প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮১
সাইদা মুন
—এই আম্মু! তোমার বান্দরটাকে নিয়ে যাও তো। আমাদের ডিস্টার্ব করছে।
তিতলি বেগম মেহমান সামলাতে সামলাতে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছেন। তার ওপর ছেলে-মেয়ের এহেন ঝামেলা দেখে তিনি বেশ বিরক্ত। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিরক্ত গলায় ঝারি দিলেন,
—এই সমস্যা কী তোদের, হ্যাঁ? একটু পর পর সাপে-নেউলে লেগে যাচ্ছিস কেন?
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে মায়ের কাছে নালিশের সুরে বলল,
—দেখো না আম্মু। আজ মেহুর কত ইম্পর্ট্যান্ট একটা দিন। হাতের মেহেদি নষ্ট হলে ছবি নষ্ট হয়ে যাবে। ভিডিওও তো করতে হবে। কতগুলো ট্রেন্ডিং ভিডিও বানাবো বসে আছি। আর তোমার ছেলে কিনা সব ভেস্তে দেবে।
তালহা ভ্রু কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—বললাম না, নষ্ট হবে না।
—হবে! তুমি বেশি জানো?
—তুই চুপ করবি?
—তুমি চুপ করো।
দুজনের কথার মাঝখানে তিতলি বেগম একবার ছেলের দিকে, একবার মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন,
—দুটোই চুপ কর দেখি। আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে একদিনেই দেখছি। বলছি, মেয়েদের মেহেদি অনুষ্ঠানে তুই কী করছিস বল তো আব্বু?
তিতলি বেগম এবার সরাসরি তালহার দিকে তাকালেন। তালহা মাথা চুলকে একেবারে নিরীহ মুখ করে ফরফরিয়ে বলল,
—মেহরীন আবদার করছিল আমার কাছ থেকে মেহেদি পড়বে। তাই তো সব কাজকাম ছেড়ে-ছুড়ে চলে এসেছি।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তালহার দিকে তাকাল। সে কখন আবদার করল? লোকটা কী সুন্দর করে তার নামে মিথ্যা বলে যাচ্ছে। মেহরীন কিছু বলতে মুখ খুলতেই তালহা সবার আড়ালে তার হাতটা চেপে ধরল। চোখ তুলে মেহরীনের চোখে চোখ রাখতেই খুব ছোট করে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করল, চুপ থাকতে। মেহরীন ফুঁস করে শ্বাস ছেড়ে আবার মুখ বন্ধ করে ফেলল। তাহিয়া এতক্ষণ ভাইয়ের কথা শুনে নাক সিটকে বলল,
—ছিইইই! মেহরীন, তাই বলে এত বিচ্ছিরি মেহেদি আর্টিস্টের কাছে মেহেদি পড়বি? এর থেকে তো আমিই ভালো।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে রাগী চোখে বোনের দিকে তাকাল,
—কী বললি?
—যেটা শুনেছ।
তালহা উঁচু স্বরে ডাকল,
—তাহিয়া…
তাহিয়াও গলা উঁচিয়ে বলল,
—কী…?
তালহা কিছু বলার আগেই আচমকা তার কাঁধে কারও হাত এসে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল রাফি দাঁড়িয়ে আছে। আজকের অনুষ্ঠানের সঙ্গে মানানসই মেহেদি রঙের পাঞ্জাবি পরেছে। গলায় সাদা ওড়না আলগাভাবে ঝুলছে। চুলটা সামান্য এলোমেলো, মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি। তালহার পাশেই বসে পড়ল সে। তারপর বেশ ভাব নিয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—নট বিচ্ছিরি। ইট ইজ দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট এক্সপেন্সিভ মেহেদি আর্টিস্ট। যা কেউ টাকা দিয়েও কিনতে পারবে না। কী ঠিক বলছি তো, দুলাভাই?
রাফির কথায় তালহার বুকটা যেন আরও দু’ইঞ্চি ফুলে উঠল। গম্ভীর মুখে মাথা নাড়িয়ে বলল,
—অবশ্যই।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে তালহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—এক হাজার টাকা একটা প্রশংসার জন্য।
তালহা চোখ কুঁচকে তাকাল। এ কি পক্ষ নিতে এসেছে নাকি লুটতে এসেছে। রাফি আবার ফিসফিস করে বলল,
—আরেকটা শুনতে চাইলে দুই হাজার টাকা দিতে হবে। বলেন দুলা, দেবেন?
তালহা তপ্ত শ্বাস ফেলল। কোনো কথা না বলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রাফির মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে সোজা হয়ে বসে এক আঙুল তুলে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাকাল তাহিয়ার দিকে,
—এত চ্যাটাং চ্যাটাং কথা এই মহিলা বলছে?
তাহিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। রাফি হাত নেড়ে তুচ্ছ স্বরে বলল,
—এই অবিবাহিত মহিলার মুখে এমন কথা? যার কিনা অওকাত নাই নিজের জামাইয়ের হাতে মেহেদি পড়ার। এটা খুবই হাস্যকর বিষয়।
একথায় হুহু করে হেসে ফেলল কয়েকজন। তাদের হাসিতে পাশে বসা বাকিরাও হেসে ফেলল। তনিমা মুখ চেপে হাসছে। ফারিন তোশকের ওপর গড়িয়ে পড়ার জোগাড়। ফারিহা হাসি আটকাতে চাচ্ছে বোনের পক্ষ নিতে তো হবে। আর তাহিয়া? সে ততক্ষণে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে,
—রাফির বাচ্চা!
বলে তেড়ে আসতেই রাফি এক লাফে উঠে দাঁড়াল,
—আরে আরে। দূরে থাকেন, মহিলা!
তাহিয়া পেছন পেছন ছুটতে শুরু করতেই রাফি ভোঁ দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতেই মেয়েদের দিকে ফিরে বলল,
—আই অ্যাম পিওর সিঙ্গেল, লেডিস। এই তাহুর কথায় আমার বাচ্চা আছে ভেবে ভুল করবেন না।
সবাই আরেক ফাক হেসে উঠল। রাফি দৌড় থামাল না। বাড়ির দিকে যেতে যেতে ঘুরে আবার বলল,
—এনিওয়ান, ক্যান কন্টাক্ট মি এনিটাইম।
পেছন থেকে ফারিন আর তনিমা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল,
—অলরেডি দুইটা গার্লফ্রেন্ড আছে! তিন নম্বর হতে চাইলে ইউ ক্যান কন্টাক্ট।
রাফি বাড়িতে প্রবেশ করতে করতেই বলল,
—মিথ্যা! মিথ্যা! মিথ্যা!
তারপর আর দেখা গেল না তাকে। হাসির রেশটা অবশ্য রয়ে গেল পুরো মেহেদির আসরজুড়ে। মেহরীনও এতক্ষণে নিজের হাসিটা আর আটকে রাখতে পারল না। হাতের মেহেদি নষ্ট হওয়ার ভয়ে মুখে হাত দিতে পারছে না, তাই শুধু মাথা নিচু করে হাসছে। তালহা পাশ থেকে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে আর মন ভরে দেখছে।
চারপাশে তখনও হাসি-ঠাট্টা চলছে। মেয়েদের কেউ মেহেদি দিচ্ছে, কেউ হাতের মেহেদি শুকানোর জন্য বাতাস করছে, কেউ সেলফি তুলছে। ক্যামেরাম্যানও বসে নেই এর ওর ছবি তুলছে। ছেলেরা প্রায় সবাই ছবি তুলে আগেই চলে গেছে। অনুষ্ঠানটা মূলত মেয়েদের, তাই বাড়ির এই অংশটায় এখন মেয়েদেরই রাজত্ব। শুধু তালহা নিজের বউয়ের মেহেদি দেওয়ার অজুহাতে বসে আছে।
মেহেদির আসরটা বসেছে বাড়ির একপাশের বিশাল খোলা জায়গাটাজুড়ে। জায়গাটাকে সাজিয়ে ছোট্ট একটা উৎসবের মাঠ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। চারপাশে গাঁদা ফুলের মালা ঝুলছে, কোথাও গোলাপ আর রজনীগন্ধার ছোট ছোট গুচ্ছ, আবার কোথাও ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চিকন গোল্ডেন লাইট। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সেই লাইটগুলো জ্বলে উঠতেই পুরো জায়গাটা নরম হলুদ আলোয় ঝলমল করছে। মাঝখানে রাখা হয়েছে বড় একটি তোশক। তার ওপর সাদা কাপড় বিছিয়ে চারপাশে কুশন আর বালিশ সাজানো। পেছনে গাঁদা ফুলের ঘন সাজের সঙ্গে ঝুলছে গোল্ডেন লাইট ও রঙিন পর্দা। সেখানেই বসে আছে মেহরীন, তালহা, তাহিয়াসহ তাদের কয়েকজন বান্ধবী-বোন।
আশেপাশেও ছোট ছোট তোশক বিছানো হয়েছে। প্রতিটির ওপর দুটো করে নরম বালিশ রাখা, যে যেখানে সুবিধা সেখানেই বসে গল্প করছে, মেহেদি দিচ্ছে, ছবিও তুলছে। আজকের আয়োজনটা মূলত মেহরীনকে ঘিরে হলেও তালহার উপস্থিতিতে আপাতত দুজনই হয়ে উঠেছে সবার আগ্রহের কেন্দ্র। মেহরীনকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মেহেদি রঙের লেহেঙ্গার সঙ্গে মানানসই ভারী সাজ। কপাল, গলা-কানজুড়ে তাজা লাল গোলাপের গহনা। চুলের সাজেও ছোট ছোট গোলাপ গোঁজা। কিন্তু এত সাজগোজ, এত মানুষ আর এত আয়োজনের মাঝেও মেহরীনের সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হচ্ছে তালহাকে নিয়ে। কারণ লোকটা আজ সকাল থেকেই অদ্ভুত রকমের উৎসাহী। এখন আবার সবার সামনে তার হাত ধরে মেহেদি দেওয়ার বায়না ধরেছে। মেহরীন মাথা নিচু করে বসে আছে। চারপাশের মানুষজন যে তাদের দেখছে, সেটা সে বেশ বুঝতে পারছে। কেউ মুচকি হাসছে, কেউ আবার বেশ জোরে জোরে বলছে “ছেলেটা বউ পাগল”, “বিয়ের আগেই বউয়ের আচল ধরে ঘুরছে ” এরকম নানান কথা। লজ্জায় মেহরীন তো চোখই তুলতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত মিনমিন করে বলেই ফেলল,
—কী শুরু করেছেন আপনি? সবাই দেখছে।
তালহা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—দেখলে দেখুক। আমি আমার বউ নিয়ে যা করার করছি, অন্য কারও বউ নিয়ে না। কী বলো আম্মু?
বলেই মায়ের দিকে তাকাল। তিতলি বেগম তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলের কথা শুনে থেমে গেলেন। মুখে কপট রাগ এনে বললেন,
—নির্লজ্জ ছেলে, যা খুশি কর। আমাকে আর একবারও ডাকবি না।
বলেই হনহন করে চলে গেলেন। তিনি চলে যেতেই তনিমা, ফারিন, ফারিহা, রাফা আর পাশে বসে থাকা মেয়েরা একসঙ্গে হেসে উঠল তনিমা খোঁচা মেরে বলল,
—ওহ্হো! দুলাভাই তো দেখি পুরোদস্তুর মেহেদি আর্টিস্ট!
ফারিন ও পাশ থেকে বলল,
—মেহরীন, তুই কত লাকিরে, ভাইয়া নিজে হাতে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে।
আরেকজন টিটকারি মেরে বলল,
—তালহা ভাই, ডিজাইন শেষ হলে আমাদের হাতেও একটু দিয়ে দেবেন কিন্তু..
একথায় তালহা জবাব দিল,
—বউ ছাড়া অন্য কারো হাতে দিলে চাকরি থাকবে না।
—ভাইয়া দেখছি বউকে খুব ভয় পান।
তালহা আড়চোখে চাইল মেহরীনের দিকে,
—ভয় পাই কিনা জানিনা তবে তার কথার অমান্য হওয়া অসম্ভব।
তনিমা হেসে বলল,
—ভাইয়া মনে হয় ওই হাদিসটা শুনেছেন, বউয়ের কথা শুনলে সংসারে সুখ আসে।
তালহা হেসে ফেলল মাথা নেড়ে বলল,
—ধরে নেও ওটাই…
এমনই টুকটাক কথাবার্তা চলছে তাদের মাঝে। এদিকে মেহরীন লজ্জায় আরও মাথা নিচু করে ফেলেছে। মোবাইলটা পাশে রেখে আবার মেহরীনের হাত নিজের সামনে টেনে নিল। ফোনের স্ক্রিনে আগে থেকেই একটা ডিজাইন সিলেক্ট করা। মাঝেমধ্যে সেটার দিকে তাকাচ্ছে, আবার মেহরীনের হাতের দিকে তাকিয়ে খুব সাবধানে মেহেদির কোণ চেপে ধরছে। পাশেই ক্যামেরাম্যান দাঁড়িয়ে। কখনো মেহরীনের মুখ, কখনো তালহার হাত, কখনো দুজনের একসঙ্গে বসে থাকার মুহূর্তের কয়েকটা ভিডিও ক্লিপ নিয়ে নিয়েছে।
আশেপাশেও এবার মেহেদি দেওয়ার প্রতিযোগিতা লেগেছে সকলেই মেহেদি দিতে ব্যস্ত। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে চেষ্টা করে মেহরীনের হাতের প্রায় অর্ধেকটা মেহেদিতে ভরে ফেলেছে তালহা। তাহিয়ারা তো বেশ অবাক। তাহিয়া একটু ঝুঁকে নকশাটা দেখে নাক তুলে বলল,
—এতটা খারাপও না।
ফারিহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—খারাপ মানে বল সুন্দর হয়েছে।
তালহা ভাব নিয়ে বলল,
—বলেছিলাম না পারব?
তাহিয়া নাক সিটকে বলল,
—একদম হুবহু তো হয়নি।
তালহা মুখ ভেংচে ভাব নিয়ে বলল,
—হুবহু করতে যাব কেন? আমার নিজের একটা স্টাইল আছে না।
তাহিয়া মুখ ভেংচি কেটে অন্যপাশে ফিরল। মেহেদি দেওয়ার সময় তালহার মনোযোগ সত্যিই অবাক করার মতো ছিল। মোবাইলের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে যতটা সম্ভব নিখুঁত করার চেষ্টা করছে। কোথাও সামান্য ভুল হলেই থেমে যাচ্ছে, আবার ঠিক করছে। এত ধৈর্য দেখে মেহরীন ও অবাক। আর এর মাঝে তো আছেই তার একেরপর এক কথা। গত আধাঘণ্টায় মেহরীনকে অন্তত দশ-পনেরোবার জিজ্ঞেস করেছে
—গরম লাগছে?
মেহরীন জবাব দিল,
—না।
কিছুক্ষণ পর আবার,
—পানি খাবে?
সে ফের জবাব দিল,
—না।
তারপর একটু পরেই,
—কোমরে ব্যথা করছে?
—না।
—একটু উঠবে?
—না, আমি ঠিক আছি।
—সত্যি?
মেহরীন বিরক্ত মুখে বলেছিল,
—হ্যাঁ।
কিন্তু তালহা তাতেও থামেনি। কিছুক্ষণ পর আবার,
—হাতটা বেশি ভার লাগছে?
মেহরীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছে,
—না।
—ঘাড়ে ব্যথা?
—না।
—চোখে চাপ লাগছে?
মেহরীন এবার সরু চোখে তার দিকে তাকাল,
—আপনি মেহেদি দিচ্ছেন, নাকি আমার পুরো শরীরের চেকআপ করছেন?
তালহা মুখ চেপে হেসে বলল,
—দুটোই করা যায়।
মেহরীন ফুঁস করে শ্বাস ছেড়ে ক্লান্ত হয়ে বসল। একে তো উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত। এর ওপর হাত স্থির রাখার ঝামেলা তো আছেই। একদিকে নকশা দিতে সুবিধা হচ্ছে না বলে তালহা হাতটা নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে, পরক্ষণেই অন্য পাশের ডিজাইন করতে গিয়ে একটু ওপরে তুলছে। কখনো কবজি ঘুরিয়ে দিচ্ছে, কখনো আঙুলগুলো আলাদা করে ধরছে। মেহরীনও বারবার হাতের অবস্থান বদলাতে গিয়ে হাপিয়ে উঠছে। আবারও তালহা মাথা তুলে বলল,
—বউ হাতটা আর একটু সোজা করো।
মেহরীন তপ্ত শ্বাস ফেলে হাতের অ্যাঙ্গেলটা বদলে বলল,
—এভাবে?
তালহা একবার দেখে মাথা নাড়ল,
—না, আরেকটু।
মেহরীন আবার একটু সরাল,
—এবার?
—হুম… এবার ঠিক আছে।
পাশ থেকে এতক্ষণ সবকিছু দেখে আসা তাহিয়া বিরক্ত মুখে বলল,
—তুমি মেহেদি দিচ্ছ নাকি আমার বান্ধুবির সার্জারি করছ, ভাইয়া?
একথায় তালহা রাগী চখে তাকাতেই সবাই হেসে উঠল। মেহরীন ও হাসছে। তালহা নির্বিকার মুখে মেহরীনের হাতের দিকে তাকিয়েই বলল,
—চুপ কর। ভালো কাজের সময় বিরক্ত করিস না।
তাহিয়া বলল,
—ভালো কাজ? এতক্ষণে অর্ধেক হাত। বাকি অর্ধেক শেষ হতে রাত পার হয়ে যাবে।
তালহা এবারও তাহিয়ার কথায় কোনো পাত্তা দিল না। নিজের কাজে মনোযোগী সে। অন্য হাতটায় একজন মেহেদি আর্টিস্ট বসেছে। হঠাৎ মেহেদি দেওয়ার মাঝপথে মেহরীন কয়েকবার অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল। তালহার চোখ এড়িয়ে গেল না বিষয়টা। মেহেদি দেওয়া থামিয়ে সে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
—কোনো সমস্যা?
মেহরীন প্রথমে মাথা নাড়ল বলল,
—তেমন না।
তালহা এবার পুরোপুরি তার দিকে তাকাল,
—কী হয়েছে, সেটা বলো।
মেহরীন একটু ইতস্তত করে বলল,
—পায়ে ব্যথা করছে।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে মেহেদিটা পাশে রেখে দিল বাহু ধরে উঠাতে বলল,
—চলো, উঠো।
মেহরীন দ্রুত মাথা নাড়ল,
—না না।
তবে তালহা শুনল না। মেহরীনের পায়ের ব্যথাটা যে শুধু সামান্য অস্বস্তি নয়, সেটা তার মুখ দেখেই বুঝে ফেলেছে সে। অন্য হাতে মেহেদি দিতে বসা মেয়েটিও তালহার সঙ্গে সঙ্গে মেহেদি দেওয়া থামিয়ে দিল। মেহরীনকে টেনে তুলতে তুলতে তালহা বলল,
—চলো, ওঠো।
মেহরীন এবারও আপত্তি করার চেষ্টা করল,
—কিন্তু মেহেদি..
—মেহেদি দেওয়ার জন্য পুরো রাত পরে আছে।
মেহরীন আর তর্ক করল না। তালহা খুব সাবধানে তার তাকে উঠাল। ভারী লেহেঙ্গার ঘের সামলাতে গিয়ে মেহরীন এক মুহূর্ত দিশেহারা হয়ে পড়তেই তালহা সঙ্গে সঙ্গে এক হাতে তার দোপাট্টাটা গুছিয়ে নিল, অন্য হাতে লেহেঙ্গার সামনের অংশটা সামান্য তুলে ধরল বলল,
—ধীরে চল..
মেহরীন এক পা এক পা করে নিচে নামতেই মুখটা কুঁচকে গেল। তালহা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
—বেশি ব্যথা?
মেহরীন কুঁচকানো মুখ নিয়েই বলল,
—ব্যথা না তবে কেমন যেন ঝিনঝিন করছে।
—একটানা বসে থাকার ফলে হয়েছে, চলো একটু হাঁটো ঠিক হয়ে যাবে।
মেহরীনকে নিয়ে আশেপাশের খোলা জায়গায় ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল সে। প্রথম দু-এক পা ফেলতেই অস্বস্তি লাগছিল। তাই তালহা তার হাঁটার গতির সঙ্গে নিজের গতি মিলিয়ে নিল,
—আস্তে হাঁটো। তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।
মেহরীন নিচের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিল। পায়ের অবশভাবটা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। আরও কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ থেমে গেল সে। অসহায় চোখে তালহার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
—একটু দাঁড়াই। পা-টা অবশ হয়ে আছে। পা যে ফেলছি, মনে হচ্ছে পড়ে যাবো পড়ে যাবো।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। এক মুহূর্তও দেরি না করে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার সামনে। তারপর সাবধানে লেহেঙ্গাটা একটু তুলে মেহরীনের পায়ের পাতায় হাত রাখল। হঠাৎ পায়ের পাতায় ছোট্ট একটা চিমটি কাটল। তারপর মুখ তুলে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—লাগছে ব্যথা?
মেহরীন চমকে তাকাল,
—কী করছেন? পা ছাড়ুন।
তালহা কোনো উত্তর না দিয়ে আরও দু-একটা হালকা চিমটি কাটল। আবারও প্রশ্ন করতেই মেহরীন এবার বলল,
—হালক লাগছে।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল,
—এই তো।
মেহরীন অবাক হয়ে তাকাল,
—এই তো কী?
তালহা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—এবার ঠিক হয়ে যাবে। ছোটবেলায় পা এমন অবশ হয়ে গেলে চিমটি কাটতাম। তার একটি পর ঠিক হয়ে যেত।
মেহরীন পা-টা আস্তে করে নাড়াল। তারপর মাটিতে পায়ের পাতা রেখে পরীক্ষা করে দেখল,
—সত্যিই তো এখন পা-টা একটু অনুভব করা যাচ্ছে।
তালহা মুচকি হাসল,
—বলেছিলাম।
মেহরীন খুশি হয়ে বলল,
—চলুন, আরেকটু হাঁটি।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল,
—ওকে, ম্যাম।
দুজন আবার ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। ভারী লেহেঙ্গার ঘেরটা বারবার মেহরীনের পায়ের কাছে এসে পড়ছিল। প্রতিবারই তালহা এক হাতে সেটা সামলে একটু তুলে রাখছিল। অন্য হাতে দোপাট্টাটা ধরে রেখেছে, যাতে হাঁটার সময় সেটাও পায়ের নিচে চলে না আসে। মেহরীন কয়েক কদম পরপর তালহার দিকে তাকাচ্ছে। লোকটার নিজের হাঁটার চেয়ে যেন তার হাঁটার দিকেই বেশি খেয়াল। একবার পায়ের দিকে তাকাচ্ছে, একবার লেহেঙ্গার ঘের ঠিক করছে, আবার দোপাট্টা সরে গেলে সেটা সামলে দিচ্ছে। মেহরীনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল প্রশ্ন করল,
—এমন যত্ন কি শুধু আজকের জন্যই?
তালহা হাঁটতে হাঁটতেই মুচকি হাসল উত্তরে বলল,
—আপনি চাইলে সারাজীবন এমনই যত্ন করব।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেলল,
—ওহ্! আমি চাইলেই পাব? এছাড়া না? তাহলে এমন যত্ন লাগবে না।
তালহা ফিক করে হেসে উঠল। তারপর একটু ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলল,
—আপনি আমার বড্ড আহ্লাদী বউ। তাই এই জন্মে আমার থেকে আপনার কিছু চেয়ে নিতে হবে না। সব ভরপুর পাবেন।
মেহরীনের মুখে আর অভিমান ধরে রাখা গেল না। ঠোঁট মেলে হেসে ফেলল সে। হাসির সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো কুঁচকে ছোট হয়ে গেল। তালহা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলল,
—তুমি একজন অমায়িক, ভালোবাসার মানুষ পেতে যাচ্ছ।
মেহরীন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল,
—আচ্ছা তাই বুঝি? আপনি কী করে জানলেন?
তালহা একটুও না ভেবে বলল,
—তোমার হাসিই বলে দিচ্ছে।
—আমার হাসি?
—হু।
মেহরীন অবাক চোখে তাকাল। তালহা একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
—দাদি-নানির কাছ থেকে শুনেছিলাম, যেসব মেয়েরা হাসলে চোখ ছোট ছোট হয়ে যায়, তাদের কপাল নাকি খুব ভালো হয়। জীবনে এমন জীবনসঙ্গী জোটে, যে তাকে চোখে হারায়।
কথাটা বলেই নিজের দিকে ইঙ্গিত করে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী একটা হাসি দিল তালহা। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে তালহার পেটে হালকা একটা গুতো মারল। হাসতে হাসতেই বলল,
—মশাই বন্ধ করুন নিজের প্রশংসা করা।
তালহা পেটের কাছে হাত দিয়ে মিথ্যে ব্যথার ভান করে বলল,
—এহ! যা বলছি, একদম সত্য বলছি।
—নিজেকে এত ভালো মানুষ মনে হয়?
—মনে হয় মানে? আলবাত আমি ভালো মানুষ।
—আত্মবিশ্বাস দেখে বাঁচি না!
—আত্মবিশ্বাস না থাকলে আপনার মতো বাচ্চা বউকে সামলাব কীভাবে?
মেহরীন আবার কনুই তুলতেই তালহা এবার এক পা সরে গেল,
—আরে আরে! মেহেদি নষ্ট হয়ে যাবে তো।
মেহরীন নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থামল। খুনসুটি করতে করতেই দুজন ধীরে ধীরে হাঁটছিল। পাশে ফুলে সাজানো মেহেদির আসর থেকে ভেসে আসছিল মেয়েদের হাসির শব্দ, সঙ্গে তো গান বাজছে। চারপাশে তখনও মেহেদির অনুষ্ঠান জমজমাট। কেউ তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে, কেউ আবার নিজের কাজে ব্যস্ত। এরইমধ্যে সালমা বেগম হাতে একটা প্লেট নিয়ে এগিয়ে এলেন। মেহরীনের সামনে এসেই খাবার মাখাতে মাখাতে বললেন,
—এই যে, বিকেল থেকে মেয়েটা কিছু খায়নি। এত মানুষের ভিড়ে খাওয়াতে আসার সুযোগই পাচ্ছি না।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি পরে খাব ছোট আম্মু।
—পরে আবার কখন? মুখ খোল বলছি কত কাজ পড়ে আছে তাড়াতাড়ি খেয়ে নে।
কথা শেষ হওয়ার আগেই সালমা বেগম এক লোকমা খাবার তুলে মেহরীনের মুখে দিয়ে দিলেন। মেহরীন আর না করতে পারল না। পাশেই একটা চেয়ারে বসল সে। তালহা পানির বোতল নিয়ে এসেছে। এরইমধ্যে সালমা বেগমের ডাক পড়তেই তালহা কৌশলে প্লেটটা নিজের কাছে নিয়ে নিল। তারপর উনাকে পাঠাল সে খাইয়ে দিবে বলেম তিনি যেতেই তালহা চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসে আস্তেধীরে ছোট ছোট লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে লাগল।
রাত বাজে প্রায় বারোটা।
মেহেদির অনুষ্ঠান মাত্রই শেষ হয়েছে। নাচ, গান, হাসি-আনন্দ আর আপনজনদের কোলাহলে সময়টা কখন যে এতটা গড়িয়ে গেছে, কেউ টেরই পায়নি। একে একে সবার খাওয়া-দাওয়াও শেষ হয়েছে। যারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে, তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে বাড়িতেই। আর বাকিরা বিদায় নিয়ে যে যার বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে।
অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা শেষ হতেই যেন মেহরীনের শরীরটাও নিজের ক্লান্তির হিসাব চাইতে শুরু করল। তাহিয়া, ফারিন আর তনিমা মিলে তাকে দুপাশ থেকে টেনে ধরে তুলল। বেচারির একেবারে কাহিল অবস্থা। কত শখ করে যে ভারী লেহেঙ্গাটা বেছে নিয়েছিল। তখন পোশাকটার সৌন্দর্যই চোখে পড়েছিল, ওজনটা নয়। এখন মনে হচ্ছে, গায়ে যেন পঁচিশ কেজির একটা বস্তা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পা ফেলতেই শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে। তিনজনের কাঁধে ভর দিয়ে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল মেহরীন।
ড্রয়িংরুমে এসে দেখা গেল জায়গাটা একেবারেই ফাঁকা। এতক্ষণ যে ঘরটা মানুষে মানুষে সরগরম ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে রাতের নিস্তব্ধতা। সবাই যে যার মতো ঘুমোতে গেছে। তাহিয়া সুযোগ বুঝে তালহাকে ডেকে পাঠালো। কিছুক্ষণ পরই তালহা দ্রুত পায়ে এসে হাজির হলো। মেহরীনের অবস্থা দেখেই আর কোনো প্রশ্ন করল না। কোনো কথা না বলে সোজা এগিয়ে এসে তাকে কোলে তুলে নিল। হঠাৎ এমন ঘটনায় মেহরীন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তালহার বুকের কাছে চলে গেল সে। আচমকাই শরীরটা একটু স্বস্তি পেল। গা এলয়ে দিল। দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরল। মাথাটা কাধে ফেলে দিল।
তালহা অনায়াস ভঙ্গিতে তাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে উঠতে লাগল। মেহরীন ক্লান্ত চোখে একবার তার মুখের দিকে তাকাল। তালহার মুখে কোনো বিরক্তি নেই, সারাদিন ধরে এদিক সেদিক সামলাচ্ছে আবার মাঝে মাঝে তাকেও সামলাচ্ছে। মুচকি হাসল সে। আরও টাইট করে তার গলা ধরে চোখ বুঝলো। দোতলায় উঠে তালহা তাকে তাহিয়ার ঘরে নিয়ে গেল। বিছানায় সাবধানে বসিয়ে দিয়ে তাহিয়াদের উদ্দেশ্যে বলল,
—ওর একটু খেয়াল রাখিস। বেশি শরীর খারাপ লাগলে বলিস আমায়।
তাহিয়া মাথা নাড়তেই তালহা আর দাঁড়াল না। তাহিয়া, ফারিন আর তনিমাও এরপর পোশাক বদলে নিল। তারপর তিনজনে মিলে মেহরীনের ভারী লেহেঙ্গাটা বদলে নরমাল থ্রি পিস পড়িয়ে দিল। এতক্ষণে মেহরীন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো আজকের দীর্ঘ দিনটার অবশেষে সমাপ্তি হলো।
—আপনি বিদেশ যাবেন কেন?
তাহসান কিছুক্ষণ নীরব থেকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—এমনি।
তনিমা এবার সরাসরি প্রশ্ন করল,
—মেহরীনের জন্য?
তাহসান ধীরে ধীরে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
—এই কথাটা কেন মনে হলো?
তনিমা দুহাত বুকের ওপর গুঁজে শান্ত গলায় বলল,
—কারণ আপনি মেহরীনকে ভালোবাসেন। তাদের দুজনকে চোখের সামনে একসঙ্গে দেখা আপনার জন্য এতটা সহজ নয়।
তাহসান শব্দ করে হেসে ফেলল,
—ভুল বলছ। মেহরীন আমার ভালোবাসা ছিল না। ভালো লাগা ছিল। তাছাড়া দুবছর ধরে চোখের সামনেই দেখছি তাদের।
তনিমা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—কিন্তু আমি তো ভালোবাসাই দেখছি। এতদিনেও মুভ অন করেননি। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের বিয়ের পরপরই দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল তাহসানের মুখ থেকে। সে একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
—তালহা আর মেহরীনকে একসঙ্গে দেখে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস হয় না। কারণ মেহরীন তালহাকেই ডিজার্ভ করে।
তনিমা সরু চোখে তাকিয়ে রইল। তাহসান কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
—মেহরীনের স্বপ্ন পূরণে এতিমখানা বানিয়েছে তালহা, শুনেছ?
—হু। সবাই জানে।
তাহসান এবার গভীরভাবে শ্বাস নিল,
—মেহরীনের এতিমখানা বানানোর স্বপ্নটা কিন্তু আমি আর তালহা দুজনেই একসঙ্গে শুনেছিলাম। একই কথা, একই স্বপ্ন। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়।
তনিমা কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল,
—কী পার্থক্য?
তাহসান মৃদু হেসে বলল,
—আমি গুরুত্ব দিইনি। আর তালহা দিয়েছে। মেহরীনের স্বপ্নটাকে তালহা মুহূর্তেই নিজের স্বপ্ন করে নিয়েছিল। আর আমি? আমি সেটাকে নিছক একটা স্বপ্ন হিসেবেই দেখেছিলাম। পার্থক্যটা আসলে এখানেই।
তনিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—বুঝলাম না।
তাহসান এবার একটু থেমে, অনেকটা নিজের সঙ্গেই কথা বলার মতো করে বলল,
—ভালোবাসার একটা নিয়ম আছে, জানো?
—কী?
—ভালোবাসলে মানুষটাকে শুধু তার ভালো লাগা, হাসি কিংবা সুন্দর মুহূর্তগুলো দিয়ে ভালোবাসলে হয় না। তার সবকিছুকে নিয়ে ভালোবাসতে হয়। যেমন, তার স্বপ্ন, তার ইচ্ছে, তার চাওয়া, তার সবকিছুকে।
একটু থেমে দূরে চেয়ে বলল,
—তালহা ঠিক সেটাই করেছে। সে মেহরীনের সবটুকু নিয়ে তাকে ভালোবেসেছে। আর আমার কাছে মেহরীন ছিল কেবল কিছুক্ষণের মোহ। তাই তো আজ তার বিয়েও কোনো দ্বিধা ছাড়াই মেনে নিতে পারছি।
কথার শেষে তাহসান মৃদু হেসে ফেলল। তনিমা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর আচমকাই প্রশ্ন করল,
—কবে ফিরবেন?
তাহসান থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলল,
—জানা নেই।
তনিমার কণ্ঠ এবার আরও নরম হয়ে এল,
—আমি অপেক্ষা করব।
তাহসানের কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল। সে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮০
—আমার জন্য তুমি কেন অপেক্ষা করবে?
তনিমা এবার তারই বলা কথাগুলো ফিরিয়ে দিল। মুখে মৃদু হাসি রেখে বলল,
—ভালোবাসার একটা নিয়ম আছে না? ভালোবাসলে মানুষটার সবকিছুকে নিয়ে ভালোবাসতে হয়। তাই আমিও আপনার বিদেশ যাওয়ার বিষয়টাকে মেনে নিয়েই অপেক্ষা করব।
তাহসান হতবাক, কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। সে শুধু পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল তনিমার দিকে। মেয়েটা তখনও মুচকি হেসে দাঁড়িয়ে আছে। তার চমকানো অবস্থা দেখে তনিমা ঠোঁট মেলে হেসে হাঁটা ধরল ছাদ থেকে যেতে যেতে বলল,
—রাত করে ছাদে বেশিক্ষণ থাকবেন না। আমার জিনসে তানারা ভাগ বসাবে আমি একদম সহ্য করতে পারবো না।
