালেন। কণ্ঠে কঠোরতা স্পষ্ট,

—আপনাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে, চাঁদাবাজির চেষ্টা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এআই বা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ছবি তৈরি ও একজন নারীর মানহানির চেষ্টা, প্রতারণার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রচার, জাল সরকারি নথি ব্যবহার, মানসিক হয়রানি এবং একজন নারীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা।
তিনি হাতে থাকা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,
—আপনাদের কাছ থেকে পাওয়া সকল প্রমান শীগ্রই যাচাই বাচাই করা হবে। তাদের উপযুক্ত শাস্তিও অবশ্যই দেওয়া হবে।
তারপর বললেন,
—আপনাদের এই মুহূর্তে আটক করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কয়েকজন কনস্টেবল এগিয়ে এসে তাদের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে টেনে টেনে বাইরে নিয়ে যেতে লাগল। তাদের নিয়ে বের হয়ে যেতেই উঠে দাড়াল অসিফার। তালহাও সাথে সাথে দাড়াল,

—বসুন চা নাস্তা করে যাবেন নাহয়।
অফিসার হেসে বললেন,
—আজ আর সম্ভব নয়। থানায় জিডি, এফআইআর ও আলামত গ্রহণের কাজকর্ম শেষ করতে হবে। অন্যদিন নাহয় এসে ভাবির হাতের চা খেয়ে যাব।
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
—অভিযোগকারী পক্ষ থেকে একজনকে আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে। প্রয়োজনীয় লিখিত অভিযোগ, আলামত জমা এবং জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে।
বিল্লাল সাহেব এগিয়ে এলেন,
—চলুন, আমি যাচ্ছি।
তালহা বলল,
—চাচ্চু, আমি যাই।

তালহাকে থামিয়ে অবশেষে বিল্লাল সাহেবই পুলিশের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। এক এক করে পুলিশ, জাবেদ, তার চাচা-চাচি সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেই পুরো বাড়িটা যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে ড্রয়িংরুমে চিৎকার, তর্ক-বিতর্ক আর উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, সেই জায়গাটাতেই এখন নেমে এসেছে শান্তি। দীর্ঘক্ষণ ধরে বইতে থাকা ঝড়টা অবশেষে থেমেছে। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। কেউ কিছু বলল না। ধীরে ধীরে সবাই এসে সোফায় বসে পড়ল। মনে হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার এই মানসিক যুদ্ধ তাদের ক্লান্ত করে দিয়েছে। তিতলি বেগম মাথাটা সোফার সঙ্গে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। তাহিয়া গা এলিয়ে বসে রইল মেহরীনের পাশে। মেহেদি পানির গ্লাস হাতে একটু একটু পানি খাচ্চে তো সবাইকে দেখছে। ফারাহও চুপচাপ বসে আছে এক কোণে। মনে নানান প্রশ্ন নিয়ে।
মেহরীনের কাঁধে এক হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাহিয়া। একটা ভারী, হতাশা মেশানো শ্বাস। তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধ শেষ, কিন্তু যুদ্ধের ফলটা তার একদম পছন্দ হয়নি। মেহরীন একবার তার দিকে তাকাল।
—কিরে? কী হয়েছে?
তাহিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন ভেতরের হতাশাটা গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—হল না ব্যাপারটা…
মেহরীন ভ্রু কুঁচকে ফেলল,

—কী?
তাহিয়া এবার একদম সরাসরি তাকাল। মেহরীনের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে। উত্তেজনায় তার গলা একটু উঁচু হয়ে গেল বলতে লাগল,
—তুই এভাবে ছেড়ে দিলি কেন? ওরা আরও অপমান ডিজার্ভ করত ইয়ার। কত বড় সাহস! আমার বেস্টিকে অপমান করে গেল আর তুই শুধু তাকিয়ে রইলি?
থেমে সে টেবিলে হালকা থাপ্পড় মারল ফের বলল,
—তোর তো উচিত ছিল ঠাস করে একটা চড় বসানো!
মেহরীন হালকা মুচকি হাসল। তার চোখে এখন আর আগের সেই ভয়ের ছায়া নেই, বরং একধরনের শান্তি অনুভব করছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
—আহা.. বয়সে বড় তো ওরা। এমনিতেও যথেষ্ট অপমানই করেছি।
এই কথাটা শুনে তাহিয়া যেন আরও ক্ষেপে গেল। ভ্রু কুঁচকে কঠিন গলায় বলল,

—বড়? বড় হলেই কি? সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা আছে ওদের?
—আহা বাদ দে বয়সে তো বড়ই…
—এই তুই বেশি বুঝিস?
তাহিয়ার রাগ দেখে মেহরীন চুপ করে গেল সঙ্গে সঙ্গে মাথা এদিক সেদিক নাড়িয়ে ঠোঁট চেপে ধরল। আস্তে করে বলল,
—না না! দাদিমা তো তুই, তাই তুই বেশি বুঝিস। আমি তো কিছুই বুঝি না।
তারপর এক মুহূর্ত একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই দুজন হেসে উঠল। খানিক আগের ভারী পরিবেশটা যেন মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল তাদের হাসাহাসির শব্দে। তাহিয়া আবারও মেহরীনের হাত চেপে ধরে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
—শুন তর্ক না ঠাস করে চড় মেরে দিবি, বিপরীতে এ্যাটাক করলে বাকিটা আমি দেখে নিব।
মেহরীন মাথা ঝাকিয়ে ভদ্র মেয়ের মতো আদেশ মেনে নিয়ে বলল,
—ওক্কে বস…
দুজন আবার হেসে ফেলল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ তার মাথায় টোকা দিল। তাহিয়া চমকে উঠে হুড়মুড়িয়ে পেছনে ফিরতেই দেখল, তালহা। দুই হাত বুকের ওপর গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি। তালহা ভ্রু উঁচু করে বলল,

—ছোটবেলা থেকে দোষ না করেও যে স্কুল থেকে মার খেয়ে এসেছে, সে নাকি আবার কাকে যেন দেখে নেবে?
তাহিয়া মুখ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। পরপরই চিৎকার করে উঠল,
—ভাইয়ায়ায়ায়া!
তালহা সঙ্গে সঙ্গে দুই কানে হাত চাপা দিল,
—আস্তে! পুরো পাড়া জানুক নাকি?
তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—মেহরীন, এক কাপ কফি নিয়ে আসো তো।
—আচ্ছা।
হাসি চাপতে চাপতে মেহরীন রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আর এদিকে তাহিয়া সোফায় ধপ করে বসে গাল দুটো ফুলিয়ে রইল। বিরবির করে বলল,
—এই বাড়িতে আমার কোনো মূল্যই নাই। সবাই মিলে শুধু আমারেই টিজ করে। কারও সাথেই আর কথা বলব না!

শেষের কথাটা ইচ্ছে করেই বেশ জোরে বলল তাহিয়া। যেন ঘরে উপস্থিত একজনও শুনতে বাদ না যায়। তারপর গাল দুটো আরও ফুলিয়ে ধপ ধপ শব্দ তুলে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল। ঠিক সিঁড়ির মুখে তালহার সঙ্গে দেখা। তালহাকে একপ্রকার ধাক্কিয়ে নিজে আগে উঠে গেল। যেতে যেতেই আবার অভিমানী গলায় বলল,
—কেউ ডাকলেও আর আসব না।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার রুমের দরজা দড়াম করে বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে এলো। ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বিরাজ করল। তারপর একে একে সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা বাহিরে ভীতুর ডিম আর ঘরে যেন বাঘিনী কেউ কিছু বলার আগেই অভিমান রাগ।
কফির ট্রেটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই মেহরীন মুচকি হেসে বলল,
—শুধু শুধু মেয়েটাকে রাগালেন কেন?
তালহা তখন সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। হাতে মোবাইল থাকলেও চোখ সেদিকে নেই। দৃষ্টি গিয়ে থামল মেহরীনের ওপর। নিরবে তাকিয়ে রইল সে। আজ মেয়েটাকে যেন অন্যরকম লাগছে। কালো ওড়নাটা মাথার ওপর পরিপাটি করে টানা। ঘোমটার আড়ালে লাজুক, উজ্জ্বল একটা মুখ। ফর্সা নাকে ছোট্ট সোনার নাকফুলটা আলোয় চিকচিক করছে। গলার সরু সোনার চেইনটা তার শুভ্র ত্বকের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে, যেন ওটার জায়গা বরাবরই সেখানে ছিল। দুহাতের সোনার বালা বেশ মানিয়েছে হাতে। সব মিলিয়ে একেবারে ঘরোয়া, শান্ত, মিষ্টি এক বউ। অজান্তেই তালহার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মেহরীন কফির মগটা তার হাতে তুলে দিতেই তালহা সেটা নিল, কিন্তু চোখ সরাল না। মৃদু স্বরে বলল,

—তোমাকে আজ অন্যরকম লাগছে।
মেহরীন অবাক হয়ে তার পাশেই বসে পড়ল। ট্রেটা টি টেবিলে রেখে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—অন্যরকম মানে?
তালহা কফিতে এক চুমুক দিয়ে একটু ভেবে বলল,
—অন্যরকম মানে.. অন্যরকমই।
—এটা আবার কেমন উত্তর?
তালহা এবার হালকা হেসে বলল,
—কিছু কিছু সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। শুধু মনে হয় চোখ সরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে না, অন্যরকম কিছু একটায় চোখ বারবার আটকাচ্ছে।
কথাটা শুনে মেহরীনের ঠোঁটের কোণে লাজুক এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তালহার বাঁ হাতটা নিজের দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। একটা দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে নিচু স্বরে বলল,
—ধন্যবাদ।
তালহা ভ্রু তুলল,
—কিসের জন্য?
—সবকিছুর জন্য। আমাকে বিশ্বাস করার জন্য, আমার পাশে থাকার জন্য, আমাকে হিয়ে লড়াই করার জন্য।
একটু থেমে তার চোখের দিকে তাকাল,
—আমি সত্যিই খুব লাকি আপনার মতো একজন জীবনসঙ্গী পেয়ে।
তালহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,

—কিন্তু আমার তা মনে হয় না।
মেহরীনের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল,
—মানে?
তালহা কফির মগটা টেবিলে রেখে পুরোপুরি তার দিকে ফিরল। চোখে এবার আর হাসি নেই। বরং গভীর, শান্ত এক গম্ভীরতা,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭২

—কারণ এখনও এমন কিছু কথা আছে, যেগুলো তুমি আমাকে বলোনি।
মেহরীনের বুকটা ধক করে উঠল। দ্রুত বলল,
—কি বলিনি আমি?
তালহা ধীরে ধীরে বলল,
—সেদিন অফিসে জাবেদ কি করেছিল যা তুমি আমাকে এখনো বলনি?

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here