প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫২
সাইয়্যারা খান
হেমন্ত উপস্থিত হয়েছে ড্রাইভারের বাসায়। বউ, বাচ্চা সহ তৌসিফদের বাড়ীটা পেড়িয়ে ডান পাশ ধরেই যেতে হয় তাদের বাসায়। হেমন্ত দরজায় কড়া নাড়লো। ভেতর থেকে নারী কণ্ঠে কেউ জানতে চাইলো,
“কে? কে বাইরে?”
গলা ঝেড়ে হেমন্ত উত্তর দিলো,
“আমি। আমি হেমন্ত। তৌসিফ ভাইয়ের বিষয়ে কথা বলতে এসেছি।”
কিছুটা দ্রুতই দরজা খুলে গেলো। ড্রাইভার চেনেন হেমন্তকে। হেমন্ত ওনাকে সালাম দিয়ে ভদ্র ভাবে বললো,
“কিছু কথা ছিলো। বলা যাবে এখন?”
“জি, জি অবশ্যই। ভেতরে আসুন।”
হেমন্ত ভেতরে ঢুকলো। ড্রাইভার বসা ওর সামনে। হেমন্ত সরাসরি প্রশ্ন করলো,
“পৌষকে কে তুলে নিয়েছে আপনি দেখেছেন?”
“আমি মুখ দেখি নি। জোয়ান কিছু ছেলে ছিলো। স্যারকে কখন শ্যুট করেছে সেটাও জানি না৷ আমি কিছুটা দূরে গাড়িতে ছিলাম। ম্যামের চিৎকার করা ডাকে সন্দেহবশতই বেরিয়ে এসেছিলাম।”
“কয়জন ছিলো ভাই? কোন সন্দেহজনক কিছু দেখেন নি? কিছু তো দেখেছেন? একটু মনে করার চেষ্টা করুন।”
ড্রাইভার বলতে পারলো না কিছু। শুধু ঘটনা কি ঘটেছিলো তাই বলতে লাগলো,
“আমার চোখে তেমন কিছু পড়ে নি। ম্যামকে যখন টেনে নিচ্ছিলো তখন উনি শুধু আমাকে বলছিলো যাতে স্যারকে হসপিটালে নিয়ে আসি। বলতে বলতেই তাকে টেনে ঐ লাল গাড়িটায় তুলে নিলো। এরপর আমি স্যারকে নিয়ে হাসপিটালে যাই।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“লাল গাড়ি?”
হেমন্তের কানে শব্দটা খুব কড়া নাড়লো। ড্রাইভার মাথা নেড়ে বললো,
“জি, মার্সিডিজ বেঞ্জ জি ক্লাস ছিলো অনুমান করছি।”
“না..নাম্বার দেখেছিলেন?”
“না স্যার। আমি দেখার সুযোগ পাই নি।”
হেমন্তের চোখ ঘোলাটে হয়ে আসছে৷ মার্সিডিজ বেঞ্জ লাল রঙের, কারো তো সে দেখেছিলো। এই অত্র এলাকার মধ্যে এই গাড়ি হাতে গুনা একটা হবে কিনা সন্দেহ। তাহলে তো পুলিশের খুঁজে পেতে এত সময় লাগার কথা না। তার বোনকে খুঁজতে তাদের কারো মাঝেই তেমন তাড়া দেখে নি হেমন্ত। বুকের ভেতর কষ্ট গুলো কেমন চেপে আসতে চাইতে। একটু ভেবে হেমন্ত বললো,
“পুলিশকে বলেছিলেন গাড়িটার কথা? তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে না?”
“করেছিলো কিন্তু তখন মনে ছিলো না স্যার।”
“আচ্ছা। আজ উঠি।”
“একটু কিছু মুখে দিতেন স্যার।”
কিছুটা ইতস্ততভাবে বললেন তিনি। হেমন্ত দেখলো টেবিলে নাস্তা রাখা। ইচ্ছে না থাকলেও এক পিস কমলা মুখে দিলো উপরন্তু মানুষটা কষ্ট পেতে পারে।
এখান থেকে বেরিয়ে সরাসরি থানায় গেলো হেমন্ত। কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানায় এসে ফোন লাগালো জুবায়ের কবিরকে। তৌসিফের সাথে তার যোগাযোগ ভালো। কাজের বিষয়ে প্রায়সময় আসতো সে। হেমন্ত তার সাথে দুই-একবার কথা বলেছিলো। জুবায়ের জানালো সে আসছে। হেমন্ত যাতে অপেক্ষা করে। হেমন্ত গিয়ে বসলো পাশের এক বেঞ্চিতে। মাথাটা ধরে আছে। কোথায় আছে তার পৌষটা? বিরবির করে হেমন্ত,
“আল্লাহ, আমার পৌষটার কেউ নেই। তুমি ওকে দেখে রাখো প্লিজ। কোথায় আছে ও, কেমন আছে? কোথায় পাব ওকে? তুমি তৌসিফকে সুস্থ করে দাও আল্লাহ। আমি জানি, আমি ব্যার্থ ভাই হতে পারি কিন্তু সে ব্যার্থ স্বামী হবে না।”
জুবায়ের এলো দুই ঘন্টা পর। হেমন্তের হাল দেখে খারাপ লাগলো কিছুটা। বসিয়ে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো হেমন্তের দিকে। হেমন্ত এক ঢোকে পানিটুকু শেষ করলো। বেশ চিন্তিত হয়ে বললো,
“কোন খোঁজ পেলেন?”
“আমরা কয়েক বাসার সিসিটিভি ফুটেজ জোগাড় করার চেষ্টা চালাচ্ছি হেমন্ত। ওখানে তেমন কোন মানুষও ছিলো না।”
“আমি বিষয়টা সহজ করে দিচ্ছি কবির। ‘মার্সিডিজ বেঞ্জ’ এর লাল রঙের গাড়ি ছিলো। ঐ গাড়িটা তুলে নিয়েছে পৌষকে। একটু ভালো মতো খোঁজ নাও ভাই। আমার বাচ্চাটা কোথায় আছে একটু খুঁজে দাও।”
“লাল গাড়ি? মার্সিডিজ বেঞ্জ? কে বললো তোমাকে?”
“ড্রাইভার।”
“আমরা জিজ্ঞাদাবাদ করেছিলাম। আমাদের এমন কিছুই বলে নি।”
“আমাকে কথায় কথায় বলেছেন। আমার মনে হয় এখানে গাড়িটা কিছুটা হলেও টার্গেট করতে সহজ হবে। কেরানীগঞ্জে কয়জনই বা এই গাড়ি ব্যবহার করে? তার উপর জোয়ান ছেলেপেলে ছিলো।”
“আমরা নিজেরাও কিছু মানুষকে টার্গেট করেছি হেমন্ত। প্রতিমন্ত্রীও এই কাজ করতে পারে।”
“আমি তো এতকিছু জানি না কবির। প্লিজ ভাই, আমার বোনটাকে খুঁজে এনে দাও।”
“আমি বুঝতে পারছি হেমন্ত। তুমি একটু শান্ত হও। উই আর ট্রাইং আওয়ার বেস্ট।”
হেমন্ত উঠে গেলো সেখান থেকে। অহেতুক ফোনটা হাতে তুলে পৌষের নাম্বারে ডায়াল করলো। ওপাশ থেকে বারবার জানাচ্ছে এই নাম্বারে সংযোগ দেওয়া সম্ভব না তবুও তিনবার লাগাতার ডায়াল করলো হেমন্ত। অবুঝ আবদার ধরে বলতে লাগলো, “একবার ধর পৌষ। একটাবার ধর।”
হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগলো গায়ে। দুঃখী বলে সামনে তাকাতেই দেখলো আদিত্য। থানায় ওকে দেখে হেমন্ত সামান্য চমকালো। আদিত্যও এই মূহুর্তে হেমন্তকে আশা করে নি। আদিত্য একটু চুপ করে থেকে বললো,
“ভাইয়া এখানে?”
“তোমার বাসায় তো কারো তাড়া দেখছি না আদিত্য তাই নিজের বোনকে খুঁজার চেষ্টা করছি।”
আদিত্য মাথাটা নামিয়ে নিলো। তার চোখ সামান্য জ্বালা করছে। বেদনার রেশ টেনে বললো,
“আমি..আমি পুষির বিষয়ে জানতেই এসেছিলাম।”
“ওনারা এখনও কিছু জানে না আদিত্য। কিছুই জানে না। মাত্র এসে জানালাম শুধু লাল মার্সিডিসটা টার্গেট করতে অথচ তাদের তৎপরতা কতটুকু বুঝতে পারছি না।”
“লাল মার্সিডিজ?”
আদিত্য অবাকতা নিয়ে বললো। তার মাথায় স্পষ্ট হয়ে এলো কিছু চিন্তা ভাবনা।
সন্ধ্যা নাগাদ জ্ঞান ফেরে তৌসিফের। তার কাছে মনে হচ্ছে দীর্ঘ একটা ঘুম হয়েছে। শরীর মোচড় দিয়ে এক হাত আনমনে পাশে রাখে। অভ্যাসবশত হাতটা খুঁজে তার তোতাপাখিকে। যেই না হাতটা রাখে ওমনি হাতে আর পিঠে ব্যথায় চিলিক দিয়ে ওঠে। কপাল কুঁচকে সামান্য ব্যথাতুর শব্দ তুলে তৌসিফ। চিনচিন করে ওঠে পিঠের দিকটা। টেনেটুনে চোখ খুলে তৌসিফ। সাদা সিলিং আর ফিকে আকাশী রঙের পর্দা চোখের সামনে দেখে কপালের ভাজ আরেকটু গাঢ় হয়। একটু সময় লাগলো তার ভাবতে। কোথায় আর কিভাবে এসেছে এসেছে কথাটা যখনই মস্তিষ্ক ধরতে পারলো তখনই বুকের বাম পাশটায় থাকা লালচে খয়েরী যন্ত্রটায় যন্ত্রণা সৃষ্টি হলো। কিছুটা অস্থির হলো তার চিত্ত। জড়িয়ে আসা কণ্ঠটা তখন বেশ ভাঙা শোনালো। তৌসিফ ডেকে উঠলো বেশ খানিকটা দ্বিধা নিয়ে,
“পৌষরাত?”
উত্তর আসে না তবে জোরালো সেই শব্দে ভেতরে ঢুকে একসাথে তিন চারজন। তুরাগ দৌড়ে আসে ভাইয়ের কাছে। মাথায় হাত রাখে। ব্যাস্ত কণ্ঠে বলে,
“তৌসিফ? ঠিক আছিস তুই? ভাইকে বল, ব্যথা হচ্ছে পিঠে?”
চোখ দুটো ভেঙে আসতে চায় যেন। তৌসিফ দেখলো তাহিয়া আর তিশাও এসেছে। তাদের স্বামীরাও সাথে। দুই বোন তার বাসায় আসে না, সেই যে পৌষের সাথে ঝামেলা হলো এরপর থেকেই আসে না তারা। প্রত্যেকের চোখে পানি। তৌসিফ চাপা শ্বাস ফেললো। চোখের সামনে ভাসলো পৌষের কান্না, অস্থিরতা। কোনমতে জিজ্ঞেস করলো,
“পৌষরাত কোথায় ভাই?”
“পৌষ, পৌষ আসবে। তুই ডাক্তারকে দেখতে দে একটু।”
ডাক্তার চেক করতে নিলেই তৌসিফ ফুঁসে ওঠে। স্যালাইনটা আস্তে করে টেনে খুললো ও। হাতটা বেশ দূর্বল লাগছে। তৌসিফ ডাক্তারকে দৃঢ় স্বরে বললো,
“নার্সকে বলে ক্যানোলাটা খুলুন তো।”
“আমি শুধু একটু চেক করব তৌসিফ। একটু বসো।”
“প্রয়োজন নেই তার।”
নার্স ততক্ষণে ক্যানেলা খুলে সেখানে ছোট্ট একটা টেপ লাগিয়ে দিলো। তৌসিফ উঠে শার্ট খুঁজলো। আদিতি পাশ থেকে নতুন আনিয়ে রাখা শার্ট দিলো চাচ্চুকে। তুরাগ কিছুটা জোর করলো। বললো,
“ডাক্তার একবার দেখুক আগে। ওদিকে দেখছি আমি।”
“*ল দেখবে আমাকে? আমার বউ নেই এখানে! কি দেখবে তোমারা? দেখার হলে এতক্ষণে দেখতে না ভাই? আমার মানুষ, আমি খুঁজে নিব।”
তৌসিফ হন্তদন্ত হয়ে ফোন খুঁজলো। না পেতেই অদিতি বললো,
“ফোনের স্ক্রিনটা ভেঙে গিয়েছিলো চাচ্চু। ভাই গিয়েছে নতুন ফোন নিতে।”
তৌসিফ বিরক্ত হওয়ার আগেই আদিত্য ঢুকলো কোবিনে। ওর হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিলো তৌসিফ। কাকে জানি ফোন করতে করতে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। পেছনে কিছুটা দৌড়ে ছুটলো আদিত্য।
এবারে বোধহয় কাজ হলো। স্বয়ং তৌসিফ তালুকদার যখন থানায় হাজির হলো তখন থানাটা গমগম হয়ে উঠলো। জুবায়ের সেখানে নেই। তৌসিফ সরাসরি ওসির সাথে দেখা করলো। সসম্মানে বসতে দেওয়া হলো তৌসিফকে। ওসি এতক্ষণ অনেকটাই জানেন। তবুও যখন মুখ খুলে সৌজন্যের খাতিরে কিছু বলতে যাবেন তার আগেই তৌসিফ অনমনীয় ভঙ্গিতে বললো,
“আমার বউ কোথায়?”
দৃঢ় দৃষ্টি আর শক্ত চোয়াল। অসুস্থ দেহটাকে আড়ালে লুকিয়ে খোলসে আবৃত হলো যেন তৌসিফ তালুকদার। ওসি সামান্য কিছু সন্দেহের তালিকা জানেন। রাস্তায় আদিত্য থেকে শুনেছে অনেকটা। হেমন্ত কবিরের সাথে এখানেই আসছে। সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছে তারা। তৌসিফ পুণরায় একই ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
“বউ? আমার বউ পৌষরাত হক কোথায়? চব্বিশ ঘণ্টা হতে চললো সে নিখোঁজ।”
“স্যার, আমরা দেখছি বিষয়টা। ইন্সপেক্টর জুবায়ের আসছেন এখানে।”
তৌসিফ উঠে দাঁড়ালো। ওসির দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমার হাতে খুনও হতে পারে ওসি সাহেব। আপনারা দায়িত্ব পালনে অক্ষম। আইন নিশ্চুপ থাকলে জনগনেরই হাত এগিয়ে নিতে হয়।”
সেখান থেকে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো তৌসিফ। থানার মূল ফটকের পকেট গেইটের ওখানে হেমন্ত আর কবিরের দেখা পেলো। কবির এগিয়ে আসবে ঠিক তখনই তৌসিফ বললো,
“লাইন্সেস করা পি স্তল আমার কবির। আশা করি অনেকদিন পর বু লেট কাজে লাগবে।”
“ভাই, আমরা খোঁজ…”
তাকে থামিয়ে দিলো তৌসিফ। দাঁত খিঁচিয়ে বললো,
“একটা মানুষ খুঁজতে এতক্ষণ লাগার কথা না কবির। ঐসব *লছাল আমাকে বুঝাতে এসো না।”
তৌসিফ ওখান থেকে যেতে নিলেই হেমন্ত হঠাৎ বলে উঠলো,
“উমায়ের শিকদারের ভাই রাফিদ শিকদার পৌষকে তুলে নিয়ে গিয়েছে ভাই। ফুটেজ সামান্য ঘোলা কিন্তু সন্দেহের তালিকার শীর্ষে সে।”
তৌসিফ ঘাড় ঘুরিয়ে শুনলো। চোখ দুটো বুজে নিলো সাথে সাথে। এগিয়ে যেতে যেতে মনে মনে ভাঙলো কিছুটা। নিজ মনেই বলতে লাগলো করুন গলায়, ‘কোথায় তুমি পৌষরাত? কি করেছে ওরা তোমার সাথে? আমার আজ অনেক বছর পর ভয় হচ্ছে পৌষরাত। তোমার জন্য ভয় পাচ্ছি আমি।”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫১
তৌসিফ গাড়ি ঘুরালো। উদ্দেশ্য উমায়ের শিকদারের বাড়ী। মাঝ রাস্তায় ফোন আসলো তার। হক বাড়ীর সামনে পৌষকে পাওয়া গিয়েছে। ওখান থেকে সরাসরি হাসপাতালে নেয়া হয়ে তাকে। তৌসিফ গাড়ি ঘুরালো। অস্থির হয়ে গেলো হঠাৎ। হাসপাতালে কেন নিতে হলো? এত রাতেই বা কেন তাকে ফেলে গেলো? তবে কি খুব খারাপ কিছু হলো? রাগে, অস্থিরতায় স্টেরিং এ হাত দিয়ে আঘাত করলো তৌসিফ। বারবার মাথায় এলেমেলো চিন্তাভাবনা আসছে। বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। পিঠের ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে তার।
