প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৩
সাইয়্যারা খান
স্ট্রেচারে করে ছুটছে তিন চারটি পা। হেমন্ত হাউমাউ করে কাঁদছে। ওর পা চলছে না। কপাল বেয়ে অবিরত ঘাম ঝড়ছে। ফ্যাকাসে মুখে জ্ঞানহারা পৌষকে নিয়ে ছুটছে তারা। ইমারজেন্সীতে থাকা ডাক্তার এগিয়ে আসে তারাতাড়ি। মুখের বাম দিকটা রক্তে ভেজা। শ্বাস নিচ্ছে কি না বোঝা দায়। ওয়ার্ডে ঢুকাতেই হেমন্তও সাথে চললো। গালে হাত দিয়ে ডাকলো করুন স্বরে। পৌষ নড়লো না। যেন ভাইয়ের ডাক সে শুনলোই না। হেমন্ত থামে না। ডাকতে থাকে বোনকে,
“পৌষ? ও পৌষ, বাচ্চা আমার, উঠ না সোনা। কি হয়েছে তোর? মুখে র’ক্ত এলো কই থেকে? তুই ব্যথা পেয়েছিস বাচ্চা? ভাইকে বল। উঠ পৌষ। জেদ কর আমার সাথে। বাচ্চা, প্লিজ উঠ না রে। ভাইকে এভাবে কাঁদাবি তুই? উঠ, আয় বাড়ী যাই।”
পাগলের প্রলাপ করতে লাগলো হেমন্ত। চৈত্র চোখ ডলছে। সেই প্রথম দেখেছিলো আপাকে। কলোনির সামনে ছিলো তার আপা। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছিলো না। চৈত্র আগ বাড়িয়ে যেতেই দেখে কেউ পড়ে আছে। পেছনে জৈষ্ঠ্য ছিলো। দুই ভাই সাহস করে এগিয়ে যেতে যেতেই লাইটের আলো গিয়ে পড়ে পৌষের উপর। ছুটে দু’জন গিয়ে তুলে নেয় পৌষকে। চিৎকার জুড়ে দিতেই ছোট চাচা বেরিয়ে আসেন। হেমন্ত ততক্ষণে মেইন রাস্তায় পৌঁছেছিলো। সরাসরি পৌষকে নিয়ে ছুটে এসেছে হাসপাতালে। গাড়ি থেকেই হেমন্ত কাঁদছে শব্দ করে। জৈষ্ঠ্য আর চৈত্র অঝোরে কাঁদছে। ছোট চাচা আর মেঝ থাকায় হাসপাতালে আসা গিয়েছে নাহয় এই তিন ভাই হয়তো বোন নিয়ে শুধু শোকই পালন করতো। এখানে আর আসতে পারতো না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“হেমন্ত, একটু সরো। দেখতে দাও ওকে।”
ছোট চাচা হেমন্তকে টেনে সরাতে চাইলো। হেমন্ত সরতে চায় না। শার্ট মেখেঝুকে গিয়েছে পৌষের র ক্তে। এত র ক্ত কোথা থেকে এলো বুঝলো না কেউ। নার্স ড্রেসিং করে যখন পুরোটা মুখ পরিষ্কার করলো তখন দেখলো কপালে শুধু গভীর একটা ক্ষত। সেখান থেকে অনেকক্ষণ যাবৎ ব্লিডিং হওয়ায় মুখ ভরে ছিলো র ক্তে। একটা স্যালাইন দিয়ে চেকআপ করা হলো। গুরুতর কিছু তারা পায় নি তবুও সাধারণ কিছু চেকআপ করার জন্য টেস্ট করবেন বলে জানালো। হেমন্ত বসে রইলো বোনের পাশে। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলো,
“ও উঠবে কখন?”
“দূর্বল দেখাচ্ছে অনেক। আশা করি জ্ঞান ফিরে আসবে।”
হেমন্ত গভীর চোখে দেখে বোনকে। মাথায় হাত বুলায় ধীরে ধীরে। বড় চাচা আর বড় চাচি তখন এসেছেন হাসপাতালে। ছোট চাচি দুই ঘুমন্ত মেয়ে নিয়ে আসতে পারেন নি। পিহা আর সেঝ চাচিও বাসায়। পিহা মেয়েটা জানে না। জানলে তাকে বাসায় রাখা দায় ছিলো। শ্রেয়াকেও এই মূহুর্তে কেউ আনে নি সাথে।
ডাক্তার স্পষ্ট করে বললেন,
“একজন এখানে থাকুন। বাকিরা বাইরে অপেক্ষা করুন। রুগীর পাশে এত মানুষ এলাউড না৷”
হেমন্ত, জৈষ্ঠ্য আর চৈত্র এরা কেউ নড়লো না। বাকি সবাই ধীরে ধীরে বেরিয়ে অপেক্ষা করলো করিডোরে। বড় চাচি ছোট চাচাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন,
“পৌষের জামাই আসে নি? জ্ঞান নাকি ফিরেছে? তাকে জানানো হয়েছে?”
“জানিয়েছে।”
তৌসিফ উপস্থিত না থাকলেও রনি আর টনি দু’জন হাসপাতালে পৌঁছেছে। তুরাগ শোনা মাত্র এদিকেই আসছে আদিত্যকে নিয়ে। তাদের সকলের পৌঁছানোরও প্রায় মিনিট দশ পর হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলো তৌসিফ। বিক্ষিপ্ত মানুষটাকে দেখে আঁতকে ওঠে যেন সকলে। এই দিকেই দৌড়ে আসছে সে। তুরাগ তারাতাড়ি যায় ভাইকে ধরতে। অসম্ভব ভাবে শ্বাসটান লাগছে তৌসিফের। তুরাগ ওকে ধরে বসাতে চায়, মানে না তৌসিফ। চিৎকার চেঁচামেচি করে। শার্ট ভিজে উঠেছে পিঠের। রনিকে গরম চোখ করে তৌসিফ জিজ্ঞেস করে,
“ও কোথায়?”
“আগে ড্রেসিংটা কর তৌসিফ। র ক্ত বের হচ্ছে।”
তৌসিফ মানে না। রনি মাথা নিচু করে পাশের কেবিন দেখাতেই তৌসিফ ভাইকে ছাড়িয়ে রনির দেখানো কেবিনে প্রবেশ করে খুব অস্থির হয়ে। তার কণ্ঠস্বর ভেদ করে ডাক আসে,
“পৌষরাত?”
ডাকটা রোজকার ন্যায় ডাকে সে। বাড়ীতে ঢুকা মাত্র এভাবেই তো ডাকে। পৌষ ছুটে আসে। ব্যস্ত হয় তৌসিফকে নিয়ে। আজ অবশ্য উত্তর করে না। এতক্ষণের সকল চঞ্চলতা, চেঁচামেচি থেমে গিয়ে নরম হয় তৌসিফ। চপল পায়ে আস্তেধীরে এগিয়ে আসে তার পৌষরাতের পাশে। হেমন্ত উঠে দাঁড়ায়। দুই ভাই নিয়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। তৌসিফ ওদিকে খেয়াল দিলো না। নজর বুলালো পুরোটা দেহে। কপালে সাদা ব্যান্ডেজ দেখে আঁতকে উঠলো কিছুটা। বুকটা অসম্ভব ভাবে বিট করলো। নিজের হাতটা রাখলো পৌষের গালে। আজ হাতটা কাঁপলো তার। ফ্যাকাসে মুখ আর ফেটে যাওয়া ঠোঁট দুটো দেখে তৌসিফের মনঃক্ষুণ্ন হলো। তার পৌষরাতটার কি হলো? আস্তেধীরে সে হাত দেখলো। বেঁধে রাখলে যেমন দাগ হয় ওমন দাগ। তৌসিফ বসলো। হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে চুমু খেলো তাতে। পা দুটো বেশ ময়লা। খুঁতখুঁত করা তৌসিফ সেই ময়লা পা দুটো নেড়েচেড়ে দেখলো। হাত দিয়ে পায়ের পাতা দুটো ঝেড়ে দিলো। এগিয়ে এলো পুণরায় মুখের কাছে। খুব নরম স্বরে ডাকলো সে,
“পৌষরাত?”
উত্তর আসে না তার। পুণরায় ডাকে সে,
“তোতাপাখি? আমার তোতাপাখিটা কই? সে কথা বলে না কেন?”
পৌষ এবারেও নিরুত্তাপ। তৌসিফ ঝুঁকে। ঠোঁটের কাছাকাছি ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
“তুমি না আমাকে ভালোবাসো হানি? দেখো, আমার পিঠ বেয়ে র ক্ত আসছে। খুব ব্যথা হচ্ছে পৌষরাত। ওয়েক আপ না হানি। আমাকে রাগীয়ে দাও। এলোমেলো নামে ডেকে দাও। আমাকে ভীষণ ভাবে নাড়িয়ে দাও। তবুও উঠে যায় পৌষরাত। একটাবার আমাকে দেখো। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।”
তৌসিফ ধীরে ধীরে মাথাটা এলিয়ে দিলো পৌষের মাথার পাশে। এত ধকল পুরুষদেহটা নিতে পারে নি। অবস হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
উমায়ের চিন্তায় এদিক ওদিক পায়চারি করছে। রাফিদকে এখনো কানাডা পাঠানো যায় নি। লুকিয়ে রেখেছে সে। ভিসা হচ্ছে না হুট করে। এ নিয়ে চিন্তায় উমায়ের ঘুমাতে পারছে না। তৌসিফের বউকে মানুষ দিয়ে রাতের আধারে হক বাড়ীর কোলনিতে রেখে এসেছে। বেঁধে রাখা ছাড়া তেমন কোন ক্ষতি হয় নি। এতে যদি তৌসিফ একটু শান্ত থাকে। রাফিদ ওখানে পাগলামো করছে। কি দেখেছে এই মেয়ের মাঝে? উমায়ের তো বেশ খানিকটা সময় নিয়ে দেখলো। কই? কিছুই বিশেষ নেই। সাধারণ একটা মুখ আর ফিনফিনে দেহ। বিশেষত্ব কি, উমায়ের খুঁজে পায় না। বিরক্ত লাগছে এখন। রাফিদ যদি ওখান থেকে পালিয়ে আসে তখন কি হবে? এই ছেলের মাথা ঠিক নেই। ঠিক থাকলে কি আর গাধার মতো তৌসিফকে শ্যুট করে তার বউ তুলে আনতো?
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫২
উমায়ের খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলো। কাল সকালে কিছু লোক নিয়ে যাবে তৌসিফকে দেখতে। এতে হয়তো-বা তৌসিফ তাকে সন্দেহ করবে না। আপাতত এটা ভেবেই নিজেকে সান্ত্বনা দিলো উমায়ের। অপেক্ষা আগামী কালকের। মাঝে শুধু রাফিদটা ঝামেলা না বাঁধালেই হয়।
